ঢাকা, বুধবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ১৪ ১৪৩২

একটি প্রকল্পে গ্রামীণ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় আশার আলো

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:৩৩ পিএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার মাধ্যমে বদলে গেছে গ্রামীন নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা। 

মানবসম্পদ উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প’টি। 

প্রকল্পটি দেশের প্রত্যন্ত ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ জনগণের জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ গড়ে তোলা। পাশাপাশি পানি ও স্যানিটেশন খাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল। আর এতে প্রায় শতভাগ সফল প্রকল্পটি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এবং সরকার, বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্প ইতোমধ্যে দেশের ৩০টি জেলা, ৯৮টি উপজেলা ও প্রায় ১ হাজার ইউনিয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই উদ্যোগ সরাসরি বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা  নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন অর্জনে অবদান রাখছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের কারণে প্রতি বছর ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগজনিত কারণে বহু মানুষ, বিশেষত শিশুরা মারা যায়। বিশ্ব ব্যাংক রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী বায়ু দূষণ, অনিরাপদ পানি, নিম্নমানের স্যানিটেশন ও হাইজিন এবং আর্সেনিক মিলে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারেও বেশি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে।

প্রকল্প সূত্র বলছে, বিশুদ্ধ পানিতে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষে প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের জন্য ৩ হাজার ২৭৮টি ছোট স্কিম, ৫৪টি বড় স্কিম ও  উপকূলীয় ৩টি জেলায় ৪০টি লবনক্ততা দূরীকরণ প্লান্ট সহ ছোট স্কিম স্থাপন করা হয়েছে। এই স্কিমগুলোর মাধ্যমে আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত এলাকার হাজার হাজার পরিবার এখন নিরাপদ ও মানসম্মত পানির সুবিধা পাচ্ছে। 

উন্নত স্যানিটেশনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত কল্পে প্রকল্পের আওতায়  কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, বাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ জনসমাগমস্থলে আধুনিক পাবলিক টয়লেট ও হ্যান্ড ওয়াশিং স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি চর্চা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। 
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো হতদরিদ্র পরিবারে বিনামূল্যে টুইন পিট ল্যাট্রিন স্থাপন। দুই পিট বিশিষ্ট এই ল্যাট্রিন ব্যবস্থার ফলে এক পিট পূর্ণ হলে অপরটি ব্যবহার করা যায়, যা টেকসই স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব স্যানিটেশন নিশ্চিত করে। হতদরিদ্র পরিবারের জন্য মোট ২ লাখ ২০ হাজার ৮৭৪টি বিনামূল্যের টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে খোলা স্থানে মলত্যাগের প্রবণতা কমে এসেছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। 

পানি সরবরাহের ছোট স্কিমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত গ্রামীণ পর্যায়ের এই প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৫ হাজার ৪১৪ জন সুবিধাভোগীর বাড়ীতে লাগানো ট্যাপের মাধ্যমে নিরাপদ খাবার পানি পানের সুবিধা উপভোগ করছে। এছাড়া প্রকল্পের নিরাপদ স্যানিটেশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গের আওতায় গ্রামীণ পর্যায়ের ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৫০ জন সুবিধাভোগী নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা উপভোগ করছে। 

সুবিধাভোগীদের মধ্যে কুড়িগ্রামের এক হতদরিদ্র উপকারভোগী রাশেদা বেগম বলেন, ‘আগে আমাদের টয়লেট ছিল না। এখন সরকার বিনামূল্যে টুইন পিট ল্যাট্রিন করে দিয়েছে। ঘরে ঘরেই পরিষ্কার টয়লেট পেয়েছি, আর অসুখও আগের মতো হয় না আমাদের।’ 

অন্যদিকে, ছোট পানি সরবরাহ স্কিমের উপকারভোগী সুনামগঞ্জের কৃষক আব্দুল হক জানান, ‘পাইপ লাইনের পানির আগে আমাদের দূর থেকে আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত পানি আনতে হতো। এখন ঘরের কাছেই বিশুদ্ধ পানি পাই। সময় বাঁচে, শরীরও ভালো থাকে। আমাদের জীবনটাই বদলে গেছে।’

প্রকল্প পরিচালক মোঃ তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, প্রতিটি পানি সরবরাহ স্কিমে ব্যবহৃত রড, কংক্রিট, পাইপ ও পাম্প ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও স্পেসিফিকেশনের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তি বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার কয়েকটি প্যাকেজ বাতিল করা হয়েছে এবং নিম্নমানের পাইপলাইন পুনঃস্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্প অফিসের মনিটরিং টিমের প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো বিল পরিশোধ করা হচ্ছে না, এমন দৃষ্টান্ত প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে।

এমআর//