লাশ পোড়ানো মামলা: সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০১:৫৭ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর ভ্যানে স্তূপ করে লাশ পোড়ানোর বর্বরোচিত ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ঘোষিত প্রথম রায়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিন বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে এ মামলায় গ্রেপ্তার আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। তাদের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। গ্রেপ্তাররা হলেন- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিনে আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত হন এবং একজন গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে অত্যন্ত নৃশংসভাবে নিহত পাঁচজনের মরদেহ এবং জীবিত ওই আহত ব্যক্তিকে একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি ও আবুল হোসেন। এই লোমহর্ষক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ঘোষিত রায়ে পলাতক প্রধান আসামি সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মামলায় মোট ১৬ জন আসামির মধ্যে আটজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, মো. শাহিদুল ইসলাম এবং ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন অন্যতম।
অন্যদিকে সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান রিপন এবং আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদসহ আটজন আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই মামলায় এসআই শেখ আবজালুল হক নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক তিনটি মামলার রায় প্রদান করল। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।
পরবর্তীতে গত ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আজকের রায়ের মাধ্যমে আশুলিয়ার সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই রায়কে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।
এ মামলায় মোট ৫৩ জনকে সাক্ষী করেছে প্রসিকিউশন। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হয় চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম ও শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। ২২ কার্যদিবসে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ ২৪ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।
এএইচ
