ঢাকা, মঙ্গলবার   ১০ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ২৬ ১৪৩২

বিশ্বযুদ্ধ: প্রলয়ংকরী ইতিহাস ও বর্তমানের শঙ্কা

মানিক শিকদার

প্রকাশিত : ০৮:৪৫ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৮:৪৬ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন “জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী দিয়ে হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি আর পাথর দিয়ে।"  

ইরানের সাথে ইজরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলছে। আর এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আবর আমিরাত, কাতার, কুয়েতসহ মধ্য প্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ। অপরদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে প্রায় চারবছর ধরে। এখানেও দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাশে দাড়িয়েছে বিশ্বের পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। এ ছাড়া চীন তাইওয়ান উত্তেজনা, পাকিস্তান- আফগানিস্তান যুদ্ধসহ বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা চলছে।  এখন প্রশ্ন হলো তবে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো তার আগে চলুন জেনে নেই বিশ্বযুদ্ধ কি? এবং এর আগে সংগঠিত দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস। 

বিশ্বযুদ্ধ বলতে এমন এক বৈশ্বিক সামরিক সংঘাতকে বোঝায়, যেখানে পৃথিবীর প্রধান শক্তিশালী দেশগুলো দুটি বিপরীত শিবিরে বিভক্ত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের যুদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকাসহ প্রতিটি মহাদেশেই অনুভূত হয়। মানব ইতিহাসে এ পর্যন্ত দুটি স্বীকৃত বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে। এই যুদ্ধগুলো কেবল মানচিত্র পরিবর্তন করেনি, বরং মানুষের চিন্তা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধরন বদলে দিয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪ – ১৯১৮) 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে সমসাময়িক সময়ে 'গ্রেট ওয়ার' বা 'সব যুদ্ধ শেষ করার যুদ্ধ' বলা হতো। প্রায় চার বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে সারা বিশ্বের প্রায় ৭ কোটি সামরিক বাহিনীর সদস্য অংশ নিয়েছিল।  বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধের জন্য চারটি প্রধান কারন চিহ্নিত করে।

মিলিটারিজম (Militarism): ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।

অ্যালায়েন্স (Alliances): দেশগুলোর মধ্যে গোপন সামরিক চুক্তি ছিল, যার ফলে একটি দেশ যুদ্ধে জড়ালে মিত্র দেশগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে নামতে বাধ্য হতো।

ইম্পেরিয়ালিজম (Imperialism): উপনিবেশ স্থাপনের নেশায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।

ন্যাশনালিজম (Nationalism): উগ্র জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও আধিপত্যের লড়াই উসকে দেয়।

শুরুর কারণ: ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্দকে সার্বিয়ায় হত্যা করা হলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। তবে এর নেপথ্যে ছিল সাম্রাজ্যবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে গোপন সামরিক চুক্তি। একদিকে ছিল মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি এবং পরে যুক্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্র) এবং অন্যদিকে অক্ষশক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্য)। 

১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর জার্মানি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হয়। এতে প্রায় ৯০ লাখ  যোদ্ধা এবং ৭০ লাখ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়। 

১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর জার্মানি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হয়। তবে এই চুক্তিতে জার্মানির ওপর অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা পরোক্ষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়টা ছিল অত্যন্ত অস্থির। ১৯২৯ সালের মহামন্দা (Great Depression) বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। এই সুযোগে জার্মানি ও ইতালিতে জন্ম নেয় উগ্র একনায়কতন্ত্র। অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি এবং বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান বিশ্বকে আবার যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেয়। লিগ অফ নেশনস (League of Nations) বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯ – ১৯৪৫)

এটি ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ যুদ্ধ। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করে, তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মূলে ছিল হিটলারের নাৎসি বাহিনীর রাজ্য জয় এবং ভার্সাই চুক্তির অপমান থেকে উত্তরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

একপক্ষে ছিল মিত্রবাহিনী ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এবং অন্যপক্ষে অক্ষশক্তি নাৎসি জার্মানি, রাজকীয় জাপান ও ফ্যাসিবাদী ইতালি।  এই যুদ্ধেই প্রথম  পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা 'হলোকাষ্ট' ছিল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। 

১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানি আত্মসমর্পণ করলেও জাপানের সাথে যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে যুক্তরাষ্ট্র ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ শেষ হয়।

বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। বিশ্বশান্তি রক্ষায় ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রভাব কমে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন দুই পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। শুরু হয় কয়েক দশকের স্নায়ুযুদ্ধ।যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভারতসহ তাদের অধিকাংশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। হলোকাস্টের পর ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জোরালো হয় এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল 
প্রতিষ্ঠিত হয়।
 
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়েছে?

বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এশীয় অঞ্চলে আধিপত্যের লড়াই দেখে অনেকেই মনে করেন আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে বিশ্বযুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, সেই অর্থে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। তবে আধুনিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। এখনকার সংঘাতগুলোকে অনেকে 'হাইব্রিডওয়ার' বা 'ছায়াযুদ্ধ' বলছেন। 

পরাশক্তিগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া বা চীন এখনো একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। 'Mutually Assured Destruction' (MAD) নীতির কারণে দেশগুলো জানে যে, পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে কেউ জিতবে না, সবাই ধ্বংস হবে। এই ভয়ই বড় যুদ্ধ আটকে রেখেছে। এছাড়া বর্তমান বিশ্ব সাপ্লাই চেইন বা বাণিজ্যের মাধ্যমে একে অপরের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল যে, একটি বড় যুদ্ধ সবার অর্থনীতি ধ্বংস করে দেবে।

যদিও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক 'নতুন স্নায়ুযুদ্ধ' হিসেবে দেখছেন। সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রক্সি ওয়ারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ঠিকই বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময় ইরান ইজরাঈল ও যুক্তরাষ্ট্রের যে যুদ্ধ চলছে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বেই শুরু হয়েছে। দ্রুত যদি এই যুদ্ধ থামানো না যায় এবং প্রতিহিংসার দাবানল ছড়িয়ে পড়ে তাহলে মানব সভ্যতার ভয়াবহ রূপ দেখবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে।  

বিশ্বযুদ্ধ কোনো রোমাঞ্চকর ঘটনা নয়, বরং এটি মানবতার চরম ব্যর্থতার দলিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে যে, অস্ত্রের জয় সাময়িক কিন্তু তার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। প্রতিটি যুদ্ধের পর মানুষ বুঝতে পেরেছে যে কূটনীতিই শান্তির একমাত্র পথ। আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে শুরু করে আমাদের ব্যবহার করা প্রযুক্তি পর্যন্ত সবকিছুতেই সেই যুদ্ধের ছোঁয়া রয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা যেন আর কোনো বড় সংঘাতের সাক্ষী না হই, সেটাই হওয়া উচিত বর্তমান বিশ্বের প্রধান লক্ষ্য।

লেখক: মানিক শিকদার, সাংবাদিক

এমআর//