যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তরণের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ১২:৫১ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২৬ শনিবার | আপডেট: ১২:৫৪ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২৬ শনিবার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। উল্টো হরমুজ প্রণালীতে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইরান এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এই যুদ্ধের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, দুই সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিমান যুদ্ধের পর দেখা যাচ্ছে, ইরান বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গর্ব করা উপসাগরীয় দেশগুলো এখন চরম অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল ভোরে মার্কিন-ইসরাইল হামলার প্রথমদিনে তেহরানের আকাশে প্রথম কালো ধোঁয়া দেখার সময় পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখন তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। কয়েক বছরের গোয়েন্দা তৎপরতা ও পরিকল্পনার পর ইরানের রাজধানীতে একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ডজনখানেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এতে দেশটির সরকার কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
তবে আমেরিকান অধ্যাপক রবার্ট পেপ তার ‘বোম্বিং টু উইন’ বইয়ে লিখেছেন, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র লড়াইয়ে এ ধরনের কৌশল কখনোই কার্যকর হয়নি।
ইরানও এ বিষয়ে সচেতন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় আমরা গত দুই দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষা নিয়েছি।’
খামেনির মৃত্যুর পর ইরান দ্রুতই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দিয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেও দেশটির বিকেন্দ্রীকৃত ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে সামরিক কমান্ড ভেঙে পড়েনি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, ‘কিছু সিনিয়র নেতাকে হারালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও বেশ অটুট আছে।’
ভায়েজের মতে, তেহরান এখন তিন স্তরের কৌশল প্রয়োগ করছে। প্রথমত টিকে থাকা, দ্বিতীয়ত পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং তৃতীয়ত যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা, যাতে তারা নিজেদের শর্তে এটি শেষ করতে পারে।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। যুদ্ধ যত বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় তত দ্রুত বাড়ছে।
ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও সস্তা ড্রোন দিয়ে দুবাইয়ের মেরিনা ও সাগরে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধ এখন তুরস্ক, সাইপ্রাস ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। এছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোতে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং তেলের রেশনিং শুরু হয়েছে।
এই যুদ্ধের কারণে বিমান চলাচল থমকে গেছে এবং বিদেশিরা উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়ছেন।
তেল আমদানিকারক দেশগুলো তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি ছেড়েও পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারছে না।
কেনিয়ার চা বিক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া ও জাহাজ ভাড়ার সঙ্গে বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায়, তাদের গুদামে চায়ের বিশাল মজুত অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি রেশনিং করা হয়েছে এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, ‘আমরা জানতাম এটি বিশৃঙ্খলার একটি নতুন দুয়ার খুলে দেবে।’ তিনি আরও জানান, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে যারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছিল, সেই উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ক্ষুব্ধ।
ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, ‘ইরানের ওপর আমাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও, তাদের কৌশলগতভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি আছে।’
কানাডার লাভাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন প্যাকুইন বলেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত অতি-আত্মবিশ্বাসী ছিল যে তাদের হাতে সব কার্ড আছে। এই আত্মবিশ্বাসের পেছনের কারণ হচ্ছে, বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরো সরকারকে মার্কিন অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করা।
এ ছাড়া ইরানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের কারণে ওয়াশিংটন হয়তো দেশটির পরিস্থিতি তাদের জন্য সহজ ভেবেছিল।
ইরান এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ট্রাম্পের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করছে। এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দামি পেট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প এখন আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের মুখে পড়েছেন। জ্বালানির দাম নিয়ে সংবেদনশীল ভোটাররা ক্ষুব্ধ হওয়ায়, অনেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি ও সিনেটর হোয়াইট হাউসে ফোন করে তাদের আসন হারানোর আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন।
তবে ইরানও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে।
আইএফআরআই গবেষক ক্লেমেন্ট থার্মে বলেন, ইরান একটি ‘জম্বি স্টেটে’ পরিণত হওয়ার পথে, যেখানে সরকার কোনোমতে টিকে থাকলেও জনগণের বেতন দেওয়ার মতো অর্থ থাকছে না। নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। যদিও ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান এখনই হবে কি না, তা বলার সময় আসেনি।
সহজ কোনো সমাধান না থাকায়, ট্রাম্প হয়তো এখন ‘বিজয়’ শব্দটির সংজ্ঞা বদলে ফেলার চেষ্টা করবেন। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জেদ ছেড়ে দিয়ে তিনি হয়তো দাবি করবেন যে খামেনিকে হত্যা করাই ছিল মূল সাফল্য।
কিন্তু আটলান্টিক কাউন্সিলের নেট সোয়ানসন মনে করেন, ইরান হয়তো ট্রাম্পকে অত সহজে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেবে না।
এক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা থাকতে পারে— হয় স্থলবাহিনী নামিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করা অথবা ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিয়ে দেশটিতে একটি জাতিগত দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া। আপাতত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে এবং এর আঁচ মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এএইচ
