শোলাকিয়া ঈদ জামাতে জনসমুদ্র, বিশ্বশান্তি কামানায় দোয়া
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০১:০২ পিএম, ২১ মার্চ ২০২৬ শনিবার
কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম ঈদ জামাত। কয়েক লক্ষাধিক মুসল্লির অংশগ্রহণ আর নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল ১০টায় শুরু হয় নামাজ। দুই শতকের ঐতিহ্য ধরে রেখে আবারও জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ।
শনিবার ভোর হওয়ার আগেই নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আসতে শুরু করেন মুসল্লিরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকে একদিন আগেই কিশোরগঞ্জে চলে আসেন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদগাহমুখী সব রাস্তা ভরে যায় মুসল্লিতে। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত জামাতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধের কামনা, বিশ্ব শান্তি ও দেশের সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
জামাত শুরুর অনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ঈদগাহ। মাঠে জায়গা না পেয়ে অনেকে আশপাশের রাস্তা, নদীর পাড়, ফাঁকা জায়গা এবং বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন।
ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। চার স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রত্যেক মুসল্লিকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। ছাতা, লাঠিসোটা, দিয়াশলাই বা লাইটার নিয়ে কাউকে মাঠে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
চার প্লাটুন সেনাবাহিনী, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন ও আনসার সদস্য মাঠ ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। ড্রোন ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। কঠোর নিরাপত্তা থাকলেও মুসল্লিরা হাসিমুখে সহযোগিতা করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
৩০ বছর ধরে স্বপ্ন ছিল জীবনে একবার হলেও এখানে নামাজ পড়বেন সাতক্ষীরার ৫৬ বছর বয়সী মাদ্রাসা শিক্ষক শেখ শফিকুল ইসলাম। তার স্বপ্ন এবার পূরণ হযেছে। তিনি জানান, একটি স্বপ্ন ছিল, যে স্বপ্ন ছিল দীর্ঘ ৩০ বছরের। সেই স্বপ্ন এবার পূরণ হয়েছে।
বুধবার ইফতারের পর সাতক্ষীরা থেকে বাসে করে রওনা দেন তিনি। কিশোরগঞ্জে পৌঁছান বৃহস্পতিবার দুপুরে। এরপর পা রাখেন তার স্বপ্নের জায়গায়। যার জন্য এতদূর আসা। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানে জামায়াতে ঈদের নামাজ আদায় করার পর শফিকুলের মুখের হাসিই বলে তার স্বপ্নপূরণে তিনি কতটা আন্দদিত।
রেওয়াজ অনুযায়ী নামাজ শুরুর আগে বন্দুকের গুলির মাধ্যমে সংকেত দেওয়া হয়। ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং ৫ মিনিট আগে একটি গুলি ছোড়া হয়। জামাতে অগণিত মুসল্লি ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও গণ্যমান্য বক্তিরা নামাজ আদায় করেন।
শোলাকিয়া মাঠে ঈদ জামাতে অংশ নেন, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। এছাড়াও অংশ নেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, শোলাকিয়া ঈদগাহ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
এসময় পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, এবার স্বতস্ফুর্তভাবে লাখ লাখ মুসুল্লি শোলাকিয়া জামাতে অংশ নিয়েছেন। মুসুল্লিদের আসা যাওয়াসহ সার্বিক নিরাপত্তার শতভাগ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। মাঠের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যের জন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি আগামী ঈদুল ফিতর আরও জামজমকপূর্ণ হবে এমনটাই আশা করছি।
শোলাকিয়া মাঠ ও শহরের অলিগলিতে বসানো হয় নিরাপত্তা চৌকি। মাঠে ছিল তিনটি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিক্যাল টিম ও অগ্নিনির্বাপন দল। আর স্কাউট সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মুসল্লি এখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসেন। তারা যেন নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে নামাজ আদায় করতে পারেন-এ কারণে এবারো মাঠে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
জনশ্রুতি আছে, মোগল আমলে এই পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ’লাখ টাকা। সেই শ’লাখ থেকেই সময়ের বিবর্তনে নাম হয় শোলাকিয়া। আবার ইতিহাস বলছে, ১৮২৮ সালে এখানে একসঙ্গে সোয়া লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন- সেই সোয়া লাখ থেকে এই মাঠ ধীরে ধীরে শোলাকিয়া ঈদগাহ নামে পরিচিতি পায়।
এএইচ
