ঢাকা, শনিবার   ১১ এপ্রিল ২০২৬,   চৈত্র ২৮ ১৪৩২

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণে কঠিন পরিণতির দিকে দেশ: বক্তারা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৫:২২ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬ শনিবার | আপডেট: ০৫:২৬ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬ শনিবার

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিলের মাধ্যমে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা দেশকে ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে টেনে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা 

আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর, স্বাধীনতা আর কতদূর?” শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা একথা বলেন। 

স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ এ মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন, হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আপীল বিভাগের বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে যে পরিমাণ কাটাছেড়া করা হয়েছে তাতে একে সংস্কার করতেই হবে। যদি গণঅভ্যূত্থানকে বৈধ মনে করা না হয়, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল তার অধিকাংশই বৈধতা হারায় এবং বর্তমান সরকারও বৈধতা হারাবে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। সুতরাং বিষয়টি ৫৫ বছরের নয়, এ দাবী সার্বজনীন এবং সর্বকালের। এ দাবী থেকে পশ্চাদপসারণ করার চিন্তা কেবলই পিছিয়ে যাওয়ার নামান্তর। 

তিনি বলেন, অধ্যাদেশসমূহ রহিতকরণের মাধ্যমে বর্তমান সরকার অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদকে পরিত্যাগ করলো। যে জনগণ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্টকে সরাতে পারে, তাদের কাছে বর্তমান সরকারকে সরানো কোন ব্যাপারই না। তারা আত্মঘাতি কাজ করছে। তারা মানুষকে মূল্যায়ন করছে না। অমীমাংশিত বিষয় সমঝোতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন তিনি।

বিচার বিভাগের ২৮ জন অফিসারকে কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করার মাধ্যমে বিচার প্রশাসন ভালো কাজ করেনি।  সেই সাথে বিচার বিভাগ সংক্রান্তে কথা বলার প্রতিবাদে জারি করা নোটিশকেও তিনি বৈধ মনে করেন না। 

সুপ্রিম কোর্টের জৈষ্ঠ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, এই অধ্যাদেশ রহিতকরণের মাধ্যমে দেশ কঠিন পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ২০ বছর পরেও যদি আওয়ামী লীগ ফিরে আসে, তখন তারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, যা ভয়ের কারণ। জানি পৃথক সচিবালয় এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ পাবো না। তারপরও আমি আশাবাদী হতে চাই।

সুপ্রিম কোর্টের জৈষ্ঠ্য আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও চায় ক্রীতদাস বিচারক। লুটপাটের অর্থনীতি বজায় রাখতে তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ ও দুদক চায় না। তারা চায়, মন্ত্রী ও আমলাদের হাতে থাকুক নিম্নআদালতের বিচারকদের প্রমোশন-বদলীসহ সকল নিয়ন্ত্রণ। অথচ এই দানবদের বিরুদ্ধেই অভ্যূত্থান হয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্টের জৈষ্ঠ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, জুলাইয়ের শহীদ এবং আহতদের রক্ত এখনো দগদগে। এর মধ্যেই কি করে জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা ভুলে গেলেন, তাদের পরিণতির কথা। কিছুদিন আগেও যে ব্যক্তি এই অধ্যাদেশের পক্ষে বলেছেন, আজ মন্ত্রী হয়ে তিনি ভোল পাল্টেছেন। আকবর আলী খান যেভাবে শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, আমরাও সেভাবেই এদের হাত থেকে মুক্তি চাই।

সাবেক যুগ্ম জেলা জজ এবং আইনজীবী ড. মো: সাজ্জাদ হোসেন বলেন, রহিতকরণ ঠিক হয়নি, এ পদক্ষেপ সরকারের জন্যই বুমেরাং হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের কালচারাল ব্যাকআপ ছিলো কিন্তু বিএনপির তা নেই। আর কতকাল সংগ্রাম করলে বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে, জানতে চাই।

তিনি বলেন, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণে স্বাধীন বিচার বিভাগ শেষ। কারণ বিচারকদের কেউ কেউ এ সরকারের প্রধান হতে চান। আর এর কারণেই তারা দলীয় আস্থাভাজন হবার চেষ্টা করেন, দলগুলোও তাই চায়।  

সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ রহিতকরণের ফলে গণতন্ত্রের বিকাশ এবং গণতন্ত্র চর্চায় অন্তরায় তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সরকার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। ভিন্নমত দমনে আদালতকে ব্যবহারের সুয়োগ সৃষ্টি হবে। দাগী অপরাধীরা সরকারী দলের ছত্রছায়ায় থেকে বিচারের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয় আদালতে নিয়ে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টাও বৃদ্ধি পাবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চিতে বাঁধা হবে এ রহিতকরণ। 

এএইচ