ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ মে ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪৩৩

মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণ

বিশাল মার্কিন ট্রেজারি ঋণই কী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইউরোপের অস্ত্র?

তাসনোভা মাহবুব সালাম

প্রকাশিত : ১০:১৮ পিএম, ২০ মে ২০২৬ বুধবার

বাণিজ্য যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ন্যাটো নিয়ে চাপ — ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একের পর এক ঝামেলায় ফেলছেন, চাপে রাখার চেষ্টা করছেন। স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন আসে, কেন শতাব্দী প্রাচীন ইউরোপীয় মিত্রদের এভাবে চাপে রাখছেন ট্রাম্প! তবে কি ট্রাম্প চাপ দিয়ে কিছু লুকাতে চাইছেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে ইইউ মিত্রদের কাছে পাল্টা অস্ত্র রয়েছে, সেটি নিয়ে এখন পর্যন্ত খুব কমই আলোচনা হয়েছে — তবে সেই অস্ত্রে ট্রাম্প কিংবা মার্কিন অর্থনীতি যে কাবু হবে, সেটা ফরচুনসহ অনেক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকিলিস হিল বা গোপন দুর্বলতা হলো ইউরোপের হাতে থাকা আট ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড।

Fortune ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে Deutsche Bank-এর বিশ্লেষক জর্জ স্যারাভেলোস-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে — ইউরোপীয় দেশগুলো মোট ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন বন্ড ও ইকুইটি ধারণ করছে, যা বিশ্বের বাকি সব দেশের সম্মিলিত পরিমাণের প্রায় দ্বিগুণ। সহজ ভাষায়, ইউরোপ হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা।

স্যারাভেলোস সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন — পশ্চিমা জোটের ভূ-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যখন মৌলিকভাবে হুমকির মুখে, তখন ইউরোপীয়রা কেন আগের মতো আমেরিকার অর্থনীতিকে সমর্থন দিতে রাজি থাকবে? এই মন্তব্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ব্যক্তিগতভাবে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

ট্রাম্পের মেরুদন্ড বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোতের নামঃ "সেল আমেরিকা"!

Foreign Policy-র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই আলোচনা শুধু তাত্ত্বিক নয় — ২০২৫ সালে ট্রাম্পের Liberation Day শুল্ক ঘোষণার পর ডেনিশ পেনশন ফান্ডগুলো তাদের ডলার-নির্ভর বিনিয়োগ কমিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছিল। এই "Sell America" ট্রেড শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষা উল্লেখযোগ্যভাবে নরম হয়ে যায়।

Council on Foreign Relations (CFR)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ট্রেজারি মার্কেটের প্রায় ৩০ শতাংশ ধারণ করেন। ইউরোপ যদি এই বিনিয়োগ গুটিয়ে নেওয়া শুরু করে, তাহলে মার্কিন বন্ড ইল্ড বাড়বে, ঋণ ব্যয় বাড়বে এবং আমেরিকার সাধারণ মানুষের মর্টগেজ থেকে অটো লোন পর্যন্ত সবকিছু চিড়ে চ্যাপ্টা হবে।

তবে 'সেল আমেরিকা' পদক্ষেপে ইউরোপের দ্বিধা কাজ করছে কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প স্থায়ী নয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের স্থায়ী মিত্র! এটাও সত্য যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই!

Foreign Policy সতর্ক করে দিয়েছে — এই অস্ত্র প্রয়োগ করা ইউরোপের জন্যও বিপজ্জনক। মার্কিন ট্রেজারি বাজার বৈশ্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ইউরোপ যদি এটি দুর্বল করে, তাহলে সেই ধাক্কা বুমেরাং হয়ে নিজেদের উপরও পড়বে। এ কারণেই জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডিরিখ মেয়ারজ ইইউ-এর পাল্টা ব্যবস্থা নরম রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

তবুও Fortune-এর বিশ্লেষক জোয়ামিক ক্লেমেন্ট মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২৫ সালে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে ট্রাম্প দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পিছু হটেন। ফ্রান্স ইতিমধ্যে EU-র "Anti-Coercion Instrument" চালু করার দাবি তুলেছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থায়নকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

২০২৫ সালের জুলাইতে EU ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায় — যেখানে বেশিরভাগ ইউরোপীয় পণ্যে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্কের সীমা নির্ধারিত হয়। কিন্তু Time-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, EU সেই চুক্তি বাস্তবায়নের আইন পাস করতে দেরি করায় ট্রাম্প ইউরোপীয় গাড়িতে ২৫ শতাংশ নতুন শুল্কের হুমকি দিয়েছেন। একই সপ্তাহে মার্কিন বাণিজ্য আদালত রায় দিয়েছে, ট্রাম্পের বৈশ্বিক ১০ শতাংশ শুল্ক আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়িয়ে গেছে।


ইউরোপ-আমেরিকার এই আর্থিক টানাপড়েন একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে — বাণিজ্য যুদ্ধের পাশাপাশি এখন চলছে আর্থিক মনোযুদ্ধ। EU-র আট ট্রিলিয়ন ডলারের ট্রেজারি হোল্ডিং এখন শুধু বিনিয়োগ নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারের ট্রিগার। আর ট্রাম্পের পাগলামিতে বাধ্য হলে ইউরোপ এই ট্রিগার চাপ দিতেও পারে।