এইচ বি রিতার কলমে অবিনাশী জুলাই বিপ্লবের জীবন্ত দলিল
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০৫:১৩ পিএম, ৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সমকালীন ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই রক্তাক্ত দিনলিপি এবং তরুণ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার এক নির্মোহ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রচিত হয়েছে লেখক ও সাংবাদিক এইচ বি রিতার গ্রন্থ '২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার বিপ্লব' (ঘাসফুল প্রকাশনী, ২০২৫)।
বইটি মূলত ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনের রক্তঝরা ইতিহাস ও দীর্ঘ দেড় দশকের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতনের এক বস্তুনিষ্ঠ বিবরণী। দীর্ঘ দেড় দশকের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন যেভাবে মাত্র ৩৬ দিনের অবিনাশী গণআন্দোলনের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে বইটিতে। তবে এটি কেবল আন্দোলনের দিনলিপি নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক নিবিড় সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ। সাংবাদিক ও লেখক কাকন রেজা তাঁর মুখবন্ধে গ্রন্থটিকে কেবল একটি বই হিসেবে নয়, বরং 'শব্দাক্ষরে নির্মিত জুলাই বিপ্লবের নির্মোহ ইতিহাস' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ।
গ্রন্থটি মূলত ১ জুলাই থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ পর্যন্ত ৩৬ দিনের রক্তঝরা ইতিহাসকে ধারণ করেছে। এতে ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪-এর দ্বিতীয় সংস্করণের জন্ম, ৫৬% কোটার বৈষম্য ভাঙতে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামা এবং রাষ্ট্রীয় উসকানিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের রাজনৈতিক মোড় নেওয়ার ঘটনাগুলো বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের বীরত্বপূর্ণ আত্মদান এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কারফিউর মতো সরকারি বর্বরতা কীভাবে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দিয়ে একে সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর করে, তা লেখিকা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন।
গ্রন্থের একটি বড় অংশ জুড়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে—দেশ স্বাধীনের ৫৩ বছর পর কেন নতুন প্রজন্মকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিপ্লবের ডাক দিতে হলো। লেখিকা অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে স্বীকার করেও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষভাগের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত (যেমন: ১৯৭৫ সালের একদলীয় ‘বাকশাল’ গঠন) এবং পরবর্তী ১৫ বছরের শাসন আমলকে কাঠামোগতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। রাজনৈতিক গবেষক বদরুদ্দিন উমর ও অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর সূত্র ধরে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে দলটি ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল।
বইটিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ডিবি হেফাজতের ‘নির্মম নাটকীয়তা’। নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও সারজিস আলমসহ প্রধান সমন্বয়কদের জোরপূর্বক আটকে রেখে আন্দোলন প্রত্যাহারের যে ভিডিও বার্তা প্রচার করানো হয়েছিল, তার বিপরীতে ডিবি কার্যালয়ের ভেতরেই সমন্বয়কদের আমরণ অনশন এবং মুক্তির পর ‘৯ দফা দাবি’ আদায়ে তাদের অনমনীয় অবস্থানকে লেখিকা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গ্রন্থটির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো, এতে দেশজুড়ে চলা গণহত্যার একটি প্রামাণ্য ভৌগোলিক চিত্র দেশি-বিদেশি নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সারণিবদ্ধ করা হয়েছে। জেলায় জেলায় প্রতিদিনের সহিংসতা, গণগ্রেপ্তার, সমন্বয়কদের গুম-আটক,সুনির্দিষ্ট মৃত্যু সংখ্যা, শহীদদের নাম ও পরিচয় সহ নিহতদের করুণ পারিবারিক পরিস্থিতি এখানে আবেগঘন ভাষায় উঠে এসেছে। ৫ আগস্টের পর তৈরি হওয়া শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা এবং পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারের বিষয়গুলোও বাদ পড়েনি।
একজন পেশাদার শিক্ষক এবং মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে লেখিকা অত্যন্ত নিপুণভাবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটি ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি উইলহেম রাইখের ১৯৩৩ সালের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি মাস সাইকোলজি অফ ফ্যাসিজম’-এর সূত্র ধরে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, স্বৈরাচারী শাসকেরা সমাজে যে 'অবদমন ও ভয়ের সংস্কৃতি' তৈরি করেছিল, চব্বিশের 'জেনারেশন জেড' বুক পেতে দাঁড়িয়ে সেই মনস্তাত্ত্বিক জড়তাকে এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
ইতিহাস প্রায়শই বিজয়ীদের দ্বারা বিকৃত হয়, কিন্তু এই গ্রন্থটি দেশি-বিদেশি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র, সংবাদপত্রের শিরোনাম ও উপাত্তের ভিত্তিতে রচিত হওয়ায় এটি কোনো রাজনৈতিক প্রচারপত্র নয়। সশরীরে রণক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও প্রবাসে বসে প্রযুক্তি ও সংবেদনশীল মননের বদৌলতে লেখিকা যেভাবে প্রতিটি রক্তকণিকার হিসাব মলাটবদ্ধ করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের কাছে চব্বিশের বিপ্লবের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, অকাট্য এবং রেফারেন্সযোগ্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে টিকে থাকবে।
দীর্ঘ ২৭ বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতায় নিয়োজিত নরসিংদীর সন্তান এইচ বি রিতা সশরীরে রণক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও দিনরাত জাগ্রত থেকে প্রযুক্তি ও সংবেদনশীল মননের বদৌলতে এই জটিল ইতিহাসকে মলাটবদ্ধ করেছেন, যা প্রশংসার দাবিদার। এটি কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমজনতার রুখে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য দলিল, যা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের পাঠ করা উচিত।
এমআর//
