ঢাকা, শনিবার   ১৩ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪৩৩

রপ্তানি ধরে রাখতে কঠোর প্রতিযোগিতায় নামতে হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৫:৪৩ পিএম, ১৩ জুন ২০২৬ শনিবার

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে এবং সম্প্রসারিত করতে আরও কঠোর প্রতিযোগিতায় নামতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

শনিবার রাজধানীতে ‘রোডম্যাপ টু ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রপ্তানি অবস্থান ধরে রাখতে এবং সম্প্রসারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো প্রতিযোগিতা করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন করে গুরুত্বারোপের আহ্বানও জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার জন্য দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নব-নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও সেটির গতি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। এতে ভোক্তা চাহিদা কমে আসতে পারে এবং রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হল-অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন। 

তার ভাষ্যমতে, ‘এর সঙ্গে চলমান জ্বালানি সংকট নতুন মাত্রার জটিলতা তৈরি করেছে।’

খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশও এসব বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ, জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এগুলোর গভীর প্রভাব রয়েছে।

তিনি জানান, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী এবং ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে খোলামেলা ও ফলপ্রসূ আলোচনার লক্ষ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উৎপাদন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের প্রবাহকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণের জন্য অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। বাজারের ওঠানামার কারণে আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি।’

মন্ত্রী উল্লেখ করেন, উন্নত দেশগুলো যেখানে সাধারণত ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে। অথচ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনেকসময়ই ঋণের জন্য ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ গুনতে হয়। ফলে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অর্থায়নে আমাদের প্রবেশাধিকার এখনও অনেকটা সীমিত।

জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থায়নের সংকটের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগসূত্রের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড)-এর সাম্প্রতিক এক বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা কিছু দেশ কেবল ঝুঁকির কারণেই প্রতিবছর অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সুদ পরিশোধ করছে।

বৈদেশিক ঋণ এবং জলবায়ু সংকট এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বলেও মন্তব্য তিনি করেন।

ড. খলিলুর রহমান সতর্ক করে বলেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানি করা জ্বালানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় ইতোমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। এতে উৎপাদন খরচ ও সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

তিনি বলেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সম্পদ অন্য খাতে সরিয়ে নিতে পারে। এতে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমান জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই সংকটের প্রভাবে ১৯৮০-এর দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশকে উন্নয়নের ‘হারানো এক দশক’ পার করতে হয়েছিল।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মরণ করেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতায় বাংলাদেশ সেই দুঃসময়ে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছিল। 

তিনি কৃষি আধুনিকীকরণ ও মুক্তবাজার নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

উদীয়মান প্রযুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে তাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয় তথা ‘ট্রেড টেক’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নতুন রূপ দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন এবং ফাইভ-জি কানেক্টিভিটির মতো আধুনিক উদ্ভাবনগুলো এখন বিশ্ব বাণিজ্যকে বদলে দিচ্ছে।

ড. রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা তিনটি কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত-‘স্থিতিশীলতা, সংস্কার এবং অগ্রগতি’। আমাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কূটনীতিতে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হল দেশের নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ এই পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে বাংলাদেশ, যার লক্ষ্য হবে যৌথ প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি অর্জন।

এই সম্মেলনে তিনটি বিষয়ভিত্তিক সেশন রয়েছে: নীতিগত নিশ্চয়তা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে ‘দ্য পলিসি কম্পাস-অ্যাডভান্সিং ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’; আর্থিক সংস্কার ও বিনিয়োগের গতিশীলতা নিয়ে ‘ক্যাপিটাল ফর গ্রোথ-ফিন্যান্স, কমার্স অ্যান্ড ট্রেড’; এবং উদীয়মান খাত ও অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের সুযোগ নিয়ে ‘দ্য নিউ স্টেজ-গভর্নমেন্ট পলিসি, এআই, ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড স্পোর্ট’।

এএইচ