ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুন ২০২৬,   আষাঢ় ৩ ১৪৩৩

বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস

মরুকরণ ও খরার প্রভাবে ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:২৫ পিএম, ১৭ জুন ২০২৬ বুধবার

প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভূমির অবক্ষয়, মরুকরণ ও খরার ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় মরুকরণ ও খরা বিশ্ব কৃষির জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে খরার তীব্রতা ও ভূমির উর্বরতা হ্রাস কৃষি উৎপাদনকে ক্রমশ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

মরুকরণ ও খরার বৈশ্বিক চিত্র:

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি কোনো না কোনোভাবে অবক্ষয়ের শিকার এবং প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মানুষ এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করছে। প্রতিবছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি ভূমি অবক্ষয়ের কারণে উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশ্বের মোট মিঠা পানির প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে কৃষি উৎপাদনে পানি সংকট দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশের কৃষিতে খরার প্রভাব:

খরার কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধান চাষের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে ধানে চিটার পরিমান বেড়ে যায়, যার কারণে খরা প্রবণ জেলাগুলোতে (যেমন বরেন্দ্র অঞ্চল) স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ধান বা ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা বিভিন্ন মাত্রার খরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর ও নাটোর অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই খরার প্রভাব দেখা যায়।

খরার কারণে— ধান, গম, ভুট্টা ও ডালের উৎপাদন কমে যায়,সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পায়,মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা হ্রাস পায়,ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়, কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং আয় কমে যায়,খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদি অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়।

খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ:

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ।  এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হলে সীমিত জমি থেকে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একদিকে আবাদি জমি কমছে, অন্যদিকে খরা, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা ও ভূমি অবক্ষয় কৃষি উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

টেকসই কৃষি প্রযুক্তির গুরুত্ব:

১. খরা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে খরা সহনশীল ধান, গম, ভূট্টা ও ডাল জাতীয় ফসলের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে। খরা সহনশীল জাত ব্যবহার করলে কম পানি ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হয় এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হয়।

২. আধুনিক সেচ প্রযুক্তি: ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার সেচ ও অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (AWD) প্রযুক্তি পানির ব্যবহার ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এই প্রযুক্তিগুলো পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমায়।

৩. সংরক্ষণশীল কৃষি (Conservation Agriculture): জিরো টিলেজ, ন্যূনতম চাষ, ফসলের অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণ এবং ফসল পর্যায়ক্রমিক চাষের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা ও জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করা যায়। এতে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং খরা সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

৪. জৈব সার ও মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা: জৈব সার, কম্পোস্ট ও সবুজ সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। সুস্থ মাটি খরা মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

৫. কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার: স্যাটেলাইট তথ্য, আবহাওয়া পূর্বাভাস, স্মার্টফোনভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা কৃষকদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে। ফলে পানি, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।

৬. কৃষি বনায়ন (Agroforestry): কৃষিজমির সঙ্গে বৃক্ষরোপণের সমন্বয় মাটির ক্ষয়রোধ, কার্বন সংরক্ষণ এবং আর্দ্রতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া কৃষকের অতিরিক্ত আয় ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও এটি কার্যকর।

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও মরুকরণ প্রতিরোধ:

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। এই কর্মসূচি মরুকরণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৃক্ষ মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে এবং কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমায়। গ্রামীণ রাস্তা, খাসজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নদীতীর ও পতিত জমিতে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

খরা মোকাবিলায় করণীয়:

মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি কৃষক, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য— খরা সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ বাড়াতে হবে,পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তিতে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে,মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে,গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে,কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে,ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও কৃষি বনায়ন সম্প্রসারণ করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, মরুকরণ ও খরা কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মানব জীবনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে টেকসই কৃষি প্রযুক্তির বিস্তারই হতে পারে কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কৃষি বিশেষজ্ঞগণের মতে, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খরা ও মরুকরণের ঝুঁকি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ একটি জলবায়ু সহনশীল, উৎপাদনশীল ও খাদ্য নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল (কৃষি সাংবাদিক)