অস্তিত্ব সংকটে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ, উত্তরণের পথ খুঁজছে জাতীয় কমিটি
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০৬:৫৩ পিএম, ১৯ জুন ২০২৬ শুক্রবার | আপডেট: ০৬:৫৬ পিএম, ১৯ জুন ২০২৬ শুক্রবার
বাংলাদেশে এখনো নদীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। এমনকি প্রভাব খাটিয়ে নদীও নিজের নামে করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশবিদরা।
একই সঙ্গে মাটিদূষণ, বায়ুদূষণ ও নদীদূষণের কারণে মানুষসহ সমগ্র প্রাণিজগতের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি’ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ আরিফুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা। এ সময় পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবকরা উপস্থিত ছিলেন।
লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, নদী নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের যে সনদটি পরবর্তীতে আইনে পরিণত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর না করলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নদী-সংক্রান্ত আলোচনায় পিছিয়ে পড়বে। তিনি দাবি করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রায় ৩০০ হারিয়ে যাওয়া নদী পুনঃখনন করেছিলেন। কিন্তু নদী দখলের সঙ্গে জড়িত কিছু আমলা ও সুবিধাভোগী মহল একে ‘খাল খনন’ হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তিনি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইলিশের প্রজনন ও বঙ্গোপসাগরে পলি জমে ভূমি সৃষ্টির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি পরিবেশ আইনকে আরও যুগোপযোগী করারও দাবি জানান।
প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেন বলেন, দেশের মানুষের শরীরে ব্যাপক পুষ্টিঘাটতি রয়েছে, যা মাটির পুষ্টিহীনতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, দেশের ৫৬ শতাংশ মাটি অম্লীয় (অ্যাসিডিক), জিংক ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে এবং মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তাই মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও ক্যাপসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। এর ফলে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান মাত্রার শব্দদূষণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, উপকূলীয় নদীগুলোর তীরে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের বর্জ্য ও জ্বালানি পরিবহন কার্যক্রমও নদীদূষণ বাড়াচ্ছে।
ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. সবুর আহমেদ খাদ্যে ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা রক্ষার জন্য হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হলেও এখন দূষণের বোঝা বহন করছে একাধিক নদী।
স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক অধ্যাপক ড. ছায়েদুল হক বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে দেশে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ঘুমজনিত সমস্যা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৫ বছরে পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্র ও সমাজ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংস করা হয়েছে। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন দেশকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি জানান, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে ৭ হাজার ৮৯৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯২টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় ২১টি ইটভাটা থাকলেও একটিরও বৈধ অনুমোদন নেই বলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিভিন্ন হিসাবে দেশে নদীর সংখ্যা ২ হাজার ৪১০ হলেও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৪০৫। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১ হাজার ৪১৫টি নদীর তথ্য উপস্থাপন করা হলেও তা গেজেটভুক্ত হয়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতেই যদি ৫৫ বছর লেগে যায়, তাহলে নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে আর কত বছর লাগবে?”
তিনি জানান, এখন থেকে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
এ সময় ইপিএফ চেয়ারম্যান ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিলসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
এমআর//
