ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ জুলাই ২০২৬,   আষাঢ় ১৮ ১৪৩৩

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সংকট নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:১৮ পিএম, ২ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৯:২৫ পিএম, ২ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার

কয়েক দশক আগেও জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বন উজাড়, কার্বন নিঃসরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। কিন্তু আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, নগর ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ব-দ্বীপ অঞ্চলে এই সংকট আরও জটিল। কারণ এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কোনো একক খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ঘূর্ণিঝড় শুধু ঘরবাড়ি ভেঙে দেয় না; কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দেয়, মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে, শিশুদের বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, শহরমুখী অভিবাসন বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন এক ‘ঝুঁকি-বর্ধক’, যা বিদ্যমান প্রায় সব সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারায়, কৃষিজমি লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়, মাছের ঘের নষ্ট হয় এবং বহু মানুষ সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়। একইভাবে ২০২২ সালের সিলেট ও সুনামগঞ্জের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা শুধু রাস্তা-ঘাট ও অবকাঠামো ধ্বংস করেনি; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবির করে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে নীতিনির্ধারকদের আলোচনায়ও এসব দুর্যোগকে শুধু ত্রাণের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে।

বাস্তুচ্যুতি: জলবায়ুর নীরব নিরাপত্তা সংকট

বাংলাদেশে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আকস্মিক বন্যা লাখো মানুষকে ঘরছাড়া করছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে দেশে ২ কোটিরও বেশি বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন নীতিগত বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে জলবায়ু-সম্পর্কিত কারণে কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তারের ফলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।

বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় অংশ ঢাকাসহ বড় শহরের বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় নেয়। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা নতুন ধরনের দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। শহরের ওপর চাপ বাড়ে, স্থানীয় সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয় এবং সামাজিক বৈষম্য গভীরতর হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাই শুধু উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাজধানীর বস্তি, শ্রমবাজার এবং নগর পরিকল্পনার মধ্যেও প্রবেশ করে।

খাদ্য নিরাপত্তা: আগামী দিনের বড় লড়াই

বাংলাদেশের কৃষি বহুদিন ধরেই প্রকৃতিনির্ভর। কিন্তু এখন জলবায়ুর অনিশ্চয়তা কৃষিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ধান, সবজি ও ফলের উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘ খরা, আবার হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা কৃষকের পরিকল্পনাকে ভেঙে দিচ্ছে।
সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে অন্য জীবিকার সন্ধান করছেন। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, উপকূলীয় মাটিতে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় জীবিকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠছে।
খাদ্য উৎপাদন কমলে শুধু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ে, দরিদ্র পরিবারের পুষ্টি কমে, শিশুদের অপুষ্টি বাড়ে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়। খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে কৃষি নীতির বাইরে রেখে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের নতুন বাস্তবতা: 

বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভিবাসনের বড় অংশই অভ্যন্তরীণ। নদীভাঙনে চরাঞ্চল থেকে মানুষ জেলা শহরে আসে, উপকূল থেকে রাজধানীতে আসে, আবার হাওর এলাকা থেকে অন্যত্র জীবিকার সন্ধানে যায়। এর ফলে কিছু এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব দ্রুত বাড়ে, অন্য এলাকায় উৎপাদনশীল জনশক্তি কমে যায়। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, পলি, লবণাক্ততা ও পানির প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হলে তা সীমান্তসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলে। এসব বাস্তবতা আঞ্চলিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরা: 

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নীরব শিকার শিশু। একটি পরিবার নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারালে সবচেয়ে আগে বন্ধ হয় শিশুর স্কুলে যাওয়া। অনেক শিশু শ্রমে যুক্ত হয়, অনেক কিশোরীর বাল্যবিবাহ হয়, আবার অনেকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত নিয়ে বেড়ে ওঠে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিত না হলে শিশুরা পাচার, সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতেও পড়ে।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন শুধু আজকের সংকট নয়; এটি আগামী প্রজন্মের মানবসম্পদকে দুর্বল করে দেয়। জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো দক্ষ, সুস্থ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। সেই ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নও টেকসই হবে না।

সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ: 

জলবায়ু পরিবর্তন সাধারণত একা কোনো সংঘাত সৃষ্টি করে না। কিন্তু এটি কর্মসংস্থানের সংকট, দারিদ্র্য, খাদ্যঘাটতি ও সম্পদের ওপর
 প্রতিযোগিতাকে তীব্র করে তোলে। ফলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। যখন একটি শহরে কয়েক লাখ নতুন মানুষ এসে বসতি গড়ে, তখন আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পরিবহনের ওপর চাপ পড়ে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ অপরাধ, বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি নগর উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় ইস্যু।

বাংলাদেশ কী করছে?

বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি বিশ্বে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সরকার ইতোমধ্যে Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP), Bangladesh Delta Plan 2100, National Adaptation Plan (২০২৩–২০৫০) গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনাগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু-সহনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নীতিমালা প্রণয়নই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ।

এখন কী করা জরুরি?

প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তাকে শুধু ত্রাণ নয়, জীবিকা পুনর্গঠন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নগর পরিকল্পনায় আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। পঞ্চমত, শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু অভিযোজনকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় আনতে হবে।

পরিশেষে:
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর শুধু গাছ লাগানো, নদী রক্ষা কিংবা পরিবেশ দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবসম্পদ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার লড়াই। আজ যদি আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা সংকটের প্রকৃত গভীরতাকে বুঝতে ব্যর্থ হবো। কিন্তু যদি এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আমাদের নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাজেট—সবকিছুর কেন্দ্রেই জলবায়ু সহনশীলতা স্থান পাবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু নদী, বন বা উপকূল রক্ষার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর, যা জলবায়ুর অভিঘাত সহ্য করেও তার মানুষকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই জীবন নিশ্চিত করতে পারে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিবেশের নয়, জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে দেখার সময় এখনই।

রিয়াজ উদ্দীন: নিউজ এডিটর, একুশে টেলিভিশন