ঢাকা, শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ৩১ ১৪৩৩

নারী থেকে নেতৃত্ব: বেগম খালেদা জিয়া

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী

প্রকাশিত : ১২:২৩ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

১৫ আগস্ট ২০২৬। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম জন্মদিন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান হয়। রাষ্ট্র তিনদিনের শোক পালন করে। জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে তাঁকে শায়িত করা হয়। এরপর এই প্রথম তাঁর জন্মদিন এল তাঁকে ছাড়া। এমন দিনে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো শ্রদ্ধা জানানো। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো হিসাব নেওয়া।

অথচ হিসাবটা এখনই সবচেয়ে নির্মোহভাবে নেওয়া সম্ভব। একজন রাজনীতিবিদ যখন বেঁচে থাকেন, তাঁর প্রশংসার সঙ্গে কিছু পাওয়ার সম্পর্ক থাকে, সমালোচনার সঙ্গে কিছু হারানোর ভয় থাকে। মৃত্যুর পর সেসব আর থাকে না। যা থাকে, তা কেবল রেকর্ড।

তাই তাঁর প্রথম জন্মদিনে প্রশ্নটি শুধু ‘আমরা তাঁকে কতটা মনে রাখব’ নয়। প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট করা যায় এবং করা উচিত।

বাংলাদেশের নারী তাঁর কাছ থেকে কী পেয়েছে? তাঁকে নিয়ে এ দেশে মতৈক্য কখনো ছিল না, আজও নেই। কারও কাছে তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, কারও কাছে তিনি কঠোর সমালোচনার পাত্র। এই লেখা সেই বিতর্ক মেটাতে বসেনি। কিন্তু একটি প্রশ্নে অনুমানের জায়গা তুলনামূলকভাবে কম কারণ সেখানে উত্তর আছে নথিতে। সরকারি সিদ্ধান্তে, বাজেট বরাদ্দে, আইনের বইয়ে, বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায়। প্রশ্নটি নারীর।

শুরুটা তাঁর নিজের জীবন থেকেই। বেগম খালেদা জিয়া প্রচলিত অর্থে রাজনীতির মানুষ হিসেবে রাজনীতিতে আসেননি। তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী, একজন মা। ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর যে নারীর সামনে শোক আর অনিশ্চয়তা ছাড়া কিছু ছিল না, তিনি ১৯৯১ সালে হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।

কিন্তু এখানেই একটি ভুল হিসাব হতে পারে। একজন নারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসলেই দেশের বাকি নারীদের জীবন বদলায় না। ইতিহাসে এর উদাহরণ কম নয়। প্রতীক এক জিনিস, নীতি আরেক জিনিস। তাই আসল প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় বসে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি ছিল ১৯৯৪ সালের। তাঁর সরকার গ্রামীণ মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করে এবং সঙ্গে উপবৃত্তি চালু করে। প্রথম মেয়াদে মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়; তৃতীয় মেয়াদে সেটি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

শুনতে এটি নিছক একটি প্রশাসনিক আদেশ। কিন্তু এই আদেশটি আসলে বাংলাদেশের লাখো পরিবারের ভেতরে একটি হিসাব বদলে দিয়েছিল। কারণ গ্রামের দরিদ্র পরিবারে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রশ্নটি কখনো শুধু ইচ্ছার প্রশ্ন ছিল না, সেটি ছিল খরচের প্রশ্ন। বেতন লাগে, বই লাগে, যাতায়াত লাগে আর মেয়েটি স্কুলে গেলে ঘরের কাজ কমে। উপবৃত্তি সেই সমীকরণটি উল্টে দিল। মেয়েকে স্কুলে পাঠানো আর খরচ নয়, বরং সামান্য হলেও আয়। যে বাবা আগে হিসাব করে মেয়েকে ঘরে রাখতেন, তিনিই হিসাব করে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে শুরু করলেন। 

একটি সিদ্ধান্ত একসঙ্গে দুটি সমস্যায় আঘাত করল। মেয়েরা কম ঝরে পড়তে শুরু করল। আর মেয়েটি যত বেশি বছর ক্লাসে রইল, তত দেরিতে তার বিয়ের কথা উঠল। বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় পরে এই দুটোই প্রমাণিত হয়েছে  অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি মেয়েদের শিক্ষার স্তর বাড়িয়েছে এবং বিয়ের বয়স পিছিয়ে দিয়েছে।

এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছিল। ২০০০ সালে মেয়েদের শিক্ষায় উৎকর্ষের জন্য এটি বিশ্বব্যাংকের পুরস্কার পায়, এবং ২০০২ সালে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান এক ভাষণে এই কর্মসূচির উদাহরণ টানেন। উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষার মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৯ শতাংশ বহন করেছিল সরকারের নিজস্ব তহবিল অর্থাৎ দায়টা কেবল দাতাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি।

শিক্ষার ভিত্তিতেও কাজ হয়েছিল একই সময়ে। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকর হতে শুরু করে তাঁর সরকারের সময়েই ১৯৯২ সালে ৬৮টি উপজেলায়, আর ১৯৯৩ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশে। একই বছর দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে চালু হয় ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগে কোটা চালুর সিদ্ধান্তটি ছিল আরও সূক্ষ্ম। এটি একদিকে নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করল। অন্যদিকে সমাধান করল একটি নীরব সমস্যা যে বাবা-মা মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা করতেন, শ্রেণিকক্ষে একজন নারী শিক্ষক দেখে তাঁরা ভরসা পেলেন। মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি সহজ হলো ঘরের ভেতর থেকেই।

উচ্চশিক্ষার দুয়ারও খুলেছিল। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, কর্মজীবী এবং সংসারে আটকে পড়া নারীর জন্য পড়াশোনায় ফেরার একটি দ্বিতীয় সুযোগ তৈরি করল। মেয়েদের জন্য দুটি নতুন ক্যাডেট কলেজ এবং তিনটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। আর চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন সম্পূর্ণ নারীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগে তাঁর সরকার ১০০ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছিল।

নীতি টেকে যখন তা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। ১৯৯৫ সালে প্রবর্তিত হয় ‘বেগম রোকেয়া পদক’ নারীর অগ্রযাত্রায় অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, যা আজও দেওয়া হয়। পুলিশ বাহিনীতে নারীর অন্তর্ভুক্তির ধারা পুনরুজ্জীবিত হয় তাঁর আমলে। আর সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপটি আসে ২০০৪ সালের ১৬ মে  সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। এটি বক্তৃতা নয়। এটি সাংবিধানিক পরিবর্তন।

আইনের দিকেও পদক্ষেপ ছিল। ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করে তাঁর সরকার, এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের জন্য গঠিত হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। অপরাধকে আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং বিচারের একটি আলাদা পথ তৈরি করা এই দুটি ছাড়া নারীর নিরাপত্তার কথা কেবল কথাই থেকে যায়।

অর্থনীতিতেও একটি পরিবর্তন ঘটছিল। তাঁর সরকারের নীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে যে সহায়তা ছিল, তার সুফল সবচেয়ে বেশি পেয়েছিলেন নারীরাই আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মীই ছিলেন নারী। গ্রামের যে মেয়েটির হাতে জীবনে কখনো নিজের আয় আসেনি, তার হাতে প্রথম মাসের বেতন পৌঁছে দিয়েছিল এই খাত। পাশাপাশি স্বল্প আয়ের নারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ ও বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা হয়েছিল। সহায়তা দেওয়া নয়, সক্ষম করে তোলা লক্ষ্যটা ছিল এটাই।

এখন সৎ কথাটি বলা দরকার। এই অর্জনগুলো কেবল একজন মানুষের নয়। আজকের বাংলাদেশে কর্মজীবী নারী, নারী উদ্যোক্তা ও নারী শিক্ষার যে বিস্তৃত বাস্তবতা আমরা দেখি, তার পেছনে বহু সরকারের বহু বছরের কাজ আছে। উপবৃত্তির কর্মসূচি পরের সরকারগুলোও চালিয়েছে, বাড়িয়েছে। এই কৃতিত্ব কারও একক দাবি নয়, হওয়াও উচিত নয়।

আর কাজটি শেষও হয়নি। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হয়নি। যৌতুক বন্ধ হয়নি। বাল্যবিবাহ কমেছে, কিন্তু ফুরায়নি। যে পোশাকশ্রমিক নারীর হাতে প্রথম বেতন পৌঁছেছিল, তাঁর মজুরি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন আজও মেটেনি। যিনি এসব শুরু করেছিলেন, তাঁর হিসাবেও এই ব্যর্থতাগুলো লেখা থাকবে।

তবু একটি জিনিস আলাদা করে তাঁর নামের পাশে থাকবে। তিনি নারীশিক্ষাকে অনুদান হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন বিনিয়োগ হিসেবে এবং তিনি এমন একটি সময়ে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন, যখন মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর কথা বললে বহু ঘরে প্রশ্ন উঠত।

তাই বাংলাদেশের নারীর ইতিহাসে তাঁর অধ্যায়টি থাকবে। থাকবে একজন গৃহিণীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছানোর গল্প। থাকবে ১৯৯৪ সালের উপবৃত্তির সিদ্ধান্ত। থাকবে শ্রেণিকক্ষে প্রথমবার নারী শিক্ষক দেখে অভিভাবকের ভরসা পাওয়ার গল্প। থাকবে সংবিধানে নারীর আসন বাড়ানোর স্বাক্ষর। থাকবে আইনের বইয়ে যুক্ত হওয়া কয়েকটি ধারা। থাকবে প্রথম বেতন হাতে পাওয়া এক তরুণীর গল্প। আর থাকবে সেই মেয়েটির গল্প, যে আজ উপবৃত্তির টাকায় স্কুলে যায় এবং জানেই না সিদ্ধান্তটি কার।

এখানেই তাঁকে স্মরণ করার প্রশ্নটি আসে।

প্রথম জন্মদিনে সবচেয়ে সহজ কাজ হবে তাঁর ছবি দিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া। কেউ লিখবেন ‘আপসহীন নেত্রী’। কেউ লিখবেন ‘দেশনেত্রী’। এসব আবেগ স্বাভাবিক, এবং অন্যায্যও নয়। কিন্তু ছবি, ব্যানার আর ফুল দিয়ে একজন রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করা যায় না। তাঁকে স্মরণ করতে হয় তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো আবার সামনে এনে।

আর সেই প্রশ্নগুলো আজও খোলা। কত মেয়ে এখনো মাধ্যমিক শেষ করার আগে ঝরে পড়ে? কত মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় আঠারো পার হওয়ার আগে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ল, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সেই অনুপাত কোথায় গেল? সংরক্ষিত আসন বাড়ল, কিন্তু সরাসরি নির্বাচনে নারী প্রার্থী কতজন? আইন হলো, কিন্তু বিচার কত দিনে শেষ হয়? আর যে মেয়েটি আজ প্রথমবার নিজের আয়ের টাকা হাতে নিচ্ছে, সে কি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দায় এখন আর তাঁর নয়। দায়টি এখন তাঁদের, যাঁরা তাঁর রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছেন এবং আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বেও আছেন। উত্তরাধিকার মানে কেবল নাম ও ছবি বহন করা নয়। উত্তরাধিকার মানে অসমাপ্ত কাজটি এগিয়ে নেওয়া।

এবার আর তিনি জন্মদিনের শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন না। কেউ তাঁর হাতে ফুল তুলে দিতে পারবে না। কোনো মঞ্চে তাঁর জন্য চেয়ার রাখা হবে না। কোনো সমাবেশে তাঁর কণ্ঠ শোনা যাবে না। কিন্তু আজ সকালেও বাংলাদেশের অসংখ্য ঘরে একটি মেয়ে বই হাতে স্কুলের পথে বেরিয়েছে। সে তাঁকে চেনে না। তাঁর নাম হয়তো কখনো শোনেওনি। তবু তার সেই বেরিয়ে পড়ার পেছনে বহু বছর আগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত কাজ করছে। ভিত্তি এভাবেই কাজ করে নিঃশব্দে এবং যিনি রেখেছিলেন তাঁর চেয়ে বেশিদিন।

আপনি নেই, দেশনেত্রী। কিন্তু আপনার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো এখনো কাজ করছে, আর আপনার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো এখনো আমাদের সামনে। জন্মদিনে আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

লেখক: স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল; সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।

এএইচ