ঢাকা, বুধবার   ২৬ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১১ ১৪৩৩

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘অতল তলানিতে’: জাতিসংঘ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০১:৪৮ পিএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর ‘ক্রমাগত নৃশংস নির্যাতন’ এবং বিরল খনিজ পদার্থের অবৈধ খননসহ বিভিন্ন অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘ জানিয়েছে যে, মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘অতল তলানিতে’গিয়ে ঠেকেছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ ও বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল ও সম্পদশালী দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং সহায়তা প্রদানে বাধা দেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন করেছে।

এতে আরও বলা হয়, অভ্যুত্থানের পর থেকে আনুমানিক ৮,০৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক (যার মধ্যে ১,০৭৪ জন শিশু) নিহত হয়েছেন; এর মধ্যে অন্তত ১,২৪১ জন গত এক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন।

তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয় যে, উন্মুক্ত তথ্যের (ওপেন সোর্স) ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৫,৭৩১ জন এবং গত এক বছরে ৩,১০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সহিংসতার ফলে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৩৬ লাখে (৩.৬ মিলিয়ন) দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ (১২.৪ মিলিয়ন) মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে এবং ৪ লাখ শিশু ও মা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, পশ্চিম রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মি—একটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী যার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী লড়াই করছে—উভয়ই মূলত মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান এই সহিংসতা—যা প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা এক নৃশংস দমন অভিযানের নয় বছর পর ঘটছে—নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন ও লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম ও সৈন্য হিসেবে নিয়োগ এবং গ্রাম ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে। জোরপূর্বক নিয়োগের হাত থেকে বাঁচতে চাইলে রোহিঙ্গাদের আটক করা হয় এবং নিয়মিতভাবে দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়; ভুক্তভোগীরা মারধর, নখ উপড়ে ফেলা এবং যৌনাঙ্গে মরিচ ঘষে দেওয়ার মতো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারে আইনের শাসনের অনুপস্থিতির ফলে একটি বিশাল অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে; বিশেষ করে উত্তর কাচিন ও উত্তর-পূর্ব শান রাজ্যে অবৈধ 'রেয়ার আর্থ' (বিরল খনিজ) উত্তোলনের ফলে আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে কাচিন রাজ্যকে 'রেয়ার আর্থ' উত্তোলনের প্রধান এলাকা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে ২০২১ সালের পর থেকে ৩০২টি নতুন খনি বা উত্তোলনের স্থান তৈরি হয়েছে—যা ১৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খনি থেকে নির্গত বর্জ্য ও রাসায়নিকের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, যা মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে; ভারী ধাতু ও রাসায়নিকের সংস্পর্শের কারণে গর্ভপাত ও গর্ভাবস্থাজনিত অন্যান্য জটিলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এই প্রতিবেদনকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন।

তুর্ক বলেন, "এই প্রতিবেদনটি সারা দেশজুড়ে বিভিন্ন স্তরে যে দুর্ভোগ, দুর্দশা ও নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছে, তা হৃদয়বিদারক।"

হাইকমিশনার বিভিন্ন রাষ্ট্র, কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের মিয়ানমারের সাথে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

"আমি সকল রাষ্ট্র, কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীকে তাদের কর্মকাণ্ড—অথবা নিষ্ক্রিয়তা—নিয়ে গভীরভাবে আত্মসমীক্ষা করার আহ্বান জানাচ্ছি; তাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত: মিয়ানমারের জনগণের জন্য কি এটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত?"

সূত্র: আল জাজিরা /এমএইচ