নেপাল-তিব্বতে নিহত ১৬৫, ৮০০ বিদেশিসহ নিখোঁজ ১৫০০
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ১২:৪৮ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ১২:৫০ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে পুরো গ্রাম ভেসে গেছে। এতে প্রায় ৮০০ বিদেশিসহ প্রায় ১৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
হিমালয়ের একটি নদীতে কাদা ও পাথরের একটি দেয়াল ধসে পড়ায় শহর ও উপত্যকাগুলোতে বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এর ফলে নেপাল ও চীনের তিব্বত জুড়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার কয়েক শত নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত কাজ শুরু করেছে। এ খবর রয়টার্সের।
নেপালের উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান করছে এবং বুধবারের দুর্যোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষের কাছে জরুরি সরবরাহ পৌঁছে দিচ্ছে।
এই দুর্যোগটি তিব্বতের লাসার সাথে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুকে সংযোগকারী একটি দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে আঘাত হেনেছে, যেখানে ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে বলেন, “এই সংখ্যা বাড়বে, কারণ আমরা পুনরায় তল্লাশি শুরু করেছি এবং আরও মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনই বিদেশি। দুই ডজনেরও বেশি দেশের নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়া, ৩৩ জন ব্রিটেন এবং ২৫ জন কানাডার নাগরিক।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীন জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা তিনেই রয়েছে।
চীনের সীমান্ত এলাকার নজরদারি ক্যামেরার একটি ভিডিওতে বুধবার সকালে দেখা যায়, কয়েকতলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত আছড়ে পড়ছে। নিচে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। পানির স্রোত খেলনার মতো বাস ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ভয়াবহ গর্জনে পানি ও কাদার স্রোত ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী গ্রাম ও শহরগুলোতে আঘাত হানে। নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ১৬২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
নেপালের ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল জানান, তিনি বিপদে থাকা তাঁর ভগ্নিপতির কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারা কাঁদছিলেন এবং বলেছিলেন, তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।’
বহুতল ভবনের নিচের তলাগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও পাঁকের মধ্য দিয়ে হেঁটে জীবিতদের সন্ধান করছেন।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপালপ্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, স্ট্রেচার ও মরদেহ বহনের ব্যাগসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, তিব্বত সরকারের কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রায় ৮০০ জরুরি কর্মী ও ১৫০টি যানবাহন মোতায়েন করেছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে অনুসন্ধানী কুকুর ও দ্রুতগতির নৌকা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নদীতে এখনো যে বাধা রয়েছে, তা নতুন করে বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে।
বর্ষা মৌসুমে অনেক ট্রেকিং কোম্পানি পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তবে এ সময়ে ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী থাকেন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় ট্রেকিং এলাকাগুলোর প্রবেশদ্বার সিয়াব্রুবেসি। এ ছাড়া বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান কৈলাস পর্বতের পাদদেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীরাও সেখানে ছিলেন।
নেপালের পুলিশ প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, নদীর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে এবং পথে থাকা বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, কাদায় ডুবে থাকা মাটির ওপর একটি বাড়ির ওপরের তলা বেরিয়ে রয়েছে।
নেপালের উত্তরের রাসুয়া জেলা প্রথম বন্যায় আক্রান্ত হয়। তবে বন্যার পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট সাতটি নেপালি জেলায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণে ভারতের সীমান্তবর্তী চিতওয়ান পর্যন্ত এ বন্যা ছড়িয়ে পড়ে।
নেপালি সেনাবাহিনী আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তারা বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে যে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলা হয়েছিল, সেটি আসলে ছিল ‘হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত।’ এর ফলে ‘নিচের দিকে ভয়াবহ বিপর্যয়’ ঘটে।
এএইচ
