নেপালের বন্যায় নিহত ৫০০ ছাড়িয়েছে
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০৭:২৫ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার | আপডেট: ০৭:২৬ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার
নেপালে ভয়াবহ ভোতেকোশি নদীর বন্যার তৃতীয় দিনেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৯৭৭ জন, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। উদ্ধারকারী দলগুলো মূল বন্যাকবলিত এলাকা ছাড়িয়ে ভাটির বিভিন্ন জেলায় তল্লাশি চালাচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক ও প্রবল বন্যা আঘাত হানে। এতে রাসুয়া জেলার ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী তিমুরে ও সিয়াফ্রুবেসি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপাল-চীন সীমান্তের কাছ থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ ভাসিয়ে নেয় রাস্তা, সেতু, ভবন, যানবাহনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে এই স্রোত ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করে এবং ভাটির দিকে আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বন্যার কারণে কিছু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বন্যায় ৫৩৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে রাসুয়া জেলার নিহতদের পাশাপাশি ভাটির বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহও রয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এখনও ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল পুলিশের ২৮ সদস্যেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, নিখোঁজ তালিকায় থাকা কিছু মানুষ হয়তো নিরাপদে অন্যত্র পৌঁছেছেন; তাদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
ভোতেকোশি নদী ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার অংশ হওয়ায় বন্যার প্রবল স্রোত মানুষ ও ধ্বংসাবশেষকে অনেক দূর ভাটিতে নিয়ে গেছে। এ কারণে রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসি এলাকায় মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যার স্রোতে ভেসে আসা মরদেহগুলো বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলো সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন্যার ভয়াবহতার আরেকটি দিক সামনে এসেছে মরদেহ সংরক্ষণে জায়গার সংকটের মধ্য দিয়ে। চিতওয়ান জেলায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ১৮৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহের। এ অবস্থায় ভরতপুরের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভরতপুর মেট্রোপলিটন সিটি ভবনটির সংস্কার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরবরাহ করছে ড্রাই আইস।
নওয়ালপরাসি পূর্ব জেলাতেও হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। সেখান থেকে মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহওয়া ও পালপায় পাঠানো হচ্ছে। কাওয়াসোটির একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলকেও অস্থায়ী মর্গে রূপ দেওয়া হয়েছে।
ভাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে পোখারা। তানাহুন, গোর্খা, নওয়ালপরাসি পূর্ব ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ পোখারায় নেওয়া হয়েছে। কাস্কি জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে মোট ৮৮টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকলেও সেই ধারণক্ষমতা ইতিমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মরদেহগুলো ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সাধারণত এই তাপমাত্রায় মরদেহ প্রায় ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত রাখা সম্ভব। এর বেশি সময় সংরক্ষণের জন্য হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা প্রয়োজন হলেও পোখারায় বিপুলসংখ্যক মরদেহ রাখার মতো এমন সুবিধা নেই।
মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ প্রতিটি মরদেহের ছবি তুলছে, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করছে এবং ময়নাতদন্ত করছে। প্রয়োজন হলে ডিএনএ নমুনাও নেওয়া হচ্ছে। যেসব মরদেহের মুখমণ্ডল দেখে শনাক্ত করা সম্ভব, সেগুলোর ছবি পরিবারের সদস্যদের দেখানো হচ্ছে। আর ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুর নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং নেপাল পুলিশ সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, শনাক্তহীন বা দাবিদারহীন মরদেহ অনির্দিষ্টকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। ‘শনাক্তহীন ও দাবিদারহীন মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ সমাধিস্থল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রতিটি মরদেহকে একটি ট্যাগ নম্বর দেওয়া হবে এবং দাফন বা সমাধিস্থ করার বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ভবিষ্যতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে দেহাবশেষ খুঁজে বের করা যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নদীর ভাটির দিকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ায় নিখোঁজদের স্বজনরা চিতওয়ানসহ বিভিন্ন এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন। অনেকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের ছবি। অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হয়ে তারা প্রিয়জনের কোনো সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষা করছেন। উদ্ধার অভিযান যত বিস্তৃত হচ্ছে, স্বজনদের মধ্যে নিখোঁজদের জীবিত থাকার আশার পাশাপাশি তাদের পরিণতি জানার আকুতিও বাড়ছে।
রাসুয়া জেলার বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড।
উদ্ধার হওয়া পর্যটকদের মধ্যে রয়েছেন—৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন মার্কিন, ২ জন ইতালীয়, আরও ৩ জনের জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে।
বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী স্থলপথে নদীর তীর ও জনবসতিতে তল্লাশি চালাচ্ছে।
অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে ৪,৪০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী ও আর্মড পুলিশ ফোর্সও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নুয়াকোট, রাসুয়া ও ধাদিং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ১,৪৭৩ জনকে উদ্ধার অথবা প্রাথমিক সহায়তা দিয়েছে। তবে বন্যায় রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
চীন সীমান্তের তিব্বত অংশে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ও হ্রদকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ‘ছোচেন খোলা’ ও ‘পুরেপু সাংপো’ নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় ব্যারিয়ার লেক তৈরি হয়েছিল। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার সকালে হ্রদটির পানির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার বলে জানিয়েছিল এবং পরবর্তী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। পরে স্থানীয় পর্যায়ে হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও নেপাল সরকার বড় কোনো বাঁধ বা হ্রদ ভেঙে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
নেপালের সরকারি মুখপাত্র ও শিক্ষামন্ত্রী সাসমিত পোখারেল জানিয়েছেন, হিমবাহ ভেঙে ধ্বংসাবশেষ-মিশ্রিত পানি উপচে পড়ার খবর তারা পেয়েছেন। তবে বড় ধরনের বাঁধ ভেঙে পড়ার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং চীনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি নেই বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে দুই পক্ষের তথ্যের মধ্যে এখনো পুরোপুরি সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।
ভোতেকোশি নদীর পানির স্তর বাড়ছে বলে জানিয়েছে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। নদী ও আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ধুনচে ও রাসুয়া এলাকায় থাকা হেলিকপ্টারগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উজান থেকে অতিরিক্ত পানি এলে তা নতুন করে বিপজ্জনক স্রোত সৃষ্টি করবে কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগ।
মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও সব মন্ত্রী তাঁদের এক মাসের বেতন ও সম্মানী প্রধানমন্ত্রীর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়কে নেপাল-চীন সীমান্ত, ভোতেকোশি নদী এবং ভাটির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ ও ব্যবসার জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারতও অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। ১২ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তৃতীয় একটি সামরিক বিমান নেপালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে দুই চালানে ৪৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ওয়াশিংটন ৫ লাখ ডলার সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় একজন উপদেষ্টা পাঠানোর কথা জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ৯০ জন মার্কিন নাগরিকের বিষয়ে খোঁজ রাখছে; তাদের মধ্যে তিনজনকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার তৃতীয় দিনে উদ্ধার অভিযান এখন আর শুধু জীবিতদের উদ্ধারে সীমাবদ্ধ নেই। বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার, সেগুলোর সংরক্ষণ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং স্বজনদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু পুনরায় সচল করা, বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছানো এবং ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
চীন সীমান্তে সৃষ্ট ব্যারিয়ার লেক নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। উজান থেকে নতুন করে কতটা পানি ভাটির দিকে আসতে পারে, সে বিষয়ে নেপাল এখনো নিশ্চিত নয়। বন্যার তিন দিন পরও পুরো বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হয়নি। নিহতের সংখ্যা ৫৩৮ ছাড়িয়েছে, ৯৭৭ জন এখনো নিখোঁজ এবং ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
