ঢাকা, শনিবার   ২৯ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৩ ১৪৩৩

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ পেলো ৩৩৮ বাংলাদেশি এজেন্সি

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:৩১ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার

আবারও বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় মোট ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার সরাসরি ২৫টি এজেন্সিকে অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কাজ করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান **বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)**ও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময় অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এবার স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেই বাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরেও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

সরকারের দাবি, এসব ধারাবাহিক আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে প্রথম ধাপে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই নেওয়ার বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ নীতিগত সম্মতি দিয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই কর্মীদের বিমানভাড়াসহ অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো খরচ বহন করতে হবে না। প্রথম পর্যায়ের কর্মীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী পাঁচটি প্রধান দেশের জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে এজেন্সি নির্বাচন করেছে মালয়েশিয়া সরকার। বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ২৫টি প্রতিষ্ঠান আগের অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকায় ছিল।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, ওই তালিকায় থাকা যেসব প্রতিষ্ঠান আগের সরকারের সময়ে সুবিধা পেয়েছে বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হোক। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাস ধরে ধারাবাহিক আলোচনার পর মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে অতিরিক্ত এজেন্সি যুক্ত করার সুযোগ দিয়েছে।

ফলে সরাসরি নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলও যুক্ত থাকবে।

মন্ত্রণালয় মনে করছে, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ৩৩৮টি বাংলাদেশি এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

অনুমোদিত এজেন্সিগুলো বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিল মালয়েশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। এতে দেশটির মানবসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা ছিলেন।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এভাবে এজেন্সি যাচাইয়ের ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি।

বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন সমঝোতা স্মারক করার সময় রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আশা করছে সরকার।

শ্রমবাজার দ্রুত চালুর জন্য বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারগুলোর বিষয়ে পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগতে পারে। আপাতত মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত তালিকা থেকে বিতর্কিত ও আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে ১৬টি সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পাশাপাশি মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী মেডিকেল সেন্টারগুলো যাচাই করবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু হবে।

নতুন করে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, কর্মীদের সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে যোগদানের ব্যবস্থা এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া শ্রমিকদের জন্য যথাযথ আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে সরকার।

অভিবাসনসংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়। সরকারের ভাষ্য, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শ্রমবাজার চালু হলে নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল ও প্রতারক চক্রের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনো নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি করার আগে কাউকে কোনো অর্থ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ কারণে পরবর্তী সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য কর্মীদের সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।

সরকার জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম ঠিক কবে এবং কীভাবে শুরু হবে, তা চূড়ান্ত হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।

এমএইচ