ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৭ ১৪৩৩

অল্প সময়ের মধ্যেই লোডশেডিং অনেকটা কমবে: ডা. জাহেদ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৪৪ পিএম, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে যে সংকট চলছে, তার প্রভাবে বর্তমানে যে লোডশেডিং হচ্ছে তা খুব দ্রুতই কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।

জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব যেন শুধু গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বহন করতে না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিং তুলনামূলকভাবে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে।

তিনি জানান, লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমান লোডশেডিং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমবে বলে তিনি আশাবাদী।

রাজধানীতে সাম্প্রতিক লোডশেডিং প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, অতীতে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এর বিপরীতে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় তুলনামূলক বেশি লোডশেডিং করা হতো। বর্তমান সরকার সেই ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে।

তার মতে, বড় শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার যুক্তি রয়েছে। কারণ শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড বড় শহরকেন্দ্রিক। তবে শুধু শহরের মানুষের প্রভাব বা সক্ষমতার কারণে তাদের বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়নি। সংকটের সময় এর চাপ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।

আগের সরকারের সময় এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ’ সরবরাহের যে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে তখন কী পরিমাণ লোডশেডিং হয়েছে তার তথ্যও প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, কোন সময়ে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল এবং কোন কোন এলাকায় এর প্রভাব পড়েছিল, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল অতীতে বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছিল কি না, সেটিও তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে জানান তিনি।

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। এর মধ্যে জ্বালানির ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে উল্লেখ করেন তিনি।

তার বক্তব্য, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। শিল্প, ব্যবসা ও উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি তুলনামূলক কম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও কম ছিল। বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

সংকট সামাল দিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে যেন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় একটানা দীর্ঘ সময় লোডশেডিং না করে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে তা ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার ডিপিডিসি ও ডেসকো এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী লোডশেডিং করে যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে, তা দেশের অন্য অঞ্চলে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে ঢাকার বাইরে শিল্প ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সংকটের কারণে কমবেশি সবাইকে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সংকট কাটাতে সরকার কাজ করছে এবং দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা।

তিনি জানান, দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ডেনমার্কের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রকল্প এলাকায় টার্মিনালের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সারের পরিস্থিতি নিয়েও ব্রিফিংয়ে কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে সারের মজুত নিয়ে কোনো সংকট নেই। তবে কয়েকটি এলাকায় সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে বর্তমানে দেশে মোট ১২ দশমিক ৮৬১ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় এবার সারের মজুত কমেনি।

তবে কোথাও কোথাও বিতরণ পর্যায়ে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তথ্য উপদেষ্টা।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এগুলোর চলাচল ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, ই-রিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অনেক জায়গায় যান চলাচল ও ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এসব যানকে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সভাপতিত্ব করেন বলে জানান তিনি।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় ই-রিকশার কারিগরি ও যান্ত্রিক মান নির্ধারণ, চালকদের লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন এবং কোন সড়ক বা এলাকায় এসব যান চলাচল করতে পারবে—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ই-রিকশা বর্তমানে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার একটি বাস্তব অংশ হয়ে উঠেছে। তাই এটি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কার্যকর নীতিমালা হলে ই-রিকশা নিয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এমএইচ