ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ২৩ ১৪৩৩

বাধাহীন লংমার্চ, রাজনীতিতে সহনশীলতার বার্তা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:৩০ পিএম, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার | আপডেট: ১০:৪৮ পিএম, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার

জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিপুল গাড়িবহর নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট। ছয় দফা দাবিতে ৫ সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচিতে পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা হয়েছে। কর্মসূচিকে ঘিরে কোথাও কোথাও যানজট ও জনদুর্ভোগের অভিযোগও উঠেছে। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরকার বাধা না দেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে বাধা না দিয়ে সরকার সহনশীলতার রাজনীতির বার্তা দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর সরকারের কোনো রকম বাধা ছাড়া বিরোধী দল এ রকম কর্মসূচি পালনের সুযোগ পেল। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের চিত্র ছিল ঠিক উল্টো। বিরোধী দল ও মতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও দমন-পীড়ন চালানো হতো, যা রাজনীতির জন্য খুবই নেতিবাচক ধারা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সুস্থ রাজনীতির চর্চা শুরু করেছে। অতীতের পথে হাঁটছে না বর্তমান সরকারের প্রশাসন, যা খুবই ইতিবাচক।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির লংমার্চ, রোডমার্চ, সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। কর্মসূচির আগে থেকেই চলেছে গণগ্রেপ্তার। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্যজোট। এই লংমার্চে সরকার কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা তো দূরের কথা, চেষ্টাও করেনি। এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এটা তো একটা গণতান্ত্রিক সরকার। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমার মনে হয়, এই সরকারের নীতিটাই এমন যে, ভিন্নমত দমন করা হবে না। ভিন্নমত প্রচারের, প্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। তারা লংমার্চ করেছে, এটা তাদের একটা গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকার কোনো বাধা দেয় নাই, বাধা দেওয়ার কোনো রকম চেষ্টাও করেনি। এটা আমি খুব ভালো একটা লক্ষণ মনে করি। গণতন্ত্রে এটাই হওয়া উচিত। এ জন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই। বিরোধী দলকে আমি বলব, আপনারা প্রতিবাদ করেন; তবে তা সুশৃঙ্খল এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে করেন।’

লংমার্চের আগে জোটের নেতারা ধারণা করেছিলেন, হয়তো অতীতের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। সে জন্য তাঁরা কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকারও তাঁদের যাত্রাপথে কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তাঁরা পথসভা করেছেন, সরকারের সমালোচনা করেছেন এবং নির্ধারিত সমাপনী কর্মসূচিও পালন করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘জামায়াত আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। তারা ছয় মাসের একটি সরকারকে পতন ঘটানোর দাবি তুলছে। এটা তো দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।’

তিনি বলেন, ‘তবে বিএনপি সরকার লংমার্চ করার জন্য তাঁদের নিরাপত্তা দিয়ে ও কোনো ধরনের বাধা না দিয়ে উদারতার প্রমাণ দিয়েছে। যেটি আমরা বিগত সরকারের সময় দেখিনি।’

১৯৯৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে বিএনপির লংমার্চ কাঁচপুরে আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, ২০২৩ সালের ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি এবং ২০২৪ সালের কালো পতাকা মিছিলেও বিএনপিকে বাধা দেওয়া হয়। বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলাও চালানো হয়। ২০১০ সালে বিএনপি চট্টগ্রামে লংমার্চ করে। এই লংমার্চে আওয়ামী লীগ সরকার বড় রকমের বাধা দেয়। বিএনপি নেতা-কর্মীদের গণগ্রেপ্তার করা হয়। ২০১২ সালে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির দাবিতে করা লংমার্চে গাড়িবহরে পুলিশি তল্লাশি করা হয়। কয়েক জেলার নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৪ সালে তিস্তা লংমার্চেও সরকার বাধা দেয়। ২০২৪ সালে সিপিবি-বাসদের লংমার্চেও সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচনা নিতে পারত না। তারা ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী দল যেসব লংমার্চ, রোডমার্চ করেছে, সেগুলোয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করত। তার মধ্যে রয়েছে গণগ্রেপ্তার, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, রেল, নৌ ও সড়ক—সব পথেই যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত তারিখের আগে-পরে অঘোষিত সরকারি হরতাল চলত। চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির নামে হয়রানি করা হতো। গোয়েন্দা নজরদারির নামে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হতো। এ ছাড়া সমাবেশস্থল বারবার পরিবর্তন করানো হতো। সরকারের অনুমতি মিলত না। অনুমতি মিললেও স্থান পরিবর্তনের নামে নানা টালবাহানা করা হতো।

সেই অভিজ্ঞতার বিপরীতে ১১ দলের লংমার্চ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে কোনো বাধার মুখে পড়েনি। ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া লংমার্চটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোটের নেতারা। সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য, দাবি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কর্মসূচি হওয়া সত্ত্বেও তা প্রশাসনিক বা দলীয় শক্তি দিয়ে ঠেকানো হয়নি।

এই লংমার্চ অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে—রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব বাধা বা হামলা দিয়েই দিতে হবে, এমন নয়। সরকার বিরোধী দলের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ দিতে পারে। এই চর্চা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও সহনশীল সংস্কৃতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এমএইচ