ঢাকা, বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ২৪ ১৪৩৩

সৌদি আরবের চার শহরে হুথিদের হামলা, আহত ৭৩

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:৫৩ পিএম, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটিয়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহরে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। মঙ্গলবারের এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন তেল স্থাপনাতেও আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।

হুথিরা জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে তারা বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তাদের দাবি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে খামিস মুশাইতের একটি সৌদি বিমানঘাঁটি, আবহা, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন নাজরান এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী জাজানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। জাজানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি বড় শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের কথা নিশ্চিত করেছে। আহত ৭৩ জনের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ছয় মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে এত বড় আকারের হামলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য বিস্তৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সৌদি ভূখণ্ডে চালানো হামলাগুলোর মধ্যেও মঙ্গলবারের হামলা অন্যতম বড় বলে মনে করা হচ্ছে।

সৌদি শহরগুলোতে হামলার পরপরই ঘটনাস্থলের বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পরিবেশের কারণে স্বাধীনভাবে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে বিস্ফোরণ ও ঘন ধোঁয়ার কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। হুথিদের দাবি, সোমবার সৌদি সীমান্তবর্তী পূর্বাঞ্চলে পৃথক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকগুলোর ছবিই সেখানে দেখানো হয়েছে।

মঙ্গলবার পরবর্তী সময়ে হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম জানায়, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানার পূর্বে জুবাহ জেলায় চারটি বিমান হামলা চালিয়েছে।

সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, হুথিদের প্রতিহত করতে জোট প্রয়োজনীয় সব ধরনের অভিযান চালাবে এবং তাদের বৈরী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে হুথি মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার জন্য রিয়াদকে দায়ী করে এর ‘সমুচিত জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আরব জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাত কিছুটা স্তিমিত থাকলেও নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় লোহিত সাগরের প্রবেশপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) জানিয়েছে, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে গত তিন দিনের লড়াইয়ের কারণে ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।

দক্ষিণ-পশ্চিম সৌদি আরবে হামলা আরও বাড়লে হরমুজ প্রণালীর বাইরেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি চাপ ও পাল্টা চাপের দিকে এগোচ্ছে। উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রেখে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরান প্রণালীটি ঘিরে নতুন করে ‘সামুদ্রিক নিষিদ্ধ এলাকা’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। তেহরানের দাবি, এই এলাকা মার্কিন অবরোধের সীমানা থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে পারস্য উপসাগরের অভ্যন্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্পষ্ট সতর্কবার্তা’ দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধের জবাবে সামুদ্রিক নিষিদ্ধ এলাকা তৈরির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হলেও দেশটির হাতে এখনও এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ এবং অঞ্চলটির মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে যেত। ফলে প্রণালী ঘিরে সংঘাত আরও তীব্র হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে। ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য গ্যালনপ্রতি ৫.৯০ ডলারের বেশি হওয়ায় তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হলে তেলের দাম দ্রুত কমে গ্যালনপ্রতি ৩ ডলারে এবং পরে ২ ডলারের নিচে নেমে আসবে।

সৌদি আরবের চার শহরে হুথিদের সর্বশেষ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতে নতুন একটি ফ্রন্টের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি তেল স্থাপনা, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা