ঢাকা, বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ২৫ ১৪৩৩

ইসরায়েলের পণ্যে ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা, বসতি স্থাপনকে অবৈধ ঘোষণা

লন্ডন প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১০:২৮ এএম, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ইসরায়েল থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণ ও সম্প্রসারণে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে লন্ডন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, শুধু অন্যায়-অবিচারের সমালোচনা করাই যথেষ্ট নয়, এবার ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’র অভিযোগও তুলেছে ব্রিটিশ সরকার। তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায় যুক্তরাজ্য।

লন্ডনের নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে সরাসরি অবৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

জেরুজালেমের কাছাকাছি এই এলাকায় ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্রিটেনের মতে, এতে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে লন্ডন। শুধু বসতি সম্প্রসারণ নয়, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ব্রিটেন।

মিলিব্যান্ড বলেছেন, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ চলছে।

তবে ইসরায়েল এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বলেছেন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ।

ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একই দিনে একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ফ্রান্স ও কানাডাও। তিন দেশই পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

লন্ডনের নতুন আইন কার্যকর হতে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে। তবে বসতি সম্প্রসারণে জড়িত কিছু উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক অবশ্য পুরোপুরি ছিন্ন করছে না লন্ডন। লন্ডনের দাবি, নিষেধাজ্ঞাগুলো ইসরায়েলের জনগণের বিরুদ্ধে নয়; লক্ষ্য ইসরায়েল সরকারের বসতি ও দখলদারিত্বের নীতি। একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।

তবে ব্রিটেনের এই ঘোষণার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের একটি অংশের ওপর ইসরায়েলে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হচ্ছে।

এমনকি সাবেক ব্রিটিশ লেবার নেতা জেরেমি করবিনসহ কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের ওপরও নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্রও ব্রিটেনের এই পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়েছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ব্রিটিশ নীতির সমালোচনা করেছেন। তবে ওয়াশিংটন আপাতত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতির পণ্য আমদানিতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডার মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব খুব বড় নাও হতে পারে। কারণ পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোর পণ্য ইসরায়েলের মোট রপ্তানির তুলনায় খুবই সামান্য।

কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ব্রিটেন—ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র—এবার সরাসরি দখলদারিত্ব ও বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, তখন ব্রিটেনের এই নীতিগত পরিবর্তন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

লন্ডনের দাবি, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে এখনই বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের অভিযোগ, ব্রিটেনের পদক্ষেপ একতরফা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ।

ফলে গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে ঘিরে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেই যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, ব্রিটেনের নতুন নীতি তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

এএইচ