ঢাকা, সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ৩০ ১৪৩৩

ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার 

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৮:৪৭ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার

দেশের ব্যাংকিং খাতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মাত্র তিন মাসে এই সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজারের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ ২০২৬ শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। অর্থাৎ মার্চ থেকে জুনের এই তিন মাসে এমন হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।

একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি অংশ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ চালাচ্ছে। অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে। অর্থনীতির এই বিপরীত চিত্র নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

এর তিন মাস আগে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। তখন এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি। একই সময়ে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসায় আমানত বাড়ছে। পাশাপাশি বড় ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত বৃদ্ধিও মোট আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তবে ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশের প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব হিসাবের মধ্যে ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব থাকতে পারে। আবার একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করতে পারে। ফলে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা আর কোটিপতি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক নয়।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল মাত্র ৫টি। ১৯৭৫ সালে তা বেড়ে ৪৭টি এবং ১৯৮০ সালে ৯৮টিতে পৌঁছায়।

পরবর্তী দশকগুলোতে এ সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে কোটি টাকার হিসাব ছিল ৯৪৩টি। ১৯৯৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৯৪টি। ২০০১ সালে ছিল ৫ হাজার ১৬২টি এবং ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি।
২০০৮ সালে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টিতে।

এরপরও ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে বড় অঙ্কের আমানতের হিসাব। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬টি।

২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এমন হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। পরের বছর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। সবশেষ জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের একটি অংশ যখন উচ্চ ব্যয় ও আর্থিক চাপ সামলাতে সঞ্চয় ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি আয় ও সম্পদ বণ্টনের ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরছে।

একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত বৃদ্ধির অর্থ হলো অর্থনীতির একটি অংশে তারল্য ও সঞ্চয় বাড়ছে। ফলে বড় আমানতধারীদের সংখ্যা ও সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ—এই দুই প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে আয় ও সম্পদের বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করছে।

এমএইচ