সাংবিধানিকভাবে দায়মুক্তি পাচ্ছেন জুলাইযোদ্ধারা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০৯:৪৩ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার
সংবিধানে ফিরছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান। একই সঙ্গে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নিশ্চিতের পাশাপাশি এর বীর রাজনৈতিক ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের (জুলাই যোদ্ধা) সুনির্দিষ্ট তফসিলে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দিতে যাচ্ছে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটির বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতেই এই নতুন সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে তোলা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে সব রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষর করেছে, ঠিক সেভাবেই এটি বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে, আগামীতে সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক সংশোধনীতে জনগণের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে গণভোটের বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্বহাল করা হবে।
তিনি বলেন, আজকের ষষ্ঠ বৈঠকে মোট ৬৩ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে (জুলাই যোদ্ধাদের) প্রতিনিধি হিসেবে শহীদদের মা-বাবা, ভাই এবং আহতদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত স্থানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
অনেকে এটি প্রস্তাবনায় যুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নকালে যেসব রাজনৈতিক দল ও শক্তি যেভাবে একমত হয়েছে, সেভাবেই সংবিধানে তা ধারণ করা হবে। তাদের সমস্ত প্রস্তাব লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ইতঃপূর্বে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে যে আইন করা হয়েছিল তা বহাল রয়েছে। তবে বিচারিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি জটিলতা এড়াতে তফসিলে সুনির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া, গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং শেখ হাসিনাসহ তার দোসরদের বিচারের গতি দ্রুত করার বিষয়ে তারা জোর দাবি জানিয়েছেন। সরকার ও আদালত বিচার কার্যক্রমে স্বাধীন হলেও তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং চার্জ গঠনের মতো বিচারসহায়ক কাজগুলো যেন দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ আন্তরিক বলে আস্বস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির অধীনে অন্যান্য আদালতে চলমান মামলাগুলো নিবিড় তদারকির মাধ্যমে নিষ্পত্তির আশ্বাস দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দীর্ঘ ছয়-সাত মাসের আলোচনার ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঘোষণাপত্র প্রণীত হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে। সংবিধানের তফসিলে এটিকে এমনভাবে ধারণ করা হবে যাতে এটি আইনি রূপ পায় এবং জুলাই যোদ্ধারা সাংবিধানিক দায়মুক্তি ও নিরাপত্তা পান।
বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সরকার ঠিক সেই অনুযায়ী কাজ করছে। নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া সনদ বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই, কারণ ঐক্যমত্য সেভাবেই হয়েছিল। জাতীয় স্বার্থে এবং নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি সর্বজনগ্রাহ্য বিল সংসদে জমা দেওয়া হবে।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতে যে গণভোটের কথা বলা হয়েছিল তা ছিল আইনি গণভোট। কিন্তু সামনে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, সেগুলো পুরোপুরি সাংবিধানিক বাধ্যতামূলক গণভোট। সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮-এ উল্লিখিত মূলনীতি, অনুচ্ছেদ ৪৮, ৫৬ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হলে সংশোধনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগেই জনগণের রায়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করতে হবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়াকে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। আইনের ‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’ বা গ্রহণ তত্ত্বের আলোকেও ওই বাতিলের সিদ্ধান্ত দূর হয়ে আগের আইনি অবস্থা বহাল হয়েছে। সংসদে এটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হলে গণভোটের বিষয়টি আর কোনো প্রশ্নের মুখে থাকবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোর বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ১৯৯৬ বা ২০০৬ সালের আগের অনুকরণে হুবহু কিছু করা হচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকার গঠিত হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার বর্তমানে সমাজের সব স্তরের মানুষ, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বিচারক, সাবেক বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদদের মতামত গ্রহণ করছে।
অতীতে বিতর্কিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব অর্পণের শেষ অপশনটি বাদ দেওয়ার পক্ষে সরকারের অবস্থান রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে কেউ রাজপথে লংমার্চ বা কর্মসূচি পালন করলে সেটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তবে চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সংসদের আলোচনার মধ্য দিয়েই নেওয়া হবে।
এমএইচ
