৭ পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত, একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ০৫:১২ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার | আপডেট: ০৫:৪৫ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, সরকারি নির্দেশ অমান্য ও অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। তাদের মধ্যে সাতজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া একজনকে দেওয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য জানা গেছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রয়েছেন।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন— সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন, মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান ও সাবেক পুলিশ সুপার তারেক বিন রশিদ।
আর সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ফারহানা তাসকিন ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার ছিলেন। ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ৪২ দিনের ছুটি নিয়ে কানাডায় যান তিনি। পরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আরো ৩৬ দিনের ছুটি চান। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে পড়ার জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করেন। তবে মন্ত্রণালয় আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কারণ দর্শানোর দ্বিতীয় নোটিশেরও জবাব দেননি তিনি। পরে ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্যদিকে, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে প্রেষণে যান। কয়েক দফায় বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানোর পর ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরো দুই বছরের ছুটি চান। মন্ত্রণালয় আবেদন নাকচ করে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি যোগ দেননি।
২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তার ঠিকানা ও ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে কর্মস্থলে ফেরানো যায়নি।
২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেননি তিনি। পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জীকে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগ দিয়েই তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা জানিয়ে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। তবে এরপর আর কর্মস্থলে ফেরেননি।
৩ জুলাই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২২ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগ দেন। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দিলেও ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের স্থান উল্লেখ করেননি।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দেননি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ছাড়েন। পরে আরো ৬০ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন নাকচ হলেও তিনি কাজে যোগ দেননি। বিভাগীয় তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তিনি সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে দায়িত্ব পালন করেন।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের পর তার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ান কাজী মিজানুর। সংশ্লিষ্ট মামলার আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে বলে বিভাগীয় নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়, তার এমন কর্মকাণ্ডে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শের পর ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
সূত্র: গণমাধ্যম
এএইচ
