ঢাকা, রবিবার   ০৮ নভেম্বর ২০২৬,   কার্তিক ২৪ ১৪৩৩

সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে, দেশের কৃষকদের হাহাকার

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৯:০৮ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার খুচরা বাজারে যখন সারের তীব্র সংকটে কৃষকরা হাহাকার করছেন, 

দেশে যখন সারের তীব্র সংকট ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নৌপথে মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে সরকারি সার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। অসাধু ডিলার ও চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটের কারণে বেশি দাম দিয়েও স্থানীয় কৃষকরা সার পাচ্ছেন না, যার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি খাত।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২২টি ইউনিয়নে মোট ২২ জন নিবন্ধিত ডিলার রয়েছেন। সরকারি ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) লেটারের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রত্যেক ডিলারের নামে ২২ টন করে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, এই সার ডিলারদের পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করার কথা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূল কারসাজিটি ঘটছে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার একাধিক ডিলার জানান, মূল ভূখণ্ডের চেয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এলাকার ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম; কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী সেসব ইউনিয়নের ডিলাররাও প্রতি মাসে সমপরিমাণ (২২ টন) সার বরাদ্দ পাচ্ছেন। 

স্থানীয় বাজারে ওই সারের চাহিদা কম থাকার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন অসাধু ডিলাররা। তারা মাস শেষে অবশিষ্ট উদ্বৃত্ত সার স্থানীয় বাজারে বিক্রি না করে, অধিক মুনাফার লোভে সরাসরি চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা প্রথমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এরপর সাধারণ কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে চড়া দামে সার বিক্রি করেন। 

আর মাস শেষে উদ্বৃত্ত থাকা বড় একটি অংশ চড়া মূল্যে চোরাকারবারিদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। চোরাকারবারিরা গভীর রাতে ট্রলারে করে এসব সার নদী ও সমুদ্রপথে সরাসরি মিয়ানমারে পাচার করে দিচ্ছে।

ক্ষুব্ধ কৃষকরা জানান, ডিলাররা যদি পাচারকারীদের কাছে সার বিক্রি না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন, তবে দাম একটু বেশি হলেও অন্য এলাকার কৃষকরা অন্তত সার পেতেন; কিন্তু সার সরাসরি দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ায় এখন আমরা চড়া দাম দিয়েও সার পাচ্ছি না।

সার পাচারের এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চর কুকরিমুকরির সার ডিলার ও মেসার্স জাকির ট্রেডার্সের মালিক মো. জাকির হোসেন। 

তিনি দাবি করেন, আমার ডিলারশিপের আওতায় সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করা হচ্ছে। সারের কালোবাজারি বা চোরাই পথে বিক্রির মতো কোনো অপকর্মের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

স্থানীয় সচেতন মহল ও কৃষকদের দাবি, বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নগুলোতে সারের চাহিদা ও কৃষকের সংখ্যা নিরূপণ করে বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। 

একই সঙ্গে উপকূলীয় নৌপথগুলোতে কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তারা, যাতে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই চোরাচালান সিন্ডিকেটকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানাধীন তেঁতুলিয়া নদী থেকে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। অভিযানটি চালিয়েছিলেন কোস্টগার্ডের চরমনিকা দক্ষিণ জোনের সদস্যরা। আটক করেন আটজনকে। 

তারা হলেন- নোয়াখালীর আজগর হোসেন ও সেলিম মিয়া, লক্ষ্মীপুরের কবির হোসেন, ভোলার আব্দুল মমিন, চরফ্যাশনের মো. শামীম ও মো. ইউসুফ, দুলারহাট থানার মো. সিরাজ এবং দৌলতখানের মো. রায়হান।

গত বৃহস্পতিবার রাতে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এর আগে গত ১২ আগস্ট উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। এ সময় ধরা হয় সার পরিবহণে ব্যবহৃত একটি ট্রাক ও একটি বড় ফিশিং বোটও। সেদিন আটক করা হয়েছিল চারজনকে। 

তারা হলেন- নোয়াখালীর সিরাজ (৬০), সোহেল (৩২) ও শাহারাজ (৪৩) এবং চরফ্যাশনের পারভেজ (৪০)। মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

বেতুয়া এলাকার এক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নৌ রুট ব্যবহার করে আসছে। তারা সারসহ নানা পণ্য মিয়ানমারে পাচার করে। ওই দেশ থেকে ফেরার সময় ট্রলারে করে তারা ইয়াবাসহ মাদকের চালান নিয়ে আসে।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ২৩ আগস্ট। এদিন বিকালে উপজেলার চর কচ্ছপিয়া ঘাটে ট্রলারসহ ১৭৫ বস্তা সার আটক করেন কোস্টগার্ডের সদস্যরা। 

এর মধ্যে ১০০ বস্তা ইউরিয়া, ৪০ বস্তা ডিএপি, ১৫ বস্তা টিএসপি এবং ২০ বস্তা এমওপি সার ছিল। তবে উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হোসেনের উপস্থিতিতে অঙ্গীকারনামায় সই রেখে ট্রলার ও সার ছেড়ে দেওয়া হয়।

লোকমান হোসেন তখন সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের মালিক জাহিদ হাসানের কাছ থেকে খুচরা ডিলার মালেক গাজী সার সংগ্রহ করেছিলেন। 

সেগুলো চর কুকরিমুকরি এলাকার কৃষকদের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চর কচ্ছপিয়া কোস্টগার্ড ১৭৫ বস্তা সার আটক করেছিল।

চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা এসব বিষয়ে বলেন, সার পাচারে ব্যবহৃত ট্রলার ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

এসব সার কোথা থেকে আসছে, তা নির্ণয় করতে পারেননি। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ তেমন তথ্য দিতে পারেনি। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এমএইচ