ঢাকা, শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬

‘নারীদের উন্নয়নে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’

প্রকাশিত : ০৯:২২ এএম, ৮ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০২:১৭ পিএম, ১১ মার্চ ২০১৮ রবিবার

ড. সায়মা হক বিদিশা

ড. সায়মা হক বিদিশা

পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য রাষ্ট্র, সমাজ এবং দেশের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। এতে দেশ উন্নত হবে এবং নারীদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।

নারী দিবস উপলক্ষ্যে নারীদের অধিকার, অর্থনীতিতে নারীদের অবদান এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একুশে টেলিভিশনের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। তিনি ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইনের রিপোর্টার মাহমুদুল হাসান

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  অফিসের পাশাপাশি নারীদের ঘরেও কাজ করতে হয়, এ বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখছেন?

সায়মা হক বিদিশা: একজন নারী ঘরে রান্নার কাজ করলে অর্থ পায় না। নারী যদি রান্নার কাজ না করতো তাহলে আরেকজন কর্মীর প্রয়োজন হতো। এজন্য তাদেরকে পারিশ্রমিক দিতে হতো। কিন্তু পরিবারে তাদের এই অবদানের বিষয়টি জিডিপিতে হিসাব করা হয় না। অপরদিকে পরিবারের প্রজনন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যাসহ সংসারেকে গতিশীল রাখার মূল কাজটি করেন নারী। পরিবার যথাযথভাবে না চললে পরিবারের সদস্যদের কাজকর্ম ও জীবনযাপন পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। আপনি যদি সম্প্রতি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা দেখেন সেখানে দেখতে পাবেন, নারীর এই নীরব অবদানের অর্থমূল্য ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা; যা গত বছরের মোট জিডিপির ৭৮.৮ শতাংশ।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  ভার্চুয়াল ভাইরাসে নারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

সায়মা হক বিদিশা: বর্তমানে ভার্চুয়াল ভইরাস মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর মাধ্যমে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, লোকলজ্জার ভয়ে বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা হয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি এ ব্যাপারে  আইসিটি আইন ভালোভাবে প্রয়োগ করলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। অন্যদিকে এ অপরাধের জন্য যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যেত তাহলে এরকম অপরাধের মাত্রা অনেকাংশ কমে যেত।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  যৌতুকের মতো অভিশাপ প্রথা এখনো সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

সায়মা হক বিদিশা: পারিবারিক সহিংসতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে যৌতুক একটি অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু দরিদ্র পরিবারে নয়; স্বচ্ছল ও তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ পরিবারগুলোতেও যৌতুকের লেনদেনের ঘটনা ঘটছে । যৌতুক না পেলে শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন করার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। যৌতুক নেওয়া বা দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও একে পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। তাই আমি বলব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদি আরও বেশি আন্তরিক হন তাহলে তা বন্ধ করা সম্ভব। 

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  গামের্ন্ট খাতে নারীদের স্বাস্থ্য এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন তোলা হয়। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

সায়মা হক বিদিশা: আগের তুলনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে গার্মেন্টে নারীদের কাজের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। তিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায় না। কিছু কিছু কারখানায় স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও সেখানে সব ধরণের চিকিৎসা সেবা নেই। মালিকরা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নামে মাত্র মেডিকেল সেন্টার রেখেছে। শ্রমিকের যেসব রোগ হয় তার জন্য ভালো কোন চিকিৎসা সেবা নেই। অনেক বছর ধরে যারা গার্মেন্টে কাজ করার ফলে নারীরা কোমড় ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথা, চোখে কম দেখা, জরায়ুর সমস্যা, কিডনির সমস্যায় ভুগে। নারী শ্রমিকেরা এখনো স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাবিষয়ক কোন অধিকার আদায় করতে পারেনি। তাই সবাইকে নারী স্বাস্থ্য সেবার অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অর্থনীতিতে নারীদের কতটা অগ্রগতি হয়েছে?

সায়মা হক বিদিশা: বর্তমানে শ্রমজীবী নারীরা পরিবার ছাড়াও দেশের অর্থনীতি টেনে তুলতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলছেন। অর্থনীতির চাকা দিন দিন আরও বেশি সচল হচ্ছে। বিশেষ করে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে প্রশংসিতভাবে। গত কয়েক বছর ধরেই সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অবদান ঊর্ধ্বমুখী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যে কাজগুলো শুধু ছেলেদের দ্বারাই করা সম্ভব বলে মনে করা হতো এমন কাজ আজ নারীরা সফলভাবে করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  জাতীয় আয়ে নারীরা কিভাবে অবদান রাখছে?

সায়মা হক বিদিশা: জাতীয় আয়ে নারীরা দুভাবে অবদান রাখছেন। এর মধ্যে একটি মজুরিযুক্ত কাজ আর অন্যটি মজুরি বহির্ভূত কাজ। মজুরিযুক্ত কাজ বলতে গেলে, অর্থের বিনিময়ে নারীরা অফিস-আদালাতসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যে কাজ করে থাকেন আমরা সেটাকে বুঝি। অপরদিকে মুজুরি বহির্ভূত কাজের মধ্যে রয়েছে নারীদের পারিবারিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। এর মাধ্যমে নারীরা জাতীয় আয়ে অবদান রাখছে। কিন্তু জাতীয় আয়ে তা গণনা করা হচ্ছে না। যেমন ধরুন একজন নারী তার শশুরের জমিতে কাজ করছেন। কিন্তু সে কাজের জন্য কোনো মজুরি পাচ্ছেন না। কিন্তু তার কাজের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে তা জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  কর্মস্থলে ডে কেয়ার সেন্টার কিভাবে নারীদের কাজেকে আরও বেশি গতিশীল করতে পারে?

সায়মা হক বিদিশা: কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার এখনো চালু হয়নি। ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করার মাধ্যমে নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে গতি ফিরে পাবে। তাকে আলদাভাবে সন্তানের জন্য চিন্তা করতে হবে না।পলিসি লেভেলে এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  শহরে নারীদের আবাসন সংকট এবং উত্তরণে কি করণীয়?

সায়মা হক বিদিশা: গ্রাম থেকে শহরে আসলে নারীরা আবাসন সংকটে ভুগে। আবাসন সংকটের কারণে তারা তাদের মেধার যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না। গ্রাম থেকে সে শহরে এসেছে কলেজে পড়তে বা হয়তো চাকরি করতে। কিন্তু আবাসন সংকট এবং নিরাপত্তা হীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা তাদের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারিভাবেও তাদের যাতায়াত এবং আবাসন সংকট দূর করার মাধ্যমে এ সমস্যা সহজেই দূর করা সম্ভব।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  নারীদের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে আর কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সায়মা হক বিদিশা: দেখুন বর্তমানে নারীদের জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্প সুদে নারীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করছে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্টি এ সুবিধার কথা জানতে পারছে না। নারীদের জন্য কি কি সুবিধা রাখা হয়েছে তা অনেকেই জানে না। তাই তাদের জন্য বিভিন্ন জেলা উপজেলায় হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠন এবং মিডিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অপরদিকে নারীদের প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা পরিবর্তন করাতে হবে। নারীর মেধার যথাযথভাবে মূল্যায়ণ করতে হবে। নারীদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে যদি বৈষম্যের শিকার হয় বা কোনো হয়রানির শিকার হয় তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোচ্চার থাকতে হবে। রাষ্ট্রের উদ্যোগে নারীর ক্ষমতায়নের মূলে যে অন্তরায় রয়েছে তা বের করতে হবে এবং তা সমাধানের জন্য যথাযথভাব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তবে বাল্যবিয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নারীর জন্য শিক্ষা ও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবার জন্য সরকারি পর্যায়ে কঠোর হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই। অপরপক্ষে নারীর গৃহস্থালি কাজের ভার লাঘব করে নারীকে শ্রমবাজারে আনার ক্ষেত্রে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মতো অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

 

এসএইচ/