ঢাকা, রবিবার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

শুভ্র মনের শুভ্রতার গল্প

আবদুল্লাহ আল ইমরান

প্রকাশিত : ০৭:১৬ পিএম, ৮ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার | আপডেট: ০৭:২৪ পিএম, ৮ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার

পাশের বাসার মেয়ে শুভ্রতা। নামের মতোই শুভ্র গায়ের রঙ। নামকরা স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। নাচ শিখতো, ভালো গানও গাইতো। ঘটনাচক্রে একবার মেয়েটার নাচ দেখেছিলাম। চমৎকার। একদিন মায়ের কাছে শুনলাম শুভ্রতা হাসপাতালে। সুইসাইড অ্যাটেম্পট। কী সাংঘাতিক কথা!

এলাকার সব খবর রাখে মাহবুব।

ফোন দিলাম। জনালো, মেয়েটা ওর প্রাইভেট টিচার অর্ক ভাইয়ের প্রেমে পড়েছিল। অর্ক ভাই এলাকার ক্রেজ। স্কুল-কলেজে গোল্ডেন প্লাস রেজাল্ট। আর্কিটেকচারে পড়েন। বেজায় স্মার্ট, দারুণ পর্সোনালিটি। সবার সঙ্গে মিশতেন না। নিজের মতো থাকতেন। হাই রেঞ্জের দু-একটা টিউশনি করতেন। জুনিয়রদের মধ্যে মাহবুবই কেমন করে যেন ঘনিষ্ট ছিল মানুষটার। শুভ্রতার ঘটনাটা তাই ডিটেইলসেই জানলাম ওর কাছে।

মাহবুব জানালো, অর্ক ভাই মেয়েটার খুব কেয়ার নিতেন। জীবনের চমৎকার সব সম্ভাবনার কথা বলতেন। শুভ্রতা মুগ্ধ হতো। মেয়েটার জন্মদিন কিংবা ঈদে উপহার দিতেন হুমায়ূনের বই। অর্ক ভাই বলতো, শুভ্রতার মতো মেধাবী মেয়ে দু`টো হয় না।

কিন্তু প্রিয় ছাত্রীর প্রতি এই নির্দোষ আন্তরিকতাই সর্বনাশ ডেকে আনলো। বয়:সন্ধি আবেগে মেয়েটা অর্ককে স্বপ্নের পুরুষ ভাবতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠলো প্রকট। অর্ক যতদিনে বুঝলো, দেরি হয়ে গেল খুব। মেয়েটিকে উপেক্ষা করা এবং টিউশনি বাদ দেয়া ছাড়া আর উপায় থাকলো না। কিন্তু শুভ্রতা অর্কের এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। অর্কর আন্তরিকতাকে সে ভালোবাসা ভেবেছিল। যে ভালোবাসার আরেক নাম জীবন। ব্যাস, জীবনের প্রতি মায়া উবে গেল। ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়লো সিলিং ফ্যানে। ভাগ্যিস, ঠিক সময়ে কাজের মেয়েটা এসে পড়েছিল।

ওই ঘটনায় জীবন ফিরে পেলেও অনেক কিছু হারাতে হলো শুভ্রতাকে। নিজের আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। পাড়াজুড়ে শুরু হলো অদ্ভূত কানাকানি। সকল কানাঘুষা আর সমালোচনা কেবল শুভ্রতাকেই ঘিরে, ১৪ বছরের মেয়েটির বোকামি আর হতবুদ্ধিতাকে ঘিরে। কেউ কেউ বলতো, শুভ্রতার মা-ই নাকি ভালো ছেলে পেয়ে মেয়েকে উসকে দিয়েছিলেন! ফলাফল, বছর খানেকের মধ্যেই শুভ্রতারা এলাকা ছাড়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওই ঘটনা অর্ক ভাইয়ের জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি।

আমি শুভ্রতাকে ভুলেই গিয়েছিলাম।

মাহবুব মনে করিয়ে দিল। গতকাল ফেসবুকে বললো, শুভ্রতাকে মনে আছে? বললাম, হ্যাঁ। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, শেষমেষ কি হয়েছিলো রে?

ও বললো, বাজে কথার ভয়ে মেয়েটা স্কুলে যেতে পারতো না। বাসায় পড়াশুনা করে কোন রকম এসএসসি দিয়েছিল। এতোকিছুর পরও মেয়েটা এ প্লাস পায়। তবুও আর পড়াশোনা করায়নি বাবা-মা। বিয়ে দিয়ে দেয়। শুনেছি দুটো ছেলেও আছে।

-আর অর্ক?

-উনি তো আমেরিকায়। বেশ আছেন।

আমার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।

বয়:সন্ধিকালের ছোট্ট ভুলে সম্ভাবনাময় একটা ফুল ফোঁটার আগেই ঝরে গেল। অথচ শুভ্রতা হতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! হতে পারতো বিসিএস ক্যাডার! এমনকি মনোযোগী চিকিৎসকও! কিছুই হতে না পারুক, একটা শুভ্র জীবন তো পেতে পারতো মেয়েটা!

ভুল কী ওর একার ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরিপক্ক অর্কের ছিল না?

তার কী মনে হয়নি, খামোখা আন্তরিকতা মেয়েটাকে ভুল পথে নিতে পারে? বয়সে বড় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে অর্কের দায়িত্ববোধ কী আরো বেশি ছিল না?

নাকি মেয়েটার আকর্ষণকে নিজের ব্যক্তিত্ত্বের অনন্য যোগ্যতা ভেবে কিছুটা আত্মসুখে ভূগতেন তিনি?

ক্যাস্পাসে, ফেসবুকে, আশেপাশের চেনাজগতে এমন বহু অর্ক ভাইকেই দেখি, যারা শুভ্রতাদের বয়:সন্ধি আকর্ষণবোধে ভীষণ আত্মসুখে ভোগেন। কিন্তু নিজের দায়িত্ববোধটা ভুলে থাকেন বিপুল বিক্রমে!

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

টিকে