গাবতলী-দাশেরকান্দি মেট্রোরেল: ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
একুশে টেলিভিশন
প্রকাশিত : ১১:০০ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার | আপডেট: ১১:০১ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার
রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন যোগাযোগ গড়ে তুলতে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নতুন একটি মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট’ নামের এ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় চলতি অর্থবছরের একনেকের তৃতীয় সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেকের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে এবং পরবর্তী একনেক সভায় এটি উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নতুন একটি মেট্রোরেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। প্রস্তাবিত করিডোরে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ ও কারওয়ান বাজার হয়ে হাতিরঝিল ও তেজগাঁও এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হবে।
এরপর আফতাব নগর, আফতাব নগর সেন্টার, আফতাব নগর ইস্ট ও নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) কাছ থেকে।
প্রকল্পের আওতায় মেট্রোরেলের মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি ডিপোর সিভিল ও ভবন নির্মাণ করা হবে। বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম, রেলওয়ে ব্যবস্থা, রোলিং স্টক এবং ডিপো সরঞ্জাম স্থাপনের কাজও থাকবে প্রকল্পে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ইউটিলিটি স্থানান্তর, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, পরামর্শক সেবা এবং প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ
প্রস্তাবিত সাউদার্ন রুটটি এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুট এবং এমআরটি লাইন-১-এর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন মেট্রো করিডোরের মধ্যে যাত্রীদের সহজে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই আন্তঃসংযোগ ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ করবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি রাজধানীর যানজট কমাতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পটি চূড়ান্ত পর্যায়ে আসার আগে একাধিকবার পর্যালোচনা করা হয়েছে। শুরুতে ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়। পরে ব্যয় কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং বাস্তবায়নকালও সংশোধন করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আরেক দফা পিইসি সভায় সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। এরপর প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে ব্যয় ধরা হয় ৪৭ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৬ জুলাইয়ের পর্যালোচনা সভায় আরও ২ হাজার ১৪১ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ, ১৭ হাজার ৭৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় হবে মূল মেট্রোরেল লাইন ও স্টেশন এবং ডিপোর সিভিল ও ভবন নির্মাণে। এটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ এবং রেলওয়ে ব্যবস্থায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ২৫৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। রোলিং স্টক ও ডিপো সরঞ্জাম কেনা ও স্থাপনে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৮২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
ভূমি অধিগ্রহণ, পুনঃঅধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৯৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। মোট প্রকল্প ব্যয়ের হিসাবে এ খাতে ব্যয় হবে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এডিবির কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২২ সালের অক্টোবরে শেষ হয়। সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বাস্তবায়নযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) ৩৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই বিশ্লেষণে বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ২ দশমিক ৪১ এবং ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (আইআরআর) ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন মনে করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের পরিধি বাড়বে, বিভিন্ন মেট্রোরেল করিডোরের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে এবং যানজট কমাতে সহায়তা করবে। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় সরকারি বিধি অনুযায়ী এটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের উপযুক্ত।
এমএইচ
