ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৯ ১৪৩৩

ইরানের অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযান

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৯:০২ এএম, ২৫ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৯:০৪ এএম, ২৫ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের আয়ের প্রধান উৎসগুলো সংকুচিত করা এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।

সোমবার কর্মসূচি ঘোষণার সময় মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোকে একের পর এক চাপে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির তেল বাণিজ্য ও অন্যান্য রাজস্বের পথ সংকুচিত করে তেহরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।

বেসেন্টের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এমন সব অর্থনৈতিক সংযোগ ছিন্ন করতে চায়, যেগুলো ইরানের বর্তমান সরকারকে টিকে থাকতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানিকে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে।

নতুন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা। অর্থাৎ সরাসরি ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তার বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও মার্কিন বিধিনিষেধের আওতায় আনার পথ খোলা রাখছে ওয়াশিংটন।

বেসেন্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুব সীমিত। ইরানি তেলকে অর্থে রূপান্তর করতে সহায়তা করা কিংবা তেহরানের কর্মকাণ্ডকে অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন করার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিও নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হতে পারেন।

তবে সোমবারের ঘোষণায় কোনো বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ইরানের সঙ্গে লেনদেনের অভিযোগে নতুন করে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বলেও উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে মিত্রবাহিনীর ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপকে এখন আরও বড় পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় ওয়াশিংটন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নিষেধাজ্ঞা কাঠামোয় ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে— ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি খাত, সোনা ও মূল্যবান ধাতুর বাণিজ্য, বিমান চলাচল, জাহাজ ও নৌপরিবহন।

এ ছাড়া ইরান সরকারের কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৬০টি প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কয়েক মাস পর নতুন এই অর্থনৈতিক কৌশল সামনে এলো। ওই সংঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং দেশটির আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলেও তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি।

এর জবাবে ইরানও বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংঘাতের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর।

ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তা কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

একাধিক দফা সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক উদ্যোগের পরও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে আরও জোরালো করার কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

ওয়াশিংটনের নতুন উদ্যোগের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ইরানকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য করার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত বা পরিত্যাগ করা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা বন্ধ করার মতো বিষয় রয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেই চাপের পরও তেহরান নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র ফেলো সিনা তুসির মতে, মার্কিন অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানিতে চাপ তৈরি করলেও ওয়াশিংটন যে রাজনৈতিক ফলাফল আশা করেছিল, তা পাওয়া যায়নি। ইরান এখনো নতি স্বীকার করেনি।

তার মতে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। সামরিক পদক্ষেপে চূড়ান্ত ফল না আসায় নতুন অর্থনৈতিক অভিযানকে তেহরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

বেসেন্ট জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত বা বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ওয়াশিংটনের বার্তা মূলত দ্বিমুখী—যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করবে, তারা মার্কিন অংশীদারিত্বের সুবিধা পাবে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ কারণেই নতুন কর্মসূচি শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়; দেশটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো নতুন কৌশল না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বারবার একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিচ্ছে। তেহরানের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরান দ্রুত মার্কিন শর্ত মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা ছাড়া তেহরানের সামনে কার্যকর বিকল্প কমে আসবে।

তবে অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সামরিক বিকল্পও যে ওয়াশিংটনের বিবেচনায় রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করেছেন তিনি। ইরান মার্কিন বাহিনীকে আক্রমণ করলে বা পরিস্থিতির সীমা অতিক্রম করলে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন হেগসেথ। তার বক্তব্য, এই মুহূর্তে ইরানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে অর্থনৈতিক চাপ।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল দাঁড়িয়েছে দুই স্তরে—একদিকে ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সংকুচিত করা, অন্যদিকে তেহরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও সেই চাপের মধ্যে নিয়ে আসা। এখন দেখার বিষয়, এই ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, নাকি এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।

সূত্র: আল জাজিরা