ঢাকা, সোমবার   ১০ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৬ ১৪২৮

চামড়ার দাম কম: ক্ষতির শঙ্কায় প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত : ০৪:০২ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৮ শনিবার

আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় আরো কমানো হয়েছে। এ বছর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকা শহরে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটে দাম কমেছে ৫ টাকা। গরুর চামড়ার সঙ্গে খাসির চামড়ার দামও গত বছরের তুলনায় ২ টাকা করে কমানো হয়েছে।

প্রতি বছর দেশের প্রতিটি জিনিসের দাম যখন হুহু করে বাড়ছে। তখন চামড়ার দাম উল্টো কমানো হচ্ছে। এ অবস্থায় মাথায় হাত পড়েছে কাঁচা চামড়ার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের। আড়তদারদের কাছে লবণ দেওয়া চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকায় বিক্রি করতে হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের তা ক্রয় করতে হবে ২২ থেকে ২৫ টাকায়। এতো কম দামে চামড়া কিনতে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে তাদের। আবার কম দামে না কিনতে পারলে ব্যবসা টিকে থাকবে না তাদের।

চামড়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সম্প্রতি সচিবালয়ে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- এবারের ঈদে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে হবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া ব্যবসায়ীরা খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা ও বকরি ১৩ থেকে ১৫ টাকা দরে কিনতে পারবেন।

গতবছর ট্যানারি ব্যবসায়ীরা ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় সংগ্রহ করেন। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া ২০-২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭ টাকায় সংগ্রহ করা হয়।

জানা গেছে, চামড়ার দাম গতবারের চেয়ে প্রতি বর্গফুট ৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই অধিভুক্ত সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু বৈঠকে তা আমলে নেওয়া হয়নি।

চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করা হলো কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী দুটি কারণ সামনে নিয়ে আসেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমেছে এবং সাভারে চামড়া শিল্পনগর স্থাপিত হলেও ব্যবসায়ীরা ওখানে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারেননি। ফলে ঠিকমতো চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আমরা চামড়া কিনে কি করবো। সাভার ট্যানারি পল্লীতে এখনও অর্ধেকের বেশি ট্যানারি চালু করা যায়নি। কারখানা উন্নয়নের কারনে অনেকেই তাদের মূলধন হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে কিভাবে আমরা চামড়া ক্রয় করবো। এতো চামড়া রাখার মত গোডাউনও আমাদের নেই।

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এ বছর চামড়ার দাম কমানোর জন্য কয়েকটি কারণ আছে। গত বছর কেনা চামড়ার ৪০ শতাংশ এখনও মজুত আছে। তাই আমরা চামড়া ক্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করিনি। এছাড়া চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক আমাদের যে ঋণ দিয়েছে তাও অনিশ্চিত। কারণ গত বছর পাওয়া ঋণ আমরা এখনও পরিশোধ করতে পারিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দাম কম।

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আমাদের বেশিরভাগ চামড়া রফতানি হয় চীনে। দেশটিতে আমাদের রফতানি অনেক কমে গেছে। এছাড়া হাজারিবাগ থেকে আমাদের ২২২টি কারখানা একবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাভারে নতুন চামড়া পল্লীতে মাত্র ১৫৫টি কারখানা কাজ শুরু করতে পেরেছে। অনেক কারখানা কাজ শুরু করতে পারিনি। তাছাড়া  চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তরের সময় উৎপাদন ব্যহত হয়। ওই সময়ে কথা অনুযায়ী মাল সরবরাহ করতে না পারায় কিছু ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যারা আজও ফিরে আসেনি। এসব কারণে চামড়ার দাম কমে গেছে।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বছরে মোটামুটি ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। মোট চামড়ার অর্ধেকের বেশি আসে কোরবানির ঈদের সময়।

এদিকে চামড়ার এ দাম কমানোর সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি ও উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান মুসলিম উদ্দিন জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা গ্রাম–গঞ্জ–অলি–গলি থেকে কম দামে না কিনলে লোকসানে পড়ার আশংকা রয়েছে। মৌসুমী ব্যবসায়ীদের আইডিয়া কম। তারা বাজার মূল্যের বিষয়টি না দেখে যেদিক থেকে পারে ইচ্ছে–খুশি মতো চামড়া কিনে মজুত করে। তখন তাদের কাছ থেকে আমাদেরকে বাড়তি মূল্যে চামড়া ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। তাছাড়া কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে বিদেশ থেকে যে কেমিক্যাল আসে তার দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ গুণ। পাশাপাশি লবণের উচ্চমূল্যের কারণে প্রতি বর্গফুটে খরচ ১২ থেকে ১৩ টাকা বেড়ে যাবে।  তিনি জানান, এবার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে চট্টগ্রামে লবণ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকায় কাঁচা চামড়া কিনতে হবে।

চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী ঢাকার দোহার উপজেলার পুষ্পখালি গ্রামের সাকিল আহমেদ বলেন, এবার আমি ৮০ হাজার টাকার চামড়া কেনার ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু চামড়ার দাম তো দেখছি অনেক কমে গেছে। এতে করে আমাদের কম দামেই কিনতে হবে। আর কম দামে কিনতে গেলেই কোরবানি দাতাদের সঙ্গে আমাদের দরকষাকষি বেড়ে যায়। কম দামে কিনতে না পারলে লোকসানে পড়তে হবে।

একইভাবে মৌসুমি ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার এলাকার আইয়ুব আলী। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট, ট্যানারি স্থানান্তর নিয়ে মালিকদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি, লবণের উচ্চমূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমসহ নানা খরচের হিসাব দেখিয়ে চামড়ার দাম কম দিতে এমনিতেই প্রস্তুত থাকে আড়ৎদাররা। তার উপর আবার সরকার থেকে দাম কমানো হলো। চামড়ার এ দাম কমানোতে আমাদের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে। লোকসানও গুণতে হতে পারে।

তিনি জানান, চামড়ার দাম কম হলে পাচারের আশঙ্কা বাড়ে। সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসায়ীরা কাচা চামড়া ক্রয়ের জন্য ভারত থেকে গরু কিংবা নগদ টাকা এনে থাকেন। আর এ কারণেই চামড়া পাচার করতে তারা বাধ্য। এ ছাড়া দেশে চামড়ার দাম কম হলে একটু বেশি দামে তা ক্রয়ের সুযোগ পায় ভারতের অর্থায়নের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। যা আমাদেরকে শঙ্কায় ফেলছে।