ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুকে প্রথম ও শেষ দেখা

অধ্যাপক রফিকুন নবী

প্রকাশিত : ০১:৪৬ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৮ রবিবার | আপডেট: ০৪:১৩ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৮ রবিবার

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম ও কাজের সঙ্গে আমরা পরিচিত। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তখন সবার কাছে বিশেষ করে তরুণদের কাছে বেশ পরিচিত নাম।

প্রথম তাকে দেখি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষ তার ভাষণ শোনার জন্য একত্রিত হয়েছিল। আমিও তাদের একজন ছিলাম।

যেহেতু আমি চারুকলার ছাত্র ছিলাম, সেহেতু রেসকোর্স অামাদের কাছে ছিল। তাছাড়া সেই ভাষণ শোনার জন্য সেদিন রেসকোর্সে যায়নি এমন কেউ ঢাকা শহরে ছিল বলে তো মনে হয় না।

অামাদের বয়সী তরুণদের জন্য বঙ্গবন্ধুর সেই অনবদ্য ভাষণ শোনা ছিল একটি বিশাল ঘটনা। তাঁর সেই দৃপ্ত ভঙ্গি, স্পষ্ট উচ্চারণ, এসবের সঙ্গে তো অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।

বঙ্গবন্ধুকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়েছিল জীবনে একবারই। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে কাছাকাছি দেখি ১৯৭২ সালে। তখন তথ্যমন্ত্রনালয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের চিত্র ও ঘটনা নিয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল। নাম ছিল ‘মিট বাংলাদেশ’। তখনকার সময়ে গ্রন্থটিকে যথেষ্ট শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল।

এই গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম অামি, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, তালাত মাহমুদসহ এরকম বেশ কয়েকজন। সৌভাগ্যবশত অামরা সেই বইয়ের অলংকরণ করেছিলাম। বইটি যখন ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ হলো তখন প্রশ্ন অাসল বইয়ের কয়েকটা ফ্রেশ কপি বঙ্গবন্ধুর হাতে পৌঁছানো।

তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। অামরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বাইরের রুমে লাইন ধরে বসে অাছি। দেশী বিদেশী সাংবাদিকরা অাছেন। তথ্য মন্ত্রনালয় থেকে প্রকাশিত বইটির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন জনতো ছিলেনই, অারো ছিলেন নানা ধরনের জ্ঞানীগুণী মানুষ জন।

একপর্যায়ে অামরা ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। সেই প্রথম খুব কাছ থেকে অামার বঙ্গবন্ধুকে দেখা। সত্যি বলতে কী, সেটাই বঙ্গবন্ধুকে অামার শেষ দেখাও।

বঙ্গবন্ধু সেদিন অামাদের সঙ্গে অনেক্ষণ কথা বলেছিলেন। কুশল বিনিময় থেকে শুরু করে বইটির মান অারো কীভাবে বাড়ানো যায় সবকিছু নিয়ে তিনি অামাদের মতামত চাইলেন। প্রাণখুলে কথা বললেন। অামরা খেয়াল করছিলাম, বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে পরিচয় করানোর এক অদম্য স্পৃহা তাঁর ছিল।

অামাদের প্রজন্মটা ভাগ্যবান। এইজন্য ভাগ্যবান অামরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী। বিশ্বের বুকে একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, নতুন জাতিসত্ত্বার বিকাশ সব অামাদের চোখের সামনে ঘটেছিল। অার এর কারিগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

তিনি শুধু নেতা নন; বিশ্বের বুকে বড় বড় যেসব মহান নেতার জন্ম হয়েছে, শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যারা অাজীবন সংগ্রাম করেছেন তাদের তালিকার অন্যতম নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটা অামাদের দেশ ও জাতির জন্য কত বড় গর্বের তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯৭৩ সালে অামি গ্রিক সরকারের বৃত্তি নিয়ে এথেন্স চলে যাই। ৭৫- সালের এক ভোরবেলায় অামি ক্লাসে যাই। অন্যান্য ছাত্ররা তখনো সবাই এসে উপস্থিত হয়নি। কিছু ছাত্র বসে বসে পত্রিকা পড়ছিল। অামি প্রত্যেকদিন যেভাবে ক্লাসে যাই ঠিক সেভাবে হাসি খুশি অবস্থায় ক্লাসে ঢুকছিলাম। সবাইকে হাই হ্যালো করতে করতে। ক্লাসে একটি জটলা থেকে অামাকে ডাক দিল।

দেখলাম তাদের একটু অন্যরকম চেহারা। তারা অামাকে বলল, তুমি কিছু জান না, এভাবে হাসি খুশি আছো? অামি বললাম, কেন কী ব্যাপার? ওরা বলল, তোমার দেশে তো বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে! অামার বুকটা ধরফর করে উঠল।

বললাম, "অাবার কী হল!" নানা ধরণের কথা মনে অাসা শুরু হল। দূরে থাকি। দেশের সঙ্গে যোগাযোগ তখন অাজকালের মত সহজ ছিল না। একটা চিঠি লিখলেও সেটা পৌঁছতে পৌঁছতে বিশ-পঁচিশ দিনের ধাক্কা। ফলে কী হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারতাম না।

ওরা তখন অামার হাতে পত্রিকাটি ধরিয়ে দিল। গ্রিক পত্রিকা। পত্রিকার প্রথম পৃষ্টায় অাট কলমে লিড নিউজ করা- যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, `বাংলাদেশে সেনা অভ্যুথানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত!` অামার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল।

অামি খানিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কী বলব, কী ভাবব মাথা কাজ করছিল না। এমন হঠকারী ঘটনা যে ঘটতে পারে এবং এমন একজন মহান ব্যক্তিকে সপরিবারে খুন করা হতে পারে তা অামাদের চিন্তার বাইরে ছিল। অামি ইউনিভার্সিটির কাছে একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতাম। তাড়াতাড়ি সেদিন বাসায় ফিরলাম।

ইউনিভার্সিটির অন্য ডিপার্টমেন্টে একটা পাকিস্তানি ছেলে পড়ত। তেমন কথা কখনোই হতো না। একই ক্যাম্পাস হওয়াই মাঝে মধ্যে হয়তো চোখাচোখি হত। হঠাৎ দেখি সে মিষ্টি নিয়ে খোঁজ করতে করতে অামার বাসায় এসে হাজির। সে সাংঘাতিক খুশি।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনায় সে ভীষণ অাপ্লুত। তা প্রকাশ করার জন্যই সে মিষ্টি নিয়ে অামার বাসায় এসেছে। সে অামার বাসা চেনার কথা না। ওই দিন সে কীভাবে অামার বাসা খুঁজে পেয়েছে সেটাই অাশ্চর্য্য।

অামার মেজাজ গরম হয়ে গেল। অামি উত্তেজিত হয়ে বললাম, তোমার সাহস হয় কী করে এই অবস্থায় অামার বাসায় মিষ্টি নিয়ে অাসার? তোমরা কী প্রতিশোধ নিচ্ছ?" ছেলেটি বেরিয়ে গেল। ছেলেটি যাওয়ার পর অামার মনে হল, অামাদের দেশ কী অাবার পাকিস্তান হয়ে গেল। নয়তো ছেলেটি এত সাহস পায় কী করে?

অামরা যারা বাইরে থাকি তখন অামরা একধরণের অনিশ্চয়তা, শঙ্কা অামাদের ঘিরে ধরেছে। বিস্তারিত কিছু জানতে পারছিলাম না। খবরের কাগজে বিস্তারিত কিছু জানা যাচ্ছিল না। খুব গভীরে কিছু লিখত না। দেশে কী হচ্ছিল না হচ্ছিল তা জানার কোন সুযোগ ছিল না। তখন যুগোস্লাভিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর ছিলেন মাহবুবুল অালম সাহেব। তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করার পর বিস্তারিত শুনলাম। সেই সময়টা বেশ অনিশ্চয়তা ঘোর অমানিশার মধ্য দিয়ে কেটেছে প্রতিটা বাঙালির।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক।

শ্রুতিলেখক: আলী আদনান

আ আ / এআর