ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬

কিডনি বিকলের কারণ ও করণীয়

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত : ০৩:৩৯ পিএম, ১৪ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৩:৪৯ পিএম, ১৪ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার

আজ ১৪ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সবার জন্য, সর্বত্র’ কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। পিঠের নিচের দিকে মেরুদণ্ডের দুই পাশে একটি করে দুটি শিম বিচির আকৃতির অঙ্গটিই কিডনি বা বৃক্ক, যার আকৃতি ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটারের মতো। প্রতিটি কিডনির ভিতরে লাখ লাখ কোষ থাকে, যা নেফ্রন নামে পরিচিত।

এই নেফ্রনগুলো শরীরের রক্ত ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বিপাকীয় আবর্জনাগুলো বের করে দেয়, তাই কিডনিকে আমাদের শরীরের পরিশুদ্ধির অঙ্গ বলা চলে। কিডনি অকেজো হলে শরীরে দূষিত পদার্থ জমে যায়, ফলে নানান উপসর্গ দেখা দেয়। কিডনি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শরীরে রক্ত তৈরি করতে সহায়তা করে।

তাই কিডনি অকেজো হলে শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। এ ছাড়া কিডনি আমাদের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন : ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি পদার্থগুলোর সমতা রক্ষা করে, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কিডনি যদি হয় অকেজো, জীবন হয় ঝুঁঁকিপূর্ণ। সুতরাং কিডনির কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই ভয়ের কারণ রয়েছে, তবে চিকিৎসার মাধ্যমেও কিডনির রোগ নিরাময় করাও সম্ভব এবং কিছু পদক্ষেপ নিলে কিডনি রোগের প্রতিরোধ সম্ভব।

কিডনি ফেইলিউরের ধরন : কিডনি রোগের মধ্যে সবচেয়ে জটিলতম হলো দুটি কিডনি ফেইলিউর বা বিকল হওয়া। এ রোগকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয় : ১. আকস্মিক বা একিউট কিডনি ফেইলিউর এবং ২. দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক কিডনি ফেইলিউর।

* হঠাৎ করে কিডনি আক্রান্ত হয়ে তার কার্যক্ষমতা নষ্ট হলে, তাকে বলে একিউট কিডনি ফেইলিউর। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নিরাময়যোগ্য।
* অন্যদিকে ধীরে ধীরে, মাস বা বছরের মধ্যে কিডনির কার্যক্ষমতা হারালে তাকে বলে ক্রনিক কিডনি ডিজিস বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ। একবার এ অবস্থা হয়ে গেলে সাধারণ চিকিৎসায় পুরোপুরি ভালো হয় না, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। আরও বেশি জটিলতা হলে ডায়ালাইসিসের দরকার হয়, এমনকি কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

যে যে কারণে কিডনি ফেইলিউর রোগ হয় :

* একিউট কিডনি রোগটি হঠাৎ করে কিছু বোঝার আগেই হয়ে যায়। আকস্মিক কিডনি রোগের প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত ডায়রিয়া, বমি বা মাত্রাতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীরে পানিশূন্যতা। এ ছাড়া যে কোনো কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে, বিভিন্ন ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে আকস্মিক কিডনি বিকল হতে পারে। পাশাপাশি নেফ্রাইটিস বা জীবাণুজনিত ইনফেকশন, সেপটিক শক, ডেঙ্গু জ্বর, ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া এবং গর্ভকালীন জটিলতায়ও আকস্মিক কিডনি রোগের কারণ।

* ক্রনিকের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কিডনি রোগ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসজনিত অথবা উচ্চ রক্তচাপের কারণে হয়। এ ছাড়া ক্রনিক নেফ্রাইটিক সিনড্রমের কারণেও এ ধরনের কিডনি রোগ হতে পারে। সময়মতো কিংবা যথাযথ চিকিৎসা না করালে আকস্মিক কিডনি রোগও ক্রনিক রোগে পরিণত হতে পারে।

কিডনি ফেইলিউর রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা : দুই ধরনের রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন।

একিউট কিডনি ফেইলিউর রোগের উপসর্গ :

* একিউট কিডনি রোগের প্রধান উপসর্গই হলো প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া, এমনকি অনেক সময় প্রস্রাব কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

* প্রস্রাবে পরিবর্তন যেমন : প্রস্রাব বেশি বা কম, রং ঘোলা, লালচে বা রক্ত যাওয়া, অনেক সময় প্রস্রাবের বেগ অনুভব হলেও প্রস্রাব হয় না, প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া, সঙ্গে জ্বর এবং পিঠের পেছনে ব্যথা অনুভূত হওয়া।

* চোখ বা চোখের পাতার নিচে, এমনকি মুখম-ল ফুলে যেতে পারে। এর সঙ্গে পায়ে পানি আসতে পারে।

* অরুচি, ক্ষুধমন্দা, বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হয়েও যেতে পারে।

* কোমরের দুই পাশে এবং তলপেটেও ব্যথা।

* উচ্চ রক্তচাপ, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, সঙ্গে কাশি, এমনকি চিৎ হয়ে রোগী শুয়ে থাকতে পারে না।

* অনেক ক্ষেত্রে টনসিল বা খোসপাঁচড়া হওয়ার দু-তিন সপ্তাহ পর এ ধরনের নেফ্রাইটিস হতে পারে।

একিউট কিডনি ফেইলিউর রোগের চিকিৎসা : কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করলেই ভালো হয়ে যায়। যেমন: ডায়রিয়া, বমি ও রক্ত আমাশয়ের কারণে রক্ত পড়ে ও লবণশূন্য হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্ত দেওয়া কিংবা বিভিন্ন ইনফেকশনজনিত রোগের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে একিউট কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব। শিশুদের গলা ব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোসপাঁচড়ার দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা উচিত। কারণ এগুলো থেকে কিডনি প্রদাহ বা নেফ্রাইটিস রোগ দেখা দিতে পারে। আরও বেশি জটিলতা হলে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি ফেইলিউর রোগের প্রধান লক্ষণ : কিডনি বিকল হওয়ার উপসর্গ সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কিডনির কর্মক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আগে বোঝা যায় না। কিছু লক্ষণ কিডনি রোগের সংকেত বহন করে।

* যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, তাদের মুখমণ্ডল বা শরীর ফুলে যায়, ক্রমান্বয়ে পেটে ও পায়ে পানি জমে, প্রস্রাব কমে যাওয়া।

* প্রস্রাবে পরিবর্তন যেমন : প্রস্রাব বেশি হয় বা কম হওয়া। বিশেষত রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।

* যারা দীর্ঘদিন ব্যথার ঔষুধ সেবন করেছেন।

* বংশে যাদের কিডনি রোগ ইতিহাস আছে।

* রক্তশূন্যতা এই রোগের অন্যতম লক্ষণ।

* যাদের আগে রক্তচাপ ছিল না, তাদের নতুন করে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেওয়া।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি ফেইলিউর রোগের চিকিৎসা : এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রোটিন জাতীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, ডাল কম খাওয়া। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পানি পরিমাণ মতো খেতে হবে। সঙ্গে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত কিডনি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। একপর্যায়ে নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভালো থাকতে হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীরা পুরোপুরি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন, যদিও চিকিৎসা একটু ব্যয়বহুল।

কিডনির অন্যান্য রোগ : কিডনিতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্কদের বেলায়। তাই প্রস্রাবের যে কোনো প্রকার লক্ষণে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শুরুতে শনাক্ত হলে কিডনির ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিডনিতে পাথর হতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও নিরাময় সম্ভব।

কিডনি ফেইলিউর রোগের প্রতিরোধ : সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে, কিডনি রোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায়।

* ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত চেকআপ, ডায়েট কন্ট্রোল, হাঁটাচলা বা ব্যায়াম, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

* উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, ডাক্তারের পরামর্শ আনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। কোনোক্রমেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

* ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের কিডনির কার্যকারিতা প্রতি ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা করা উচিত। যাদের ঝুঁঁকি রয়েছে তাদের বছরে একবার হলেও নিয়মিত কিডনি ফাংশন টেস্ট করা উচিত।

* যখন তখন ইচ্ছামতো ব্যথার ওষুধ না খাওয়া, যা কিডনি ফেইলিউরের একটি অন্যতম কারণ।

* চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করা।

* যথাসম্ভব কেমিক্যালযুক্ত খাবার পরিহার করা। সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। চর্বিজাতীয় খাবার ও লবণ কম খাওয়া, সবুজ-শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া এবং পরিমিত পানি পান করা।

* যাদের ওজন বেশি, তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত হাঁটাচলা বা বয়স অনুযায়ী ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।

* কিছু কিছু কিডনি রোগ আছে যেগুলো থেকে সম্পূর্ণ পরিত্রাণ সম্ভব নয় যেমন : জন্মগত বা বংশগত কিডনি ডিজিস, পলিসিসটিক কিডনি ইত্যাদি। তবে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

কিডনি ফেইলিউর হলেই তা হয় ব্যাপক এবং মারাত্মক কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। অনেকাংশে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নষ্ট না হওয়ার আগে কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। তাই কিডনি রোগ অনেকটা সমুদ্রে ভাসমান বরফখণ্ডের মতো। এর সামান্য অংশ পানির উপরিভাগে দৃশ্যমান, আর বেশিরভাগই পানির নিচে অদৃশ্য থাকে। অর্থাৎ কিডনি সামান্য খারাপ হলে তা অনেক সময় বোঝা যায় না। তবে একটু সচেতন হলেই এবং লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রার প্রণালি বদলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে চললে কিডনি বিকল হওয়ার কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা খুব জরুরি। কিডনি সচেতনতা নিয়ে একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। পরিবার থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে কিডনি ভালো রাখার বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের মাধ্যমে স্কুলে কিডনি রোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের যথাযথ অংশগ্রহণ এমনকি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোও যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যম, চিকিৎসকসহ সমাজের সব সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক : সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু

শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।