ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১২ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ২৮ ১৪২৬

কেন দান করবেন?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:১৬ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৯ সোমবার

দানের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ আমাদেরকে কমবেশি দিয়েছেন। কারণ দান যদি আমাদের জীবনে না থাকত, তাহলে কী হতো তার পরিণতির কথা বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে কৃপণের মতো অর্থ জমায়, বার বার তা গণনা করে এবং একে নিজের রক্ষাকবচ মনে করে-(সূরা হুমাজাহ : আয়াত ২)।

জমানো অর্থ কখনোই রক্ষাকবচ হতে পারে না, যদি না সেই জমানো অর্থ থেকে কিছু অংশ দানের কাজে ব্যয়িত হয়। একবার বনী ইসরাইলের এক লোক স্বপ্নে দেখলেন, তার জীবনের দুই অংশ। এক অংশে তার খুব সম্পদ, প্রাচুর্য, বিলাসিতা থাকবে। আরেক অংশে থাকবে দারিদ্র্য, অভাব, দুঃখ, কষ্ট। স্বপ্নেই তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ দুই অংশের মধ্যে কোন অংশ সে প্রথমে পেতে চায়, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা তার আছে।

এটুকু দেখেই ঘুম ভেঙে গেল তার। বিষয়টি তাকে খুব ভাবাচ্ছিল। স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলেন। স্ত্রী তাকে পরামর্শ দিলেন, ঠিক আছে, যেহেতু দুটো অংশই তোমার নিয়তি, কাজেই প্রথমে তুমি সম্পদ আর প্রাচুর্যই চাও। পরদিন তিনি আবারো স্বপ্নে দেখলেন। স্বপ্নেই বললেন, তিনি প্রথম প্রাচুর্যময় জীবনই চান। তা-ই হলো, পরদিন থেকেই জমি, ব্যবসা ইত্যাদি নানানভাবে বিপুল অর্থ সমাগম হতে লাগল তার বাড়িতে। এদিকে তার স্ত্রী একজন বুদ্ধিমতী মহিলা ছিলেন। স্বামীর এই বিপুল ধন সম্পত্তিকে শুধু নিজেদের জন্যে খরচ না করে তিনি স্বামীকে দিয়ে উদার হাতে বিলাতে লাগলেন গরিব আত্মীয়, প্রতিবেশী, অভাবীদের মাঝে। এত বেশি দান খয়রাত করতে লাগলেন যে ধীরে ধীরে সে জনপদের চেহারাই পাল্টে গেল।

এদিকে বনী ইসরাইলীর জীবনের প্রথম অংশ শেষ হয়ে এল। এবার দ্বিতীয় অংশের পালা। দুঃখ, অভাব, বিপদ আর ঝামেলার জীবন! কিন্তু কোথায় সেসব! বনী ইসরাইলী দেখল, সে-তো দিব্যিই আছে। কোনো বিপদাপদ, ঝামেলা নেই। প্রাচুর্যেরও কমতি নেই। এমন সময়ই তিনি আবারো স্বপ্ন দেখলেন, গায়েবি কণ্ঠ তাকে বলছে, যেহেতু তুমি তোমার সম্পদ গরিব দুঃখীদের জন্যে ব্যয় করেছ, আল্লাহ তাই তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তোমাকে তিনি আরও সম্পদ দান করবেন। যাতে তুমি আরেও বেশি বেশি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারো।

আসলে দান সম্পদে বরকত এনে দেয়, দূর করে বালা মুসিবত, দুর্দশা। শুধু তা-ই নয়, তৃপ্তি আর প্রশান্তিও এনে দেয় দান। একসময় মনে করা হতো সম্পদই সুখের উৎস। সম্পদ বাড়ালেই বোধ হয় মানুষ সুখী হবে। সম্পদের পেছনে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে গিয়ে গজিয়ে উঠল একের পর এক বস্তুবাদী সমাজ, বস্তুবাদী সভ্যতা। কিন্তু ভুল ভাঙতে শুরু করল খুব দ্রুতই। দেখা গেল, অঢেল সম্পদ আর সীমাহীন প্রাচুর্য থাকার পরও মানুষ সুখী হতে পারছে না। ২০১৫ সালের এক গ্লোবাল ওয়েল্থ রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন যে মোট ১৩২ ট্রিলিয়ন সম্পদ আছে, তার ৪২ শতাংশই (৬৩.৫ ট্রিলিয়ন) আছে আমেরিকানদের হাতে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্বে সুখী দেশগুলোর যে তালিকা করেছে, তার শীর্ষে এ পর্যন্ত একবারও যেতে পারেনি আমেরিকা।

গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ যখন শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, নিজের জন্যেই সঞ্চয় করে, সে খুব দ্রুত ক্লান্ত আর নিরানন্দ হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক যৌথ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। ৬৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক এ গবেষণাটিতে অংশ নেন। প্রথমে তাদেরকে তাদের বার্ষিক আয়ের বিবরণ দিতে বলা হয়। এরপর মাসে তারা যে ব্যয়গুলো করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে বলা হয়। নিজেদের জন্যে ব্যয় ছাড়াও দান, উপহারসহ সব ধরনের ব্যয়েরই বিবরণ দিলেন তারা। এরপর তারা সুখী কিনা, তা যাচাইয়ের জন্যে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হলো তাদের।

দেখা গেল, যারা দান করেছেন, অন্যদের উপহার দেবার জন্যে ব্যয় করেছেন, তারা অনেক বেশি সুখী মনে করছেন নিজেকে, তাদের চেয়ে যারা এদের মতো অত দান করেননি। তাই ইতিহাস সাক্ষী, উপার্জনের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মানুষের জন্যে ব্যয় করলে প্রাকৃতিক নিয়মেই আমরা ভালো থাকি, আনন্দে থাকি, সুখী হই। আমাদের সম্পদেও বাড়ে সমৃদ্ধি। প্রাকৃতিক এ নিয়ম এত পরীক্ষিত যে, একবার তার প্রমাণ পেলে যে-কেউ নিজেই চমকিত হবেন, উল্লসিত হবেন। সবসময়ের জন্যেই দাতা হওয়ার প্রেরণা পাবেন তিনি। নবীজী (সা.) খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, সৃষ্টির সেবায় যা ব্যয় করবে, তা-ই হচ্ছে তোমার সম্পদ, তোমার পরিত্রাণের উপায়। আর যা জমিয়ে রেখে যাবে, তা তোমার নয়; তোমার উত্তরাধিকারীর ভোগে ব্যবহৃত হবে। ঋগবেদে বলা হয়েছে, এসো প্রভুর সেবক হই। গরিব ও অভাবীদের দান করি। প্রকৃতপক্ষে হক্কুল ইবাদ বা মানবতার সেবাই স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ ও প্রশস্ত পথ।

আমার সম্পদ, আমার উপার্জনের মালিক আমিই : সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, আমার উপার্জন, আমার ধন-সম্পত্তির মালিক আমিই। জমিয়ে রাখা বা খরচ করা আমার ইচ্ছাধীন। এ থেকে কাউকে কিছু দেওয়া না দেওয়া আমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আল কোরআনের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সূরা জারিয়াত-এর ১৬-১৯ নম্বর আয়াতে সৎকর্মশীলদের একটি গুণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ... তারা তাদের ধনসম্পত্তি থেকে অভাবী ও বঞ্চিতের হক আদায়ে অকাতরে ব্যয় করত। অর্থাৎ আমরা যা দান করি, কোরআনের দৃষ্টিতে তা দয়া নয়; তা অসহায়দের অধিকার। আপনি যখন দান করেন, তখন আপনি সৃষ্টির অধিকারকেই সম্মান করেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করবেন।

আগে সচ্ছল হয়ে পরে দান করব : আগে সচ্ছল হয়ে পরে দান করব-এ দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভ্রান্ত। বরং বলা যায়, সচ্ছল হওয়ার জন্যেই দান করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক নিয়মেই সে শূন্যস্থান পূরণে চারপাশ থেকে প্রতিদান আসতে শুরু করে। যেভাবে বাতাসের শূন্যতা ঝড় সৃষ্টি করে, একইভাবে সৎ দান প্রতিদানের প্লাবন সৃষ্টি করে।

দানের ধর্মীয় নির্দেশ নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী ধনী-গরিব সবার জন্যেই প্রযোজ্য। আপনার যা আছে তা থেকেই দান করুন। দানের ক্ষেত্রে পরিমাণ নয়; আপনার আন্তরিকতাই প্রমাণ করবে আপনি বিশ্বাসী না অবিশ্বাসী। নবীজী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি তার বৈধ উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করে, আল্লাহ ওই দান নিজ হাতে গ্রহণ করেন এবং তাতে বরকত দিয়ে করে তোলেন পাহাড়তুল্য।

ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিলে পাপ হয় : এ প্রসঙ্গে একজন ধনাঢ্য ভিক্ষুকের কথা বলি। নাম হাজী কামাল শেখ। হাতে ব্যান্ডেজ। রক্ত মাখানো। রাজধানীর রমনা পার্কের সামনে বসে ভিক্ষা করছিলেন। অনেকেই তাকে ভিক্ষা দিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল তার হাতে আসলে কিছুই হয়নি। পেটের দায়ে হাতে ব্যান্ডেজ করে লাল আলতা রং মেখে ভিক্ষা করছেন। আগে হাত পেতে ভিক্ষা করতেন। আয় ভালো হতো না। তখন তার দৈনিক আয় ছিল ২০০-৩০০ টাকা।
ব্যান্ডেজ লাগানোর পরই ভাগ্য ফিরল। প্রতিদিন অনায়াসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হয়। নতুন নতুন এলাকায় গেলে আয় বেড়ে যায়। এক এলাকায় এক মাসের বেশি থাকেন না। তার বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে। বউ-ছেলেমেয়ে সব গ্রামেই থাকেন। তার চার স্ত্রী। গ্রামের এক বাড়িতেই থাকেন চারজন।

ভিক্ষা করে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পাঠান। আর বাকি টাকা তিনি নিজের কাছেই রাখেন। চার ঘরে ১০ সন্তান। ছয় ছেলে, চার মেয়ে। এর মধ্যে চার ছেলে বিদেশে। দুই ছেলে গ্রামেই রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। চার মেয়েরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ভিক্ষা করায় এ পেশা ছাড়তে পারছেন না তিনি। তার স্বপ্ন ভিক্ষা করেই ঢাকা শহরে বাড়ি করবেন। কারণ, তাকে যিনি ভিক্ষা করে অধিক উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন, তার এখন ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি। তাই হাজী কামাল শেখ চান তার ঢাকা শহরে প্রতিটি ছেলের নামে একটি করে ফ্ল্যাট থাকবে। কারণ, সোনাইমুড়ীর এক ভিখারি ভিক্ষা করে ধনী হয়ে ইউপি মেম্বার পদে নির্বাচন করেছেন। তিনি দুবার হজ করেছেন। তাই নামের আগে হাজী। দুবারই ভিক্ষার টাকায়।

এসএইচ/