ঢাকা, শনিবার   ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ৩০ ১৪২৬

‘সারাদিন কাজ করে মজুরি পায় ১০২ টাকা’

তবিবুর রহমান

প্রকাশিত : ০৪:১৪ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার | আপডেট: ০৪:৩৩ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নতি হচ্ছে দেশের অবকাঠামোর, পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার। তবে এ যুগেও নিদারুণ কষ্টে দিন কাটচ্ছে সিলেটের চা বাগানের বেশিরভাগ শ্রমিকরা। বর্তমানে চা রপ্তানি পণ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও এ খাতের শ্রমিকরা শোষণ ও বঞ্চনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

দেশের উৎপাদিত চায়ের সিংহভাগই আসে সিলেটের বাগানগুলো থেকে। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসে এই খাত থেকে। তবুও এ খাতের শ্রমিকরা অবহেলার শিকার।

যাদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের কারণে আজ এতো উন্নতি সাধিত হচ্ছে। পর্দা আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই মানুষগুলো। বিশেষ করে বেশি বঞ্চনের শিকার হচ্ছে নারী শ্রমিকরা।

খোজঁ নিয়ে যানা গেছে, সারাদিনের শ্রমের মূল্য মেলে মাত্র ১০২টাকা। তাতে কতটুকুই সচল থাকে সংসারের চাকা। সিলেটে চা শ্রমিক আছেন এক লাখেরও বেশি, যাদের সবার শ্রম আর ঘামের গল্পগুলো একই। প্রখর রোদ কিংবা মুষলধারায় বৃষ্টি কাজ কী থেমে থাকে? কিন্তু শরীর ভেজা শ্রমিকের কষ্ট কে বোঝে!

650

এমনই এক চা শ্রমিক শান্তি লাল বর্মন, বয়স ৫৭। চেহারা ও শরীরের জীর্ণ দশা দেখলে মনে হয়, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। কাজ করেন সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানে। সকাল সাড়ে আটটায় বাসা থেকে বের হন, ফিরেন বিকাল সাড়ে চারটায়। কাজের ফাঁকে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘সারাদিন কাজ করে মজুরি পায় ১০২ টাকা’।

“খাইয়া, না-খাইয়া কোনোমতে বাইচা আছি-গো দাদা। যতক্ষণ গতরে শক্তি আছে, ততক্ষণ না হয় খাটলাম। অল্প একটু অসুস্থ হইলেই-তো কাজ করতে পারি না। বড় বাবুর কথা মতো নিজের জীবন শেষ করে দিলেও চা শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে ভাবে না তারা। আমার একটা ছেলে একটা মেয়ে রয়েছে। যে টাকা মজুরি পায়। এটা দিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া-খাতা-কলম কিনার টাকা পায়নে। তার স্ত্রীর তার সাথে চা-বাগানেই কাজ করে। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি এভাবেই নিজেদের অসহায়ত্ব ও মানবেতর জীবনযাপনের কথা  জানান।

650

তিনি বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে চা বাগানে কাজ করে আসছি। আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ বছর চা বাগানে কাজ করি। নিজের জীবনের কোনো পরিবর্তন করতে পারিনি। শুরুতে যখন কাজ শুরু করে তখন বেতন ছিল মাত্র ২৫ পয়সা। এখন সেখান থেকে বেড়ে ১০২ টা হয়েছে। যা দিয়ে নিজেই চলতে পারিনা । পরিবার চালাবো কিভাবে। আমার একটা ছোট বাচ্চা আছে তার ঠিকমতো ভাত কাপুড় দিতে পারিনা। ঠিক মতো পড়াশুনা করাতে পারি না। অনেক কষ্ট আছি। দেখার কেউ নেই আমগো। জীবন চা বাগানের মধ্যে পড়ে চলে গেল। কিন্তু এখন আমি মানবেতর জীবন জীবন যাপন করছি।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, প্রতিদিন নানা পরিবর্তন হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে নানাখাতে। কেবল স্থির দাঁড়িয়ে শ্রমিকের মজুরি। মালিকপক্ষের দাবি, শ্রমিকদের মজুরির সাথে পাল্টেছে জীবনমানও। আরও উন্নত করতে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন মোট চায়ের চাহিদা ৫ কোটি কেজি। ১৬৮টি বাগান থেকে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ৬ কোটি কেজি। তাই চাহিদা মিটিয়ে চা রফতানি করা হয়।

650

দেশের এই শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ১২ লাখ শ্রমিক। এমনিতেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সূচকে পিছিয়ে চা বাগানের শ্রমিকরা। অন্য কোন কাজ না জানায় চা বাগানের বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ নেই তাদের।

চা শ্রমিকদের নানাবিধ সমস্যা ও জীবনমান নিয়ে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, `চা শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। তাঁদের জীবনমান অত্যন্ত নিম্নমানের। তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়ন খুবই জরুরি`।

টিআর/