ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭

অবিভক্ত ও যুদ্ধমুক্ত কাশ্মীর চাই

আজাদুল ইসলাম আদনান

প্রকাশিত : ০১:০৭ পিএম, ৬ আগস্ট ২০১৯ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৪:০৭ পিএম, ৬ আগস্ট ২০১৯ মঙ্গলবার

কাশ্মীর ইস্যুতে ফের মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসন-শোসন থেকে মুক্তি পায় এ অঞ্চল। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ওই বছর ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার সময় হায়দারাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। হায়দারাদ ও জুনাগড় হিন্দু অধ্যষিত হলেও তার শাসকবর্গ ছিলেন মুসলমান। পক্ষান্তরে কাশ্মীর রাজ্যটি মুসলিম অধ্যষিত হলেও শাসক ছিলেন হিন্দু।

ফলে রাজ্য ৩টি ভারত না পাকিস্তানে যোগ দেবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ভারত তাদের অংশ বলে দাবি করলে পাকিস্তান তার বিরোধীতা করে নিজেদের দাবি করে। এদিকে হায়দারাবাদের শাসক নিজাম ভারতের সাথে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালে ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দারাবাদ দখল করে নেয়। নিজাম পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে ভারত জুনাগড়ও দখল করে নেয়। 

অন্যদিকে কাশ্মীরের শাসক মহারাজা হরি সিং ভারতের সাথে যুক্ত হতে না চাইলেও পরে প্রতিরক্ষা,পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে "Instrument Accession" চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হয়। সেই থেকে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা সৃষ্টি হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে "লাইন অব কন্ট্রোল " রেখা টানা হয়।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৮ সালে ভারত কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। জাতিসংঘের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবে কাশ্মীরে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার, এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হয়। কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি বলবৎ হয় ১৯৪৮ সালে, তবে পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করে। তখন থেকেই কাশ্মীর কার্যত পাকিস্তান ও ভারত নিয়ন্ত্রিত দুই অংশে ভাগ হয়ে যায়।

অন্যদিকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে চীন কাশ্মীরের আকসাই-চিন অংশটির নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আর তার পরের বছর পাকিস্তান - কাশ্মীরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনের হাতে ছেড়ে দেয়। সেই থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন - এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে।

১৯৬৫ সালের দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আরেকটি যুদ্ধবিরতি চু্ক্তি হয় । এরপর ১৯৭১-এর তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তির মধ্যে দিয়ে বর্তমানের 'লাইন অব কন্ট্রোল' বা নিয়ন্ত্রণ রেখা চূড়ান্ত রূপ পায়। ১৯৮৪ সালে ভারত সিয়াচেন হিমবাহ এলাকার নিয়ন্ত্রণ দখল করে - যা নিয়ন্ত্রণরেখা দিয়ে চিহ্নিত নয়।

ইতিহাসবিদরা বলেন, ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু যে শর্তে তা হয়েছিল, সেই শর্ত থেকে ভারত অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও অনেকটা জোর করে এই ব্যবস্থায় ঢুকেছে এবং সেই থেকে সংকট জটিল থেকে আরও জটিল হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষ ভারতের সঙ্গে থাকতে রাজি ছিলনা। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ইউনিয়ন করে যুক্ত হতে কিংবা নিজেরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চায়। 

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তাদের দাবি অনেকটা ন্যায্য ছিল। ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে কাশ্মীরে কর্মসংস্থানের অভাব এবং বৈষম্যের অনেক অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ সময় কাশ্মীরে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও নির্যাতন চালানোর অনেক অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সেখানে বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নতাবদী আন্দোলন দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গত কয়েক বছরে সেখানে সাধারণ নাগরিক ও এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৫০০ জনের মতো নিহত হয়েছে। ফলে, তাদের স্বায়ত্বশাসন অনেকটা জরুরি হয়ে পড়ে।

বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে ভারত এবং পাকিস্তান দুই দেশই যুদ্ধ বিরতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল ২০০৩ সালে। পাকিস্তান পরে ভারত শাসিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সহায়তা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০১৪ সালে ভারতে নতুন সরকার এসেছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু ভারতের সেই সরকারও পাকিস্তানের সাথে শান্তি আলোচনা করার আগ্রহ দেখায়। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দিল্লী গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।

এর এক বছর পরই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০১৬ সাল থেকে ভারত শাসিত কাশ্মীরে দেশটির সামরিক ঘাঁটিত বেশ কয়েকটি আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালে কয়েকটি কথিত জঙ্গি হামলা ও চলতি বছরের ১৪ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় এক আত্মঘাতি হামলায় ৫৩ জন ভারতীয় সৈন্য নিহতের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনার রুপ নেয় পাক-ভারত সম্পর্ক। ফলে সবধরনের আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

দেশ ভাগের সময় ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ভারত সরকার পরে সংবিধানের ৩৭০ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল। পররাষ্ট্র, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি সবক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল ওই রাজ্যকে। তাদের আলাদা পতাকা, প্রধানমন্ত্রী ও সংবিধান ছিল।  তবে কালে কালে সব হারিয়ে অবশিষ্ট ছিল সাংবিধানিক ধারা ও বিশেষ কিছু ক্ষমতা। এবার তাও হারালো যুগে যুগে নির্যাতনের শিকার হওয়া এ অঞ্চলের মানুষ। 

গতকাল সোমবার ভারতের পার্লামেন্টে প্রবল চাপ ও উত্তাপের মুখে ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে তাদের সেই বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হলো। এর মধ্যদিয়ে ভারতের সংবিধানের ৩৫(ক) ধারারও বিলোপ করে দেয়া হলো বলে বিরোধী দলীয় নেতারা দাবি করে আসছেন। এর ফলে কাশ্মীরকে এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আনা হলো। 

এদিকে কাশ্মীর নিয়ে ভাতের এমন কর্মকাণ্ডে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছে পাকিস্তান। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে বলে ঘোষণা দিয়ে পাক পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, এর ফল চরম হবে। কাশ্মীর নিয়ে সবধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

এ ঘটনায় এখনো মুখ খোলেনি আন্তর্জাতিক বিশ্ব কিংবা জাতিসংঘ। ভারতীয় পার্লামেন্টে বিলটি পাস হওয়ার পর অনেক মুসিলম রাষ্ট্র ভারত সরকারের কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। কাশ্মীর নিয়ে ইমরানে পাশে থাকার ঘোষনা দেয় মালয়েশিয়া ও তুরস্ক। এ ব্যাপারে ওআইসির পক্ষ থেকে এখনো কেনো বক্তব্য জানানো হয়নি। 

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের সমঝতার কোনো বিকল্প নেই। ভারত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা এক তরফা। এটি কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। বিতর্কিত এ ইস্যুতে উভয় দেশকে যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় কাশ্মীরকে স্বায়ত্বশাসন দেয়া। নতুবা এ অঞ্চলে আরেকটি পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন তারা। তাই বিশ্ববাসীর দাবি- যুদ্ধ নয়, চাই অবিভক্ত কাশ্মীর।