ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬

একটি অবিস্মরণীয় মর্মান্তিক শোকের দিন

কবীর চৌধুরী

প্রকাশিত : ১২:১১ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৯ বুধবার

১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট। ওই দিনটির হবার কথা ছিল আনন্দের, খুশির, উৎসবের। জাতির জনক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

রাতে কিছু এলোমেলো গুলির শব্দ শোনা গেল। কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ি চলাচলের শব্দও পাওয়া গেল। সবাই ভাবল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অনুষ্ঠান হবে এসব তারই মহড়ার অংশ। সত্যি সত্যি কী ঘটেছে নৃশংস ঘাতকদের দল ছাড়া কেউ সে সম্পর্কে কোন ধারণা করতে পারেনি। এবং তারপর বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত ছিল তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাংলার মীরজাফর খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে হানা দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বহু সদস্যকে হত্যা করে।

ওই কালো রাতে যারা নিহত হন তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও ছিলেন তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তার বড় ছেলে শেখ কামাল, তার মেজো ছেলে শেখ জামাল, তার ছোট ছেলে শেখ রাসেল, তার ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী ও ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার মেজো বোনের ছেলে শেখ ফজলুল হক মণি, মণির স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণি, শেখ কামালের স্ত্রী ক্রীড়াবিদ পারভীন কামাল খুকু, মৃত্যুর এক মাস আগে শেখ কামালের সঙ্গে তার বিয়ে হয়, শেখ জামালের স্ত্রী পারভিন জামাল রোজিসহ বঙ্গবন্ধুর আরও কতিপয় ঘনিষ্ঠজন।

মোশতাক বাহিনীর কালো পোশাক পরা হিংস্র ঘাতকরা সকালের আলো ফোটার একটু আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর ভবনে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের গুলির শব্দ শুনে শেখ কামাল ওপর থেকে নিচে নেমে আসে। ঘাতকরা তাকে সরাসরি ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। তারপর তারা সিঁড়ির ওপরে হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

কেন তাকে হত্যা করা হলো? কারা তাকে হত্যা করল? তার মৃত্যুতে কারা লাভবান হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর কুয়াশাবৃত নয়। বঙ্গবন্ধুকে তারাই হত্যা করে যারা তার আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ চায়নি। বঙ্গবন্ধু শুধু একটি স্বাধীন দেশ চাননি, যিনি চেয়েছিলেন তার স্বাধীন দেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করবে। সে জন্যই তার অনুপ্রেরণায় প্রণীত ১৯৭২ সালের শাসনতন্ত্রে দেশ পরিচালনার মৌল চার নীতি হিসেবে স্থান পায় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধুর বিরোধিরা এটা মেনে নিতে পারেনি। তারাও হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিল, কিন্তু তাদের কাম্য ছিল পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যেখানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা পাবে। ধর্মনিরপেক্ষতা একটি পরিতাজ্য বিষয় বলে গণ্য হবে, আর সমাজতন্ত্র হবে একটা অনুচ্চার্য বিষয়। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তাদের এইসব অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবে না। তাই ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন :

নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়
করে যদি যারা তার পুত্রসম বিশ্বাসভাজন
জাতির জনক যিনি অতর্কিত তাঁরেই নিধন।
নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর।
সারা দেশ ভাগী হয় সে ঘোর পাপের।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের শনিগ্রহ জেনারেল জিয়া এই দেশকে আবার পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। তিনি ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি বর্জন করে পাকিস্তানি কায়দায় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ চালু করলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে সম্মানের আসনে পুনর্বাসিত করলেন। পাঠক শাহ আজিজুর রহমান ও আব্দুল আলীম প্রমুখের কথা স্মরণ করতে পারেন। এর চাইতেও ভয়াবহ ও নৃশংস কিছু কাজ জেনারেল জিয়া সম্পাদন করেন। 

প্রহসনমূলক সামরিক বিচারের মাধ্যমে তিনি শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেন। ওই সময় দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয় তা আমাদের নাৎসী নেতা এডলফ হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু হিটলার ছিলেন একজন অসুস্থ, প্রায় উন্মাদ ব্যক্তি।

আর জিয়াউর রহমান তার নিধনযজ্ঞ পরিচালনা করেন ঠাণ্ডা মাথায়। এক সঙ্কট মুহূর্তে তার প্রাণরক্ষাকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে তিনি যেভাবে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন ও তা দ্রুত কার্যকর করেন। এর মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়ার উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতা দখলের লোভ, চতুর ও নৃশংস ষড়যন্ত্রকারীর চরিত্র খুব স্পষ্টভাবে সবার চোখে ধরা পড়ে।
কিন্তু জিয়াউর রহমান শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ষড়যন্ত্রকারী জিয়া অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নির্মমভাবে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। তার সারা শরীর বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে যায়। আমার মনে পড়ে আমাদের দেশজ প্রবাদ বাক্যের কথা, ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’ অন্য আরেকটি প্রবাদের কথাও আমার মনে পড়ে : ‘ন্যায় বিচারের চাকা খুব ধীরে ধীরে ঘোরে, কিন্তু ওই ঘূর্ণন দানাগুলোকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করে সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দেয়।’

আজ কোথায় জিয়া আর কোথায় বঙ্গবন্ধু? আজ অগণিত মানুষের কাছে জিয়া একটি চরম ঘৃণিত নাম আর অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি দিন দিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি, তার স্মৃতিকেও ম্লান করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় কীর্তি সম্পর্কে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের মন্তব্য আমার মনে পড়ে। তিনি লিখেছেন : ‘বর্তমান যুগের ইতিহাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জন্ম একটি বিরাট ঘটনা। ... সুচিন্তিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভব, শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রমাণ সমগ্র পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির বন্ধু ও অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানব জাতির পথপ্রদর্শক ও মহানেতা। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর উৎসাহ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সভ্যতা, সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সব মানুষের মানবাধিকারের স্বীকৃতি। তার সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয়, সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে, এ আশা আমাদের আছে এবং থাকবে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে শেখ মুজিবের বিশাল মহিমার একটি প্রকাশ যেমন আমরা দেখতে পাই, তার মহামানবতার আর একটি পরিচয় আমরা পাই তার চিন্তাধারার অসাধারণতায়।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ-২, জ্যোৎস্না পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০০৭, পৃ-৬১১)

আজ বঙ্গবন্ধু সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার আদর্শগুলো আছে, বাতিঘরের মতো তার নির্দেশিত পথগুলো আছে আমাদের সামনে। ওই বাতিঘরের আলোয় আমাদের পথ আলোকিত করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব। গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে চেতনায় ধারণ করে আমরা আমাদের সোনার বাংলাকে একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলব। এখানে মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার কোন স্থান থাকবে না। আমাদের অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুঞ্জয়ী স্মৃতি বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
জয় বঙ্গবন্ধু।
জয় বাংলা।

(এই লেখাটি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ থেকে নেয়া)

এএইচ/