ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬

তিনি ছিলেন ‘ইতিহাসের মহানায়ক’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৫:৪২ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৯ বুধবার | আপডেট: ০৫:৪৫ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৯ বুধবার

সমাজ ও রাজনীতি ‘নেতা’ বা ‘নায়ক’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে নিতে পারেন অনেকেই। মাঝে মাঝে অসাধারণ ক্যারিশমা সম্পন্নরা ‘বড় নেতা’ অথবা ‘মহানায়কের’ আখ্যায়ও ভূষিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে, তারা প্রায় সবাই সমসাময়িক কালের নেতা, চলতি পারিপার্শ্বিকতার প্রেক্ষাপটের নায়ক। কিন্তু ‘ইতিহাসের নায়ক’ হওয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ সব কালে, সব যুগে সৃষ্টি হয় না। যুগ-যুগান্তরের পরিক্রমায় হাতেগোনা এক-আধজনই কেবল ‘ইতিহাসের নায়ক’ হয়ে উঠতে পারেন। ইতিহাস তার আপন তাগিদেই সেরূপ ‘নায়কের’ উদ্ভব ঘটায়, আর সেই ‘ইতিহাসের নায়ক’ই হয়ে ওঠেন ইতিহাস রচনার প্রধান কারিগর ও স্থপতি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমনই একজন কালজয়ী পুরুষ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের একজন বড়মাপের নেতা ও রাজনীতির একজন মহানায়কই শুধু ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘ইতিহাসের নায়ক’। আরও সত্য করে বললে, তিনি ছিলেন ‘ইতিহাসের এক মহানায়ক’।

রাজনৈতিক-সামাজিক পরিমণ্ডলে এক ক্রম-অগ্রসরমান বিবর্তন ও উত্তরণের ধারার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়কের এই অবস্থানে উত্থিত হতে পেরেছিলেন। তার ভাবনা-চিন্তা, আদর্শবোধ, জীবন দর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন আত্ম-পরিচয়ের মৌলিক উপাদানগুলো ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়েছে। একসময়কালের অবস্থান থেকে পরবর্তী অন্য একসময়কালে সেসবের উন্নতর উত্তরণ ঘটেছে। উত্তরণ ও বিবর্তনের এই গতি কোন দিন বন্ধ হয়নি, অব্যাহত থেকেছে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

রাজনীতির অনেক আঁকাবাঁকা পথে তাকে চলতে হয়েছে, অনেক আগু-পিছু করে তাকে রাজনীতির পথপরিক্রম করতে হয়েছে। বাস্তবতার প্রতিকূলতার মুখে কখনও কখনও তাকে সাময়িক আপসও করতে হয়েছে। কিন্তু তার সার্বিক বিবর্তনের গতি ছিল সামনের দিকে, প্রগতি অভিমুখে। এটাই ছিল স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী। কেন? কারণ, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, ছিলেন জনতার নেতা। রাজনীতির তাত্ত্বিক পণ্ডিত তিনি কখনই ছিলেন না। তিনি একজন সর্বজ্ঞানী স্কলার অথবা কোনো এক বা একাধিক বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞও ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞাবান একজন নেতা। তিনি ছিলেন মানুষের লোক। মানুষের কাছ থেকে তিনি গ্রহণ করতে পারতেন, বিচার-বিবেচনার রসদ সঞ্চয় করতে পারতেন। সব বিষয়ে শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। মানুষের ওপর, জনতার ওপর তার এহেন অপার ভালোবাসা ও নৈকট্যই তার ক্রমবিবর্তনের প্রগতিমুখীন হওয়াটাকে স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল।

শুরুতে তিনি ছিলেন এক দুরন্ত কিশোর- মুজিবর। অনেকের কাছে মুজিব ভাই। তারপর মুজিবর রহমান অথবা শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর বহুদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে তার নাম ছিল ‘শেখ সাহেব’। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন পরিচয় ‘বঙ্গবন্ধু’। একাত্তরের পর তিনিই হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতি এবং ‘জাতির পিতা’। তিন দশক সময়কালের মধ্যে এভাবেই ঘটেছিল তার অবস্থানের উত্তরণ।

তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে তার চিন্তাধারা-জীবনদর্শনেও উত্তরণ ঘটেছিল। শুরুটা ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের ছাত্রকর্মী হিসেবে। কিন্তু সে সময়ও মুসলিম লীগের মধ্যে উদারনৈতিক ও কিছুটা প্রগতিমুখীন যে প্রবণতা ও অংশ ছিল, বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই আবুল হাশেম-সোহরাওয়ার্দী সাহেবের অনুগামী। তিনি ছিলেন ঢাকার নবাবদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের বিরুদ্ধে। তিনি একই সাথে ছিলেন নেতাজী সুভাষ বোসের ভক্ত। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট- এই তিন দলের ঝাণ্ডা নিয়ে কলকাতায় ‘রশিদ আলী দিবস’ পালনসহ নানা কর্মসূচিতে সঙ্গী-সাথী-অনুগামীসহ তিনি ছিলেন একজন উৎসাহী যৌবন দীপ্ত অংশগ্রহণকারী।

মুসলিম লীগের কর্মী থাকার সময় থেকেই কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের সাথে তার পরিচয়, কিছুটা ঘনিষ্ঠতার সূচনা। তখন থেকেই তার মাঝে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি একটি গভীর মনের টানের উন্মেষ। সঙ্গে সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক বোধের জাগরণ।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালি জাতির ওপর পরিচালিত শোষণ-বঞ্চনা, বাংলা ভাষার ওপর আঘাত, প্রতিক্রিয়াশীল অংশের দ্বারা মুসলিম লীগের নেতৃত্ব করায়ত্ত হওয়া ইত্যাদি তাকে অতি দ্রুতই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহযুক্ত করে তোলে। সাধারণ কর্মচারীদের দাবি নিয়ে সংগ্রাম করে তিনি জেলে যান। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের একজন প্রধান সংগঠক হয়ে ওঠেন। জেলে ও জেলের বাইরে কাজ করতে করতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের সাথে তার সংযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় ‘শেখ সাহেব’ দুইবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাপ গঠিত হয়। চলে নবগঠিত ন্যাপের ওপর আওয়ামী-হামলাবাজি। ‘শেখ সাহেবও’ ন্যাপের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পক্ষ নেন। তবে, ‘শেখ সাহেব’ অচিরেই বুঝতে সক্ষম হন যে, বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু তার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। তাই দেখা যায়, ১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে অ্যাসেমব্লিতে ন্যাপ উত্থাপিত স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই ‘ন্যায্য’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানান। প্রগতিশীলদের সাথে তার নৈকট্য আরও বৃদ্ধি পায় সে সময়।

আইয়ুবী সামরিক শাসন জারির পর প্রবল নির্যাতন ও আক্রমণের মুখে ‘শেখ সাহেব’ কিছুদিন হতাশায় আচ্ছন্ন ছিলেন। ন্যাপের ও গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ তাকে আবার উজ্জীবিত হতে সাহায্য করেন। ষাটের দশক শুরু হতে হতেই তিনি আবার চাঙা হয়ে ওঠেন। ’৬১ সালের শেষ দিকে আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ, খোকা রায় প্রমুখের সাথে কয়েকটি গোপন বৈঠকে তিনি মিলিত হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সূচনা করার কৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। ‘শেখ সাহেব’ একাধিকবার পার্টির নেতাদের বলেন, গণতন্ত্র, বন্দিমুক্তি প্রভৃতি দাবির সাথে সাথে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার দাবিও তখনই ওঠানো উচিত। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ‘স্বাধীনতার দাবিটি সঠিক বটে, তবে তা উত্থাপনের জন্য এখনও অবস্থা পরিপক্ব হয়নি। এখন গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে ছাত্রদের মধ্য থেকে আন্দোলন শুরু করতে হবে।’ ‘শেখ সাহেব’ তার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথেও কথা বলেন। শেষ বৈঠকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের বলেন, ‘দাদা। আপনাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম, কিন্তু যুক্তিগুলো সব মানলাম না।’

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের বছরগুলোতে জেলখানাগুলো ভরে উঠল রাজনৈতিক বন্দিদের দিয়ে। ‘শেখ সাহেব’ এবং আরও অনেককে যেতে হলো জেলে। অনেকের জন্যই হয়ে উঠল, একবার জেলে ঢোকা, কিছুদিন পরে জেল থেকে বের হয়ে আসা, তারপর আবার জেলে যাওয়া। অন্যান্য সব রাজনীতিবিদদের সাথে ‘শেখ সাহেব’ও দেখললেন যে, ‘আমরা তো আসি-যাই, কিন্তু জেলখানার প্রায় স্থায়ী বসবাসকারী হয়ে রয়েছেন একঝাঁক ঋষিতুল্য কমিউনিস্ট নেতা। তাদের কাজ তো দেখি সবসময় আমাদের অভ্যর্থনা জানানো ও বিদায় দেয়া।’ কমিউনিস্টদের আত্মত্যাগ তাকে অভিভূত করে। এ কারণে তিনি আজীবন কমিউনিস্টদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন। তাদের সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রতিও একটি সহানুভূতি ও আকর্ষণ তার মধ্যে গড়ে উঠতে থাকে।

তবে তিনি ছিলেন সোজাসাপ্টা কাজের মানুষ। তিনি তার অসাধারণ প্রজ্ঞা ও হৃদয়ের সিগনাল বুঝে অগ্রসর হতেন। সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাষ নিয়ে তত ব্যস্ত থাকতেন না। কমিউনিস্টদের তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, ‘আপনাদের বুদ্ধি একটু বেশি, তবে আক্কেল একটু কম।’ তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি কমিউনিস্টদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতেন। তাদের পরামর্শ মেনে চলতেন এমনটা সব সময় না ঘটলেও, সেই পরামর্শগুলো হিসাবে নিতেন।

’৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর ‘শেখ সাহেব’ বুঝতে পারেন, এখন স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সামনে রেখে বাঙালির স্বাধিকারের জন্য জোরেশোরে নামার সময় এসে গেছে। তিনি ৬-দফা দাবি শেখ করে আন্দোলনে নেমে পড়েন। আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও নামডাকওয়ালা নেতাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি দৃঢ়চেতাভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন। আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের আক্রমণকে উপেক্ষা করে ‘শেখ সাহেব’ সাহসী মহাবীরের মতো আপসহীনভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন বাঙালির স্বাধিকারের দাবি নিয়ে। দলের কর্মীরাই শুধু নয়, সমগ্র দেশবাসী এই ৬-দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার পেছনে সমবেত হতে থাকে।

সরকার মরিয়া হয়ে তার বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দিয়ে তাকে সব দিক থেকে ‘শেষ করে দেয়ার’ চেষ্টায় নামে। কিন্তু ‘শেখ সাহেব’ ছিলেন ইতিহাসের পক্ষে। এবং তিনি ইতিহাস সৃষ্টির জন্য একজন ‘ইতিহাসের মহানায়কের’ যেসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি থাকা অপরিহার্য সেরূপ প্রজ্ঞা, জেদ, প্রত্যয় ও দক্ষতাসম্পন্ন একজন জননেতা ছিলেন। পাক-সরকারের প্রতিটি আঘাত সে সময় তার জন্য বরমাল্য স্বরূপ ভূষণ হয়ে ওঠে। ক্রমান্বয়ে তার জনপ্রিয়তা অসামান্য উঁচুস্তরে পৌঁছে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির একক ও অবিসংবাদিত নেতা। ৬-দফাকে প্রগতিশীল কর্মসূচিতে সমৃদ্ধ করে রচিত হয় ঐতিহাসিক ১১-দফা। সংগঠিত হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। জেল থেকে মুক্ত হয়ে আসেন মহানায়ক। শেখ সাহেব হয়ে ওঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’।

’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তার দলকে নিয়ে অভূতপূর্ব বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ইয়াহিয়া খান সেই বিজয়কে কেঁড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাতীয় পরিষদের বৈঠক বাতিল করে দেয়। দেশের অঘোষিত সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অধিকারকে এভাবে নস্যাৎ করার পথ গ্রহণ করা হয়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। বঙ্গবন্ধু জনতার ক্রোধ ও স্বাধিকারের প্রত্যয়কে ধারণ করে জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে এগিয়ে নেন। সাত মার্চের ভাষণে তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো।’ ... ইত্যাদি। স্বাধীনতার পথে বাঙালির যাত্রার শীর্ষপর্যায়ের ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের সূচনা সেখান থেকেই। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে জেগে  ওঠা জাতির ঐক্যের প্রতীক। স্বাধীনতার স্থপতি। জাতির জনক।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পদার্পণ করেন জাতির জনক। নতুন রাষ্ট্রের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় সাংবিধানিক রূপ প্রদানের কাজটি তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। রচিত হয় ‘৭২-এর সংবিধান, ঘোষিত হয় চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। সৃষ্টি হয় নয়া ইতিহাস।

তার পরেরটা হলো আরেক পর্ব। সেটি দেশ পরিচালনার পর্ব। সে পর্বে তার ভূমিকা একটি স্বতন্ত্র বিষয়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে ভালো-মন্দ অনেক কথাই থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাস রচনা হয়ে গেছে তার আগেই। এবং সেই ইতিহাস রচনার মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

‘ইতিহাসের মহানায়ক’ যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন তা একাধারে তার এবং জনগণের অমর সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মূল নির্যাস হলো নতুন বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রসম্পন্ন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ, আর তার চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সংবলিত ’৭২ সালের সংবিধান। অনেক উপাদান দিয়েই একটি দেশের একটি ‘রাজনৈতিক পর্ব’ রচিত হতে পারে। কিন্তু সব উপাদান দিয়ে একটি দেশের ‘ইতিহাস’ সৃষ্টি হয় না। ইতিহাস সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় ‘ঐতিহাসিক উপাদান’। চার রাষ্ট্রীয় আদর্শসম্পন্ন নতুন রাষ্ট্রের জন্মের প্রধান স্থপতি হওয়াটাই হলো সেই ঐতিহাসিক উপাদান, যার কারণে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন ‘ইতিহাসের মহানায়ক’। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হলো ’৭২-এর সংবিধানের মূল আদর্শিক ভিত্তি। তাই, একথা সকলেরই উপলব্ধি করা বিশেষভাবে প্রয়োজন; ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি মূল আদর্শিক ভিত্তির ক্ষেত্রে আপস, বিকৃতি, পদস্খলন হওয়াটা হবে ‘ইতিহাসের মহানায়কের’ অবমূল্যায়ন।

ইতিহাসের শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তার সৃষ্ট ‘ইতিহাসকে’ উল্টিয়ে দিতে। ‘ইতিহাস’ সৃষ্টিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন- এই ‘অপরাধেই’ ইতিহাসের খলনায়ক পঁচাত্তরের ঘাতকরা তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছে। দেশকে পাকিস্তানি ধারার উল্টোপথে ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কালের চাকাকে চিরদিন উল্টোপথে চালানো যায় না। ইতিহাসের নিয়মেই ‘ইতিহাস’ আবার নতুন শক্তিতে পুনর্জাগরিত হবে। তাই জোর দিয়ে এ কথাই বলব, ‘ইতিহাসের’ অমূল্য সম্পদ ’৭২-এর সংবিধানের মূল ভিত্তিকে অবিকৃতভাবে পুনরুজ্জীবিত করাটাই হলো ‘ইতিহাসের মহানায়কের’ প্রতি জাতির সবচেয়ে বড় দায় ও কর্তব্য।

একথা সত্য যে, শেষ বিচারে ইতিহাসের স্রষ্টা হলো জনগণ। কিন্তু ব্যক্তির ভূমিকাকেও ইতিহাস অগ্রাহ্য করে না। ইতিহাসের চাহিদা অনুযায়ী যে ব্যক্তি জনগণকে জাগিয়ে তুলতে পারেন, এবং জাগ্রত জনগণের গণবাণীকে সঠিক রূপে প্রতিফলিত করতে পারেন- তিনিই হয়ে ওঠেন ‘ইতিহাসের নায়ক’।

ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান- তোমাকে সালাম!

(লেখাটি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ থেকে নেওয়া)

এএইচ/এসি