ঢাকা, শুক্রবার   ২২ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ৮ ১৪২৬

মৃত্যু পথযাত্রীদের সেবা দেন যে চিকিৎসক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৪:৩৫ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০১৯ রবিবার | আপডেট: ০৫:২৪ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০১৯ রবিবার

ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল ও অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের প্রায় ছয় লাখ মানুষ মৃত্যুশয্যায় আছে। তাদের ব্যথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি এবং নিরাপদ মৃত্যু নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

তিনিই প্রথম বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ধরণা দিয়েছিলেন। যখন তিনি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেন অনেকে তখন তাকে পাগল বলেছিল। অনেকে করেছিলেন উপহাস। তবে তিনি এসবে কর্ণপাত না করে ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করেন প্যালিয়েটিভ কেয়ার ওয়ার্ড। সেখানে দশটি পুরুষ শয্যা ও নয়টি মহিলা শয্যা নিয়েই শুরু হয় তার যাত্রা।  

এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করার তার উদ্দেশ্যে ছিলো, যখন কোনো রোগীর চিকিৎসা আর কোনো কাজে আসবে না বা চিকিৎসা বিজ্ঞান তাকে নিয়ে নিরুপায় হয়ে যায়, এই সব রোগীদের শারীরিক ও মানসিক সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। তিনি চেয়েছেন, মানবিক দায়িত্ব হিসেবে এসব রোগীকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিকিৎসা ও সেবা দিয়ে যাওয়া।

সম্প্রতি প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ও বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একুশে টিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

একুশে টিভি অনলাইন: কী পরিমাণ মৃত্যু পথযাত্রী রোগী রয়েছে?
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: পৃথিবীতে নিরাময়হীন রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র নিরাময়যোগ্য রোগে বাংলাদেশে ৬ লাখ মানুষ মৃত্যুশয্যায়, যারা তেমন কোন চিকিৎসা সেবা পায় না। এছাড়া শুধু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে মারা গেছে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এবং একই সময় এইডস্ রোগে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। আক্রান্তদের শতকরা ৭০ শতাংশ মৃত্যুর আগে তীব্র শারীরিক ব্যথা সহ্য করেছেন। যদিও খুব অল্প প্রশিক্ষণে এসব মানুষকে সেবা দিয়ে তাদের ব্যথাবিহীন মৃত্যু নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই প্যালিয়েটিভ কেয়ারের যাত্রা শুরু হয়।

একুশে টিভি অনলাইন: প্যালিয়েটিভ কেয়ার আসলে কী?
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: প্যালিয়েটিভের বাংলা অর্থ হলো প্রশমন। প্যালিয়েটিভ কেয়ার বলতে বুঝি নিরাময় অযোগ্য রোগী বা যেসব রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে বা থাকে না, তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্তিকভাবে সহযোগিতা করা। একেই আমরা প্যালিয়েটিভ কেয়ার বলি। ব্যথা, কষ্ট এই বিষয়গুলো যতটা সম্ভব প্রশমিত করাই এ সেবার উদ্দেশ্য।

একুশে টিভি অনলাইন: প্যালিয়াটিভ কেয়ারে কোন কোন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়।
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত মানুষ নানা ধরনের শারীরিক উপসর্গ, মানসিক ও সামাজিক সংকটে রোগীসহ পুরো পরিবার বিপর্যস্ত ও অসহায়বোধ করে। অথচ বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত প্রতিরোধ আর নিরাময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অসুখ-বিসুখ যেন কখনো না হয়, আর হলেও যেন তা তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যায় সেটাই সবাই চায়। গত একশ’বছরে চিকিত্সাবিজ্ঞান এই দুই ক্ষেত্রে অর্জন করেছে অভূতপূর্ব সফলতা। তবে এটাও সত্যি যে, অনেক রোগ আছে যা পুরোপুরি ভাল হবার নয়, যেমন বিশেষ ধরনের ক্যান্সার, পক্ষাঘাতগ্রস্ততা অথবা এই ধরনের আরো বেশ কিছু রোগ। সাধারণত এমন রোগীর ক্ষেত্রে তার পরিবারকে অনেক সময় বলা হয় ‘আর কিছু করার নেই, বাড়ি নিয়ে যান’। কিন্তু ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’এসব রোগী ও তার পরিবারকে দূরে ঠেলে না দিয়ে সহায়তার হাত বাড়ায়। এক কথায় চিকিত্সা ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিষয়টিকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরে নিয়ে আসাই এ সেবার মূল লক্ষ্য। 

প্যালিয়েটিভ কেয়ার-এর মতো চিকিত্সায় ‘কিছু করার নেই’একটি ভুল ধারণা এটা,পলায়ণপর মনোবৃত্তি। মানবিক দায়িত্ব হিসেবে এসব রোগীকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিকিত্সা ও সামাজিক ব্যবস্থায় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর যে তিনটি দেশে প্যালিয়াটিভ কেয়ার সবচেয়ে বেশি সুনাম অর্জন করেছে,তার মধ্যে একটি হচ্ছে ভারতের দক্ষিণ কেরালা। দুই নম্বর হচ্ছে উগান্ডা, তিন নম্বর হলো স্পেন। স্পেনের দুটো শহর। সেখানে নাকি শতকরা ৯০ ভাগ নিরাময় অযোগ্য মানুষ এই ধরনের পরিচর্যার আওতায় এসেছে। তাদের কিন্তু একবারেই হাসপাতালমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়। তাদের হলো হোম কেয়ার সিস্টেম। গৃহমুখী চিকিৎসা।
 
একুশে টিভি অনলাইন: প্যালিয়েটিভ কেয়ারে রোগীর কি কি সেবা দেওয়া হয়?
অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: এখানে মৃত্যুর জন্য যেসব রোগী অপেক্ষা করে। যাদের চিকিৎসা দিয়ে আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তাদের যন্ত্রণা মুক্ত ও নিরাপদ মৃত্যু নিশ্চিত করতে সেবা দেওয়া হয়। এটাকে আপনি এক প্রকার আইসিইউও বলতে পারেন। এসব রোগীদের মন,আত্মা ও শারীরিক ও মানসিক কষ্ট কমাতে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের যাত্রা শুরু হয়। আমাদের দেশে নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে অনেকেই কথা বলে কিন্তু নিরাপদ মৃত্যু নিশ্চিতে তেমন কোন আলোচনা নেই। তবে অনেকেই এবিষয় জানে না। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের এবিষয় নিয়ে মিড়িয়া বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

একুশে টিভি অনলাইন: মৃত্যুর পথের যাত্রীদের কি কি সেবা দেওয়া হবে?
অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: প্যালিয়েটিভ কেয়ারে দুই ধরনের সেবা দেওয়া হয়। একটা চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্বারা আর অন্যটি মানবিক দিক বিবেচনা করে। এখানে যারা ভর্তি হয় তাদের অধিকাংশ রোগী তীব্র যান্ত্রণার মধ্যে থাকে। অনেকেই চিৎকার করে। এটা কমানোর চেষ্টা। ক্যান্সারের কারণে অনেকের শরীরিরে ঘা দেখা দেয় সেটা কমানোর চেষ্টা করা হয়। অনেকের দেখা যায় যে, ঘা থেকে পোকা বের হচ্ছে। প্রচুর বমি হয়। এসব রোগী বেশির ভাগ যন্ত্রণা নিয়ে বাস করে।

একুশে টিভি অনলাইন: বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ার কতটি রয়েছে। এখানে সেবা নিতে কেমন খরচ লাগে?
অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ারে এই সেবা রয়েছে। সরকারিভাবে আর অন্য কোন স্থানে এমন সেবা দেওয়া হয় না। তবে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ক্যান্সার হাসপাতাল নতুন করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার খোলার উদ্যেগ গ্রহণ করেছে।

এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য কোন টাকা লাগে না। এমন সকল প্রকার ওষুধও বিনামূল্য দেওয়া হয়। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে তাহলে এই টাকা আসে কোথা থেকে। মূলত সেবার ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় বহন করে। আমাদের এখানে ২৫টা বেড আছে। বর্হিবিভাগে রোগীও দেখা হয়। এমনকি নারী ও শিশুদের জন্য আলাদাভাবে সেবা দেওয়া হয়। আমাদের একটা টেলিফোন সার্ভিস আছে, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীরা টেলিফোনে মোবাইল সেবা পেয়ে থাকে।

টিআর/এসি