ঢাকা, শনিবার   ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ২২ ১৪২৬

রবীঠাকুরের গল্প অবলম্বনে

শেষ বিকেল

শায়লা শারমিন শুভ্রা

প্রকাশিত : ১০:০৪ পিএম, ১ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার | আপডেট: ১০:১১ পিএম, ১ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

আকাশটা হঠাৎ বৈরী হয়ে উঠল। কি পাগলা হাওয়া! আকাশ তীক্ষ্ণ কন্ঠে ডেকে উঠল। 

: দেখলে শ্বেতা, আকাশ তোমাকে ধমকে দিল!

শ্বেতা দু'হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো। ঝুম বৃষ্টি। শ্বেতা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মেঘ শ্বেতার মাথায় হাত রাখল। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না শ্বেতা। চোখের কোণে বর্ষা।

: কি হল শ্বেত পাথর? আজ দেখি পাথর গলে....!

: চুপ! কথা বলবা না। কেন এলে, হ্যাঁ?

: ভাবলাম অদৃশ্য চুরি দিয়ে কেউ একজনকে ক্ষত-বিক্ষত করে যাই।

: ও! তাহলে কাটাকুটি শুরু কর।

: নিশিথিনী আমাকে খুব পছন্দ করে জানই তো। উপহার হিসেবে ঘড়িটা সোনা দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছিল। আজ বাদে কাল আমার আঁকা ছবির এক্সজিভিশন। হাতে টাকা-কুড়ি নেই।

: ঘড়ি বিক্রি করতে এলে?

: বলতে পার তাই।

: দুঃখিত মেঘবাবু। আমি ঘড়ির দোকান না।

: তা হবে কেন?

: কারো ঘড়ি আমি কিনতে পারব না। উঠে দাঁড়াল শ্বেতা। রুমে চলে গেল। মেঘ চেঁচিয়ে বলল- দোকান না হও। মানবতার স্টোর রুম তো!

ছবি আঁকার খাতিরে মেঘবাবুর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। উঠতি বয়সী মেয়েদের মধ্যে বেশি। যা শ্বেতাকে খুব কষ্ট দেয়। তার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, মেঘের ধর্মবোধে উদাসীনতা। ঠিক উদাসীনতা নয়। এটাকে বলে ধর্ম বিদ্বেষ। মেঘের বাবা হাসান সাহেব তাই তার ছোট ছেলে মেঘকে ত্যাগ করেছেন।

মেঘ স্টাডি রুমে ঠিক বসে আছেন। বিশ মিনিট পরে গোলাপি রঙের খাম হাতে শ্বেতা স্টাডি রুমে ঢুকল। টেবিলের উপর খামটা রেখে চুপচাপ চলে গেল।

গোলাপী খাম! মেঘ মুছকি হাসল। প্রিয় অভিমান। শ্বেতা গোলাপী রংয়ের নাম দিয়েছে অভিমান। খামটা হাতে নিয়ে ধুপ-ধাপ শব্দ করে বেরিয়ে গেল মেঘ। ধুপ-ধাপ শব্দ করে যাওয়া অভ্যাস। কেউ একজনকে জানান দিয়ে যাওয়া।

দুই.

মস্ত বড় বাড়ি। শ্বেতা একা থাকে। জন-মানুষ বলতে মঈন চাচা আর ছোট্ট টুনটুনি। টুনটুনি মঈন চাচার মেয়ে। মা মরা মেয়ে। শ্বেতার সাথে মিল আছে। খুব ভাব দু'জনের। শ্বেতা ছোট থেকেই দেখে আসছে,মঈন চাচা বাবার শক্ত খুঁটি।

শ্বেতার বাবা মুহিব উদ্দিন। মাস -তিনেক হল মারা গেছেন। হৃদয়ের ক্রিয়া-কলাপ বন্ধ। সব শেষ। শ্বেতা অবাক হয়ে বাবার চলে যাওয়া দেখল। চোখের জল, চোখের কোণে শুকিয়ে গেল। একটুও কাঁদল না। সারাক্ষণ স্টাডি রুমে থাকে। মাঝে মাঝে মেঘ এসে জ্বালাতন করে। প্রিয় বাবা আর ধর্ম নিয়ে হাজারটা কথা শুনিয়ে যায়। মেঘ আর শ্বেতা এক সাথে সাইকলজি নিয়ে পড়া শেষ করেছে। তবুও মেঘ আর্ট নিয়ে পরে থাকে। অঘোষিত এক ভালোবাসা আর স্নায়ু-যুদ্ধ দুজনের।

অসম পৃথিবীতে ধর্ম যেন অবান্তর-এমনই মেঘের ধারনা। শ্বেতা ঠিক উল্টো। জীবনের গভীরতা-রসবোধ শ্বেতাকে খুব ভাবায়। মেঘ ছবি আঁকে। নিজেকে পরিচয় দেয় আর্টিস্ট হিসেবে। শিল্পী-শিল্প। ইহাতেই মগ্ন। ভবিষ্যৎহীন এই আঁকা-উঁকি শ্বেতার পছন্দ না। মেঘের বিশ্বাস ইউরোপের দেশ গুলোতে তার আঁকা ছবির এক্সজিভিশন হবে। শ্বেতার কাছে তা নিছক ছেলে-খেলা।

তিন.

বাবার এতো সম্পত্তি শ্বেতার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব না। ট্রাস্টে উইল করে রেখে দেওয়ার কথা ভাবছে। বাবার স্বপ্ন বাড়ি অনাথ আশ্রম। যার নাম হবে ঘাসফুল। কত দায়িত্ব। সব বলে রেখেছে মঈন চাচাকে। টুনটুনি বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকালটা ও এমনই করে। মাঝে শ্বেতা সঙ্গ দেয়। খুব স্নেহ করে শ্বেতা। স্নেহ করার মতই মায়াময় মুখ। বাবাই তার সব।

: টুনটুনি পাখি! চাচাকে ডেকে দিতে পারবি?

না, পারব না বলেই ডাক শুরু: বাবা বাবা আপুন তোমাকে ডাকছে। শ্বেতার হাসি পায়। কি মায়া করে আপুন ডাকে।

: শ্বেতা মা! ডাকছো?

: হ্যাঁ চাচা। ট্রাস্টের কি হল?

: উকিলের সাথে কথা হয়েছে। ওনিই সব করবেন। তোমার চলে যাবে। সেই সাথে তোমার বাবার স্বপ্ন বাড়িও।

: তবে তাই করুন চাচা। আর শুনুন, সিগমুন্ড ফয়েডের কিছু বই কিনে আনবেন। ও হাঁ, ভার্জেনিয়া ওলফের বইটাও মনে করে আনবেন। বইয়ের নাম মনে আছে তো?

: মনে আছে মা। আচ্ছা মা, রাতে কি রান্না হবে?

: চাচা? অভ্যাস গেল না। আমাকে বলতে হয় কেন? আপনি এই বাড়ির খুঁটি। আপনি যা ইচ্ছে করে নেন।

চার.

আকাশ গুঁড়ু-গুঁড়ু করে ডাকছে। শ্বেতা স্টাডি রুমে কার্ল মার্ক্সের বই নিয়ে বসল। অর্থনীতির বাইবেল খ্যাত- "ডাস ক্যাপিটাল"

: বইয়ে মুখ গুজে জীবনাটা শেষ করে দিলে। কি সুন্দর বিকেল! চোখে পরে না এসব?

কখন এলো মেঘ? শ্বেতা টেরই পায়নি।

: তুমি খেয়াল করেছ শ্বেতা? তোমার আমার দেখা মানেই বৃষ্টি।

বলতেই আকাশ কেঁদে উঠলো। শ্বেতা মেঘকে দেখছে। কি নীরব দেখাচ্ছে মেঘকে। মেঘের সৌন্দর্যই তো নীরবতা। সুনসান এই নীরবতায় আমি মন ভরি, চোখ ভরি। কেন যে এমন উড়নচন্ডী হল, বিদ্বেষী  হল!

মৌনতা ভাঙল মেঘ।

: কি এতো দেখছো? এভাবে যদি একদিন আমার আঁকা ছবি দেখতে। আমি ধন্য হয়ে যেতাম।

শ্বেতা হাসল। এই হাসির অনেক উত্তর। অনেক প্রশ্ন। শ্বেতা বইয়ে চেখ বুলালো।

: কি হবে এতো পড়ে শ্বেতা? সংঘর্ষ এড়াতে পারবেন মহারাণী?

শ্বেতা এবার মুখ খুললো।

: সংঘর্ষে ভরপুর প্রতিটা কোণ। শুদ্ধ থাকতে, সত্য জানতে পড়ার কোন বিকল্প নেই। নির্দিষ্ট কোন সেক্টরে নিজেকে কুক্ষিগত রেখে সত্য জানা যায় না। সংঘর্ষ এড়াতে হলে জ্ঞান অর্জন মূখ্য মাধ্যম। ডিটেকটিভ, থ্রিলার, রোমাঞ্চ, উপন্যাস, ডারইনজম, ধর্মতত্ত্ব, অর্থশাস্র, রাজনীতি, বিজ্ঞান সব সেক্টরে পদ-চারণ থাকা চাই। এক জায়গায় আবদ্ধ থেকে সত্য জানা যায় না। স্রোতে গা ভাসিয়ে নয়, নিজস্বতা দিয়ে সত্য খুঁজতে হয়। (একদমে বলে শ্বেতা হাঁপিয়ে উঠলো।)

মেঘ খানিক হেঁসে বলল: এই নাও এক গ্লাস পানি খেয়ে নাও। আমার এতো সত্য খুঁজে লাভ নেই।

: তা খুঁজবে কেন মেঘ? তোমার তো প্রেয়সী খুঁজেই সময় থাকে না।

মুচকি হাঁসল মেঘ। এক জীবনে মেঘ এতে মেয়ের সান্নিধ্য পেয়েছে। তবুও শ্বেতা তার পুরো পৃথবী।

: ভালই বলেছ শ্বেতা।

শ্বেতা মুখ নীচু করে বসে আছে।

খানিক হেসে মেঘ বললো: ইতালি, জার্মানিরর মেয়েরা যখন আমাকে ঘীরে থাকবে, তোমার খুব হিংসে হবে, তাই না মহারাণী?

: কবে যাচ্ছেন মেঘবাবু?

: শিল্প বিষয়টাই বুঝলে না শ্বেতা।

শ্বেতা চুপ।

: টাকার জন্য যাওয়া আটকে আছে। জানই তো আমার বড় লোক বাবা আমাকে ত্যাগ করেছেন। কারণটাও জানো তুমি। ধর্ম-কর্ম হযে উঠে না। তোমার চিন্তা কি?তোমার জমিদার বাপ অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছেন। (শ্বেতার চোখে জল) বাবাকে নিয়ে কিছু বলা যায় না। আমাকে কষ্ট দিতে তোমার বাঁধে না শ্বেতা। কিন্তু হাওয়ায় বয়ে বেড়ানো অদৃশ্য বাবাকে কিছু বললে কাটা বিঁধে তোমার বুকে।

মেঘ এতো উত্তেজিত হয়ে গেল কেন? শ্বেতা বুঝতে পারছে না। অবাক হয়ে চেয়ে আছে মেঘের চোখের পানে।

: কেন তোমার এতো সংঘর্ষ শ্বেতা? আমাকে ভালোবাসলে তোমার ধর্মবোধে লাগে। আমার মতো ফালতু আর্টিস্টকে চোখে পরে না তোমার। কখনো তোমার কাছ থেকে এক ফোটা অনুপ্রেরণা পাই নাই। এক ফোটা ভালোবাসাও না। পাথর একটা। ধুপ-ধাপ শব্দ করে মেঘ চলে গেল।

শ্বেতা স্তব্ধ হয় বসে রইল।

: আমি ভালোবাসি না মেঘকে? মেঘ! তুমি শুধুই একজন শিল্পী। শ্বেতার নও। আমার মতাদর্শন, ধর্মবোধ তোমাকে আলাদা করে দিয়েছে। আমি দুঃখিত।

পাঁচ.

শ্বেতা আলমারি খুলে মায়ের গহনাগুলো বের করল। মাকে শ্বেতা দেখেনি কখনো। বাবার কাছে মানুষ। বাবাই সব। এত্তো গহনা মা পরতেন কিভাবে? শ্বেতা বুঝে উঠে না। গহনার মাঝে মাকে খুঁজে পায়। হীরের নেকলেসটা নাকি মায়ের খুব খায়েশের ছিল। আর রাখা যাবে না গহনাগুলো নিজের কাছে- ভাবতেই বুকটা হু হু করে উঠলো।

: মঈন চাচাকে ডেকে দে টুনটুনি।

: কি হল মা? দরকার?

: চাচা, এই গহনাগুলো বিক্রি করলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে, তাই না?

: হ্যাঁ  যাবে। কিন্তু কেন? এগুলো মা জননীর গহনা। কত স্মৃতি।

চোখের কোণের জল আর বুকের ভেতর ছিঁড়েখুঁড়ে তছনছ হওয়া উপেক্ষা করে শ্বেতা।

: গহনা পরতে ভালো লাগে না, চাচা। এগুলো বিক্রি করে মেঘকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। ওর এক্সজিভিশন হোক। নাম-যশ-খ্যাতি হোক। আমার কথা কিছুতেই বলবেন না। কিন্তু মা....

শ্বেতার মুখ দেখে আর কিছুই বলতে পারে না মঈন চাচা। দ্বিধান্বিত মুখে বের হয়ে গেল।

ছয়.

শেষ বিকেল। আজ মেঘ ইতালির উদ্দ্যেশে প্লেনে। মেঘ জানতেও পারল না- শ্বেতার জন্যই তার স্বপ্নপূরণ হতে যাচ্ছে। শ্বেতার ভালোবাসার গভীরতা চোখে পরল না মেঘের।

সাত.

বহুদিন পর চিঠি এলো-

মহারাণী,
আমি স্বপ্নের খুব কাছাকাছি। তবে নিজেকে যতই প্রতিষ্ঠিত করি না কেন- আমি ব্যর্থ। শ্বেত পাথর আমাকে আর্টিস্ট হিসেবে মেনে নিলো না। আমার আঁকা ছবি দেখলো না। ভালোবাসল না।

শ্বেত পাথর! কিভাবে আমি ইতালি এলাম, এক্সজিভিশন করলাম, সবটাই রহস্য রয়ে গেল। দেখো শ্বেতা, একদিন আসব। তোমার ধর্মবোধ, মতাদর্শন, সত্যের কাছে মাথা নত করে তোমাকে চাইব।

ইতি,
তোমার মেঘ।

বাক্স ভর্তি মেঘের আঁকা ছবির পাশে বসে শ্বেতা। মেঘ কি করে জানবে তা! শেষ বিকেলের চিঠি পড়ে, শ্বেতা মৌন হাসল।

লেখক: শায়লা শারমিন শুভ্রা, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।