ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৩ ১৪২৭

কর্মজীবী মায়ের কষ্ট

লায়লা নাজনীন

প্রকাশিত : ০৪:৩৭ পিএম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার | আপডেট: ০৪:৪০ পিএম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার

একজন নারীকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রোল প্লে করতে হয়, কখনো সে মেয়ে, কখনো সে স্ত্রী, কখনো বোন, কখনো মা, তবে এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন রোল হচ্ছে মায়ের রোল প্লে করা। একজন মা, সে শুধু নামে মাত্র একজন মা নন। সন্তানের জন্য সে কখনো শিক্ষক, কখনো ডাক্তা‌র, কখনো বন্ধু, কখনো মোটিভেশনাল স্পিকার।

আমাদের দেশে কর্মজীবী নারী মানে সে শুধু অফিসকর্মী না, সে গৃহিণীও বটে। অফিসের কাজের পাশাপাশি তাকে পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা এবং বাসার সমস্ত কাজ করতে হয়। আর যদি তার সন্তান থাকে তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই।

অনেক সময় দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী। দেখা যায়, দুজনেই অফিস থেকে একই সময়ে ছুটিতে বাসায় আসে। বাসায় ঢুকেই স্বামী সুন্দর করে হাত-মুখ ধুয়ে সুড়সুড় করে খাটে আরাম করে বসে। আর স্ত্রী বেচারি অফিস থেকে এসে কোনোরকম জামা-কাপড় চেঞ্জ করে হাত-মুখ ধুয়ে চলে যায় রান্না ঘরে। 

বিকেলের নাস্তা এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্ত্রী। আর সন্তান থাকলে তো কোনো কথাই নাই। অনেককে দেখা যায়, বাচ্চা কোলে নিয়েই কাজকর্ম করছে বা বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে কাজ করছে।

এতকিছুর পরেও দেখবেন আমাদের পরিবার এবং সোসাইটিতে কর্মজীবী মায়েরা সে সম্মানটুকু সবার কাছে পায় না। যদি সন্তান খারাপ রেজাল্ট করে তাহলে আত্মীয়-স্বজন পরিবার-পরিজন বলবে বাচ্চাকে মা সময় দেয় না এর জন্য রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। বাচ্চা অসুস্থ হলেও মায়ের দোষ হয়। মা চাকরি করার কারণে বাসায় থাকে না। সন্তানের কোনো পরিচর্যা নেই তাই বাচ্চা অসুস্থ হয়েছে। এছাড়া আবার কারো সন্তান খারাপ হয়ে গেলে সব দোষ মায়ের, মা কোনো ভাল শিক্ষা দেয়নি।

এসব কথা তো বাদই দিলাম, আমাদের দেশে এখনো বিভিন্ন জায়গায় সন্তান ছেলে-মেয়ে হওয়ার ক্ষেত্রে নারীকেই দায়ী করা হয়। ছেলে সন্তান হলে বাড়ির বউরা যতটুকু আদর-যত্ন পেয়ে থাকে, মেয়ে সন্তান হলে সেই আদর যত্ন পান না এখনো অনেক জায়গায়। বিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাকে এসব কথা লিখতে হচ্ছে ভেবে আমি নিজেও অবাক হচ্ছি। আমার সাথে পরিচয় আছে এরকম অনেক নারীর মুখে শুনেছি, মেয়ে সন্তান হবে জানতে পেরে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ মেয়ে সন্তান হয়েছে জানতে পেরে তাকে হাসপাতালেই দেখতে যাননি। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মেয়ে সন্তান হওয়ায় স্ত্রীর ভরণপোষেই বন্ধ করে দিয়েছে।

এভাবে দেখা যায়, একটা সময় সন্তানরাও তাকে অপছন্দ করা শুরু করে। সন্তানদের মধ্যে ধারণা জন্মায়, আমার মা ভালো না, আমাকে রেখে প্রতিদিন অফিসে চলে যায়, আমাকে সময় দেয় না, এরকম করতে করতে একটা সময় এসে কর্মজীবী মায়ের মধ্যেও এক ধরনের সংশয় তৈরি হয়। তখন নিজের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, আমি মনে হয় আমার সন্তানকে ঠিকমতো সময় দিতে পারছি না তার জন্য সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, খারাপ রেজাল্ট করছে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব মায়েরা চাকরি করে না, শুধু গৃহিণী তাদের বাচ্চারা অসুস্থ হয় না? তাদের ছেলে মেয়েরা কি খারাপ রেজাল্ট করে না? অনেক সময় দেখা যায়, যখন কোনো সন্তান ভালো কিছু করে তখন বাবা গর্ব করে বলে আমার ছেলে আমার মত হয়েছে, পাড়া-প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন বলে বাপকা বেটা, কই কখনো তো কেউ বলেনা মা কা বেটা। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- সন্তানের খারাপ কিছু হলে তার দায়ভার মায়ের আর ভালো সব কিছুই বাবার।

আবার মাঝে মাঝে দেখা যায়, মা তার সন্তানকে শাসন করলে সেটা নিয়েও পরিবারে অসন্তোষ দেখা যায়। পরিবারের বয়োঃজ্যৈষ্ঠদের কাছ থেকে অনেক কথা শুনতে হয়। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি। 

একজন কর্মজীবী মাকে শুধু বাড়িতেই নয়, অফিসেও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অফিস কর্তৃপক্ষের ধারণা, সন্তান হলে মেয়েরা অফিসে ঠিকমতো কাজ করবে না। দুইদিন পর পর বাচ্চার অসুস্থতা এসব কথা বলে ছুটি নেবে এবং তার কাজের প্রতি আগ্রহ কম থাকবে। অফিস কর্তৃপক্ষের এ ধরনের মনোভাবের কারণে অনেক সময় ওই মা প্রেগনেন্সি লিভে থাকলেও মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকে। মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, তার অবর্তমানে তার স্থানে অন্য কেউ জায়গা দখল করে নিলো কি না। সে কাজে ফিরলে আগের মতো তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে কী না। 

কর্মজীবী মায়েদের এত কাজ থাকে যে, সবসময় তাদের হিমশিম খেতে হয়। তাই তাদের কিছু প্রাথমিক পরিকল্পনা করা উচিত কাজ নিয়ে। কর্মজীবী মায়েদের কাজের সিডিউলটা করতে হয় সন্তানের কথা মাথায় রেখে। বাচ্চা ৬ মাস থেকে স্কুলে দেয়ার আগ পর্যন্ত মায়েদের প্রেসার একটু কম থাকে। যেমন বাচ্চাকে আয়া বা পরিবারের লোকদের কাছে রেখে যাওয়া। বাচ্চার ৩ থেকে ৪ বছর বয়স থেকে প্লে স্কুল দেয়া, ৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত স্কুলে দেয়া, বাচ্চা নাস্তা কি খাবে, বাসায় না থাকলে দুপুরে কি খাবে, এসব সাপ্তাহিক প্ল্যান করে রাখা উচিত। বাচ্চার পড়ার সময় তাল মিলিয়ে সে নিজে পড়াশুনা করে নিতে পারে বা অফিসের কাজ পেন্ডিং থাকলে বাসায় বসে করে নিতে পারে। আবার বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকলে সে সময়টাতে কিছু কাজ সেরে ফেলতে পারে।

প্রধান, মানবসম্পদ (বিভাগ), স্টার সিনেপ্লেক্স

এমবি/