ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭

মিয়ানমার কী আইসিজে’র আদেশ মানতে বাধ্য?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:৫৮ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২০ রবিবার

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সু চি

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সু চি

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং সেখানে গণহত্যার তদন্তে সহযোগিতার জন্য দেশটির সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে)। এ জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা নিয়মিত জানাতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে মিয়ানমারকে। তবে, আইসিজের এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। তাই এ মুহূর্তে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- মিয়ানমার কী এ আদেশ মানবে? আর না মানলেই বা কী হবে? 

গত ২৫ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন জুরিস্টের বৈশ্বিক জবাবদিহিতা উদ্যোগের জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা এবং সমন্বয়ক কিংসলে অ্যাবট সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, 'বৃহস্পতিবারের আদেশটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণহত্যা কনভেনশন অনুসারে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা পালন করছে কিনা তার ওপর আদালতের বিচারিক নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।'

অ্যাবট বলেন, 'মিয়ানমার এ আদেশ মানতে আইনত বাধ্য। এ লক্ষ্যে মিয়ানমার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা আদালতে নিয়মিত জানাতে হবে (প্রথমে চার মাস পর এবং এরপর ছয় মাস পর পর)। দেশটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার জন্য ভীষণ চাপে থাকবে। কারণ জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত এ আদেশ দিয়েছেন এবং এর এখতিয়ার দেশটি ইতিমধ্যেই মেনে নিয়েছে।' 

তবে মিয়ানমার জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতের আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে কী হবে? দেশটির দাবি, সেখানে গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি। তার ওপর দেশটির সাবেক সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে দশকের পর দশক দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেছে। 

এ বিষয়ে এশিয়া জাস্টিস কোয়ালিশন সেক্রেটারিয়েটের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ প্রিয়া পিল্লাই বলেন, মিয়ানমার এ আদেশ না মানলে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে এবং এটা তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে যেতে পারে। ফলে এ আদেশ না মানা মিয়ানমারের স্বার্থের প্রতিকূল হয়ে দাঁড়াবে। কেননা, এটা বিশ্ব আদালতের সর্বসম্মত আদেশ।

এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। আর এ নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে বলেই দীর্ঘ সময় ধরে চাপে থাকতে হবে মিয়ানমারকে। দেশটির প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও চাপ আসবে। যেমন- মালয়েশিয়া বলেছে, এ আদেশে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে এবং রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচার হওয়া দরকার।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িতদের অন্যতম আখ্যা দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, রাখাইন রাজ্যে অবস্থান করা বাকি রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় এ আদেশ গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ এমন আশঙ্কাও করছেন যে, আইসিজের আদেশকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আবারও হামলা চালাতে পারে। এক্ষেত্রে তারা উগ্র বৌদ্ধদেরও ব্যবহার করতে পারে।

রাখাইন রাজ্যের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লিওয়া বলেন, সরকার কী প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চির সরকার রাখাইনে ভয়াবহ অপরাধের কথা স্বীকার করলেও গণহত্যার অভিযোগ মেনে নেয়নি। আদালতও জাতিসংঘের তদন্তকারীদের রাখাইনে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আদেশ দেননি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনী গণহত্যার আলামত নষ্ট করে ফেলতে পারে। 

তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্তকারীদের অবাধে তদন্ত চালানোর সুযোগ থাকতে হবে বলেই মনে করেন লিওয়া।

অন্যদিকে, গত শুক্রবার লন্ডনের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউজের এশিয়া প্যাসিফিক প্রোগ্রামের পরিচালক ড. চম্পা প্যাটেল প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে এক নিবন্ধে লিখেছেন, এ আদেশ সত্যিই যুগান্তকারী। মামলাটি দেখালো, একটি ছোট্ট দেশও কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনে অন্য দেশকে জবাবদিহির আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমার এ আদেশ না মানলে নিরাপত্তা পরিষদ তা মানতে বাধ্য করার প্রস্তাব পাস করতে পারে। 

তবে, তাতে চীন হয়তো ভেটো দেবে বলেও আশংকা প্রকাশ করেন ড. চম্পা।

এ বিষয়ে মিয়ানমারে জাতিসংঘের প্রথম বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের সহকারী জন ফ্রেডারিক প্যাকার বলেন, ‘আদালতের সিদ্ধান্ত চীন আটকে দিতে পারে না। যদিও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন মিয়ানমারকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা, আদেশ মেনে চলতে মিয়ানমারকে রাজি করাবে চীন। কারণ, শেষ পর্যন্ত আইসিজের আদেশ লঙ্ঘন করার মানে জাতিসংঘের সনদকে চ্যালেঞ্জ করা। সেটা চীন করবে না।’

সেক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি অব্যাহত রাখতে হবে। যেহেতু এ ক্ষেত্রে নৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কাজেই সমস্যা সমাধানে আরও সোচ্চার হওয়া উচিত বাংলাদেশের।  

এনএস/