ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭

পর্বতে উঠতে হলে চূড়ার দিকে তাকাতে হবে

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:২৫ পিএম, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার

একটি রূপক গল্প দিয়ে শুরু করছি আজকের লেখা। একটি উট ও তার বাচ্চা গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিল। বাচ্চা উটটি জিজ্ঞেস করল, মা, আমাদের পিঠে এত বড় কুজ কেন? মা উটটি বলল আমরা মরুভূমির প্রাণী, তাই পানি সংরক্ষণের জন্যে আমাদের কুজ রয়েছে। বাচ্চা উটটি কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, আমাদের পা এত লম্বা ও পায়ের পাতা গোল কেন? মা উটটি বলল, মরুভূমিতে চলার জন্যে আমাদের পায়ের গঠন এরকম। বাচ্চা উটটি আবার জিজ্ঞেস করল, আমাদের চোখের পাপড়ি এত দীর্ঘ ও ঘন কেন? মা উটটি জবাব দিল, মরুঝড়ের সময় ধুলা-বালি থেকে বাঁচার জন্যে এরকম। তখন বাচ্চা উটটি বলল, আমাদের সবকিছুই তো তাহলে মরুভূমির জন্যে, কিন্তু আমরা এখন চিড়িয়াখানায় কেন? অর্থাৎ যেখানে থাকার কথা সেখানে তারা নেই। কারণ, শত শত দর্শনার্থীদের উট দেখার কৌতূহল মেটানোর জন্যে আজ তারা চিড়িয়াখানার চৌহদ্দিতে বন্দি।

আমরা মানুষেরা যে পরিমাণ সম্ভাবনা, সামর্থ্য নিয়ে জন্মেছি, সে অনুসারে যে সাফল্য ও সৌভাগ্যের জীবনে বিচরণ করার কথা মুক্তভাবে আমরাও কি সেখানে বিচরণ করতে পারছি?  সত্যিই কি আমরা মুক্ত, স্বাধীন? আমরা কি বন্দি নই? কোনদিক থেকে আমরা বন্দি আর কোনদিক থেকে আমরা মুক্ত? মানুষেরা বন্দি সংস্কারের কাছে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের কাছে, শোষক ও পরাভববাদীদের আরোপিত মিথ্যা ধারণার শৃঙ্খলে। সোজা কথায় বললে নেতিবাচকতার কাছে মানুষেরা বন্দি। আমরা দাসত্ব করছি ভয়-ভীতি, রোগ-শোক, লোভ-লালসা, কাপুরুষতা আর প্রবৃত্তি ও পণ্যের। ফলে প্রতিদিনের জীবন আমাদের কাছে হয়ে উঠছে ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর। প্রতিদিনের কাজ আমাদের কাছে ঠেকছে বিড়ম্বনা হিসেবে। শুধু প্রতিদিনের জীবন বা প্রতিদিনের কাজগুলো নয়, আমাদের পুরো জীবনের ব্যাপারে সৃষ্টি হচ্ছে একধরনের ভয়, আশংকা, অনিশ্চয়তা, হাহাকার এবং তার ফলে মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে ভাল্লাগে না বা অসহ্য, যত্তোসব-এ ধরনের বিরক্তিবোধক শব্দ। আর হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সবচেয়ে বেশি অলস পড়ে থাকছে আমাদের সবচেয়ে সেরা সম্পদ মস্তিষ্ক। কারণ, মস্তিষ্ককে চালায় যে মন, সেই মনই যে বন্দি! মন বন্দিত্বে পড়ে গেলে কী হয় আর মুক্ত হলে কী হয় তার দুটো উদাহরণ দিয়েছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তার ভাঙো দুর্দশার চক্র বইয়ে।

স্যারের লেখাটাই আমরা হুবহু পড়ে শোনাচ্ছি। তিনি লিখেছিলেন, আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে ছোটখাটো একটি লাজুক মেয়ে ছিল। দেখে মনে হত খুবই সাধারণ। হয়ত সাধারণই ছিল সে। আমাদের স্কুল পর্যায়ের বই পড়া কর্মসূচিতে সে যুক্ত ছিল। এখানে একটা আশ্চর্য বই পড়েছিল সে। বইটা জুলভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ। ৮০ দিনে ভূ-প্রদক্ষিণ বা বিশ্বভ্রমণ। বইটাতে ও পড়েছিল কী করে এর নায়ক ফিলিয়াস ফগ কত বিপদ জয় করে মাত্র ৮০ দিনে বিশ্বভ্রমণ করে ফিরে এসেছিলেন। পথে কত বাধাবিপত্তি, কত সংকট, বিপদ, দুর্ঘটনা! সব উৎরে মাত্র ৮০ দিনেই এই অসাধ্য তিনি সাধন করেন। বইটা মেয়েটাকে জ্বালিয়ে তুলেছিল। দেশে তখন এভারেস্ট অভিযানের তোড়জোড় চলছে। মেয়েটার মনে হয়েছিল, এত কষ্ট দুঃখ আর বাধা-বিপত্তির পরও ফিলিয়াস ফগ যদি সফল হতে পারেন, তাহলে আমি কেন চেষ্টা করলে একদিন এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পারব না? এর পরেই শুরু হল তার চেষ্টা। একসময় সে সত্যি সত্যি এভারেস্টের চূড়ায় গিয়ে উঠল। দেখুন স্বপ্নের কী শক্তি! আপনারা সবাই মেয়েটির নাম জানেন। নিশাত মজুমদার। বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী নারী। বলে না দিলে কে বিশ্বাস করবে যে, এই ছোটখাটো দুর্বল গড়নের লাজুক মেয়েটি এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছিল। দেখুন মানুষের উদ্যম, স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসের কী ক্ষমতা! পৃথিবীর দুর্ভেদ্যতম দেয়ালকেও সে ভেঙে ফেলতে পারে। ওর আগে এভারেস্টে উঠেছিল এ দেশের মাত্র একজন-মুহিত।

মুহিতের যাত্রার আগের একটা ঘটনাও মাঝে মাঝে মনে পড়ে। সেদিন একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা ওর হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিচ্ছিলাম। বক্তৃতার সময় দেখলাম ওর চেহারা বিমর্ষ। মনে হলো, কিছুটা যেন ভয়-পাওয়া। তেমনি বিমর্ষ গলাতেই ও সবাইকে বলল, আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। ওকে বললাম, দেখ মুহিত, এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গিয়ে পৃথিবীতে মরে কয়জন? সব মানুষই তো মরে বিছানায়। কই, বিছানায় যাওয়ার আগে তো প্রতিদিন আমাদের ডেকে বলে না, আমি বিছানায় শুতে যাচ্ছি, আমাকে আপনারা দোয়া করবেন। তাহলে যাত্রার মুহূর্তে তোমার গলা কেন বিষণ্ন? পর্বতে উঠতে চাইলে চূড়ার দিকে তাকাও, নিচের দিকে নয়। আপনারা জানেন কাজটা ও পেরেছিল। এভারেস্ট জয় করেছিল।

কেন এরা কাজটা পেরেছে? কারণ তাদের ভেতরে একটা তীব্র স্বপ্ন ছিল, সেটা হলো : আমি পারব। ছিল একটা দুর্জয় আত্মবিশ্বাস : আমি পারবই। আই মাস্ট গো টু দ্য টপ। এই স্বপ্নই তাদের ওখানে নিয়ে গেছে। আমাদের সবার বুকের মধ্যে অমনি একটা করে পর্বত আছে। আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত : ওই চূড়াকে জয় করব। ওর শীর্ষে উঠব। তাহলেই জীবনের সার্থকতা।

তাই স্যারের মতো করে আমরাও বলতে চাই-যদি রোগ কাবু করে সাময়িকভাবে, তাহলে বুকের মধ্যে সুস্থ হওয়ার আশাবাদ নিয়ে পর্বত দাঁড় করাতে হবে। যদি ব্যর্থতা এসে ভর করে, তাহলে বুকের মধ্যে সফল হওয়ার আশাবাদ নিয়ে পর্বত দাঁড় করাতে হবে। যদি অশান্তি নাড়া দেয় জীবনকে, তাহলে বুকের মধ্যে প্রশান্তির পর্বতকে দাঁড় করাতে হবে। তাহলেই সম্ভব রোগ, অশান্তি, না-পাওয়ার কষ্টগুলোকে মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া, জীবনকে নতুন করে শুরু করা। যে শক্তি দিয়ে জীবন নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তার নাম আত্মশক্তি। এই শক্তি দেখা যায় না, ধরা যায় না, কিন্তু এই শক্তির স্ফূরণ ঘটলে যে প্রাপ্তি, যে অর্জন জীবনে আসে তা সবাই দেখতে পান। যেভাবে সূর্য উঠলে সবাই দেখতে পান, কাউকে বলে দিতে হয় না যে, দেখ দেখ সূর্য উঠেছে আজ!

একটি মোমবাতি জ্বলে উঠলে যেমন ঘরটা আলোকিত হয়ে যায়, অন্ধকার দূর হয়ে আলো ছড়ায়; তেমনি আত্মশক্তি জেগে উঠলে জীবন থেকেও অন্ধকার দূর হতে শুরু করে, জীবন চলে আলোর দিকে, ভালোর পথে। 

তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার ভাষাতেই বলি তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। মনের ব্যায়াম মেডিটেশন গত ১০ বছরে আমার সবসময় মনে হয়েছে, আমি অসুস্থ। পাঁচ বছর আগে এই সমস্যাটা তীব্র আকার ধারণ করল। যখন জানতে পারলাম আমার মৃগী রোগ হয়েছে। ডাক্তারের একথা শুনে আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়লাম। অসুস্থতার কারণে আমি সবসময় বিব্রত বোধ করতাম। পুকুরে নামা যাবে না, আগুনের সামনে যাওয়া যাবে না ইত্যাদি বিভিন্ন বিধিনিষেধ মেনে চলতে হতো। ডাক্তারের পরামর্শে আমাকে উচ্চ মাত্রার ওষুধ খেতে হতো। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারি নি। কোনো উপায় না পেয়ে চিকিৎসা করাতে ভারতে গেলাম। চেন্নাইয়ের বিখ্যাত তিন জন বিশেষজ্ঞকে দেখালাম। একজন ডাক্তার ওষুধের পাশাপাশি ব্যায়াম করতে বললেন, অন্য জন প্রার্থনা করার প্রয়োজনীয়তা বোঝালেন। তবে তিন জনের একটি পরামর্শ একই ছিল। তারা প্রত্যেকেই বললেন, মেডিটেশন করুন। কারণ আপনার অসুখটা শরীরে নয়, এটা আপনার মনের রোগ। দেশে ফিরে আমি মেডিটেশন কোর্সে অংশ নিলাম। 

এই যে রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনা থেকে মুক্তি পেয়েছেন এরা, কেন? কারণ, রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনার বেশিরভাগই মনোদৈহিক। মনের দুঃখ কষ্ট ক্ষোভ হতাশা গ্লানি জমে তা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা-বেদনা রূপে প্রকাশ পায়। মাথাব্যথা, মাইগ্রেন, ব্যাকপেইন, বাতব্যথাসহ ক্রনিক রোগগুলোও তা-ই। মেডিটেশনে এলে মনের একেবারে গভীর থেকে অপ্রয়োজনীয় এ জঞ্জালগুলো বেরিয়ে যায়। বইতে শুরু করে নিরাময়ের সুবাতাস। বহু বছর ধরে যারা রুকু-সেজদা দিয়ে নামাজ পড়তে পারেন নি, তারাও আবার শুরু করেন রুকু-সেজদা দিয়ে নামাজ। শুধু কি নিরাময় লাভ? ধূমপান এলকোহল ড্রাগ নেশা ও মাদকদ্রব্য বর্জন এবং যে-কোনো বদ-অভ্যাস থেকে মুক্তিতে কোর্স দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। 

মেডিটেশনকে বলা যায় মনের ব্যায়াম। নীরবে বসে সুনির্দিষ্ট অনুশীলন বাড়ায় মনোযোগ, সচেতনতা ও সৃজনশীলতা। মনের স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে। প্রশান্তি ও সুখানুভূতি বাড়ানোর পাশাপাশি ঘটায় অন্তর্জাগৃতি। আর কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশন প্রক্রিয়া সঞ্জীবিত হয়েছে প্রাচ্যের সাধনা আর আধুনিক বিজ্ঞানের নির্যাসে। সাধকদের সাধনা ও মনোবিজ্ঞানের প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের ফলে সহজে মেডিটেটিভ লেভেলে পৌঁছে আত্মনিমগ্ন হওয়া যায়। গভীর আত্মনিমগ্নতা আত্মশক্তির জাগরণ ঘটায় ভেতর থেকে। আর অন্তরের এই জাগরণই বদলে দেয় জীবনের বাকি সবকিছু।

যেমন, এক ছোট্ট মেয়ে কোর্স করে বলছিল-“আমি শিক্ষার্থী! আলোর অভিযাত্রী! বড় কিছু করার জন্যেই আমি পৃথিবীতে এসেছি!” আর বড় কিছু করতে হলে আগে নিজেকে তৈরি হতে হবে। তাই আমার মনছবির সেই বড় কাজ করার জন্যে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছি। কোর্সে এসে আমি কীভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয় তা শিখেছি। তাই আমি দুই ঘণ্টার পড়া এক ঘণ্টায় পড়তে পারছি। আগে পড়ালেখায় একদমই মন বসাতে পারতাম না। কারণ আমার পড়তে ভালো লাগত না। আর এখন পড়ালেখা করতে আমার খুবই ভালো লাগে। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকে এই মেয়েটির মতো অনেক শিক্ষার্থীই মনোযোগ দিয়ে পড়, রুটিন করো, সময়মতো টেবিলে বসো-এগুলো শুনে আসছে তাদের গুরুজনদের কাছ থেকে। কিন্তু পড়ার প্রতি টান অনুভব করে নি সেভাবে। কোর্সের দ্বিতীয় দিনে গুরুজী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে যে কথাগুলো বলেন, সেগুলো শুনেই তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে শুরু করে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, প্রতিদিনের নিয়মিত মেডিটেশন সবধরনের মানুষের জন্যে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্যে দারুণ কিছু সুফল বয়ে নিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, নানা ধরনের মানসিক চাপ মোকাবেলা করতে এবং শিক্ষার্থী জীবনটাকে আরো আনন্দপূর্ণ করে তোলে নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা। শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন গবেষণা থেকে বেশ চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া গেছে। অঙ্ক ও ইংরেজিতে ভালো করতে পারছিল না ক্যালিফোর্নিয়ার এমন ১৮৯ শিক্ষার্থীর ওপর ২০০৯ সালে একটি গবেষণা চালানো হয়। তিন মাস ধরে প্রতিদিন দুবেলা তাদেরকে মেডিটেশন করতে বলা হয়। ফলাফল চমৎকার। দেখা গেল তিন মাস পর এদের মধ্যে ৭৮ জনই শুধু অঙ্ক আর ইংরেজিই নয়, সব বিষয়েই আগের চেয়ে ভালো করছে। বাকিরাও ভালো করছিল তাদের চেয়ে, যারা এই মেডিটেশন প্রোগ্রামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

যারা সংসারের দায়িত্বে আছেন তাদের প্রশ্ন-ভালো থাকব কীভাবে? মূল্যস্ফীতির এই যুগে যেখানে সর্বত্র ত্রাহি মধুসূদন দশা সেখানে সামনে এগোনোর স্বপ্ন দেখব কীভাবে? বসের ঝাড়ি, দোকানদারের ভ্রুকূটি, পাওনাদার-বাড়িওয়ালার ধমকের পর স্ত্রীর দুটো কথা বা সন্তানের একটা আবদারও যখন অসহ্য মনে হয়, সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে পালাতে ইচ্ছে করে, তখন স্বস্তি-নিরাপত্তা পাব কোথায়?

আরকে//