ঢাকা, রবিবার   ০৫ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২০ ১৪২৭

সহনশীল না হলে ‘করোনা’ আরও রুঢ় হবে

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

প্রকাশিত : ০৬:১৪ পিএম, ৩১ মার্চ ২০২০ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৬:১৭ পিএম, ৩১ মার্চ ২০২০ মঙ্গলবার

পৃথিবী আজ বিপর্যয়ের মুখে। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তি আজ অচলই মনে হচ্ছে। প্রযুক্তি কোন কিছু্ যেন করে উঠতে পারছে না। এভাবেই চলেছে। করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক নতুন রোগ বিশ্বকে সমান তালে পদঘাত করে চলছে। লাখের পর লাখ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছেন সহস্রের 'পর সহস্র মানুষ। বাংলাদেশে মার্চ মাসের শুরুতে আক্রমণ করে এ ভাইরাস। ভাইরাসটা অনেক ভয়ঙ্কর বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে। উন্নত দেশগুলো এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।

যুগে যুগে মানবজাতির উপরে এমন মহামারি ও বিপর্যয় বিভিন্ন সময় এসেছে বলে আমরা জানি। এটাও জানি যে, এ দুর্যোগও কেটে যাবে। হয়ত আরও অনেক মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের গুনতে হবে। করোনা ভাইরাস তো একটা ভাইরাস মাত্র, তাকে তাড়াতে সক্ষম হলে সে চলে যেতে বাধ্য হবে কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের মানবিকতা, সম্মানবোধ ও অহিংসা, সহিষ্ণুতা কোথায় যেন উবে গেল। এখন প্রশ্ন জাগে আমরা আসলেই কি কখনও অমানবিক, অসহিষ্ণু, অপদমিত জাতি ছিলাম কিনা। এ প্রবন্ধে অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি অনুচ্চারিত থাকবে, উচ্চারিত হবে নিজের দেশের কথা।

দেশের অভ্যন্তরে প্রথম একজনের শরীরে করোনা ধরা পড়লে পাল্টাতে থাকে সামগ্রিক চিত্র। এটা সত্য, প্রাণঘাতি এ ভাইরাসের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ দিগ্বিদিক ছুটবে, নিরাপত্ত চাইবে, স্বস্তি খুঁজবে। কিন্তু এ দিগ্বিদিক ছোটার কারণে অমানবিকতা এবং অসহিষ্ণুতা ধরা দিলে তাতে ভাইরাসকে দোষ দেওয়া যাবে কি? দেশের মানুষ যতটুকু না ভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝে আতঙ্কিত তার থেকেও অস্বাভাবিকভাবে উৎসাহ নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ায় আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা মেনে নিতে হয়। আমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবস্থা ও অবস্থানের সমালোচনা করতে পারি, প্রতিবাদ করতে পারি। তবে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছুটা দায়িত্ব রয়েছে। দেশ তথা বিশ্বের এ পর্যদস্তু অবস্থায় যদি আমরা মার্জিত অচরণ করতে না পারি তো এ সংকট বাড়বে বৈ কমবে না।

প্রথম যদি বলি তো ১৮ মার্চ সরকার দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করল। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ বন্ধ ও ছুটি আরও বাড়বে বলে আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ, ২০২০) প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে দেশের ভিতরে অবকাশকালীন ভ্রমনের হিড়িক পড়ে যায়। যদিও পরবর্তিতে চাপ প্রয়োগ করে সকলকে ঘরে ফেরানো হয়। পরে দেওয়া হলো সাধারণ ছুটি। মানুষ দলে দলে গ্রামে ফিরে গেল। কিন্তু কেন? এখানে সরকারের সঙ্গে আমরাও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছি। সব কিছু বন্ধ করে তারপর ছুটি ঘোষণা করলে এমনটি হতো না। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও পরীক্ষা না করে বলা যাবে না এগুলো করোনা নাকি স্বাভাবিকতা। কিন্তু করোনা পরীক্ষা নামক আলাদিনের জাদুর চেরাগ তো কেবল মাত্র সরকারের আইইডিসিআর নামক ‘সত্যানন্দ’র হাতে। এ প্রতিষ্ঠান বললে করোনা, না বললে নয়। কয়েকজনকে পরীক্ষা করে কিভাবে বলা যায় যে, দেশে করোনা রোগী নেই। বলা যেতে পারে অমুক সংখ্যকের মধ্যে অমুক সংখ্যক করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। যা হোক সমালোচনা বা আলোচনা যা-ই করি না কেন আপাতত আমরা এ প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন গতি নেই। এ রোগকে কোনভাবে কিছু করা যাবে যাচ্ছে না বা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। যতটুকু করা যাবে তা হলো, প্রতিরোধ করা। মানে সতর্ক থাকা। এ সতর্কতা কিভাবে তা আমরা জানি। দেশের ১০০ ভাগ মানুষ না জানলেও ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ জানে। বাকি যারা জানেন না সেটা তাদের সীমাবদ্ধতা নয়। আমরা অক্ষরজ্ঞান পেয়েছি বলে তারা সে সুযোগ পাননি। তাই আমাদের দায়িত্ব বাকিদের সতর্ক করা। তাদেরকে বুঝিয়ে বলা। একবার বুঝে না, দুই বার বুঝে না। শতবারও নয়, বা সহস্র বার। গণনার দরকার নেই, যে পর্যন্ত না বুঝবে সে পর্যন্ত বুঝিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় আমাদের এ শিক্ষা একদিন আমাদেরকেই পরিহাস করবে।

অবশ্যই এ বুঝানোর ধরণ যেন যশোরের মনিরামপুরের সহকারী কমিশনার-ভূমি (সদ্য প্রত্যাহারকৃত) সাইয়েমা হাসানের মতো না হয়। এখানে একটু বলে রাখি, দেশের যে পরিস্থিতি চলছে এ সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা চাপ প্রয়োগ করবে এটা স্বাভাবিক। তবে এটা অস্বাভাবিক যে, চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ ফৌজদারি অপরাধে অপরাধী হচ্ছেন। কেউ এ সময় অযথা যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাকে আটক, গ্রেফতার, কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড দেওয়া আইনের প্রয়োগ কিন্তু অন্য কিছু নয়। যেমন, কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা বা ধরে ধরে লাঠি চার্জ। এটা মানবাধিকার ও সংবিধানের অবমাননা। একজন অপরাধ করলে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা বা কান ধরানোর আইনি বৈধতা আমার জানা নেই। তবে এতটুকু জানি, বিষয়গুলো অবৈধ। কোন অধিকারে ম্যাজিস্ট্রেট এ কাজ করবেন? যেমন একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ভিডিও দেখলাম। সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এক প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে কোয়ারেন্টাইন না মানার জন্য তাকে অর্থদণ্ড করেছেন। কিন্তু যখন তিনি (প্রবাসী) দণ্ডের টাকা আনতে ঘরের ভিতরে গেলেন তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উক্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক তার বিরুদ্ধে বিষেদগার করেছেন। সঙ্গে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও উপস্থিত সকলকে নিয়ে বললেন, দেখলেন কত বড় ননসেন্স, কত বড় খারাপ লোক। আবার হাফপ্যান্ট পড়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছিল, বিচারক (ভ্রাম্যমাণ আদালতের) এমন ব্যবহার করতে পারেন কি? এটা করে তিনি ঐ অভিযুক্তর সম্মানহানী করেননি? তার অপরাধের জন্য তো শাস্তি তিনি দিলেন তবে তাকে মর্যাদাহানী করার অধিকার বা অইনগত বৈধতা ম্যাজিস্ট্রেটকে কে দিল? এই হলো আমাদের শিক্ষার ধরণ। এখানে কি হওয়ার কথা ছিল, অন্যরা এমন মন্তব্য করলেও সকলকে বুঝানোর দায়িত্ব ঐ ম্যাজিস্ট্রেটের ছিল। সচেতন করা এবং আইনের ভিতরে থেকে আবারও সতর্ক করা। সেটা না করে উৎসুক জনতা মতো তিনিও মহাভারতের দুর্যোধন’র মতো আর্বিভূত হলেন। এটা সত্য অনেক জায়গায় ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্যান্য কর্মকর্তা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষকে ভালোবাসা ও সম্মান দিয়ে সচেতন করে তুলছেন।

দেশের কি হচ্ছে? বার্তা কক্ষে অবস্থানকালীন সময়ে বা বাইরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে প্রতিদিনই দেখছি বা শুনছি অথবা খবর পাচ্ছি সারাদেশের চিকিৎসকরা যেন একটু পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জ্বর, সর্দি, কাশি বা অন্যান্য স্বাভাবিক রোগ নিয়ে হাসপাতলে বা ক্লিনিকে গেলে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন না। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো? আমার এতকাল ধরে জেনে আসছি, আল্লাহর আগে শেষ ভরসা চিকিৎসক। কিন্তু তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন। প্রথম দিকে পিপিই’র সংকট থাকলেও এখন নেই। সরকার বা বিভিন্ন সংস্থা সারাদেশে প্রয়োজনীয় পিপিই সরবারহ করছে। করোনা বা অন্য কোন রোগ নিয়ে এ সময় হাসপাতাল রোগী আসলে হাসপাতাল থেকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া বা চিকিৎসক চিকিৎসা না দিলে মানুষ যাবে কোথায়? ধরুন, আমরা সাংবাদিকরা যদি সত্য সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করতে না পারি, পুলিশ যদি যথাযথ নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে এত এত সাংবাদিক বা পুলিশ থাকার দরকার কি? তেমনি চিকিৎসার সময় চিকিৎসকরা এমন ভান ধরলে চিকিৎসকের প্রয়োজন আছে কি? সমালোচনা বাদ দিয়ে যদি বলি, অনেক চিকিৎসকই চিকিৎসা দিচ্ছেন তাহলে সেটা মিথ্যা বলা হবে না। এটা সত্য যে, চিকিৎসকেরও মৃত্যু ঝুঁকি আছে। সংক্রমিত হওয়ার ভয় আছে। তারও তো সন্তান ও পরিবার আছে সেক্ষেত্রে তিনি কেন ঝুঁকি নিতে চাইবেন। তবে সরকার বা বিভিন্ন মহল চিকিৎসকের পাশে আছে। এই চিকিৎসকরাই যখন চরম ক্রান্তিকালে রোগী সুস্থ করে তোলেন তখন তাকে বা তাদেরকে মহান সৃষ্টিকর্তাই প্রতিনধি মনে হয়।

দেশে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে ধারণাই ছিল না আমরা এত ‘সচেতন’! সচেতনতা এসে পড়ল মৃত ব্যাক্তির দাফনের? করোনায় আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে তো কবরস্থানে কবর দেওয়া যাবে না। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বাদ সাধেন, ‘এখানে আমরা থাকি, আমাদের ছেলে পুলে আছে। এখানে কবর দিলে আমাদের কি হবে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার বারবার বলছে, করোনায় মৃত ব্যক্তিকে কবর দিলে কোন সমস্য নেই। এতে করোনা ছড়ায় না। কে শোনে কার কথা। কিছু পাতি নেতা নেতৃত্ব দিয়ে এমন অরাজকতা সৃষ্টি করছেন। আচ্ছা, তাদের অমুক অমুক কবরস্থানে কবর না দিতে দিলে কোথায় দাফন করা হবে। কয়েকটা কবরস্থানের ফটকে ‘করোনায় মৃত বক্তির কবর দেওয়া যাবে না’ মর্মে ব্যানারও দেখেছি। কিন্তু কেন? আমরা কি পার্শ্ববর্তী কোন জাতির মতো অন্ধকারচ্ছনতায় ডুবে গেলাম? আমরা কি সাধারণ বিজ্ঞান বুঝি না? আমাদের ভিতরে কি মানবিকতা নেই? শেষমেষ গোঁড়ামি কিভাবে ভর করল! বাংলাদেশে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আসুন আমরা এমন গোঁড়ামি না করি। আগামীকাল করোনায় আমার বা আপনার মৃত্যু হলে আমাদের কবর কোথায় হবে? আপনার বা আমার সন্তানই আমাদেরকে কবরস্থ করাকালে ‘কবরস্থানে কবর দেওয়া যাবে না’ বলে রুখে দাঁড়াবে না তো?

দুর্যোগ কেটে যেতেই আসে। করোনা নামক প্রাণঘাতি এ ভাইরাসও এক সময় বিলীন হয়ে যাবে। তবে ধ্বংসযজ্ঞের সময় আমরা সহনশীল না হলে আমাদের প্রতি করোনার আচরণ আরও রূঢ় হবে। রূঢ় বলতে আমরা সচেতন বা সহিসষ্ণু না হলে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। আমরা এতকাল ধরে দেশের খেয়ে যে শিক্ষা নিয়েছি তা কাজে লাগানোর সময় এখনই। এ মানবজাতির কল্যাণে কাজ করতে না পারলে মানুষ নামক দেহটা একটা বিশাল মাংস পিন্ড ছাড়া কিছুই নয়। এ সময় দেশের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক বাহিনী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বিভিন্ন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। করোনা নামক এক অদৃশ্য মানবশত্রুর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি হয়েছে আরও কত হবে তা আমরা কেউ জানি না। তবে এতটুকু জানি আমাদের কর্মকাণ্ডই মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারে। বাতাসে শুধুই যেন মৃত্যুর আভাস পাচ্ছি। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবি আজ কত? কাজের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে দেখি, ফাঁকা নগরী হাহাকার করছে। মৃত্যুর ভয়ে মানুষগুলো কোথায় যেন পালিয়েছে। কখন কে মরবে কেউ জানেন না। কাজ শেষে সন্ধ্যা অথবা গভীর রাতে বাসায় ফিরে ভাবি, যাক আজ বাসায় ফিরলাম কাল সুস্থ হয়ে বের হতে পারলেই হলো। এক একটা দিন যায় আর এক একটা দিন মৃত্যুর ভয়টা বাড়তে থাকে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে আমাদের রক্ষা করুন। সকলের প্রতি আমরা ভালোবাসা বিলেয়ে দেই। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই। মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দেই। তবেই আমরা জয়ী হবো।

লেখক: মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। ই-মেইল: shafi9312@gmail.com

এসি