ঢাকা, বুধবার   ১৫ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ৩০ ১৪২৭

করোনায় প্রশ্নবিদ্ধ ডব্লিউএইচও’র কার্যক্রম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:২৩ পিএম, ৯ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস এখন বিশ্বের আতঙ্ক। কিন্তু শুরু থেকেই ভুল তথ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ডব্লিউএইচও’র কার্যক্রম। তারপরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ডা. তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এই বৈশ্বিক মহামারীর সঙ্গে রাজনীতিকে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

শুরুতে সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক পরার বিষয়টি নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় অনেক। এ বিভ্রান্তির উৎস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ডব্লিউএইচওর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, শুধু সংক্রমণের লক্ষণ থাকলে (যেমন কাশি) বা সংক্রমিত কারো দেখাশোনা করার সময় মাস্ক পরতে হবে। সেক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্যকর্মী, আক্রান্তের পরিচর্যাকারী ও শ্বসনতন্ত্রের সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদেরই মাস্ক পরতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্ক পরিহিত অবস্থায় সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় প্রায় পাঁচ গুণ।

এক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, শুধু মাস্ক পরার মাধ্যমেই সংক্রমণ থেকে পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায়, তা-ও নয়। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস মূলত যে বস্তুটির মাধ্যমে ছড়ায়, হাঁচি-কাশি বা কথা বলার সময় শ্বসনতন্ত্র থেকে নির্গত ক্ষুদ্র জলকণা; সেটিকে আটকানোয় মাস্ক অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া এটি শুধু সুস্থ ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেয় না, আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর।

ফলে সংক্রমণ ঠেকানোয় মাস্কের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ডব্লিউএইচও ঔদাসীন্য দেখালেও এশিয়ার দেশগুলো সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে মাস্কের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করতে পারেনি। এমনকি চীনও সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুরু থেকে অবস্থান ছিল, নাগরিকদের সবার মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের পর ওয়াশিংটনও এখন মার্কিন নাগরিকদের মাস্ক ব্যবহার করতে বলছে।

ভাইরাসটি ছড়ানোর বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ। সে সময় চীনা চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং ২০০৩ সালের সার্স মহামারীর জন্য দায়ী ভাইরাসটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নভেল করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সম্পর্কে নিজ দেশের চিকিৎসকদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ কথা বলায় ওই চিকিৎসককে কর্তৃপক্ষ সতর্কও করে দিয়েছিল। পাশাপাশি এ নিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বেশকিছু চিকিৎসককে আটকও করেছিল চীনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ছড়াতে থাকার কারণে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি দৃশ্যমান হতে থাকে জানুয়ারির শুরু থেকেই। গত ১৪ জানুয়ারি নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে প্রথম এক আশ্বাসবাণী দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ডব্লিউএইচওর অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া এক টুইট বার্তায় সে সময় চীনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বলা হয়, উহানে শনাক্ত নতুন করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় না।

যদিও এরই মধ্যে খোদ ডব্লিউএইচওর বিভিন্ন স্থানের পরীক্ষাগারেই কয়েকজনের নভেল করোনা ভাইরাসে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

এর কিছুদিন পর ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গ্যাব্রেইসাস বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখান থেকে ফেরার পর মহামারী মোকাবেলায় চীনের পদক্ষেপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ‘তথ্য ভাগাভাগিতে’ চীনের ‘খোলা দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।

চীনা ডা. লি ওয়েনলিয়াং এতে আপত্তি তোলারই সুযোগ পাননি। কর্তৃপক্ষের ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা পরিস্থিতি কতটা খারাপ করে তুলতে পারে, তার শিকার হয়েছেন তিনি। নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে এরই মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তিনি।

গত ২৩ জানুয়ারি ডব্লিউএইচওর জরুরি কমিটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হবে কিনা সে বিষয়ে আলোচনায় বসে। সে সময় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও গোটা পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীনের অবস্থান নিয়ে বেশ সমালোচনায় মুখর ছিলেন। কিন্তু ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তখনো জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিপক্ষে মত দিয়ে গেছেন। কমিটির অন্য সদস্যদের আপত্তিতেও কর্ণপাত করেননি তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বিলম্বিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি। গত ৩০ জানুয়ারি শেষ পর্যন্ত এ জরুরি অবস্থা ঘোষণা হলেও ডব্লিউএইচও পরিচালক বিষয়টি নিয়ে চীনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থেকেই যান।

সার্স মহামারী-পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এখতিয়ার ও কার্যপরিধি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির (আইএইচআর) সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে ডব্লিউএইচওকে শুধু সদস্য দেশের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য সূত্রের দেয়া তথ্য কাজে লাগানোরও ক্ষমতা দেয়া হয়। একই সঙ্গে মহামারী নিয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সদস্য দেশকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাও দেয়া হয় এর মাধ্যমে। এতে ডব্লিউএইচর মহামারী নিয়ন্ত্রণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের পথে বড় একটি বাধা দূর হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মহামারী আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে তথ্য গোপনের এক ধরনের প্রবণতা বরাবরই দেখা গেছে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ডব্লিউএইচওর নিজস্ব উপায়ে কার্যক্রম চালানোর পথে বড় একটি বিপত্তি অতিক্রম করা সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রাপ্ত ক্ষমতা ও সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে শুরু থেকেই অন্ধের মতো পথ চলেছে ডব্লিউএইচও। এক্ষেত্রে চীনের বিভিন্ন বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করে গেছে সংস্থাটি।

ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের এক গবেষণা বলছে, চীন যদি তথ্য চাপানোর প্রবণতা না প্রদর্শন করত এবং মহামারী ঠেকানোয় শ্লথ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন না করত, তাহলে বিশ্বব্যাপী মহামারী ছড়ানোর গতি নেমে আসত বর্তমানের ২০ ভাগের এক ভাগে।

সে হিসেবে এ মহামারী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষে অনেক কম। সংস্থাটি শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সীমা আরোপের বিপক্ষে মত দিয়ে গেছে। এ বিষয়ে টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গ্যাব্রেইসাসের বক্তব্য ছিল, এতে শুধু ভয় আর শঙ্কা বাড়বে। জনস্বাস্থ্যের তাতে লাভ হবে সামান্যই।

ডব্লিউএইচওর এ অবস্থান যে শেষ পর্যন্ত ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে, তার অনেক উদাহরণও এখন বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থিত।

সূত্র : বিশ্ব গণমাধ্যম 

এসএ/