ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ৪:৪০:০৩

ঠাকুরগাওয়ের জাঠিভাঙ্গা গনহত্যা দিবস আজ (ভিডিও)

ঠাকুরগাওয়ের জাঠিভাঙ্গা গনহত্যা দিবস আজ (ভিডিও)

আজ ২৩ এপ্রিল ঠাকুরগাওয়ের জাঠিভাঙ্গা গনহত্যা দিবস । ৭১’র এই দিনে পাকি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ৩ হাজারেরও বেশি নীরিহ মানুষকে হত্যা করে । গণহত্যার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার ও শহীদ পরিবারের মযার্দার দাবী জানিয়েছেন শহীদদের স্ত্রী-সন্তানরা। ৭১’র ২৩ এপ্রিল। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অত্যাচারে ভিটে ছেড়ে ভারত পালিয়ে যাচ্ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। শরণার্থী ঢল সীমান্ত পেরুনোর আগে একটু বিশ্রামের জন্য আশ্রয় নিয়েছিল জাঠিভাঙ্গায়। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং রাজাকাররা। বেছে বেছে পুরুষদেরকে নদী তীরে নিয়ে যায় এবং লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ভয়াবহ এই গণহত্যার স্মরণে ১৯৯৬ সালে সেখানে একটা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে নির্যাতনের শিকার বিধবা ও তাদের সন্তানরা আজো কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়নি।
স্বাধীনতা যুদ্ধে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিকা

একটি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস একটি অনন্য সাধারণ দলিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন আত্মদানের গৌরবগাথা। বাঙালির হাজার বছরের যুদ্ধজয়ের ইতিহাস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এ বিজয় ইতিহাসের পাতায় সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে আমাদের ত্রিশ লাখ শহীদানের আত্মদানের বিনিময়ে। দু’লাখ মা-বোনের সস্মানহানি করুণ আর্তনাদ মিশে আছে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়। এক অদ্ভুত তত্ত্ব ‘দ্বিজাতি তত্তে¡র’ ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিমারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সামরিক ও প্রশাসনিকসহ সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করে শোষণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে বিদ্রোহের জন্ম হয়। শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে এ বাংলার সংগঠিত জনগণ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘাতপ্রতিঘাত সংঘাতময়তার পথ অতিক্রম করে অসীম সাহসিকতার সাথে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে। এ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কবর রচিত হয়। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যয়নসমাপ্ত ও অধ্যয়নরত অসংখ্য ছাত্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হাফিজ উদ্দিন: শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল শেরপুরের সাদিপুর ব্রিজে সম্মুখ সমরে সিলেট বিভাগের প্রথম শাহাদাত বরণকারী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। নিঃসন্তান হাফিজ উদ্দিন ছিলেন এক অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মোজাহিদ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আর্মি ভেহিক্যাল মেকানিক পদে শিয়ালকোটে চাকরিরত ছিলেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে এসে সংসার জীবনের মায়া পরিত্যাগ করে শত্রুতা বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব বড়চর তাঁর গ্রামের বাড়ি। তাঁর বাড়ির কাছে পূর্ব বড়চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক সংলগ্ন তাঁরই সহযোদ্ধা শহীদ মহফিল হোসেনের সমাধির পাশে এ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলী মিয়া চৌধুরী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনের পুরোভাবে থেকে বুকের মধ্যে স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১-এ ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে ফিরে এসেছিলন তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের খোলা সবুজ চত্বরে। তিনি আমাদের প্রিয় মেধাবী সংগঠক অনলবর্ষী বক্তা, ছাত্রনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া চৌধুরী। মরহুম আলহাজ্ব তারা মিয়া চৌধুরীর ঔরসে ও মরহুমা ফিরুজা বেগমের গর্ভে জন্ম নেয়া বড় ছেলে আলী মিয়া চৌধুরী ১৯৪৪ সালে চুনারুঘাট থানার তাউশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আলী মিয়া চৌধুরী ১৯৬৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে বৃন্দাবন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। বাঙালি জাতিসত্তা রক্ষার মিছিলে যুবক আলী মিয়া চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নিজের অর্জনের কথা ভুলে যান। লক্ষ কন্ঠে গগনবিদারী আওয়াজ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা, গোলটেবিল না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ এবং জয় বাংলা ইত্যাদি সেøাগানের কাছে তিনি স্বাধীনতার উদ্দীপ্ত চেতনায় নিজেকে সঁপে দেন। অতঃপর আত্মচেতনার টানে মা-মাটি-মানুষ আর প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ইস্পাতকঠিন আহŸানে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধের ২ নং সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সম্মুখ সমরের যোদ্ধা হিসেবে। এর পরের ইতিহাস যুদ্ধ, কেবল যুদ্ধ। জীবন বাজি রেখে তুমুল যুদ্ধ। এবং সবশেষে বিজয়। রণাঙ্গন থেকে স্বাধীন দেশে ফিরে প্রশাসনিক ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০০১ সালে সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে স্ত্রী ও এক ছেলে এক মেয়ে রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অসীম সাহসী ও মেধাবী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া চৌধুরী। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক মিয়া : ৭৩ বছর বয়স্ক হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক মিয়া অসুস্থ অবস্থায় নুরপুর ইউনিয়নের শরীফাবাদ গ্রামে তার পৈতৃক বাড়িতে বর্তমানে দিন কাটাচ্ছেন। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, এই তো সেদিনের কথা। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলে ১৯৫৭ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই ১৯৬৩ সালের এসএসসি পাস করি। কত কথা মনে পড়ে। হায়, দিনগুলো কেমন করে হারিয়ে যায়। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে শরীর-মন জেগে উঠেছিল। আর তাই মুক্তিযুদ্ধে গমন। ৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এনামুল হকের অধীনে শমসেরনগর, ভানুগছা, কমলগঞ্জ অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। তারুণ্যের উদ্দীপনায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবন ছিল দেশপ্রেমে ভরপুর। ফলে শক্তিশালী পাক হানদার বাহিনী আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা একের পর এক ওদের শক্তিশালী ঘাঁটি তছনছ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। এই তো আমার দেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ। বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর পাল চৌধুরী : শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার দাউদনগর বাজারের ডা. মৃত গিরিন্দ্র কুমার পাল চৌধুরী ও মৃত নির্মলা পাল চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র রণবীর কুমার পাল চৌধুরী ১৯৫৯ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করে সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) থেকে ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তিনি ঢাকা থেকে শায়েস্তাগঞ্জ নিজের বাড়িতে চলে আসেন। ২৫ মার্চের পর সারা বাংলার মতো শায়েস্তাগঞ্জও মিছিল আর আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়। ২৯ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী বিকাল অনুমান আড়াইটায় শায়েস্তাগঞ্জে প্রবেশ করলে রণবীর পাল বাইসাইকেলে চড়ে বন্ধু মন্টুকে নিয়ে ভারতের খোয়াই শহরে গিয়ে পৌঁছান। অতঃপর আগরতলায় গিয়ে ত্রিপুরার তদানীন্তন গভর্নর বালেশ্বর প্রসাদের সহধর্মিণী উমা প্রসাদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১-এর অক্টোবর মাসে প্রশিক্ষক কে ভি সিং-এর পরিচালনায় লেবুছড়া ক্যাম্পে গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করে ৩ নং সেক্টরের অধীন সাবসেক্টর কামান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তেলিয়াপাড়াসহ অসংখ্য সফল অপারেশনে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর কুমার পাল চৌধুরী বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হাসিম : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ ব্যাচের ছাত্র। তৎকালীন হবিগঞ্জ মহকুমার তুখোড় ছাত্রনেতা, অসীম সাহসী ও প্রখর মেধাবী ছাত্র যুব সংগঠক বাহুবল উপজেলার ৭ নং ভাদেশ্বর ইউপির পাঁচবার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হাসিম মরহুম সরাফত উল্লাহর ঔরসে মরহুমা তাজিবুন্নেছার গর্ভে ১৯৪৯ সালের ৭ জুলাই বাহুবল উপজেলার চক্রামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বিনির্মাণের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমোঘ আহ্বান সাড়া দিয়ে বৃন্দাবন কলেজ স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র মো. আবুল হাসিম কেএম সফিউল্লাহর ৩ নং সেক্টরে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর অধীনে বাংলার মুক্তির রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখেন। স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত হতে প্রেরণাদাতা হিসেবে প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব ওমর আলী, জনাব নৃপেন্দ্র দত্ত, জনাব কাজী আবদুল খালেক, জনাব আব্দুল ওয়াদুদের কথা মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল হাসিম বলেন, সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় চৌকিদার বাড়ি কালেঙ্গা ফরেস্ট বিট অফিসের কাছে অ্যাম্বুস করে আমরা ৯৬ জন পাক হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হই। যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে সরকার এই অঞ্চলকে মান্নান নগর হিসেবে ঘোষণা করে। ’৭১-এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম বলতে শুরু করেন নতুন বাজার ব্রিজ, রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের ইতিহাস। অমিত সাহসী স্কুল সহপাঠী প্রয়াত আব্দুল মতিন ছিলেন এই অপারেশন টিমের গ্রুপে লিডার। দুই বন্ধু মিলে নাইওরি সেজে রিকশা নিয়ে ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে আকস্মিক আক্রমণ করে ক্যাম্পে থাকা ১১ নারী নির্যাতনকারী রাজাকারকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করেন এবং একজনকে মারাত্মক আহত করেন। এসব অমূল্য অনিঃশেষ অমোচনীয় স্মৃতি নিয়ে এ সমাজসেবক বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে পৈতৃক বাড়িতে অবসর জীবনযাপন করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায়: মুক্তিযুদ্ধের অমর স্মৃতি বুকে ধারণ করে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পুরানবাজার এলাকার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ব্রজেন্দ্র লাল রায় ও মাতা আশালতা রায়ের পুত্র শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ ব্যাচের ছাত্র হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায় আজও একনিঃশ্বাসে জাতির পিতার অসামান্য অবদান তাঁর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা তাঁর নিঃশ্বাসে নেতৃত্বের কর্মকুশলতা ও তাঁর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায় ১৯৭১-এর জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হেঁটে কালেঙ্গা পাহাড় হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত গোবিন্দ সিং আশরাম বাড়ি পৌঁছার পর আগরতলা কংগ্রেস ভবনে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম অন্তর্ভুক্ত করান। গৌরপ্রসাদ রায় ৩ নং সেক্টরের অধীন সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কোম্পানি কমান্ডার লে. ওয়াকিউজ্জামানের অধীনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসাবে মনু নদীর তীর, নয় মৌজা, চাতলাপুর, ভিওপি, টেংরাবাজার, রাজনগর, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ, মোগলাবাজারসহ অসংখ্যা স্থানে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধরত অবস্থায় দিন কাটান। বর্তমানে তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার ও হবিগঞ্জ জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি হিসাবে দায়িত্বরত। বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাবিবুর রহমান: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রবল টানে সারা বাংলার মতো হবিগঞ্জও প্রকম্পিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রবল উত্তাপে হবিগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগ নেতা চুনারুঘাট থানাধীন রামশ্রী সাহেববাড়ির মরহুম সৈয়দ সামছুর রহমানের প্রথম পুত্র সৈয়দ হাবিবুর রহমান তার উদ্দীপ্ত যৌবন সমর্পণ করেছিলেন দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথের মধ্য দিয়ে মৃত্যু উপত্যকায় মুক্তির রণাঙ্গনে। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৬৯ ব্যাচের ছাত্র সৈয়দ হাবিবুর রহমান রওফে বাবুলকে সহপাঠী বন্ধু মহল ও রণাঙ্গনের সহযোদ্ধারা ‘পাগলা বাবুল’ বলে ডাকতেন। ২৬ মার্চ ১৯৭১ হবিগঞ্জ সদর থানা পতাকা স্ট্যান্ডে উড্ডীয়মান পাকিস্তানি পতাকা পুলিশের প্রবল বাধার মুখে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাবিবুর রহমান। ৩ নং সেক্টরের মেজর কেএম সফিউল্লাহর অধীনে সৈয়দ হাবিবুর রহমান অকুতোভয় সেনানীর মতো বীরদর্পে অসংখ্য গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিয়ে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি বাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পর ২০০৮ সালের ২৭ নভেম্বর হজব্রত পালন অবস্থায় পবিত্র মক্কা নগরীতে ইন্তেকাল করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহীসন: সংলাপে সংলাপে মানুষের জীবনের হাসি কান্নাকে একান্ত মুন্সিয়ানা দিয়ে উপস্থাপন করে শত সহস্র দর্শক শ্রোতাকে মুগ্ধ করে এখনও তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে জীবনের ছন্দময়তা ধরে রেখেছেন আমাদের প্রিয় নাট্যজন এস এম মহসীন। ১৯৭১ এর রণাঙ্গনের শব্দ সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহসীন শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৫৭ সনে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৩ সনে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৭১ সনে প্রবাসী বাংলাদেশে সরকারের সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে শব্দ সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আগরতলা থেকে কৈলাশহর ও সিলেট পর্যন্ত প্রতিটি শরণার্থী শিবির ও প্রতিটি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের মানুষকে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত করে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী প্রাপ্ত শব্দ সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমির কালচারাল অফিসার, শিল্পকলা একাডেমীর ভারপ্রাপ্ত ডিজি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয় নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই: ক্যাডার সার্ভিসভুক্ত প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই ১৯৪৫ সনের ৩ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানার শরিফাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আব্দুর রহিম ও মাতা মরহুমা আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৫৭-৫৮ সাল পর্যন্ত সময়কাল শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেন। পিতার চাকুরির কারণে অন্যত্র বদলি হওয়ায় তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন সমাপ্তকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ৩নং সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের নেতৃত্বে তিনি বিভিন্ন রনাঙ্গনে কৃতিত্বের সাথে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার পর যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২৫শে মে ২০১৩ইং সনে ক্যাডার সার্ভিসভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই পরলোকগমন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত: দরাজ কন্ঠে শব্দের উচ্চারণে হাজারো মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দুরন্ত কৈশোর যৌবন পেরিয়ে আজ প্রৌঢ়ত্বের জীবন আঙিনায় দাঁড়িয়ে যিনি, তিনি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত। ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধি পিতা মৃত প্রভাত দত্ত ও মাতা রেণুবালা দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রাণেশ দত্ত শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করেন। হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে স্নাতক শেষবর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্বাধীনতার আন্দোলনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মফস্বল শহর হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ। হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসাবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক তার শরীর মনকে উদ্দীপ্ত কওে তোলে। ২৭ এপ্রিল প্রাণেশ দত্ত শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সপরিবারে চলে যান খোয়াই পার হয়ে ভারতের আগরতলায়। সেখান থেকে আসামের লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার বাগচির অধীনে স্পেশাল ব্যাচ হিসাবে ৯০ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্তের যুদ্ধকালীন জীবন-স্মৃতি তাঁকে আজও আবেগ অনুভ‚তিতে ভরিয়ে রেখেছে। যে সম্মুখ সমর সংঘটিত হয়েছিল জকিগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে। বেলুচ রেজিমেন্টের এক ব্যাটালিয়ন পাক হানাদার বাহিনীর সাথে প্রায় ৫ ঘন্টা স্থায়ী এ যুদ্ধে বেলুচ ব্যাটালিয়নকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়। অগণিত বেলুচ পাক হানাদার নিহত হয়। প্রায় ১৫০ জন পাক হানাদার সৈন্য আত্মসমর্পণ করেন। ৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের অধীনে পরিচালিত যুদ্ধজয়ের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে আছেন শায়েস্তাগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত। বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঝারু মিয়া: হবিগঞ্জ বারের সিনিয়র আইনজীবী মো. ঝারু মিয়া শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে বৃন্দাবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে স্নাতক সমাপনি শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তরুণ ঝারু মিয়া দেশের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য দেশ হানাদারমুক্ত করার লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ত্রিপুরার বকুল পালাদানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে কৃতিত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাবেদ আলী: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সেনা সদস্য প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাবেদ আলী শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। নুরপুর ইউনিয়নের মরহুম সোহরাব আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবেদ আলী মেজর কেএম সফিউল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত ৩নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার লে. হেলাল মুর্শেদের নেতৃত্বে পরিচালিত মেডিকেল কোরে যোগদান করেন। ক্যাম্পে আগত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও আহত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মতিন: একজন অকুতোভয় প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মো. আব্দুল মতিন। চুনারুঘাট থানার বালিয়ারী গ্রামে জন্ম নেয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পিতার নাম হাজী ছাইম উল্লাহ। ১৯৬৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ আব্দুল মতিন বৃন্দাবন কলেজে স্নাতক সমাপনি বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মেজর কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত ৩ নং সেক্টরের অধীনে গেরিলা প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে অসীম সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যে আমাদের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিছু তরুণ যুবক কিশোর দেশমাতৃকার টানে জীবনকে বাজি ধরে নিজেদের দেশপ্রেমকে শনাক্ত করেছিলেন। তাঁদের এ অসামান্য অবদানে আমরা উত্তর প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা গর্বিত, ধন্য, মুগ্ধ। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ, সকৃতজ্ঞ, বিনত অভিবাদন। বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার দেব রায় : মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন সমন্বয় গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা শায়েস্তাগঞ্জ বড়চর গ্রামের মৃত সচীন্দ্র দেব রায় ও মাতা মৃত ল²ী দেব রায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র সুকুমার দেব রায় ১৯৬১ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বৃন্দাবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর সিলেটের মুরারি চাঁদ (এম.সি কলেজ) কলেজে গণিত বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল তরুঙ্গমালার শরিক ছাত্র নেতা সুকুমার দেব রায় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বুকে ধারণ করে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চলে যান ভারতের আসামে। আসামের তেজপুর ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে তিনি ২নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর এ.টি.এম হায়দারের নেতৃত্বে কুমিল্লার অংশবিশেষ, আখাউড়া ও ভৈরব অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অপারেশনে অসীম সাহসিকতার সাথে অংশ নেন। নিঃসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার দেব রায় বর্তমানে এনজিও সিসিডি-এ ডেপুটি এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নির্বিঘ্নে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ বড়চর গ্রামের মৃত আ. নূরের মেজো ছেলে মো. শফিকুর রহমান। কিন্তু ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ঢেউ শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের ক্যাম্পাসে শহীদ আসাদের রক্ত ঝরার ইতিহাস গণ-আন্দোলনের ইশতেহার হয়ে এ মফস্বল শহর শায়েস্তাগঞ্জ এলাকাজুড়ে সংগ্রামের কাফেলাকে প্রলম্বিত ও প্রকম্পিত কওে তোলে। সেই কাফেলার অংশীদার হয়ে কিশোর শফিক স্বাধীনতার আদর্শে উজ্জীবিত হতে থাকলেন। এলো ’৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকালের ইস্পাতকঠিন ডাক। যুদ্ধে যেতে হবে। যুদ্ধ করতে হবে। হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এ দেশকে করতে হবে শত্রুমুক্ত। করতে হবে স্বাধীন। বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে যুদ্ধের মহাপ্লাবনে অতি সন্তর্পণে মে মাসের প্রথম দিকে বড় ভাই মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহাব খালাতো ভাই এমএম জহিরসহ লালচান্দ চা বাগানের কয়েকজন চা শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে ভারতের কাতলামারা সিমলায় চলে যান। অতঃপর সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিনের ক্যাম্পে হাজির হয়ে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সহকারী কমান্ডার (সাংগঠনিক) হিসেবে কিছুদিন আগেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে নিজের পৈতৃক বাড়িতে বাস করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল কবির: গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা সময়ে ১৯৬৯ সালে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার সাবাসপুর গ্রামের মো. আব্দুল কবির শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সমগ্র বাংলায় গণঅভ্যুত্থানের তীব্র ঢেউ ছড়িয়ে পড়লে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে শায়েস্তাগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ছাত্রসমাজের ওপর। ছাত্রলীগের নেতা হিসাবে আব্দুল কবির এ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে জড়িয়ে রেখে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেয়ে ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে নিজের জীবনকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথমে তিনি ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে যোগদান করে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩ নং সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদের নেতৃত্বে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জীবন সংগ্রামে জয়ী দেশপ্রেমিক এই ব্যক্তি পরবর্তীতে সমাজ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। নিজ খরচে কবির কলেজ ও জহুর চাঁন বিবি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, এলাকায় কয়েকটি মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে এখনও নিয়োজিত আছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফিরোজ মিয়া : চুনারুঘাট থানার বালিয়ারি গ্রামে মৃত আব্দুল রাজ্জাকের পুত্র মো. ফিরোজ মিয়া ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার মতিউর রহমানের নেতৃত্বে গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে ভারতের কাঁচামাটি ক্যাম্পে অবস্থান করেন। অতঃপর প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি কালেঙ্গাসহ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফিরোজ মিয়া স্বাধীনতা-পরবর্তী জীবনে উবাহাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় পৈতৃক বাড়িতে জীবনযাপন করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল দেব রায় : শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব বড়চর গ্রামের মৃত সচীন্দ্র দেব রায় ও মাতা লহ্মী দেব রায়ের পুত্র সুনীল দেব রায় ১৯৫৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জয় বাংলা জয় বাংলা’ এসব স্লোগানে মুখরিত স্কুল চত্বরের মিছিলে সুনীল হারিয়ে যেতেন। ভুলে যেতেন নিজের শিক্ষাজীবনের কথা। এ উত্তপ্ত মিছিলের পথ ধরেই একদিন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিবাহিনীতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। ফরেস্ট রেঞ্জারের চাকরি শেষে এখন অবসর জীবনযাপন করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল দেব রায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান: বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে অতি গোপনে ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে কিছুদিন গাইডের কাজ শেষে ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে লেবুছড়া ট্রেনিং ক্যাম্পে এক মাস সাত দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। অতঃপর গ্রুপে কমান্ডার আজিজুল হক তরফদারের নেতৃত্বে তিনি রেমা চা বাগানের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্পে হানা দিয়ে তছনছ করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী, সন্তান, পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন দেব: শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মনোরঞ্জন দেব ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শিঙ্গিছড়াসহ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্প ও পাক হানাদার ক্যাম্প আক্রমণে অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দেন। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়ি বাহুবল উপজেলার রামপুর গ্রামে অবসর দিন কাটাচ্ছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা : কিশোর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা চুনারুঘাট উপজেলার উবাহাটা গ্রামে কাজীবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম কাজী আব্দুস সালাম, মাতা মরহুমা মানিক চান বিবি।শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৮ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ’৭১-এ অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অগ্নিঝরা মার্চের উত্তাপ এই দামাল কিশোর গোলাম মর্তুজার শরীর ও মনে ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের অপত্য স্নেহে বেড়ে ওঠা এই কিশোর গর্ভধারিণী মায়ের ভালোবাসার প্রবল বাধাকে উপেক্ষা করে ২৯ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী শায়েস্তাগঞ্জে প্রবেশ করার সাথে সাথে হেঁটে ভারতের খোয়াই শহরে চলে যান। সেখান থেকে তিনি ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে ২২ এমএফ কোম্পানিতে যোগদান করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৩ নং সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান চৌধুরীর অধীনে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প একডালা কোম্পানির স্কুল আক্রমণ করলে দুজন রাজাকার নিহত হয়। পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর সরাসরি নির্দেশে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মর্তুজাকে তিন ইঞ্চি মর্টার প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। সেদিনের কিশোর আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্র্তুজার কাছে প্রশিক্ষণ নেয়াকে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরম পাওয়া বলে মনে করেন এই মুক্তিযোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক চৌধুরী (মাহতাব): মো. হামিদুল হক চৌধুরী (মাহতাব) চুনারুঘাট উপজেলার উবাহাটা গ্রামের পঞ্চায়েত বাড়ীর মৃত আব্দুল লতিফ চৌধুরীর ছেলে ’৭১ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি ত্রিপুরার খোয়াই মহকুমার অমর কলোনিতে ভর্তি হয়ে অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে শাকির মোহাম্মদ, দেউন্দি, লালচান্দসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা পরেশ চন্দ্র রায়: লস্করপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কালিপদ রায়ের পুত্র পরেশ চন্দ্র রায় ১৯৬৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তার অনেক সহপাঠী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে থাকলে তিনিও ভারতের অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান করে প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর মেজর কে এম সফিউল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত ৩ নং সেক্টরের অধীনে বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বাবর আলী: ১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের বছর। এ বছরই ছিল প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. বাবর আলীর এসএসসি পরীক্ষার বছর। বাবর আলী পরীক্ষা না দিয়ে এপ্রিলের শেষদিকে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। গ্রামের বাড়ি চুনারুঘাট থানার বালিয়াড়ি থেকে বাবা হানিফ উল্লা ও মা নুরজাহান বেগমকে কিছু না জানিয়ে প্রথমে ভারতের খোয়াই শহরে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে ট্রেনিং সমাপ্ত করে ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধীনে বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা রসময় কর্মকার: স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বে সারাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজও প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। প্রতিদিনকার মিছিলে অবরোধে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উদ্বুদ্ধ তরুণ ছাত্রসমাজের উচ্চারিত স্লোগানে এ অঞ্চলও মুখরিত হতে থাকে। ১৯৬৩ সালে অধ্যয়নরত স্কুলের পাশের কর্মকার বাড়ির মৃত রসিক কর্মকারের পুত্র রসময় কর্মকার দেশমাতৃকার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হন। অতঃপর ভারতে চলে যান। অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারপর ৩ নং সেক্টরের অধীনে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যে আমাদের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিছু তরুণ যুবক কিশোর দেশমাতৃকার টানে জীবনকে বাজি ধরে নিজেদের দেশপ্রেমকে শনাক্ত করেছিলেন। তাঁদের এ অসামান্য অবদানে আমরা উত্তর প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা গর্বিত, ধন্য, মুগ্ধ। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ সকৃতজ্ঞ, বিনত অভিবাদন। তথ্যসূত্র ১. বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৌখিক ও লিখিত বিবরণ। ২. হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড অফিস থেকে সংগৃহীত তথ্য। ৩. হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মো. আবুল হাসিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর পাল চৌধুরী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য বিবরণী। লেখক: আইনজীবীমুক্তিযুদ্ধ এনসাইক্লোপিডিয়া গবেষক এবং তথ্য সংগ্রাহক

আজ ঐতিহাসিক ৩১ মার্চ(ভিডিও)

আজ ৩১ মার্চ। ১৯৭১ সালের এ’দিন প্রায় সব ফ্রন্টে পাকিস্তানী বাহিনীর আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের সমন্বিত আক্রমনে পিছু হটতে বাধ্য হন মুক্তিযোদ্ধারা। তবে, চুয়াডাঙ্গায় বাঙালী বীরসেনারা পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণায়, সাড়া ফেলে বিশ্ব গণমাধ্যমে। অন্যদিকে, পাকিস্তানী হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিন্দা প্রস্তাব পাস করে ভারতের মন্ত্রিসভা। গণহত্যা শুরুর পর লাঠিসোঠা, দা-বল্লম আর বিদ্রোহী বাঙালী সেনা, ইপিআর ও গোপন বাম দলের অস্ত্র দিয়ে সারা বাংলায় শুরু হয় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে স্বতস্ফূর্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ। তবে, ৩১ মার্চ পাকিস্তানী হানাদাররা অতিরিক্ত সৈন্য ও আধুনিক সমরসজ্জার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয় যুদ্ধের বাস্তবতা ও নির্মমতা। মুক্তিযোদ্ধারা দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকায় পিছিয়ে যায়। পাকিস্তানী বাহিনী গুড়িয়ে দেয় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র। যেখান থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটার খবর ছাপিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোড়ন তোলে চুয়াডাঙ্গার সংবাদ। সেখানে আসাবুল হক জোয়ারদারের নেতৃত্বে মুক্তিসেনারা পাকিস্তানী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে চুয়াডাঙ্গাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করে। এদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডাকেন। তার আগেই বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রেহমান সোবহান ত্রিপুরা থেকে বিমানে দিল্লি পৌঁছান। বন্ধু অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মূখ্যসচিব পি এন হাক্সারসহ সংশ্লিষ্টদের জানান গণহত্যার ভয়াবহ খবর। এরপর ভারতের মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাকিস্তানী হত্যাযজ্ঞের নিন্দাপ্রস্তাব পাস হয়।

আজ ঐতিহাসিক ৩০ মার্চ (ভিডিও)

আজ ৩০ মার্চ। ১৯৭১ সালের এদিনে মুক্তিযোদ্ধাদের আধিপত্য ভাঙ্গতে পাকিস্তানি জান্তা রিজার্ভ সৈন্যদেরও সবদিকে পাঠাতে শুরু করে। তবে প্রতিরোধের মুখে পড়ে সর্বত্র। ভারতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডাকেন ইন্দিরা গান্ধী। কয়েক লাখ শরণার্থীর পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার খবর শিরোনাম হয়ে ওঠে বিশ্ব গণমাধ্যমে। ঢাকার পরে চট্টগ্রাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। দুঃসংবাদ পায় ৩০ মার্চ বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ নতুন নতুন ফ্রন্টে পাকসেনা নিহতের। যশোরের খণ্ডযুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসে পাকসেনারাই ঊর্ধ্বতনদের জানান, মুক্তিসেনাদের বীরত্ব। নতুন করে সাতক্ষীরাসহ আরও কিছু এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটির খবরে উদ্বিগ্ন পাকজান্তা সারাদেশে পাঠাতে শুরু করে রিজার্ভ সেনাদের। তবে এদিন খোদ ঢাকায় চোরাগুপ্তা হামলা করতে গিয়ে ধরা পরে দুই গেরিলা, ঢাকাতেও আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তল্লাশি শুরু হয়। জীবন বাঁচাতে এপারের মানুষের ঢল নামে ওপার বাংলায়, সে সময়ের বিশ্বগণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সংখ্যাটা দিনে আড়াই লাখ। বাঙালি নারী-শিশু-বৃদ্ধদের সীমান্ত পারের এমন মানবিক বিপর্যয় ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময়ও হয়নি। কোলকাতায় প্রথমে খোলা হয় ত্রাণ কার্যালয়, পরে দ্রুত সময়ে ক্যাম্প গড়ে ওঠে। এদিন অটল বিহারী বাজপায়ীর নেতৃত্বে বাজপেয়ীর নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের মিছিল হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। প্রগতিশীল বামপন্থী সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল কোলকাতা ও দিল্লিতে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস দলীয় মূখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় রাস্তায় নামেন উদ্বাস্তুদের ত্রানের চাঁদা তুলতে। নক্সালকর্মীরাও এগিয়ে আসেন সহায়তায়। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রীদের খবর পাঠান, পরের দিন জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে। বাংলার স্বজনদের কাছে যেতে আগের দিনের মত সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে পশ্চিম বাংলার যুবকেরা।   একে// এসএইচ/

ভালুকায় বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও শহীদদের স্বীকৃতি দাবি (ভিডিও)

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও ময়মনসিংহের ভালুকায় একাত্তরে গণহত্যায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের স্বীকৃতি মেলেনি। অযত্ন, অবহেলায় পড়ে থাকা বধ্যভুমিগুলোও বিলীন হওয়ার পথে। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণসহ শহীদদের স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যসহ মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা। ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই রাতে ভালুকার মল্লিকবাড়ী, ভান্ডাব গ্রামের আব্দুস ছামাদ ডাক্তারের বাড়ীতে রাজাকারও পাক বাহিনীর সদস্যরা হানা দেয়। রাতভর পরিবারের সদস্যদের উপর চালায় পৈশাচিক নির্যাতন। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় বসতবাড়ী। গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত বাড়ীর গাছ পালা ও বসতঘরের পোড়া টিন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই স্মৃতি। কিন্তু শহীদ পরিবার হিসেবে আজো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি পরিবারের সদস্যরা। মল্লিকবাড়ী ছাড়াও সাতেঙ্গা, পাড়াগাঁও, বিরুনীয়া, ভাওয়ালিয়াবাজুসহ উপজেলার আরো কয়েকটি স্থানে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা গণহত্যা চালায়। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে বধ্যভূমিগুলো। ভালুকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও ভালুকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার। ভাওয়ালিয়াবাজুতে একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং বধ্যভুমিগুলো সংরক্ষণের দাবী স্থানীয়দের ।  

আজ ঐতিহাসিক ২৯ মার্চ (ভিডিও)

আজ ২৯ মার্চ, ১৯৭১ সালের এই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে গ্রাম পর্যায়েও পাকিস্তানি সেনারা অভিযান শুরু করে। জীবন বাঁচাতে উদ্বাস্তুরা দলে দলে যেতে শুরু করেন ভারতে। তবে, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং সিলেটে প্রথমবারের মত মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় উদ্বেগে পড়ে হানাদারবাহিনী। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। চট্টগ্রামে পাকবাহিনীর বহুমাত্রিক হামলায় মুক্তিসেনারা কৌশলগতভাবে দুর্গম অঞ্চলে পিছিয়ে যায়। তবে বরিশালের পেয়ারাবাগান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ফরিদপুরসহ সে এলাকার নদীবিধৌত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখে। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে গেরিলারা ভাল অবস্থায়, যশোর অঞ্চলেও মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রগামী। রাজশাহীর চরাঞ্চলে মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণের খবর আসে বিশ্বগনমাধ্যমে। সিলেটের চাবাগান এবং পুরো ময়মনসিংহে ২৯ মার্চ ছোট ছোট আক্রমনে মুক্তিযোদ্ধারা জানান দেয়, দেশের সব অঞ্চলেই মুক্তিসেনারা। এরিমধ্যে শহর অঞ্চল ছাড়িয়ে পাকিস্তানি বর্বরবাহিনী গ্রামে ঢুকে পড়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর ছেড়ে যারা নিরাপদ ভেবে গ্রামে চলে গিয়েছিল, সেখানেও নিরাপদ রইল না তারা। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর থেকে দু-একটি করে পরিবার ভারত গেলেও মার্চের শেষদিকে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে সীমান্ত পার হতে শুরু করে।   দেশভাগের পর অনেক পরিবার-আত্মিয়স্বজন ভারত ও পাকিস্তান নাগরিক হলেও বাংলার দুই অংশের মানুষের যোগাযোগ ছিল নিত্যদিনের, পড়াশোনার জন্যও অনেকেই কোলকাতামুখী। ২৫ মার্চের পর গণহত্যার ভাসাভাসা খবরে উদ্বেগ ছিল পশ্চিম বাংলার মানুষদের। উদ্বাস্তুদের মাধ্যমে পাকবাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র জেনে পশ্চিমের বাঙালীরা স্বজনদের জন্য অজানা আশাঙ্কায় ছুটে আসে সীমান্তে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা তাদের পার হতে না দিলেও তা আবেগাপ্লুত মানুষের অসহায়ত্ব হিসেবেই সামনে আনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

চা বাগানে হারিয়ে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের বধ্যভূমি(ভিডিও)

হারিয়ে যেতে বসেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের সবচে বড় বধ্যভুমি পাত্রখলা। বধ্যভুমির উপরই তৈরি করা হয়েছে চা-বাগান। অরক্ষিত আছে চৈত্রঘাট ও কালেঙ্গা বধ্যভুমিও। সংরক্ষণের অভাবে কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিময় স্থানগুলো। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলই নদীর পাশে এখনও দৃশ্যমান একটি বাংকারের একাংশ। ধলই ভ্যালী ক্লাবের বর্তমান গ্যারেজ ও বাংলো ছিলো পাক হানাদারদের টর্চার সেল। বাংলো থেকে কয়েকশ গজ দূরে এই জায়গাটিতেই বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করা হতো। এখন এ বধ্যভুমির উপরই গড়ে উঠেছে পাত্রখলা চা-বাগান। এদিকে বধ্যভুমির উপর চা বাগান করায় ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা। বধ্যভূমির অস্তিত্বের কথা জানেই না পাত্রখলা চা বাগান কর্তৃপক্ষ। কমলগঞ্জের শমশেরনগর বিমানঘাঁটি, চৈত্রঘাট, দেওরাছড়া, কামুদপুর ও কালেঙ্গা এলাকায় হত্যা করা হয় বহু মানুষকে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে চৈত্রঘাট ও কালেঙ্গা বধ্যভুমি। বাঙ্গালি চেতনার উৎস এসব বধ্যভূমি রক্ষিত না হলে, অচিরেই তা হারিয়ে যাবে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। তাই স্মৃতিময় এ স্থানগুলো সংরক্ষণের দাবী উপজেলাবাসীর। এমজে/

আজ ঐতিহাসিক ২৮ মার্চ (ভিডিও)

আজ ২৮ মার্চ, ১৯৭১ সালের এইদিন জল-স্থল-আকাশ থেকে বহুমাত্রিক আক্রমনে বাঙালী সেনারা পিছিয়ে গেলে পাকিস্তান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় চট্টগ্রাম। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাঙালী সেনা এবং যশোর ও বরিশালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক সাফল্য পায়। অন্যদিকে লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিক্ষোভ সারাবিশ্বে পৌছে দেয় যুদ্ধের বার্তা। স্বাধীনতার ঘোষণার সময় চট্টগ্রাম ও আশাপাশের অধিকাংশ এলাকা বাঙালি সেনাদের দখলে থাকলেও ২ দিনের ব্যবধানেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। চট্টগ্রামের দক্ষিণ থেকে বেলুচ রেজিমেন্ট, উত্তর থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাস এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে অগ্রসরমান পাকসেনাদের হামলায় পিছিয়ে আসার কৌশল নিতে হয় বাঙালীসেনাদের। তার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও আকাশ থেকে বোমাবর্ষণে ২৮ মার্চ চট্টগ্রাম চলে যায় পাকিস্তানীদের নিয়েন্ত্রণে। তবে যশোর অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যায় দুর্বারগতিতে। তাজউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামরা পশ্চিমবঙ্গের দিকে ছুটে পথে পথে দেখেন যুদ্ধের প্রস্তুতি। ড. রেহমান সোবহান উল্টোপথে পূর্বে ত্রিপুরামুখী পথে দেখেন, সেনা ইউনিট নিয়েও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকসেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে খালেদ মোশাররফ চোরাগুপ্তা গেরিলা হামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাখেন নিজের হাতে। আন্ডরগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিতরা বরিশালের পেয়ারাবাগান থেকে যুদ্ধ শুরু করে ২৮ মার্চ থেকে, পুরো মুক্তিযুদ্ধে তারা ভারত যায়নি। এমন গোপন দলগুলো নক্সালকর্মীদের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে ২৮ মার্চ থেকে, অস্ত্রের যোগানও আসে সেখান থেকেই। আন্তর্জাতিকভাবে এদিন বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনে বড় ঘটনা ঘটে লন্ডনে। গণহত্যার বদলা নেয়ার প্রত্যয়ে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ করে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাঙালী। এতে অংশ নেন বিদেশীরাও।   টিআর/

ময়মনসিংহে ইপিআর ক্যাম্পে নিহত হয় ১২১ পাক সেনা (ভিডিও)

একাত্তরের ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহে বাঙালি ইপিআর সদস্য ও ছাত্র-জনতার সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত হয় ইপিআর ক্যাম্পের পাকিস্তানি সেনারা। নিহত হয় ১২১ জন। প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ চলে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, এ বিজয় ছিলো সারাদেশের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ২৭ মার্চ সকালে ময়মনসিংহের খাকডহর ইপিআর ক্যাম্পের বাঙালি জওয়ানদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাতে সিপাহীদের বদলে টহলের দায়িত্ব দেয়া হয় পাকিস্তানি কমান্ডারদের। রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে পাকিস্তানি কমান্ডারের বাসা থেকে গুলি ছোঁড়া হয়। এরপরই বাঙালি জওয়ানরা টহলরত ২ হানাদার কমান্ডারকে খতম করে। শুরু হয় দু’পক্ষের গোলাগুলি। এরমধ্যেই ইপিআর ক্যাম্পের পাকিস্তানি সেনাদের বন্দি করার সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্র-জনতা। ২৮ মার্চ বিকেল ৩টা পর্যন্ত ১৫ ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধে নিহত হয় ১০৪ পাকিস্তানি সেনা। জীবিত আটক করা হয় ১৭ জনকে। পরে তাদেরও হত্যা করা হয়। খাকডহর যুদ্ধই ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম প্রতিরোধ এবং দেশে প্রথম সফল যুদ্ধ । সাধারণ জওয়ান আর স্থানীয় জনতার প্রতিরোধে যুদ্ধজয়ের স্বীকৃতি দেবে সরকার এই প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর।   এসএইচ/

স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে যায় মানুষের মুখে মুখে (ভিডিও)

 ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বাঙালি সেনাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।  সামরিক জান্তা কারফিউ তুলে নিলে ঢাকা ছাড়েন রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ। এদিকে ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ভারতের কোলকাতা ও দিল্লীতে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ২৬ মার্চ থেকেই। ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বাঙালি সেনাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের বার্তা তরঙ্গসীমা ছাড়িয়ে মুখে মুখে পৌঁছে যায় সারাদেশের মানুষের কাছে। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে গণহত্যায় বিপর্যস্ত ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার জন্য এদিন কারফিউ তুলে নেয় জান্তা সরকার। এ সুযোগে বেঁচে যাওয়া নগরবাসী, লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়ে। পার্শ্ববর্তী রায়ের বাজার একাত্তরে ছিল পুরো গ্রামীণ জনপদ। অবরুদ্ধ শহর থেকে ভারতে রওনা দিয়ে ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম এখানেই মুক্তাঞ্চলের আমেজ পান। পাকসেনারা দেশি পত্রিকা অফিসে হামলা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ ছাড়া করায়  বিশ্বগণমাধ্যমে গণহত্যার খবর তখনও তেমন আসেনি। তবে ২৭ মার্চ ভারতে ব্যাপক বিক্ষোভে নিরবতা ভাঙ্গে। তা এখনো স্মরণে আছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতা মুবিনুল হায়দায় চৌধুরীর। অন্যদিকে পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা অবস্থানকালেই যে গণহত্যা ঘটলো, সে ব্যাপারে ২৭ মার্চ তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বলেন, দেশ রক্ষা পেয়েছে। ভারতে বিক্ষোভের খবর ২৭ মার্চ বিশ্বজুড়ে প্রচার হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রাতেই তাদের পক্ষে যুক্তি দিতে দেশে দেশে দূত পাঠাতে শুরু করেন। তবে বিশ্ববাসী তা বিশ্বাস করেনি, নয় মাসের বীরত্মপূর্ণ লড়াইয়ে বাঙালিরা ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা।     এসএইচ/

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: যে নিবন্ধ পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাস

`আবদুল বারীর ভাগ্য ফুরিয়ে আসছিল। পূর্ব বঙ্গের আরও হাজারো মানুষের মতো তিনিও বড় একটি ভুল করেছেন, তিনি পালাচ্ছেন, কিন্তু পালাচ্ছেন পাকিস্তানী পেট্টোলের সামনে দিয়ে। তার বয়স ২৪, সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি কাঁপছেন, কারণ তিনি এখনই গুলির শিকার হতে যাচ্ছেন।` এভাবেই শুরু করা হয়েছিল গত অর্ধ-শতকের দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী নিবন্ধগুলোর একটি। এটি লিখেছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। তিনি একজন পাকিস্তানী সাংবাদিক, তার প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায়। এই নিবন্ধের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো দেশটির পূর্ব অংশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন আর নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিশ্বের সামনে উঠে আসে। বিবিসি`র মার্ক ডামেট লিখেছেন, এই প্রতিবেদন সারা বিশ্বকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্ষুব্ধ আর ভারতকে শক্ত ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে বলেছিলেন, লেখাটি তাকে এত গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল যে এটি তাকে ইউরোপীয় রাজধানীগুলো আর মস্কোয় ব্যক্তিগতভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দেয়, যাতে ভারত এক্ষেত্রে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস এসব উদ্দেশ্য নিয়ে রিপোর্ট করেননি। যেমনটা তার এডিটর হ্যারল্ড ইভান্স লিখেছেন, ‘তিনি খুব ভালো একজন প্রতিবেদক, যিনি তার কাজটা সৎভাবে করছেন।’ তিনি ছিলেন খুব সাহসীও। তিনি জানতেন এই সংবাদ প্রকাশের আগেই তৎকালীন সেনা-শাসিত পাকিস্তান থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে, যা ওই সময়ে খুব সহজ কাজ ছিল না। `তার মা তাকে সব সময়েই বলতেন যেন তিনি সত্যের পক্ষে থাকেন। মাসকারেনহাসের বিধবা পত্নী ইভোন বলতেন, আমার সামনে একটি পাহাড়ও যদি রাখো, আমি সেটি টপকে যাবো। তিনি কখনো হতোদ্যম হতেন না`। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন মাসকারেনহাস করাচির একজন নামী সাংবাদিক। স্থানীয় গোয়ান-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তিনি একজন সদস্য। তার পাঁচটি সন্তান রয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু সম্প্রদায় আর সাধারণ বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে পূর্ব পরিকল্পিত অভিযান শুরু করে। আরো অনেক যুদ্ধাপরাধের মতো সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করে, ছাত্র-শিক্ষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে। এতে ঢাকা থেকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে গ্রামগুলোতেও। তাদের এই পরিকল্পনা কিছুটা সাফল্য পাওয়ার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কয়েকজন সাংবাদিককে এনে ঘুরিয়ে দেখানো হবে যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা কতটা সফলতা পেয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলায় যে তাদের ভাষায় সব কিছুই স্বাভাবিক সেটি তুলে ধরা। ঢাকায় অবস্থান করা বিদেশী সাংবাদিকদের অবশ্য এর আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর আট জন সাংবাদিককে দশ দিনের একটি সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাসও। যখন তারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান, তখন তাদের মধ্যে সাতজন সাংবাদিক পাকিস্তানী সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট করেন। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক এবং ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ক্ষেত্রে। ইভোন মাসকারেনহাস স্মৃতিচারণা করে বলেন, “আমি কখনোই আমার স্বামীর এ রকম চেহারা দেখিনি আগে। তিনি ছিলেন খু্বই ক্ষুব্ধ, চিন্তিত, বিষণ্ণ আর আবেগী।” মাসকারেনহাস বলেন, আমি যা দেখেছি, সেটা যদি আমি লিখতে না পারি, তাহলে আমি আর কখনোই অন্য কোন কিছু লিখতে পারবো না। তবে পাকিস্তানে সেটা লেখা সম্ভব নয়। কারণ গণমাধ্যমের সব প্রতিবেদনই সেখানে সেন্সর করা হয়। এবং তিনি যদি সেই চেষ্টা করেন, তাকে হয়তো গুলি করেই মারা হবে। এরপর অসুস্থ বোনকে দেখার নাম করে মাসকারেনহাস তখন লন্ডনে চলে যান। এরপর সরাসরি লন্ডন টাইমসের সম্পাদকের দফতরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাকে বলেন, `আমি পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং আর্মি অফিসারদের বলতে শুনেছি যে এটাই একমাত্র সমাধান।` হ্যারল্ড ইভান্স প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু বলেন যে তার আগে করাচি থেকে ইভোন আর তার সন্তানদের বের করে আনতে হবে। তারা সিদ্ধান্ত নেন তাদের প্রস্তুত করতে একটি সংকেতমূলক টেলিগ্রাম পাঠানো হবে, যেখানে লেখা হবে, ‘অ্যানের অপারেশন সফল হয়েছে।’ ইভোন মাসকারেনহাস বলেন, ‘পরদিন ভোর তিনটায় আমি টেলিগ্রামটি পাই। তখন আমার মনে হয়েছিল, ও ঈশ্বর, এখন আমাদের লন্ডন যেতে হবে। আমাকে সবকিছু এখানে ফেলে রেখে যেতে হবে। এটা যেন শেষকৃত্যের মতো একটা ব্যাপার ছিল।’ সন্দেহ এড়াতে পরিবার রওনা হবার আগেই অ্যান্থনি মাসকারেনহাস আবার পাকিস্তানে ফিরে যান। কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, পাকিস্তানী নাগরিকরা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। তাই পরিবার চলে যাওয়ার পর তিনি সড়ক পথে গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে আফগানিস্তানে ঢুকে পড়েন। যেদিন লন্ডনে পুরো পরিবার আবার একত্রিত হয়, তার পরের দিন সানডে টাইমস পত্রিকায় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল, `গণহত্যা`। `প্রতারণা` এটি খুবই শক্তিশালী একটি প্রতিবেদন ছিল, কারণ মাসকারেনহাস পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন। সামরিক ইউনিটগুলোর হত্যা আর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযান আমি নিজে দেখেছি। বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর শহর আর গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দেখেছি। আমি দেখেছি, পুরো গ্রামের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালাতে। অফিসার্স মেসে রাতের বেলায় কর্মকর্তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে তারা কতটা সাহস দেখিয়ে সারাদিন ধরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। আপনি কতজনকে মেরেছেন? তাদের উত্তর আমার এখনও মনে আছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশকে পাকিস্তান প্রতারণা হিসাবে দেখেছে এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে শত্রু এজেন্ট হিসেবে গণ্য করেছে। তার এই প্রতিবেদনের তথ্যকে তারা অস্বীকার করে একে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা হিসেবে দাবি করেছে। এরপর থেকে লন্ডনেই বাস করেন মাসকারেনহাস ও তার পরিবার। তবে তারপরেও সবসময়েই পাকিস্তানে যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ১৯৭৯ সালে তিনিই প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে পাকিস্তান পারমানবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ১৯৮৬ সালে তিনি লন্ডনে মারা যান। বাংলাদেশে তাকে এখনো স্মরণ করা হয় এবং তার এই নিবন্ধটি দেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সূত্র: বিবিসি আর/টিকে

স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানমন্ত্রীর উপহার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার (২৬ মার্চ) ৪৮তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশের সব মুক্তিযোদ্ধাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে অন্যান্য বছরের মতো এবারও মোহাম্মদপুরের গজনভী রোডে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১) যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রীর সহকারি প্রাইভেট সেক্রেটারি(এপিএস) সাইফুজ্জামান শিখর, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন, প্রটোকল অফিসার খুরশিদ-উল-আলম ও অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার গাজী হাফিজুর রহমান আজ সকালে উপহার সামগ্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করেন।মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ঈদ ও পহেলা বৈশাখের মতো প্রত্যেক জাতীয় দিবস ও উৎসবে তাদেরকে স্মরণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা, মোহাম্মদপুরে ১৩ তলার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১সহ মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনে নেওয়া ব্যাপক পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।যুদ্ধাহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার কারণেই তারা এই সম্মান পাচ্ছেন। তারা শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন কামনা করেন। সূত্র: বাসসআর

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস(ভিডিও)

আজ ২৬শে মার্চ; মহান স্বাধীনতা দিবস। একাত্তরের ভয়াল ২৫ মার্চের কালরাতের ধ্বংসস্তুপ আর লাশের মধ্য থেকে রক্তরাঙা সূর্যোদয়ের পূর্বাভাষ ছিলো এদিন। পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়ে যান স্বাধীনতার ঘোষণা। সেই বার্তা কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বার বার প্রচার হতে থাকে। শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম। ছাত্র-জনতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন বাঙালি সেনা সদস্যরাও ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণের মধ্য দিয়েই নির্ধারণ হয়ে যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাগ্য। পরের দিনগুলোতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী যেমন আলোচনার নামে কালক্ষেপন করতে থাকে, তেমনি বাঙালী জাতি নিতে থাকে যুদ্ধের প্রস্তুতি। ২৫ মার্চ দিনশেষে মধ্যরাতে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরিতে পরিণত করে। সেই চিত্র আরো স্পষ্ট হয় পরের দিন ২৬ মার্চ সকালে। শুধু ঢাকাই নয়, পাকিস্তানী বাহিনী চট্টগ্রাম, যশোর সেনানিবাসের বাঙালী সৈন্যদের হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। হত্যা করা হয় নিরস্ত্র বাঙালীদের। চলে ধ্বংসযজ্ঞ। তবে, চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে বাঙালী সৈন্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অন্যান্য স্থানে ইপিআরের বাঙালী সদস্য এবং ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দেশের মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই স্বপ্ন পূরণে কারাগারে যাবার আগে বার্তা রেখে যান বাংলার মুকুটহীন সম্রাট। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সেই ঘোষণা প্রচার করা হয়। পাকিস্তানী সৈন্যরা বাঙালীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে, বাঙালীরাও গড়ে তোলে প্রতিরোধ। অন্যদিকে, ইপিআরের অস্ত্রে সজ্জিত বাঙালী সৈন্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সর্বস্তরের মানুষ। নয় মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদদের আত্মদান ও লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বাংলার আকাশে পতপত করে উড়তে থাকে লাল সবুজের পতাকা।    

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি