ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২০:১০:৩৮

‘গ্রেট টিম লিডার’দের যে পাঁচ প্রলোভনে পা ফেললেই বিপদ...!

গ্রন্থ পর্যালোচনা : ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশনস অব এ সিইও’

‘গ্রেট টিম লিডার’দের যে পাঁচ প্রলোভনে পা ফেললেই বিপদ...!

জীবনে সাফল্য পেতে চায় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য। তবে ‘সাফল্য ছেলের হাতের মোয়া নয়, যে চাইলেই পাওয়া যাবে। সাফল্যের জন্য চাই অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর অধ্যবসায়। যাঁরা জীবনে সাফল্য পেয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের সাফল্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক একটি গল্প। যে জীবনযুদ্ধের গল্পগুলো মোটেই সুখকর নয়। অনেক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছতে হয় সত্যিকারের সাফল্যের বন্দরে। জীবনসাফল্যের অভিযানে প্রতি পদক্ষেপেই ওঁৎ পেতে থাকে একের পর এক প্রলোভনের ফাঁদ। জীবনের কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে যে প্রলোভনসমূহের কোনো একটি ফাঁদে পা ফেললেই আর রক্ষে নেই। তখন তাকে নিশ্চিতভাবে নিমজ্জিত হতে হয় চোরাবালির চরে। গড়পড়তা মানুষের জন্য যেমন, তেমনি একজন টিম লিডারের ক্ষেত্রেও কথাগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন টিম লিডারকে সাধারণত যে প্রলোভনগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে, যে প্রলোভনগুলোর ফাঁদে পা দিয়ে নিজের অজান্তেই একজন টিম লিডার তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়, সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করে একটি চমৎকার বই লিখেছেন (২০০২) বিশিষ্ট আমেরিকান লেখক প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি (জন্ম : ১৯৬৫)। বইটির শিরোনাম দিয়েছেন- `The Five Temptations of a CEO`| প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্বনামধন্য ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম ‘দ্য টেবিল গ্রুপে’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তিনি বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিতে সহস্র সিনিয়র এক্সিকিউটিভের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি গত পনের বছর ধরে একজন পরামর্শদাতা ও বক্তা হিসেবে পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়েছেন, এবং দিয়েই চলছেন। মূলত সেই অভিজ্ঞতার সারাৎসার বাণীবদ্ধ করেই লিখেছেন ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশনস অব এ সিইও’ বইটি। বইটিতে ‘সিইও’ (CEO or Chief Executive Officer) বলতে তিনি বুঝিয়েছেন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী তথা দলপ্রধানকে; এবং ‘টেম্পটেশনস’ বলতে বুঝিয়েছেন এমন সব প্রলোভনকে, যেগুলো একজন শ্রেষ্ঠ দলপ্রধান হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে যে বা প্রলোভনগুলো প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে, যেসব প্রলোভনসমূহ একজন দলপ্রধানকে তার অজান্তেই আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে, যেগুলো থেকে প্রতিমুহূর্তে সতর্ক না-থাকলে বিপদ অবিসম্ভাবী, সেগুলোকেই রূপক গল্পের মোড়কে ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও’ বইটিতে তুলে ধরেছেন লেখক। লিঞ্চিওনি ‘সিইও’ তথা ‘টিম লিডার’ বা দলপ্রধানদের কথা মাথায় রেখে বইটি লিখলেও এই প্রলোভনগুলো যেকোনো মানুষের সাফল্যযাত্রার পেছনেই অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন (২০১৭) বাংলাদেশের স্বনামধন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘রকমারি ডট কম’-এর হিউম্যান রিসোর্স টিমের কো-অর্ডিনেটর জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর (জন্ম : ১৯৮৭)। স্মরণীয় যে, বইটির অনুবাদক জনাব মারুফ সাহেবও একজন টিম লিডার। তিনি যে লিঞ্চিওনি’র বক্তব্যগুলো স্বয়ং আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পাদন করেছেন, তা অনূদিত বইটির প্রাঞ্জল ঝরঝরে গদ্য আর প্রকাশভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়। বইটি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে : লেখক এই বইটির নাম দিয়েছেন ‘The Five Temptations of A CEO’। তিনি এই ‘সিইও’ শব্দটি দিয়ে আসলে একজন ‘লিডার’ কে বুঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। একজন লিডার যখন তার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়ে যান, তখন তিনি নিজেকে একটু আলাদা ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় এই আলাদা ভাবাই তাকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। যে লিডার তার ফলোয়ারদের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভাবতে পারেন না, সে খুব দ্রুতই ফলোয়ারদের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা হারান। গ্রেট লিডার হতে হলে পাঁচটা টেম্পটেশনের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হয়। ...লেখক একটি রূপক গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ঐ টেম্পটেশনগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ...কিশোর বয়স থেকেই এই টেম্পটেশনগুলো জেনে নিয়ে সেগুলো ওভারকাম করার ক্রমাগত প্রাকটিস করতে থাকলে গ্রেট লিডার হওয়ার পথ কেউ রুখতে পারবে না। (‘অনুবাদকের কথা’ অংশ : দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও) লেখক মোট চারটি প্রধান খণ্ডে ভাগ করে তাঁর বক্তব্যগুলোকে গ্রন্থবন্ধ করেছেন। প্রথম খণ্ডে স্থান দিয়েছেন এগারোটি অধ্যায়ের। প্রথম অধ্যায়ে পাঠকের সাথে সাক্ষাৎ মিলবে “এন্ড্রু ও’ব্রেইন”, সংক্ষেপে “এন্ড্রু” নামধারী এই গল্পের নায়কের। সে ‘ট্রিনিটি সিস্টেম’ নামক একটি টেকনোলজি কোম্পানির সিইও। ‘গত এক বছরের কাজের রিপোর্ট আর জবাবদিহি নিয়ে আগামীকাল তার প্রথম বোর্ড মিটিং’। এ-নিয়ে সে খুবই চিন্তিত। সাধারণত সে অফিস থেকে দেরি করে না বের হলেও সে আজ অফিস থেকে সবার শেষে বেরিয়েছে; অফিসের হলরুমে হাঁটার সময়ও আজ তার খুব অস্বস্তি বোধ করছিল; বিচলিত মনে সে ভাবছে, কাল সদস্যদের কাছ থেকে তার কতই না নেতিবাচক কথা শুনতে হবে, কেউ হয়তো তার কাঁধ চাপড়ে বাহবাও দেবে না; এক কথায় বলা চলে সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে তার তত্ত্বাবধানে কোম্পানি যে খারাপ ফলাফল করেছে তা নিয়ে সে খুবই উদ্বিগ্ন। তার তখন মনে পড়ে একটি প্রবাদ— ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’। এভাবেই এগিয়ে চলে গল্পের গতি। পাঠকরাও এন্ড্রু’র সাথে সাথে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে দেখা যাবে, যে পথ দিয়ে এন্ড্রু গাড়ি নিয়ে যাত্রা করেছে, সে পথ দিয়ে আর কোনো গাড়ি-ই যাচ্ছে না। যদিও ‘মেরামতের জন্য সেই রাস্তাটি বন্ধ থাকবে’ এমন নোটিশ এন্ড্রু গত দু’সপ্তাহে বহুবার দেখেছে, তা-সত্ত্বেও আগামীকালের বোর্ড-মিটিংয়ের দুশ্চিন্তায় ভুল করে সেই পথেই সে চলে এসেছে। এন্ড্রু যেন আজ এক উদ্ভ্রান্ত পথিক। সে আজ কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না! তার এই উদ্ভ্রান্তদশাকে লেখক উপস্থাপন করেছন এভাবে— একবার ভাবল, অফিসের কাছে ভালো একটা হোটেলে থাকবে। রাতে জামা কাপড় লন্ড্রি সার্ভিসে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেবে। হোটেলে বসেই মিটিংয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু নাহ্! পরক্ষণেই তার মনে হলো নিজের বাড়িতে গিয়ে অন্তত দু’ঘণ্টা শান্তিতে ঘুমানো দরকার। যদিও এন্ড্রু নিজের বউ বাচ্চাদের সামনে খুব ভাব নিয়ে থাকে, তবুও তার মনে হল- নৈতিক ও মানসিক সাপোর্টের জন্য বউ-বাচ্চাদের সঙ্গ তার একান্ত প্রয়োজন। (পৃ. ২৫) অতঃপর এন্ড্রু দরকারি কাগজপত্র ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে, কোট হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। উঠে গিয়ে একটি লোকাল ট্রেনে। সেখানে বিধ্বস্ত এন্ড্রু’র সাথে দেখা হয় ধূসর শার্ট পরিহিত এক বয়স্ক ভদ্রলোকের। যার নাম— “চার্লি”। চার্লি গল্পের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। চার্লি একরকম গায়ে পড়েই এন্ড্রুর সাথে গল্প করতে চায়। চার্লিকে প্রথমে বিশ্বাস করতে না পারলেও পরবর্তীতে চার্লির ইচ্ছাতেই এন্ড্রু তার সাথে কথোপকথন শুরু করে। চার্লি নিজেকে পরিচয় দেয় একজন রেইলরোড কোম্পানির প্রেসিডেন্টের ছেলে হিসেবে। চার্লির সাথে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে তৃতীয় অধ্যায়ে। চতুর্থ অধ্যায়ে এসে দু’জনের মধ্যে গল্পটা জমে ওঠে। চার্লি ও এন্ড্রুর মধ্যকার কথোপকথনের শুরুর অংশটি চমৎকার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন লেখক। বইটি না-পড়ে সে নাটকীয়তার নাট্যরস আস্বাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যা-ই হোক, শুরুর দিকে চার্লিকে এন্ড্রু বিশ্বাস করতেই পারছিলো না। তবুও একটা অবজ্ঞামিশ্রিত সংশয়াচ্ছন্নতার মধ্য দিয়েই চার্লিকে সে তার সমস্যাগুলো বলতে শুরু করে। লেখক এন্ড্রুর মানসিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে— ...অবশ্য এন্ড্রুর মনের মধ্যে সংশয় কাজ করছিল। সে ভাবল, ‘আমি একটা কোম্পানির সিইও। আর আমি আমার সমস্যার কথা এক পাগল বুড়োর কাছে বলতে যাচ্ছি। আমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? মনে তো হয় কিছুটা হলেও খারাপ হয়েছে। এ কারণেই তো তাঁকে এসব কথা বলতে যাচ্ছি।’ (পৃ. ৩৫) আলোচনার প্রারম্ভেই চার্লি বুঝে ফেলে এন্ড্রুর বিপর্যস্ত মানসিক পরিস্থিতির কথা : চার্লির জবাব, “ও! তাই নাকি! তুমি কি জান, তুমি যে টেম্পটেশনের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছো। ভাবছ, কী করে বুঝলাম? আর তা বুঝা একেবারেই সহজ কাজ। ঐ যে তুমি জানো যে, তোমার কোম্পানির দুর্দিন যাচ্ছে, কিন্তু তুমি নাকি তার জন্য দায়ী না। সিইও’দের সাধারণত পাঁচটা টেম্পটেশন থাকে। তুমি কিন্তু ইতোমধ্যে এক বা একাধিক টেম্পটেশনের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছ।” (পৃ. ৩৮) এরপর চার্লি এক এক করে সিইও’দের পাঁচটি টেম্পটেশন নিয়ে এন্ড্রুর সাথে আলোচনা করে। পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করে প্রথম টেম্পটেশন নিয়ে। চার্লি এন্ড্রুর কাছে জানতে চায়, এন্ড্রুর ক্যারিয়ারের সেরা দিন কোনটি, সে-সম্পর্কে। এন্ড্রু দু’সেকেন্ড ভেবেই জানিয়ে দেয়— সে যেদিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটাই ছিল ক্যারিয়ারের সেরা দিন। কিন্তু এখানেই আপত্তি চার্লির। সে এন্ড্রুর বক্তব্যকে ‘হাউ ফানি’ বলে উড়িয়ে দেয়। সে একের পর এক যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট কখনোই নির্বাচিত হওয়ার দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন বলবে না, বলবে— যেদিন সে দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে সেই দিনকে; একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান কখনো সরকারি অনুদান পাওয়ার দিনকে তার ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যেদিন সে অনুদানের টাকাগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে সে-দিনকে; একজন বাস্কেটবল কোচ কখনো যেদিন কোনো দলের সাথে বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যে-দিন দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারবে, সে-দিনকে; ঠিক একইভাবে, একজন সিইও’রও উচিত যে-দিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন না-ভেবে যে-দিন কোম্পানির জন্য ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে, সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাবা এবং সব সময় নিজের ক্যারিয়ারের চেয়ে কোম্পানির সাফল্যের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চার্লির ভাষায় : ...মূলত যাঁরা গ্রেট সিইও তাঁরা এসব ব্যাপার নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। তাঁরা শুধু তাঁদের কাজের মাধ্যমে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তাঁরা চান কোম্পানির আরো উন্নতি হোক, নিজের ইগো নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। (পৃ. ৪৪) এমনিভাবে কীভাবে একজন সিইও নিজের ক্যারিয়ার, পদমর্যাদা, ভাবমূর্তি ও ইগোর কবলে পড়ে প্রথম টেম্পটেশনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন, তা চার্লি ও এন্ড্রুর সুবিস্তৃত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নাট্যিক আবহে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বইটির ঘটনাপ্রবাহ পড়তে গিয়ে পাঠকদের জন্য সবচেয়ে পরিতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে— বর্ণনাগুলোকে কখনো একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর মনে হবে না লেখক মোটেই নিরস তত্ত্বকথা উপস্থাপন করেননি, অত্যন্ত সরসভাবে একেবারে গল্পের ভঙ্গিতে দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্ণনাটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাষারূপ দিয়েছেন চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির। হঠাৎ করেই ট্রেনের বগিতে আলো চলে যাওয়া, আলো চলে যাওয়ার পরের ভূতুরে পরিবেশ, আবার আলো জ্বলে ওঠার রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা প্রভৃতি বিষয়গুলো খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইয়ে। বইটির প্রথম খন্ডের ‘ছয়’সংখ্যক অধ্যায়ে চার্লি আলোকপাত করে দ্বিতীয় টেম্পটেশন সম্পর্কে। চার্লির মতে, সিইও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াটা কঠিন হলেও সিইও’র কাজগুলো পরিচালনা করা মোটেই জটিল নয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এন্ড্রু তা মেনে নিতে পারে না। এন্ড্রুর যুক্তি : কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন টেকনোলজি, বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক পরিবর্তন, ব্যবসার নিয়ম কানুনের অদল-বদল, সস্তা শ্রমবাজার, ট্যাক্স, ভ্যাট, ঘুষ ইত্যাদি কত ধরনের ব্যাপার স্যাপারের কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক জটিল হয়ে গিয়েছে। চার্লিও নাছোড়বান্দা! এন্ড্রুর এসব যুক্তি মানতে সে পুরোপুরি নারাজ। এভাবেই জমে ওঠে গল্প। এন্ড্রু তার জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অফিসের অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি, সে টেরিকে (টেরি ছিল এন্ড্রুর কোম্পানির ‘মার্কেটিং বিভাগে’র প্রধান, তাকে এন্ড্রু কোনো রকমের পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে) সঠিক উপায়ে চাকরিচ্যুত করেনি, যদি তাকে পূর্ব-সতর্কতা ব্যতীত চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয় তাহলে এন্ড্রুর কেমন লাগবে- এমনি নানা প্রশ্নে এন্ড্রুকে জর্জরিত করে চার্লি। যুক্তির পর যুক্তি উপস্থাপন করে চার্লি এন্ড্রুকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে আসলে নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের সঠিক জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি; আর এটিই হচ্ছে একজন সিইও’র দ্বিতীয় টেম্পটেশন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর ভাবনাগুলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন সিইও কী করে থাকে, অথচ তার কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় প্রভৃতি নানা বিষয় এন্ড্রু ও চার্লির কথোপকথনের মধ্যে ফুটে উঠে। তাদের আলোচনায় পাঠকের সামনে বেরিয়ে আসে মজার মজার সব তথ্য। নাট্যরসে ভরপুর সেসব তথ্যাবলি সত্যি-ই খুব উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়। পরবর্তী অধ্যায়ে তৃতীয় টেম্পটেশন ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা’সম্পর্কে আলোকপাত করে চার্লি। কেন একজন সিইও স্বল্প তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক সময়ে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, তার দুর্বলতাগুলো কী কী, এন্ড্রু-ই বা কী কী ভুল করেছিল, একজন সিইও হিসেবে এন্ড্রুর কী করা উচিত হয়নি বা কী করা উচিত সে-সব সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করে চার্লি। গল্পের শুরুতে চার্লির প্রতি এন্ড্রুর যে বিরক্তি ও সংশয় ছিল, এ-পর্যায়ে এসে তা আর অবশিষ্ট থাকে না। এখন সে নিজের আগ্রহ থেকেই চার্লির কাছে তার সমস্যা তুলে ধরতে শুরু করে, এবং সমাধানের পথ জানতে চায়।  আর চার্লিও দিয়ে চলে একের পর এক উপদেশ। একটি দৃষ্টান্ত : ...একজন সিইও’র ‘I was wrong’ এ তিনটি শব্দের বাক্যটি বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যাবার জন্য বললে হবে না বরং এমনভাবে বলতে হবে, যেন অন্য টিম মেম্বাররা বুঝতে পারে, সিইও সাহেব সত্যিই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ...একজন সিইও তাঁর সিদ্ধান্ত হতে ভুল প্রমাণিত হলে কখনোই অস্বস্তিতে পড়বেন না। তিনিই ‘গ্রেট সিইও’ যিনি ওই ধরনের অবস্থায়ও খুবই স্বাভাবিক থাকতে পারেন। তাহলে পরবর্তীতে কোম্পানির মারাত্মক দুর্দিনেও অল্প তথ্যের সাহায্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সৎ সাহস পাবেন। (পৃ. ৭০) অষ্টম অধ্যায়ে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে আরও তিনজন বৃদ্ধ লোকের সাথে- একজন লম্বু লোক, একজন টেকো লোক ও অপরজন ফিটফাট বাবু। লোকগুলোর নামের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, তাদের সাথে এন্ড্রু ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কতোটা হাস্যরসাত্মক ও উপভোগ্য হতে পারে। তাদের মধ্যে আলোচনা হয় চতুর্থ টেম্পটেশন নিয়ে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এন্ড্রু জানতে পারে তারা সকলেই এক একজন সিইও ছিলেন; এবং সকলেই কোনো না কোনো টেম্পটেশনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গল্পের এই অংশটিও বেশ চমৎকার। এন্ড্রু কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই তার সামনে ঘটনাগুলো ঘটে যায়। এন্ড্রু যেন একটি গোলকধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে যায়। তবুও সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নেয়। কারণ আলোচনায় বেরিয়ে আসছে এক একজন সিইও’র এক একটি দুর্বলতার কথা। যেমন­— ...তখনই লম্বুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ঠিক এই কাজটি না করার কারণেই আমার অধপতন হয়েছে। টিম মেম্বাররা একজন আরেক জনকে চ্যালেঞ্জ করবে, এটা আমি মোটেও মেনে নিতে পারতাম না। আমি তাদের মাঝে তীব্র বা কড়া ভাষার যুক্তিতর্ক হতে দিতে ভয় পেতাম। আমার ভয় করত তারা যদি একে অপরকে খুবই ঘোরতর আক্রমণ করে বসে তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।” (পৃ. ৮০) এই যে নিজে সমালোচিত হওয়ার ভয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে ‘প্রোডাক্টিভ আইডিওলজিক্যাল কনফ্লিক্ট’ হতে না-দেয়া, এটাই চতুর্থ টেম্পটেশন। কোম্পানির উন্নয়নের জন্য এবং অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মিটিংয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে গঠনমূলক তর্কবিতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তাহলে সকলের মতামত যেমন জানা যাবে, তেমনি কোম্পানির জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা যাবে। সময় গড়িয়ে যায়। ট্রেন চলতে থাকে তার আপন গতিতে। চতুর্থ টেম্পটেশন সম্পর্কে কথোপকথন শেষ হতে-না-হতেই ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যে। এন্ড্রুকে রেখে চার্লিসহ অন্যান্যরা ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এন্ড্রু অনেক চেষ্টা করেও চার্লিদের নেমে যাওয়া থেকে বিরত করতে পারে না। এ-পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খুবই চমকপ্রদ ও রহস্যাবৃত। চার্লিদের অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়ে এন্ড্রু হন্তদন্তভাবে চার্লিদের পিছু পিছু ট্রেন থেকে নেমে যায়। সে তখন পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এতোটা উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল যে ট্রেন থেকে নামার সময় নিজের মূল্যবান ব্রিফকেসটি নিতেও ভুলে যায়, যে ব্রিফকেসে ছিল তার পরবর্তীদিনের বোর্ড-মিটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসমূহ। যা-ই হোক, এভাবে ট্রেন থেকে নেমে অনেক অনুনয়-বিনয় করে চার্লির কাছ থেকে এন্ড্রু জেনে নেয় পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে। পঞ্চম টেম্পটেশনের মূলকথা হচ্ছে : সিইও’রাও যেহেতু মানুষ, তাই তাদেরও ভুল হতে পারে; সিইও’র কোনো কাজে যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে সিইও’র উচিত বিন্দুমাত্র লজ্জা অনুভব না-করে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল করার প্রত্যাশায় নিজের ভুলগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরা এবং সবার কাছ থেকে গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া। নিজের দুর্বলতাগুলোকে লুকিয়ে না-রেখে টিম মেম্বারদের ওপর বিশ্বাস রেখে তাদেরকে গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ করে দেয়া উচিত, যা অনেক সিইও’-ই নিজের মর্যাদার কথা ভেবে টিম মেম্বারদের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে এবং গঠনমূলক তর্ক করা সুযোগ দিতে ভয় পায়। এভাবেই উদ্ভ্রান্ত এন্ড্রু চরিত্রের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে শত-সহস্র যুক্তি-তথ্য উপস্থাপন ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন সিইও’দের পাঁচটি ‘টেম্পটেশন’ তথা ‘প্রলোভন’ সম্পর্কে, যে পাঁচ প্রলোভনের ফাঁদে নিজের অজান্তেই পা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন একজন সিইও। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে- এন্ড্রুর এ-ট্রেনভ্রমণ তথা মানসভ্রমণ এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া উপর্যুক্ত ঘটনাবৃত্ত ঘটে যায় মাত্র ২০ মিনিটে। এমনকি চার্লিদের সাথে তাড়াহুড়ো করে ট্রেন থেকে নামার সময় এন্ড্রু তার যে ব্রিফকেস ফেলে এসেছিল, পরে দেখা গেল সেটাও আগের যায়গাতেই আছে। তবে কী তার সাথে কিছুই ঘটেনি! সত্যি-ই লেখক এক অদ্ভুত চমৎকারিত্বপূর্ণ রহস্যজাল তৈরি করে সাজিয়েছে ঘটনাবৃত্ত, যে রহস্যজাল উন্মোচনের জন্য গ্রন্থপাঠের কোনো বিকল্প নেই। গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে শেষ হতে বইয়ের আরও দুটি অধ্যায় বাকি থেকে যায়। দশম অধ্যায়ে লেখক পরবর্তী দিনের বোর্ড-মিটিংয়ের ঘটনাবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। কীভাবে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির বাৎসরিক বোর্ড-মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হয়, কর্মী নিয়োগে সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, কোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, অন্য কোম্পানির সাথে কোনো চুক্তি কীভাবে সম্পন্ন করা হয়, কীভাবে একজন সিইও’র কাছ থেকে তার কাজের জবাবদিহিতা গ্রহণ করা হয়, কীভাবে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ড ও কর্মপরিকল্পনাকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, কীভাবে কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় প্রভৃতি মিটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তের অতিসূক্ষ্ম বর্ণনা তুলে ধরেছেন লেখক। এমনকি চরিত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মানসিক পরিস্থিতি এবং চিন্তাভাবনাগুলোও বাণীবদ্ধ করতে ভুল করেননি। শুধু সিইও’দের জন্যেই নয়, যেকোনো পাঠকের জন্যেই এসব ঘটনাক্রম নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি অনুষঙ্গ। একাদশ অধ্যায়ে তিন বছর পরের আর একটি বোর্ড-মিটিংয়ের বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে দেখানো হয় গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সাফল্যের যাত্রায় অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।ইটির দ্বিতীয় খন্ডে লেখক এন্ড্রুর মতো বহু লিডার কীভাবে নিজেদের সামান্য ভুলের কারণে, কখনও বা নিজের অজান্তে এক বা একাধিক প্রলোভনে পা দিয়ে ব্যর্থতার আস্তাকুঁড়ে নিমজ্জিত হন, তার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। পাশাপাশি কীভাবে সে-সব কাটিয়ে ওঠা যায় সে-সম্পর্কে পরামর্শ দেন। তৃতীয় খন্ডে উপস্থাপন করেন একটি রোল মডেল, যেখানে ব্যাখ্যা করে দেখান ‘কেন এক্সিকিউটিভরা বিফল হয়’তার ইতিবৃত্ত। এ-পর্যায়ে প্রতিটি টেম্পটেশনের মূল বক্তব্যগুলো পুনরায় তুলে ধরেন লেখক, এবং এক একটি টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একজন সিইও’র কী করা উচিত, সে-সম্পর্কে একটি একটি করে ‘সিইও’দের জন্য সহজ-সরল দিকনির্দেশনা’ উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি একটি চার্ট তৈরি করে ‘পাঁচটি টেম্পটেশন দূরীকরণের উপায়’ও লিপিবদ্ধ করেছেন। একজন সিইও কোনো টেম্পটেশনে আক্রান্ত হচ্ছেন কিনা, কীভাবে তা নিজে নিজে মূল্যায়ন করবেন, সিইও’দের আত্মমূল্যায়নের এমনি একটি মডেল উপস্থাপন করে লেখক সাজিয়েছেন বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টি। নিজেকে প্রশ্নকরণের মাধ্যমে কীভাবে একজন সিইও তার মধ্যে কোনো টেম্পটেশন ভর করেছে কিনা তা মূল্যায়ন করতে পারবে, এমন উপযোগী কিছু কার্যকরী টুলসের উল্লেখ করা হয়েছে বইয়ের এই শেষ অংশে। সর্বোপরি, প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি যদিও দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও বইটি কেবল সিইও’দের কথা বিবেচনা করে লিখেছেন, তা-সত্ত্বেও বইয়ের বক্তব্যসমূহ যেকোনো মানুষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। জীবনসাফল্যের পথযাত্রায় যেকোনো মানুষেরই জীবনপথে ওঁৎ পেতে থাকা নানা প্রলোভনের ফাঁদ, যে-সব থেকে বাঁচাতে এই বইয়ের বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে সকলের উপকারে আসবে। প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র ইংরেজি ভাষায় রচিত এই মহামূল্যবান বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য খুবই উপকার সাধন করেছেন জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর। তাঁর অনুবাদের ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল, ঝরঝরে ও সহজবোধ্য। ছোট ছোট বাক্যে বক্তব্যগুলোকে তিনি এতোটা সরলভাবে বাণীবদ্ধ করেছেন যে কোথাও গদ্যের স্বাভাবিক গতিময়তা বিঘ্নিত হয়নি। যেহেতু তিনি নিজেও একজন টিম লিডার, একজন টিম লিডার হিসেবে তিনি যে মূল লেখকের বক্তব্যগুলো গভীরভাবে আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেছেন, তা গ্রন্থটি পাঠ করলে সহজেই অনুধাবন করা যায়। এতো সুন্দর একটি অনুবাদকর্মের জন্য বাংলাভাষী পাঠকদের পক্ষ থেকে অনুবাদককে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ‘অন্যরকম প্রকাশনী’ কর্তৃপক্ষকে, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। লেখক : এমএসএস শিক্ষার্থী, প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়           e-mail : arif.du.bd11@gmail.com
মীর হুমায়ূন কবীরের গবেষণাগ্রন্থ “আনিস চৌধুরীর নাটক:জীবন ও শিল্প”

আনিস চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯০) বাংলাদেশের বাংলাসাহিত্যের একজন স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। আটাশিটি ছোটগল্প ও দশটি উপন্যাসের সফল রচয়িতা হলেও নাট্যকার হিসেবেই তিনি অর্জন করেছেন সমধিক খ্যাতি। এমনকি বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও লাভ করেছেন তিনি। তবে দুঃজনক হলেও সত্য যে, এই দীর্ঘ সময় পর্বে আনিস চৌধুরীর সমগ্র নাট্যবিষয় নিয়ে মূল্যায়নধর্মী কোনো গবেষণাগ্রন্থ তো নয়-ই, কোনো গবেষণা-প্রবন্ধও রচিত হয়নি। যাকে বাংলা নাটক গবেষণার দৈন্যতা হিসেবেও চিহ্নিত করা চলে। যা-ই হোক, নাট্যকারের মৃত্যুর প্রায় পঁচিশ বছর পর এই দৈন্যদশার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন বিশিষ্ট গবেষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক, মীর হুমায়ূন কবীর (জন্ম : ৩০ অক্টোবর ১৯৮৬)। সম্প্রতি অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮-কে সামনে রেখে  প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প”। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। মূল্য ৩৬০ টাকা। “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প” মূলত মীর হুমায়ূন কবীর-এর এমফিল অভিসন্দর্ভের (২০১৫) পরিমার্জিত গ্রন্থরূপ। গবেষক প্রধানত তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করে এই গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন ‘আনিস চৌধুরীর জীবন ও মানসগঠন’। এ অংশে তিনি নাট্যকার আনিস চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠার সূত্রধরে পারিবারিক ঐতিহ্য, অধ্যয়ন-সূত্র, কর্ম-পরসর, সংসার-পর্ব, সাহিত্য-সাধনা ও রাজনৈতিক সচেতনা চিহ্নিতকরণ সহ সামগ্রিক জীবন-পরিসর তুলে ধরেছেন। সাবলীল ভাষায় গ্রন্থবদ্ধ করেছেন নাট্যকারের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য-নির্ভর উপস্থাপনা। জীবন-পরিক্রমা ও মানসবিকাশের সূত্রে শিশু ‘আনিসুজ্জামান কামরুদ্দীন’ কীভাবে হয়ে উঠলেন নাট্যকার ‘আনিস চৌধুরী’, তা বিশদ ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ সহযোগে গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করেছেন এই গ্রন্থের লেখক।     গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায় বিন্যস্ত করা হয়েছে ‘বাংলা নাট্যধারায় আনিস চৌধুরীর অবস্থান’ শিরোনামে। এ অধ্যায়ে গবেষক প্রাচীন সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের নাট্যব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে বাংলা নাটকের পথযাত্রার ইতিবৃত্ত, আনিস চৌধুরীর পূর্ববর্তী ও তাঁর সমসাময়িক বিশিষ্ট নাট্যকারদের নাটক ও নাট্যপ্রবণতা, নাটকে জীবন-উপস্থাপনের কলাকৌশল ও রীতি-পদ্ধতির অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেছেন; এবং দেশ-কাল-প্রতিবেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা নাট্যচেতনার রূপান্তরের একটি পরিপ্রেক্ষিত-পরিক্রমা উপস্থাপন করে চিহ্নিত করেছেন বাংলা নাট্যসাহিত্যের ধারায় আনিস চৌধুরীর স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা। বাংলা নাট্যধারার বিশিষ্ট নাট্যকারদের নাটক ও নাট্যপ্রবণতার সারবক্তব্য উপস্থাপন করে আনিস চৌধুরীর নাট্যপ্রবণতা সম্পর্কে যে মন্তব্য গবেষক উপস্থাপন করেছেন, তা এখানে উল্লেখকরণের দাবি রাখে : “বাংলা নাটকে আনিস চৌধুরীর স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, সমকালীন অন্য নাট্যকারদের মতো ইতিহাস, পুরাণ কিংবা হৃত-ঐতিহ্যের ধূসর জগতে বিচরণ করেননি তিনি; বরং তাঁর সমস্ত নাট্যকর্ম জুড়েই বাংলার নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত জনশ্রেণির জীবন-যন্ত্রণার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাঁর শিল্পদৃষ্টি প্রখর প্রতিবাদী না-হলেও এ শ্রেণির প্রতি তাঁর সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে যথেষ্ট।”   ‘আনিস চৌধুরীর নাটকে উপস্থাপিত জীবনের স্বরূপবৈশিষ্ট্য’ শিরোনামে গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়টি সাজিয়েছেন লেখক। অধ্যায়টি শুরু করা হয়েছে এভাবে “আনিস চৌধুরীর নাট্যভাবনা মূলত আবর্তিত হয়েছে সমকালকে কেন্দ্র করে। বিভাগোত্তর পর্যায়ে পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে নবীন সমাজের গোড়াপত্তন হয়, যে ভাঙাগড়াময় জীবনবৃত্তে তিনি বিচরণ করেছেন, সেই জীবন ও সমাজের ঘনিষ্ঠ রূপকার তিনি। নাটকের কাহিনি নির্বাচনে তিনি ইতিহাসের দ্বারস্থ হননি, দূর কিংবা নিকট অতীতকে গ্রহণ করেননি, বরং সমকালীন। ... বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভে মধ্যবিত্ত সমাজে যে নাগরিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে  তারই বাস্তব চিত্র রূপায়িত হয়েছে তাঁর নাটকে। মধ্যবিত্ত জনজীবনের বিচিত্র আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-দাহ, হতাশা-বেদনা, নৈরাশ্য-যন্ত্রণার রূপচিত্রাঙ্কনে তাঁর পারদর্শিতা বিস্ময়কর। গ্রামীণ ভূস্বামী, শাহরিক ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমজীবী নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা রূপায়ণে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর নাটকের মজিদ মাস্টার, ইনাম, কবির, আলিম, কলিম, কাইউম, রাশিদা, কিংবা মিনু সকলেরই বিচরণ মধ্যবিত্ত পরিবৃত্তে। দারিদ্র্যের কঠিন নিপীড়ন এবং উত্তরণের আকাক্সক্ষায় তারা সংগ্রামলিপ্ত। এ সংগ্রামে কেউ বিজয়ী হয়েছে, কেউ জীবনযুদ্ধে পরাজয় বরণ করে তলিয়ে গেছে অতল গহ্বরে।” এমনিভাবে আনিস চৌধুরীর নাটকের চারিত্র্য, নাট্যনির্মাণের কলাকৌশল ও রীতিপ্রকৃতি, বিভিন্ন নাটকে উপস্থাপিত প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রসমূহের সৃজনকৌশল, জীবন-বৃত্তান্ত ও জীবনপ্রবণতা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে নাট্যকারের সামগ্রিক প্রবণতার বিশদব্যাখ্যা একের পর এক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তির মালা গেঁথে উপস্থাপন করেছেন গবেষক মীর হুমায়ূন কবীর। অতঃপর তিনি একটি একটি করে নাটক ধরে ধরে প্রতিটি নাটকের চুলচেরা পর্যালোচনা করেছেন। পর্যালোচনার এই প্রক্রিয়ায় স্থান-দেয়া বারোটি নাটককে সাজানো হয়েছে দুটো পৃথক পরিচ্ছেদে। ‘বিভাগোত্তরকালের নাটক’ শিরোনামের প্রথম পরিচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে দেশ-বিভাগের পরে এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে রচিত পাঁচটি নাটক : ‘মানচিত্র’ (১৯৬৩), ‘এ্যালবাম’ (১৯৬৫), ‘প্রত্যাশা’ (১৯৬৭), ‘ছায়াহরিণ’ (১৯৬৮) এবং ‘যখন সুরভী’ (১৯৬৯)। অন্যদিকে ‘স্বাধীনতা-উত্তরকালের নাটক’ শিরোনামের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বিশ্লেষিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রচিত ‘যেখানে সূর্য’ (১৯৭৪), ‘চেহারা’ (১৯৭৯), ‘তবু অনন্য’, ‘নীলকমল’ (১৯৮৬), ‘তারা ঝরার দিন’, ‘বলাকা অনেক দূরে’ এবং ‘রজনী’ শীর্ষক সাতটি নাটক। প্রতিটি নাটক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নাটক রচনায় নাট্যকারের প্রবণতা ও স্বাতন্ত্র্য, উপস্থাপিত নাট্যকাহিনির প্লট-বিন্যাস ও ঘটনা-পরিপ্রেক্ষিত, চরিত্র-পরিচয় এবং চরিত্র-সৃজনের যৌক্তিকতা সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, চরিত্রানুগ সংলাপ তৈরির কারিশমা, ভাষা-শৈলী ও অলংকার উপস্থাপনের অভিনবত্ব অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায়, অথচ সুগভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনা করেছেন গবেষক। এ-গ্রন্থ সম্পর্কে গ্রন্থের ‘প্রস্তাবনা’ অংশে গবেষণাকর্মটির তত্ত্বাবধায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর গিয়াস শামীম যথার্থই বলেছেন “... এ-গ্রন্থে আনিস চৌধুরীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। বিশেষত পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, আকাঙ্ক্ষিত কর্মপরিসর এবং অনুকূল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ তাঁর জীবন ও মানস গঠনে কতটুকু কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে তা তথ্যপ্ রমাণযোগে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। সর্বমোট বারোটি নাটকের পর্যালোচনাসূত্রে তিনি দেখিয়েছেন, আনিস চৌধুরী মূলত মধ্যবিত্ত জীবনের নিপুণ রূপকার এবং সমকাল-পরিসরে তিনি ছিলেন দলছুট ও স্বতন্ত্র। প্রকৃতপক্ষে আনিস চৌধুরীর নাট্যবিষয়ে প্রণীত এ-গ্রন্থ বাংলাদেশের গবেষণা-সাহিত্যে একেবারেই অভিনব। ইতঃপূর্বে তাঁর সমগ্র নাট্যবিষয়ে মূল্যায়নধর্মী একটি প্রবন্ধও রচিত হয়নি। সেই বিবেচনায় এই গবেষণাকর্ম নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবহ। গবেষণা-অভিসন্দর্ভ প্রণয়নে লেখক তাঁর সর্বোচ্চ অভিনিবেশ প্রয়োগ করেছেন; প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তযোগে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। বক্তব্যবিন্যাসে ও বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন পূর্বাপর তথ্যনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী। আমার বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যবিষয়ক ‘গবেষণায় আনিস চৌধুরীর নাকট : জীবন ও শিল্প’ একটি প্রশংসনীয় কাজ।”   অধ্যাপক ডক্টর গিয়াস শামীম-এর সাথে সহমত প্রকাশ করে বলা যায়, গবেষক মীর হুমায়ূন কবীর-এর “আনিস চৌধুরীর নাটক : জীবন ও শিল্প” প্রকৃতবিচারেই বাংলা সাহিত্যবিষয়ক গবেষণায় একটি প্রশংসনীয় কাজ। নাট্যকার আনিস চৌধুরীর জীবন-পরিসর, নাট্যদৃষ্টি ও নাট্যকর্ম বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গবেষকের স্বতন্ত্র অনুসন্ধিৎসু শ্যেনচক্ষু সর্বত্রই সজাগ থেকেছে। লেখক: সহযোগী সম্পাদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গবেষণা পত্রিকা (বাংলা ও ইংরেজি)          e-mail: arif.du.bd11@gmail.com

যে প্রবন্ধগুলো রয়েছে ‘কবি শহীদ কাদরী ও অন্যান্য প্রবন্ধ‘ প্রন্থে

তান্ত্রিকগণ। আটটি প্রবন্ধের একটি বৃক্ষ। তবে এটি কোনো একজাতীয় বৃক্ষ নয়। এর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের ডালপালা। রয়েছে বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের গুণিনদের উপস্থিতি। রয়েছে তাঁদের কাজ এবং অবস্থানের কথা। প্রতিটি রচনায় আমি সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এই সময় হয়তো একদিন নতুন সময়ের হাতে তার উত্তরাধীকারের স্বীকৃতি দেবে। বাংলা গদ্য সাহিত্যে এমন কাজ প্রচুর রয়েছে। তাই প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধে আমি প্রেক্ষাপট এবং রচনার ভাষাভঙ্গী ও রীতি প্রয়োগে স্বকীয় অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। বাকিটুকু পাঠক আবিস্কার করে নিতে পারবেন। ‘যাদুরবংশীবাদক মার্কেজ‘। ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এর সাহিত্য কর্মের বিষয়ে রচিত এই প্রবন্ধ। ম্যাজিক রিয়েলিজমের এই যাদুকরকে আমি নানান দিক থেকে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করেছি। তাঁর লেখক জীবনের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব রচনা তিনি রেখে গেছেন, প্রায় প্রত্যেকটি লেখা ও সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। উঠে এসেছে মার্কেজের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক চিন্তা ও দর্শন। আমি মনে করি এই প্রবন্ধে পাঠক একসাথে পেয়ে যাবেন তাঁকে। যে কোন পাঠক মার্কেজকে পাঠের পূর্বে এই প্রবন্ধ পাঠ করলে তাঁর রচনা বুঝতে অনেক সহজ হবে বলেও মনে করি। কেননা যে কোন সাহিত্যিকের বই পাঠের পূর্বে তাঁকে চেনা এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশের সাথে পরিচিত হওয়া জরুরি বলে মনে করি। ‘তখন টেড হিউজ অন্য নারী শয্যায় ছিলেন‘। ব্রিটিশ কবি টেড হিউজ এবং আমেরিকান-ব্রিটিশ কবিসিলভিয়া প্লাথ সম্ভবত ইংরেজি সাহিত্যের সবেচেয় বেশি আলোচিত নিজেদের ব্যক্তিগত এবং সাহিত্যের কারণে। আত্মবিধ্বংসী কবি সিলভিয়াপ্লাথের মৃত্যুর এতো বছর পরও রহস্যের খোলস উন্মোচনে এখনো চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওরসেস্টার কলেজের শিক্ষক, গবেষক স্যার জোনাথন বেট, ‘টেড হিউজ: দি আনঅথরাইজড লাইফ‘ নামে এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটি ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয় (আমার রচনাটি এই গ্রন্থ প্রকাশের কয়েকদিন পূর্বে রচিত)। সেখানে তিনি সিলিভিয়া প্লাথ আত্মহত্যার সময় স্বামী টেড হিউজ কোথায় ছিলেন এবং সেই মুহুর্তের দৃশ্য উপস্থাপন এবং তা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। গ্রন্থটি প্রকাশের আগেই ব্রিটেন, আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বে আলোচনার ঝড় ওঠে। তারই প্রেক্ষাপট আমার আগ্রহের স্থান। ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবশালী এই দুই কবি সব সময় আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলো। সেজন্যেই এ রচনায় আমি প্রসঙ্গের সাথে তুলে এনেছি আরো বিস্তারিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘স্ট্রে বার্ড‘স‘ এর চায়না অনুবাদ নিয়ে তুমুল বিতাণ্ডা শুরু হয়েছিলো একবার। গ্রন্থটির অনুবাদ করেছিলেন চীনের তরুণ লেখক ফ্যাং টাং। তাঁর রচনার প্রেক্ষাপটে আমার প্রবন্ধ ‘ তীব্র সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথের স্ট্রে বার্ড‘স এর চায়না অনুবাদ‘। এই অনুবাদ গ্রন্থ নিয়ে ব্রিটেন-আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারত-চীনসহ পুরো বিশ্বে সমালোচনা চলে। তবে এ নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা তো দূরে থাক বেশ কয়েকজন তুখোড় সাহিত্যকর্মীর সাথে আলোচনা করে বুঝি তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। ব্রিটেনের দি গার্ড়িয়ান, ডেইলী মেইল, ডেইলি টাইম, বিবিসি থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো এ নিয়ে মেতে ওঠে। বাংলাদেশে একমাত্র দৈনিক সমকাল এর ‘কালোর খেয়া‘ তে আমার এ সংক্রান্ত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। সেই আগ্রহ থেকেই প্রবন্ধটি এই গ্রন্থভুক্ত করলাম। ‘নীলপদ্মের উদ্যান জিংকি বয়েস‘। নোবেল বিজয়ী বেলারুশের সাংবাদিক সেটলানা আলেক্সিয়ভিস এর রিপোর্টিংধর্মী উপন্যাস ‘জিংকি বয়েস‘ বিষয়ে আমার এই প্রবন্ধের অবতারণা। ২০১৫ সালে তাঁর নোবেল বিজয়ের পর পরই এটি রচনা করি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র এই উপন্যাসের পটভূমি। তাতে যুদ্ধবিরোধী এই সাংবাদিক মানবিকতা ভুলণ্ঠিত হওয়ার দৃশ্য তুলে এনেছেন অনুপুঙ্খ। সাংবাদিকের চোক যখন ঔপন্যাসিকের চোখ হয়ে ওঠে তখন দৃশ্য কেমন হয়, সেই বিষয়টি উঠিয়ে আনার জন্যই আমার এই রচনা। আমি কবি আবুল হাসান-এর রচনাকে সব সময় বুকে আগলে রেখেছি। এখানে সেখানে চিরিকুটের মত অসংখ্য কথা তাঁকে নিয়ে লিখেছি। এই গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধ ‘অনন্তযাত্রার কবি আবুল হাসান‘ সম্ভবত পূর্ণাঙ্গ রচনা। তাঁকে নিয়ে অসংখ্য রচনা রয়েছে। তবে কোন রচনা আমার দেখার দৃষ্টির সাথে এক নয়। আমি আবুল হাসানকে পাশ্চাত্যের আলো ফেলে নতুনভাবে আবিস্কার করেছি। এতে করে আমি আবারো বুঝতে পেরেছি সব ভাষার কবিতার সুর কিন্তু এক। এর চিন্তা, দর্শনও এক। কেবল কবির ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন। এটি আবুল হোসেনকে দিয়ে আমি আবিস্কার করেছি। শহীদ কাদরী দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কবি। রচনার বহর খুব বেশি নয়, কিন্তু জনপ্রিয়। তাঁকে নিয়ে রচিত আমার প্রবন্ধ ‘পাখি জীবনের কবি শহীদ কাদরী‘। এতে আমি মূলত বলতে চেয়েছি নতুন কোন কবিতা রচনা না করার ভেতর দিয়ে কবি কিভাবে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আমি বলতে চেয়েছি একজন কবি সব সময় কবিতা রচনা করেন। এমন কি কবি মৃত্যুর পরেও কবিতা রচনা করেন। অনেকেই বলে থাকেন শহীদ কাদরী প্রবাস জীবনে তেমন কোর কবিতা রচনা করেন নি। এই কথাটিকে আমি ভুল প্রমাণ করেছি। বলেছি তিনি কখনো কাব্য রচনা থেকে বিরত থাকেন নি। এটি গভীর নীরিক্ষণের বিষয়। কবি শামীম আজাদ এর কাব্যগ্রন্থ ‘জিয়ল জখম‘ নিয়ে আমার রচনা ‘দীর্ঘ সহবাসের জিয়ল জখম‘। কবির অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ থেকে আমি বিশেষ কারণে এটি নির্বাচন করেছি। আমার মনে হয়েছে এখানে কবি শামীম আজাদ নিজেকে মেলে ধরেছেন। এখানে তিনি চিন্তা, ভাষা, দর্শন, পারিপার্শ্বিকতা, প্রকৃতি নিয়ে নতুন কাব্যভাষা তৈরি করেছেন। কবি বিলেতে অবস্থান করেন বলে তাঁর কাব্যভঙ্গি যে নতুন বাঁক নিতে দেখেছি তাকে তুলে ধরার জন্যই আমার এই রচনা। বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় হুমায়ূন আজাদ বিষয়ে আমার রচনা ‘তান্ত্রিক হুমায়ুন আজাদ‘। এতে হুমায়ুন আজাদ এর সাথে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতর্পণের মাধ্যমে তুলে এনেছে তাঁর অভিব্যক্তিক চেহারা। যেখানে একজন হুমায়ুন আজাদকে আমি দেখেছি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রভাব বিস্তারি ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সম্ভবত হুমায়ুন আজাদই একমাত্র সাহিত্যিক যাঁর মধ্যে কোনো রকম রাগঢাক ছিলো না। তিনি স্পষ্টভাষী এবং চিন্তুক। আমার এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর রাজকীয় চেহারা উপস্থাপন করতে চেয়েছি।   লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক টিকে

আল মাহমুদের কবিতায় নারী ও প্রেম

ছয় দশকের অধিক সময় ধরে সাহিত্য সৃষ্টির পথে হাঁটছেন বিশিষ্ট কবি আল মাহমুদ। গদ্য-কবিতা মিলে তার রচনাসম্ভারের পরিধি অনেক বিস্তৃৃত। দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের কারণে তিনি গ্রহণযোগ্যতার ভিন্ন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন। নতুন দার্শনিকতায় নিজের অবস্থান স্থির করেছেন। ফলে পূর্বের অনুরক্তদের সঙ্গে তার দূরত্ব রচিত হয়েছে। নন্দিত-নিন্দিতকালের সাহিত্যে তার দর্শনগত পরিবর্তন সহজবোধ্য হয়ে উঠেছে। আল মাহমুদ অকপটে স্বীকার করেন, তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো প্রেম ও নারী। তবে নারী ও সৌন্দর্যকে তিনি আলাদা করে দেখতে চান। এক নারী একজনের কাছে সুন্দর, অন্যের কাছে তা না-ও হতে পারে। তাই আল মাহমুদ নারীকে সৌন্দর্য না বলে আকর্ষণীয় বলতে চান। তার মানে নারী আকর্ষণ করে, তার মধ্যে আকর্ষণ করার শক্তি আছে। সেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বলেই নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় এত ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি আর্টের অংশ হিসেবেই দেখতে চান। কবি তার ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতায় লিখেছেন— ‘বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল/ পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না/ তুমি যদি খাও তবে আমাকে দিও সেই ফল/ জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হবো চিরচেনা/ পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা/ দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।’ আবার তিনি লিখেছেন—‘আমার চুম্বন রাশি ক্রমাগত তোমার গতরে/ ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল/ এর ব্যতিক্রমে বানু এ-মস্তকে নামুক লানৎ/ ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।’ `লোক লোকান্তর`-এর `সিম্ফনি` কবিতায় শুধু নারীর শরীরকে আরাধ্য করেননি কবি, কবিতার চরণসজ্জায় আবরণহীন শব্দের আভরণ স্থান করে নিয়েছে। কবি লিখেছেন- `শঙ্খমাজা স্তন দুটি মনে হবে শ্বেতপদ্ম কলি/লজ্জায় বিবর্ণ মন ঢেকে যাবে ক্রিসেনথিমামে`। `নূহের প্রার্থনা` কবিতায়ও নারী-পুরুষ সম্পর্কই মুখ্য স্থান গ্রহণ করেছে। লিখেছেন ‌`আবার করবো পান বুকের এ উৎস ধারা হতে/জারিত অমৃত রস/এতোদিন যৌবনের নামে/যা ছিল সঞ্চিত এই সঞ্চারিত শরীরের কোষে/হে নূহ সন্তান দেবো, আপনাকে পুত্র দেবো`। `শোকের লোবান` কবিতা নিবেদিত নারীর দাবি পূরণের গল্প-ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন `তামসিক কামকলা শিখে এলে/যেন এক অক্ষয় যুবতী/তখন কবিতা লেখা হতে পারে একটি কেবল/যেন রমণে কম্পিতা কোনো কুমারীর/নিম্ননাভিমূল`। `কালের কলস` গ্রন্থের `শূন্য হাওয়া` কবিতায় কামবিন্দুকে ঘিরে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের সম্পর্কের চরণবৃত্ত গড়ে উঠেছে- `ঘুমের ছল কামের জল/এখনো নাভিমূলে/মোছেনি তবু আবার এলো/আগের শয্যায়।` আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম মীর আবদুস শাকুর আল মাহমুদ। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার তেমন সুযোগ হয়নি তার জীবনেও। স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে সাহিত্য রচনায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে তার পেশা জীবন শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় লেখালেখি চালাতে থাকেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ `লোক লোকান্তর` (১৯৬৩) তাকে প্রথমসারির আধুনিক বাংলা কবিদের কাতারে নিয়ে আসে। কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬) কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা কবিতায় তার আসনকে অনিবার্য ও পাকাপোক্ত করে দেয়। তারপর লিখেছেন আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া ইত্যাদি কাব্য। তার গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধ বনিক, ময়ূরীর মুখ ইত্যাদি। আর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে কবি ও কোলাহল, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, ত্রিশিরা প্রভৃতি। আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ গল্প ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাসও আলাদা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।    

নজরুলের সাম্যবাদ ও তার উৎস-সন্ধান

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণে বলেছেন আমার কাব্য আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে। বিনা কারণে তিনি কিছুই সৃষ্টি করেন নাই। ‘এ নহে বিলাস বন্ধু...‘ গানে যেন তিনি এ কথাই বলেছেন। একজন মহাপুরুষকে বুঝতে হলে তাঁর আগমনকালীন সমাজ ব্যবস্থা, পরিবেশ-পরিস্থিতিকে বুঝতে হয়। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে চুরুলিয়ায় তাঁর জন্ম। ন’বছর বয়সে হন এতিম। পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের বিচার বিভাগের উচ্চ পদস্থজন। কাজী উপাধি তারই সাক্ষ্য বহন করে। একটি পরাধীন দেশে তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতের সব কিছু লুটপাট করে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে পাচার করছিল। দারিদ্রের কষাঘাত, ধনী-গরীবের আকাশ-পাতাল তারতম্য, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, মারামারি, হিন্দু-মুসলমানে দিন রাত হানাহানি ইত্যাদি ছিল সেই সময়ের চিত্র। ১৯১৯ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যখন নজরুল সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীর ৭২ শতাংশ রাষ্ট্র ছিল উপনিবেশ, আর প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ ছিল পরাধীন। উপনিবেশ আর পরাধীনতার কষাঘাতে জর্জরিত মানুষ, পর্যুদস্ত মানবতা। অপরদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রেও যে সকল মানুষ সুখী নয় তা তো বলাই বাহুল্য। মোটকথা, পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পদ, ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কতিপয় লোকের হাতেÑ যা তখনও ছিল এখনও আছে। নজরুল এসেছিলেন সব ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য। কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদের এমন জোরালো প্রবক্তা পৃথিবীতে কোনো কবি-সাহিত্যিক পৃথিবীতে আমাদের জানামতে আর কেউ নেই। বলাবাহুল্য নজরুলের সাম্যবাদ হৃদয়লব্ধ বস্তু। প্রজ্ঞার চেয়ে আবেগের প্রাধান্য তার মধ্যে বেশি। অনেক জায়গায় উচ্ছ্বাসের মুখে নজরুল কবিতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেননি। এতদসত্ত্বেও তাঁর সাম্যবাদের মধ্যে যে সমাজ সচেতনতা, যে সংস্কার মুক্তিপ্রবণতা ও যে সাম্যপ্রীতি প্রকাশিত হয়েছে তা অনন্যসাধারণ। নজরুলের সাম্যবাদে ঈশ্বরের অস্বীকৃতি নেই। নজরুলের সাম্যবাদী উক্তি তাদের বিষয়েই, যারা মানুষের সমাজে কৃত্রিম ভেদাভেদ রচনা করে নিজেদের স্বার্থসাধনে রত। এই জগতে সকলেই অসাধু ভণ্ড নয়; কেননা   ‘অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান।’ কাম, প্রলোভন ইত্যাদি মানবিক প্রবৃত্তি তো দেহধারী মাত্রের মধ্যেই উপস্থিত, কিন্তু এদের জয় করার সাধনস্পৃহাও সকল হৃদয়ে বর্তমান। নজরুলের সাম্যবাদে মানবিক দুর্বলতা স্বীকৃত এবং সেই সঙ্গে এই দুর্বলতাকে জয় করে নবসমাজ গঠনের ইঙ্গিতও পরিস্ফুট। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতাটিতে তিনি পতিতা নারীর মাতৃত্বকেই মা বলে সম্বোধন করেছেন। পতিতাবৃত্তিকে তিনি সতীকর্ম বলেননি। কামনার পথেই সন্তান আসে। পতিতার ক্ষেত্রে এই কামনা অবৈধ সন্দেহ নেই। কিন্তু পতিতার ভাল হবার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়াকে নজরুল সমর্থন করেননি। কেননা ‘পাপ করিয়াছি বলিয়া নাই কি পুণ্যের অধিকার? ‘ অসৎ চরিত্রের জন্যে যেমন নারী পতিতা হয়, তেমনি চারিত্রিক দোষের জন্যে নরকেও পতিত করা উচিত। নরনারীকে সমান সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবার আকাক্সক্ষা থেকেই নজরুলের ‘বারাঙ্গন‘, ‘নারী’ প্রভৃতি কবিতার জন্ম। [নজরুল-চরিত মানস, ড. সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা (এপ্রিল ২০১২) পৃ. ১৬৬] নজরুলের সাম্যবাদ সর্বব্যাপী, সর্বপ্লাবী। এর মধ্যে নেই কোনো অস্পষ্টতা, নেই কোনো ভণিতা-ভণ্ডামি। এটি অবশ্য নজরুল-মানসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যে, তিনি যা বিশ্বাস করেছেন তাই বলেছেন এবং যা বলেছেন তাই করেছেন। কোনো কিছু পাশ কাটিয়ে মহাকাব্য রচনার কবি তিনি নন। বরং সবকিছুকে হৃদয়ে ধারণ করে, জীবনের সবটুকু আকুতি দিয়ে মানবমুক্তির সনদ রচনার মহামানব তিনি। তিনি কবিÑ এটি তার আংশিক পরিচয়; প্রকৃত অর্থে গোটা পৃথিবীকে সৌন্দর্যময় মহাকাব্যে রূপান্তরের মহাকবি তিনি। সেই অর্থে তিনি মানবকুলের অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অন্যতম। মানুষকে নিয়েই পৃথিবী, মানুষের সুখ-শান্তির মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীর সৌন্দর্য। মানুষ বলতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকেই বুঝতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই যদি সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, প্রতিটি মানুষের যদি মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা মেলে, তবেই পৃথিবী সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হবে। আর এমন পৃথিবীই মানব জাতির সকলেই কামনা করেন, কেবল অত্যাচারীরা ব্যতীত। সুন্দর পৃথিবী-প্রত্যাশী মানবগোষ্ঠীর মধ্যে মুষ্ঠিমেয় যে ক’জন নকীবের ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদেরই অন্যতম কাজী নজরুল ইসলাম। চলমান ঘুণেধরা বিশ্বব্যবস্থার ভিত্ কাঁপানো নজরুলের শ্রেষ্ঠতম কবিতা  ‘বিদ্রোহী’ যেন মানবমুক্তির আকুল-আকুতি যার শেষাংশে নজরুল-মানস পরিস্ফূটিত হয়েছে এভাবে  ‘মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি  সেই দিন হব শান্ত! ’ (বিদ্রোহী: কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল কেবল সাম্যের বাণী প্রচার করেননি, তিনি অসাম্যের কদর্য রূপটি প্রত্যক্ষ করেছেন, এর ভয়াবহতা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর সকল কর্ম ও সাধনা দিয়ে সব ধরনের অসাম্য দূর করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সেই পথচলায় সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের গোটা সাহিত্য, রেখে গেছেন মানবমুক্তির চিরকালীন উপাদান। নজরুলের সাম্যবাদ চাপিয়ে দেয়া কোন বিষয় নয়, কারও দয়ার দানও নয়। বরং এটি প্রকৃতির আইনেরই অংশ যা অলঙ্ঘণীয়। এ পৃথিবীর মালিকানা কোন ব্যক্তি, জাতি, গোষ্ঠী বা দেশ বিশেষের নয়। মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহর সৃষ্ট জীব হিসেবে সকল মানুষের সমঅধিকার রয়েছে সবকিছুর মধ্যে। আর এটিই সাম্যের মূলমন্ত্র। নজরুলের ভাষায় রবি শশী তারা প্রভাত-সন্ধ্যা তোমার আদেশ কহে ‘এই দিবা রাতি আকাশ বাতাস নহে একা কারো নহে। এই ধরণীর যাহা সম্বল বাসে-ভরা ফুল, রসে ভরা ফল, সু-স্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখির কণ্ঠে গান, সকলের এতে সমঅধিকার, এই তাঁর ফরমান!’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) সাদা আর কালোর মধ্যে কোন বৈষম্য আনয়নের নৈতিক বা আইনগত অধিকার কারোর নেই। কেননা শ্বেত পীত কালো করিয়া সৃজিলে মানবে, সে তব সাধ। আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ! তুমি বল নাই, শুধু শ্বেতদ্বীপে জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে, সাদা র’বে সবাকার টুঁটি টিপে, এ নহে তব বিধান।’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) কিন্তু বিধির বিধানকে পদদলিত করে অসাম্যের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে অস্থির করে রেখেছে মানুষ নামধারী লোভী আর ঈর্ষাতুর কতিপয় পাপাত্মা। এরা কখনো রাজা, কখনো জমিদার, কখনো বা মহাজন সেজে অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন করে। নজরুলের কলমে তা ফুটে ওঠেছে এভাবে তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী, রসনা তাহার শ্যামল ধরায় করিছে সাহারা গোবী! মাটির ঢিবিতে দু’দিন বসিয়া রাজা সেজে করে পেষণ কষিয়া! সে পেষণে তারি আসন ধসিয়া রচিছে গোরস্থান! ভাই-এর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে বীরের আখ্যা পান!’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) মানুষে মানুষে যারা বৈষম্যের জগদ্দল পাথর সৃষ্টি করে যাচ্ছে তাদের মূলোৎপাটন তো দূরের কথা, উল্টো তাদেরকে বীরের আখ্যা দেয়া হয়। প্রকৃতির বিধানের সাথে এ যেন এক নির্মম পরিহাস। কবি এ চিত্রটি এঁকেছেন এভাবে-           জনগণে যারা জোঁকসম শোষে তারে মহাজন কয়,           সন্তানসম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।                    মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,                    মাটির মালিক তাঁহারাই হন           যে যত ভণ্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান্। নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান। (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) কিন্তু বৈষম্য সহ্য করা কোন মানুষেরই উচিত নয়। অত্যাচারিতদের বাহ্যত দুর্বল মনে হলেও কার্যত এরাই শক্তিশালী। কেননা এদের যে কেবল সংখ্যাধিক্যের শক্তি রয়েছে তা-ই নয়, এদের রয়েছে সততার অপরাজেয় শক্তি। অত্যাচারিতদের অপরিমেয় সেই শক্তির উদ্বোধন কামনা করেছেন নজরুল। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে তিনি শত শতাব্দীর ঘুম ভেঙে সামনে যাবার স্বপ্ন-সাহস দেখিয়েছেন, অধিকার-হারা মানবগোষ্ঠীকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছেন, তাদের শিখিয়েছেন দৃপ্ত উচ্চারণ- তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে করিব ভোগ, এই পৃথিবীর নাড়ী সাথে আছে সৃজন-দিনের যোগ। তাজা ফুলে ফলে অঞ্জলি পুরে বেড়ায় ধরণী প্রতি ঘরে ঘুরে, কে আছে এমন ডাকু যে হরিবে আমার গোলার ধান? আমার ক্ষুধার অন্নে পেয়েছি আমার প্রাণের ঘ্রাণ এতদিনে ভগবান! (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) যারা উদার আকাশে কালিমা লেপন করছে, শান্তির বেলুন যারা গুলির আঘাতে জর্জরিত করছে, তাদের মূলোৎপাটন করতে না পারলে সত্যিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই তো নজরুল-কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে- যে-আকাশ হ’তে ঝরে তব দান আলো ও বৃষ্টি-ধারা সে-আকাশ হ’তে বেলুন উড়ায়ে গোলাগুলি হানে কারা? উদার আকাশ বাতাস কাহারা করিয়া তুলিছে ভীতির সাহারা? তোমার অসীম ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে কা’র কামান? হবে না সত্য দৈত্য-মুক্ত? হবে না প্রতিবিধান? (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) অসাম্যের প্রতিবিধান অবশ্যই হবে। কারণ ‘সাম্য’ সত্য। আর অসাম্য হ’ল দৈত্যরূপী মিথ্যা। দৈত্যের হাত থেকে সত্যকে মুক্ত করে সুন্দর পৃথিবী প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নজরুলকে আমরা পাই আপোসহীন হিসেবে, একজন নিরন্তর সাধক হিসেবে। তাঁর এ সাধনাকে দেখেছেন ‘সুন্দরের সাধনা’ হিসেবে। মানবসৃষ্ট অসাম্যের সকল প্রাচীর ভেঙে নজরুল সাম্যের গান শুনিয়েছেন। মানব-সাগরে তিনি সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং সাম্যের বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন- গাহি সাম্যের গান- যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম ক্রীশ্চান। (সাম্যবাদী : কাজী নজরুল ইসলাম) সাম্যের এমন সাবলিল আহ্বান কেবল বাংলা সাহিত্যেই নয়; বরং বিশ্ব সাহিত্যেও আর কোন কবির কাব্যে আমরা পাইনি। তিনি মানুষকে দেখেছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে। মানুষের মধ্যে তিনি পারস্পরিক আত্মার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। ফলে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সাম্যের সুললিত বাণী গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্। নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- (মানুষ : কাজী নজরুল ইসলাম) মানুষ এমন জীব যার মাঝে স্বয়ং স্রষ্টার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাজেজা। কিন্তু মানুষ যখন আপন স্রষ্টাকে আপনার মাঝে না খুঁজে অন্যত্র খুঁজে বেড়ায়, তখন একদিকে যেমন স্রষ্টার সাথে তার সহজাত সম্পর্কে ছেদ ঘটে, ঠিক তেমনি বিব্রত বোধ করেন স্বয়ং স্রষ্টা, অপদস্থ হয় গোটা মানব-সত্তা। তাই স্রষ্টাকে খুঁজতে হবে নিজের মধ্যে। তাতে স্রষ্টা এবং সৃষ্টি উভয়ের মাঝে সহজাত সম্পর্কটি অটুট থাকবে এবং মানুষ তার মর্যাদার জায়গাটি ধরে রাতে সক্ষম হবে। কে তুমি খুঁজিছ জগদীশে ভাই আকাশ-পাতাল জুড়ে? কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে? হায় ঋষি-দরবেশ, বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ! সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে, স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে! (ঈশ্বর : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল প্রতিটি মানুষের মাঝেই স্রষ্টাকে প্রত্যক্ষ করেন। মানব-হৃদয় হ’ল স্রষ্টাকে পাবার তীর্থস্থান। ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই’ কিংবা ‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত/ সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে/ মানুষেরে তুমি যত কর ঘৃণা/ খোদা যান তত দূরে সরে সাম্যের এসব অমোঘ বাণী যাঁর কাব্য-কাননে জোরে-শোরে বিঘোষিত হয়েছে, তিনি আমাদের নজরুল, সাম্যের সার্থক রূপকার এক অনন্য মহাপুরুষ। নজরুলের সাম্যের রূপরেখাটি এরকম গাহি সাম্যের গান বুকে বুকে হেথা তাজা সুখ ফোটে, মুখে মুখে তাজা প্রাণ! বন্ধু এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র-ধনী, হেথা পায় না ক’ কেহ ক্ষুদ-ঘাঁটা, কেহ দুধ-সর-ননী। অশ্ব-চরণে মোটর-চাকায় প্রণমে না হেথা কেহ, ঘৃণা জাগে না ক’ সাদাদের মনে দেখে হেথা কালা-দেহ। সাম্যবাদী স্থান নাই কো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান। (সাম্য : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল পাপকে ঘৃণা করেছেন, কিন্তু পাপীকে নয়। চোর-ডাকাত, মিথ্যাবাদী তথা সকল পাপীর প্রতি তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন পরম মমতার হাত। সাম্যের গান গাই যত পাপী-তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই। (পাপ : কাজী নজরুল ইসলাম) আদম হইতে শুরু ক’রে এই নজরুল তক্ সবে কম-বেশি করে পাপের ছুরিতে পুণ্যে করেছে জবেহ্। বিশ্ব পাপস্থান অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান ধর্মান্ধরা শোনো অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো! (পাপ : কাজী নজরুল ইসলাম) একজন পাপীকে এমন করে ভালবাসা যিনি দিতে পারেন, তিনিই তো আমাদের নজরুল। কিন্তু তাই বলে পাপকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। উমর ফারুক (রা.) যখন মদ্যপানের অপরাধে আপন ছেলেকে দোররা মেরে হত্যা করেন, সেই বিষয়টিকে নজরুল দ্বিধাহীনভাবে চিত্রিত করেছেন এভাবে এত যে কোমল প্রাণ, করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক’ অপমান! মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে মেরেছ দোর্রা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের প’রে। ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি ‘অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী!’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক (রা.) সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাম্যের এ বিধান এমনি কঠোর এবং অলঙ্ঘণীয় যে, তা আত্মীয়-অনাত্মীয় মানে না, এমনকি পিতার হাতে পুত্রকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও সামান্যতম বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। এমন সাম্যই তো নজরুলের আরাধ্য। তাই তো তিনি লিখেছেন আবু শাহমার গোরে কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে। (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) হযরত উমর ফারুককে নিয়ে নজরুল যে ‘নান্দীপাঠ’ রচনা করেছেন তা বিশ্ব সাহিত্যের সেরা সম্পদ। কিন্তু কেন এ নান্দীপাঠ? নজরুল নিজেই এর জবাব দিয়েছেন ... হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট! অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ, মানুষেরে তুমি বলেছো বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই! (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের সাম্যের সুমহান আদর্শকে হযরত উমর (রা.) বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসে যে উপমা স্থাপন করেছেন তা নজরুলকে আলোড়িত করেছে। তিনিও এমন সাম্যই প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়, রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রে কোন তফাৎ থাকে না, দরিদ্রের কুটিরে স্বয়ং খলিফা আপন পিঠে করে খাবারের বোঝা পৌঁছে দেন, ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়ে খলিফা সে উটের রশি ধরে তপ্ত মরুতে এগিয়ে চলেন। ইসলামের সাম্যের বিধানের সার্থক প্রয়োগকারী উমর ফারুকের মধ্যে নজরুল দেখেছেন একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। মদীনা থেকে জেরুজালেম যেন সাম্যের এক মহাগাঁথা। সেই মহাগাঁথার মহাকবি হযরত উমর ফারুক (রা.)। আর নজরুলের কলমের তুলিতে তা হয়ে উঠেছে অনবদ্য। সাম্যের সেই মহানায়কের জেরুজালেম যাত্রাকে নজরুল যেভাবে চিত্রিত করেছেন তা নিম্নরূপ হেরি পশ্চাতে চাহি তুমি চলিয়াছ রৌদ্র্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি। দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা, বলেছে শত্র“ শেষে উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর দেয় এসে! হায় রে! অর্ধেক ধরার মালিক আমিরুল মুমিনীন শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন। সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু’খানা শুকনো ‘খবুজ’ রুটি, একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু-তিন মুঠি! প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি চলেছে মাত্র একটি ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি! মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে, সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর ’পরে। কিছুদূর যেতে উট হতে নামি কহিলে, ‘ভৃত্যে ভাই, পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এই বার আমি যাই উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বসো উটে; তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে!’   ... ভৃত্য দস্ত চুমি কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ করো তুমি? উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’   খলিফা হাসিয়া বলে, ‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে! রোজ-কিয়ামতে আল্লা যেদিন কহিবে, উমর! ওরে, করেনি খলিফা মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে!’ কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই? আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু! মোর অধিকার নাই আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা! ইসলাম বলে সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কে-বা!’ ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি, মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী! জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কি- না, কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি, বিশ্ববীণা! জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব,- অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব!’...   আসিলে প্যালেস্টাইন, পারায়ে দুস্তর মরুভূমি, ভৃত্য তখন উটের উপরে, রশি ধরে চলো তুমি! জর্ডন নদী হও যবে পার, শত্র“রা কহে হাঁকি ‘যার নামে কাঁপে অর্ধ পৃথিবী, এই সে উমর নাকি?’ খুলিল রুদ্ধদুর্গ-দুয়ার! শত্র“রা সম্ভ্রমে কহিল- ‘খলিফা আসেনি, এসেছে মানুষ জেরুজালেমে!’ সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্র“-গির্জা ঘরে বলিলে, ‘বাহিরে যাইতে হইবে এবার নামাজ তরে!’ কহে পুরোহিত, ‘আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়, পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?’ হাসিয়া বলিলে, ‘তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ নামাজ আদায় করি, তবে কাল অন্ধ লোকসমাজ ভাবিবে- খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি আজ হতে যেন এই গির্জারে মোর মসজিদ করি! ইসলামের এ নহে কো ধর্ম, নহে খোদার বিধান, কারো মন্দির গির্জারে করে ম’জিদ মুসলমান!’ কেঁদে কহে যত ঈসাই ইহুদি অশ্র“-সিক্ত আঁখি ‘এই যদি হয় ইসলাম- তবে কেহ রহিবে না বাকি, সকলে আসিবে ফিরে গণতন্ত্রের ন্যায় সাম্যের শুভ্র এ মন্দিরে!’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল এমন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সকলে মিলে ন্যায় ও সাম্যের শুভ্র ঠিকানা প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে মানুষের মাঝে পারস্পরিক কোন ভেদাভেদ থাকবে না। এমনকি পাপী-তাপী, চোর-ডাকাতদেরও মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সার্বিক প্রয়াস চালানো হবে পরম মমতায়। চোর-ডাকাত কবিতায় কবি বিশ্বব্যাপী অসাম্যের কারণ অনুসন্ধানে প্রয়াসী হয়েছেন। প্রচলিত অর্থে আমরা যাদের চোর-ডাকাত হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেই এবং সমাজচ্যুত করি, এদের চেয়েও ভয়ংকর হ’ল তারা যারা অন্যের সম্পদ লুট করে ‘পেতেছে বিশ্বে বণিক-বৈশ্য অর্থ-বেশ্যালয়’। আর এদের কারণেই অন্ন, স্বাস্থ্য, প্রাণ, আশা, ভাষা হারায়ে সকল-কিছু, দেউলিয়া হয়ে চলেছে মানব ধ্বংসের পিছু পিছু, পালাবার পথ নাই, দিকে দিকে আজ অর্থ-পিশাচ খুড়িয়াছে গড়খাই। (চোর-ডাকাত : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল সাহিত্যে সাম্যের যে অমিয়ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার উৎসমূল কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরে বোধ হয় এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, তাঁর সৃষ্টি কোন বিলাসিতা ছিল না; বরং জীবনের অভিজ্ঞতা-সঞ্চিত। ড. সুশীলকুমার গুপ্ত লিখেছেনÑ ‘নজরুল কাব্যের এই বিদ্রোহাত্মক ভাবই পরবর্তী বাঙলা সাহিত্যে সাম্যবাদী ধারণা প্রচারে নজরুলের অবদান অবশ্য স্বীকার্য। ...বহু শিরোনামায় বিভক্ত ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় নজরুল সাম্যবাদের প্রতি যে বিশ্বাস ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তার তুলনা বাঙলা সাহিত্যে প্রায় নেই বললেই চলে।’ সাম্য এবং উদারতা নজরুলের পারিবারিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকার। এর একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন ড. সুশীলকুমার গুপ্ত ‘নজরুলের পূর্বপুরুষেরা পাটনার অন্তর্গত হাজীপুরের অধিবাসী ছিলেন। সম্রাট শাহ আলমের সময় তাঁরা বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়ায় এসে বসবাস আরম্ভ করেন। মোগল রাজত্বকালে এখানে যে একটি বিচারালয় ছিল তার কাজীর আয়মা সম্পত্তি প্রাপ্ত হন। কাজী নজরুল এই কাজীদেরই বংশধর। তাঁর বাড়ির পূর্বদিকে ছিল রাজা নরোত্তম সিংহের গড় আর দক্ষিণে পীরপুকুর। এই পুকুরের পূর্বপারে পীরপুকুরের প্রতিষ্ঠাতা সাধক হাজী পাহলোয়নের মাজার শরীফ এবং পশ্চিমপারে একটি ছোট সুন্দর মসজিদ। নজরুলের পিতা ও পিতামহ সমস্ত জীবন ধরে এই মাজার শরীফ ও মসজিদের সেবা করে পরিবারের ভরণপোষণ করে যান। মুসলমানধর্মের প্রতি অসাধারণ নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও নজরুলের পিতা অন্য কোন ধর্মমতের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিলেন না। ধর্মের ক্ষেত্রে পিতার এই উদারতা নজরুল উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছিলেন। তাছাড়া ফারসী ও বাংলা কাব্যের প্রতি গভীর অনুরাগও তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছ থেকে।’ নজরুলের পিতার মৃত্যুর পর (১৯০৮) সংসারে নেমে আসে ভয়াবহ আর্থিক দুর্যোগ। নজরুল হাল ধরেন সংসারের। বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত পীরপুকুরের পূর্বপারে আল্লাহর অলি হাজী পাহলোয়ানের মাজার শরীফের খাদেম এবং পশ্চিমপারে অবস্থিত মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং মক্তবের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব কাজ থেকে পরিবারের জন্যে যতটা না অর্থের সংস্থান করেছেন তার চেয়ে ঢের বেশি তিনি নিজের জন্যে সঞ্চয় করেছেন ভবিষ্যত-পুঁজি। মসজিদে তিনি আজান দিয়েছেন, নামাজ পড়তে মুসল্লিগণ সমবেত হয়েছেন এবং তিনি দেখেছেন এক কাতারে, একই সমতলে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকলে নামাজ পড়ছেন; ধনী, দরিদ্রে, রাজা-প্রজার কোন ভেদাভেদ নেই। ইসলামের সুমহান এ সাম্য নজরুলের কচি-মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণেই তিনি বড় হয়ে বলতে পেরেছেন ‘ইসলাম সে তো পরশ-মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি? পরশে তাহার সোনা হলো যারা তাদেরই মোরা বুঝি।’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের সুমহান সাম্য এবং সৌন্দর্য্যরে যে অপরূপ চিত্রটি নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শৈশবেই তা তাঁকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে যা পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। তবে পতিত মুসলমানদের বিষয়ে তাঁর আক্ষেপের সীমা ছিল না। বিশ্বসভ্যতাকে সুরক্ষার জন্যে তিনি বারবার ফিরে গেছেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে, স্বর্ণালী সময়টিতে। সাহায্য প্রার্থনা করেছেন আল্লাহ পাকের দরবারে, করুণ মিনতি জানিয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ‘পাঠাও বেহেশত হতে হজরত পুনঃ সাম্যের বাণী, (আর) দেখিতে পারি না মানুষে মানুষে এই হীন হানাহানি।’ বিশ্ব নিখিলের মুক্তির রূপটি নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে মানুষে মানুষের অধিকার দিল যে-জন ‘এক আল্লাহ ছাড়া প্রভু নাই কহিল যে-জন, মানুষের লাগি চির দীন বেশ ধরিল যে-জন বাদশাহ-ফকিরে এক শামিল করিল যে-জন (আজি) মাতিল বিশ্ব-নিখিল মুক্তি কলরোলে॥ কিন্তু মহানবীর আদর্শ থেকে বিচ্যুতির ফলে আজ বিশ্ব জুড়ে হানাহানি আর মানুষে মানুষে বৈষম্যের সীমাহীন প্রাচীর গড়ে উঠেছে। ফলে অশান্তি বিরাজ করছে সর্বত্র। ব্যথিত নজরুল তাই হযরতকে স্মরণ করে লিখেন তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ, ক্ষমা করো হজরত। ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ তোমার দেখানো পথ। বিলাস বিভবে দলিয়াছ পায়ে, ধূলি সম তুমি প্রভু, তুমি চাহ নাই আমরা হইব বাদশা-নওয়াব কভু। এই ধরণীর ধন-সম্ভার সকলের তাহে সম-অধিকার, তুমি বলেছিলে, ধরণীতে সবে সমান পুত্রবৎ। তোমার ধর্ম্মে অবিশ্বাসীরে তুমি ঘৃণা নাহি করে আপনি তাদের করিয়াছ সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে। ভিন-ধর্ম্মীয় পূজা মন্দির ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর, আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারি নাকো পর মত্॥ তুমি চাহ নাই ধর্ম্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি, তলওয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী। মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা সার করিয়াছি ধর্ম্মান্ধতা, বেহেশত হতে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত॥ (নজরুল-গীতি, অখণ্ড : পৃ. ১৯২) ইসলাম ধর্মের অনুসারী বলে দাবিদার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের বাণীর পূর্ণ প্রতিফলন না দেখে নজরুল যেমন আহত হয়েছেন এবং এর প্রতিকারে সচেষ্ট হয়েছেন, ঠিক তেমনি হিন্দুধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিরাজমান জাতিভেদ প্রথা তাকে কতটা মর্মাহত করেছে তার প্রমাণ মেলে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’সহ আরও অনেক লেখায়। কেবল একটি উদাহরণ দিচ্ছি জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া। ছু’লেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া। হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান, তাই ত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশ-খান! এখন দেখিস ভারত-জোড়া, প’চে আছিস বাসি মড়া, মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কা হুয়া॥ জানিস না কি ধর্ম্ম সে যে বর্ম্ম সম সহন-শীল, তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁওয়া-ছুয়ির ছোট্ট ঢিল। যে জাত-ধর্ম্ম ঠুনকো এত, আজ নয় কাল ভাঙবে সে ত, যাক না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥ দিন-কানা সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে, কেমন করে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতা-কলে তোরা জাতের চাপে মারলি জাতি, সূর্য্য ত্যজি নিলি বাতি, তোদের জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত বিজাতের জুতো ধোওয়া। মনু ঋষি অণু সমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির, বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস শির। ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়, তোরা চিনলি নে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥ সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এ বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর, মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্মপর। তোরা সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা করে, স্রষ্টায় পূজিস জীবন ভরে, ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভী দোওয়া॥ বলতে পারিস বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন সে জাত? কোন ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ? নারায়ণের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই? তোরা ছেলের মুখে থু থু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোয়া॥ ভগবানের ফৌজদারী-কোর্ট নাই সেখানে জাত-বিচার, তোর পৈতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার! জাত সে শিকেয় তোলা র’বে, কর্ম্ম নিয়ে বিচার হবে, তার পর বামুন চাড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোওয়া ॥ এই আচার বিচার বড় করে প্রাণ-দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা। বাবা এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গী-মামার খাচ্ছ থাবা! তাই, নাই ক অন্ন, নাই ক বস্ত্র, নাই সম্মান, নাই ক অস্ত্র, এই জাত-জুয়াড়ীর ভাগ্যে আছে আরো অশেষ সুখ সওয়া॥ নজরুল তাঁর জীবনের উষালগ্নেই রুটির দোকানে কাজ করে শ্রমজীবীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছেন, যৌবনে যুদ্ধের ময়দানে মানবতার বিপর্যয় অবলোকন করেছেন, জীবনের নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাতে ধনী-দরিদ্রের প্রকট বৈষম্য, হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মানুষে মানুষে হানাহানি, লোভাতুরের নির্মম থাবা ইত্যাদি দেখেছেন, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে এ সকল অনাচার-অবিচারের মূলোৎপাটনের চেষ্টা করেছেন, সৃষ্টি করে গেছেন অনবদ্য সব সাহিত্য; বাংলা সাহিত্যকে দিয়ে গেছেন অহংকারের একটি জায়গা যা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। ..................................................................................................................... লেখক: নজরুল গবেষক, টিভি অনুষ্ঠান নির্মাতা ও উপস্থাপক; যুগ্ম কর-কমিশনার, ট্যাক্সেস। মেইল: jehadtax@gmail.com

বাংলা সাহিত্যে প্রথম সৈনিক-কবি কাজী নজরুল ইসলাম

চুরুলিয়া হলো বর্ধমান জেলার কয়লাখনি অঞ্চল। ইংরেজদের শাসনামলে এই গ্রামে আণ্ডাল থেকে চুরুলিয়া পর্যন্ত একটা রেলপথও চালু ছিল। ভারতের স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে এই রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। নজরুল তাঁর জন্মস্থান চুরুলিয়া গ্রাম থেকে এক সময় বেরিয়ে পড়েন। এই বেরিয়ে পড়া নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখার আগ্রহ নিয়ে। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। ছোট পৃথিবী ছেড়ে বড় পৃথিবীর স্বপ্ন, লেখাপড়া শিখেছেন নানান স্কুলে। রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে, বর্ধমানের মাথরুন বিদ্যালয়ে। আবার বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কাজীর শিমলায় দরিরামপুর হাইস্কুলে। এসব তাঁর খাম-খেয়ালির মতো ব্যাপার ছিল না। আসলে যাঁরা বড় মাপের মানুষ হন, বিশেষ করে স্বপ্ন দেখা ভাবুক মানুষ তাঁদের ভিতরে অস্থিরতা থাকে। জীবনকে, দেশকে, জগতকে দেখার জন্য তাদের সব সময়ই মনে হয়, হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনো খানে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভুষণের মতো মানুষদের মধ্যেও এমনটা ছিল। পৃথিবীর অন্য অনেক বিখ্যাত লেখকদের জীবনেও এমনটা দেখা যায়। এ যেন তাদের এক স্বপ্নের দেশ, স্বপ্নের পৃথিবী খুঁজে বেড়ানো। কবি নজরুল খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ধরাবাধা গতানুগতিক পথ যেন তার জন্য নয়। সিয়ারসোল হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় বসার আগেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। দেশের যারা যুবক তারা অনেক স্বপ্ন দেখতেন যে, বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হতে পারলে অস্ত্র চালনা শেখা যাবে। সেই অস্ত্র উঁচিয়ে ধরা যাবে ভারতের ইংরেজ শাসকদের উপর। লেখা-পড়ার চাইতে তাঁরা তখন দেশ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। এসই স্বপ্নই তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। কত কষ্ট করেছেন ঘর ছেড়ে বের হবার পর। কাজী বাড়ির ঠুনকো আভিজাত্য ভেঙে রুটির দোকানে কাজ করেছেন। কিন্তু এসবের মধ্যেও ছেলেবেলার লেখা-পড়ায় দারুণ আগ্রহ ছিল তাঁর। সেই আগ্রহেই ময়মনসিংহের মতো অতো দূরের এখনকার বাংলাদেশের গণ্ডগ্রামে গিয়ে থেকেছেন। সেখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। নজরুল যদি যুদ্ধে যোগ না দিতেন তাহলে তাঁর জীবন কেমন হতো কে জানে। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সৈনিক কবি করে তুলেছিল। পৃথিবীর নানান দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ তাঁকে উৎসাহী করে তুলেছিল। করাচির সেনানিবাসে থাকার সময় তিনি লেখেন প্রথম কবিতা ও গল্প। কলকাতার পত্রিকাতে তা ছাপা হয়। করাচিতে নজরুল ছিলেন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। এই যুদ্ধক্ষেত্রেই পল্টনের আরো দু’জনের সঙ্গে নজরুলের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ডিসিপ্লিন ইনচার্জ শম্ভু রায়। অন্যজন মণিভুষণ মুখোপাধ্যায়। এই মণিভূষণ পরবতীকালে ‘লাঙল’ পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। তাঁর আরেকটি প্রতিভা ছিল সংগীত প্রতিভা। মণিভূষণ নিয়মিতভাবে নজরুলের সঙ্গে সংগীতের তালিম নিতেন, এছাড়া আরো একজনের নাম উল্লেখ করা যায়। তিনি হলেন হাবিলদার নিত্যানন্দ দে – যাঁর বাড়ি ছিল হুগলীর ঘু্টিয়া বাজারে। এই নিত্যানন্দের কাছ থেকেই নজরুল অরগ্যান বাজানো শিক্ষা গ্রহণ করেন। নজরুলের জীবনে করাচি সেনানিবাসে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সৈনিকের জীবন-যাপন করেও তিনি লেখাপড়া ও সাহিত্য চর্চায় নিয়মিত ডুবে থাকতেন। করাচি সেনানিবাসে থেকেও তিনি তৎকালীন সমস্ত বিখ্যাত পত্র-পত্রিকা পাঠ করতেন। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, বঙ্গবাণী, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ও বিজলী’র গ্রাহক ছিলেন। এছাড়া রুশ বিপ্লব সম্পর্কিত নানা পত্র-পত্রিকা তিনি নিজের হাতের কাছে রাখতেন সব সময়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত রুশ বিপ্লব নজরুলকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব সম্পর্কে যাবতীয় পত্র-পত্রিকা নজরুল অত্যন্ত খুঁটিয়ে পড়তেন। জাতীয়তাবাদী পত্র-পত্রিকাতেও রুশ বিপ্লব সম্পর্কে অনেক খবরাখবর প্রকাশিত হতো। যদিও এদেশে তখনো অবধি কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ঠিক এ রকম একটা পরিস্থিতিতে সেনা বিভাগের কঠিন কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ থেকেও ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন ভারতের একজন হাবিলদার হয়ে কীভাবে রুশ বিপ্লব সম্পর্কে এতটা আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তা থেকেই কাজী নজরুলের স্বদেশচেতনা এবং বিপ্লবী মানসিকতার প্রকৃত ছবিটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যাইহোক, সৈনিক থাকা অবস্থায় নজরুলের সাহিত্য-জীবনের উন্মেষ ঘটে। করাচি থেকেই তিনি নিয়মিত কলকাতার পত্র-পত্রিকাতে বিস্তর লেখা পাঠাতে থাকেন। তাঁর বেশ কয়েকটি লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে ছাপা হতেই বাঙালি পাঠক মহলে এই নতুন অসামান্য প্রতিরোধের বাঙালি কবির একটি স্বতন্ত্র জায়গা নির্দিষ্ট হয়ে গেল। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই কাজী নজরুলই প্রথম সৈনিক কবি। নজরুলের ‘মুক্তি’ শীর্ষক কবিতাটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছাপা হয়। যতদূর জানা যায়, এটিই ছিল পত্রিকায় ছাপানো তাঁর প্রথম কবিতা। এরপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে-জুন সংখ্যায় মাসিক ‘সওগাত’ প্রথমবর্ষ সপ্তম সংখ্যায় নজরুলের একটি গল্প ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। গল্প হলেও লেখাটি অনেকটা আত্মস্মৃতিমূলক। ‘মুক্তি’ কবিতাটি প্রকাশের পর নজরুলের সাহিত্য-সৃষ্টিতে যেন বাণ ডাকতে শুরু করে। একটার পর একটা গল্প, কবিতা, উপন্যাস তিনি লিখতে শুরু করেন। লিখলেন, ‘ব্যথার দান’ গল্প, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত হলো। প্রকাশ হলো ‘হেনা’ গল্পটি। ‘ব্যথার দান’ গল্পে রুশ বিপ্লব সম্পর্কে কবি নজরুলের চিন্তা-ভাবনা কোন স্তরে ছিল তার বিবরণ পাওয়া গেল। শুধু দেশপ্রেম নয়, নজরুল ইসলামের এই গল্পের ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিকতাও ফুটে উঠেছে। যা আমাদের বাংলা সাহিত্যের নতুন দিক বলতে হবে। ‘রিক্তের বেদন’ গল্পটিও নজরুল ইসলাম করাচি সেনানিবাসে বসে লেখেন। নজরুল ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কলকাতায় ফিরে ১৯২০ সাল থেকে কবিতা ও গান লিখে গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি অন্যতম প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর। সুভাষচন্দ্র বলতেন, ‘নজরুলের গান না শুনলে মনের মধ্যে জোশ তৈরি হয় না।’ নজরুল ছিলেন মানবতাবাদী লেখক। তিনি বলতেন, ‘এই উপমহাদেশের কোনো মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ থাকা চলবে না। নারী ও পুরুষের মধ্যে চলে আসা হাজার বছরের ব্যবধান দূর করতে হবে। মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা না করলে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না।’ তিনিই প্রথম মানুষ, লিখিত আসরে উপমহাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা যাঁর মধ্যে উচ্চারিত হয়েছিল। মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই তিনি বাকহারা ও স্মৃতিশক্তিহীন হয়ে পড়েন। বাইশ তেইশ বছরের সাহিত্য সাধনা তাঁর। এর মধ্যেই উপমাহদেশীয় জীবনের যে মূল বাণী সেই বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্যসাধনের মন্ত্রটিকে তিনি চমৎকার  ‍কুশলতায় চিত্রিত করে তুলেছেন তাঁর কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ ইত্যাদি অজস্র সৃষ্টির মাধ্যমে। বাংলা ভাষায় এত অধিক সংখ্যক সংগীত আর কোনো কবি সৃষ্টি করেননি। তিনি তাঁর ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘এই উপমহাদেশ শুধু হিন্দুর নয়, শুধু মুসলমানের নয়, খ্রিস্টানের নয়— এই উপমহাদেশ সব মানুষের মহা মানবের মহান তীর্থমাত্র।’ আজীবন তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন-সকল রকম সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ ছিল অশান্ত। ধর্মের উগ্রতা সমাজের সকল ইতরতার বিরুদ্ধে উদার উদাত্ত কন্ঠে সাম্যের আহ্বান। তাই তাঁর শেষ পরিচয় তিনি বাঙালি মানবতার কবি। ডব্লিউএন

রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর উপনিবেশিক শিক্ষাদর্শন

রবীন্দ্রনাথের নায়কত্ব আজ ক্ষুণ্ন, রবীন্দ্রনাথ আজ অপ্রাসঙ্গিক- এ জাতীয় কিছু অর্বাচীন বক্তব্য স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথ আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। বাঙালির জীবদর্শনের গতিপথ নির্ধারণে রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর কাব্য, উপন্যাস, নাটক, সংগীত প্রভৃতি সৃজনশীল শিল্পপ্রকরণ নিঃসন্দেহে বাঙালির নান্দনিক জীবনভাবনার অপরিহার্য অংশ। এই সত্যকে অস্বীকার না করেও বলা যায়, তাঁর দর্শনচিন্তার বহুপ্রান্ত এখনও বিজ্ঞ গবেষকদের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। এই অতলস্পর্শী বটবৃক্ষের দর্শনভাবনার প্রতিটি প্রান্ত উন্মোচন তাই আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। রবীন্দ্রনাথের দর্শনচিন্তা, সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা, তার অর্থনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব, সমবায়, কৃষি ও গ্রাম উন্নয়ন প্রস্তাব, সংস্কৃতিভাবনা কিংবা শিক্ষাভাবনার গভীরতা পরিমাপের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা আজ পর্যন্ত হয় নি। তাঁর কবিতা, উপন্যাস, গান প্রভৃতি সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের উপর যে পরিমাণ গবেষণা হয়েছে, তাঁর দর্শনভাবনার কিংবা মননশীল চিন্তার ক্ষেত্রে সেই তুলনায় সিকিভাগ কাজও হয় নি। তাই বর্তমানে তরুণ সমাজের একটি বৃহৎ অংশের কাছে রবীন্দ্রনাথ কল্পলোকের আধ্যাত্মপুরুষ হিসেবে শ্রদ্ধা ভক্তি লাভ করছে ঠিকই কিন্তু জীবনভাবনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে না। এর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এদেশে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাসের পটভূমিতে। আলোচ্য প্রবন্ধের শুরুতেই এ দেশে রবীন্দ্রচর্চার প্রধান প্রবণতাসমূহ খুব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হবে। অতঃপর উত্তর-উপনিবেশিক (Post Colonialism) ডিসকোর্সের তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যাখ্যা করে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনায় তার প্রয়োগ দেখানো হবে। প্রবন্ধের শেষাংশে একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে এসেও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা কেন প্রাসঙ্গিক এই প্রশ্নের একটি যৌক্তিক সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এক. রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরুর পর থেকেই সরাস্বত মহল থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও প্রশংসা লাভ করেছেন। একই সঙ্গে যৌক্তিক-অযৌক্তিক সমালোচনার শিকারও হয়েছেন অসংখ্যবার। ডিএল রায়, রজনীকান্ত সেন কিংবা শনিবারের চিঠি গোষ্ঠীর রবীন্দ্র বিরোধিতার কথা কারও অজানা নয়। পরবর্তীকালেও দেখা গেছে, বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে পড়ে নির্মোহ রবীন্দ্রচর্চা ব্যাহত হয়েছে। একদিকে চলে রবীন্দ্রনাথকে দেবতার আসনে বসিয়ে রবীন্দ্রচর্চার নামে অন্ধ রবীন্দ্র পূজা, অন্যদিকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য রবীন্দ্র বিরোধিতা। দুটি পক্ষই এক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। রবীন্দ্র বিরোধী পক্ষের মধ্যে আবার দুইটি ভাগ লক্ষ্য করা যায়। একদল রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করেছেন ইসলামের দোহাই দিয়ে, আর একদল রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের ডাক দিয়েছেন মার্কসীয় শ্রেণি-চেতনার কথা বলে। “আমাদের শ্রেণী সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ মিত্রশক্তি নন”- এই ব্যাখ্যা দিয়ে কমরেড ভবানী সেনসহ কিছু অতিবাম উগ্র রবীন্দ্রবিরোধিতায় মেতে ছিলেন। অবশ্য তাদের এই ভুল ভাঙ্গতে খুব বেশি সময় লাগে নি। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পরপরই ধর্মের দোহাই দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের অপচেষ্টা জোরালো হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উচ্ছিষ্টভোগী কিছু বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের ডাক দেয়। এই গোষ্ঠীর মুখপাত্র সৈয়দ আলী আহসান এই প্রসঙ্গে বলেন, “মনে রাখতে হবে যে, পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল স্বাতন্ত্রবোধের উপর ভিত্তি করে। ...নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্যে নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজবো। সেইসঙ্গে এটাও সত্য যে, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার এবং হয়ত বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয় আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন আমাদের বেশি।” (পূর্বপাকিস্তানে বাংলা সাহিত্যের ধারা/মাহেনও) পুরো পাকিস্তান আমল জুড়ে বাংলার মাটি থেকে রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন দেওয়ার অপচেষ্টা চলে। ১৯৬১ সালে কবির জন্ম শতবার্ষিকী পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধা দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন সংসদে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয় বলে ঘোষণা দেন। এরপর রাতারাতি রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব ঘটনার ফলে বাঙালির মানসলোকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভালবাসা তীব্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় রক্ষচক্ষুকে উপেক্ষা করে কবি সুফিয়া কামাল, বিচারপতি মাহবুব মোরশেদ, খান সরওয়ার মুর্শেদ প্রমুখের নেতৃত্বে কবির জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। এ সময় প্রগতিশীল গবেষকদের হাত ধরে তার উপর একাডেমিক গবেষণার সূত্রপাত হয়। এক্ষেত্রে শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন অগ্রপথিক। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠা রবীন্দ্র সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পথকে সুগম করে। এভাবে বিপুল বিক্রমে রবীন্দ্রনাথ ফিরে আসেন বাঙালির হৃদয়লোকে। এই সময়ের রবীন্দ্রচর্চায় একটি আশ্চর্যজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিছু রবীন্দ্রপ্রেমী এ সময় রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম চেতনার প্রকাশ দেখাতে চেষ্টা করেন। আ ন ম বজলুল করিম রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম সুফী সাহিত্যের প্রভাব নিয়ে কাজ করেন। কাজী আবদুল ওদুদের ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলিম সমাজ’, আবুল ফজলের ‘মুসলিম স্বাতন্ত্র্য বোধ ও রবীন্দ্রনাথ’, গোলাম মোস্তফার ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘গল্পগুচ্ছের মুসলিম চরিত্র’, মজিবর উদ্দীন মিয়ার ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম সমাজ ও জীবন’, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক’, আনিসুজ্জামানের ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলিম সমাজ : একটি ভূমিকা’ প্রভৃতি প্রবন্ধকে একটি বিশেষ প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। গবেষক আবুল মোমেন দেখিয়েছেন, এই সকল রবীন্দ্রপ্রেমী শাসকগোষ্ঠীর নিকট রবীন্দ্রনাথকে জায়েজ করার জন্য এই কাজ করেছেন। তাদের উদ্দেশ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলা যায়, এটি ছিল একটি ভুল প্রবণতা। আবার এই সময় একটি বড় অংশ বিশেষত শহুরে বাঙালি মধ্যবিত্ত রবীন্দ্রনাথকে দেবতার আসনে বসিয়ে শুরু করেন অন্ধ রবীন্দ্র পূজা। এই অংশটি রবীন্দ্রনাথকে বাস্তবতা বিবর্জিত আধ্যাত্ম্য পুরুষ হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। ফলে দেবকল্প রবীন্দ্রনাথের নিকট চিন্তাশীল ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ম্লান হতে থাকে। এতে করেও নির্মোহ রবীন্দ্রচর্চা আবার বাধাগ্রস্ত হয়। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. সৈয়দ জামিল আহমেদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ-   “গোড়া মতবাদীদের মতো আমরা যদি জেদ করে বলি যে, পূজ্যপাদ রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি শব্দ-শব্দাংশই অমোঘ সত্যের দ্যোতক, তাহলে তো আমরা ইসলামপন্থীদের মতোই স্রেফ একটিমাত্র সত্য আঁকড়ে থাকার গোড়ামির চেয়ে সুনিশ্চিতভাবেই উত্তম কিছু নই।” (বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাট্য সংকেত) দুই. সমকালীন জ্ঞানতত্ত্বে উত্তর-উপনিবেশবাদ একটি বহুল আলোচিত সমালোচনা তত্ত্ব (Critical Theory)। শব্দটি ইংরেজি Post Colonialism শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। বিশ্বের ইতিহাসে বাইরের দেশ কর্তৃক বিভিন্ন দেশকে শাসিত-শোষিত হতে দেখা যায়। একে উপনিবেশবাদ বলে। উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো যখন লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে উত্তর-উপনিবেশিক যুগে প্রবেশ করে সেই সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিকে উত্তর-উপনিবেশবাদ বলে। উপনিবেশের কবলমুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মানবীয় মাত্রা এবং এরই প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির সার্বিক আত্মিক মুক্তি ও প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে এই তত্ত্বের মূল কথা। সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী তাদের স্বার্থে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে একটি ভেদরেখা টেনে দিয়েছে- যার উপর ভিত্তি করে পশ্চিম তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে থাকে আর প্রাচ্যকে মনে করে হীন, দুর্বল, নিকৃষ্ট, বর্বর, অসভ্য, নিজেদের শাসনে ও প্রতিপালনে অক্ষম। কাজেই নিকৃষ্টদের সভ্য করে তোলার জন্য তাকে শাসন করার বৈধতা তাদের রয়েছে- এই যুক্তি দিয়ে শ্বেতাঙ্গদের শাসন, আইন, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছে। এই পশ্চিমী ভাবনার বিপরীত স্রোত হচ্ছে উত্তর-উপনিবেশবাদ। এই তত্ত্ব প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সম্পর্কের বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখার দৃষ্টিকোণ এনে দেয়। এই ডিসর্কোসের মূল বক্তব্য হল- পশ্চিমের নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার কিছু নেই। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থেই সে এই শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব খাড়া করেছে মাত্র। প্রাচ্য নিজেও যে জ্ঞান গরিমার কোনো অংশে ন্যূন নয়- এই বোধের বিনির্মাণ এই তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক। উত্তর-উপনিবেশবাদ তাই শুধু কোনো সাহিত্য সমালোচনা রীতি নয়, একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক তত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ উপনিবেশিত সমাজ কাঠামোর পটভূমিতে বেড়ে উঠেছেন। উপনিবেশিত সমাজে বসবাস করেও তিনি উত্তর উপনিবেশিক চিন্তা করতে পেরেছেন এক কালোত্তীর্ণ প্রতিভাবলে। অনেকে ইউরোপের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগকে বড় করে দেখান। কিন্তু বিষয়টি এত সরলরৈখিক নয়। প্রথম জীবনে বিলেতি সভ্যতার প্রতি কিছু মোহমুগ্ধতা থাকলেও পরবর্তীতে তাঁর চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে। তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ এর সবচেয়ে বড় দলিল। তিনি উপনিবেশের জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধকে অগ্রাহ্য করে প্রাচ্যের জ্ঞানতত্ত্বকে পশ্চিমের সামনে তুলে ধরেছেন। পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের পরিবর্তে উপস্থিত করেছেন প্রাচ্যের মানবিক ডিসকোর্স। আর এভাবেই তিনি গড়ে তুলেছেন উপনিবেশবাদবিরোধী মতাদর্শিক বৌদ্ধিক প্রতিরোধ।   তিন. রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য চর্চার বাইরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষা বিস্তারে। তার শিক্ষা ভাবনায় কিছু স্ববিরোধিতা ও দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং একই সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় তপোবন আশ্রিত জীবনবোধের প্রতি মোহমুগ্ধতা এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাটি হচ্ছে উপনিবেশিক কাঠামোর বাইরে ভিন্নতর শিক্ষাভাবনা, যা এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়।  রবীন্দ্রনাথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি কখনো আগ্রহ অনুভব করেন নি। উপনিবেশিক শাসকদের গড়ে তোলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তার কাছে মনে হয়েছে পাগলাগারদ বা হাসপাতাল। এজন্য তিনি ভারতীয়দের ইংরেজি লেকচারের ফনোগ্রাফ, বিলেতি অধ্যাপকের শিকল বাঁধা দাঁড়ের পাখি না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন- “বিদ্যালয়ের ঘর বানাইলে তাহা বোর্ডিং ইস্কুল বলিতে যে ছবি মনে জাগিয়া উঠে তাহা মনোহর নহে- তাহা বারিক, পাগলাগারদ, হাসপাতাল বা জেলেরই একই গোষ্ঠীভুক্ত।” রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে নিজস্ব সংস্কৃতির পাটাতনে স্থাপন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। শেকড় বিচ্ছিন্ন আরোপিত শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহতা সম্বন্ধে তার মন্তব্য যুক্তিযুক্ত- “আর তা যদি একান্তই অসম্ভব বলে গণ্য করি, তবে বিশ্ববিদ্যালয় চিরদিন বিলাতের আমদানী করা টবের গাছ হয়ে থাকবে, টব মূল্যবান হতে পারে, অলঙ্কৃত হতে পারে, কিন্তু গাছকে সে চিরদিন পৃথক করে রাখবে ভারতবর্ষের মাটি থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সখের জিনিস হবে, প্রাণের জিনিস হবে না।” ভারতবর্ষে যখন লর্ড মেকলের চুইয়ে পড়া শিক্ষানীতি সার্বজনীন শিক্ষার বিপরীতে একটি ব্রিটিশ অনুগত গোষ্ঠী তৈরির দিকে অগ্রসর হয়, রবীন্দ্রনাথ তখন সার্বজনীন শিক্ষার বিস্তারের লক্ষে কৃষকদের তার জমিদারিতে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। “আমার জীবনের একটি মাত্র লক্ষ্য হল শিক্ষার আলোক বিস্তার... আমাদের চাষী সাধারণকে অজ্ঞতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া” তার এই বক্তব্য রেঁনেসাসের চেতনা থেকে আরো এগিয়ে প্রগতিশীলার পথকে প্রশস্ত করে। স্পষ্ট বোঝা যায় তার শিক্ষাচিন্তা শ্রেণি বিশেষের জন্য নয়, এর লক্ষ্য সার্বজনিন, গোটা জাতি। তার এই ভাবনা এদেশের মার্কসবাদী চিন্তকদের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের উপনিবেশবাদ বিরোধী শিক্ষাচিন্তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে ‘তোতাকাহিনী’ শীর্ষক প্যারালালে। এই কাহিনীতে দেখা যায়, রাজা মন্ত্রীকে একটা পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু পাখিটা একে তো মূর্খ, কায়দা-কানুন জানে না, উপরন্তু রাজার বাজারে লোকসান ঘটায়। ফলে পণ্ডিতরা শুধু কলম নয়, সড়কি দিয়ে পাখিটিকে শিক্ষা দিতে থাকে এবং এতে তার মৃত্যু হয়। এই কাহিনীতে ‘বাজার’ এবং ‘সড়কি’ শব্দ দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রকৃতপক্ষে এই ‘বাজার’ হলো উপনিবেশের বাজার, যা ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী নষ্ট হতে দিতে পারে না, আর সামরিকায়নের মাধ্যমে হলেও পাখি নামক শিক্ষার্থী বা প্রজাকে সে বশে রাখতে চায়। এজন্যই রাজার নির্দেশে কারাগার সদৃশ শিক্ষালয়ে চলে পাখির উপর নিবিড় ঔপনিবেশিক শিক্ষাদান কর্মসূচি। এই প্রেক্ষাপটে আধিপত্যকামী ঔপনিবেশিক শিক্ষাপ্রকল্পের বিপরীতে উত্তর উপনিবেশিক শিক্ষাদর্শন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় জবরদস্তি ছিল শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি চালু করা। রবীন্দ্রনাথ উচ্চকণ্ঠে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন- “বিদ্যা বিস্তারের কথাটা যখন ঠিকমত মন দিয়া দেখি, তখনকার সর্বপ্রধান বাধাটা এই দেখিতে পাই যে, তার বাহনটা ইংরেজি।” রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ শাসন আমলেই ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন- “ইংরেজি কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা নয়। প্রচলিত শিক্ষায় ইংরেজি ভাষায় ভাবের চর্চা হয় না, ভাবের সঙ্গে ভাষার মিল হয় না বলেই যত সমস্যা। কারণ শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সামঞ্জস্য সাধনই প্রধান বিষয়।” ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৈরির যে উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের, তার বিপরীতে সর্বজনীন শিক্ষার আদর্শকে দাঁড় করিয়ে রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষায় শিক্ষার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন- “দেশের অধিকাংশ লোকের শিক্ষার উপর যদি দেশের উন্নতি নির্ভর করে এবং সেই শিক্ষার গভীরতা ও স্থায়ীত্বের উপর যদি স্থায়ীত্ব নির্ভর করে, তবে মাতৃভাষা ছাড়া যে আর কোনও গতি নাই।” সমস্ত জাতিকে শিক্ষার আলোকবর্তিকায় আলোকিত করার জন্য শিক্ষায় মাতৃদুগ্ধরূপী মাতৃভাষা চালুর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি বলেন- “যাহাতে সমস্ত জাতির মানসিক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিষ্পন্ন হইতেছে, শিক্ষাকে সেই ভাষার মধ্যে মিশ্রিত করিলে তবে সে সমস্ত জাতির রক্তকে বিশুদ্ধ করিতে পারে, সমস্ত জাতির ক্রিয়ার সহিত তাহার যোগ সাধন হয়।” তাই তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে বিলেতি তলোয়ারের খাপের মধ্যে দেশি খাঁড়া ভরিবার ব্যায়াম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাভাষা যথেষ্ট নয়- এ সম্পর্কিত ধারণা বহুদিন থেকে চলে আসছে। রবীন্দ্রনাথ এই অজুহাত বাদ দিয়ে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানের গ্রন্থ রচনার আহ্বান জানান। বিজ্ঞান শিক্ষাকেও সর্বজনীন করতে হলে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা জরুরি। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ- “বিজ্ঞান যাহাতে দেশের সর্বসাধারণের নিকট সুগম হয়, সে উপায় অবলম্বন করিতে হইলে একেবারে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার গোড়াপত্তন করিয়া দিতে হয়... ঘরে বাহিরে চারিদিকে বিজ্ঞানের আলোক পরিব্যাপ্ত করিয়া দিলে বিশেষভাবে বিজ্ঞানের চর্চা এদেশে স্থায়ীরূপে বর্ধিত হইতে পারিবে।” উপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ; তার এই সংগ্রাম ছিল বৌদ্ধিক, মতাদর্শিক ও রাচনিক। জীবন-জীবিকাভিত্তিক সর্বজনীন যে শিক্ষাব্যবস্থার কথা তিনি বলেছেন, তাতে তাঁর জনমুখী চেতনার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা যায়- “আমি তোমাদের লোক” এই ঘোষণা তার বিশ্বাসের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই বোধ শ্রেণিচেতনার বিচারেও গ্রহণযোগ্য। ভাববাদী ও রোমান্টিক জমিদার কবি তার শিক্ষাচিন্তার ক্ষেত্রে অনেক বেশি মানবিক চেতনায় সিক্ত, গণমুখী ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে মাতৃভাষায় শিক্ষার যে বক্তব্য তিনি রেখেছিলেন, আজকের দিনে স্বশাসনের সময়কালে এসেও একই দাবি অব্যাহত রয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার এখনও সুদূরপরাহত। উপনিবেশ-উত্তর এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার বৃত্ত ভাঙ্গতে রবীন্দ্রনাথ আজ শুধু প্রাসঙ্গিকই নন, অপরিহার্যও বটে।   তথ্যসূত্র: (১) সাম্প্রতিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ, শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত (২) বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ, আহমদ রফিক (৩) সাহিত্যকথা সংস্কৃতিকথা, সনজীদা খাতুন।   লেখক: প্রভাষক, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ।

‘বনলতা সেন’ ইতিহাসের উজ্জ্বলতম চরিত্রের নান্দনিক প্রকাশ

“তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই তবুও গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই তুমি আজও এই পৃথিবীতে রয়ে গেছ।”                                      -জনান্তিকে/সাতটি তারার তিমির জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৬) কাব্য সম্ভারের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত এবং সমালোচিত কবিতা ‘বনলতা সেন’(১৯৪২)। কবিতাটির নামেই কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ করা হয়।‘বনলতা সেন’ কবিতাটি নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মাত্রিক আলোচনা এবং সমালোচনা। আমি এ পর্যায়ের নাম গন্ধহীন পাঠক মাত্র।তবে কবিতাটির ভাব, ভাষা এবং প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গের ব্যবহার আমাকে নতুন  কিছুর প্রতি আকৃষ্ট করেছে।তারই সামান্যতম প্রচেষ্টা এই লেখাটি। জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য নিয়ে কাজ করা প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক প্রদ্যুম্ন মিত্র তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ‘জীবনানন্দের চেতনাজগৎ’ এ বলেছেন, “বনলতা সেন নাটোরের-হয়তো সে কবির প্রিয় পরিচিত নাটোরেরই। প্রিয় পরিচিত অথচ বিস্মৃত; কিন্তু নবীন আবিষ্কারে মহনীয় সত্তায় সে যেন উদ্ভাসিত।” প্রদ্যুম্ন মিত্রের এই কথাটির মধ্যেই আমি নতুনত্বের সন্ধান খোঁজার চেষ্টা করেছি।হয়তো ‘বনলতা সেন’ কবির প্রিয় পরিচিত নাটোরেরই’; বাস্তবের সাথী না হলেও মনযোগী স্রোতা হিসেবে পেয়ে থাকবেন (?) কোলকাতায় তাঁরই পরিচিত নাটোরের মেয়ে জয়শ্রী সেনের (নাটোরের মেয়ে যার বিবাহ হয় বরিশালে। পরে তারা স্থায়ী হন কলকাতায়। যেখানে কবি অনেক সময় আড্ডা দিতেন) আলোচনার মাধ্যমে।হয়তো বা বিমুগ্ধ কবির হাতে তারই ‘কল্পনার ভিতর-চিন্তা ও অভিজ্ঞতার’ বাস্তবসম্মত প্রকাশ ‘বনলতা সেন’। মনে হয় কবি কল্পনার বিশিষ্টতর রূপটি আমাদের চর্ম চক্ষুতে ধরা পড়ে না। তাই আমরা কালের দাবীকে ভুলে যাই। কেননা মানুষের কোনো কর্ম বা আচরণ প্রয়োজন নিরপেক্ষ হতে পারে না। বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশের আবির্ভাব এমন একটা সময়ে যখন পৃথিবীর অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। কবির আবির্ভাব যুদ্ধ বিধ্বস্ত  ঝরাজীর্ণ এক মলিন পৃথিবীতে।অর্থাৎ জীবনানন্দ দাশের কবি প্রতিভার বিকাশ এক যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে এবং তার পরিনতিশীল চেতনা ক্রমশই অগ্রসর হচ্ছিলো অন্য আরেকটি যুধ্যমান পৃথিবীর দিকে। সংশয়, হতাশাগ্রস্ত পৃথিবীতে যখন চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, যুদ্ধভীতি বিশ্বে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, প্রায় প্রতিটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা নাজেহাল হয়ে পড়েছে, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে  জনজীবনে হাহাকার সৃষ্টি করেছে ঠিক তার পূর্ব মুহূর্তে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির আবির্ভাব নতুন কিছুরই ইঙ্গিত  প্রদান করে। অপরদিকে কবির স্বগক্তিই বিষয়টিকে আরও ইঙ্গিতবহ করেছে। কবির ভাষায়,  “মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়-চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি।” দেশ-কালে সীমাবদ্ধ নাটোরের বনলতা সেনের পশ্চাতে রয়েছে ভূগোলের বিস্তৃতি ও ইতিহাসের বোধ (depth)। তাই এটা মনে করা অত্যুক্তি হবে না যে, তিনি যুগের দাবীকে স্বীকার করে নিয়ে এই ক্লেদ-পঙ্কিল অবস্থায় শান্তির পশরা খুঁজেছেন, তার জন্য দ্বারস্থ হয়েছেন ইতিহাসের। ‘বিগত শতাব্দী ধরে’ ইতিহাসের পাতায় আঁটকে থাকা ‘মহারাণী’কে কবি তাঁর ‘অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারসত্তায়’ নতুন  রূপে আশা সঞ্চারি হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির করলেন।কবিতার ভাব, ভাষা, সময়-চেতনা ও ইতিহাসের প্রতি গভীর মনোযোগ দিলে বোঝা যায় কবির শিল্পিত হাতে ‘নবীন আবিষ্কারে মহনীয় সত্তায় উদ্ভাসিত’ নারী আর কেউ নয় বরং তিনি ‘অর্ধবঙ্গেশ্বরী’ হিসেবে খ্যাত ‘মহারাণী ভবানী’। “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” ‘ঐতিহ্য উত্তরাধিকার চেতনা’ ছিলো জীবনানন্দ দাশের আলোচ্য কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।তাই তিনি বাঙালির হাজার বছরের (দশম-দ্বাদশ) ইতিহাসের পট-পরিক্রমায় বিচরণ করে জীবনের সন্ধান করেছেন। ভাষার সূ্ক্ষ গাঁথুনি এঁটে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের দ্বারে কড়া নেড়ে সমকালীন বাংলার অবস্থাকে ইঙ্গিত করেছেন।তিনি বিম্বিশার ও আশোকের ধূসর রাজ্যের প্রসঙ্গ টেনে, বিদর্ভ নগরের অন্ধকারকে পাঠকের সামনে এনে সমকালীন সাম্রাজ্যবাদী  শক্তির অপশাসনে পিষ্ট বাংলার রূপটিকেই কি তুলে ধরেন নি? এবং সেই সঙ্গে মুক্তির দিশার সন্ধান করেন নি? কেননা মগধের রাজা বিম্বিশার ষোল বছর বয়সে রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তিনি ২৯ বছর বয়সে যখন বুদ্ধের শান্তির বাণীর (“বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের নিমিত্তে, জীবজগতের প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন করে দেব-মানবের প্রয়োজনীয় সুখের জন্য বিচরণ কর”) স্পর্শ পেলেন তখন তিনি পার্থিব চিন্তা- চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে জন-কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখেন।আবার কলিঙ্গের যুদ্ধে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমতায় আসা মহামতি আশোক রাজ্যের বিবর্ণ রূপ দেখে মর্মাহত হন।তিনিও তাঁর আলোয় আলকিত হয়ে প্রজা সাধারণের (মানুষের দুঃখ দূর করার) জন্য নিজেকে নিয়জিত রাখেন।অপরদিকে মগধকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় উপমহাদেশে অখণ্ড রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালনের মাধ্যমে বিম্বিশার তাঁর রাজ্যের শ্রী বৃদ্ধি করেন।মূলত জম্বুদ্বীপে বুদ্ধের আগমনে সাহিত্য, শিল্পও দর্শনে নব জাগরণ  ঘটে।ধূসর রাজ্য আলোকিত হয়ে উঠে। তেমনি জীবনানন্দ দাশ সমকালীন যুদ্ধাহত, দুর্ভিক্ষ পীড়িত পৃথিবীর ক্লান্তি লাঘবের জন্য সন্ধান করেছেন ইতিহাসের পরাক্রমশালী নেতার যিনি জনতার জন্য নিবেদিত প্রাণ।তিনি হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসে জীবনের সেই রূপের সন্ধান করেছেন। বিম্বিশার-অশোকের ধূসর রাজ্যে যেভাবে শান্তির বার্তা আসে, বিদর্ভ নগরের কালো অন্ধকার দূর হয়ে যায় জীবনানন্দ দাশও তেমনি বাঙালির হাজার বছরের পট-পরিক্রমায় একজনকে খুঁজে পেয়েছেন তাঁর শ্রুত্যে (?)। ‘অর্ধেক বঙ্গেশ্বরী’ (পূর্বে যমুনা তীর পশ্চিমে মালদহ-মুর্শিদাবাদ, উত্তরে দিনাজপুর, দক্ষিণে ঝিনাইদহসহ অর্ধেক বঙ্গ তাঁর শাসনাধীন ছিল) রানি ভবানীর মধ্যে। কেননা ইতিহাসের এই মহিয়সী নারী তার পুণ্যকর্ম, দেশপ্রেম ও জনহিতকর কাজের জন্যই প্রাতঃস্বরনীয়া হয়ে আছেন। রানি ভবানীর দেশপ্রেমের স্বরূপটি উন্মোচন করেছেন নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ‘পলাশীর যুদ্ধ’ নামক ঐতিহাসিক আখ্যান কাব্যের ১ম সর্গে।অপরদিকে তাঁর মুক্তহস্ত ও পরোপকারী গুণের সাক্ষ্য পাওয়া যায় কিশোরীচাঁদ মিত্রের ইতিহাস গ্রন্থে, অক্ষয় কুমার মৈত্রের ‘রানী ভবানী’ গ্রন্থে, মহেন্দ্র গুপ্তের ‘রানী ভবানী’ নাটকে।গবেষক সমর পাল ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার বরাত দিয়ে বলেন, “যিনি রানী ভবানীর ব্রহ্মোত্তর ভোগী নন তিনি ব্রাহ্মণ নামের অযোগ্য।”   “আমি ক্লান্ত প্রান এক,চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন” এখানে ‘জীবনের সমুদ্র’বলতে কবি মানব সমাজকেই বোঝাতে চেয়েছেন। যে মানবসমাজ অনিশ্চয়তায় চাদরে ঢাকা, যেখানে কোন আশা নেই, নেই কোনো আলোকের সন্ধান। যুদ্ধের দামামা মানব সমাজকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তুলেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মানবজীবন ফেনিল হয়ে পড়েছে। ইংরেজরা খাদ্য সামগ্রী সৈন্যদের জন্য জব্দ করেছে, ব্যবসায়ীরা করেছে গুদামজাত। সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মানব জীবন হয়ে উঠেছে অস্তিত্বহীন। ‘মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মায়ের দুধ চাটছে।কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে মা কথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রয় করতে চেষ্টা করছে। তাই সমকালীন এই করুণ অবস্থা দৃষ্টে বিহ্বল কবিও অন্য সবার মতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। “আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন” ‘ক্লান্ত প্রাণ’ কবি শান্তির আশ্রয় খুঁজেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই আশ্রয় পেয়েছেন বনলতা সেনের রূপকে ইতিহাস খ্যাত মহারানী ভবানীর জীবন কাহিনিতে। তাই তিনি ইতিহাসের দ্বারস্থ হয়ে স্বভাবগত ভঙ্গিমায় প্রকৃতির অনুষঙ্গে তাঁকে বাস্তবসম্মত রূপ দান করলেন। কেননা তিনি চাইছেন ‘প্রকৃতিলীন এক অস্তিত্ব-তার জৈব প্রাণময়তার মধ্যে আত্ম-অবলোপী আত্তীকরণ। দুর্ভিক্ষপীরিত পৃথিবীতে(১১৭৬ বঙ্গাব্দে) মহারানী যেভাবে মানুষের ক্লেদ মুছে দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন ঠিক সেইভাবে হতাশাগ্রস্ত, জরা-ব্যধিতে আক্রান্ত পৃথিবীতে তিনি এমন কাউকেই কল্পনা করেছেন। এই মহীয়সী নারী ‘অর্ধেক বঙ্গেশ্বরী’ হয়েও তিনি সাধারণের মতো জীবন যাপন করতেন।পালঙ্ক ছাড়াই মাটিতে মাদুর বিছিয়ে শয়ন করতেন, দিনান্তে তাঁর খাদ্য ছিল উড়িধানের চালের অন্ন। তিনি তাঁর প্রজাদের জন্য নিজেকে নিয়জিত রেখেছিলেন। তার রাজ্যে কৃষিজীবী সম্প্রদায় সামান্য কর দিয়ে বাস করতেন। তারপরও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় কৃষকদের খাজনা মকুফ করে দেন। প্রজাদের ক্ষুধা  নিবারণের জন্য তিনি অসংখ্য লঙ্গরখানা খুলে দেন। প্রজাদের স্বার্থে তিনি রাজকোষ পর্যন্ত শূন্য করতে দ্বিধাবোধ করেননি। এক কথায় তিনি ‘দুর্ভিক্ষের করাল ছোবলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মেতে উঠেন। তাঁর কথা ছিল প্রজা না বাঁচলে রাজ্যের প্রয়োজন নাই। স্নেহময়ী জননীর মতো তিনি প্রজাকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। অন্যথা নারীর কল্যাণের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রর মতে, তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে মত দিলেও নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিরোধিতার জন্য তা আলোর মুখ দেখেনি। তাই তিনি নিজ প্রচেষ্টায় অনাথা ও  বিধবা নারীদের মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করেন ও তাদের ভরণ-পোষণের জন্য গঙ্গাতীরে আশ্রম করেদেন। তাছাড়া শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য তিনি ‘পাঠশালা’ ও ‘চতুষ্পাঠী’ নির্মাণ করেন যেখানে দর্শন, জ্যোতিশাস্ত্র, বিজ্ঞান, কাব্য, ব্যাকরণ প্রভৃতি বিষয় আলোচনা হতো।তিনি গরিব ও মেধাবী ছাত্রের শিক্ষার পথ সুগম করতে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন যা মি. অ্যাডামসের রিপোর্ট থেকে জানা যায়। এছাড়া তিনি জনসাধারণের পানির কষ্ট দূর করতে বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পুস্করনি স্থাপন করেন, যোগাযোগের সুবিধার জন্য নির্মাণ করেন রাস্তাঘাট, রোগার্তের চিকিৎস্যার জন্য নিয়োগ করেন বহু হাকিম ও কবিরাজ।সচেতন কবি হয়তো ইতিহাসের সত্যকে ভালোভাবেই জানতেন বনলতা সেন কবিতাটির গভীর অনুধ্যানের মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ উপলব্ধি করা যায়।  “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা” ‘তোমার কালো কেশের মতো রাতের আঁধার এলো ছেয়ে’ সমসাময়িক কবি জসীম উদদীনের মতো জীবনানন্দ দাশও চিত্ত আকৃষ্টকারী বনলতা সেনের ‘মেঘকালো’ চুলের বর্ণনা প্রদান করেছেন। কিন্তু ‘ঐতিহ্য উত্তরাধিকার’ সচেতন কবি ঐতিহ্যকে আশ্রয় করেই এই সৌন্দর্যকে রূপায়িত করেছেন। মূলত কবি এরূপ বর্ণনার মাধ্যমে শিল্পসম্মতভাবে বনলতা সেনের পরিচয়ের যোগসূত্র স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য মালবের একটি নগর ‘বিদিশা’। বিদিশার প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে অন্ধকার গুহা, যার অন্ধকার কুটুরি গভীর মনোযোগী অনুসন্ধানীকেও দিকভ্রষ্ট করে। বনলতা সেনের চুল বিদিশার সেই অন্ধকারকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার মোহনীয় চুলের অন্ধকারও সকলের হৃদয়-হরণ করে, দিশেহারা করে ফেলে অনুসন্ধানী মনকেও। কবি তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যের উজ্জ্বল বর্ণনা দিয়ে তাঁকে বাস্তব, জীবন্ত, সবাক সত্তায় পরিস্ফুট করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি বনলতা সেনের মুখকে ‘শ্রাবস্তীর’ সঙ্গে তুলনা করে একজনের মুখকে সুদূর রহস্যময় শিল্পকলায় পরিণত করেছেন। কেননা ‘শ্রাবস্তী’র ভাস্কর্য অলৌকিক দৃশ্যকে ধারণ করে আছে। তবে তা সৌন্দর্যের পশরা সাজানো পরিপাটি গোছের।প্রতিটি ভাস্কর্য যেন শিল্পীর মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলা। সহজ স্বাভাবিক গড়নের এবং সৌন্দর্যের প্রকাশ মূর্তিগুলোর  সাবলীল অঙ্গবিন্যাস, নিখুঁত সম্পাদন এবং বাস্তবের ভিত্তির উপর অতীন্দ্রিয় রসসৃষ্টি করে শ্রেষ্ঠত্বের বিকাশ ঘটিয়েছে। শ্রাবস্তীর এই কারুকার্য কি আমাদেরকে বনলতা সেনের সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দেয় না? পরোক্ষে আমাদেরকে কি রানী ভবানীর সৌন্দর্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না? কেননা পুরাণের ‘পরমাপ্রকৃতি’ ভবানীর মতো রানী ভবানীও ছিলেন ‘সুন্দরী, সুলক্ষণা’ এবং ‘ঐশ্বর্যশালিনী’ রমণী যার সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত আছে নানা মিথ। “অতিদূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙ্গে যে নাবিক” দিশেহারা নাবিকের চোখে দারুচিনি দ্বীপের ভেতর সবুজ ঘাসের দেশ যেমন জীবনের সন্ধান দেয় তেমনি অন্ধকারের (যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবীর হতাশা, গ্লানি, ক্লেদ, পঙ্কিলতা এবং মানুষের জীবনের চরম অনিশ্চয়তা অন্ধকারের প্রতিভূ)এই জগতে কবি আশার আলোর সন্ধান পেয়েছেন বনলতা সেনরূপী মহারানী ভবানীর আশ্রয়ে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষপীরিত পৃথিবীতে স্বাধীনচেতা-জনদরদি শাসকই পারে পৃথিবীর হতাশা, ক্লান্তি, গ্লানির অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখাতে। সমকালীন সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বনলতা সেন এর আদতে মহারানীর হিতৈষী হৃদয়ই কবিকে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। সমাজ ব্যবস্তাও সেই নীড়েরই প্রত্যাশী।কবির মধ্যেও জেগে উঠেছে প্রাণের স্পন্দন। তাই তিনি পৃথিবীর এই অন্ধকারে তাঁকে পৃথিবীতে ‘সবুজের আহবান’ হিসাবে কল্পনা করেছেন।  “এতদিন কোথায় ছিলেন?” ইতিহাসের প্রাণহীন কোটরে বন্দী এই মহীয়সী নারী কবির ‘সবুজের আহবানের’ প্রতীতি হিসাবে নির্মিত হয়েছেন। নবীন আবিষ্কারে মহনীয় সত্তায় উদ্ভাসিত কবি কল্পনায় জীবন্ত নারী তাঁর স্বভাবগত বিনয়ের ভাষায় কবির প্রতি কৃতজ্ঞ প্রকাশে কার্পণ্য করেননি। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো (স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে) জীবনানন্দ দাশও যেন তাঁর অবচেতন মনের গহীন থেকে রানী ভবানীর সেই আহবানকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। “পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” ইতিহাসের এই মহীয়সী নারী একসময় সকলের দুঃখ কষ্টের সময় নিজেকে বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু আজ তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন। কবি এই উপমার মাধ্যমে সেই বিষয়টির প্রতিই যেন ইঙ্গিত প্রদান করেগেছেন সুকৌশলে। পাখি যেমন নীড়ের টানে দিনান্তে ছুটে চলে আপন ঠিকানায় তৎকালীন সময়ের সংকটাপন্ন মানুষ স্বস্তির আস্থা খুজে পেতেন মহারানীর আশ্রয়ে। “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো” ‘শীত’ তাঁর কবিতায় বার বার নানা রকম ব্যাঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এবার কবি শীতের রুক্ষতার বিপরীতে সকালের ঘাসে স্নিগ্ধতার প্রতীক শিশিরের উপমা দিয়ে এই ভূ-খণ্ডের জরা জীর্ণতার বিপরীতে ইতিহাসখ্যাত মহীয়সী নারীর উপস্থিতি কল্পনা করেছেন হাজার বছরের ইতিহাসে ‘সৌন্দর্যের প্রতিমা’ হিসেবে। খুবই সামান্য সময়ের জন্য শীতের সকালের শিশিরের মতো। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই দিনের শেষে সন্ধ্যার আগমন ঘটে। কিন্তু এই কবিতায় সন্ধ্যার আগমন শিশিরের শব্দের মতো। শীতের রুক্ষতার মাঝে সৌন্দর্যের এক বিন্দু প্রকাশ ঘটে সকালের শিশিরে।সূর্যের প্রখরতায় সেই সৌন্দর্যটুকুও প্রকৃতি থেকে বিলীন হয়ে যায়। ঠিক সেইভাবে দিনের সৌন্দর্যকে ম্লান করে নিঃশব্দে সন্ধ্যা সমস্ত প্রকৃতিতে অন্ধকার নিয়ে হাজির হয়। সন্ধ্যা যেভাবে নিঃশব্দে প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্যকে ম্লান করে ঠিক সেই ভাবে রানীর প্রয়াণও তাঁর রাজ্য ও জনগণের জীবনের সৌন্দর্যকে ম্লান করে ফেলেছে।ব্রিটিশ রাজশক্তির অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছে, নীলকরদের হাতে কৃষক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, অন্ধকার এসে জীবনের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষাকে(আলোকে)গ্রাস করে ফেলেছে।   “ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল” জীবনানন্দের শব্দের খেলায় জীবনের বর্ণনা প্রকৃতির নিরবিচ্ছিন্ন আবেস্থনের মধ্যে দ্বীপের মতো জেগে উঠেছে। তাঁর কবিতায় ‘চিল’ নামটি বার বার এসেছে। মনে হয় কবি সচেতনভাবেই এই নামটি ব্যবহার করেছেন। আবার তিনি চিল এর বেশে ফিরে আসার সংকল্পও করেছেন। বৈশিষ্ট্যগত ভাবে চিল একটি উচ্চ চিৎকারকারী নখর বিশিষ্ট মাংসাশী প্রাণী। চিলের এই উচ্চ চিৎকার কি বাক স্বাধীনার প্রতীক নয়? এবং জীবনের প্রয়োজনে শত্রুর মোকাবেলায় প্রতিবাদী নয়? কবি উপলদ্ধি করেছেন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে ব্যক্তির বাক স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে, জীবিকার চেয়ে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ জরুরী হয়ে পড়েছে। ঠিক সেই সময়ে এই প্রতীকের ব্যবহারে কবি বাক স্বাধীনতা ও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিবাদী সত্তার অনুসরণ করেছেন। তাই সারা দিনের ক্লান্তি মুছে ফেলেও চিল যেমন স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে তেমনি মহারানী ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের পট পরিবর্তনের পরও মহারানী ভেঙ্গে পরেননি বরং অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে হয়ে উঠেন প্রতিবাদী। তাই তো ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহ্‌ও তাঁর কাছে সাহায্য পার্থই। ১৭৭১ সালে রানী ভবানীকে লেখা একটি চিঠির ভাষ্য মতে, “...আপনই আমাদের প্রকৃত শাসক, আমরা আপনার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করি। আপনার নিকট হইতে আমরা সাহায্য লাভের আশা করি।” “পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি” সকল প্রকার সৌন্দর্য বিলীন হয়ে গেলে অন্ধকার এসে আলোকে গ্রাস করে ফেলে। সূর্যের সোনা-জ্বলা আকাশ রাত্রির কালো কাপড়ে আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায়। বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে আলোকের স্থান হয় পাণ্ডুলিপির হৃদয় পটে। বনলতা সেন রূপী রানী ভবানীর ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।রাতের জমাট অন্ধকারে মিটমিট করে যেভাবে জোনাকি জ্বলে থাকে ঠিক তেমনি রানী ভবানীও বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে মানুষের মুখের গল্পে পরিণত হয়েছেন, আগামী দিনের অনুপ্রেরণা হিসাবে অন্ধকারের মাঝে জোনাকির আলোর মতো। “সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী ফুরায়” ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ বাউল সাধক লালনের অচিন পাখিই কি জীবনানন্দ দাশের ‘পাখি’ নয়? মৃত্যুর মাধ্যমে যার পরিসমাপ্তি ঘটে, শেষ হয় জীবনের সব দেনা পাওনা। আবার সব নদীই এক সময় বিলীন হয়ে যায়।মহারাণীও তেমনি জীবনের লেন-দেনা শেষ করে প্রকৃতিতে আশ্রয় নিয়েছেন, বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন জগতের সীমা থেকে। তাঁর এই বিস্মৃতি সূচিত হয়েছে অন্ধকারের হাত ধরে। জীবনানন্দ দাশের এই ‘অন্ধকার’ কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান’-এর শ্যাম বা কৃষ্ণ রূপটিকেই প্রতিকায়িত করে না? তিরিশের কবিদের মধ্যে সর্বজন বিদিত কবি জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিকতার পথে যাত্রা করলেন না বরং মৃত্যুর দুর্বিষহ রূপটিকে হৃদয় বিদারিত সুরে বর্ণনা করলেন যেখানে মৃত্যু তাঁর কণ্ঠে অন্ধকার আত্মার প্রতিধ্বনি হিসেবে ধরা দিয়েছে। তাই মুখোমুখি বসিলে কেবল মৃত্যুর অন্ধকার সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠে। যে মৃত্যু কবির বর্তমান সময়ের প্রেরণাকে গ্রাস করেছে।                                                                                                          

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি