ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:৫০:৪০

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পুনর্গঠন শুরু করেন   

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পুনর্গঠন শুরু করেন   

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরেই দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন শুরু করেন এবং সফলভাবে সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক এবং অর্থনীতির বাইরের উভয় খাতের গভীরে প্রথিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেন।    বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রকাশিত সংবাদপত্রের রিপোর্ট এবং প্রকাশিত গ্রন্থে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক সম্পদের পর্যাপ্ত সহবরাহ, অবকাঠামো পূননির্মাণ, যুদ্ধে সর্বস্বহারা লাখ লাখ লোকের পুনর্বাসন এবং আর্থিক, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনরুজ্জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক খাতের বাইরে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন এবং বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়। এরফলে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় দিবসে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সুভেনিয়রে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, তিনশ’র বেশি রেলসেতু এবং তিনশ’ বেশি সড়ক সেতু যুদ্ধকালে পাকিস্তানী বাহিনী ধ্বংস করেছে। ২৯ টি জাহাজ ডুবিয়ে বন্দরের প্রবেশপথ অচল করে দেয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যায়। পলায়নরত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বন্দরের চ্যানেলে মাইন পুঁতে যাওয়ার কারণেও দেশের প্রধান এই সমুদ্র বন্দর ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। তারা আত্মসমর্পণের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ টাকা ও মজুদ স্বর্ণ জ্বালিয়ে দেয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিরা প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়। এতে সদ্য স্বাধীন হওয়া এই দেশটি অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। সুভেনিয়রে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে কৃষিখাতে ৩৭৬ কোটি টাকাসহ দেশের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক এই দুর্বল অবস্থার মধ্যেই দেশে নবগঠিত কতিপয় গ্রুপ তাদের অশুভ উদ্দেশ্য পূরণে রাজনৈতিক বিপন্ন পরিস্থিতি তৈরি ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু তাদের কঠোর ভাষায় সাবধান করে দেন এবং একই সময়ে বিপুলসংখ্যক উন্নয়ন কার্যক্রম এবং নীতি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জাতি পুনর্গঠন শুরু করেন। বাংলাদেশ অবজারভারের প্রথম পাতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ত্রাণ ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। দৈনিক বাংলার ১৯৭৫ সালের ২৬ জানুয়ারি রিপোর্টে বলা হয়, গৃহহীন মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু ৩ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্ব হারানো নারী, শিশু ও অন্যদের জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের জুন মাসে ১ লাখ ৬৬ হাজার বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালে ৫ শত কোটি টাকার প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন। বাজেটে কৃষি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়, এর পর শিক্ষা ও সামাজ কল্যাণে বেশি বাজেট বরাদ্ধ রাখা হয়েছিল। সার ও শিশু খাদ্যের উপর শুল্ক প্রত্যাহার করা ও তুলা থেকে তৈরি সুতার এবং পানির পাম্পের উপর থেকে কর কমানোর সিদ্ধান্ত ছিল বাজেটে পুর্নগঠন প্রক্রিয়ার অংশ। শিশুদের জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে সার ও শিশু খাদ্য সরবারাহকারী কৃষকদের কর আরোপ করা হয়নি। সাধারণ জনগণ যাতে সহজে কাপড় সংগ্রহ করতে পারেন তার জন্য সূতি কাপড়ের উপর কম করে কর ধার্য করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বিশেষ উদ্যোগে পরের বছরই ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ঘোষণা করা হয়।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদুৎ বিতরণ পুরুদ্ধার করার লক্ষ্যে দেশের বড় বড় সেতু, বিদুৎ কেন্দ্র, টেলিফোন ভবন পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু করেন। যা ছিল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়। পরবর্তী বছরগুলোতে সরকার হার্ডিঞ্জ ব্রীজ, তিস্তা ও ভৈরব রেলওয়ে ব্রীজ পুনঃনির্মাণ করে যানবাহনের জন্য খুলে দেয়।চট্রগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ভাঙ্গা জাহাজ অপসারণ করে বন্দর চলাচলের যোগ্য করে তোলা হয়। বঙ্গবন্ধু একই সাথে যমুনা নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। শিল্প খাতের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার দীর্ঘ মেয়াদী শিল্প ঋণ প্রদানের নীতিমারা গ্রহণ করেন। বিনিয়োগকারীদের জন্য চলমান কাজের জন্য স্বল্প মেয়াদি মূলধন ঋণ প্রদান ও ইক্যুইটি সার্পোট দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পরমাণু শক্তি কমিশন, বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ, শিল্পঋণ সংস্থা, কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন। এই সব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গবন্ধুর অপর পদক্ষেপ ছিল সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ে বিভিন্ন দেশের সাথে কার্যকরী কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার কাজ। বঙ্গবন্ধুর সফল প্রচেষ্টার কারণে জাতিসংঘ যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পরবর্তী বাংলাদেশ পুনঃগঠনের সহায়তার জন্য ৪১১ কোটি টাকা প্রদানের ঘোষণা প্রদান করেছিল। ভারত সরকার সে সময় বাংলাদেশকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার সহযোগিতা প্রদান করে। জাতিসংঘের ত্রাণ পরিচালনা কমিটি ১৯৭২ সালের এক প্রতিবেদনে যুদ্ধ পরবর্তী এক বছরের মাথায় দেশটিতে সুশৃংখল ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য তৎকালীন সরকারকে ধন্যবাদ জানায়। তৎকালীন মার্কিন দুতাবাস যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে পাঠানো এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায় যে, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সব কিছু তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেভাবে প্রশাসনকে পুনঃবিন্যাস করেন তাতে মনে হয় নি বাংলাদেশ মাত্র এক বছর আগে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এসি  
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল সবার জন্য সমান অধিকার: অর্থনীতিবিদদের অভিমত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাধীনতার পরপরই এক সুদূর প্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন বলে দেশের বেশ ক’জন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।    তারা বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে নতুন সরকার যুদ্ধ নিপীড়িত মানুষ বিশেষ করে পল্লীর দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে সেজন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আর্থিক নীতি প্রণয়ন করে। দেশের প্রথম বাজেটে কৃষি, শিক্ষা ও সমাজ কল্যাণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা এবং নারী, শিশু ও যুদ্ধে সর্বস্বান্তদের জন্য গৃহনির্মাণে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর বিশেষ উদ্যোগে এই বাজেটের আলোকে দারিদ্র্য বিমোচন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকায় দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু সব সময় গরীবের পক্ষে কাজ করেছেন। এমনকি ছোট বেলাতেই তিনি তাঁর পিতার ক্ষেতের ফসলের অংশ গরীবদের মাঝে বিতরণ করতেন। ড. আতিউর বলেন, আমরা তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো যে তিনি পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তিনি বহুবার হাসিমুখে কারাগারে গিয়েছেন। এমনকি জেলেও তিনি অন্য বন্দীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলেন এবং তাদের সমস্যা সম্পর্কে বোঝাতে চেষ্টা করেন। তিনি তাদের সমস্যা সমাধানেরও পরামর্শ দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা দিতে হবে না এবং কেউই ১শ’ বিঘার ওপর জমি রাখতে পারবে না।তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠায় ব্যাংক ও শিল্প কারখানা জাতীয়করণ এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু চাকরির সুযোগ সৃষ্টি ও আয় বৈষম্য কমিয়ে আনতে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প এবং কুটির শিল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সঙ্গে দেশব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেন। আতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও দারিদ্র্য বিমোচন এবং সবার সমনাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তিনি বলেন, এক কথায় বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন হচ্ছে সমতার অর্থনীতি অর্থাৎ সবার জন্য সমনাধিকার।বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক জন সাবেক গভর্ণর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, পাকিস্তান সরকারের পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে সবধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার নীতি ও তৎপরতার প্রেক্ষাপটে ৬ দফা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সে সময় জাতীয় বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে কোন প্রণোদনা ছিল না। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের পাট ছিল পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরিতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নীতি ও দক্ষ নেতৃত্বে দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। বস্তুতঃ বাংলাদেশ আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্বাসনের সুফল যাতে সবাই পায় সেজন্য বঙ্গবন্ধু দেশ গড়তে স্বাধীনতার পরপরই ব্যাংক ও কলকারখানা জাতীয়করণসহ বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এসি   

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে  জাতীয় শোক দিবস পালিত   

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়েছে।  শুক্রবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ম্যাগডোনালের চার্জ এভিনিউ’র আবদুল্লাহ রেস্টুরেন্টে মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।  এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, টাঙ্গাইল ৫ আসনের সংসদ সদস্য সানোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, ব্রুকলিন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম নজরুল। বিশেষ অতিথি ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শামসুউদ্দিন আজাদ, মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু।    প্রধান অতিথি  বলেন, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক ও বেদনার দিন। এই দিনে ঘাতকেরা সপরিবারে হত্যা করেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ইতিহাসে এই  রকম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নজির নেই। এই দিনে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার স্থপতিকে, বাংলাদেশিরা হারিয়েছেন তাদের জাতির পিতাকে, বাঙালি হারিয়েছে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে। মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি বাঙ্গালি জাতির জনককে  হত্যা করলেও তার নীতি ও আদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। যতদিন বাংলাদেশ ও বাঙালি থাকবে, ততদিন জাতির জনকের নাম এ দেশের লাখো কোটি বাঙালির অন্তরে চির অম্লান হয়ে থাকবে।’ কেআই/ এসএইচ/    

পিতার ভবনে অমৃতসদনে

বাঙালির অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক বাড়ির সঙ্গে। জড়িয়ে আছে হাজারো সংগ্রামের ইতিহাস। একটি জাতির মুক্তির ইতিহাস। একটি দেশের জন্মের ইতিহাস। ’৬০ এর দশক থেকে সেই ছোট্ট বাড়িটি সাহস, দৃঢ়তা আর বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে আছে বাংলার মানুষের কাছে। ধানমন্ডির লেকের ধারে ৩২ নম্বর সড়কে ৬৭৭ নম্বরধারী সেই বাড়িটি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে দেশের সব নাগরিককে একবারের জন্য হলেও এই ‘পিতার ভবনে অমৃতসদনে’ আসতে হবে। ১৯৬২ সালের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলার মুক্তিসনদ ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ’৭১ সালের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বঙ্গবন্ধু নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে মতবিনিময় করেছেন এই বাড়িতে বসেই। ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণের রূপরেখাও তিনি তার মানসমুকুরে সাজিয়ে নিয়েছিলেন এ বাড়ির কনফারেন্স টেবিলে বসে। ২৩ মার্চ ১৯৭১ -এ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনটিতেই বিক্ষুব্ধ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয় এখানেই। যা, সঙ্গে সঙ্গেই ছড়িয়ে যায় সারা বাংলায়। স্বাধীনতোত্তর দিনগুলোতে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবেও এ বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু তার রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।  ৩২ নম্বরের এই বাড়িটিতে তখনও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ছিল অবারিত দ্বার। আবার এ বাড়িতেই নেমে আসে শোকাবহ রাত ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ এর এই রাতে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাড়িটির এ সমস্ত প্রেরণাদায়ক ঐতিহ্যের কথা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে এ বাড়ির নম্বরও পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এই কু-উদ্দেশ্যেই একে বলা হতো, ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাড়ি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা যে এতো সহজ নয়, তা জানতো না খুনীরা। তাই, আজও ৩২ নম্বর বলতে মানুষ বঙ্গবন্ধুর বাড়িকেই বোঝে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার কৃষি ও বনমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু। তবে, সে সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। অতঃপর ১৯৫৬ সালের কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। তবে তখনও ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনও ঠাঁই ছিল না। তিনি সপরিবারে থাকতেন আবদুল গণি রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে। এসময় পিডবিস্নউডি থেকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছিল। একদিন বঙ্গবন্ধুর পিএস নুরুজ্জামান পিডবিস্নউডি থেকে একটি আবেদনপত্র এনে দেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। সেটি জমা দেয়া হলে ১৯৫৭ সালে বেগম মুজিবের নামে ছয় হাজার টাকা মূল্যের এক বিঘার একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথমে দুই হাজার টাকা এবং পরে কিস্তিতে বাকি চার হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। ওই বছরই শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নিবেদিত প্রাণ শেখ মুজিব দলকে সময় দেবেন বলে ছেড়ে দেন মন্ত্রিত্ব। ১৯৫৮ সালে টি বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সেগুনবাগিচায় একটি বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। সে বছরই আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করলে গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। ১২ অক্টোবর সেগুনবাগিচার বাড়িটি তিন দিনের মধ্যে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুল মাঠের পাশে মাসিক ২০০ টাকা ভাড়ায় একটি বাড়িতে এসে ওঠেন বেগম মুজিব। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই শেখ মুজিবের পরিবার যে এই বাড়িতে থাকেন, তা জানাজানি হয়ে গেলে বাড়ির মালিক বেগম মুজিবকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। সন্তানদের নিয়ে আবার তিনি এসে ওঠেন সেগুনবাগিচার একটি বাসার দোতলায়। পরবর্তী ২ বছর এখানেই তারা ছিলেন। ১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পান। চাকরি নেন আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির কন্ট্রোলার অব এজেন্সিস পদে। বেতন ৩ হাজার টাকা। বেতনের সেই টাকার উপর নির্ভর করে পিডবিস্নউডির বরাদ্দ দেওয়া সেই প্লটে ১৯৬১ সালে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধারকর্জ করে, বন্ধুবান্ধবদের সহায়তায় এবং হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিয়ে ঢাকার বুকে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব ঠিকানা। নির্মাণ কাজ তদারকি করেছিলেন তৎকালীন পিডবিস্নউডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও পরবর্তীকালে পূর্তসচিব মাইনুল ইসলাম। নির্মাণ কাজে নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও দাফতরিক সহকর্মীরা। সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহকর্মী চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের নূরুল ইসলাম। আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির একজন কর্মকর্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল তার আত্মিক এবং পারিবারিক সম্পর্ক। নূরুল ইসলাম ‘ক্রস ওয়ার্ড’ লটারি খেলতেন। একদিন লটারীতে ব্যবহার করেছিলেন শেখ রেহানার নাম। সেইদিনই তিনি পেয়ে যান ছয় হাজার টাকা। সেই টাকা তিনি গচ্ছিত রাখেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছে। বাড়ির নির্মাণ কাজে টাকার সংকট দেখা দিলে নূরুল ইসলাম এই গচ্ছিত টাকা কাজে লাগানোর অনুরোধ করেন। সেই টাকা ঋণ হিসাবে গ্রহণ করে পরবর্তীতে তা পরিশোধও করেন বঙ্গবন্ধু। বাড়ির জানালার গ্রিল সরবরাহ করেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা রংপুরের মতিউর রহমান। বাড়ি নির্মাণকালে কেয়ারটেকার ছিলেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার আরজ আলী। কোনোমতে নির্মাণকাজ শেষ করে ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এই বাড়িতে উঠে আসেন। বাড়িতে ঢুকতেই ছিল একটি ছোট রুম, যা ড্রয়িংরুম হিসাবে ব্যবহার করা হতো। আসবাব বলতে ছিল একসেট বেতের সোফা মাত্র। একতলা বাড়িটিতে তখন ছিল দুটি বেডরুম। যার একটিতে থাকতেন বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব। অন্যটিতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তার পাশের কক্ষটি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। রান্নাঘরের এক পাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। বঙ্গবন্ধু ও তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৩২ নম্বরের এ বাড়িটিকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে দোতলার কাজ শেষ হয়। ১৯৯৪ সালে লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুলে ধরেছেন ৩২ নম্বরের বাড়িতে তাদের বসবাসের দিনগুলোর কথা : ‘১৯৬১ সালে এই বাড়িটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কোনোমতে তিনটা কামরা করে এতে আমরা উঠি। এরপর মা একটা একটা কামরা বাড়াতে থাকেন। এভাবে ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে দোতলা শেষ হয়। আমরা দোতলায় উঠে যাই। ছয় দফা দেবার পর কাজকর্ম বেড়ে যায়। নিচতলাটা তখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই ব্যতিব্যস্ত। নিচে আব্বার শোবার কামরাটা লাইব্রেরি করা হয়।’ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যে টেলিফোনটি প্রথম সংযোগ দেয়া হয় সেটির নম্বর ছিল ২৫৬১। এই টেলিফোন নিয়ে একটি মজার গল্প আছে। আইয়ুব খানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রায়ই এ টেলিফোনটিতে আড়ি পাততো। তাই, শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে নিজের নাম গোপন করে ‘বালিওয়ালা’ বলে নিজের পরিচয় দিতেন। আর সিরাজুল আলম খান নিজের পরিচয় দিতেন ‘ইটাওয়ালা’ বলে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাসও, আছে হারানোর বেদনা। স্বাধীন দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের অন্ধকারে একদল বিশ্বাসঘাতক বিপথগামী সেনা অফিসারের হাতে ৩২ নম্বরের বাড়িতেই সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন নরপিশাচরা রাতের অন্ধকারে হামলা চালায় স্বাধীনতার স্থপতির বাসভবনে। পৈশাচিক উল্লাসে বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুর নির্মমভাবে হত্যা করে তারা। সে রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ তিনটি বাড়িতে সংঘটিত খুনীদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বীভৎসতার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি : ‘কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বাড়িটির প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বয়ে যায় বাড়িটিতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর হয়ে পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই পড়েছিলো তার ভাঙ্গা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল। টেলিফোন অপারেটর। মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব। বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল। নিচ তলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের। এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবীর ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।’ সেদিন আরো হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের বাসায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলসহ কয়েক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে।  এরপর বাড়িটি সিল করে দেয় তৎকালীন সরকার। হত্যাকণ্ডের সময় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন। পরে, তারা ভারত সরকারের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে ভারতে চলে আসেন। নির্বাসিত অবস্থায় দিল্লীতে বসবাস করতে থাকেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরে এলে বাড়িটি ফিরে পান তিনি। এর বছর খানেক পর শেখ হাসিনা সংবাদপত্রে একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখতে পান। হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশনের সেই বিজ্ঞপ্তির তালিকায় ৩২ নম্বরের বাড়িটিও ছিল। বাড়ি নির্মাণে পাকিস্তান আমলে নেওয়া ১২ হাজার টাকা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ও পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ক্ষমতায় থেকেও এই অতি সাধারণ বাড়িটির কোনও ‘উন্নয়নও’ করার চেষ্টা করেননি বঙ্গবন্ধু। ঋণ বকেয়া থাকায় নিলামে ওঠে বাড়িটি। ১২ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধের পর বাড়িটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয় শেখ হাসিনাকে। জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য বাড়িটি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট উদ্বোধন করা হয় জাদুঘরটি। নাম দেওয়া হয়- ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর।’ ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন: ‘মিউজিয়াম করতে গেলে অনেক পরিবর্তন করতে হয়। সে পরিবর্তন কমিটি করাচ্ছে। আমি প্রায়ই যাই দেখতে। দেয়ালগুলোতে যখন পেরেক ঠোকে, জিনিসপত্রগুলো যখন সরিয়ে ফেলে, বুকে বড় বাজে, কষ্ট হয়, দুঃখ হয়। মনে হয় ওই পেরেক যেন আমার বুকের মধ্যে ঢুকছে। মাঝে-মাঝেই যাচ্ছি, ঘুরে দেখে আসছি যতই কষ্ট হোক। এই কষ্টের মধ্যে, ব্যথা-বেদনার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। সে আনন্দ হলো, আমরা জনগণকে তাদের প্রিয় নেতার বাড়িটি দান করতে পারছি। জনগণের সম্পত্তি হবে ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি। এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। আমরা তো চিরদিন থাকবো না কিন্তু এই ঐতিহাসিক বাড়িটি জনগণের সম্পদ হিসেবে সব স্মৃতির ভার নিয়ে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে।’ জাদুঘরটা সাদামাটা। তিন তলা ভবন মাত্র। নয় কক্ষবিশিষ্ট এ ভবনের আসবাব পত্রও একদমই সাধারণ মানের। ভবনে ঢুকতেই চোখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। প্রথম তলায় আরও রয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে নিহত সবার ছবি এবং কিছু আসবাবপত্র। এই ঘরটি আগে ছিল ড্রইং রুম। এই ঘরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। এর পাশের ঘরটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের পড়ার ঘর। এখানে তিনি লেখালেখির কাজও করতেন। ১৯৭১ সালে এই ঘর থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠানো হয়েছিল সারাদেশে। দোতলায় বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষ। এ ঘরের সামনে করিডর থেকে নিচে যাওয়ার সিঁড়িতেই ঘাতকদের গুলিতে মারা যান জাতির পিতা। এখনও গুলির চিহ্ন সেখানে রয়ে গেছে। আর রয়েছে, শিল্পীর তুলিতে আঁকা বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ অবস্থার একটি প্রতিকৃতি। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে তার বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে সাজানো আছে তার প্রিয় পাইপটি, তামাকের কৌটা। রয়েছে টেলিফোন সেট ও রেডিও। সামনের খাবার ঘরের একপাশে আছে শিশু রাসেলের বাইসাইকেল। আছে খাবার টেবিল, থালা, বাটি। আছে রেকসিনের সোফা। শেখ জামালের কক্ষে দেখা যায় তার সামরিক পোশাক। বাড়ির তৃতীয় তলায় শেখ কামালের কক্ষে তার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সাজিয়ে রাখা আছে। এছাড়াও রয়েছে পুত্রবধূ সুলতানা কামালের বৌভাতের সবুজ বেনারসি শাড়ি, রোজী জামালের লাল ঢাকাই জামদানি, বিয়ের জুতা, ভাঙা কাচের চুড়ি, চুলের কাঁটা, শিশু রাসেলের রক্তমাখা জামা, বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা সাদা পাঞ্জাবি, তোয়ালে, লুঙ্গি, ডায়েরি। বাড়ির দেয়াল, দরজা, ছাদসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘাতকের বুলেটের চিহ্ন ১৫ আগস্টের সেই অমানবিক বীভৎসতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এসব ছিলো, তিনি যাদের ‘ভাই-য়েরা আমার’ বলে সম্বোধন করতেন এ দেশের সেই সমস্ত ভাইদের মধ্যকার একদল বিশ্বাসঘাতকদের। অপকীর্তির ইতিহাসের এই দেয়াল লিখন যুগ যুগ ধরে নিন্দিত হতে থাকবে। এই বাড়ির পেছনে রয়েছে জাদুঘরের স¤প্রসারিত নতুন ভবন। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মায়ের নামে এ ভবনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুন’ গ্যালারি। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট এ অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। ছয় তলা এ ভবনের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র রয়েছে। পঞ্চম তলায় রয়েছে পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র। বঙ্গবন্ধু ভবনের গেটের উল্টোদিকে একটি স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করে কীর্তিত হয়েছে সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা একটি অবিস্মরণীয় কবিতার বিশেষ অংশ। যেটা, আসলে কবির উপলব্ধির চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেই হয়ে আছে। আজ অবধি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি বাঙালির মনের কথা। আর সর্বদা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরে অন্তরে : ‘যতকাল রবে পদ্মা, মেঘনা গৌরী, যমুনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ লেখক : সাংবাদিক, নিউজ রুম এডিটর, একুশে টিভি, ঢাকা।

টিএসসিতে বঙ্গবন্ধুর ৪৩ ফুট উচ্চতার চিত্রকর্ম [ভিডিও]  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় চিত্রকর্ম দেখতে ভিড় করছেন বহু মানুষ।   ৪৩ ফুটের এই চিত্রকর্ম মনে করিয়ে দিচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। ৩০ জন শিল্পীর ১৫ দিনের নিরলস পরিশ্রম মূর্ত করে তুলেছে স্বাধীনতার স্থপতিকে।   জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহদাতবার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় চিত্রকর্মটি রাখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি এলাকায়। রং তুলির ছোঁয়ায় বঙালির সবচে প্রিয়জনকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীরা। চিত্রকর্ম দেখতে আসা মানুষেরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু দেশ ও দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতেন। জীবনভর সংগ্রাম করেছেন স্বাধীনতার জন্য। বাংলাদেশের স্থপতির আর্দশ ধারণের আহ্বান তাদের কন্ঠে।  ছবির একপাশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা অন্নদা শঙ্কর রায়ের কবিতাটি স্থান পেয়েছে। বাঙালির চেতনায় বঙ্গবন্ধু তাই অবিনশ্বর।    শিল্পীদের আঁকা বিশাল এ ছবির মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলে থাকারই অনুভূতি কারো কারো। দেড়শ শিল্পীর তত্ত্বাবধায়নে ৩০ জন শিল্পীর রঙতুলির ছোঁয়ায় মূর্ত হয়ে উঠেছে চিত্রকর্মটি। জাতির জনকের ৪৩তম শাহাদাত বার্ষিকীতে চিত্রকর্মের উচ্চতা ৪৩ ফুট নির্ধারণ করে চারুশিল্পী সংসদ। ভিডিও:   এসি    

বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে ৪০ বছর রোজা রেখে শোক পালন!

বাঙালি জাতির জনক, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ও বাঙালির কাছে স্বপ্ন পুরুষ। তিনি সমগ্র জাতির ভালোবাসার আরাধ্য নাম। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রোজা রেখে শোক পালন করে আসছেন আওয়ামী লীগ নেতা মো আবদুল আলিম মোল্লা (৬৫)। তিনি টঙ্গীর মোদাফা এলাকার ৫২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স কম থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার অপরাধে বিএনপি সরকারের শাসনামলে ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হয়েছিলো তাকে। কিন্তু এত সব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালোবাসা কখনো টান পড়েনি। ব্যক্তি জীবনে তিনি দুই ছেলের জনক।   আব্দুল আলিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘১৫ আগস্ট আসলেই আমার সেই দিনের কথা মনে পড়ে যায়। আমি পুরো মাসজুড়ে আল্লাহর নিকট আমার আদর্শ, আমার নেতা ও তার পরিবারের জন্য প্রার্থনা করি। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রোজা রেখে শোক পালন করি এবং ৩১ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে ইফতার করে শোক পালনের সমাপ্তি ঘটাই।’    কেআই/এসি    

বঙ্গবন্ধু বললেন তুই আমাকে লিডার বলিস না: কামাল লোহানী

টানা সাড়ে তিন মাস বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে একই সেলে কাটিয়েছেন কিংবদন্তীতুল্য সাংবাদিক কামাল লোহানী। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় থেকে অসংখ্যবার বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে এসেছেন। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন রেডিও কমেন্টি করেছেন তিনি। কলকাতা সংবর্ধনা সভায়ও তিনি কমেন্টি করেছেন। সংবাদ সংগ্রহের কাজে বঙ্গবন্ধুকে অনুসরন করেছেন ছায়ার মত। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে ভাবছেন তা জানতে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় তাঁর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কীভাবে? কামাল লোহানী: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আমি কর্মী ছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু পাবনায় নির্বাচনী প্রচারে যেতেন ও আমাকে কর্মী হিসেবে চিনতেন। তবে সরাসরি সান্নিধ্যে আসি ১৯৬২ সালে। এ বছর আমি গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে যাই। আমাকে পাঠানো হয় ২৬ নাম্বার সেলে। সেই সেলে বঙ্গবন্ধু ছিলেন। সেলে ঢুকতেই একটি দরাজ কন্ঠ বলে উঠল, `আয় আয় এখন থেকে আমাদের সঙ্গে বাস করতে হবে।` এ দরাজ কন্ঠটিই বঙ্গবন্ধু। আমার ওই বয়সে জেল খানায় হঠাৎ করে জেল খানায় গিয়ে এমন আন্তরিক সান্নিধ্য আমার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। এরপর সাড়ে তিন মাস আমরা একসঙ্গে ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটা কথা আমার জন্য যেমন শিক্ষণীয়, প্রতিটা আচরণ ছিল আমার জন্য বিস্ময়কর। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জেলখানায় তখন বোধহয় অনেক নেতা ছিলেন। কামাল লোহানী: হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধু সহ অনেক নেতা তখন কারাগারে। জেলখানায় দীর্ঘদিন ধরে বন্দী ছিলেন রণেশ দাস গুপ্ত। বামপন্থী নেতা। বঙ্গবন্ধু তাঁকে যে কী পরিমাণ শ্রদ্ধা করতেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জেলখানায় এমন অনেক পুরনো কারাবন্দী ছিল যারা পনের বিশ বছর ধরে জেল খাটছিল। আমি খেয়াল করে দেখলাম, জেলখানায় নেতৃত্ব বা প্রভাব খাটানোর কোন ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুর ছিল না। সবাইকে সহবন্দী হিসেবে ট্রিট করতেন। আমাদের একই সেলে তাজউদ্দিন ছিলেন, আবুল মনসুর আহমেদ (ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুয আনাম এর বাবা) ছিলেন, কফিল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন, ইত্তেফাক- এর তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন, কোরবান আলী ছিলেন। ছাত্রনেতাদের মধ্যে শাহ মোয়াজ্জেম, শেখ ফজলুল হক মণি, হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক নেতাদের মধ্যে নাসিম আলী ছিলেন। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতানৈক্য ছিল। কিন্তু আমরা সবাই একটা বিষয়ে একমত ছিলাম। তা হলো আমাদের শত্রু এক। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: তখন বঙ্গবন্ধুর প্রভাব আপনার উপর কেমন পড়েছিল? কামাল লোহানী: বঙ্গবন্ধুকে আমি `লিডার` সম্বোধন করতাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই আমাকে লিডার ডাকবি না। আমি জানি তোর লিডার কে। কারণ, তিনি জানতেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে আমি তাঁর অনুসারী নই। আমি গোঁ ধরে তাঁকে লিডার ডেকেছি সব সময়। আমরা বিকেলে ভলিভল খেলতাম। আপনারা জানেন, বঙ্গবন্ধু টুঙ্গীপাড়ায় ভাল ফুটবল খেলতেন। কিন্তু কারাগারে দেখেছি তিনি ভাল ভলিবলও খেলেন। তাঁর শারীরিক উচ্চতার কারণেই তিনি ভাল খেলতেন। আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে খেলতাম। একটা দলে ক্যাপ্টেন ছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধু আমাকে ক্যাপ্টেন বানিয়ে তিনি আমার দলে খেলতেন। খেলার মাঠে তিনি খেলোয়াড়। অন্য কিছু তখন তার মাথায় আসতো না। একে একে সবাই জামিন নিয়ে বের হয়ে গেল। শুধু বঙ্গবন্ধু, আমি ও রনেশ দা রয়ে গেলাম। আমার রিলিজ অর্ডার যখন আসল, তিনি তখন বললেন, তুইও চলে যাবি? আমি তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি। কারাগারে একটা জিনিস খেয়াল করেছি। সেটা হলো জেলার থেকে শুরু করে বাইরের সবাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি একটা গোপন আনুগত্য দেখায়। গোপন একটা শ্রদ্ধা সবাই লালন করে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি যখন বঙ্গবার্তায় কাজ করতেন তখন বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপাতেন না। সত্যি নাকি? কামাল লোহানী: হ্যাঁ সত্যি। তবে একবার ছেপেছিলাম। খুব বড় করেই ছেপেছিলাম। ওনাে বক্তৃতাটা হুবুহু ওনার ভাষায় তুলে দিয়েছিলাম। ওনি ফোন করলেন অফিসে। আমি রিসিভ করার পর বললেন, ` কীরে? তোরা তো আমার ছবি ছাপিস না? আজ ছাপলি যে?` আমি ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেলাম। কী বলব ভাবছি। তিনি বললেন, `ফজা ( সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ) কৈ?` আমি বললাম, প্রেসক্লাবে। তিনি হো হো করে হেসে বললেন, `তাস খেলতে গেছে। না? বলিস আমি ফোন করছিলাম`। এই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু। যিনি সবকিছু সহজ স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারতেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের পরে যখন কলকাতায় সংবর্ধনা নিতে গেলেন তখন কমেন্টি আপনি করেছিলেন। সেখানে বিশেষ কোন স্মৃতি? কামাল লোহানী: হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধু পড়াশুনা করেছেন কলকাতা ইসলামীয়া কলেজে। ছাত্ররাজনীতি করেছেন কলকাতায়। সেখানে তাঁর অনেক স্মৃতি। বক্তৃতা শেষ করে আমাকে বললেন, ` ওই আমি ছাগু মিয়ার হোটেলে চা খেতে যাব`। আমি বললাম, ` আপনি তো এখন ইসলামীয়া কলেজের ছাত্র না। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী। আপনার নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজকরা চিন্তিত। তারা আপনাকে যেতে দেবে না। তিনি অনেকটা আদরের সঙ্গে ধমক দিয়ে বললেন, `ধূর, শেখ মুজিবের আবার নিরাপত্তা কী`। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ১৫ আগস্ট নিয়ে বলুন। কামাল লোহানী: ১৫ আগস্ট সকালে আমাকে টেলিফোন করে আমার সহকর্মী খুরশীদ আলম। এরপর রেডিও খুলে মেজর ডালিমের কণ্ঠ শুনি। ` শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।` এরপর অফিসে গেলাম। কিন্তু অফিসে আমাদের কিছুই করার ছিলনা। এরপর সংবিধান বাতিল হল। পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হলো। সরকারের ভেতরে যারা ভিন্ন মত পোষণ করত তারা মোশতাকের সাথে হাত মিলিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। যদিও তাজউদ্দিন তা হতে দেয়নি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটিই একদিন জাতির জনক হলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র- এই যে একটা পূর্ণাঙ্গ কনসেপ্ট তা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি কীভাবে ধারন করলেন? কামাল লোহানী: তখন যারা রাজনীতি করত তাদের জেলখানায় যাওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে এগিয়ে ছিলেন। সেখানে অনেক পুরনো বামনেতাদের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন। তাদের প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। তাছাড়া তখন সবাই রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশুনা করতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন - এগুলো রাজনৈতিক কর্মীদের মনে মগজে গেঁথে থাকত। ফলে শোষিত বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধু দর্শনের জায়গা থেকে তাঁর অাসল পরিচয় পেয়েছিলেন। ৪৭- এর অাগে তিনি যখন পাকিস্তান অান্দোলন করেছেন তখন তিনি মুসলিম লীগের প্রগতিশীল ধারায় ( আবুল হাশিম গ্রুপ) ছিলেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধু হত্যার রাজনীতি কী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল? কামাল লোহানী: যেটা বলেছেন সেটা খুবই জটিল প্রশ্ন। কারণ, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন এই অবস্থা ছিল না। চারদিক থেকে চক্রান্ত হচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সপ্তম নৌ বহর পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে শেষ করতে চেয়েছিল। রাশিয়া সাপোর্ট না করলে আমাদের অবস্থা কঠিন হতো। যখন মার্কিনীরা দেখল সপ্তম নৌ বহরের পরিকল্পনা ব্যর্থ তখন তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই পরিকল্পনায় অন্যতম এজেন্ট ছিল খন্দকার মোশতাক। অস্বীকার করার উপায় নেই এই পরিকল্পনাগুলোর শেষ পরিণতি ১৫ আগস্ট। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মার্কিন ষড়যন্ত্রের ফল। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ। ইতিহাসে অনেক নতুনত্বের সন্ধান অাপনি অামাদের দিয়েছেন। কামাল লোহানী: আপনাকেও ধন্যবাদ। আআ/ এআর

খুনিদের ফিরিয়ে আনতে চিঠি দেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ভুমিকা রাখবে। তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষকে এ জন্য চিঠি দেবে।   বুধবার (১৫ আগস্ট) সকালে কমিশন কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ৪৩তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় কমিশন চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ কথা বলেন। আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো না, বাঙালি আজকের অবস্থানে আসতে পারতো না। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের অর্ধেক সময় কারাগারে কাটিয়েছেন কেবল এদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। অথচ একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের চক্রান্তে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।’ কাজী রিয়াজুল হক আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনও আপস করেননি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য কীভাবে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তার খুনিদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বিদেশে পলাতক খুনিদের দেশে এনে শাস্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কমিশন থেকে চিঠি পাঠানো হবে।’ এরআগে সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মচারীরা। পরে কমিশন কার্যালয়ে মিলাদ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।   এসি   

স্মৃতির পাতায় জাতির জনক এবং আজকের বাংলাদেশ

১৫ই আগস্টের কালরাতে শাহাদত বরণকারী সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতক-খুনি চক্র স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল দেশের অগ্রগতিকে। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সব অর্জনকে। এদিন শুধু জাতির জনককেই হত্যা করা হয়নি, মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও লক্ষ্যকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন পূরণের নেতৃত্বকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের কোনো উত্তরাধিকার যেন বেঁচে না থাকে। আর সে জন্যই ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র ১০ বছরের শিশু রাসেলকেও রেহাই দেয়নি। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে থাকায় সেদিন ঘাতকের হাত থেকে প্রাণে রক্ষা পান। আজ গর্ব করে বলতে পারি, ষড়যন্ত্রকারী খুনিচক্রের সেই আশা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল, প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হবে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা সোনার বাংলা। আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে দৃপ্ত পদক্ষেপে।বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কত কথা কত স্মৃতি আজ মনের চারপাশে ভিড় করে আসে! মনে পড়ে ১৯৭১-এর রক্তঝরা মার্চের ১৭ তারিখের কথা। সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমণ্ডির বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাভারাতুর কণ্ঠে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না। আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যেকোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’ বিশাল হূদয়ের মহৎ মনের অধিকারী ছিলেন তিনি।স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বের ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন হন। সে সময় বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য পদ লাভ করে তার মধ্যে অন্যতম কমনওয়েলথ অব নেশনস, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ও জাতিসংঘ। এই চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মেলন ও অধিবেশনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর। মুক্তিযুদ্ধের পরম মিত্র প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা মহানগরীর ব্রিগেড ময়দানে ২০ লক্ষাধিক মানুষের গণমহাসমুদ্রে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন। কলকাতার মানুষ সেদিন বাড়িঘর ছেড়ে জনসভায় ছুটে এসেছিল। সভা শেষে রাজভবনে যখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তখন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার জন্মদিন ১৭ মার্চ। আপনি সেদিন বাংলাদেশ সফরে আসবেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সফরের আগেই আমি চাই আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেবেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সম্মতি জানিয়েছিলেন। ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলার মাটি স্পর্শ করার আগেই ১২ মার্চ বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল। একই বছরের ১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্র দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং ক্রেমলিনে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। ১৯৭৩-এর ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়াতে ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কমনওয়েলথ সম্মেলন। কিন্তু সব নেতার মাঝে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো। বঙ্গবন্ধু সেদিন বক্তৃতায় বৃহৎ শক্তিবর্গের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘হোয়েন এলিফ্যান্ট প্লেস গ্রাস সাফারস।’ তাঁর এই বক্তৃতা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুইটলাম, তাঞ্জানিয়ার প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস নায়ারে, জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডা, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তা, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান, শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েকেসহ বিশ্বের বরেণ্য সব নেতা। ১৯৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে সর্বমোট ছয়জন নেতার নামে তোরণ নির্মিত হয়েছিল। তার মধ্যে জীবিত দুই নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মার্শাল জোসেফ ব্রোজ টিটো। আর প্রয়াত চারজন নেতা ছিলেন মিসরের জামাল আব্দুল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ণ, ঘানার কাউমি নক্রুমা এবং ভারতের পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু। আলজেরিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত—শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ বিশেষভাবে মনে পড়ে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের কথা, যেদিন জাতির জনক জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য ও মহত্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ যখন বক্তৃতা প্রদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষিত হয়, তখন বিশ্বনেতৃবৃন্দের মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে।বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট। প্রতিদিনের মতো সকালবেলা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যাই। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে গিয়েছিলাম। দিনের কাজ শেষে দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে বসে একসঙ্গে খেয়েছি। বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর খাবার যেত। পরম শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী। সুখে-দুখে, আপদে-বিপদে যিনি বঙ্গবন্ধুকে যত্ন করে রাখতেন। নিজ হাতে রান্না করে বঙ্গবন্ধুকে খাওয়াতেন। খাওয়া শেষে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিলেন। এরপর গণভবনে নিজ কক্ষে বসলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় প্রতিদিন বিকেলে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে দৈনন্দিন রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন। একসঙ্গে চা পান করতেন। এরপর রাত ৮টায় স্বীয় বাসভবনে ফিরতেন। বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরতাম। যেতামও একসঙ্গে, ফিরতামও একসঙ্গে। গণভবনে যেখানে বঙ্গবন্ধুর অফিস, সেখানে তিনি দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিস করতেন। গণভবনের পাশে এখন যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস, সেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর অফিস। বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষের পাশেই আমার দপ্তর। সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগ্ম সচিব মনোয়ারুল ইসলাম এবং ব্যক্তিগত সচিব ফরাসউদ্দীন—এই দুজন পিএইচডি করতে বিদেশ যাবেন এ উপলক্ষে কর্মকর্তাদের নৈশভোজ। নৈশভোজ শেষে তাঁদের বিদায় করে আমি আবার ৩২ নম্বরে এলাম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তখন খাবার টেবিলে। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘কাল সকালে আমার বাসায় আসবি। আমার সাথে তোর প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাবি।’ আমার আর প্রিয় নেতার সঙ্গে প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া হয়নি।পরদিন ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের এদেশীয় এজেন্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সদস্য জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এ রকম ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দি করা হয়। ধানমণ্ডির যে বাসায় আমি থাকতাম, সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সেই বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেওয়া হয়নি। দুই দিন পর ১৭ তারিখ খুনিচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল সদস্য আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনিচক্রের সমর্থনে সম্মতি আদায়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। তখনো জেনারেল সফিউল্লাহ সেনাপ্রধান এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল ব্রিগেড কমান্ডার। তাঁদের হস্তক্ষেপে আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর ২৩ তারিখ ই এ চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ আমাকে এবং জনাব জিল্লুর রহমানকে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বঙ্গভবনে নিয়ে যায়। বঙ্গভবনে খুনি মোশতাক তার অবৈধ সরকারকে সমর্থন করার জন্য আমাদের দুজনকে প্রস্তাব দেয়। আমরা খুনি মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ জিল্লুর রহমান, আমাকে ও আব্দুর রাজ্জাককে (শ্রদ্ধেয় নেতা প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক) একই দিনে গ্রেপ্তার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ছয় দিন বন্দি রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। আমাদের সঙ্গে আরেকজন বন্দি ছিলেন, তিনি দ্য পিপল পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত আবিদুর রহমান। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি চৌকির একটিতে ঘুমাতাম আমি ও রাজ্জাক ভাই এবং অন্যটিতে জিল্লুর ভাই ও আবিদুর রহমান। একদিন রমজান মাসের ৩ তারিখ রোজা রেখে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষরাতের দিকে সেনাবাহিনীর একদল লোক কক্ষে প্রবেশ করে উচ্চৈঃস্বরে চিত্কার করে বলতে থাকে, ‘হু ইজ তোফায়েল’ ‘হু ইজ তোফায়েল!’ রাজ্জাক ভাই জেগে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। চোখ মেলে দেখি আমার বুকের ওপর স্টেনগান তাক করা। আমি অজু করতে চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়। কক্ষের সঙ্গেই সংযুক্ত বাথরুম। অজু করে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই ও আবিদুর রহমানের সামনেই আমার চোখ বেঁধে বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমি অনুভব করি, আমাকে রেডিও স্টেশনে আনা হয়েছে। এরপর হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায়ই চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে অনেকগুলো প্রশ্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তাঁর কোথায় কী আছে—এ রকম বহু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ায় ভীতি প্রদর্শন করে খুনিরা বলে, ‘ইতিমধ্যে আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে আমার বিরুদ্ধে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি দিয়েছে। সেই বিবৃতিতে আমার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে।’ আমি নিরুত্তর থাকি। শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধু যা ভালো করেছেন আমি তার সঙ্গে ছিলাম, যদি কোনো ভুল করে থাকেন তার সঙ্গেও ছিলাম। এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারব না।’ তখন তারা চরম অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় আমার ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এরপর অর্ধমৃত অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্যে খুনি ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলাম। আমাকে রুমের মধ্যে একা রেখে তারা মিটিং করছিল আমাকে নিয়ে কী করবে। অজ্ঞাত একজন আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বলছিলেন, ‘আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন, আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন।’ তাঁর ধারণা হয়েছিল, ঘাতকের দল আমাকে মেরে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত ঘাতকরা এসে বলল, ‘আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি তার উত্তর দিতে হবে; উত্তর না দিলে আপনাকে আমরা রাখব না।’ নিরুত্তর থাকায় পুনরায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন ঘাতকদল পুলিশ কন্ট্রোল রুমের যে কক্ষে আমরা অবস্থান করছিলাম সেই কক্ষে রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইয়ের কাছে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে আসে। জ্ঞান ফিরলে যন্ত্রণায় চিত্কার করতে থাকি। শারীরিক অসহ্য ব্যথা নিয়ে যখন আর্তনাদ করছি তখন জিল্লুর ভাই ও রাজ্জাক ভাই আমার এ অবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং তাঁরা দুজনই সেবা-শুশ্রূষা করেন। এরপর সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। এ অবস্থার মধ্যেই রাতে মেজর শাহরিয়ার আমার কাছ থেকে লিখিত বিবৃতি নিতে আসেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে তার লিখিত উত্তর দিতে হবে।’ আমি মেজর শাহরিয়ারকে বললাম, ‘আপনারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন দিতে পারেন; আমি কোনো কিছু লিখতেও পারব না, বলতেও পারব না।’ ওরা যখন দেখল আমার কাছ থেকে কোনো বিবৃতি আদায় করা সম্ভবপর নয়; তখন তারা উপায়ান্তর না দেখে চলে যায়। পরদিন অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফাঁসির আসামিকে অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে যেভাবে রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারে আমাকেও সেইভাবে বন্দি করে কনডেম সেলে রাখা হয়। তিন মাস আমি সূর্যের আলো দেখিনি। আমার সঙ্গে তখন কারাগারে বন্দি ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানসহ অনেকে। সেই দিনগুলোর কথা যখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে তখন চিন্তা করি—কী করে সেই সব দিন অতিক্রম করেছি। এরপর ২০ মাস ময়মনসিংহ কারাগারে অবস্থানের পর ১৯৭৭ সালের ২৬ এপ্রিল আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, এমনকি দু-দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের বেশির ভাগ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তাঁর হূদয়ের ভালোবাসা অপরিসীম। সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব; কিন্তু বাংলা ও বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর হূদয়ের যে দরদ, যে ভালোবাসা, তার গভীরতা অপরিমেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রযাত্রা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে রাখা দরকার যে গণতন্ত্রেও একটা নীতিমালা আছে। গণতন্ত্রের দিশারি যারা তাদের গণতন্ত্রের নীতিকে মানতে হয়। খালি গণতন্ত্র ভোগ করবেন আর নীতিমালা মানবেন না, ওটা হবে না, হতে পারে না।’ সুতরাং আজকের দিনে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি দল-মত-নির্বিশেষে আমাদের সবার জন্য অনুসরণীয়। মানুষের জন্য অপার ভালোবাসা আর তাদের কল্যাণে কাজ করাই বঙ্গবন্ধুর মূল ভাবাদর্শ। নিজ চিন্তা ও আদর্শ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তা-ই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এই দরদ আর অকৃত্রিম ভালোবাসার নিরন্তর প্রতিফলন আমরা দেখি তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নীতি-আদর্শ ও কর্মে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনকল্যাণে নিবেদিত থেকে সংবিধান সমুন্নত রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে বাংলাদেশ একদিন উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে, এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ চেতনা ধারণ করে সমগ্র বিশ্বে পুনরায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফাহমিদা নবীর গান

শোকের মাসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবীর কণ্ঠে প্রকাশ হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান-‘পিতার রক্তে’। ‘পিতার রক্তে রঞ্জিত এই বাংলাকে ভালোবাসি/ তাঁর রেখে যাওয়া এই বাংলার বুকে বারবার ফিরে আসি’-বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুজন হাজংয়ের এমন কথায় সুরারোপ করেছেন যাদু রিছিল। সুমন কল্যানের সংগীতায়োজনে গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ফাহমিদা নবী। গানটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে গানটিতে। গানের কথা ও সুরের মধ্যে এক ধরনের বৈচিত্রময় অনুভূতির প্রকাশ হয়েছে। জাতির জনকের জন্য সম্মান, অহংকার, বিষাদ, দেশপ্রেম, হাহাকার, প্রার্থনা এবং বিজয় এই সবগুলো অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। গানটিতে কণ্ঠ দিতে পেরে আমি নিজেও সম্মানিত বোধ করছি। গীতিকবি সুজন হাজং এ প্রসঙ্গে বলেন, “বঙ্গবন্ধু মৃত্যঞ্জয়ী। তার মতো মহানায়কের জন্য গান লিখতে পারা আমার জন্য সম্মানের। বাঙালি হিসেবে এটা আমার দায়বদ্ধতাও। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমার এই গান লেখা। আগামী ১৫ আগস্ট জাতির পিতার প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তৈরি এ গানের মাধ্যমে তার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারলেই আমাদের সার্থকতা।সুরকার যাদু রিছিল বলেন, “সুজন হাজং তার লেখার মাধ্যমে যে দেশপ্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন, কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী তার অসাধারণ গায়কীর মাধ্যমে তা উপস্থাপন করেছেন। আশা করছি গানটি আপামর বাঙালির মনের কথা হয়ে প্রকাশ হবে। ১৪ অগাস্ট গীতিকার সুজন হাজং এর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে গানটি প্রকাশিত হয়েছে।  টিআর/  

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বুধবার সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এর আগে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিউগলে করুন সুর বেজে ওঠে। এ সময় তারা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। স্পিকারের পর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে এরপর পুনরায় শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের শোকাবহ এই কালোদিবসে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপদগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। তবে এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান। জাতি আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দিবসটি উপলক্ষে বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আর সুবিধামতো সময়ে মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জায় হবে বিশেষ প্রার্থনা। একে//

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি