ঢাকা, বুধবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ৫:০৫:১৪

রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে বিএনপি

রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে বিএনপি

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং যে দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে সেই দলের প্রধান শেখ হাসিনাসহ সব সিনিয়র নেতাদের ওপর বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালানো হয় প্রকাশ্য দিবালোকে; রাজধানীর গুলিস্তান এ্যাভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। দীর্ঘ ১৪ বছর প্রতীক্ষার পর গত ১০ অক্টোবর বিচারিক আদালত এতদসংক্রান্ত মামলার রায় প্রদান করেছে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রায়ের প্রসঙ্গটি ছিল ১০ অক্টোবর বুধবারের টক অব দ্যা কান্ট্রি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা জীবন শেষ হতে শুরু করেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ২৪টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি। ২৪ বছর হচ্ছে দুই যুগ অনেক বড় একটি সময়। এত দীর্ঘ একটা সময় এক জায়গায় থাকলে সেখানে শিকড় গজিয়ে যায়, সেই শিকড় টেনে উপড়াতে কষ্ট হয়, সময় নেয়। আমি সেই সময়সাপেক্ষ কষ্টের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। চিন্তা করলে মনে হয় এই তো মাত্র সেদিনের ঘটনা। প্রথম যখন এসেছি যোগাযোগ করার জন্য টেলিফোন পর্যন্ত নেই, ঢাকায় মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য কার্ডফোন ব্যবহার করার চেষ্টা করি, টেলিফোন কার্ডের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলে কিন্তু কথা শুনতে পারি না। বাচ্চাদের স্কুল নেই, যেটা আছে সেখানে নেওয়ার যানবাহন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বেতন যৎসামান্য ভাগ্যিস কয়েকটা বই লিখেছিলাম রয়েলটির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায়। এরকম ছোটখাটো যন্ত্রণার কোনো শেষ ছিল না কিন্তু যখন পেছনে ফিরে তাকাই তখন পুরো স্মৃতিটি মনে হয় একটা মধুর স্মৃতি। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ একদল ছাত্র এসে হাজির, তারা হাসি হাসি মুখে বলল, ‘স্যার টিলার ওপর পিকনিক হচ্ছে। সবাই মিলে মাছ রান্না করেছি, চলেন স্যার, আমাদের সঙ্গে খাবেন।’ আমি সরল বিশ্বাসে আরেকজন শিক্ষক নিয়ে সেই মাছ খেতে গিয়েছি। পরদিন সকালে শুনি ছাত্রদের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযোগ, তারা নাকি আগের দিন কোথা থেকে মাছ চুরি করে এনেছে। ভাইস চ্যান্সেলর রেগে আগুন কিন্তু ছাত্রদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিও বসাতে পারছেন না কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন (আমি) এবং প্রক্টর (আমার শিক্ষক বন্ধু) আগের রাতে ছাত্রদের সঙ্গে সেই চুরি করা মাছ খেয়ে এসেছি। সে অপরাধের তদন্ত হয় কেমন করে? আমি আমার ছাত্রদের বুদ্ধি দেখে চমৎকৃত হলাম! তবে কিছুদিনের ভিতরেই অবশ্য আমি নিজেই একটা তদন্ত করার দায়িত্ব পেলাম। তখন ছাত্র সংসদটি ছিল ছাত্রদলের হাতে, তারা সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করেছে। সেখানে উপস্থিত বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল রাজাকারদের অপকর্ম নিয়ে। ছাত্রশিবিরের সেটা পছন্দ হয়নি তাই তারা ছাত্রদলের এক নেতাকে ছুরি মেরে দিয়েছে। তদন্ত করে আমরা দোষী ছেলেটাকে বের করেছি, কিন্তু শাস্তি দেওয়ার আগেই সে আলীগড়ে চলে গেল! ছাত্রদলের ছেলেদের তখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক ধরনের ভালোবাসা ছিল তবে কিছুদিনের ভিতরেই জামায়াত এবং বিএনপি জোট করার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও ভালোবাসা উবে যেতে থাকে। আমার মনে আছে শিবিরের ছাত্রের হাতে ছুরি খাওয়া ছাত্রদলের সেই নেতাটিকে একদিন ক্যাম্পাসে দেখলাম। সে শিবিরের ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে গলা ফাটিয়ে আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে! ভাষা অত্যন্ত অশালীন, লজ্জায় কান লাল হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আমি নিশ্চয়ই তদন্তে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্পর্শকাতর তদন্ত আমাকে দেওয়া হতে থাকল। আমি হাবাগোবা মানুষ, তখনো জানি না যে কোনো কোনো তদন্ত করতে হয় এবং কোনো কোনো তদন্ত করতে গিয়ে কালক্ষেপণ করে এক সময়ে হিমাগারে পাঠিয়ে দিতে হয়। তাই আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের কিছু মাস্তানের তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়ে সবাইকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। একদিন আবিষ্কার করলাম ছাত্রলীগ আমাকে এবং আমাদের ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। ক্যাম্পাসে আসতে পারি না, খবর পেয়েছি তদন্তের আসামিরা গোলচত্বরে সোফা পেতে বন্দুক কোলে নিয়ে বসে আছে! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার এরকম ঘটনার কোনো শেষ নেই। একবার বাসায় বোমা পড়েছে, সেটা নিয়ে খুব হইচই। সেই হইচই দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কীভাবে কীভাবে আমেরিকায় বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চে আমার প্রাক্তন বস সেই খবর পেয়েছে। সে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ই-মেইল পাঠিয়েছে, ‘তুমি এই ই-মেইল পাওয়া মাত্র পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্লে­নে চেপে এখানে চলে এসো। এখানে পৌঁছানোর পর তোমার বেতন ঠিক করব।’ আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না। তাকে অভয় দিয়ে ই-মেইল পাঠালাম, বললাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই! এখানে এটা আমার জন্য এমন কোনো ব্যাপার নয়, এটি আমার দৈনন্দিন জীবনের খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা! কেউ যেন মনে না করে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন বুঝি কেটেছে এরকম ঝুঁকি ঝামেলার ভিতর দিয়ে, মোটেও সেরকম কিছু নয়। বেশিরভাগ সময় কেটেছে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে, সেই সময়টি হচ্ছে জীবনের পরম পাওয়া। তাদের সঙ্গে গেলেই মনে হতো আমি বুঝি আবার নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেছি, কোনো দায়-দায়িত্ব নেই সময়টি রঙিন চশমা চোখে পৃথিবীটাকে দেখার, নিরবচ্ছিন্নভাবে আনন্দ করার। তাই সেদিন সিলেটের ঝুম বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এসে পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে নেয় আর ছাত্রছাত্রীরা বলে, ‘স্যার চলেন বৃষ্টিতে ভিজি’ আমি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আমি নিশ্চিত আমার এই ছেলেমানুষী কাজকর্ম দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুরুগম্ভীর শিক্ষক কৌতুক অনুভব করেছেন, অনেকে হয়তো বিরক্তও হয়েছেন কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেননি। কেমন করে বলবেন, আমার ছাত্রছাত্রীরা তো লেখাপড়াও করেছে। বাংলাদেশের এক কোনায় পড়ে থাকা ছোট এবং অখ্যাত একটি ইউনিভার্সিটি হয়েও তারা দেশের বড় বড় ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছে। তাদের অনেকেই আমার কথা বিশ্বাস করে নিজেদের গড়ে তুলেছে, আমি সারাক্ষণ তাদের কানের কাছে বলে গিয়েছি, ক্লাসরুমে আমরা তোমাদের যেটা শেখাই সেটা হচ্ছে তোমার শিক্ষার পাঁচ পার্সেন্ট বাকি পঁচানব্বই পার্সেন্ট শিখতে হবে নিজে নিজে ক্লাসরুমের বাইরে থেকে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো সময়টুকু আমার জীবনের একটি অমূল্য সম্পদ। কিছুদিন আগে ছুরিকাহত হয়ে হাসপাতালে ছিলাম, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আমি বাসাতেও ফিরে যাইনি। সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে সিলেটে আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে চলে এসেছিলাম। আমি যখন ক্যাম্পাসে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক তাদের বেশির ভাগই এক সময়ে আমার ছাত্র ছিল আমার এক ধরনের আনন্দ হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় তারা ভীরু পদক্ষেপে সসংকোচে এসেছে এখন তারাই বড় বড় প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান, ডিন! কত বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক তার জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই যুগ কাটিয়ে দিতে গিয়ে অনেক কিছু খুব কাছে থেকে দেখতে পেয়েছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-বল্টু নিজ হাতে লাগিয়েছি, খুলেছি তার এর সমস্যাটা কোথায় আমি খুব ভালো করে জানি। আবার কেমন করে এর সমস্যাটা মেটানো হয় সেটাও আমি খুব ভালো করে জানি। কিছুদিন আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাংবাদিকরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সম্মেলন করেছে, তারা আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা করার জন্য। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা কী, আমি খোলাখুলি বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সমস্যা হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর। আমি নিজের কানে শুনেছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে বলেছেন, কোনো ভাইস চ্যান্সেলর যদি দাবি করে তিনি কোনো রকম লবি না করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন তাহলে তিনি হচ্ছেন ডাহা মিথ্যাবাদী (তার ব্যবহৃত শব্দটি ছিল ড্যাম লায়ার)। আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম এবং কল্পনা করছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার জন্য নানা ধরনের লবি করে বেড়াচ্ছেন, লবি করা সংক্রান্ত যে সব গল্প আমরা শুনে থাকি সেগুলো মোটেও সম্মানজনক না। আমার বক্তব্যটি সংবাদ মাধ্যমে চলে এসেছিল এবং ভাইস চ্যান্সেলররা আমার ওপরে রাগ হয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যদিও বক্তব্যটি আমার নিজের নয় আরেকজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের, তারপরও আমি তাদের বিবৃতি নিয়ে বাদ প্রতিবাদ করিনি। কারণ এই দেশে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যারা খাটি শিক্ষাবিদ, যাদের স্বপ্ন আছে এবং যারা দেশকে যেমন ভালোবাসেন বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও সেরকম ভালোবাসেন। আবার সবাইকে মেনে নিতে হবে এই দেশে অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যাদের এত বড় দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা নেই, শুধু ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা ধরনের বাণিজ্য করার জন্য ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন। আমার দুঃখটা এখানে, এই দেশে এখনো ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া যায়! আমরা কি দেখিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর যাওয়ার আগে শেষদিনে ৫০-৬০ জনকে একসঙ্গে মাস্টার রোলে নিয়োগ দিয়ে গিয়েছেন? সেই নিয়োগের সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ যদি সত্যি হয় তাহলে শুধুমাত্র একটা স্বাক্ষর দিয়ে তারা কত টাকা কামাই করেছেন সেটা কেউ হিসাব করে দেখেছে! আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে আমি নতুন এক ধরনের জীবনে ফিরে যাব। বহুদিন থেকে আমি আমার নতুন জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি! যাওয়ার আগে অনেক জোর দিয়ে একটি কথা বলে যেতে পারি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক করার জন্য সেখানে সত্যিকারের শিক্ষাবিদ স্বাপ্নিক ভাইস চ্যান্সেলরের নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে এখন অর্থের অভাব নেই, অর্থের অভাবে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাঁড়াতে পারছিল না এখন তারা খুব সহজেই দাঁড়াতে পারবে। শুধু দরকার একজন খাটি ভাইস চ্যান্সেলর। বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতির বাইরে থেকে সচ্ছল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়টি দেখার জন্য আমি আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকব। লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসএ/

এগিয়ে যাওয়ার গল্পে অনন্য বাংলাদেশ

সবুজে ঘেরা ছায়াসুনিবিড় গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তার চিত্র পাল্টেছে অনেকখানি। বর্ষায় গ্রামের মেঠোপথে কাদা, রাস্তায় গর্ত, কিংবা সড়ক ভেঙে পানির প্রবাহ, এসব বলতে গেলে অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা থেকে। কারণ, এখন দেশের বেশিরভাগ গ্রামেই মেঠো পথের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে পিচঢালা সরু পথ। সবুজ শস্য খেতের মধ্য দিয়ে কালো পিচঢালা রাস্তা গিয়ে ঠেকেছে মফস্বল শহরের কেন্দ্রে। যা গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। মাঠ থেকে করলা, আলু, বেগুন বা যে কোনো শাক-সবজিসহ ফসল সহজেই শহরে নিয়ে যেতে পারছেন কৃষক। বিক্রি করতে পারছেন বেশি দামে। নদীনালা বা নিজের পুকুরের মাছও ভ্যান বা ছোট পিকআপে করে নিয়ে সরাসরি পাইকারি বাজারে বিক্রি করছেন মাছ চাষী। এতে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্মও কমেছে খানিকটা। ফলে লাভের পুরোটাই যাচ্ছে চাষী বা কৃষকের পকেটে। আবার, বিদ্যুতের আলোয় সন্ধ্যার পর আলোকিত হয়ে উঠছে কৃষকের ঘর। বাচ্চারা পড়ালেখা করছে আনন্দের সাথে। কৃষকের কুঁড়ে ঘর পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কুঁড়ে ঘর, শনের ছাউনি বা টিন ঘেরা দেয়ালে জায়গা করে নিয়েছে ইট। গেল এক দশক ধরেই গ্রামের সাথে আমার নিবিড় যোগাযোগ। পেশাগত কাজে রাজধানী শহরে থাকলেও সুযোগ পেলেই ছুটে যাই গ্রামেগঞ্জে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, এখন বেশিরভাগ গ্রামেই বদলে যাওয়া এই দৃশ্য। যা মনে আনন্দের দোলা দেয় গ্রামবাসীর। গ্রামের নারীরা এখন সাজুগুজুর জন্য পার্লারের সন্ধ্যানে শহরে যায়। বেশ কিছু মফস্বল অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে নারীদের জন্য পার্লার বা শরীরচর্চার জন্য জিম। আর, প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীরাও আগের চেয়ে বেশ সমৃদ্ধ। তাদের চাষাবাদ বা কৃষিভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গেল কয়েক বছর পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার এমন তথ্যেরই দেখা মেলে। একটি সুখকর চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে বাংলাদেশকে নিয়ে একসময় কটাক্ষ করেছিলেন বিশ্বমোড়লরা, তারাই আজ বিস্ময়ের সাথে দেখছেন বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া। এক সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতির লালসবুজের দেশটি এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে। দরিদ্র কিংবা স্বল্পোন্নত পরিচয়ের ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে নতুন পরিচিতি উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রযাত্রা। যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান সূচকে এগিয়ে যাওয়ারই অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল বক্তৃতার বাগাড়ম্বরতাই নয়, দৃশ্যমান উন্নয়ন, সাথে পরিসংখ্যানের খতিয়ান। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি আয় কিংবা দেশের উন্নয়নে বিদেশি অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, ডলারের দাম বাড়ায় বেড়েছে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসা। গত একবছরেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। এ আয় গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, আর ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার আসে এর আগের বছরে। প্রবাসী আয় বাড়ায় বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। গেল সপ্তাহ পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১৭ কোটি ডলারে। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের প্রবাসী আয় বিতরণের অভিযোগে গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর বিকাশের ২ হাজার ৮৮৭টি এজেন্টের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮৬৩টি এজেন্ট হিসাব বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই বড় হতে থাকে দেশের আয়ের অন্যতম এই উৎস। ইতিবাচক ধারা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিদেশি অর্থায়নেও। গেল অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ পাওয়া গেছে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। এত বেশি অর্থছাড় আগে কখনই হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অর্থ ছাড় হয়েছিল ৩৫০ কোটি ডলার। এ হিসাবে আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে অর্থ ছাড় বেড়েছে ৭১ দশমিক ৪১ শতাংশ। গত অর্থবছর থেকে সরকারের বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে দ্রুত অর্থছাড় করছে দাতা সংস্থাগুলো। জাইকার অর্থায়নে মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। গুলশানে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর বেশ কয়েক মাস এ সংস্থার অর্থায়নের চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ ছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এগুলোর বাস্তবায়ন আবার শুরু হয়, বাড়তে থাকে অর্থ ছাড়ও। মেট্রোরেল প্রকল্পে ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণ দেবে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ায় রাশিয়ার অর্থছাড় বেড়েছে। এ কেন্দ্রের জন্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার অর্থছাড় হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে রাশিয়া ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। আবার, পোশাক খাতের ওপর ভর করেই অব্যাহত আছে দেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানি পরিস্থিতি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো বলছে, গেল অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ হাজার ৩৭২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার পণ্য রফতানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ হাজার ১৬২ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে পণ্য রপতানি হয়েছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ডলারের। সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া যায়নি। এই হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। গেল অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৩৭২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। পোশাক ছাড়াও পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রকৌশল পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়নি। সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনীতির সবসূচকেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত রাখতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারক সংস্থা মুডিস, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস এবং ফিচ রেটিংয়ের কাছ থেকেও। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শীর্ষ এই তিন রেটিং সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। যা ক্রমাগত উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত কর কাঠামোর সংস্কার এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য গৃহীত উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চপ্রবৃদ্ধির অর্জনের পথে রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সাম্প্রতিক পদক্ষেপসহ প্রবৃদ্ধির সহায়ক শর্তগুলো দৃশ্যমান। রেটিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসছে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে একটি ধাক্কা লাগতে পারে। তবে তা দক্ষ নেতৃত্বে উৎরে যাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান অবস্থান থেকে আরও সামনে এগোতে হলে বাংলাদেশকে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। বর্তমান এই রেটিং বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিকর। এই রেটিংয়ের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবেন। বাংলাদেশ বিদেশে বন্ড বিক্রি করে টাকা নিতে চাইলে সুদের হার কম হবে। আরও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। দরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রযাত্রায় পুরো কৃতিত্বই জননেত্রী ও দেশপ্রধান শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রীর সফল নেতৃত্বেই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে দেশ ও বিদেশ থেকে। লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, এফবিসিসিআই।এসএইচ/

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সন্ত্রাসের যথার্থ বিচার

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সংঘটিত গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনা নিয়ে তৎকালীন জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ এখন সম্যকভাবে পরিচিত। সেই বীভৎস হত্যাযজ্ঞের মামলার রায় গতকাল ঢাকার বিশেষ আদালত ঘোষণা করেছেন। রায়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের ফাঁসি হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বর্তমানে পলাতক তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডের তালিকায় আছেন বিএনপির আরো কয়েকজন প্রতাবশালী নেতাসহ সে সময়ের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আদালত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তাতে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়েছে, যারা শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের রক্ষকের আসনে বসেছিল তারাই রাষ্ট্রকে হত্যা করার জন্য ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি চালিয়েছিল। আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দুই সামরিক শাসক এবং তাদের নতুন প্রতিভূদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাংলাদেশের পরিবর্তে ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি স্টাইলের আরেকটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ নামের খোলসে এখানে প্রতিষ্ঠিত করা। জিয়াউর রহমান কর্তৃক জামায়াতসহ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির পুনরুত্থান, বাহাত্তরের সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সব শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাতিল, রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা সব মুছে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ইতিহাস বিকৃতি, বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিচার করা যাবে না এই মর্মে আইন করাসহ এরশাদ কর্তৃক সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের সংযোজন এবং খালেদা জিয়া যখন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানান, তখন এঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ থাকে না।১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত এঁদের সবারই ধারণা ছিল, দেশের মানুষকে ধর্মান্ধতার বড়ি গিলিয়ে এবং ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে তাঁরা চিরদিন ক্ষমতার মধু পান করতে পারবেন। কিন্তু কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তাঁরা বুঝতে ভুল করেছেন ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতির একটা অদৃশ্য সহজাত শক্তি আছে, যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা অসম্ভব। এই অমোঘ সত্যকে তাঁরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা যেভাবে দেশে ফিরলেন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হলেন, এটা ছিল ওই ধর্মাশ্রয়ী মধু ভক্ষণকারীদের ধারণার বাইরে। তাঁরা ভেবেছিলেন জীবনের ভয়ে শেখ মুজিবের দুই এতিম মেয়ে আর কোনো দিন দেশে ফিরবেন না। ফাঁকা মাঠে চিরকাল মধু খাবেন। কিন্তু শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর যত দ্রুতগতিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী উদার প্রগতিশীল মানুষ এবং তরুণ প্রজন্ম যখন জেগে উঠতে শুরু করল, তখন ওই সম্মিলিত অপশক্তি প্রমাদ গুনতে নেমে পড়ল। তারা বুঝতে পারল শেখ হাসিনা বেঁচে থাকলে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়বে এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে নিঃশেষ করার অপকর্মে যারা দায়ী তাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তাই ওই অপশক্তির প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আবার কখনো সম্মিলিতভাবে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ কারণেই দেখা যায়, গত ৩৭ বছরে শেখ হাসিনার ওপর ১৯ বার হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু বিপরীতে অন্যান্য দলের টপ নেতৃত্বের কারো গায়ে একটি টোকাও পড়েনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় চলে এলে তাদের হিসাব-কিতাব আরো এলোমেলো হয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে তাঁকে সহজে হত্যা করা যাবে না। বহুবিধ পন্থা ও কৌশলের অংশ হিসেবে তারা ধর্মান্ধ উগ্রবাদী জঙ্গিদের উসকে দেয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পুনর্জাগরণ ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার ভেতর দিয়ে ওই অপশক্তি নিশ্চিত হয়ে যায়, শেখ হাসিনা জীবিত থাকলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পূর্ণ বাংলাদেশের পুনরুত্থান তারা কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, তারা আরো বুঝতে পারে, শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় এলে একাত্তরে যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তারা কেউ রেহাই পাবে না। প্রতিবেশী দেশের আরেকটি বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শেখ হাসিনার উত্থানে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এরা হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, যাদের পৃষ্ঠপোষক আবার বাংলাদেশের পুরনো শত্রু পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। আইএসআই ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কাশ্মীরি জঙ্গি ইউসুফ ওরফে মাজেদ ভাটের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পঁচাত্তরের ঘটনার জের ধরে যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী হয়েছে এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ নয়, বরং ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি স্টাইলের দেশ চায়, তারা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। শেখ হাসিনাকে চিরতরে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রসহ বহুবিধ পন্থার অংশ হিসেবে সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহারের পথ বেছে নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। এই গ্রেনেড হামলার মূল টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে কৌশল ও লক্ষ্য ছিল পঁচাত্তরের মতো। আওয়ামী লীগের সব সিনিয়র নেতাই ছিলেন এক মঞ্চে। সেদিন আক্রমণকারীদের মিশন সফল হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকতেন না।দীর্ঘ অনুসন্ধান ও শুনানির পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা ও আগ্রহের জন্য মিডিয়ায় অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়, যার দু-একটি এখানে উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাওয়া ভবনের পরিকল্পনায় ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, বাবর গ্রেনেড সরবরাহ করেন এবং ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে কাজ করে হরকাতুল জিহাদ। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গিদের আক্রমণের জন্য সহায়তা করে প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার একাংশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনের স্বীকারোক্তি, আর্জেস গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে। তৃতীয়ত, ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর বঙ্গবন্ধুর খুনি রশীদ-ডালিমের ফোন বাবরের কাছে—হাসিনা বাঁচল কী করে? বিএনপি এখন যা-ই বলুক না কেন, কিছু ভাইটাল প্রশ্নের উত্তর তো তাদের থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রথম প্রশ্ন—তারা প্রহসনের জজ মিয়া নাটক সাজালেন কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন—অবিস্ফোরিত গ্রেনেডসহ ঘটনার সব আলামত নষ্ট এবং ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলা হলো কেন? তৃতীয়ত, পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড বাংলাদেশে এলো কী করে? পিওএফ (পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) চিহ্নিত গ্রেনেড পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া অন্য কারো হাতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া গ্রেনেড নিক্ষেপ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থার চোখ এড়িয়ে আক্রমণকারীরা কোথায়, কিভাবে এই প্রশিক্ষণ নিল।বিএনপি যেহেতু তখন ক্ষমতায় ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর তো তাদেরই দিতে হবে। সে সময়ের জামায়াত-বিএনপি সরকার প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য কিভাবে জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল তার কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় ২০০৯ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রধান দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মিথ্যা অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার পর ওই পত্রিকায় প্রতিবেদকের কাছে সেই করুণ ও নির্মম কাহিনির বর্ণনা দেন আলোচিত নোয়াখালীর দিনমজুর জজ মিয়া। ২১ দিনের রিমান্ডসহ ২৭ দিন ঢাকার সিআইডির কার্যালয়ে বন্দি করে অমানুষিক নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের ভয়, আবার প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য প্রস্তুত করা হয় জজ মিয়াকে। জবানবন্দি দেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রতিবেদকের কাছে বর্ণনা করতে গিয়ে জজ মিয়া বলেন, হাত-মুখ ধুয়ে আবার ম্যাজিস্ট্রেটের কামরায় আসি। আসার পর ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, জজ মিয়া, তুমি এখানে সই করো। আমি বলি, স্যার, আমার কোনো অসুবিধা হবে না তো? ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, তুমি রাজসাক্ষী হবে। পরে তোমাকে ওনারা (সিআইডি কর্মকর্তাদের দেখিয়ে) ছাড়িয়ে নেবেন। যদি সই না দাও, তাহলে তুমি আসামি হবে, তোমার ফাঁসি হবে। আমি সই করে দিই। এরপর ওই রুমে বিরিয়ানির প্যাকেট আনা হয়। আমি, ম্যাজিস্ট্রেট, মুন্সি আতিক, আবদুর রশীদ একসঙ্গে বিরিয়ানি খাই। এত বড় একটা বীভৎস হত্যাকাণ্ড নিয়ে যাঁরা এ রকম মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর তামাশা করলেন, তাঁদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত অমোঘ নিয়মেই হয়। সেটাই আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সব সাজানো নাটক ও ষড়যন্ত্র তছনছ হয়ে যায়। অভিযুক্ত জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে তা মানুষের কাছে আরো পরিষ্কার হয়ে যায়।২১ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সব দুর্বৃত্তায়নকে ছাড়িয়ে গেছে। সব ধরনের মানবিক ক্ষমা ও অনুকম্পার অযোগ্য অপরাধ যাঁরা করেছেন তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রকে নিষ্ঠুর হতে হবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং এ রকম নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে। ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ নাটকের গুরু লুৎফুজ্জামান বাবর এখন নিজেই আসল শত্রু প্রমাণিত হয়ে বাংলাদেশের আইন ও আদালতের খাঁচায় আবদ্ধ হলেন ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার যথার্থ বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আরেকটি কলঙ্ক থেকে মুক্ত হলো।লেখক : কলাম লেখক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকsikder52@gmail.com

সিনহার স্বপ্নভঙ্গ এবং মিথ্যার বেসাতি

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বপ্নচারী এক মানুষ, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। আবার স্বপ্ন যে সত্য হতে হবে এমন কোনো কথাও কিন্তু নেই। স্বপ্নের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে বলুন? কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হলে সেটাকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শিখতে হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো এমন অবস্থায় ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ লিখেই ফেললেন। কিন্তু আমাদের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখলেন এক বই ‘ব্রোকেন ড্রিম’। এই বই নিয়েই যত হইচই! এখন কথা হলো ‘ব্রোকেন ড্রিম’-এ তিনি এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন যার বৃত্তান্ত নিছক সাংঘর্ষিকই নয় বরং ডাহা মিথ্যাচার। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার লেখা বই ‘ব্রোকেন ড্রিম’-এ উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করতে তিনি একবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। বিচারপতি সিনহা লেখেন I decided to approach the Prime Minister. Accordingly, I requested a meeting with the Prime Minister at a secret place. I got a favorable reply within fwe hours. ’অর্থাৎ বিচারপতি সিনহা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। তো সেই উদ্দেশ্যে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি ‘গোপন জায়গায়’ দেখা করার জন্য অনুরোধ জানালেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সম্মতি জানানো হয়। কী আশ্চর্য ব্যাপার! যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য বিচারপতি সিনহাকে একটি ‘গোপন জায়গায়’ যেতে হবে কেন? কোন আইনে লেখা আছে যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের প্রধান বিচারপতি দেখা করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? এটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে করতে হবে কেন? সরকারের তিনটি অঙ্গ: আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগ। তিনটি বিভাগের সমন্বিত প্রয়াসেই তো সরকার চলবে, তাই না? তো এতে এত ঢাক ঢাক গুড় গুড়ের কি আছে? এছাড়া সুপারিশগুলোর কথা তিনি নিজেই তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। এই যেমন, যুদ্ধাপরাধ-বিচারে গতি সঞ্চার করার জন্য দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ, একই উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত বিচারপতি এবং প্রসিকিউটর নিয়োগের সুপারিশ, ইত্যাদি। এর সবকিছুই নাকি তৎকালীন আইনমন্ত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সুপারিশ করেছিলেন কিন্তু ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাতে রাজি হননি বলে বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আর সে কারণেই নাকি তৎকালীন আইনমন্ত্রী বিচারপতি সিনহার শরণাপন্ন হন যেন বিচারপতি সিনহা নিজে একবার এই ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। সবই বুঝলাম, কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার বিষয়টি বোধগম্য হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যেই প্রটোকল মেনে চলতে হয় সেখানে তিনি আদৌ কোনো ‘গোপন জায়গাতে’ যেতে পারেন কি না সন্দেহ! তার উপরে একজন বিচারপতির সাথে দেখা করার জন্য তিনি প্রটোকল ভেঙে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করতে যাবেন সেটা আসলে কতখানি বিশ্বাসযোগ্য? এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তথাকথিত সেই ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার পর কি কি কথা হয়েছে। যেহেতু ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা হয়েছে, তাই বুঝে নিতে হবে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ এবং বিচারপতি সিনহার কথাবার্তার কোনো সাক্ষী কিন্তু নেই! সেই গোপন সাক্ষাৎকালে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যদি কিছু বলে থাকেন, তাহলে তার একমাত্র সাক্ষী হয়ে আছেন বিচারপতি সিনহা। তো সেই বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে এই ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন: ÔWhen we met I told the Prime Minister the purpose of my meeting. The moment I raised the point, I felt she reacted sharply.Õ অর্থাৎ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো তখন বিচারপতি সিনহা তার দেখা করার উদ্দেশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন। আর শোনামাত্রই ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ ভীষণ প্রতিক্রিয়া দেখালেন বলে বিচারপতি সিনহার মনে হলো। খেয়াল করুন, এটা কিন্তু নিতান্তই বিচারপতি সিনহার মনে হওয়া ব্যাপার। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ভীষণ প্রতিক্রিয়া’ দেখার তো আর কোনো সাক্ষী নেই! এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন: ÒThen she became emotional and explained to me the suffering she had undergone in getting justice for the trial of those who had murdered her parents and younger brothers. She told me how much money she spent for collecting and safeguarding witnesses and said the mental pressure she withstood was beyond comprehension. She was intensely interested in putting the offenders to justice, but she had to cross a lot of hurdles. Given that backdrop she straightaway rejected the proposal of the Ministers.Ó অর্থাৎ বিচারপতি সিনহার মতে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাঁর এই ‘ভীষণ প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়ে পরক্ষণেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ বিচারপতি সিনহাকে বোঝানো শুরু করলেন যে, তাঁর নিজের (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) বাবা-মা এবং ছোট ভাইদের বিচার করতে তাঁকে কত অর্থকষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা, বাধা-বিপত্তি সইতে হয়েছে। আর এই কারণেই নাকি ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে কোনো সুপারিশ শুনতে রাজি নন। আচ্ছা, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যে বিচারের কথা বলছেন সেটা কি শুধুই তাঁর পারিবারিক বিষয়? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর পরিবার কি আমাদের কেউ নন? এটা ঠিক যে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাঁর ঔরসজাত কন্যা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির জনক আর তাই তাঁর হত্যার বিচার আমরা সবাই চেয়েছি। এই রাষ্ট্র চেয়েছে। আর সেই বিচার হয়েছে এই বাংলার মাটিতে। কিন্তু বিচারপতি সিনহা যেভাবে ঘটনা বর্ণনা করলেন তাতে তো মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ ছাড়া আর কেউই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচার চায়নি। কত বড় মিথ্যাচার! এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বই-এ উল্লেখ করেছেন: ÒShe frankly conceded that corruption was rampant, and since the offenders were powerful persons having money and muscle, and they could influence any official or witness and this could not be tackled by the administration all the time. Moreover, forty years had elapsed in the meantime, and it was extremely difficult to collect witnesses as most of them are not alive now. She had set up the tribunal chiefly to meet her election pledge and there was nothing more than that she was prepared to do.Ó অর্থাৎ বিচারপতি সিনহার মতে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাকে জানালেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করার বিষয়টি অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার, এর সফলতা নিয়ে তাই ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ সন্দিহান বিভিন্ন কারণে। প্রথম কারণ বাংলাদেশে সবাই দুর্নীতিবাজ, ন্যায়বিচার তাই করা যাবে না। এর মধ্যে ৪০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং জীবিত সাক্ষী খুঁজে পাওয়া ভার। তাই তিনি এই বিচার নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। আর এছাড়া বিচারপতি সিনহার কাছে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ নাকি অকপটে বললেন যে, তিনি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছেন মূলত তাঁর নির্বাচনি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে, সুতরাং ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আর কিছু করার জন্য তিনি প্রস্তুত নন। বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার এই সাক্ষাতের কথাবার্তা থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করার বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেন কোনো গুরুত্বই রাখে না। এটা শুধু একটা লোক দেখানো পদক্ষেপ সরকারের। সত্যি কি তাই? যদি সত্যি হয়েই থাকে তাহলে আমরা ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এত কাঠখড় পোড়ালাম কেন? এতগুলো মামলার রায় হলো কী করে? এরই মধ্যে ৬টি ফাঁসির দ- কার্যকর হলো কী করে? সরকার এত বৈরী-সহিংস পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই বিচারকে এগিয়ে নিয়ে গেল কেন? আন্তর্জাতিক বিশ্বে সরকারকে এত প্রতিকূলতা আর ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হলো কেন? যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিচারপতি সিনহা যে জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। আর সেজন্যই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার বিষয়টির অবতারণা করেছেন। এই আলাপচারিতার কোনো সাক্ষী নেই। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ আদৌ এ ধরনের কথা বলেননি বা বলতে পারেন না। আমরা যারা যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছি তাহলে কাজ না করে বসে থাকলেও তো পারতাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, নানা সমালোচনার মোকাবেলা করেছি, নানা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর সরাসরি সম্পৃক্ত আছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে অটল থাকতে, আপসহীন থাকতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি ন্যায় বিচারের পক্ষে সোচ্চার থাকতে। তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে কখনো খাটো হতে দেননি আন্তর্জাতিক মোড়লদের হাতে অথবা দেশের ভেতরে চেতনা ব্যবসায়ীদের কাছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে কখনই তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। জন কেরি, বান কি মুন, হিলারি লবি গ্রুপের চিঠি, ফোনকল বা চাপের মুখে হার মানেননি। যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যেতে পারলে তাঁর সরকার আরও স্বস্তিতে দিনাতিপাত করতে পারতো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ অন্যরকমও হতে পারতো। কিন্তু না, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ সেটা হতে দেননি। উল্টো আমি দেখেছি বিচারপতি সিনহা প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধ বিচার বন্ধ করতে চেয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করতে চেয়েছেন। বিচার নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। প্রকাশ্য আদালতে নিজেকে শান্তি কমিটির সদস্য বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে পারেননি। আর তাই তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এ কারণে এখন তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ নানাজনকে নিয়ে নানা উদ্ভট ও অবিশ্বাসযোগ্য কথা রটিয়ে ভগ্ন-স্বপ্নের অলিগলিতে মিথ্যাচারের বেসাতি করে বেড়াচ্ছেন। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক / এআর /

অনুরোধ সত্ত্বেও আইভি আপা সেদিন ট্রাকে উঠেননি : ড. মাহফুজা

২০০৪ সালের ২১আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ ছিল। আমরা জানি, এদেশে মাঝখানে ( ২০০১-০৬) সন্ত্রাসের রাজনীতির উত্থান ঘটেছিল। সন্ত্রাস বিরোধী জনসমাবেশ করার জন্যই আওয়ামী লীগ সভা ডেকেছিল। সেই সমাবেশে আমি নিজেও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে নিজের কোন কাজে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সমাবেশে যাওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অনেকেই ট্রাকের উপর ছিলেন। যে ট্রাকটিকে মঞ্চ বানানো হয়েছিল। অনেক নেতা আইভি আপাকে (মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ‍যিনি মাহফুজা খানমের বোন) বলেছিলেন ট্রাকে উঠে আসার জন্য। কিন্তু আইভি আপা ট্রাকে উঠেননি। না বললেই নয়, আপার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি সব সময় সাধারণ নেতাকর্মীদের পাশে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি সব সময় তার কর্মীদের সঙ্গে থাকতেন। এটা তার একটা আদর্শিক বোধ ছিল। আপনারা জানেন, সমাবেশটি ছিল সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ। আর সেই সমাবেশেই বোমা ফেলা হয়। যে বোমা ফেলা হয়েছিল তা ছিল সেনাবাহিনী ব্যবহৃত বোমা। যে দল এদেশে স্বাধীনতা এনেছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছিল সেই দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশুন্য করার জন্য এ হামলা চালানো হয়েছিল। ওই দিন আমি সন্ধ্যায় টেলিভিশন দেখছিলাম। তখন এ ঘটনা জানতে পারি। আইভি আপা খুব স্মার্ট ছিলেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও টিপটাপ চলতেন। টিভির খবরে যখন আপাকে দেখানো হচ্ছিল তখন দেখলাম আপার চেহারায়, শাড়িতে প্রচুর রক্ত লেগে রয়েছে। তাঁর পা দুটি উড়ে গিয়েছিল। আপাকে পরে সিএমএইচে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সিএমএইচে দেখা করতে পারিনি। এখানে বলা হয়নি, আমরা ২০০০ সালে পেশাজীবী নারী সংগঠন করেছিলাম। আমি ছিলাম সেই সংগঠনের সভানেত্রী। ডা. দীপু মনি, শিরীন শারমীন সবাই সেই সংগঠনে জড়িত ছিল। এ প্রজন্ম হয়তো জানে না, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নয়মাস আইভি আপা মনপ্রাণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বীরাঙ্গনাদের ডেলিভারি করানো, যুদ্ধ শিশুদের বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া নারীদের কাউন্সেলিং করা সহ নানা কাজে তিনি তখন সক্রিয় ছিলেন। আমরা কয়েকজন মিলে জাহাঙ্গীর গেইট পর্যন্ত গিয়েছিলাম। এরপর আমাদেরকে আর যেতে দেওয়া হয়নি। এর কয়েকদিন পর তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। দেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে আইভি রহমান ছিলেন পরিচিত মুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীকার আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, নারী আন্দোলনে আইভি আপা ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশের মানুষের জন্য আইভি আপা ছিলেন উদাহরণ। আইভি অাপার হত্যা মামলার রায়ের জন্য আমাদেরকে চৌদ্দ বছর অপেক্ষা করতে হলো। আইভি অাপার দুই মেয়ে ও এক ছেলে চৌদ্দ বছর কেঁদেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লু ভাই (জিল্লুর রহমান) ও অাইভি অাপার সংসারও অনুকরণীয়। তাদের স্বামী-স্ত্রীর বুঝাপড়া ছিল বেশ ভালো। দু`জনেই রাজনীতি করতেন। নিজ নিজ অবস্থা থেকে দু`জনেই বেশ অবদান রেখে গেছেন। ১৪ বছর পর মামলাটির রায় হলো। আমি মনে করি, বিচারক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেছেন। এই রায় কার্যকর হোক সেই প্রত্যাশা আমি রাখছি। আমরা দীর্ঘদিন বিচারহীণতার সংস্কৃতিতে ছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক বিচার কার্য সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে আমিদেরকে সেই কলংক মুছিয়ে দিচ্ছে। লেখক : ড. মাহফুজা খানম গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানের ছোট বোন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অা অা// এআর

২১ আগস্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন উদাহরণ : তুরিন

মরণঘাতি রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য নিষ্ঠুর হামলা, তা যেখানেই ঘটুক না কেন, বিনা শাস্তিতে পাড় পেয়ে যেতে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ আগেও এ ধরণের হামলার শিকার হয়েছে যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার ও আত্মীয়দের হত্যা করা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এই হত্যাযজ্ঞের মাত্র ৪১ দিনের মাথায় হত্যাকারীদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে অর্ডিন্যান্স পাস করা হয় যেন হত্যাকারীদেরকে কোন আইনী প্রক্রিয়া বা অন্য কোন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা না যায়। যাইহোক, পরে এই অধ্যাদেশটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং বিখ্যাত "বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা" দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটায় এবং দেশের আইন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে।  

উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশে

শুক্রবার ছুটির দিন। এ দিন সাধারণত মানুষ একটু ঘোরাঘুরি করে থাকেন। তবে, যদি কোনো মেলা বা উৎসব হয় তাহলে সেখানেই মজাটা অন্যরকম। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার এই তিনদিন ছিল জাতীয় উন্নয়ন মেলা। এ মেলাকে ঘিরে রাজধানীতে দেখা গেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটা অন্য রকমভাব। শুক্রবার মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতার অভাব নেই বিন্দুমাত্র। স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্টলে গিয়ে মিললো অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। এখানে যেতেই তরুণ চিকিৎসকরা জানতে চাচ্ছেন কি সেবা চান। তারা খুব আনন্দের সঙ্গে ওজন মাপেন ও পেসার পরীক্ষা করে দিচ্ছেন। খুব উৎসাহ নিয়ে এ সেবা দিচ্ছেন দর্শকদের। কৌতুহলী হয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো-আপনারা কি এ সেবা আপনাদের মেডিক্যালে দেন। তাদের একজনের সহজ স্বীকারোক্তি না। এটা এ সেবা মেলায় দেওয়া হচ্ছে। আর মেডিক্যালে এ সেবা নিতে হলে টাকা দিয়ে টোকেন নিয়ে এ সেবা নিতে হবে। উল্লেখ্য, মেলায় বিনা পয়সায় খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অন্য সময় এমনটা হয় না তাদের কথা থেকেই প্রতীয়মান মনে হলো। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- রাজধানীর এই উন্নয়ন মেলায় প্রায় সব স্টলেই খুব সহজেই মানুষকে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রমের বর্ণনা সম্মেলিত লিফলেট। এতে তাদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই বলেই মনে হলো। এ রকম হয়তো সারাদেশের উন্নয়ন মেলায় লক্ষ্য করা গেছে নিশ্চয় হয়তো এমনটা। এটা নিশ্চয়ই ভালো কাজ। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়ন তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। এটা মন্দ কিসের। ঢাকা জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. ফেরদৌস জানান, এবারের উন্নয়ন মেলায় মোট ৩৩০টি স্টল ছিল। এসব স্টলের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০টি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ১৯টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৬টি, কৃষি মন্ত্রণালয় ১৬টি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০টি এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ৯টি স্টলে কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করে। সারা দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের কথা বারবার জাতিকে স্মরণ করে দিয়ে যাচ্ছেন। এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই। দেশের উন্নয়নের কথা সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও প্রচার করে যাচ্ছেন। দেশের সার্বিক উন্নয়ন হচ্ছে তাদের মতে। আরও উন্নয়ন হয়তো হবে ভবিষ্যতে এতে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নয়ন মেলায় সরকারের নানা উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে জাতির সামনে। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। এটা সরকারের বড় সাফল্য। সরকার সাধারণ জনগণের কাছে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। এখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজেই যোগাযোগ করা যায়। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য কোন খাত নেই সেই খাতে সরকার উন্নয়ন করে নাই। সরকার দেশের যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে বলে তাদের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে। তাদের দাবির পক্ষে যথেষ্ট কারণও রয়েছে বটে। বিশেষ করে সরকার পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করছে। পদ্মা সেতু এখন জাতির কাছে দৃশ্যমান। এটা আর এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। এছাড়াও রাজধানী ঢাকায় যানজট কমানোর লক্ষ্যে সরকার একের পর এক উড়াল সেতু নির্মাণ করে যাচ্ছে। এতে অনেকটা যানজটও কমেছে বলে অনেকেই মনে করেন। এছাড়াও রাজধানীবাসীর যানজটের হাত থেকে রক্ষা করতে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এ প্রকল্প শেষ হলে রাজধানীতে যানজট অনেকটাই কমে যাবে বলেই মনে হয়।এক অর্থে বলা যায়, সরকার রাজধানীর উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর ফলে রাজধানীতে মানুষ সুফল ভোগ করবে। উন্নয়ন মেলাতে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় বড় উন্নয়নের বড় বড় চিত্র চোখে পড়লো। এটা মন্দ কিছু নয় মনে হয়। প্রশ্ন হলো- উন্নয়ন মেলায় সরকারের উন্নয়নের চিত্র যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের এসব ব্যক্তি যেভাবে সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়েছে এই তিন দিন। সেভাবে কি সারা বছর তারা সেবা দিবে? উন্নয়ন মেলায় সব চেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্যাভেলিয়নে। এর কারণ ছিল মুহূর্তের মধ্যেই পাসপোর্ট নবায়ন করে দেওয়া হতো এ মেলায়। এ তিন দিন সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল এ স্টলে। আগ্রহীরা লাইন ধরে এ সেবা নিয়েছেন। মেলায় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো তারা খুব সহজেই এ সেবা নিতে পেরেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ মেলা শেষ হয়েছে। এর পর কি এ সুবিধা পাবেন। মেলায় এ ধরনের সেবা দিতে পারলে অন্য সময় কেনো নয়। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে প্রায় অভিযোগ উঠে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় না। শুধু এ বিভাগ নয় সরকারি অন্যান্য বিভাগেরও একই অবস্থা এমন অভিযোগ অনেকেই করে থাকেন। তাহলে শুধু কি বছরে শুধু তিন দিনই ভালো সেবা পাওয়া যাবে আর বছরের বাকি দিনগেুলোতে নয়। সরকার দাবি করছে, সারাদেশে সব খাতে উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ কথার যৌক্তিকতা কতটুকু রয়েছে? উত্তরের জেলা, কুড়িগ্রাম বা গাইবান্ধার প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে কি উন্নয়ন সমানভাবে হচ্ছে। এমন কিছু গ্রাম রয়েছে যেখানে বিদ্যুতের আলোই ঠিক মতো এখনও যায়নি। তাদের কি ধরনের উন্নয়ন করা হচ্ছে। তারা তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারে না এমন কথা প্রায় শোনা যায়। তারা কি উন্নয়নের ভাগিদার হলো? যোগাযোগ খাতে অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে। রেল যোগাযোগেও অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন সমানভাবে হচ্ছে। উত্তর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়,গাইবান্ধা, রংপুর, বগুড়া জেলার জন্য দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু রয়েছে। একটি লালমনি এক্সপ্রেস ও আরেকটি রংপুর এক্সপ্রেস। এ দুটি ট্রেনের ওপরই ভরসা করতে হয় এসব জেলা ও আশে পাশের জেলার মানুষদের। আর এসব জেলার মানুষকে সেই নাটোর-ঈশ্বরদী হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে যেতে হয়। কিন্তু বগুড়া থেকে যদি সরাসরি বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত একটা লাইন তৈরি করা হয়, তাহলে উত্তর অঞ্চলের সঙ্গে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার দূরত্ব কমে যাবে। কমে যাবে যাত্রাপথ। এই পথের জন্য কাজ চলছে এমনটা শোনা যায় অনেক আগে থেকেই কিন্তু এব বাস্তবায়ন চোখে পড়ার মতো কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। তাহলে উন্নয়ন হচ্ছে সেটা কি সুষম উন্নয়ন। শুধু এই এলাকায় নয়, সারাদেশেই সুষম উন্নয়ন করা দরকার। শুধু ঢাকা শহর বা চট্টগ্রাম নয়। এমনি কি শুধু মহানগরগুলোর উন্নয়ন করলেই হবে না। সারা দেশের উন্নয়নের চিন্তা করা দরকার। অবশ্যই সেটা সুষম টেকসই উন্নয়ন হওয়া উচিৎ। দেশের সার্বিক খাতে টেকসই উন্নয়ন দরকার। শুধু মেলায় যেন উন্নয়ন সীমাবদ্ধ না থাকে। বছরের শুধু তিন দিন নয়, ৩৬৫ দিনেই সরকারি কর্মকর্তারা সেবা দিবেন হাসিমুখে সাধারণ মানুষ এমনটাই চায়। পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়। শুধু শহর নয় কিংবা জেলা শহর নয়, প্রত্যন্ত চর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ুক উন্নয়ন। সেটা দেশের যে প্রান্তেই হোক। হোক না উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম। সব মানুষ উন্নয়নের সমান অংশীদার হোক এটাই সাধারণ মানুষ আশা করে মনে হয়। দেশের সব মানুষের উন্নয়নের জন্য যা করণীয় সংশ্লিষ্টরা এমনটাই ভাববেন। শহরের একটা শিক্ষার্থী যে সুবিধা পান গ্রামের সেই শিক্ষার্থীও যেন সেই সুবিধা পায়, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। লেখক: সাংবাদিক। এসএইচ/

‘অ্যা ব্রোকেন ড্রীম’, বিচারপতি সিনহার বক্তব্য ও একটি বিশ্লেষণ

বিচারপতি এস কে সিনহা সাহেব সম্প্রতি তার লেখা ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রীম` বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘তার বইতে প্রচুর বানান ভুল, এমনকি বইয়ের ইনডেক্স লেখারও সুযোগ পাননি তিনি সময় স্বল্পতার কারণে’। এ বিষয়ে আমি বলি, নির্বাচনের আগে বইটি বের করে বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নির্বাচন বানচালের অনেক তাড়াহুড়ো ছিল সিনহা সাহেবদের। সিনহা সাহেব একই অনুষ্ঠানে আরো বলেছেন- `বই প্রকাশের জন্য তিনি কোনো ইনভেস্টর খুঁজে পাননি। যারা পরবর্তীতে ইনভেস্ট করেছে তারা নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।` প্রকৃত সত্য হচ্ছে, যারা ইনভেস্ট করেছে তারা বিএনপি-জামায়াত পরিবারের সদস্য। নাম প্রকাশ করলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অ্যাম্বাসেডর ` দ্য ব্রোকেন ড্রিম` সম্পর্কে বলেছেন- `আমি তার বইয়ের প্রথম দুই-তিন পৃষ্ঠা পড়েছি। সেখানে দেখলাম সিনহা সাহেব লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু হওয়ার কারণে পালিয়ে বেড়াতেন`। কিন্তু সিনহা সাহেব যেটি লিখেননি সেটা হলো তিনি (সিনহা সাহেব) স্বঘোষিত শান্তি কমিটির সদস্য। নিশ্চয়ই তিনি ওই সময় মুক্তি বাহিনীর ভয়েই পালিয়ে বেড়াতেন। এসকে সিনহা সাহেব আরো বলেছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের একটি অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক তাকে বলেছেন, `আপনার জজ সাহেবরা মন্ত্রাণালয়ের ফোনে প্রভাবিত হন।` তখন সিনহা সাহেব সরাসরি প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমার প্রশ্ন, বিচার বিভাগ যদি তখন স্বাধীন হয় তাহলে এখন কেন বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার জন্য এই দ্বিমুখিতা? এসকে সিনহা সাহেব দাবি করছেন, `২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবৈধ। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতাই নির্বাচিত।` তিনি কী জানেন না, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়! সবচেয়ে বড় কথা, আর সংসদ যদি অবৈধ হয় তাহলে তিনিও তো অবৈধ। তিনি তখন কেন প্রতিবাদ করেননি? সিনহা সাহেব বলেছেন- আই হেট পলিটিক্স। অথচ তার দেশ ত্যাগের মুহূর্তে হাজার খানেক সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তাদের তিনি আরো জানিয়েছেন, তিনি ( সিনহা) দেশে ফিরে আসবেন। এইরকম আরো কিছু কথা দিয়ে তার যে ইউনুসের মত রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে তা প্রমাণ করেছেন। এসকে সিনহা সাহেব পরিশেষে বাংলাদেশের বিষয়ে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এসকে সিনহা সাহেবকে বলি, একটি স্বাধীন দেশের উপর আরেকটি দেশ হস্তক্ষেপ করলে সে দেশের স্বাধীনতা যে খর্ব হয় সে বিষয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দেওয়া আপনি কী জানেন না? লেখক: সাবেক সহ সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় কমিটি। আ আ/ এআর

পৃথিবীটা ঘুরছে

আতিক সাহেবের একমাত্র ছেলে গুড্ডু। একটু মোটা তাজা বলে সবাই আদর করে গুড্ডু বলেই ডাকে। গেলো সোমবার তার সাত বছর সমাপ্তির কেক কাটলো। ছেলেটার বুদ্ধি হবার পর থেকে আতিক সাহেবকে বেশ বিরক্ত করা শুরু করেছে। ছেলে বাবাকে বিরক্ত করবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু বিরক্তির ধরণ যদি অসহনীয় পর্যায়ের হয় তাহলে সেটা হজম করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সে তার বাবা-মায়ের মাঝখান ছাড়া ঘুমাবে না। সে কখন ঘুমে থাকে কখন জেগে থাকে তা অনুমান করা কঠিন।     একদিন গভীর রাতে তার মনে হলো বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। বাবাকে জড়িয়ে ধরতে হাত বাড়াল। বুঝল বাবা বিছানায় নেই। উল্টে মায়ের দিকে হাত বাড়াল। দেখল মাও বিছানায় নেই। বিছানায় উঠে বসে গুড্ডু। তাদের খুঁজতে যাবে এমন সময় বাবা-মা এসে দেখেন সে বিছানায় বসে আছে। রাগে-ক্ষোভে প্রশ্ন ছোড়ে দেয় গুড্ডু, ‘‘তোমরা আমাকে একা রেখে কোথায় গিয়েছিলে?” গুড্ডুর বাবা-মার বুদ্ধি লোপ পায়। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে ভাবতে হয়। ভাবার উত্তরের মধ্যে গুড্ডুর প্রশ্নটাও পড়ে। গুড্ডুর বাবা ছেলেকে বললেন, বাবা, ‘‘বাসায় মনে হলো, চোর দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। তাই আমরা চোর তাড়াতে গিয়েছিলাম।” গুড্ডু এ উত্তরে খুব একটা আশ্বস্ত না হলেও বলে, ‘‘আমাকে নিয়ে গেলে না কোনো? কতদিনের সখ আমার চোর দেখার।’ অন্যদিন যাবো বাবা, এখন ঘুমাও। বাবা-মা একে অপরের মুখপানে চেয়ে থাকেন। একটা আতঙ্কের ছাপ দুজনের চেহারায়। বিপদ থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। তারা চাপা আতঙ্ক নিয়ে যথাস্থানে গিয়ে গুড্ডুকে আদর করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। একদিন গুড্ডুকে যখন তার বাবা পড়াচ্ছিলেন তখন হঠাৎ করেই গুড্ডু তার বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘‘আচ্ছা বাবা, সূর্য কি অস্ত যায়?” বাবা বিলম্ব না করেই উত্তর দেন, ‘‘এটা কোনো প্র্শ্ন হলো। সূর্য অস্ত যাবে এটাই তো পৃথিবীর নিয়ম, সবাই জানে এ কথা।” কিন্তু গুড্ডু মানতে চায় না। চেচিয়ে গুড্ডু বলে, না বাবা, সূর্য কোথাও যায় না, সে ঠিক স্থানেই থাকে। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে।” বাবা কোনভাবে বুঝাতে পারেন না যে, সূর্য অস্ত যায়। বাবা বললেন, তোকে আগামী সপ্তাহের ছুটিতেই কক্সবাজার নিয়ে যাবো, দেখিস কেমন করে সূর্য অস্ত যায়, তোকে আমি চাক্ষুস দেখিয়ে দেবো। গুড্ডু মুখ ভেংচিয়ে বলে, কক্সবাজার কেনো? পৃথিবীর সব দেশে আমাকে নিয়ে গেলেও সূর্য অস্ত যায় দেখাতে পারবে না। আতিক সাহেব এবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে নিয়ে গেলেন গু্ড্ডুকে। সূর্যাস্তের আগে আগেই পৌঁছে গেলেন সৈকতে। গুড্ডুকে দেখাচ্ছেন সূর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্য। আতিক সাহেব খুশী হয়ে বললেন, কি বাবা, এবার দেখলে তো কি করে সূর্য অস্ত যায়?” গুড্ডু বলে, অস্ত যায় না বাবা, পৃথিবী ঘোরে।” আতিক সাহেব ছেলের কথায় বিরক্তির চরম স্তরে পৌছান। গুড্ডুকে কোনোভাবেই বুঝাতে পারেন না। তার একটাই কথা সূর্য অস্ত যায় না পৃথিবী ঘোরে। সে এবার পৃথিবী ঘোরাটা দেখতে চায়। আতিক সাহেব কল্পনায় ফিরে যান তার ছোটবেলায়। আতিক সাহেবের বাবা মাঝে মাঝে তার দুহাতে ধরে কেমন করে শুন্যে তুলে ঘুরাতেন। ঘুরাতে ঘুরাতে একসময় দাঁড় করিয়ে রেখে দিতেন। তখন মনে হতো হ্যা সত্যি সত্যি পৃথিবীটা তো ঘুরছে। কাল-বিলম্ব না করে তিনি গুড্ডুকে দুহাতে ধরে শুন্যে তুলে ঘুরাতে লাগলেন। তাকে নিয়ে বেশ কিছুটা বেশিই চক্কর দিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেন। গুড্ডু ঘুরতে ঘুরতে বেশ জোরেই বলতে থাকে, “এই তো আমি যা বলেছিলাম বাবা, পৃথিবী ঘোরে সত্যি সত্যি ঘুরে”। এসি   

কাছের দেশ

দেশে থেকে থেকে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, এখন দেশের বাইরে গেলে কেমন যেন অস্থির লাগে, মনে হয় কখন আবার দেশে ফিরে যাবো! বাংলাদেশের একটা টিমের সঙ্গে একেবারে সবচেয়ে কাছের দেশ ভারতবর্ষে এসেছি, শহরটির নাম পুনে। ঝকঝকে তকতকে একটা শহর। থাকা খাওয়া এবং কাজকার্মের আয়োজন চমৎকার। যারা সাথে আছে তারা সবাই আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাই চমৎকার সময় কাটছে। তারপরও মনে হচ্ছে কখন দেশে ফিরে যাব। আজকে একটু বেশি ব্যস্ততা ছিল তাই দুপুরে ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকেছি। অন্য খাবারের সঙ্গে সফট ড্রিংক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। গ্লাসে করে সফট ড্রিংক আনা হয়েছে এবং তখন লক্ষ্য করলাম ড্রিংক খাওয়ার জন্যে প্লাস্টিকের স্ট্র নেই, এরকমটি আগে দেখিনি। প্রথমে ভেবেছি বুঝি ভুল করে দেওয়া হয়নি কিন্তু একটু পরেই জানতে পারলাম আসলেই সফট ড্রিংক খাওয়ার জন্য এখানে কোনও স্ট্র দেওয়া হয় না। কারণটা খুবই চমৎকার। এই রাজ্যটি বুঝতে পেরেছে প্লাস্টিক পলিথিন এই বিষয়গুলো পরিবেশের জন্যে একটা বিপজ্জনক বিষয়। পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কাজেই তারা আইন করে বন্ধ করে দিয়েছে, কেউ আর পলিথিন কিংবা প্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারে না। সফট ড্রিংক খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের স্ট্র পর্যন্ত পাওয়া যায় না। স্থানীয় মানুষদের কাছে শুনেছি কেউ যদি পলিথিনের ব্যাগে কিছু ভরে রাস্তা ঘাটে চলাফেরা করে তাদের নাকি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। দেশ থেকে আসার সময় ভুল করে কোনও পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে এসেছি কিনা সেটা নিয়ে এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছি! অথচ এই বিষয়টা করার কথা ছিল আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে। শুনেছি বুড়িগঙ্গার তলাটি নাকি পলিথিনের ব্যাগে বোঝাই। নালা নর্দমা পলিথিন দিয়ে বুজে গেছে। এই পলিথিন যে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে গিয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে তাও নয়, যুগ যুগ ধরে এগুলো পরিবেশের ওপর বিষ ফোঁড়া হয়ে বেঁচে থাকবে। আমাদের এত কাছের একটি দেশ যারা কথাবার্তা চালচলন শিক্ষাদীক্ষায় হুবহু আমাদের মতো, তারা যদি পরিবেশকে বাঁচানোর জন্যে এতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে আমরা কেন পারি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাই না! আমরা এখানে এসেছি মেধা স্বত্ব (বা ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি সংক্ষেপে আই পি) সম্পর্কে জানতে। সারা পৃথিবীই মেনে নিয়েছে নতুন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। যারা মনে করে এটা একটা রূপক বা বিমূর্ত কথা তারা যদি একটু খুঁটিয়ে দেখে তাহলেই বুঝতে পারবে যে এটি আসলে একেবারে টাকা-পয়সা বা ডলারের হিসাব হতে পারে। গবেষণা করে যখন কিছু আবিষ্কার করা হয় সেটা যদি পৃথিবীতে ব্যবহার করার উপযোগী কিছু হয় এবং যদি পেটেন্ট করে তার মেধাস্বত্ব রক্ষা করা হয় তাহলে এটা দেশের আয়ের উৎস হয়ে যেতে পারে। ভারতবর্ষে এই মেধাস্বত্ব রক্ষা করার ব্যাপারটি খুব গুরুত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে এবং যে মানুষটি প্রথম এই বিষয়টা শুরু করেছেন তার নাম আর.এ. মাশেলকার। বিজ্ঞানের জগতে সুপারস্টার বলে যদি কিছু থাকে তাহলে মাশেলকার হচ্ছেন সেরকম একজন মানুষ। অল্প বয়সে যখন তার বাবা মারা যান তখন তার অশিক্ষিত মা অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছেন। মাশেলকার তার পিএইচডি শেষ করার পরও তার মা নিশ্চিত ছিলেন না তিনি তার সন্তানকে ঠিক করে মানুষ করতে পেরেছেন কিনা। দেখতে দেখতে মাশেলকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠলেন, পৃথিবীর সেরা সেরা ইউনিভার্সিটি তাকে ডেকে ডেকে নিয়ে সম্মান সূচক পিএইচডি দিতে শুরু করলো। যখন তার সম্মান সূচক পিএইচডি এর সংখ্যা পচিশে দাঁড়ালো তখন তার মা শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হলেন যে তিনি তার ছেলেকে মানুষ করতে পেরেছেন! তার বর্তমান পিএইচডি’র সংখ্যা কতো জানার জন্যে তার একজন সহযোগিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন, “শেষবার যখন এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে তখন তার সংখ্যা ছিল উনচল্লিশ, আমি যতদূর খবর পেয়েছি তিনি এর মাঝে আরো একটি পেয়ে গেছেন!” এই হচ্ছেন মাশেলকার। বলাই বাহুল্য আর.এ. মাশেলকার খুব ব্যস্ত থাকেন, দেশে বিদেশে ঘুরতে হয়। তারপরেও আমাদের টিমের জন্য সময় বের করে এনেছেন। আমি আগেও লক্ষ্য করেছি আমাদের দেশের জন্যে এক ধরনের মায়া আছে। সেদিন বিকেলেই তার প্যারিস যাওয়ার কথা কিন্তু তার মাঝেই তিনি আমাদের তিন ঘণ্টা সময় দিলেন, এক সাথে দুপুরের খাবার খেলেন। তার কথা বলার ভঙ্গি খুব সুন্দর। খুব চমৎকার ভাবে মানুষদের অনুপ্রাণীত করতে পারেন। পশ্চিমা দেশের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে নিজেদের উপস্থাপন করতে হয় সেটা কখনো ভুলেন না। পশ্চিমা দেশ বহুদিন থেকে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে আছে কাজেই বড় বড় ব্যাঙের লাফ (Frog Leap) দিয়ে তাদের ধরতে হবে এরকম একটা আলোচনা হয়। আরএ মাশেলকার সেটা শুনে মাথা নেড়ে বলেছেন- ‘উঁহু, ব্যাঙের লাফ দিয়ে হবে না, আমাদের পোল ভল্ট করে তাদের ধরে ফেলতে হবে।’ শুধু যে মুখে একথা বলেন তা নয়, আসলেই দেশটি যেন পোল ভল্টের লাফ দিয়ে পশ্চিমা জগৎকে ধরে ফেলতে পারেন সে জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যাই হোক, খুব বড় বড় জ্ঞানী-গুনী মানুষের সাথে আসলে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না, যদি পেয়ে যাই তাহলে তাদের চিন্তার জগৎটা পরীক্ষা করে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। মনে আছে প্রায় তিরিশ বৎসর আগে একবার কার্নেগী মিলান ইউনিভার্সিটিতে হার্বাট সাইমনের সাথে কথা বলেছিলাম। আমরা সবাই এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কথাটার সাথে পরিচিত, এই কথাটা প্রথম হার্বাট সাইমন ব্যবহার করেছিলেন। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, কথা বললেই বোঝা যায় মানুষটা কত অসাধারণ বুদ্ধিমান। তখন মাত্র ইন্টারনেট, ই-মেইল আসতে শুরু করেছে, আমার মনে আছে হার্বাট সাইমন তখনই সেটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মাঝে ছিলেন। একেবারে ঘোষণা দিয়ে তিনি নিজেকে এই সব থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। তার ভাষায়, যখন আমার প্রয়োজন হয় তখন আমি কারো সাথে যোগাযোগ করবো, সবাই ঢালাও ভাবে না চাইতেই আমাকে দুনিয়ার খবর দিয়ে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে আমি তাতে রাজি নই। আমার তখন বয়স কম ছিল, আমি গলার রগ ফুলিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করেছিলাম, সময়মত খবর পাওয়া যে কত জরুরি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, তিনি আমার কথাকে কোনও গুরুত্ব দেননি! এতোদিন পর আমি আবিষ্কার করেছি যে, আসলে যে বিষয়টা বুঝতে আমার ৩০ বছর লেগেছে তিনি সেটা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। এখানেও এভাবে মাশেলকারের মতো মানুষকে পেয়ে গিয়ে আমার প্রশ্নের শেষ ছিল না, তিনি ধৈর্য্য ধরে উত্তর দিয়েছেন। আমি প্রথমেই জানতে চাইলাম, জীবনে ব্যর্থতা সম্পর্কে তার কী ধারণা। আমরা যখনই পেছনে ফিরে তাকাই, সবসময়েই দেখি জীবনে যতটুকু সাফল্য, ব্যর্থতা তার থেকে অনেক বেশি। মাশেলকার ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা বলতেই রাজি নন, তার মতে এটা হচ্ছে কোনও কিছু জানার প্রক্রিয়া, (FAIL হচ্ছে First Attempt In Learning বাক্যটার শব্দগুলোর প্রথম অক্ষর!) আমি তারপর জানতে চাইলাম তাকে কখনো অসৎ বা দুর্নীতি গ্রস্থ মানুষের পাল্লায় পড়তে হয়েছে কিনা, তিনি বললেন যে, হ্যাঁ। মানুষজন তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। আগে ঢালাও ভাবে সবাইকে বিশ্বাস করতেন এখন খোঁজ খবর নিয়ে তারপর বিশ্বাস করেন। আমি জানতে চাইলাম তাকে কেউ হিংসা করে কিনা, তার পেছেনে কেউ লেগেছে কিনা। মাশেলকার বললেন, যে হ্যাঁ, তার বিরুদ্ধে মানুষজন অনেকবার লেগেছে, বড় বড় খবরের কাগজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন প্রচারণা চালিয়ে গেছে। তারপর যেটা বলেছেন সেটা লেখার জন্যেই আমি এত কিছু লিখেছি। আর এ মাশেলকার বললেন আমার ভেতরে আসলে একটা ডিলিট (Delete) বাটন আছে, দিনের শেষে ঘুমানোর আগে আমি সেই ডিলিট বাটন চাপ দিয়ে সব কিছু মুছে ফেলে শান্তিতে ঘুমাই। কথাটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আমাদের মতো মানুষদের যাদের ক্রমাগত চারপাশের মানুষের নেতিবাচক কথা শুনতে হয় তাদের সবার ভেতরে এই ডিলিট বাটন থাকতে হবে যেন আমরা দিনের শেষে চারপাশের সব কিছু অসুন্দর এবং কুৎসিত বিষয় মুছে দিয়ে মহানন্দে শান্তিতে ঘুমাতে পারি! পুনে শহরের ছোট আরেকটা বিষয়ের কথা বলে শেষ করে দিই। একজন খুব উচ্চবিত্ত মানুষের বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। সন্ধ্যেবেলা বাইরে তার সঙ্গে হাঁটছি তিনি আশেপাশে সবকিছু দেখাতে দেখাতে তার বিশাল এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাশে আরেকটি উঁচু দালান দেখালেন। বললেন, ‘যারা আমাদের কমপ্লেক্সটি তৈরি করেছে তাদেরকে এই দালানটাও তৈরি করতে হয়েছে, এটি স্বল্প মূল্যের এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষেরা এখানে থাকবে। শুধু তাই না এর অর্ধেক এপার্টমেন্ট করপোরেশন নিয়ে নিয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করার জন্য।” এর পেছনের কারণটি শুনে আমি চমৎকৃত হলাম। শহর কর্তৃপক্ষ কখনোই চায় না যে শহরটি বড়লোকের এলাকা এবং গরিবের এলাকা হিসেবে ভাগ হয়ে যাক। সব মানুষ সমান এবং সবাই মিলে মিশে থাকবে সেটাই হচ্ছে লক্ষ্য! সে জন্যে বড় লোকের এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাশে গরিবের এপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি করতে হয়। আমার তখন হঠাৎ করে মহাখালী ডিওএইচএসের কথা মনে পড়লো, এর ঢোকার পথে বড় বড় করে লেখা, ‘টোকাই প্রবেশ নিষেধ’। একটা স্বাধীন দেশে সত্যিই কি আমি দরিদ্র শিশুদের একটা এলাকায় ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিতে পারি? একেবারে ঘোষণা দিয়ে? লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়এসএ/

শুভ বৌদ্ধ মধু পূর্ণিমা

আজ শুভ মধু পূর্ণিমা। বৌদ্ধ বিশ্বের জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দঘন একটি তিথি এবং এর আবেদন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৌদ্ধদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত যাপনের দ্বিতীয় পূর্ণিমা তিথিতেই এই পূর্ণিমা উৎসব উদযাপন করা হয়। অর্থাৎ ভাদ্রপূর্ণিমা তিথিই বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে মধু পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বৌদ্ধরা এদিন বিহারে গিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু এবং নানা ধরনের পুষ্প, ফল ও খাদ্য ভোজ্যাদি দান করে থাকেন।         বিশেষ করে বৌদ্ধ বালক-বালিকা, শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী ও বৃদ্ধ-প্রৌঢ়সহ সব শ্রেণীর নর-নারীরা এ দিন বৌদ্ধ বিহারগুলোতে গিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু দান করার উৎসবে মেতে ওঠে। এ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিটি বৌদ্ধবিহার ও বিহারের প্রাঙ্গণগুলো মধুদানের এক আনন্দঘন পরিবেশে মুখর হয়ে ওঠে। আমরা জানি বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর মোট পঁয়তাল্লিশ বর্ষ বর্ষাবাসব্রত পালন করেন প্রাচীন ভারতবর্ষের নানা বিহার, অরণ্য, পর্বত, গুহা, আরাম প্রভৃতি নানা স্থানে। তন্মধ্যে একবার বর্ষাবাস যাপন করেন পারলেয়্য নামক বনে। সেই পারলেয়্য বনে ছিল নানা পশুপাখি ও জীবজন্তুর আবাস। বুদ্ধের অপরিসীম মৈত্রী প্রভাবে বনের সেসব পশুপাখি ও জীবজন্তুরা তাদের স্বভাবজাত হিংস্রতা পরিহার করে মহামানব বুদ্ধকে অহিংসা, দান, সেবা ও শ্রদ্ধার আদর্শ প্রদর্শন করেছিল। এমনকি অরণ্যের বন্য হস্তীসহ সেখানকার নানা ধরনের পশুপাখি ও জীবজন্তু বুদ্ধকে নানাভাবে তিন মাস সেবাযত্ন করেছিল। ভাদ্র মাসের এই পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধজীবনের বানরের মধুদানের এক বিরল ঘটনা জড়িয়ে আছে। সে দিনের বানরের এই মধুদান একটি নিছক ঘটনা মনে হলেও এর থেকে আমরা একটি পশুর ত্যাগ, সেবা ও দানচিত্তের এক মহৎ শিক্ষা পেয়ে থাকি। বনের একটি বানর হয়ে বুদ্ধকে দান দিয়ে যেখানে তার মহৎ উদার ও ত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে, সেখানে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হয়েও বিপন্ন মানুষের প্রতি সেই উদারতা, ত্যাগ, দান, সেবা দেখাতে পারছি না। পারছি না মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মৈত্রী, করুণা, দয়া প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলির আদর্শ ও আচরণ দেখাতেও। আজ মানুষের প্রতি মানুষের সেবা, দান, ভালোবাসা ও সহানুভূতি তেমন নেই বললেই চলে। মানুষের আর্তনাদ ও অভাব-অনটন দেখেও মানুষ তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায় না। মানুষ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শন করছে না। মানুষ মানুষের জীবন সংহার করছে দেখেশুনে। মানুষ যেন তার মানবিক গুণাবলি থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। এটাই কী মানুষের ধর্ম? মানুষের প্রেমভরা হৃদয় যেন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। এ রকম হওয়ার তো কথা ছিল না। যেখানে বনের একটি বানর বুদ্ধকে মধু দান করে তৃপ্তি পেয়েছে, আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে; এমনকি বনের বন্য হস্তিও যেখানে বুদ্ধকে তিন মাস সেবা করে অপার আনন্দ অনুভব করেছে, সেখানে আমরা জীবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও মানুষের প্রতি সেই দান, ত্যাগ, ভালোবাসা দেখাতে পারছি না। এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে? গোটা বিশ্বসহ আমাদের দেশের সর্বস্তরে আমরা আজ এই করুণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। অন্যদিকে আবার চলছে দান ও সেবার বিনিময়ে কত বিপন্ন ব্যবসা আর কত জঘন্য অপরাধ ও নির্মমতা। মানুষের স্বভাব হয়ে গেছে বনের হিংস্র পশুপাখি ও জীবজন্তুর চেয়েও অনেক খারাপ। আমরা আগে তাদের দেখলে অবজ্ঞা করতাম, অবহেলা করতাম। এখন তারা আমাদের দেখে অবজ্ঞা করে, অবহেলা করে। এমনকি আগে আমরা বনের পশুপাখি-জীবজন্তুদের দেখলে ভর্ৎসনা করতাম, গাল-মন্দ করতাম। কিন্তু এখন তারা আমাদের দেখে ব্যঙ্গ করে, ভর্ৎসনা করে। কারণ বর্তমান বিশ্বে এখন আমরা সব ধরনের মনুষ্যত্ব ধর্ম ও মানবতার গুণ হারিয়ে ফেলেছি। আমরা হয়ে গেছি পূর্বের আদিম অসভ্য বর্বরের চেয়েও খারাপ। দিনদুপুরে মানুষ খুনখারাবি করছে। নানা সন্ত্রাস, অপরাধ এমনকি গুম ও হত্যা করতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করছে না। এটাই কি মানবতা? এটাই কী সভ্যতা? এসব দেখে আমি নিজেকে ধিক্কার দিই। আজ বিবেকের কাছে প্রশ্ন জাগে আমরা কি দান দিয়ে, মানুষকে সেবা দিয়ে এবং অপার ত্যাগে আমাদের চিত্তকে কি প্রীতিতে প্রসারিত করতে পারি না? আমরা কি পারি না অসহায়, নিঃস্ব, হতদরিদ্র এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি মৈত্রী, করুণা ও ভালোবাসায় আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করতে? আজ বাংলাদেশসহ বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে এমন প্রশ্নগুলোই আমাদের বারবার ভাবিয়ে তুলছে। আজ শুভ মধু পূর্ণিমা আমাদের সেই মহৎ শিক্ষাই দিচ্ছে- আমরা যেন আমাদের মানবীয় গুণাবলিতে পুনরুজ্জীবিত হই, সিক্ত হই এবং দানে, ত্যাগে ও পরপোকারে বিশ্ব মানবতায় এগিয়ে যাই। অতএব, বৌদ্ধদের এসব পূজা-পার্বণ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আমরা মানুষের জন্য, বিশ্ব মানবতার জন্য নানা ধরনের দান, সেবা ও ত্যাগের মহৎ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, যেখানে আমাদের সব ধরনের সংকীর্ণতা এবং হিংসা, দ্বেষ, লোভ ও চিত্তের হিংস তা দূরীভূত হয় এবং মৈত্রী, দয়া, দান, সেবা, উদারতা প্রভৃতি মানবিক গুণাবলিতে আমাদের চিত্ত যেন করুণাসিক্ত হয়। এগুলো ধর্মের সর্বজনীন শিক্ষা। এ জন্যই বুদ্ধের শিক্ষা হল জীবনের সব ক্ষেত্রে অকৃত্রিম উদার চিত্ত হওয়া, বিবেক-বুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলা এবং দান-ত্যাগ-সেবায় নিজকে পরিপূর্ণ করা। কারণ অজ্ঞানতা, মূর্খতা মানুষের কখনও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মন্দ ও অকুশলকর্মে মানুষ কখনও মহৎ হতে পারে না। এমনকি এসব অপকর্মে দেশ ও সমাজ কখনও উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগোতে পারে না। পারে না বিশ্ব মানবতাকে উপকৃত করতে। অন্ধকার দিয়ে যেমন আলোকে আহ্বান করা যায় না, তেমনি অকুশল এবং মন্দকর্ম দিয়ে কখনও সৎ, শুভ ও মঙ্গলকে আলিঙ্গন করা যায় না। এটাই হচ্ছে বৌদ্ধ যুক্তিবিজ্ঞানের মূল কথা। অতএব, চলুন আমরা আজ মহামতি বুদ্ধের এই শিক্ষা থেকে জীবন প্রতিষ্ঠার সব গুণ ও আদর্শ গ্রহণ করি। দান, সেবা ও ত্যাগে জীবনকে মহিমান্বিত করি। বিদ্যা ও জ্ঞানে আমাদের জীবনকে ধন্য ও সার্থক করি। বৌদ্ধ মধু পূর্ণিমা সফল হোক। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু- জগতের সকল জীব সুখী হোক। ভবতু সব্ব মঙ্গলং- সকলের মঙ্গল লাভ হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। নিব্বানং পরমং সুখং- নির্বাণ পরম সুখ, নির্বাণ পরম শান্তি। প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার এসি      

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি