ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৯ ৮:৪৩:১৮

২২ ডিসেম্বর : গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া মুক্তি দিবস

নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিসৌধ

২২ ডিসেম্বর : গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া মুক্তি দিবস

আজ ২২ ডিসেম্বর। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া মুক্তি দিবস। ১৯৭১ সালের আজকের এ দিনে এ দুই উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশের বিজয় ঘোষিত হলেও গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া পাকহানাদার মুক্ত হয়েছিল ২২ ডিসেম্বর। টানা ২৮ দিন মুক্তি বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর আক্রমণের পর ১৯৭১ সালের আজকের এ দিনে গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পে অবস্থানরত শতাধিক পাকসেনা মিত্র বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে। আর এর মধ্য দিয়ে ওইদিন এ দুই উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়।তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে এখনও সরকারি উদ্যোগে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিসৌধ। আজও সরকারিভাবে চিহ্নিত হয়নি আগৈলঝাড়া উপজেলার ছয়টি ও গৌরনদী উপজেলার চারটি বধ্যভূমি। এসএ/  
ফুল হাতে স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষের ঢল

সকাল হতে না হতেই একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ফুলে ভরে ওঠে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদী। ভোর থেকেই ফুল হাতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লাখো মানুষের ঢল নামে স্মৃতিসৌধে। তারা শ্রদ্ধা জানায় একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি। রোববার (১৬ ডিসেম্বর) ছিলো বিজয়ের ৪৭ বছর। বিজয় দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে। তারা শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যাওয়ার পর স্মৃতিসৌধ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষ স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদীতে ফুল দিতে জড়ো হয়। পাশাপাশি শহীদদের প্রতি জানাতে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, শিল্পী-বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, পেশাজীবী, শ্রমিক, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলিতে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতিসৌধের বেদী। পুরান ঢাকার তাঁতী বাজার থেকে স্মৃতিসৌধে আসা আশফাকুর রহমান আকাশ বলেন, আজ বিজয় দিবস তাই শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছি এখানে। হৃদয়ের নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর শহীদদের প্রতি। তাদের কারণেই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। শহীদদেরা মরে না, তারা লুকিয়ে আছেন ভাষায়, বাঙালির হৃদয়ে। আরকে//

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আ’লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়।আজ রোববার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে রক্ষিত জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংঠনের নেতৃবন্দ ও কর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।পরে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি জাতির পিতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বরণে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, একেএম এনামুল হক শামীম, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গোলাম রব্বানি চিনু, মারুফা আক্তার পপি ও এ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবির কাওসার এবং উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।এরপর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।পরে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষসহ সর্বস্তরের জনগণ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।সূত্র : বাসসএসএ/ 

বিজয় দিবসের বিশেষ নাটক ‘বিসর্জন ৭১’

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিশেষ নাটক ‘বিসর্জন ৭১’। সুমন আনোয়ারের রচনা ও পরিচালনায় এতে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ, মুনিরা মিঠু, জাকিয়া বারী মম, আহসান হাবিব নাসিম, শ্যামল মাওলা, সুজাত শিমুল প্রমুখ। যুদ্ধের বেদনায় গাঁথা এই নাটকের গল্পে দেখা যাবে- মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়, ঢাকা, ১৯৭১ সাল। ঘরে ঘরে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে হানাদার বাহিনী। হত্যা, ধর্ষণ আর গোলাগুলিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরনো ঢাকার শাঁখারি বাজার।উপায় না দেখে একটি ঘরে খাটের নিচে শহীদ তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লুকিয়ে রাখে, তার বোন পুরো পরিবার রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। হানাদার বাহিনী শহীদের বাড়ীর দরজায় টোকা দিলে তার বোন দরজা খুলে দেয়। তখন শহীদের স্ত্রী খাটের নিচ থেকে কাশি দিচ্ছিলো, নিরুপায় হয়ে তার মুখ চেপে ধরে। মিলিটারি শহীদের বোনকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর শহীদের স্ত্রীকে খাটের নিচ থেকে বের করা হলে দেখা যায় নিথর দেহ, দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে সে। তারও অনেক পরে খাটের নিচ থেকে একটা শিশুর কান্না ভেসে আসে।এখানে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন জাকিয়া বারী মম। নাটকটি বাংলাভিশনে প্রচার হবে আজ রাত ৯টা ৫মিনিটে। এসএ/  

বিজয়ের দিনে শহীদ

রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত বয়রাট গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক আ. ওয়াহাব মিয়ার সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুহুল ইসলাম (সাদী)। তিনি ১৯৫০ সালে ঝিনাইদহ জেলার কাঁচেরকোল গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মাসাধিক কাল টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত থেকেও ১৯৬৬ সালে শৈলকূপা থানার বেণীপুর হাই স্কুুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে আইএসসি অধ্যয়ন শেষে তৎকালীন পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগদানের মাধ্যমে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন। বিমানবাহিনীর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ফ্রান্সে যান এবং সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সেরা অফিসারের বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেন।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেক বাঙালি সৈনিকের মতো তার অন্তরেও দেশমাতৃকার জন্য অবদান রাখার তাগিদ অনুভব করেন। সঙ্গত কারণেই অন্যান্য বাঙালি অফিসারের সঙ্গে তাকেও পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করা হয়। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বন্দিশিবির থেকে পালানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন। জন্মভূমির প্রতি প্রবল আকর্ষণ দেখে এক পাঞ্জাবি অফিসার বন্ধু তাকে পালানোর সুযোগ দিলে তিনি জীবন বাজি রেখে ভারত হয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন। তিনি নিজ এলাকা রাজবাড়ীর পাংশা থানার মুজিব বাহিনীর কমান্ডার আ. মতিন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে এলাকার যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে ভারতের বনগ্রামে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। কুষ্টিয়া, কুমারখালীসহ আশপাশে সংঘটিত সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর রাজবাড়ী শহরে রেলওয়ে লোকোশেডে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বিহারি ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নেন। ঢাকায় যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের  প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন রাজবাড়ীতে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গোলাগুলির মধ্যে রুহুল ইসলাম সাদী তার দুই সহযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলামসহ নির্মমভাবে শহীদ হন `৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। শত্রু সেনারা তাকে হত্যা শেষে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে ওঠে। তার এক সহযোদ্ধা পাংশার বয়রাট গ্রামের রবিউল ইসলাম কুসুম মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আজও বেঁচে আছেন। রাজবাড়ী শহরের রেলওয়ে লোকোশেডে যুদ্ধক্ষেত্রের সহযোদ্ধা ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে রাজবাড়ীর লক্ষ্মীকোল নামক স্থানে মসজিদের সামনে সমাহিত করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার মা আমেনা খাতুনকে ২০০০/- টাকা সম্মানী পাঠিয়েছিলেন। এই শহীদের মায়ের নামে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে পেনশন বরাদ্দ ছিল ৭৫ টাকা। আমেনা খাতুন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পেনশন ৩০৫/- টাকা সোনালী ব্যাংকের কসবা মাজাইল (পাংশা) শাখা থেকে গ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতার এই সূর্যসন্তান বাংলাদেশের মুক্তির জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। এই শহীদ পরিবার অদ্যাবধি রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের সচ্ছল জীবন যাপনের নিমিত্তে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন। সেখান থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও এই শহীদ পরিবারকে কোনো সহায়তা করেনি। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে শহীদ সাদীর পরিবারকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়; কখনও পত্র মারফত, কখনও পত্র ছাড়াই। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কিছু উপহার দেওয়া হয়। দেশমাতৃকার টানে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া যোদ্ধার এই হচ্ছে মূল্যায়ন। পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত থাকা অবস্থায় রুহুল ইসলাম সাদী তার বাবা-মাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় একটা বাড়ি তৈরি করে দেবেন। তার বাবা-মাও আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু পুত্রের অকালমৃত্যুতে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। বর্তমানে রুহুল ইসলাম সাদীর রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত বয়রাট গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। এই পরিবারের সব সদস্য উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতে কোনো কোটায় কেউ সুযোগ পাননি। ইতিমধ্যে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য অনেককে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছে। শহীদ রুহুল ইসলাম সাদীর স্মরণে রাজবাড়ীতে একটি স্থাপনার নামকরণ করে এই বীর যোদ্ধার স্মৃতিকে  জাগরূক রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা  গ্রহণ করা হোক।লেখক : শহীদ মুক্তিযোদ্ধার অনুজ এসএ/

স্মৃতির পাতায় ১৯৭১

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়েছিলাম কলকাতার থিয়েটার রোডে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরে। সেখানে অবস্থান করছিলেন শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য মনসুর আলী, কামারুজ্জামান ও অন্যরা। সবাই আনন্দে আত্মহারা! নেতৃবৃন্দ আমাদের বুকে টেনে নিয়ে আদর করেছিলেন। প্রিয় মাতৃভূমিকে আমরা হানাদারমুক্ত করতে পেরেছি, মনের গভীরে যে কী উচ্ছ্বাস, কী আনন্দ; সে আনন্দ-অনুভূতি অনির্বচনীয়! স্বাধীন বাংলার যে ছবি জাতির পিতা হৃদয় দিয়ে অঙ্কন করে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র করে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, `কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।` পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অদম্য বাঙালি জাতি নেতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সমগ্র বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, জাতীয় মুক্তির ন্যায্য দাবির প্রশ্নে কেউ আমাদের `দমাতে` পারে না। জাতীয় জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আমার জীবনেও ডিসেম্বর মাস আনন্দ-বেদনার স্মৃতিতে উদ্ভাসিত। `৭০-এর ডিসেম্বরে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলাম। ১৯৬৯-এর ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু মুজিবের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান তুলেছিলাম। বঙ্গবন্ধু সেদিন এই জনপদের নামকরণ করেছিলেন `বাংলাদেশ`। সমবেত জনতাকে আহ্বান করে বলেছিলেন, `আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্লোগান তুলুন, `আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ`।`৭১-এর ৩ ডিসেম্বর থেকে সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ অর্জন করে। মুক্তিবাহিনীর চতুর্মুখী গেরিলা আক্রমণে বিধ্বস্ত পাকিস্তান বাহিনী এদিন উপায় না দেখে একতরফাভাবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। গভীর রাতে ইন্দিরা গান্ধী এক বেতার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে সাফ জানিয়ে দেন, `আজ এই যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করল।` পরদিন ৪ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যৌথভাবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জনে চিঠি লেখেন। এর পরপরই ভারত ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম `গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ`কে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক `৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গৃহীত রাষ্ট্রের নাম `গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ` উদ্ধৃত করে লোকসভার অধিবেশনে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, "বাংলাদেশ `গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ` নামে অভিহিত হবে।" ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতার পর লোকসভার সব সদস্য দাঁড়িয়ে তুমুল হর্ষধ্বনির মাধ্যমে এই ঘোষণাকে অভিনন্দন জানান। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার ও জনসাধারণের ভূমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও মুজিব বাহিনীর জন্য ৭ ডিসেম্বর ছিল এক বিশেষ দিন। এদিন মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চল যশোর হানাদারমুক্ত হয়। যশোরের সর্বত্র উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সেদিন সরকারের নেতৃবৃন্দ ও মুজিব বাহিনীর কমান্ডাররাসহ আমরা বিজয়ীর বেশে স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রুমুক্ত প্রথম মুক্তাঞ্চল যশোরে প্রবেশ করি। জনসাধারণ আমাদের বিজয়মাল্যে ভূষিত করে। সে আনন্দ-অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অনেকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মুজিব বাহিনীর ভুল বোঝাবুঝির কথা বলেন। এটা সঠিক নয়। আমাদের হেডকোয়ার্টার ছিল কলকাতা বেইজড। আমি নিয়মিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। মনে পড়ে জেনারেল ওবানের কথা। তিনি দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং দিতেন। জেনারেল সরকার ও ডিপি ধর, যাঁরা আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে কো-অর্ডিনেট করতেন। সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত করে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংগঠিত ছিল মুজিব বাহিনী। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর (এফএফ) সঙ্গে একত্রে যুদ্ধ করে পাকিস্তান বাহিনীকে মোকাবেলা করাই ছিল মূলত মুজিব বাহিনীর কাজ।১৮ ডিসেম্বর আমি ও শ্রদ্ধেয় নেতা আবদুর রাজ্জাক- আমরা দু`ভাই হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসি। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করি। চারদিকে সে কী আনন্দ, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শ্রদ্ধেয়া ভাবি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারকে যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেখানে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে, দল-মত-শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে, আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ২২ ডিসেম্বর। বিমানবন্দরে নেতৃবৃন্দকে বিজয়মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই। ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিদের দোসর এ দেশীয় রাজাকার-আলবদর বাহিনীর ঘাতকরা। মনে পড়ে নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের কথা। মনে পড়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসউদ্দীন আহমদ, আনোয়ার পাশা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. আবুল খায়েরসহ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা। জাতির মেধাবী সন্তানদের হত্যা করার মধ্য দিয়ে ঘাতকরা আমাদের মেধাহীন জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল।আমরা সে সময় স্লোগান দিয়েছি, `জাগো জাগো বাঙ্গালী জাগো`; `পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা`; `তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা`; `বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো`; `জয় বাংলা` ইত্যাদি। সেদিন কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান এসব প্রশ্ন ছিল অবান্তর। আমাদের মূল স্লোগান ছিল- `তুমি কে? আমি কে? বাঙালি, বাঙালি।` আমাদের পরিচয় ছিল `আমরা সবাই বাঙালি`। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, যে পাকিস্তানের কারাগার বঙ্গবন্ধুকে আটকে রাখতে পারেনি; মৃত্যুদণ্ড দিয়েও কার্যকর করতে পারেনি। অথচ `৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত শক্তির দোসর খুনি মোশতাক-রশীদ-ফারুক-ডালিম চক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল! যে স্বাধীনতাবিরোধীরা মাকে ছেলেহারা, পিতাকে পুত্রহারা, বোনকে স্বামীহারা করেছিল; জেনারেল জিয়া তাদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সংবিধান থেকে উৎপাটিত করেছিল।একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করার জন্য গত বছরের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর কলকাতা গিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কলকাতার যে বাড়িতে আমরা ছিলাম- সানি ভিলা, ২১নং রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা, সেখানে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম ব্যারাকপুর। যেখানে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে আমি অবস্থান করতাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সীমান্তে নিয়ে তাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাতাম। গিয়েছিলাম ৮নং থিয়েটার রোডে। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠেছিল চার জাতীয় নেতা, যারা এখান থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালে বঙ্গবন্ধু যে হোস্টেলে থাকতেন, সেই বেকার হোস্টেলে গিয়েছিলাম। সেখানে `বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ` নামে একটি কক্ষ দেখে অভিভূত হয়েছি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানাদি যেখান থেকে পরিচালিত হতো, সেখানে গিয়েছিলাম। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠেছিল।বিশ্বের প্রধান প্রধান জরিপকারী সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশ হচ্ছে উদীয়মান ১১টি দেশের অন্যতম। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট মতে, সামাজিক খাতের অগ্রগতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, `সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে।` আমাদের রফতানি, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, বিদ্যুৎ উৎপাদন পাকিস্তান থেকে বেশি। আবার সামাজিক খাতে আমাদের গড় আয়ু ভারত-পাকিস্তান থেকে বেশি। মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, জন্মহার ভারত-পাকিস্তান থেকে কম। নারীর ক্ষমতায়নেও আমরা এগিয়ে। আমাদের দেশে এখন শতকরা ৮৫ জন বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে। অর্থাৎ সামগ্রিকতায় বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশমান। আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের আশাবাদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত `রূপকল্প` অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। ইতিমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। মহান বিজয় দিবসের ৪৭তম বার্ষিকীতে আজ গর্ব করে বলতে পারি, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। শিগগির বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। আজ দেশ অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে; কিন্তু ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী এবং যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সংবিধান পরিবর্তন করেছিল, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে যারা বাতিল করেছিল এবং যারা দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছিল- আজকে আমরা সেই স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে পুনরুদ্ধার করেছি। জাতির পিতার হত্যার বিচার শেষ করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের হত্যার বিচার করে ইতিমধ্যে অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, বাকিদের বিচারকার্য চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ আজ মর্যাদাশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা; দুই. বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। একটি তিনি পূর্ণ করে গিয়েছেন। আরেকটি আজকে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারএসএ/

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

বিজয় দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।আজ রোববার সকাল পৌনে ৮টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান তিনি।প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা।এর আগে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বঙ্গবন্ধু ভবনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন তিনি।এরপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনতা জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।এসএ/  

বিজয়ের সাজে সেজেছে রাজধানী

প্রতি বছর বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি স্মরণ করে মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ৪৭তম বিজয় দিবস পূর্ণ হলো এবার। আর এর  উপলক্ষে লাল সবুজ আলোয় সেজেছে রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশ। প্রকৃতিতে শীতের উপস্থিতি, দেশজুড়ে নির্বাচনি আমেজ অন্য দিকে বিজয়ের আনন্দ যেন কোটি বাঙালির হৃদয়কে আপ্লুত করে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। জনমনে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে। যেন আলোয় আলোয় মেখে দিয়ে সমস্থ কালো। সকালে ফুলে ফুলে সাজিয়ে দেবে শহীদ বেদী আর স্মৃতি সৌধ।  আর তাই তো নগরীর সব সরকারি স্থাপনা এখন ঝলমলে। এই চাকচিক্য চোখে পড়ার মতো। পথে পথে উড়ছে সারি সারি বিজয় নিশান।  বিজয়ের এ দিনটিকে স্মরণ করে রাখতে রাজধানী ঢাকাকে সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। আলোকসজ্জায় রঙিন ঢাকা যেন পরিণত হয়েছে একখণ্ড লাল সবুজের পতাকায়। শনিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,  নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্থাপনা, অফিস-আদালত সেজেছে বর্ণিল সাজে।  সন্ধ্যার পরই লাল সবুজের আলোতে ঝলমলিয়ে ওঠে পুরো রাজধানী। চোখ ধাঁধানো এ আলোকসজ্জার ঝলকানিতে মন কেড়েছে সবার। বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে লাল, নীল, হলুদ, সাদা,সোনালি, হরেক রঙের আলোর ব্যবহার করা হয়েছে। আলোকসজ্জার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযোদ্ধের বিভিন্ন প্রতীকী ও জাতীয় পতাকার আদলে এমন মোহনীয় সাজে সেজেছে রাজধানী ঢাকা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, ফার্ম গেট, সংসদ ভবন এলাকা, শেরে বাংলা নগর, শাহবাগ, বাংলামটর  মতিঝিল, পল্টন, দৈনিক বাংলা, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো আলোকসজ্জা করা হয়েছে। বিভিন্ন রঙ ও বর্ণের এসব আলোকসজ্জা উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনকাড়া এমন আলোকসজ্জায় মুগ্ধ অনেকেই। সড়কের ডিভাইডার ও ল্যাম্পপোস্টে লাগানো হচ্ছে বিজয় দিবসের বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন আর পতাকা। এ সব ব্যানার ফেস্টুনে রয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নের কথা ও জাতিকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা। এছাড়া বিজয় দিবসের পূর্ব মুহূর্তে পথে ঘাটে চলছে পতাকা বিক্রি। উৎসুক জনতা পতাকা কিনছে। বাঙালি জাতি প্রতি বছর এ দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে। এ দিনেই পাকিস্তানিরা এ দেশের বীর সন্তানদের কাছে মাথা নত করে বিদায় নেয়। ফলে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে বিশ্বে মানচিত্রে।   এসএইচ/          

১৫ ডিসেম্বর : খাগড়াছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস

আজ ১৫ ডিসেম্বর। খাগড়াছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে চেঙ্গীনদী বিধৌত এই খাগড়াছড়ি শত্রুমুক্ত হয়েছিল। সারাদেশের মানুষের মতো খাগড়াছড়ির পাহাড়ি বাঙ্গালী নির্বিশেষে মানুষ অংশ নিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে।সর্বশেষ ১৪ ডিসেম্বর গাছবান কুকিছড়ায় পাকবাহিনীকে হাটিয়ে ১৫ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির সবচেয়ে উঁচু স্থান এসডিও বাংলোর সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় খাগড়াছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী। এসময় গ্রুপ কমান্ডার অশোক চৌধুরী বাবুল, মংসাথোয়াই চৌধুরী, জুলু মারমাসহ অনেকেই সঙ্গে ছিলেন।এর আগে ২৭ এপ্রিল মহালছড়িতে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। পরে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতায় করায় মহালছড়িতে চিত্তরঞ্জন চাকমাসহ চার পাহাড়িকে হত্যা করে পাকবাহিনী।এদিকে খাগড়াছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। সকালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আলোচনা সভা ও র‌্যালি বের করবে।এসএ/  

তারাই আমাদের বাতিঘর

আবার এসেছে ফিরে ডিসেম্বর। শোক, শক্তি ও সাহসের মাস, আমাদের অহঙ্কারের মাস। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- কী অমূল্য আমাদের এই স্বাধীনতা। ১৪ ডিসেম্বরের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের শোক আমাদের ১৬ তারিখের বিজয় উলল্গাসের মাঝেও মনে করিয়ে দেয় কত লক্ষ প্রাণের দামে কিনেছি এই ভূমি। এ সময়টাই শ্রেষ্ঠ সময় নিজের বিবেকের পরিশুদ্ধতা যাচাই করার। সেই সঙ্গে আবার ভেবে দেখার সময় যে, কত কষ্টে বাঙালি তার নিজ ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জন করেছে। এবারের ডিসেম্বর সেই যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসের শেষেই ভোটের মাধ্যমে আমাদের নতুন সরকার নির্বাচিত করতে হবে। এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার ভোট দেবেন। এই তরুণদের ভোট দেওয়ার প্রাক্কালে একজন শহীদ-সন্তান হিসেবে আমি কিছু কথা বলতে চাই। নিশ্চিতভাবে, একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশই হবে এই প্রজন্মের মুখ্য চাওয়া। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইবে, খুলে দিতে চাইবে নিজের সম্মুখের সব দ্বার, বহির্বিশ্বের সঙ্গে পালল্গা দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিম লে মাথা উঁচু করে নিজেদের স্থানটি করে নিতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য তাদের নিজেদের কী করণীয়, তারা কি সেটা জানেন? সেটা নিয়ে কি তারা ভাবছেন? আমরা কি সেটা তাদের কাছে উপস্থাপন করেছি? নীতিনির্ধারণের সময় তাদের কি আমরা যুক্ত করছি? জাতীয় জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজে তরুণদের সংযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ দৃষ্টি দিতে চাই আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের কাছে জাতির প্রত্যাশার ওপর। একটি ভোট শুধু একটি সরকার বদল করে না, সেই সঙ্গে একটি জাতির যাত্রার গতিপথ পরিবর্তন করে দিতে পারে। এমনকি, সম্মুখ যাত্রার পথ রুদ্ধও করে দিতে পারে। নিজের একটি ভোটের ক্ষমতা কত বিশাল তরুণ প্রজন্মকে তা অনুধাবন করতে হবে। এই বাংলাদেশে, ১৯৯১-এর নির্বাচনের ভোট যুদ্ধাপরাধীদের সরকারের অংশ হওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের খুনিদের গাড়িতে তুলে দেওয়ার পথ খুলে দেয়। কী দুঃখজনক এই ঘটনা! শুধু এবার নয়, ভবিষ্যতে এ দেশে আর কোনো ভোট যেন তেমন ভুলের ক্ষেত্র তৈরি করতে না পারে কোনোদিন, সে জন্য আজকের তরুণদের সচেতন করতে হবে। তরুণদের জানাতে হবে, তাদের হাতের একটি ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বোঝাতে হবে প্রতিটি জনগণের হাতের এক একটি ভোট, শুধু সরকার নয়, সমাজ বদলের কত বড় হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্মকে তাই সঙ্গতভাবেই ভাবতে হবে, কীভাবে তারা তাদের হাতের ভোটটির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারেন। এর স্পষ্ট উত্তর পূর্বপুরুষের রক্তের প্রতি অনুগত থেকে ভোট দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষে আজীবন থাকতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে শোষণহীন, বঞ্চনাহীন, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল দেশের স্বপ্ন দেখে আমাদের স্বজনরা অকাতরে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, সেই আদর্শই আমাদের পথ চলার বাতিঘর হয়ে থাকবে আজীবন। এর থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না কখনই, কোনো কারণেই। এই আদর্শের ভেতরেই থাকতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে। একজন শহীদ সন্তান হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যুদ্ধাপরাধীদের দল বা তার সহযোগীদের বাক্সে নিজের পবিত্র আমানত হাতের ভোটটি তুলে দিয়ে তারুণ্য তার রক্তের ঋণের সঙ্গে বেইমানি করবে না, তারুণ্যের দ্রোহের যে গর্ব তাকে অপমান করবে না। তাই আমি দু-একটা স্লোগান এখানে উচ্চারণ করব, যা এখন খুব উচ্চারিত হচ্ছে রাজপথে ও ভার্চুয়াল মিডিয়াতে, যা আমার মনে হয়েছে তরুণদের জন্য খুব প্রযোজ্য। উচ্চারিত হচ্ছে, `তরুণ ভোটার প্রথম ভোট, স্বাধীনতার পক্ষে হোক`। স্লোগান উঠেছে, `আমার ভোট আমি দিবো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দিবো`। আমার মনে হয় এই স্লোগান দুটোতে স্পষ্ট বলে দেওয়া আছে তরুণদের প্রতি জাতির আকাঙ্ক্ষার কথা। এ দেশের সব আন্দোলনে তরুণরাই ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। `৫২, `৭১, `৯০- তাদেরই রক্ত ঝরেছে সর্বাধিক। তাদের পূর্বসূরি সব শহীদের পবিত্র রক্তের প্রতি অনুগত থেকে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তরুণ ভোটাররা যুদ্ধাপরাধী, তাদের সন্তান অথবা তাদের আশ্রয় দেওয়া দল বর্জন করবেন- দৃঢ়ভাবে আমি বিশ্বাস করি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভোট দিয়ে, চলমান উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পথে থাকতে সাহায্য করে জাতির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তরুণরা তাদের পবিত্র দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন- এই কামনা করি। লেখক: ডা. নুজহাত চৌধুরী  শহীদ বুদ্ধিজীবী আলীম চৌধুরীর কন্যা; সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।  

ইটিভিতে আজ তথ্যচিত্র ‘ঢাকার গণহত্যা’

আজ ১৪ ডিসেম্বর। একুশে টেলিভিশনে রাত সাড়ে ৯টায় সম্প্রচার হবে তথ্যচিত্র ‘ঢাকার গণহত্যা’। এটি নির্মাণ করেছেন রঞ্জন মল্লিক। পরিচালক রঞ্জন মল্লিক এক সাক্ষাতকারে তার নির্মিত তথ্যচিত্রের কথা বলতে গিয়ে দর্শকদের কাছে কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন। যা নিচে দেওয়া হলো :১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে প্রহসনের সৃষ্টি করে। ২৫ মার্চ নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাঙালি নিধনের নীল নকসা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান চলে যান। রাত ১১.৩০ মিনিট, ঢাকার নিরস্ত্র বাঙালির উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রথমেই তারা ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে। জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, কলা-ভবন, ইকবাল হল বর্তমান সার্জেন্ট জহিরুল হক হল সহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।এ সময় জগন্নাথ হলের দেওয়াল ভেঙ্গে বিকট শব্দে সামরিক কনভয় প্রবেশ করে। আকাশে সার্চ লাইট জ্বালিয়ে প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু করে। হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জ্যোর্তিময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য সহ হলের ৬৬ জন ছাত্র শিক্ষক কর্মচারিকে হত্যা করে। তা ছাড়া নাম না জানা অনেকেই সেই রাতে আহত ও নিহত হন। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি দেশের সেনাবাহিনী সেই দেশেরই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে আক্রমণ চালাতে পারে- এমন নজির বোধ হয় স্মরণকালের ইতিহাসে কোথাও নেই। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে সেই জঘন্যতম লজ্জাজনক কাজটি করেছিলো। পাকসেনারা রোকেয়া হল আক্রমন করে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো।তিনশত বছরের পুরানো  মন্দির শ্রী শ্রী রমনা কালিবাড়ি। এ মন্দিরটির উচ্চতা ছিলো ১২০ ফিট। বহুদূর থেকে মন্দিরের চূড়া দেখা যেত। মন্দিরের চারিদিকে জনবসতি ছিল। ২৭ মার্চ গভীর রাতে পাকসেনারা মন্দিও আক্রমণ করে। মন্দিরের পুরোহিত শ্রী পরমানন্দ গিরি সহ ৬০/৬৫ জনকে হত্যা করে।১৯৭১ সালে মীরপুর ছিলো শহর সংলগ্ন গ্রামাঞ্চল। স্বাধীনতার পর এখানে দশটি বধ্যভূমির সন্ধান মেলে।  কালাপানি বধ্যভূমি, রাইন খোলা বধ্যভূমি, শিরনির টেক বধ্যভূমি, সারেং বাড়ি বধ্যভূমি, গোলার টেক বধ্যভূমি, বাংলা কলেজের আম বাগান বধ্যভূমি, আলোকদি বধ্যভূমি, মুসলিম বাজার বধ্যভূমি, শিয়াল বাড়ি বধ্যভূমি ও জল্লাদ খানা বধ্যভূমি। বুদ্ধিজীবী হত্যার একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ পূর্বদেশ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। ঐ ডায়েরিতে লিখা  ছিলো  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন শিক্ষক, শিক্ষিকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকের নাম। এবং শিক্ষকরা কোয়াটারের কত নম্বর বাড়িতে থাকেন তাও উল্লেখ ছিল। ডায়রিতে আরো লিখা ছিলো জল্লাদ বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মঈনউদ্দিন, কমান্ডার শওকত ইমরান, সিটি বদর বাহিনীর প্রধান শামসুল হকের নাম।মানুষ হত্যা করে শহরময় অতংক সৃষ্টি ছিলো পাক সেনাবাহিনীর প্রধান কাজ। পুরানো ঢাকার শাঁখারি পট্টির অপ্রশস্ত রাস্তার উভয় প্রান্তে খান সেনারা অবরোধ করে ঘরে ঘরে হানা দেয়। এ সময় তারা নির্বিচারে নারী পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে।১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমি আবিস্কৃত হয়। সেদিন রায়র বাজারের বিভিন্ন গর্ত থেকে প্রচুর সংখ্যক লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে অধ্যাপক, ডাক্তার,সাংবাদিক,সাহিত্যিকেরই লাশ ছিলো বেশি।  মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউট ছিলো আর এক নির্যাতন আর হত্যা  কেন্দ্র। আল-বদর বাহিনীর এই হেড কোয়াটারে অসংখ্য মানুষকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে পরিচিত শত শত অধ্যাপক, চিকিৎসক ও ডাক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এখানে ডেকে এনে হত্যা করা হতো। হত্যার পর অধিকাংশ লাশেরই চোখ উপরানো থাকতো।পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যাকান্ডের সামান্যচিত্রই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা শহরের সবগুলো গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হলে হয়তো দেখা যাবে ঢাকাতেই লক্ষ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন।পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই নির্মম হত্যাকান্ড জাতি কখনো ভুলবে না। আন্তর্জাতিক আদালতে গণমানুষের হত্যার বিচার অবশ্যই আমরা চাইবো।এসএ/    

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অম্লান পথরেখা ফিরে দেখা

ডিসেম্বর শুধু বিজয়ের নয়, বেদনারও মাস। এ বিজয়ের পেছনে রয়েছে এ দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীসহ ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, কয়েক লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রম হারানো, অগ্নিসংযোগে লাখ লাখ বাড়িঘর ভস্মীভূত হওয়া ও এক কোটি জীবন বিপন্ন মানুষের ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণের মতো নজিরবিহীন বিয়োগান্ত ঘটনা। পাকিস্তানি হানাদাররাই শুধু এ অপরাধ সংঘটিত করেনি, পাকিস্তানপন্থি ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও পিডিপির নেতাকর্মীরা তাদের দোসর হিসেবে মানুষ হত্যাসহ এসব জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ নেয়। এদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক। গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের পাশাপাশি তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা ধরে হত্যা করে। এ জন্য ইসলামী ছাত্রসংঘের উদ্যোগে সৃষ্টি হয় আলবদর, আলশামস নামে বিশেষ ঘাতক বাহিনী। এ কুখ্যাত বাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী ড. মুনীর চৌধুরী, ড. আবুল খায়ের, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. আনোয়ার পাশা, ড. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. রাশিদুল হাসান, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামুদ্দীন আহমেদ, এমএ মান্নান ওরফে লাডু ভাই, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, মুহাম্মদ আখতার, সেলিনা পারভীন, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. মুর্তজা, ডা. ফজলে রাব্বী প্রমুখ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এসব বুদ্ধিজীবীকে নিজ বাসা থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে অনেককে প্রথমে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (বর্তমান মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ) টর্চার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের ওপর নির্যাতন শেষে ১৪ ডিসেম্বর মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় একেক করে প্রথমে গুলি ও এরপর বেয়নেট চার্জ করে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর `অপারেশন সার্চলাইট` নামে গণহত্যা শুরুর রাতে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে অনেক বুদ্ধিজীবী অনুরূপ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সব শহীদ বুদ্ধিজীবীর আত্মদানের প্রতি জাতির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্বাধীনতা অর্জনে তাদের অমূল্য অবদান চিরস্মরণীয় করে রাখতে স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধু সরকার ১৪ ডিসেম্বরকে `শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস` হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকে শুরু করে যথাযোগ্য মর্যাদায় সমগ্র জাতি দিবসটি পালন করে আসছে। বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের পাশাপাশি এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা খুবই সক্রিয় ও মূল্যবান অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর জামায়াত-আলবদর-আলশামস-ইসলামী ছাত্রসংঘ নিজেদের পরাজয়ের প্রতিশোধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বশূন্য করার হীন লক্ষ্যে বেছে বেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রের এ দেশের সেরা মেধাবী সন্তানদের নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এত কিছুর পরও `৭১-এর ঘাতক-খুনিচক্র বাংলাদেশের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি। বাংলাদেশ শুধু ওঠে দাঁড়ায়ইনি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের এক বিস্ময়, রোল মডেল। জেনারেল জিয়া-এরশাদ সামরিক জান্তা, বিএনপি ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে নানা আনুকূল্য ও কৌশলের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী এ অপশক্তি বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপচেষ্টা করেছে। এখনও সে অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আদালত কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীকে মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন বাতিল এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে এর অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ইতিমধ্যে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা ছেড়ে ধানের শীষ এবং পরোক্ষভাবে ড. কামাল হোসেনের বৃহত্তর ঐক্যের ছায়াতলে আজ তারা আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এরা স্বাধীনতার শত্রু, দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু, প্রগতির শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, উন্নয়নের শত্রু। এরা খুবই নিষ্ঠুর, প্রতিশোধপরায়ণ ও ফ্যাসিবাদী। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী, মানুষ হত্যাকারী, নারী ধর্ষণকারী চিহ্নিত এই গোষ্ঠীর নির্বাচন তো দূরের কথা, সাধারণ রাজনীতি চর্চারও অধিকার থাকার কথা না, থাকতে পারে না। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, কয়েক লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রম ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ বাংলাদেশে এদের ঠাঁই নেই। এদের ও এদের ছদ্মবেশী, মুখোশধারী পৃষ্ঠপোষক-আশ্রয়দাতাদের সম্বন্ধে দেশবাসী সাবধান। লেখন: ড. হারুন-অর-রশিদউপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি