ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ৪:১৫:০২

ফাঁস

ফাঁস

  বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। উপন্যাসটি ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করছে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে পুরো উপন্যাসটি। এক # সবুজের চোখে চিত্রা ছিল সুন্দরী, রুপকথার রাজকন্যা, মোনালিসা, ক্লিওপ্রেট্টা ।চিত্রা সবুজের একক সিদ্ধান্তের, একক পছন্দের বউ । সবুজের বাবা মা চেয়েছে, মধ্যবিত্ত ঘরের কোন শিক্ষিত সুন্দরির সাথে সবুজের বিয়ে দিতে । পাত্রীও নির্বাচন করা হয়ে গেছে । বি এ পড়ুয়া মেয়ে, গায়ের রং হলুদ বাটা ফর্সা নয়, তবে চোখ নাক ঠোঁট চুল সব মিলিয়ে মেয়েটাকে এক কথায় সুন্দরীই বলা যায় । সবুজ মেয়েটাকে দেখে, মেয়ের বাবা মা সবাই শহরে থাকে । নিজের বাসায় নয়, সরকারী বাসায় ।মেয়ের বাবা একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রধান হিসের রক্ষক হিসেবে কাজ করে । মেয়ের মা পড়ালেখা  জানা শিক্ষিত মহিলা ।মেয়ের ভাইবোনেরা সবাই স্কুল কলেজে পড়ে । সব মিলিয়ে পরিবারটি মার্জিত রুচিশীল মধ্যবিত্ত ঘর ।সবুজ সব শুনে, মেয়েটির একটি ছবিও সে নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখে । ছবির মেয়েটি সবুজের পছন্দ হয় ।  দিন ক্ষন ঠিক করে, বেশ কিছু সময়, সবুজ আলাদা ঘরে মেয়েটার সাখে কথা বলে ।শহরে থাকলেও মেয়েটা একটু ভিন্ন আদলে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে । শিক্ষা সংস্কৃতিতে, সংযত ও শালনিতায় সে বিশ্বাসী । সাধারণ একটা স্যালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় কাপড় টেনে মেয়েটা সবুজের সামনা সামনি চেয়ারে বসে । মুখে ঠোঁটে সামান্য রংয়ের প্রলেপ, চুল গুলো ঝুটিতে বদ্ধ হয়ে ওড়নার চাপে স্থিত ।মেয়েটার চেহেরাটাও কেমন লাজুক লাজুক ।সবুজের সামনে একাএকা বসে থাকতে তার একটু অস্বস্থিই লাগে । তবু মাথাটা হালকা একটু নিচু করে মেয়েটা চুপচাপ বসে থাকে । সবুজ মেয়েটার সাথে কথা বলে । মেয়েটা কথার উত্তর দেয়, মেপে মেপে ধীর শান্ত গলায় ।কথা বলার সময় মেয়েটার ঠোঁটের কোন, চোখের তারায়ও কোন ধরনের ঝিলিক খেলা করে না ।  সবুজ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মেয়ে দেখেছে । বন্ধু হিসেবে, প্রেমিক হিসেবে অনেকের কাছাকাছি ও এসেছে ।গল্প হয়েছে, হাসি তামশা হয়েছে ।বলা যায় প্রতিটি মেয়ে ছিল রুপে রংয়ে নকঁশায় জীবন্ত প্রজাপতি । সারাক্ষণ উড়ুউড়ু মন, দেহ বল্লরীর ভাঁজে পোশাকের বাহারিত্ব, কথার ছলাকলা, চোখের চঞ্চলতা, ঠোঁটের কোনে  বিটকেলে হাসি, ক্ষনে ক্ষনে মুখাবয়বের পরিবর্তন, এই মেঘের ছায়া,এই আবার নবর্সূযের সতেজ রাঙা আলো । মেঘ জড়ানো খোলাচুল, পদ্ম কুসুম খোঁপা, সর্পদোলা লম্বা বেনী । কারো আবার কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে কত রং, বাহাদুরি সব কিসব কাট । সবুজ বইতে পড়ে, নিজ চোখে দেখে, মেয়েরা হচ্ছে বহতা নদী, পাহাড়িয়া ঝর্ণা, ওড়ন্ত প্রজাপতি,  ভোরের আকাশে স্নিগ্ধ বৃষ্টি ফোটা । কিন্তু, সবুজ হিসেবটা মেলাতে পারে না । এই মেয়ে তো ওর মা চাচীদের মতো অনেকটা গেঁয়ো প্রকৃতির, বদ্ধ ডোবা, গতিহীন ঢেউহীন. বড় বেশি ঘোলাটে ।   সবুজের অভিজ্ঞতায় বিবেচিত হয়, মেয়েটা বোকা, ক্ষেতমার্কা ।শিক্ষা থাকলেও আধুনিক স্যের্ন্দযবোধ,উন্মুক্ত সংস্কৃতি এসব বিষয়ে তার ছিটে ফোটা জ্ঞানও নেই ।তার চোখে চাহনিতে নেই একবিংশ শতকের উন্মুক্ত প্রেম, কথার ভেতর আহ্লাদি ঢেউ নেই, স্রোত নেই ।মেয়েটাকে তার খুব একটা পছন্দ হয় না । সবুজের মা গ্রামের মেয়ে ।ভদ্র আচরণ, লাজুক স্বভাব, চলনে বলনে ধীর স্থির স্বভাবের মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলে আনতে তার ইচ্ছেটা বেশি । সবুজ নিজেও বড়বেশি মাতৃভক্ত । মা বাবার সাথে নিজের বিয়ে নিয়ে বেশি কথা বলতে সবুজের একটু আধটু লজ্জা করছে । তার বড় দুইভাই তো চোখ মুখ বন্ধ করে পিতৃআজ্ঞা পালন করে গেছে । মেয়ে নয়, ছবি দেখেই নিজেদের ভবিষ্যত বেছে নিয়েছে, মা বাবার ইচ্ছেয় সম্মতি জানিয়েছে । তবুও তার ভাগ্য হাজার গুণ ভালো । তার সাথে বিয়ের মতো একটা লজ্জাকর বিষয় নিয়ে বাবা মা তার সাথে কথা বলছে ।  তাই মাতৃ- আজ্ঞায় আদিষ্ট হয়ে সবুজ মেয়েটাকে অপছন্দ করতে পারে না । আংটি বদলের মধ্যে দিয়ে সবুজের মা-বাবা বিয়ের সব পাকা কথা বলে আসে ।মাকে হ্যাঁ বলার পরেও সবুজের মনের ভেতর কিছু একটা সুঁইযের মত সারাক্ষন বিঁধতে থাকে । কাছের বন্ধুদের সাথে মেয়েটার রুপ গুন নিয়ে আলোচনা করে । এক বন্ধুর পরামর্শে সবুজ মেয়েটার পেছনের বাড়ির খোঁজ খবরে মেতে ওঠে । খবর যা পাওয়া যায়, তাতে সবুজের মন বিগড়ে যায় । সবুজ তার মাকে বলে, ঐ মেয়েকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয় । সবুজের বাবা বলে, কেন, কি অপরাধ মেয়েটার? সবুজ তার বাবাকে কিছু বলে না । সবুজ জানে, বাবা মেয়ের বংশ লতিকার গল্প শুনতে চাইবে না ।শুনলেও তা বিবেচনার গুরুত্বে আনবে না । উল্টো, মানুষের জন্ম, মনুষ্যত্ব, তার শ্রেষ্টত্ব এসব বিষয়ে একগাদা নীতিকথা সবুজকে শুনিয়ে সবুজের মুখ বন্ধ করে দেবে । সবুজ ফিসফিসিয়ে তার মাকে গোয়েন্দা রিপোর্ট শুনায় । মেয়েটার জাত পরিচয় খুব একটা ভাল নয়, যদিও মেয়ের বাবা একটা সরকারী অফিসে ভালো চাকুরি করে ।মেয়ের দুই ভাই আছে, বড়টা ডাক্তারী পড়ে, ছোট টা এখনো স্কুলে পড়ছে । মেয়েটার আরো একটা বোন প্রাইমারিতে পড়ে । এই টুকুতে সবুজের আপত্তি ছিল না । সম্যসাটা হয়, মেয়ের চাচা জেঠাদের নিয়ে । তারা সবাই গ্রামেই থাকে, পড়ালেখাও বিশেস জানে না । জমি চাষ করে, একজন নাকি গ্রামে রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকান চালায় । আড্ডা, গালগল্পে তাদের দিন পার হয় । গর্বকরে বলার মতো কোন বংশ পরিচয়ও তাদের নেই ।গ্রামের বাড়িতে তাদের কোন ভালোমানের একটা ঘরও নেই, এমনকি মেয়ের বাবার একটা ঝুপড়িও নেই ।মেয়েটার বাবাকে গ্রামের লোকেরা কেউ ভালো করে চেনেও না । সবুজ ইচ্ছে করে একটা ভয়ঙ্কর মিথ্যাও তার মাকে বলে ।মা. আমি মেয়েটার এক নিকট আত্মীয়ের কাছে শুনেছি, মেয়েটা শারীরিক ভাবে অসুস্থ । সারা বছর নানা রোগে ভুগে । সবুজের বাবা সবুজকে বলে, মেয়ের পুর্ব পুরুষের এতো ইতিহাস আর মেয়ের বাবার ধন সম্পদ আমাদের জানার দরকার নেই ।আমাদের দরকার একটি সুন্দর মনের মেয়ে, । মেয়েটিকে আমি দেখেছি, কথাও বলেছি, বড়বেশি সহজ সরল । বাবা, কিন্তু, মেয়েটা যে অসুস্থ । একটা অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আমি, মেয়েটা অসুস্থ নয়, যে তোমাকে এই কথা বলেছে, সেই লোকটাই মানষিকভাবে অসুস্থ ।অসুস্থ মানষিকতার লোকদের কথায় কান দিও না, মেয়েটাকে বিয়ে করলে তোমার ভাল হবে, আমি বলছি, জীবনে তুমি সুখি হবে । সবুজের মা গ্রামের সহজ সরল মহিলা । নানা সংস্কার-কুসংস্কারে তার মন নানা সুতোয় শক্ত করে বাঁধা । ছেলের অমঙ্গলের কথা ভেবে সে বলে, বাবা, আমরা ওদেরকে পাকা কথা দিয়ে এসেছি ।বিয়ের একটা তারিখও হয়ে আছে । এই সময়ে যদি, ওরা এই দুঃসংবাদ পায়, তাহলে যে, মেয়েটার অভিশাপ লাগবে, মেয়ের মেয়ের মায়ের বুকফাটা শাপ আর চোখের জলে তোকে সারা জীবন হাবুডুবু খেতে হবে । সবুজ গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে । কোন কথা সে বলে না । সবুজের বড়ভাবী বলে, তুমি তো আমাকে বলেছিলে, কোন একটা মেয়ের সাথে তোমার কি একটা সম্পর্ক আছে, এই মেয়ে যদি তোমার পছন্দ না হয়, তাহলে তোমার সেই পছন্দের মেয়েটাকে বিয়ে করে নাও । সবুজ হঠাৎ থমকে যায় । বাবা মায়ের সামনে এই ধরনের কথা বলতে সবুজ অভ্যস্ত নয় । গম্ভীর স্বরে বলে, ভাবী, তুমি যে কি বলো না ।আমি আবার, সবুজের বাবা নিজ বিবেচনায় স্থান ত্যাগ করে । মা চুপটি করে বসে থাকে । মুখ লুকাতে হবে না । ডুবে ডুবে তো বহু জল খেলে । এবার প্রকাশ করো, তোমার ঐ মুক্তা না ফুক্তা, যাকে তুমি নিজের চেয়ে বেশি ভালবাস বলে আমাকে বার কয়েক বলেছিলে । সবুজ ভাবীকে চোখ ইশারায় কিছু একটা বলতে চায় । ভাবী তার ইশারা বুঝেও বুঝতে চায় না । মুক্তা সবুজের কততম প্রেম, সবুজ নিজেও তা জানে না । সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে সে বহু মেয়ের প্রেম নদে একা একা হাবুডুবু খেয়েছে ।কত মেয়েকে প্রেমপত্র দিয়েছে । কিন্তু একটা চিঠির উত্তরও আজ পযর্ন্ত সে পায় নি সবুজ । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হঠাৎ করে মুক্তা আসে । রুপে রংয়ে অতি সাধারণ একটা মেয়ে ।সবুজের সাথে একই বিভাগে পড়ে । সবুজের দুই বছরের জুনিয়র ।পরিচয়, আলাপ, তারপর বোধহয় একটু কাছাকাছি আসা, গল্প আড্ডা, রিক্সায় চড়ে বিকেলের হাওয়া খাওয়া,টং দোকানে দাঁড়িয়ে বসে চটপটি ফুসকা খাওয়া । ভালই চলছিল দিনের সাক্ষাৎ আর রাতের নির্ঘুম স্বপ্ন কল্পনা গুলো ।কিন্তু হঠাৎ করে কি যে হয়, সবুজ তার ভেতরের কষ্টটাকে কোন রকমে চাপা দেয় । সবুজ হাসে, বলে, ভাবী, সম্পর্ক টম্পর্ক আসলে ঐগুলো কিছু না, সময় পার করার জন্য এই বয়সের ছেলে মেয়েরা সবাই কম বেশি এক আধটু এসব করে থাকে । ওখানে প্রেম বা ভালবাসা খুব একটা বেশি থাকে না ।মেয়েটা আমার জুনিয়র । আসলে আমার নোট ফোট নিয়ে একটু আধটু নাড়াচাড়া করতে ভালবাসত, সেই সুবাদে আমরা দুইজন একটু কাছাকাছি ছিলাম ।  বড় ভাবী সবুজের কথায় আহত হয়, বলে, তুমি বড় বেশি দেমাগী, অত দেমাগ কিন্তু ভাল নয়, নিজের দেমাগের আগুনে একদিন নিজেই জ্বলে পুড়ে মরবে, এই আমি বলে রাখলাম ।  সবুজ মায়ের, ভাবীর এইসব কথা মানে না, বিশ্বাস করে না । সবুজ তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, সবুজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক ছেলে । সে ভাল করে জানে, মা বাবার কথা মেনে নিলে তার জীবন গরুর গাড়ির চাকা হয়ে ধূলো কাদায় ঘুরপাক খাবে । জীবনের ভোগ বিলাস, সুখ আহ্লাদ, কিছুই হবে না ।সুখের আশায়, বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্নে বিভোর থেকে, সবুজ তার মা বাবার কোন আদেশ উপদেশ কানে তুলে না । সবুজ এই যুগের ছেলে । আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত,শিক্ষার ধাক্কায়  গ্রাম্য আচারে সংস্কার বিশ্বাসের প্রতিও তার বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অনক কমে গেছে ।মায়ের মুখে অন্যের অভিশাপের কথা শুনে, সে মনে মনে হাসে ।সবুজ ভাল করেই জানে মা বাবার জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে চলতে গেলে, জীবন চাকা সবুজের ইচ্ছেয় চলবে না ।বর্হিবিশ্বের রুপসৌর্ন্দয, জাগতিক জীবনের বিত্ত বৈভব, সুখ আহ্লাদ, কিছুই  আর তার ইহজনমে হয়ে ওঠবে না । আর মনে মনে বলে, দেমাগ, ভাবী, দেমাগ তো থাকতে হবে ।দেমাগ দেখানোর জন্য যোগ্যতা থাকতে হয় । সে যোগ্যতা সবুজ অর্জণ করেছে ।তোমাদের মতো গ্রামীন সংস্কার বিশ্বাসকে বেদবাক্য মানলে, জীবন আমার গরুর গাড়ি চাকা হয়ে এই মাটির কাঁদা ধুলায় গড়াগড়ি খাবে । সবুজ গরুর গাড়ির চাকা হয়ে বেঁচে থাকার চন্য এত কষ্টকরে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ করে নাই ।সবুজের জীবন লক্ষ্য, সুখের আশায়, ভোগবাদি জীবনের লালসায় সবুজ মা বাবার পছন্দের মেয়েকে স্পষ্ট ভাষায় না বলে দেয় । সবুজের এই না ধ্বনিতে তার মা বাবা আহত হয় । মেয়ে বাড়ির লোকজন ছুটাছুটি করে । কেন, কি দোষে, কোন অপরাধে, একটা মেয়ের জীবনে এতবড় কলঙ্ককালিমা টিপ সবুজের পরিবার পরিয়ে দেয় । উত্তরহীর মুখে সবুজের পরিবার মাথা নিচু করে, মেয়ে বাড়ির লোক জনদের নানা কূটকাটব্য শুনে যায় ।  ++++++++++++++দুই++++++++++++++++++++ সবুজ নিজের মতো করে মেয়ে খুঁজে বেড়ায় ।বন্ধুরা সবুজের জন্য হন্য হয়ে মেয়ে খোঁজে । মেয়ে পাওয়া যায়, মেয়ে পছন্দ হয়, কিন্তু, মেয়ের পরিবার পছন্দ হয় না ।আবার কোনটার পরিবার পছন্দ হলে, মেয়েটা সবুজের মনোমত হয় না । পছন্দ অপছন্দের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সবুজের বসন্ত বন থেকে এক বছরের বেশি সময় হাওয়া হয়ে ওড়ে যায় । হঠাৎ এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, দুর সম্পর্কীয় সবুজের এক খালাত ভাই সবুজকে নিয়ে চিত্রাদের বাড়িতে হাজির হয় । সবুজ বলে, এই বাড়িটা মেয়ের বাবার ।শহরের বুকে, বেশ খোলামেলা জায়গায় বাড়িটা দেখতেও বেশ সুন্দর।মেয়েদের নিজের গাড়ি আছে ।পরিবারও তোর পছন্দ হবে ।সবাই খুব হাসি খুশি মিশুক । গাড়ি বাড়ির মালিক হলেও মনের ভেতর কোন অহংকার নেই । চিত্রার মা বাবার সাথে সবুজের সাক্ষাৎ হয় ।চিত্রার সাথে সবুজের দেখা হয়, কথা হয় ।চিত্রা গান করতে পারে না, কিন্তু কণ্ঠস্বর বড়বেশি সুরেলা, আহ্লাদে ভরা, ভারি মিষ্টি । চিত্রার চোখে মুখে চড়ুই পাখির অস্থিরতা । আর গায়ের রং স্বর্ণলতার মতো হলুদ । চিত্রা রুপবহ্ণি, চোখে তার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, হাসিতে মুক্তো ঝরছে । চিত্রা বড়বেশি কথা বলে, কলকলিয়ে নদীস্রোতের মতো সেই শব্দধ্বনি । মিনিট দশ পনরের মধ্যে চিত্রা তার ভেতর বাইরের সব সৌর্ন্দয সবুজকে জানিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় । সবুজ কোন কথা বলে না, বলার সুযোগ সে পায় না । চিত্রা বলে, সবুজ শুনে যায় ।সবুজ মুগ্ধ, বিমোহিত, এরকম চঞ্চলা হরিনীকে তো সবুজ মনে মনে এতদিন খোঁজে ফিরছে । শুধু চিত্রাকে নয়, চিত্রার পরিবারও সবুজের পছন্দ হয় ।  চিত্রার বাবা ছোটখাট একজন ব্যবসায়ী ।সপরিবারে শহরে থাকে । নিজের কেনা জমিতে একতলা দালান, গাড়ি আছে, বাসায় কাজের ছেলে মেয়ে আছে ।ভদ্রলোকের দুই মেয়ে, দুই ছেলে । চিত্রা সন্তানদের মধ্যে প্রথম । চিত্রার বাবা সবুজের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে ।চৌদ্দজাতের মানুষ নিয়ে তার কারবার ।মিনিট কয়েকে সবুজেকে চিত্রার বাবা চিনে নিতে ভুল করে না ।গ্রামের ছোপ ছোপ সবুজমাখা সবুজের ভেতরটা পড়ে আসতে তার খুব একটা অসুবিধা হয় না ।   চিত্রার বাবা হাস্যমুখে সবুজের কাছে নিজ পরিবারের গল্প করে যায় । কোন কথা গোপন রাখে না । বলে, দেখ বাবা, আমিও গ্রামের ছেলে, পরিশ্রম আর সাধনায় আমি আজ এখানে এসে, হা হা হা । চিত্রার বাবা খুব হাসিখুশি মানুষ । মুখে তার হাসি লেগেই থাকে ।চিত্রার বাবা হাসতে হাসতে বলে, মেয়ে দুটি হয়েছে, সালেহার মতো, আমার স্ত্রী, বুদ্ধিমান, বেশ চালাক চতুর ।প্রথম জীবনে চাকরি করেছি, মাসগোনা   পয়সায় সালেহার মন ভরে না । ওর জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে শুর করি ব্যবসা । হা হা । ভাল আছি, সুখেই আছি ।  আর একটা কথা, তুমি নিশ্চয় শুনেছ, এসব কথা তো লুকিয়ে রাখা যাবে না, দুর্গন্ধ তো সবার আগেই ছড়ায় । না শুনলেও দুই একদিনের মধ্যে শুনে যাবে । বলার লোকতো আর কম নেই । তার চেয়ে আমার মুখে শুন, আমার ছোট মেয়ে, নাম, চয়না,  সে কলেজে ভর্তি হতে না হতেই এক ছেলেকে তার প্রেমের ফাঁদে আটকে নিয়ে বিয়ে করে বসেছে । চিত্রার বাবা আবারও হা হা করে হাসে । বলে, আমি বাবা হয়েও বুঝতে পারি নাই, আমার মেয়ের পেঠের ভেতর এত বুদ্ধি ।বুঝেছ বাবা, ছেলেটা পুলিশ বিভাগে চাকরি করে । ফ্যামেলিও ভাল । বুঝতে পারছ, কি বিচক্ষন মেয়ে আমার, একটা জ্বলজ্যান্ত পুলিশ অফিসারের গলায় ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে ।যেখানে পুলিশ, চিত্রার বাবা আবারও শব্দ করে হাসে । তুমি কি এবার একটু চুপ করবে । চিত্রার মা বলে । চিত্রার মা কিন্তু এখনো মেয়ে জামাইকে স্বীকার করে নেয় নাই । অপেক্ষা করছে, পুলিশ বিভাগে চাকরি করার মতো মেধা সাহস, জ্ঞানবুদ্ধি ছেলেটার সত্যি আছে কিনা, খুব সাবধানী চোখে বিষয়গুলো চিত্রার মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে । আর আমি, গোপনে মেয়েটার সাথে এক আধটু কথা বলি, তবে জামাই বাবাজীর সাথে এখনো কোন কথা বলা হয়নি । হা হা হা । চিত্রার মা ধমক দিয়ে বলে, তোমার আক্কেল জ্ঞান কবে হবে, বলতে পার । কি সব যাতা বলে যাচ্ছ । ছেলেটা কি ভাবছে, বল তো । সবুজ একটা বোধাই টাইপের হাসি দিয়ে বলে, না না, আমি কিছুই ভাবছি না । ওনার কথা শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে । সাদামাটা মনের মানুষ, মনের ভেতর কোন রকম ঘোর প্যাঁচ নেই ।আজকাল তো এরকম মানুষের দেখা মেলা ভাগ্যের ব্যাপার । আঙ্কেল, আপনি বলুন । চিত্রার বাবা মুখ বন্ধ করে রাখে । চিত্রার মা মুখ খোলে ।  চিত্রার মা মেয়ের মত রং সুন্দরী । কথার সুরটা ঠিক মেয়েলি নয়, শাসকের সুরে সে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে ।সবুজকে তার ছাত্র মনে করে, নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তুলে । সবুজ ঘর্মাক্ত শরীরে, ভীত স্বরে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায় ।সবুজের আচরণে ব্যবহারে চিত্রার মা-বাবা দুইজনে খুব  খুশি হয় । চিত্রার মা মনে মনে বলে, এরকম একটা ছেলেই আমি এতদিন ধরে আমার চিত্রা মায়ের জন্য খুঁজছি ।হে আল্লাহ, সত্যিই তুমি রাহমানুর রাহিম ।সব কিছু ভালোই ভালোই যেন শেষ করতে পারি, সেই দয়াটুকু করো । চিত্রার মা হাসিমুখে চিত্রা সম্পর্কে এক গাদা ভালো ভালো কথা সবুজকে শুনিয়ে দেয় ।বলে, দেখ, আমার মেয়েটার গুনগান তোমার কাছে আমি করবো না । তবে মেয়েটার দোষ যদি বলতে হয়, তাহলে বলবো, মেয়েটা আমার একটু অস্থির স্বভাবের ।বয়স কম, কলেজে পড়ে, আর আমাদের প্রথম সন্তান । ওর বাবা ওকে বেশি সোহাগ দিয়ে দিয়ে একটু জেদি স্বভারের বানিয়ে দিয়েছে ।বাইরে কারো সাথে অবশ্য এই জেদ দেখায় না । বাপের আহ্লাদি মেয়ে, বাপের কাছেই যত আব্দার আর জেদ ।অইসব নিয়ে ভাববার কিছু নেই, বিয়ের পর মেয়েদের এসব জেদ ফেদ কোথায় চলে যায় । চিত্রার বাবা বলে, কি শুরু করলে তুমি, মেয়ে তো বাবার কাছে নানা আব্দার করবে, এটাকে তুমি দোষ বলে প্রচার করছ কেন ।আমার মেয়েটার গুনগুলো সবুজকে শুনিয়ে দাও । ওসব শুনতে সবুজের ভালো লাগবে । সবুজ চিত্রার মা বাবার এই সরলতা দেখে মুগ্ধ হয় । ভাবে, একেই তো বলে পরিবার । কি সুন্দর আন্ডারস্টেডিং । চিত্রা শিকারি দৃষ্টিতে সবুজের আপাদমস্তক বার কয়েক দেখে নেয় । সবুজের গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, লম্বা, তবে শরীর-স্বাস্থ্যটা একটু রোগা রোগা । সবচেয়ে, বড় সম্যস্যা সবুজের পোশাক, কেমন যেন ক্ষেতক্ষেত মার্কা । কালো প্যান্ট, সাথে হলুদ রংয়ের ফতুয়া । কর্থাবার্তায়ও সবুজ খুব একটা স্মার্ট বলে চিত্রার মনে হয় না । কেমন একটা মুখচোরা স্বভাবের বলে তার বিশ্বাসে দানা বাঁধে ।সবুজকে তার পছন্দ হয়, আবার হয় না । দোটানার দোলাচলে সে দুলতে থাকে । চিত্রার মা, মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ায় । গুজুর গাজুর, ফিসফাস করে সে মেয়েকে বুঝিয়ে বলে, এরকম ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । কোন রকম ওজর আপত্তি করো না । মা, ছেলেটাকে আমিও খারাপ বলছি না, আগেকার গুলোর চেয়ে এই ছেলেটা অনেক ভালো, কিন্তু,পোশাকে আশাকে কেমন একটা গেঁয়ো ভাব আছে । তুমি মায়ের কথা শোন, ঐ গেঁয়ো গন্ধ দুইচার মাসের সাবান শ্যাম্পু জলের ধাক্কা খেলে বাপ বাপ করে কোথায় যে পালিয়ে যাবে,, সেটা তুমিও বুঝে ওঠতে পারবে না ।তোমার ভবিষ্যত সাজিয়ে গুছিয়ে দেবার দায়িত্বতো তোমার মায়ের । মায়ের ওপর ভরষা রাখো, বিশ্বাস রাখো, দেখ, কি হয় । মা, ওর পরিবার । ওর পরিবার ধুয়ে কি আমরা পানি খাব নাকি । আমাদের দরকার একটা মেয়ে জামাই, ওর পরিবার নয় ।আর বিয়ের পর, তুমি তো ওর পরিবার নিয়ে থাকবে না । থাকবে তুমি আর সবুজ । সেখানে বাইরের কেউ, আসে কি করে । সেইসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না । ছেলেটা নিজের পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তার মা বাবার পছন্দকে নয় ।ওর খালাতো ভাইয়ের সাথে আমার আর তোমার বাবার আগেই সব কথা ফাইনাল হয়ে আছে । তবু বলছি, ওর মা বাবা, ভাই বোন । বলছি তো, বেশি কিছু এখন জানার দরকার নেই, সময়ে সব জানতে পারবে । চিত্রা তার মাকে তার সম্মতি জানিয়ে দেয় । সবুজের বাবা মায়ের অমতে সবুজের খালাত ভাই, সবুজের অভিভাবক হয়ে বিয়ের কথা পাকা দিয়ে আসে । +++++++++++++++++++তিন+++++++++++++++++ সবুজের বাবা ছিল সামান্য একজন সরকারে চাকুরে।উদার প্রকৃতি, নীতিবান আর্দশবাদি, সৎ চরিত্রের মানুষ ।কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা সম্ভব হয় নি । তবু বই পড়ার প্রতি আছে একটা তীব্র নেশা।সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেশি বিদেশী লেখকদের নানা বই ।বেতনের এক চতুর্থাংশ টাকা ব্যয় করেছে এই বই কেনার পেছনে । অর্থ বিত্তের অভাব আছে, কিন্তু মনের দীনতা বলতে কিছু নেই । এখন অবসরে আছে । তবু দীর্ঘবছর ধরে মেনে চলা রুটিনের কোন ব্যতিক্রম করে না ।ভোরের আযান হলে মসজিদে যায় । নামাজ শেষ করে মিনিট বিশেক, এদিক ওদিক ঘুরে, ভোরের আলো বাতাসে নিজেকে সতেজ করে নেয় ।ঘরে ফিরে একমুঠো মুড়ি, কখনো আবার একটুকরো বিস্কিট দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নেয় । আবারো অজু করে কোরান শরীফটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে । ‘ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ । আটটায় তিনটে রুটি, সবজী ও এক কাপ চা খেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের তলায় এসে বসে । হাতে থাকে একটি বই । বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে আসে ।গোসল নামাজ খাওয়া শেষ করে আধঘন্টা সময় বিছানায় গড়াগড়ি । সবুজের মা ঘর সংসারের নানা অভিযোগ নিয়ে কোন কথা বলতে আসলে, মুখ চিবিয়ে হাসে ।বলে, ঘর গৃহস্তালী থাকলে অভাব থাকবে । এজন্য তো এর নাম সংসার ।কখনো আবার অপন মনে বলে ওঠে,হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান । সংসারে তিন ছেলে দুই মেয়ে । বড় ছেলে বিএ পাশ করে, একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে । মেজটা আই এ পাশ । বছর তিনেক একটা পোশাক কোম্পানিতে চাকরি করেছে ।এখন কোন কাজ কর্ম করে না । রাস্তার মোড়ে, দোকানে বসে দেশ উদ্ধারের প্রয়োজনে, দিনরাত রাজা উজির মারে । দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, ভাল পরিবারে ।মেয়ে দুটি সুখে আছে । ছোট ছেলে সবুজ । ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবী ।পরিবারের নানা অভাব অনটন থাকা সত্বেও নিজ সাধনা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটা হাতে নিয়ে এসেছে । সবুজের বাবা তার ছেলে মেয়েদেরকে সব সময় শেখাতে চেষ্টা করেছে জীবনের উদ্দেশ্য কি, সৌর্ন্দয, মাহাত্ম্য কোথায় । স্কুল কলেজ জীবনে সবুজ তার বাবার এই দর্শনকে সম্মানের সাথে সমীহ করে চলেছে ।বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলার সময় বাবার উদাহরণ টেনেছে ।বাবার ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসকে নিয়ে সবুজ সেই সময়ে অহংকারও করেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সবুজকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় । বড়লোক বাবার ছেলে মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে একটা নিরেট সত্যি সবুজের উপলদ্ধিতে এসেছে, জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হলে নীতিবাক্যের ফুলঝুড়ি দিয়ে জীবন সাজানো চলবে না ।জীবন চলে টাকার স্রোতে, টাকায় জীবনে গতি আনে, সুখ আনে, সৌর্ন্দয আনে, জীবনকে করে অর্থবহ, সার্থক । টাকাহীন জীবন বদ্ধ জলাশয়, জঙ্গম স্থবির । সবুজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয় ।তার চোখে স্বপ্ন ভাসে, একদিন সে অনেক অনেক বড়লোক হবে । শহরে বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, সুন্দরী বউ হবে ।তবে তার জীবন চলবে সহজ সরল রেখায় । আধুনিকতার ছল করে কোন অশ্লীল উগ্রতায় জড়িয়ে নিজের অতীতকে বিসর্জন দেবে না ।হাজার বছর ধরে তার রক্তে বহমান পুর্ব পুরুষের ঐতিহ্য-সংস্কার বা বিশ্বাসকে ও সে কখনো অবহেলা অসম্মান করবে না ।  সবুজ গ্রামের ছেলে, জীবন হবে তার সবুজ প্রকৃতির মতো পেলব সুন্দর, মসৃণ । তবে তার বাবার মতো টানটান জীবন নয় । তার অর্থ থাকবে ।দুই হাতে মুঠোভরে সে টাকা খরচ করবে । তার ভবিষ্যত বংশধরদেরকে অভাব শব্দটার সাথে কখনো পরিচয় করিয়ে দেবে না । গ্রামের বাড়িতেও সে একটা সুন্দর ঘর করবে । এই স্বপ্ন তার সেই শিশু-শৈশবকাল থেকে তার মনের ভেতর সুপ্ত হয়ে আছে । গ্রামের বাড়িতে শহরের মতো করে সুন্দর ঘর করবে । মা বাবাও তার সাথে থাকবে । মা বাবার জন্য দক্ষিণ দিকে থাকবে একটি বড়সড় ঘর । দক্ষিনের খোলা হাওয়ায়, সুখে আনন্দে কেটে যাবে, তাদের শেষ দিনগুলো । ইট সিমেন্টের পাকা ঘর হলেও সবুজ গ্রামীন সৌর্ন্দযকে হণন করবে না । সবুজের বাড়ি হবে সবুজে সবুজে সবুজময় । বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকবে সুপারি গাছ । গাছগুলো বড় হয়ে ছাদ পযন্ত ওঠে যাবে ।ছাদের ওপর বসে সবুজ চারপাশের সবুজকে তার বুকের গভীরে টেনে নেবে । আকাশের ভাসমান মেঘমালা দেখবে, দেখবে নীল সামিয়ানায় তলে তারাকা রাজির মিটিমিটি লুকোচুরি খেলা ।জোছনায় নিজেকে ভাসিয়ে নেবে দুর দেশের অজানা সৌন্দযে । রবি ঠাকুরের গান শুনবে । নজরুলের কবিতা পড়বে । “ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না ।” এসব সে জেগে জেগে ভাবে ।রাতের ঘুমেও সেইসব ভাবনা স্বপ্ন হয়ে তার মনে ভাসে । সবুজ তার শিক্ষকদের মুখে শুনেছে, মনীষিদের জীবনীপাঠে জেনেছে, জীবনের সুখস্বপ্ন সত্যি হয়, মেধা শ্রম আর সাধনার বলে । সবুজ মেধাবী, প্রতিটি সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সে তার মেধার যোগ্যতা দিয়েছে ।সবুজ পরিশ্রম আর সাধনা ছিল বলেই তো সে আজ তার চারপাশের লোকজনের কাছে সবুজ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু সবুজ কর্মজীবন, কি করবে, কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবে । ভাবনার শেষ থাকে না, কিন্তু কোন সিদ্বান্তেই সবুজ স্থির হতে পারে না ।সবচেয়ে বড় সম্যসা-সংকট অর্থের । বহু দিন মাস নানা ভাবনায়, হেলাফেলায় সে শেষ করে । তার পর মধ্যবিত্তের শেষ ভরষার স্থল চাকরি বাজারে যাতায়াত শুরু করে । একটা চাকরির জন্য সে নানা জায়গায় তার পরিচয় ও যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা করে । সবুজ চাকরির জন্য এদিক ওদিক হন্য হয়ে চরকী ঘোরা ঘুরে । চাকরি হয় না, কিন্তু, কেন চাকরি হয় না, তার উত্তরও সবুজের জানা হয় না । বছর খানেক পরে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটমাপের একটি চাকরি পাওয়া যায়, তাও নিজের যোগ্যতায় নয়, প্রতিষ্ঠানের বড় সাহেব তার এক নিকটতম বন্ধুর কাকা । বন্ধুর অনুরোধে সবুজকে চাকরিটা পাইয়ে দেয় । সবুজের জীবনের সব সুন্দর ইতিবাচক ভাবনাগুলো নেতিয়ে পড়ে । ভাঁটার স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার জীবনের জোরালো নীতি-আর্দশগুলোতে গুণেপোকা বাসা বাঁধতে শুরু করে । সবুজ নব বিশ্বাসে স্থিত হয়, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে, মেধা শ্রম সাধনা কিছুই নয়, দরকার ক্ষমতাবান আত্মীয়ের । সামনে এবং পেছনে ডাল তলোয়ার হাতে নিয়ে যারা তার জীবন চলার পথকে করে দেবে মসৃণ, ঝেড়ে মুছে লক্ষ্যে পৌঁছার সিঁড়িগুলোকে করে দেবে ঝকঝকে তকতকে । কেউ একজন হাত ধরে সামনে টেনে নিয়ে যাবে, অন্য একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিয়ে যাবে ।সবুজ অস্থির হয়ে ভাবে, কেউ একজন, যে আমার সামনে শক্ত হাতে মই ধরে রাখবে, আমি তার ওপর বিশ্বাস করে, নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সপে দিয়ে তরতর করে ওপরে ওঠে যাব । কিন্তু, কে সেই, কে । অস্থির সব নানা ভাবনায় সবুজ সারাক্ষণ কাটা ঘুড়ির মতো শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকে ।  আলো আঁধারীর ভাবনাকাশে হঠাৎ করে উঁকি দেয়, যদি কোন বড়লোক বাবার অর্থব মেয়ের গলায় ঝুলে যেতে পারা যায়, তাহলে ও হয়তো জীবনের স্বপ্নগুলো সত্যি হয়ে জ্বলে ওঠবে । সবুজ তার বন্ধুসম খালাতো ভাইয়ের্ সহযোগিতায় পেয়ে যায় সেই স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি । চিত্রাই সেই চাবি, যে তাকে পেছন থেকে ঠেলবে, আর তার ব্যবসায়ী শ্বশুর বাবা তাকে সামনে থেকে টেনে নিয়ে যাবে । চিত্রার সাথে সবুজের বিয়ে হয় । বিয়ের অনুষ্ঠানে সবুজ বুঝতে পারে, কত বড় ঘরের মেয়েকে সে তার জীবন সঙ্গীনি করে নিয়েছে ।বিয়েতে আগত অতিথিদের পোশাক, বেশভূষা, পরিচয়, জীবন বৃত্তান্ত শুনে দেখে সবুজ বুঝতে পারে, তার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব ।একই অনুষ্ঠানে দুই দুইটি বিয়ে । চিত্রার আর চিত্রার ছোটবোন চয়নার । চিত্রার মা বাবা পুলিশ জামাইকে স্বীকার করে নিয়ে নব সাজে বরণ করে নিয়েছে । ++++++++++++++চার++++++++++++++++++++++++ বউ হয়ে চিত্রা সবুজের গ্রামের বাড়িতে আসে । চিত্রার জন্ম শহরে । গ্রামের বাড়িতে সে ইতোপূর্বে কখনো যায় নি । শিশু বয়সে সে বাবার মুখে কদাচিৎ একটি গ্রামের নাম শুনেছে । কিন্তু সেই নামটিও আজ তার স্পষ্ট মনে নেই । মায়ের মুখে শুনেছে, গ্রামে তার বাবার আরো দুই ভাই ও দুই বোন আছে । কিন্তু তাদের নাম, বা তারা কি কি কাজ করে, এসব চিত্রা বা তার ভাই বোনেরা কেউ জানে না । জন্মের পর কখনো চোখে দেখেছে বলেও তাদের কারো মনে পড়ে না । মায়ের মুখে জেনেছে, তার চাচারা কেউ পড়ালেখা কিছুই করে নি, গ্রামে চাষবাস, দিন মজুরের কাজ করে । সবাই স্বার্থপর, হিংসুটে, লোভী ।সবার সারাক্ষণ খাই খাই স্বভাব । তার বাবার চাকরীর সব টাকা তার দাদা-দাদী, চাচা ফুফুদের পেছনে খরচ হয়ে যেত । মাই তো বুদ্ধি করে সবাইকে জানিয়ে দেয়, চিত্রার বাবার চাকরি চলে গেছে । নিজেরই চলে না, বাড়িতে কিভাবে টাকা পয়সা পাঠাবে । বাবা মাঝে-মধ্যে গ্রামের কথা বলতে চায়, মা ধমক দিয়ে বাবাকে চুপ করিয়ে দেয় । চিত্রা বা চিত্রার ভাইবোনের কাছে গ্রাম এক ভীতিকর স্থান । নোংরা ময়লার স্তুপ, রোগ-ব্যাধিতে পূর্ণ, মানুষগুলো বড় বেশি হিংস্র, হিংসুটে লোভী, স্বার্থপর, ধান্ধাবাজ ।এদের কথাবার্তায় নেই কোন শালীনতা, অশ্লীল-অশ্রাব্য কথার স্রোতে এরা সারাক্ষণ হাবুডুবু খায় । চিত্রা নতুন বউ । সবুজদের টিন বেড়ার ঘরে একটি খাটের ওপর চুপটি করে বসে আছে । বাড়ির ও গ্রামের বউ ঝি‘ রা দলে দলে নতুন বউকে দেখতে আসে । গ্রাম্য রীতি ও সংস্কৃতি হিসেবে নানাজনে নানা রকমের হাসি মশকরা করে যায় । নানা উপমা উদাহরণে নব বধুর রূপ সৌন্দযের বর্ণণা করে ।দাদী সম্পর্কের কেউ একজন বলে, ওমা, নাত বউয়ের গায়ের রং তো দেখি পাকনা কলার রং ।মেয়ে মানুষের এত রুপ রং তো ভাল নয় । একটা মেয়ে বলে, দেখ দাদী, তোমার নাত বৌ না আবার শুধু গা সুন্দর খালাত বোন হয় । সবাই হি হি হা হা করে হাসে ।  চিত্রা বড়বড় চোখ করে সব দেখে, কান পেতে সব শুনে । মনে মনে মায়ের মুখে শোনা গ্রামের কথা ভাবে । মা তো সত্যিই বলেছে, এরা কি মানুষ, সভ্যতা ভব্যতা বলে এদের ভেতরে কিছুই নেই । কথাবার্তার শ্রী দেখলে মরীর জ্বালা করে ।কথা নয় যেন কোদালের কোপ বসাচ্ছে । চিত্রা কারো কথার কোন উত্তর করে না, রাগে ক্ষোভে চিত্রা ভেতরে ভেতরে শুধু ফোঁস ফোঁস করে । নব বধূর ঘোমটা চিত্রার মাথায় নেই । মধ্য জানুয়ারির শীতেও চিত্রা গরমে বিন্দু বিন্দু ঘামাচ্ছে । সম্পর্কে চিত্রার এক ননদ কানে কানে চিত্রাকে বলে, ভাবী, ঘোমটা টা মাথায় ভালো করে টেনে দাও । গ্রাম তো, নানা লোকে নানা কথা বলবে । তোমার বদনাম হবে । চিত্রা চোখ তুলে মেয়েটাকে দেখে । পরনে জামদানী, হাতে গলায়, কানে সোনার অলঙ্কার । সাজে পোশাকে মেয়েটাকে গ্রামের মেয়ে বলে মনে হচ্ছে না । কথার স্বরেও আছে চুড়ির রিনিঝিনি । কিন্তু, এই মেয়ে এসব কি বলছে, কেন বলছে, টেনে লম্বা করে ঘোমটা না দিলে লোকেরা নানা কথা বলবে, বদনাম করবে । চিত্রা শহরের মেয়ে, এসব বদনামের তোড়াই কেয়ার করে সে । তার ধৈয্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় । সেই বেশ মেজাজের সাথে বলে, এই মেয়ে, তুমি কে, কেন ফালতু বকবক করছো, ঐসব ঘোমটা টোমটা আমি দিতে পারবো না । সবুজকে ডাকো, ওর সাথে আমার কথা আছে ।  মেয়েটা মিষ্টি করে হাসে ।বলে, ভাবী, আমি আপনার ননদ হই, এইটুকু আপাতত মনে রাখেন, পরে ভাল করে পরিচয় করিয়ে নেব ।দাদাকে এভাবে নাম ধরে ডাকবেন না, গ্রামের বাড়িতে কেউ স্বামীকে এভাবে নাম ধরে ডাকে না, লোকে শুনলে তোমাকে খুব খারাপ ভাববে । বলছি না, বাজে বকবক করবে না, ডাকো সবুজকে ।গাঁইয়্যা ভুত একটা, কোথায় নিয়ে এসেছে আমাকে । রাতে খেতে বসে চিত্রার মেজাজ যায় বিগড়ে ।নিচে পাটিতে বসে সবার সাথে তাকেও ভাত খেতে হবে ।পাটিতে বসে কিভাবে ভাত খাবে, চিত্রা তো তার জীবনে কখনো ওভাবে নিচে বসে কোন খাওয়া খায় নি । তার এত সুন্দর দামী বিয়ের শাড়ীর বা কি অবস্থা হবে । হাত ধোয়ার জন্য সবুজের এক বোন একটা প্লাষ্টিকের চোট গামলা এগিয়ে দেয় । সাবান নেই, হাত মোছার কোন টাওয়াল নেই । চিত্রা কিছুই ভাবতে পারে না ।একটা শব্দ তার মাথার ভেতর দপদপ শব্দ করে বাজতে থাকে । সে আড়চোখে কটমট করে একবার সবুজের দিকে তাকায় । সবুজ তার ছোটবোনকে ধমকের সুরে বলে ওঠে, ঘরে কি হাত ধোয়ার সাবানও নেই ।হাত ধোয়ার জন্য একটা সাবান দিতে পারিস না । সবুজের বড় ভাবী মুখ খিঁচিয়ে বলে ওঠে, ওমা,েএই কোন যুগীরে ভাতেরে কইতেছে অন্ন ।  বাসর রাত, বিছানা খাট, আর চারপাশের শ্রী দেখে, চিত্রার চোখ জ্বালাপোড়া করে । কোথায় এসেছে সে । কাকে সে বিয়ে করেছে । যদিও চিত্রা বস্তির ঘরদুয়ার কখনো ভালো করে দেখে নাই, তবু তার মনে হয়, বস্তির লোকেরা এর চেয়ে ভাল অবস্থায় থাকে । সবুজ সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে । সিগারেট খেয়ে সে বাসরঘরে যায় । ভাবীরা নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায় । চিত্রা তার মাথার কাপড়টা সরিয়ে নিয়ে ফোঁস করে ওঠে । এই সবুজ, একটা ভালো মানের খাট যার ঘরে নেই, তার বিয়ে করার সখ কেন জাগে । আমার বাসার কাজের বুয়াও এর চেয়ে ভালো খাটে ঘুমায় । সবুজ হাসে, বলে, সোনা, আজ রাতে এরকম ফোঁসফাঁস করো না । আড়ালে কেউ শুনেলে, আর রক্ষে থাকবে না । চিত্রা আবারও ফোঁস করে, বলে, তোমার মুখ থেকে গুয়ের গন্ধ আসছে কেন । কি সিগারেট খেয়েছ । সিগারেট না বিড়ি । সবুজ মুখ খোলার আগেই, চিত্রা বলে ওঠে, যাও ভালো করে ব্রাশ করে এসো । ব্রাশ পেষ্ট আছে তো, নাকি ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য চুলার ছাই দিয়ে দাঁত ঘষো ।চিত্রা দিনের নাটকের আজে বাজে সংলাপও নিয়ে সবুজকে খোঁচা মারে । সবুজ আর কোন কথা বলে না । সবুজ বুঝতে পারে, সে একটা বড় ধরণের ভুল সে করে বসেছে । এত সহজে মাথা নিচু করার ছেলে সবুজ নয়, সে জানে, বিড়াল প্রথম রাতেই কাটতে হয় । কিন্তু চিত্রার উগ্র হাবভাব, উত্তপ্ত কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, চিত্রা রাজকন্যার আদুরে বিড়াল নয়, খোলা বনের ক্ষুর্ধাত কোন বাঘ । বাঘের লেজে খোঁচা মারা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না । তাই বেশ মিষ্টিস্বরে চিত্রাকে সে বলে, এসব নিয়ে মাথা গরম করো না, এগুলো গ্রামীন সুন্দর, গ্রামীন ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কার । নিছক নির্মল আনন্দের জন্যই এসব করা । কাউকে ছোট করা, হেয় করা, বা অপমান করার জন্য নয় । মাথা গরম না করে দুইটা দিন চুপ করে থাক, দেখবে এই কথার অলংকারগুলো তোমারও খুব প্রিয় হয়ে ওঠবে । চিত্রা বিছানা থেকে নেমে আসে । বলে, দুইটা দিন, দুইটা দিন চুপ করে থাকলে হবে, কিন্তু, আমি তো একদিনও আর এখানে থাকবো না । কালকে সকালেই তুমি আমাকে শহরে আমার বাপের বাসায় দিয়ে আসবে । কিসব পাগলের মতো কথা বলছো, কাল বাদে পরশু বৌ-ভাত । বৌ ভাত অনুষ্ঠান শেষ হলে তুমি শহরে যাবে ।   ++++++++++++++++++পাঁচ++++++++++++++++++++++++++++ চিত্রার না শুধু না হয় । শত হাজার চেষ্টা তদবিরেও কেউ চিত্রার না কে হাঁ করতে পারে না । সেই শিশু শৈশব থেকে তার মা-বাবা ঢাক-ঢোলের আওয়াজ তুলেও যা করতে পারেনি, সবুজের একতারার বীন তা কি করে পারে । সবুজ ও পারে নি । চিত্রা স্থায়ী হয়ে আবাস গড়ার জন্য গ্রামে আর আসে নাই । চিত্রার ইচ্ছেয় সবুজকে গ্রাম ‘ছেড়ে গিয়ে শহরে স্থায়ী আবাস গড়তে হয়েছে । সবুজ শহরে থাকে, প্রথমে মাস কয়েক শ্বশুরের ঘরে ঘরজামাই হয়ে ছিল । চিত্রার ছোটবোন চয়না বলে, আপু দুলাভাইকে বলো, তোমাকে নিয়ে আলাদা বাসা করে থাকতে । বিয়ের পর মেয়ে বাবার ঘরে, দেখতে সুন্দর দেখায় না ।দুলাভাইকে বল, তোমাদের দুইজনের জন্য ছ্ট্ োএকটা বাসা ভাড়া করে নিতে । তোমরা টোনাটুনি সেখানে থাকবে । আনন্দ করবে, ভালবাসার পেখম খুলে বাকুম বাকুম করে সময়গুলো মধুময় করে তুলবে । চয়নাও দেখতে বেশ সুন্দর । নিজের বোধ বিবেচনায় চলতে সে বেশি পছন্দ করে ।কথা বলে কাটকাট, এজন্য অনেকে চয়নাকে বেয়াদপ বলে । আর চিত্রার কাছে তো চয়না একটা বিশ্বমানের বেযাদব ।চয়নার চটাং চটাং কথাবার্তা চিত্রার একদম সহ্য হয়না ।বেশ তেতো গলায় চিত্রা চয়নাকে বলে, এ্যাই, খুব তো বড়বড় কথা বলছিস, সবুজ তো তোর জামাইয়ের মতো পুলিশে চাকরি করে না । কারো কাছে হাত পেতে ঘুষের টাকা নেয় না ।কয় টাকা বেতন পায় সবুজ । ঘর ভাড়া দিয়ে দিলে বউকে খাওয়াবে কি । চয়না প্রতিবাদ করে না, হাসে । বলে, টাকা না থাকলে,খাবে না । না খেয়ে, না পরেও দেখবে, ভালবাসার জীবন কত সুন্দর । জীবনে কাউকে তো ভালবাসতে পারলে না, দুলাভাইকে একটু ভালবাসতে শেখো । চিত্রা আলাদা বাসার কথা সবুজকে বলে না, তার বাবাকে বলে । বাবা হাসি মুখে বলে, আচ্ছা । সবুজ নিজের পুরুষত্ব ফলাতে গিয়ে একটু গাঁইগুই করে, বলে, আমি আমাদের দুইজনের থাকার মত একটা ঘর ভাড়া করে নিতে পারব । চিত্রা ঝাঁঝালো গলায় বলেছে, কয় টাকা বেতন পাও তুমি, ফুটানি মারছ কেন, তোমার মুরোদ তো আমার জানা হয়ে গেছে । সবুজ সময় করে গ্রামের বাড়ি যায় । একটা রাত মা বাবার সাথে থেকে আসে, সকালে ঘুম থেকে ওঠে একবার নিজের গ্রামটা ঘুরে আসে । গ্রামের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা তার শিশু শৈশবের সুখ আনন্দগুলোকে খুঁজে দেখে । বিকেল না হতেই আবারো শহুরমুখো হয় । মা বাবার লক্ষীছেলে হয়ে থাকা, বারবার তাদের আঁচলে ফিরে যাওয়া, এসব চিত্রা ও তার মা বাবার খুব একটা পছন্দ হয় না । চিত্রার বাবা সবুজকে বলে, দেখ বাবা, জীবনে বড় হতে গেলে পিছুটান রাখতে নেই । পিছুটান বড় খারাপ জিনিষ, পিছুটান পুরুষ মানুষের স্বপ্নকে, উচ্ছ্বাসাকে ধ্বংস করে দেয় । জীবনে যদি বড় কিছু একটা হতে চাও, তাহলে ভুলে যাও তোমার অতীত, তোমার দুঃখ কষ্ট, অভাব অনটন । সবুজ কোন কথার উত্তর করে না । সবুজের একগুঁয়েমি আর র্নিবুদ্ধিতা দেখে চিত্রার মায়েরও মেজাজ বিগড়ে যায়, কিন্তু এত তড়িঘড়ি থলের বেড়াল বের করে আনতে চায় না, মিষ্টিস্বরে হাসিমুখে বলে দেখ, ঘর সংসারের আসল মালিক হল, ঘরের বউ, তার কথা যদি না শুন, তাহলে ধরে নিতে হবে, তোমার কপালে অনেক দুঃখ দুর্গতি আছে । চিত্র সেই ঝাল মরিচের সাথে একটু আদা-পেয়াঁজ বাটা লাগিয়ে দেয় । বলে, মা, এইসব কথা ওকে বলে কোন লাভ নেই । তোমার জামাই হলো ওর মা বোনের দম দেয়া পুতুল । ওদের সুতোর নাচনে নাচবে, গাইবে, কথা বলবে । আমি তুমি আমরা ওর কেউ নই । চিত্রার মা বলে, মা বোনের আঁচলের তলে যদি বসে থাকবে, তাহলে শহরের মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছিলে কেন, গ্রামের কোন অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করলেই তো পারতে, গ্রামের অশিক্ষিত ভুত বিয়ে করলে, ওরা তোমার মা বাবার দাসী বান্দি হয়ে, ওদের পা ধুয়ে ধুয়ে পানি খেত, আর তোমারও স্বর্গ প্রাপ্তির রাস্তাটা সহজ হয়ে যেত । মা, কোন লাভ হবে না ।ওর সারা শরীরে মনে গেঁথে আছে গ্রাম্য বিশ্বাস,গ্রাম্য সংস্কার । সেখানে সে দেখেছে, ঘরের পুরুষেরা প্রত্যেকে এক একটা বাঘ সিংহ, আর তাদের বউয়েরা হচ্ছে পোষা বিড়াল । ঝাঁটা লাতি খেয়েও তারা নাকি কান্নায় মিউমিউ করবে সামান্য একটু দুরে সরে দাঁড়াবে, পরক্ষনেই আবারো আদুরে ভঙ্গিমায় পায়ের কাছে এসে লুঠোপুটি খাবে,  কিন্তু কোন বাদ-প্রতিবাদ করবে না, করার সাহস দেখাবে না । তোমার জামাই তো সেই গ্রামেরই পুরুষ মানুষ, পুরুষ সিংহ, মেয়ে মানুষের কথা শুনে চললে ওর যে পুরুষত্বটাই নষ্ট হয়ে যাবে । নিশ্চয় কোন বড় রকমের পাপ আমি করেছি, না হলে আমার কপালে এরকম বলদ জুটবে কেন, তুমি জানো মা, আমার বান্ধবী কেয়া, কত বড় ঘরে ওর বিয়ে হয়েছে, ওর বরটা না, কেয়াকে এক গ্লাস পানি ঢেলে পযর্ন্ত  খেতে দেয় না । কেয়ার কোন সখ আহ্লাদে বাঁধ সাধে না, কেযার কথা ছাড়া কোন কাজই সে করতে রাজি হয় না । আর আমার কপালটা দেখ, চিত্রা নাকি কান্নায় মুখ ভাসাতে থাকে । চিত্রার মা বলে, ওটায় হলো বংশগুণ । বংশ গরিমা তো আর গায়ে লেখা থাকে না, কাজে কর্মে, কথায় আচরণে ফুটে ওঠে । চিত্রা, চিত্রার মা দুইজনেই মিলে সবুজের বাবা মাকে কূটকাটব্যে ভাসাতে থাকে । সবুজ বেশ শক্তস্বরে বলে, আমার মা বাবা আপনাদের কি ক্ষতি করেছে, কেন ওনাদের পা ধরে সারাক্ষণ আপনারা টানাটানি করেন । মা, শুনলে, ও তোমাকে কি বলল, ওর ভাষাটা শুনলে, এই হল ওর শিক্ষা, ওর রুচিবোধ ।ও নাকি মাষ্টারের ছেলে, আমি তো বলেছিলাম, ঐ মাষ্টারের ছেলেকে আমি বিয়ে করবো না । সবুজ চিত্রার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ে । বলে, আমার বাবা মাষ্টার, এই খবর তোমাকে কে দিয়েছে । আমাকে শেখাতে এসো না, আমি তো দেখেছি, তোমাদের সারা ঘরে বই আর বই, এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । মাষ্টার না হলে কেউ কি এতো বই ঘরের ভেতর, এভাবে এলোমেলো করে রাখে । চিত্রার মাকে একটু চিন্তিত দেখায় । বলে, সবুজ, তুমি তো বলেছিলৈ, আমার বাবা সরকারী অফিসে জব করতেন । বই পড়াটা ওনার হবি, নেশাও বলতে পারেন । ও, এজন্য তোমাদের ঘর দুয়ারের এই অবস্থা । যা দেখে এলাম, ঘরে তো বসার মতো একটা চেয়ার নেই ।চিত্রার মা ঘেন্নাভরে কথাটা বলে ।   জানো মা, ওর মা শুদ্ধকরে সুন্দর করে কথাও বলতে পারে না । বাপ তো পৃথিবীর সকল মানুষকে ছাত্র মনে সারাক্ষণ জ্ঞান ঝাড়ে ।আমি নতুন বউ, আমাকেও কিসব জ্ঞান ঝেড়েছে, কিছুই শুনি নাই ।  তুমি জানো মা, ওদের বাড়িতে একটা ভালমানের টয়লেট পযর্ন্ত নেই । বাড়ির সব ছেলে মেয়েরা একই পুকুর জলে, একই ঘাটে গোসল করে । মহিলাদের পোশাক বদলানোর জন্য পুকুর পাড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘের দেয়া আছে, সেখানে বাড়ির বৌ-ঝিরা, ছিঃ ছিঃ, ভাবতে পারো, ঐ রকম পরিবেশে বড় হওয়া একটা ছেলে, তার কাছ থেকে তুমি এর চেয়ে ভাল কথা আর কি শুনবে । গুরুজনদের সাথে এই হল ওর কথা বলার শ্রী । চিত্রার মা বড়বড় চোখে একবার সবুজের দিকে তাকায় । কেন আমরা তোমার মা বাবার পা ধরে টানাটানি করছি, সেটা যদি তুমি বুঝতে পারতে, তাহলে তো আমাদের জীবন ধন্য হয়ে যেত ।কিন্তু, তোমাকে বুঝতে হবে, ঐ গ্রাম্য সেন্টিমেন্ট, বস্তাপচা ধ্যানধারণা বিশ্বাসকে তোমাকে সাগর জলে ভাসিয়ে দিতে হবে । দেখবে, তোমার ভেতরকার সব ময়লা আর্বজনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে । তখন দেখবে, জীবনের অর্থটা তোমার কাছে  পাল্টে গেছে ।সমাজে দশ জনের একজন হয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারবে । ঐ বস্তাপচা সেন্টিমেন্টে পথ চললে, শুধু তোমার নয়, আমার মেয়ের কপালেও ছাই ভস্ম ছাড়া কিছুই জুটবে না । সবুজ কথা বাড়ায় না । ওঠে বাইরে চলে যায় ।   +++++++++++++++ছয়++++++++++++++++++++     চিত্রার রুপ আছে, কিন্তু কোন গুণ নেই । চিত্রা তার জীবনে একটা কাজই ভালো করে রপ্ত করেছে, সেটা হলো চামড়ার যতœ ।মনের যতœ কখনো করে নাই, করার প্রয়োজনও বোধ করে নাই ।বাথরুমে ঢুকে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয় । সাবান শ্যাম্পু, কন্ডিশনারে নিজেকে সয়লাব করে । প্রতি সপ্তাহে একবার করে সে পার্লারে যায় । বলে, আজ কতটাকা দিয়ে আসলাম, জান, বাপের জন্মে এসবের নাম শুনেছো । কথা সত্যি, সবুজ বাবার জন্মেও এসব নাম শুনে নাই । চিত্রার বদৌলতে তাকে এসব এসব শুনতে হয়, শুনতে হচ্ছে । সবুজ বুঝে গেছে, চিত্রার নিজ জ্ঞান বুদ্ধিতে চলে না, সংসার চিত্রার হলেও মূল চাবিকাঠি ঘুরে চিত্রার মায়ের নানা ইশারা ইংগিতে, আদেশ উপদেশে ।  সবুজের এই গ্রাম প্রীতি চিত্রার অসহ্য লাগে । সবুজের এই মধ্যবিত্ত মন মানষিকতাকে চিত্রার মা ও চিত্রা অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে । মা চিত্রাকে ফু মন্তে শিখিয়ে দেয়, কি করে গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথকে সোজা করে ইট কংক্রিটে ভরাট করে দিতে হয় । কথায় কথায় তারা দুইজনে সবুজের মা বাবাকে নিযে কটাক্ষ করে । সবুজের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচি, ধ্যান ধারনা আর বিশ্বাসের ওপর বিষ ছড়ায় । সবুজ চিত্রাকে তার বাবার আর্দশের কথা বলে, তার মায়ের সরলতার কথা বলে । সবুজের কথা শুনে চিত্রার মাথায় আগুণ জ্বলে । সে ঝালমরিচের গুড়া ছিটিয়ে সবুজকে বলে, ঐসব হল, মাষ্টারদের ভন্ডামি । তোমার বাবার মত মাষ্টারদের জন্য আঙ্গুর ফল সব সময় টকই থাকে । নিজেদের তো কিছু করার মুরোদ নেই, তাই নীতিবাক্য আওড়িয়ে মিথ্যে সান্ত্বনা খোঁজে । ছেলে মেয়েদের স্বপ্ন আশাকেও গুড়িয়ে মারতে চেষ্টা করে । মাষ্টারদের এসব আলতু ফালতু কথা শুনে শুনে আজকালকার ছেলে মেযেরা বড়বড় স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায় । চিত্রার অভিধানে অভাব শব্দটা কখনো জায়গা পায় নি । জন্মের পর থেকে সে কখনো হাঁ ছাড়া না শব্দটা শুনে নি । তার সখের কাজে তার মা বাবা কখনো বাঁধ সাধে নি । সবুজের সংসারে এসেও সে তার সখ আহ্লাদ পূরণের টাকাটা মায়ের কাছ থেকে নিয়ে নেয় ।  চিত্রার সকল সখ স্ফূর্তির কাজে সবুজ বাঁধা দেবে । বলে, এসব ফালতু কাজ, এসব অপচয়, এসব ফুটানি তার একদম পছন্দ নয় । রাগে অপমানে চিত্রার সারা শরীর রি রি করে, তবু সূচনাতে সবুজের সাথে সে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যেতে চাই নি । প্রতিরাতে চিত্রা সবুজের সাথে ঘ্যানর ঘ্যানর করে । তার বাবার বড় লোক হবার কাহিনী শুনায়, তার বান্ধবীদের জৌলুষ জীবনের গল্প বলে । চিত্রা নাকি কান্নায় চোখের জলে বালিশ ভেজায় । সকাল হতে মধ্যরাত অবধি সবুজ নানাকাজে ব্যস্ত থাকে ।বছর না ঘুরতেই গুনতি টাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সবুজ তার শ্বশুর আব্বার সাথে ব্যবসায় হাত লাগায় ।সবুজ একা নয়, সবুজের ভায়েরা ভাই, পুলিশ অফিসারও টাকা কড়ি ও অন্যসব ঝুট ঝামেলা সামাল দিয়ে এই ব্যবসার সাথে নিজেকে জড়িয়ে নেয় । ব্যবসার কারণে, চিত্রা সবুজ, চিত্রার মা বাবা পরিবারসহ ঢাকায় চলে যায় । রাজধানীতে এসে সবুজ গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । সবুজ তার গ্রামকে ভুলে যায় । ভুলে যেতে থাকে গ্রামের বন্ধু স্বজন আত্মীয়দের । তার ভেতরের চির সবুজ পাগলাটে মনটা ধীরে ধীরে শহরের ইট কংক্রিটে আটকে পড়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করে । চিত্রা ও চিত্রার মা-বাবার জ্ঞানবুদ্ধির কূটকৌশলে সবুজও ধীরে ধীরে  বুঝতে পারে, জীবনে বড় হতে হলে, আনন্দ উত্তাপে অবগাহন করতে হলে বারবার পেছনে ফিরে দেখা যাবে না । বুদ্ধিদীপ্ত হৃদয় কখনো অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখে না । পিছুটান জীবনের উচ্ছল গতিস্রোতকে থামিয়ে দেয় ।নানা নুড়ি পাথরের ধাক্কায় জীবন রক্তাক্ত –ক্ষতাক্ত হয় ।জীবনের অর্থই হলো, এগিয়ে যাওয়া, শুধু ধাও, বেগে ধাও, উদ্দাম উদাও ।   +++++++++++++++++সাত++++++++++++++++++++   সবুজের বাবা হঠাৎ করে হার্ট এ্যাটাকে মারা যায় । সবুজের বিয়ের মাস কয়েক পরের ঘটনা, সবুজের শ্বশুরেরা তখন চট্টগ্রাম শহরে থাকে । চিত্রার বাবা অসুস্থ । অসুস্থ বেয়াইকে দেখার জন্য সবুজের বাবা শহরে বেয়াইয়ের বাসায় যেতে চায় ।সবুজকে বলে, আমি একবার গিয়ে বেয়াইকে দেখে আসি । সবুজ দৃঢ়স্বরে না করে দেয় । বাবা সবুজের না কে গুরত্বে আনে না । তিনি স্পষ্টভাষী, সত্য বলতে কোন দ্বিধা করে না । হাসিমুখে সবুজকে বলে, না করছো কেন, আর তুমি না বললেও আমি শুনবো কেন, বউ আমার পছন্দ হয়নি, এটা সত্যি, বউয়ের ওপর অভিমান করে আমরা তো আর আত্মীয়তার বন্ধনকে অস্বীকার করতে পারবো না । ভালো খারাপ যাই হোক না কেন, ওরা এখন আমাদের আত্মীয় । ওদের অসুখে বিসুখে, আপদে বিপদে যদি আমরা একটু পাশে থাকতে না পারি, তাহলে তো মানুষ নাম ধারণ করে বেঁচে থাকাটাই বৃথা । সবুজ বাবাকে বলে, বয়স হয়েছে তোমার, এখনো জ্ঞান বিতরণ করাটা বন্ধ করতে পারলে না । তোমার এই মাষ্টারি মার্কা কথাবার্তা শুনে মেনে আমার জীবনটাই নষ্ট হতে বসেছিল । তবু তোমার স্বভাব বদলালো না । সবুজের বাবার মুখে কোন কথা আসে না । নির্বাক পাথর দৃষ্টি তুলে সে সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । সবুজ বেশ মেজাজ দেখিয়ে তার বাবাকে বলে, তোমার এতো লোভ কেন, কেন তুমি ওদের বাসায় যেতে বায়না ধরেছো । সবুজ আরো যা যা বলে, তা সবুজের বাবা শুনে নি, শুনতেও চায় নি । দিন কয়েক পরে, সবুজের বাবা সবুজের মাকে বলে, সবুজ কি বলেছে, না বলেছে, ওসব ভেবে কোন লাভ নেই । ছেলেটার বুদ্ধি জ্ঞান আজো দেখছি কিছুই হলো না, সব সময় মাথা গরম কথাবার্তা । আমি যাবো, বেয়াইকে একবার দেখে আসি, ভাল লাগলে একটা রাত বেয়াই বেয়াইনের সাথে গল্পসল্প করে কাটিয়ে দিয়ে আসবো ।সবুজের মা বাঁধা দেয়নি, খুশি মনে বেয়াই বেয়াইনের জন্য বানিয়ে দিয়েছে, পুলিপিঠা  মুগ পাকন । সকালে ঘুম থেকে ওঠে, গা গোসল সেরে সবুজের বাবা তার তার বহুল ব্যবহৃত পায়জামা পাঞ্জাবি আর স্যান্ডেল পরে বেয়াই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওযানা দেয় । বিকেল না গড়াতেই সবুজের বাবা ক্লান্ত শরীরে নিজ বাড়িতে ফিরে আসে । সবুজের মা, জানতে চায়, চলে আসলে যে, বলে গেলে, রাত কাটিয়ে আসবে । সবুজের বাবা অত রাগঢাক জানেও না, বুঝেও না । সবুজের মাকে শুধু বলে, আমাকে কিছু খেতে দাও, বড় বেশি খিদে লেগেছে, সারদিন কিছু খাওয়া হয় নি । সবুজের মা, ভাবী, ভাইয়েরা বারবার জানতে চায়, কি হয়েছে, কেন তুমি চলে এসেছো, ওরা কি, সবুজের বাবা শান্ত গলায় শুধু বলে, বেশি কথা বলো না তো, ওরা কি বলেছে, সেসব শুনলে হয়তো তোমাদের মন খারাপ হবে, কথায় কথায় বাড়বে । অনেক রাতে সবুজের মাকে সব কথা খুলে বলে । পরে ঘরের সবাইকে ডেকে বলে, আমি তোমাদের একটা কথা বলবো, তোমরা শুধু শুনবে, কোন প্রশ্ন করবে না । পারলে, আমার কথাটা মেনে চলো । তোমরা কেউ কোনদিনই সবুজের শ্বশুরের বাসায় বেড়াতে যেও না, পারলে বিপদে পাশে থেকো । তোমাদের প্রতি এই আমার নির্দেশ । আর কোন কথা শুনতে চেয়ো না । এরপর বেঁচেছিল মাত্র তিনদিন ।দীর্ঘ বছরের লালিত জীবন রেখাটা হঠাৎ করে তার কেমন এলোমেলো হয়ে যায় ।সারাক্ষন, বড়বেশি চুপচাপ হয়ে বসে থাকে ।পুকুর ঘাটে একাকী বসে বসে সকাল সন্ধ্যা পার করে । আসরের নামাজ পড়বে বলে ওজু করতে গিয়েছিল পুকুর ঘাটে । সেখানে মাথা ঘুরে পুকুরের জলে পড়ে যায়, আর ওঠে দাঁড়ায় নি ।মান অভিমান, লজ্জা, দুঃখ কষ্ট সব পুকুরজলে ডুবিয়ে চিরশান্তির পথে চিরকালের জন্য পা বাড়িয়ে দেয় । সেই মৃত্যুতেও চিত্রা ম্বশুর বাড়িতে আসতে পারে নাই । অজুহাত একটা ছিল, ছেলেটা তখন চিত্রার পেঠের ভেতর একটু আধটু গড়াগড়ি খেতে শুরু করেছে । চিত্রার মা চিত্রাকে আসতে দেয় নাই ।  সবুজের সাথে চিত্রার বড়ভাই এসেছিল, জানাজায় হাজিরা দিতে ।নত মুখে, ভেজাচোখে সবুজ দুইরাত তিনদিন বাড়িতে সময় পার করে, আবারো তার নিজ কর্তব্য কর্মে ফিরে গেছে । সবুজ চিত্রাদের বাসার কাজের মেয়ের মুখে শুনেছে, তার বাবার অপমান আর যন্ত্রনার কষ্টকাব্য । চিত্রার মা তার বাবাকে প্রথমে চিনতেই চায় নি । বসতে বলে নি । চেনার পরেও ন্যূনতম সৌজন্য বোধটুকুও দেখায় নি । ঘন্টাখানেক সবুজের বাবা চিত্রাদের ড্রয়িংরুমে একাকী চুপচাপ বসে থাকে । চিত্রার মা বাবা বা বাসার অন্য কেউ একবারের জন্য উঁকি মেরেও দেখেনা, জানতেও চায়না, অনাহূত আত্মীয় ভদ্রলোক কি প্রয়োজনে এখানে এসেছেন । ঘন্টাখানেক বসে, নিজের সাথে নিজে বুঝাপড়া করে, সবুজের বাবা, বিধ্বস্ত মনে, নিঃশব্দ পায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় ।  সবুজ চিত্রার কাছে জানতে চায়, ঘটনার সত্যতা কতটুকু । চিত্রা কাটকাট জবাব দেয়, আমি কি করে বলবো, আমি তো আমার বাসায় ছিলাম । মায়ের বাসায় কে এলো, কে গেলো, কি ঘটলো. আমি কি করে বলবো । বাবা এখানে আসে নাই । না । তাছাড়া তোমার বাবা বিনে খবরে আমাদের বাসায় গেল কেন ।আমার বাবার এমন কি অসুখ ছিল, যে বাবাকে দেথতে আসতে হবে । মা নিশ্চয়, তোমার বাবার এই আলগা সোহাগটা ভাল চোখে নিতে পারেনি । মা তো বলেছে, বেয়াইয়ের সাথে একটু হাসি মশকরা করতেই তিনি রাগ করে ওঠে চলে গেছেন । কথায় কথায় যার নাকের ডগা লাল হয়ে ওঠে, তার যেখানে সেখানে বেড়ানোর এত সখ জাগে কেন । মা তো ভুলেই গিয়েছিল তোমার বাবা আবার বই পড়ুয়া পন্ডিত । পন্ডিতদের মান সম্মানটা তো সব সময় একটু বেশি টনটনে থাকে । সবুজ বিনা বাক্য ব্যয়ে চিত্রার গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দেয় । চিত্রা কোন সাড়া শব্দ করে না, কান্নাও করে না । ভেজা চোখে শুধু একবার সবুজের চোখে চোখ রাখে, তারপর ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরের দরোজাটা ঠেলে দেয় । সবুজ চিত্রাকে আর কোন কথা বলে নাই । আহত পাখির মতো সারারাত বারন্দার সোফার ওপর বসে ছটফট করে । ঘরে ঘরে পায়চারি করেছে । দীর্ঘশ্বাসে শুন্য ঘরটা ভরাট করেছে । একটা লজ্জা, একটা বিশাল ক্ষত নিয়ে তার বাবা পৃথিবী থেকে চলে গেছে, এই যন্ত্রনাটা আজো সবুজকে কুরে কুরে খায় । ++++++++++++++আট+++++++++++++++++++++     সবুজের বিয়ের বছর চারেক পর, কোন এক ঈদের আগের দিন সবুজ চিত্রাকে নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে আসে । সময়টা বর্ষাকাল ছিল না । তবু হঠাৎ করে বৃষ্টি নামে । ট্রেন থেকে নেমেই সবুজ বৃষ্টির কবলে পড়ে । হূলস্থুল বৃষ্টি । বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় বেশ কিছুক্ষণ তারা ষ্টেশনে বসে অপেক্ষা করে । বৃষ্টির তোড় কমে আসলে ষ্টেশন থেকে টেক্সি নিয়ে বাড়িমুখো হয় । বৃষ্টির কারনে গ্রামের কাঁচা রাস্তা মিনিট কয়েকের বৃষ্টিতে জল থইথই করে, কাঁদায় ভরে ওঠে ।সবুজদের বাড়ির কাছাকাছি এসে টেক্সির চাকা কাঁদাজলে আটকে যায় । চাকা সম্মুখে চলেনা, চলতে পারে না । সামনে যাওয়া সম্ভব হয় না । কাঁদাজলে আটকা পড়ে গরগর শব্দ করে । ঈদ উৎসব উদযাপনের জন্য নয় । সবুজের মায়ের আব্দার রক্ষা করতে সবুজকে বাড়িতে আসতে হয়েছে । সবুজের ছেলে, বয়স প্রায় দুই বছর হতে চলেছে । সবুজের মা এখনো তার নাতিকে দেখেনি । মা তার বড় ভাইকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে, বাবা, তোর ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য মনটা সারাক্ষণ ছটফট করে । আমি তো আর বেশিদিন বাঁচবো না, যদি একবার দাদু ভাইকে দেখতে পেতাম, তাহলে মরেও শান্তি পেতাম । মায়ের ইচ্ছেপূরণ করার জন্য সবুজ আর চিত্রাকে বাড়িতে আসতে হয় । চিত্রা প্রথমে আসতে রাজি হয় নি ।সবুজকে বলেছে, তুমি ছেলেকে নিয়ে গিয়ে বুড়িকে একবার দেখিয়ে আন, মরলেও যাতে কলিজাটা জুড়ায় । কিন্তু পরক্ষনেই বলে, থাক, তোমার একা গিয়ে কাজ নেই ।একদিনেই তো তোমরা সবাই মিলে আমার ছেলেটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে  । গুটি গুটি বৃষ্টি ঝরছে । ছেলেকে টাওয়ালে জড়িয়ে নিয়ে সবুজ টেক্সি থেকে নেমে আসে । চিত্রা টেক্সি থেকে নামে না । সবুজ তাকে নেমে আসতে বলে ।চিত্রা ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দেয়, আমি এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে তোমাদের ঐ টিন বেড়ার বস্তিতে যাব না । তুমি টেক্সিতে ওঠে বসো । আমাকে আর আমার ছেলেকে ঢাকার বাসে তুলে দিয়ে আস, তোমার ইচ্ছে হলে তুমি এই জলে কাঁদায় ডুবে মর । কি পাগলামো শুরু করেছো, এই তো সামান্য একটু পথ, পাঁচ সাত মিনিট লাগতে পারে, নেমে আস । পাঁচ সাত সেকেন্ডের পথ হলেও আমি কাঁদাজলে আমার পা ডুবাবো না । ছেলেটাকে এই বৃষ্টির পানিতে আর ভিজিও না ।ওকে আমার কাছে দাও । টেক্সিওয়ালা সবুজদের পাশের গ্রামের ছেলে । হয়তো সে সবুজকে চেনে । চিত্রার সপ্তমে চড়া কণ্ঠস্বর শুনে সে হাসে । বলে, ভাবী, আমনে নামি আইয়েন, রাস্তা এখনো অত বিরবিজ্জা (পিচ্ছিল) হয় নাই । হাঁটি যাইতে কোন সম্যসাই হইবো না । ব্যাগ দুটা আমি কাঁধে লই যাইয়ের, আমনে দাদারে ধরি পা টিপি টিপি সাবধানে আইয়েন । চোখ কটমট করে চিত্রা একবার টেক্সিওয়ালাকে আরেকবার সবুজকে দেখে । তারপর রাজ্যের বিরক্তি মুখে এনে খুব সাবধানে মাথাটা টেক্সির ভেতর থেকে বের করে আনে, চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ একবার দেখে নেয় । চিত্রার এইটা দ্বিতীয়বার শ্বশুরবাড়িতে আসা ।প্রথমবার বিয়ের দিন, বউ হয়ে তাকে আসতে হয়েছিল । দুই দিন দুই রাত তাকে এই নরকপুরিতে থাকতে হয়েছে, সেই নির্মম অভিজ্ঞতা এখন আবার তার মনে পড়ে । চিত্রার মনটা আবার তেতো হয়ে আসে । সবুজদের বাড়িটা মুল রাস্তা থেকে তিন চারশ গজ ভেতরে । রাস্তাটি সরু, দুইপাশে খাদ, ঝোপঝাড় । বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি জমে গেছে । স্যান্ডেল পায়ে হাঁটা সম্ভব হবে না । স্যান্ডেল হাতে নিয়ে খালি পায়ে চিত্রাকে রাস্তাটুকু হেঁটে যেতে হবে । চিত্রা সব দেখে, পানির ভেতরে সব ভাইরাস, খালি পায়ে হাঁটতে গেলে, সব ভাইরাস পায়ের চামড়া ফুটো করে শরীরের ভেতর ঢুকে পড়বে । বিষাক্ত এসব ভাইরাস তার কিডনি খাবে, লিভার পচাবে, চিত্রা ভাবতে পারে না । চিত্রার ভেতরটা কেমন গুলিয়ে আসে । চিত্রা তার পায়ের স্যান্ডেলের দিকে তাকায় । শাড়ির সাথে ম্যাচকরা দামী স্যান্ডেল, পানি লেগে গেলে তো আরো বেশি সর্বনাশ হয়ে যাবে । টেক্সিওয়ালা ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায় ।  সবুজ বলে, কি হলো, টেক্সি থেকে নেমে আসো । চিত্রা দাঁতে দাঁত চাপে, বলে, নামবো না । আমি তো বহুবার বলেছি, গ্রামে কোন ভদ্রলোক থাকে না, থাকতে পারে না । এই নোংরা ময়লায় পা দিলে আমার এখনি হার্ট এ্যাটাক হবে, বৃষ্টির পানিতে ভিজে আমার ছেলের নিউমোনিয়া হবে । ছেলেটা আমার । আমি এই গ্রামের জলে কাঁদায় নিজেকে রাঙিয়ে রাঙিয়ে বড় হয়েছি । আমার ছেলের কিছুই হবে না, তোমার ও কিছু হবে না । নেমে আস তুমি, তুমি তো আমার ছেলের মা, আমারই বউ । সেটা তো আমার জীবনের সবচেযে বড় দুর্ভাগ্য । কোন পাপের কারণে তোমার মতো একটা লোককে আল্লাহ আমার জীবনের সাথে জোড়া লাগিয়ে দিল, সেটা ভেবে ভেবে আজো আমি কুল কিনারা পাই না । তুমি নেমে আস, বৃষ্টির দু’চার ফোটা পানি মাথায় পড়লে তোমার মাথা ঠান্ডা হয়ে যাবে, তারপর দেখবে তোমার সব ভাবনা উত্তর জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে । বলছি তো, আমি নামবো না । টেক্সির ড্রাইভারকে বলো, টেক্সি টেনে টেনে বাড়ি পযর্ন্ত নিয়ে যেতে । ভাবী বলে তো দাঁত কেলানো হাসি দিয়ে গেল, ভাবীর জন্য এই কষ্টটুকু করুক না । দরকার হলে ডাবল ভাড়া দিয়ে দেবো । বাজে বকবক করো নাতো । নেমে আস বলছি । সবুজের কন্ঠে হালকা উত্তাপ খেলা করে যায় । এ্যাই, ছোট লোকের মতো কথায় কথায় মেজাজ দেখাবে না । জাত অজাত নিয়ে এখন ঝামেলা করো না তো, গ্রামের আলো বাতাস গায়ে লাগতেই সবুজের ভেতরকার মানুষটা হঠাৎ করে জেগে ওঠে । তার সারা শরীর মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে । ইচ্ছে করে চিত্রার এই হামবড়ামি ভাবটা গ্রামের জল বাতাসে ডুবিয়ে মারে । তবু নিজেকে সংযত করে বলে, দেখ, এখানে সিন ক্রিয়েট করো না । রাস্তার দুইপাশে বাড়ি, বাড়ি ঘরের লোকজন উঁকি মেরে দেখছে, আমাদের কথা শুনছে । পাগলামি না করে নেমে এসো । চিত্রা সবুজের হাত না ধরে সাবধানি পায়ে টেক্সি থেকে নেমে আসে । একাই পথ চলতে চেয়েছিল, কিন্তু কি ভেবে একটা হাত সবুজের দিকে এগিয়ে দেয় ।গুটিগুটি পায়ে শ্বশুরের বাড়ির ওঠানে গিয়ে দাঁড়ায় । হৈই চৈই আনন্দ উল্লাসে বাড়ি সরগরম হয়ে ওঠে ।  চিত্রা মুখ বাঁকিয়ে ঘরের কোনে খাটের ওপর গিয়ে চুপটি করে বসে থাকে । কারো সাথে কোন কথা বলে না, চোখ ঘুরিয়ে সব দেখে । *********++++++++++নয়++++++++++++++++++++ ঈদের দিন সকাল থেকে চিত্রাকে খুব স্বাভাবিক দেখা যায় । তার হাসিখুশি মুখ, মিষ্টি কথাবার্তায় সবাই মুগ্ধ হয় । বাড়ির লোকজন চিত্রাকে আপন ভেবে কলকলিয়ে নানা কথা বলে যায় । সকালে ঘুম থেকে ওঠে চিত্রা রান্নাঘরে যায় । ভাবীদের পাশে বসে কাজে হাত লাগায় ।নিজহাতে পরিবার ও মেহমানদের জন্য খিচুড়ি রান্না করে ।নতুন নতুন আইটেমের নাস্তা বানায় । মুরগী মাংস করে । নামাজের পর আগত মেহমানদের নিজ হাতে খাবার সার্ভ করে । হাসিমুখে সবার সাথে কথাও বলে । সবুজ সব দেখে,চিত্রার এই পরিবর্তণ দেখে সে খুশি হয় । কিন্তু বুঝে ওঠতে পারে না, চিত্রার এই ভোল পাল্টানোর পেছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে । বিকেল হলে বাড়ির সকল বউদের সাথে চিত্রাও সারা বাড়ি ঘুরে আসে । সবুজের চাচী জেঠাই সবার পায়ে হাত রেখে সালাম করে । কুশল বিনিময় করে ।এক চাচী বলে, বউ মা, মাঝে মধ্যে তো বাড়ি থেকে ঘুরে যেত পার ।আমাদের ভাল লাগবে, তোমারও একটা পরিবর্তন হবে । চিত্রা হাসি মুখে বলে, চাচী আম্মা, আমি তো আসতে চায়, কিন্তু আপনাদের ছেলে তো আসতে আগ্রহ দেখায় না । বলে, দুর, গ্রামে গিয়ে কি হবে । ওখানে মানুষ থাকে নি । যতসব কাঁদা আর জঙ্গল । এবার তো আসতে চাইছিল না ।আমি তো জোর করে নিয়ে এলাম ।বলেছি, আপনাদের নাতি এবার ঈদ তার দাদা দাদীদের সাথে করবে । চাচী বলে, আমাদের ছেলে বাড়িতে আসতে চায় না, তুমি কি বলছ বৌ মা । হাসিমুখে চিত্রা বলে, জানি, আমার মুখের কথা আপনাদের বিশ্বাস হবে না ।আপনার ছেলে এখন আর গ্রামের সবুজ ছেলে নয়, শহরের সাহেব । আমার কথা বিশ্বাস না হলে, আপনাদের ছেলেকে জিজ্ঞাসা করুন, কথা আমি সত্যি বলছি কিনা । সবুজ ঘরে নেই ।সে তার পুরাণো বন্ধুদের সাথে বাইরে বসে আড্ডায় মেতে আছে । চিত্রা ছেলেকে কোলে নিয়ে সবুজের মায়ের পাশে গিয়ে বসে । সবুজের মা বিছানায় ওঠে বসে । বলে, দাদু ভাইকে আমার কোলে দাও । চিত্রা ছেলেকে সবুজের মায়ের কোলে বসিয়ে দেয় । দাদী নাতীকে জড়িয়ে হাসে, দন্তহীন গালে বারবার চুমো খায়, নাতীর সাখে কত কথা বলে যায় । ছেলেটা চোখ তুলে তার দাদীকে দেখে, হাসে । চিত্রা বলে, মা, আপনারা সবাই এতো ভালো, আপনাদের এত দয়ামায়ার শরীর, আর আপনার ছেলেটা যেন কেমন । কেন বৌমা, আমার ছেলে কি করেছে । না, কিছু করে নি, বলছি, ও যেন কেমন একটু নিষ্ঠুর প্রকৃতির । কারো জন্য কোন দয়া মায়া বলতে ওর ভেতরে কিছু নেই । সবুজের মা হাসে, বলে, না বৌমা, সবুজ নিষ্ঠুর নয়, ও একটু পাগলাটে স্বভাবের ।তবে আমার ছেলের মনটা খুব ভালো ।আমি সবুজের মা বলছি, আমার সবুজের ভেতরটা কলাগাছের বোগলির মতো সাদা । কোন দাগ তুমি সেখানে পাবে না ।সবুজের বাবাও ছিল, ওরকম সহজ সরল । মা, আপনার ছেলে তো, আপনার কাছে হীরের টুকরোই হবে ।কিন্তু, আমি তো সেইসব আজ পযর্ন্ত কিছুই ওর ভেতরে দেখি নাই । আপনার প্রতিও ওর দরদ ভালবাসা আছে বলে, আমার মনে হয় না ।যদি থাকতো, এই যে আপনি বছর খানেক আগে পুকুরের ঘাটে পড়ে গিযে পাযে ব্যথা পেয়েছিলেন ।সেই সময়ে আমি কত হাজারবার ওকে বলেছি, মাকে শহরে নিয়ে আস, এখানে একজন ভালো ডাক্তার দেখাও, গ্রামের টোটকা ঔষুধে মায়ের পা ভালো হবে না ।কিন্তু, আপনার ছেলে আমার কথা শুনলো না ।উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে, বলে, যা বুঝনা তা নিয়ে বকবক করো নাতো । কত করে বললাম, মাকে দেখে আস, তোমার একার যদি যেতে ইচ্ছে না করে, তাহলে আমিও তোমার সাথে যাব । কিন্তু, ওতো ভীষন একগুঁয়ে কারো কথা শুনতে ও রাজি নয় । সবুজের বড়ভাবী মায়ের ঘরে আসে । বলে, মা তো দেখছি, তার বড়ছেলের বউয়ের কথা ভুলে গেছে । নতুন জনকে পেয়ে পেঠের খিদের কথাও ভুলে গেছে । মা, ভাত খাবেন না । নাকি ছোট ছেলের বউয়ের সাথে গল্প করে পেঠ ভরে গেছে ।  বড়ভাবী মায়ের কোল থেকে সবুজের ছেলেটাকে কোলে তুলে নেয় । চিত্রা কিছু একটা বলতে চায় । সবুজের মা হাত ইশারায় চিত্রাকে চুপ থাকতে বলে ।চিত্রা ভাবীকে বলে, ভাবী, এই সন্ধ্যারাতে ভাত খেতে হবে । তোমাকে এখন খেতে হবে না । মাকে চারটে খাইয়ে দিই । ঘরের ছেলে মেয়েরাও খেয়ে নিয়েছে ।তোমার ছেলের জন্য গরুর দুধ গরম করে রেখেছি, কিভাবে খাওয়াবে, ওকেও খাইয়ে দাও । আমরা বড়রা সবাই মিলে একসাথে খাবো । চিত্রাও সবুজের বড়ভাবী ওঠে রান্নাঘরের দিকে যায় । সেখানে বসে চিত্রা সবুজের চরিত্রকে কেটে ফালি ফারি করে ।সবুজের বড়বাবী বড়বড় চোখ করে শুধু চিত্রার কথা শুনে, কোন কথা বড়ভাবীর মুখে আসে না । চিত্রার কথা বড়ভাবীর ঠিক বিশ্বাস হয় না, তবু মনে প্রশ্ন জাগে,সবুজ ভাই, এমন, হতেও পারে, পুরুষ মানুষকে কতটুকু আর চেনা যায় । চিত্রাতো তারই বউ, ওতো আর মিথ্যা বলবে না । ++++++++++++++++দশ++++++++++++++++++++++++++     রাত দুপুর ।বিছনায় শুয়ে আছে সবুজ ।তার ঘুম আসছে না । নানা ভাবনায় এলোমেলো হয়ে আছে সবুজের মনটা ।কোল বালিশে বুকে চেপে ধরে এপাশ ওপাশ করে । অস্তির চিত্তে ওঠে বসে । চিত্রার দিকে চোখ মেলে দেখে । চিত্রা গভীর ঘুমে বিভোর । চিত্রার এই একটা মহৎ গুণ । বিছানায় পড়তে না পড়তেই ঘুমের গহীনে সাঁতার কাটতে শুরু করে । নাক ডেকে ডেকে সুখের ঘুম ঘুমায় । সবুজ বিছানা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায় । লাইট জ্বালায়, আবারো চিত্রার দিকে চোখ রাখে । চিত্রা ত্রিভুজ ভাজে শুয়ে আছে, লাইটের আলোতেও তার নড়ন চড়ন নেই । সবুজ লাইট বন্ধ করে । বাথরুমে যায় । অনেকক্ষণ ধরে চোখে মুখে পানি ছিটায় । এসে টেবিল ল্যাম্প জ্বালায় । ড্রয়ার খুলে ডাইরি বের করে । কলম হাতে নিয়ে সাবধানী হাতে চেয়ার টেনে বসে । সবুজ তার ডাইরিতে লেখে, লেখা না, শব্দের আঁচড়ে একটা দৃশ্য আঁকতে চেষ্টা করে । ছায়া শীতল সবুজ গ্রামের দৃশ্য । ছনের টিনের ছাউনি দেয়া বেড়ার কিছু ঘর । নিকানো ওঠান, একটি মুরগি, তার সাথে পাঁচ ছয়টা ছানা । একটা ন্যাংটা শিশু মুরগি ছানার পেছনে ছুটছে ।বাইর বাড়ির খোলা চত্বরের এক কোনে সারি দিয়ে কয়েকটা খড়ের স্তুপ ।পাশে লম্বাটে একটা গোয়াল ঘর, গোয়াল ঘরের পেছনে খাদা খন্দক । অযতেœ গড়ে ওঠা বুনো লতাপাতা আর গাছপালায় আবৃত সবুজ বন ।সবুজ বনের ভেতর ডাহুক পাখির শিকারী চলাফেরা । সবুজ একটুখানেক থামে । তার মনে হয়, ছবিটার কোথায় যেন ভুল হয়ে যাচ্ছে । কলমটা ঠোঁটে কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে । গভীর ভাবে মনে করতে চেষ্টা করে, হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যটা কি । সবুজের মনে পড়ে, মনে পড়ে না, ঝাপসা একটা ছায়ার মতো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে বড় পুকুর, জলে টইটুম্বর ।শাপলা ফুল, সাদা লাল, শত শত অগুনতি । জলের ওপরে তলে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট বড় নানাজাতের মাছ । মাছের সাথে পাল্লা দিয়ে গুটি কতেক ছেলে মেয়ে, উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ,সাঁতার কাটছে, ডুবছে, ভাসছে । একটা পানকৌড়ি পাখি ডুব দিয়ে, ক্ষনিক পরে ভেসে ওঠে, ঠোঁটে একটা বেলে মাছ । পুকুরের পাড়ে আম জাম গাছের সারি, খোলা চত্বরে রাজবেশে দণ্ডয়মান এক বিশালাকৃতির ডুমুর গাছ । থোকা থোকা ডুমুর ফল ঝুলে আছে ঘন সবুজ পাতার আড়ালে আবড়ালে । গাছের ছায়ায় বাঁধা আছে, লাল রংয়ের দুধেল গাভী । মায়ের ওলানে মুখ রেখে চুকচুক শব্দ তুলে আনন্দে নেজ নাড়াচ্ছে, কালো রংয়ের দুর্বল এক বাছুর ।  পুকুর ঘাটে মেয়ে মহিলাদের জটলা । ভেজা শাড়ি লেপটে ধরে রাখা শ্যামলা কালো শরীর, জল ফোটা গড়ানো মা বোনদের নরম কোমল শরীর । পিঠের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভেজা ভেজা লম্বা ঘন কালো মেঘ । সবুজের কলম থেমে যায় । বন্ধ চোখে দেখে, হৃদয়ের প্রশস্ত অঙ্গিনায় কেউ একজন পেছন ফিরে ফিরে দেখে, ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে সামনের দিকে চলে যায় । নুপুর ধ্বনি, রিনিঝিনি বেজে ওঠে মনের ওঠানে । সবুজ আবারো লেখে, একটি মেয়ে, কালো গায়ের রং, মাথার লম্বা চুলে লাল ফিতার বেনি । পুকরের পাড়ে, বাড়ির খোলা ওঠানে, আশে পাশে ঝোপঝাড়ে একাকী একটি মেয়ে হেঁটে বেড়ায় । নরম আঙ্গুলের ঠোকায় গাছের পাতা নাড়ায়, তার চোখে মুখেও কচি পাতার ঝলমলে হাসি খেলা করে যায় । মেয়েটির বয়স, সবুজের বয়স তখন কত ছিল । মেয়েটা তো স্কুলে যেতো, সবুজ ও । মেয়েটির পরণে কলাপাতা রংয়ের স্যালোয়ার কামিজ, গায়ে সিল্ক ওড়না । চোথ দুটি জোনাকি আলোতে ঝলমল । মেযেটার নাক ঠোঁট, তার উপমা সবুজের জানা ছিল না, এখনো জানা নেই । সেগুলো শুধু সুন্দর । একটা গন্ধ তার নাকে এসে লাগে । গন্ধটা কিসের, সবুজ বুঝে ওঠতে পারে না । কোন পারফিউম, কোন পরিচিত ফুল, ভেজা মাটির গন্ধ, যেন বহু দুর থেকে ভেসে ভেসে আসে । কেমন একটা ভাল লাগা অনুভুতি, সবুজের শরীর শিউরে ওঠে । একটা কোমল হাত, কচি লাউয়ের ডগার মতো, আলতো করে ছুয়ে দিয়ে যায় । পিঠের ওপর চৈতি হাওয়ার চঞ্চল উষ্ণ হালকা নিঃশ্বাস । সবুজ চোখ বন্ধ করে রাখে, নিজের নিঃশ্বাস টাও । সবুজ বুঝতে পারে না, মাঝে মধ্যে কেন তার এমন হয় । আজ কত বছর, কত যুগ হয়ে গেছে । সেই নবীন চঞ্চল কৈশোরে কেউ একজন তার হাতে হাত রেখেছিল, খোলা চুলের ঘুর্ণি দিয়ে তার সারামুখ ভাসিয়ে দিয়েছিল ।সেই প্রাকযুগের বনলতা আজো কেন তার মনের কোনে জেগে ওঠে, নেচে ওঠে, কেন তাকে এভাবে বিবশ করে তুলে । সবুজের কলম থেমে যায় । সবুজ চোখ বন্ধ করে । একটা আনন্দ, একটা সুখানুভব, বসন্ত হাওয়ার মতো, শ্রাবণ জলধারার মতো, তার মনোবন্দরে আচড়ে আচড়ে পড়ে । অস্পষ্ট ছায়ার মতো, কেউ একজন তার হারিয়ে যাওয়া সুখের বাড়িতে ওঠানে আঙ্গিনায় হেঁটে বেড়ায়, গুনগুন করে গান গেয়ে যায় । মেয়েটা তখন পুকুর ঘাটে একাকী, পুকুর জলে তার পদ্ম ডাটার পা দুটি জলের তলে তিরতির করে কাঁপছে, ভাসছে । কিছু ধ্বনি, ফিসফাস কিছু শব্দ তরঙ্গ, অস্পষ্ট হয়ে তার মনোবীনায় সুর তুলে । সবুজের ঠোঁটে হাসি খেলা করে । সবুজ আর কিছু ভাবে না, দেখে না, সেই সুখ, আনন্দ ছায়ার গহীনে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে । +++++++++++++++++++এগার ++++++++++++++++++++++ চিত্রা স্বভাবের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, সে বিছানায় তার পিঠটা ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই ঘুম পাড়ানি মাসি পিসিরা তার কানের কাছে গুনগুনিয়ে গান শিুরু করে । চিত্রা নাক ডেকে ডেকে তাদের গুনগুনানি শুনে । মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক হাত পা ছুড়ে ।হাতের ছোঁয়ায় সবুজকে খুঁজে না পেলে চিত্রারে ঘুম ভেঙ্গে যায় ।সে চোখ খুলে, দেখে, সবুজ কোথায়, সবুজ বিছানায় থাকলে, কখনো সবুজের বুকের ভেতর, কখনো আবার পিঠের সাথে নিজেকে লেপ্টে দিয়ে নাক ডাকতে শুরু করে । আজও সবুজের বুকের সাথে নিজের মাথাটা গুজে দিয়ে ঘুমিয়েছে । মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখে, সবুজ বিছানায় নেই । ধড়মড় করে চিত্রা বিছানায় ওঠে বসে । চোখ ঘুরিয়ে দেখে, পাশের টেবিলে ল্যাম্প জ্বলছে,টেবিলে মাথা রেখে চেয়ারে বসে সবুজ ঘুমাচ্ছে ।চিত্রা  বিছানা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়, ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় সবুজের পাশে । সবুজের বাম হাতটা লম্বালম্বি ভাবে টেবিলের ওপর শুয়ে আছে ।ডান হাতটা মাথার নিচে ভাঁজ করা, হাতের দুই আঙ্গুলের ফাঁকে একটি কলম । বাম হাতের নিচে ডাইরি, ডাইরি খোলা,সেখানে কিছু লেখা মুক্তোর মত জ্বলজ্বল করছে । সবুজের কন্ঠস্বরে গুনগুন স্বর বাজে । চিত্রা অবাক হয়, সবুজ তাহলে ঘুমায় নি, চিত্রা সবুজের পিঠে হাত রাখে । সবুজ নড়ে না. চোখও খোলে না ।চিত্রা আবারো শুনে, একটা ক্ষীন সুরধ্বনি সবুজের গলার ভাঁজে ভাঁজে খেলা করছে । চিত্রা আলতো হাতে সবুজের হাতটা ডাইরির ওপর থেকে সরিয়ে নেয় । নিঃশব্দে ডাইরিটা তার হাতে তুলে নেয় ।ঘুম চোখে, থেমে থেমে একটু একটু করে চোখ বুলায়, পাতা উল্টায় । ধীরে ধীরে চিত্রার মেজাজে আগুন শিখা নেচে ওঠে । নোংরা লোক একটা, রাত জেগে জেগে মেয়ের রুপ শরীর নিয়ে কাব্য লিখছে । কর্কশ স্বর ধ্বনির সাথে সাথে ডাইরিটাও ফ্লোরে পড়ে হা হয়ে থাকে । চিত্রার ঝনঝনানিতে সবুজের ঘুমধ্যান ভেঙ্গে যায় । সবুজ কিছু বুঝে ওঠার আগে ঘরের ভেতর শুরু হয়ে যায়, উন্মত্ত ঘুর্ণি হাওয়া, সমুদ্র গর্জণ ।  চিত্রা বলে, ডাইরিতে এসব কি মাথামুন্ড লিখেছ । তোমার রুচিবোধ কি কখনো বদলাবে না । এই বলে ডাইরি টাকে একটা লাথি মেরে ঘরের এককোনে গড়িয়ে দেয় । সবুজ চোখে তখনো ঘুমের রেশ । সে বুঝতে পারে না, এই রাতে চিত্রা কেন এরকম আচরণ করছে ।সবুজ তন্দ্রালু স্বরে বলে, কি হয়েছে, এত চেঁচামেচি কেন করছ । চিত্রা ডাইরিটা তুলে নিয়ে আসে, বলে, রাত জেগে জেগে এসব কি নোংরামো হচ্ছে শুনি । নোংরামি, ডাইরি নিয়ে কি নোংরামি আমি করেছি । কি লিখেছো, আঙ্গাল বাঙ্গালের মতো এসব জঘন্য চিন্তা ভাবনা তোমার মাথায় আসে কোথা থেকে । চিত্রার রাগের কারণটা সবুজের কাছে পরিষ্কার হয় । সবুজ রাগ করে না, মিষ্টি হেসে বলে, ডাইরি লেখা ভাল ।পৃথিবীর জ্ঞানী গুনী সব ব্যক্তিরা সব সময় ডাইরি লিখতেন । চিত্রা মুখ ভেংচি কেটে বলে, আহা রে, আমার জ্ঞানী পন্ডিত । অত পন্ডিতগিরি তোমকে দেখাতে হবে না ।মানুষ নিজের নোংরামীর কথা লুকিয়ে রাখে, আর তুমি লিখিত দলিল বানাচ্ছ । তোমার এই সব নোংরা কথার হালখাতা যদি আমার ছেলের হাতে পড়ে, তাহলে কি সর্বনাশটা হবে, বুঝতে পারছো । চিত্রার ছেলের বয়স বছর ছয়েক হবে, একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে । বাংলা বই সে পড়তে পারে না । ছেলে বরফ চেনে না, আইচ চেনে । মা বাবা চেনে না, মম ড্যাড চেনে । সেই ছেলেকে নিয়ে চিত্রার ভয়ের শেষ নেই । সবুজ চিত্রার দিকে তাকিয়ে একটু খানেক হাসে । বলে, তোমার ছেলে তো বাংলা অক্ষরও চেনে না, তাকে নিয়ে অহেতুক কেন এতো ভয় পাচ্ছো । আর আমি তো খারাপ কিছু লিখি নাই, লিখিও না । তুমি একটু ভালো করে পড়ে দেখ, দেখবে, এটা আমার গ্রামের ছবি, শিশু শৈশবের ভাললাগার ভালবাসার স্রোতস্বিনী, যে ভালবাসা মিশে আছে আমার বহমান রক্তস্রোতে । পড়ালেখার প্রতি চিত্রার আগ্রহ কোন কালেও ছিল না । চিত্রা ঝাঁ ঝাঁ স্বরে বলে ওঠে, ভালবাসার আর জিনিষ পেলে না । ঐ র্দুগন্ধে ভরা গ্রাম, তোমাকে এই রাতদুপুরে ভালবাসার গান শুনাচ্ছে ।ঐ যে খোলা চুলের মেয়েটা, জলে পা ডুবিয়ে, সে কি তোমার নতুন আসমানি । যত সব ইতরামি, নোংরা চিন্তা ভাবনা । সবুজ কিছুক্ষণ চুপ করে পাথর হয়ে থাকে । বুকের কষ্ট আর চোখের জল চাপা দিয়ে মিনমিনিয়ে বলে, আচ্ছা, তোমার যখন পছন্দ নয়, তখন আর লিখবো না । শুধু লেখা না, রাত জেগে আর তোমাকে বইও পড়তে হবে না । সবুজ করুন চোখে চিত্রাকে দেখে । ক্ষীনস্বরে বলে, বইও পড়তে দেবে না, আমার বই পড়াতেও তোমার সম্যসা । হ্যাঁ, তোমার বই পড়াতে আমার সম্যসা আছে । তুমি তো আর মাষ্টার মহাশয় না, যে রাত জেগে জেগে তোমাকে বই পড়তে হবে । বইপড়া হলো যতসব অকর্মাদের কাজ ।এসব বই পড়ে পড়েই তো আজকালের ছেলে মেয়েরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । বই পড়লে ছেলে মেযেরা নষ্ট হয়ে যায়, জানতাম না তো, এরকম উদ্ভূট কথা বাপের জন্মেও শুনি নি । তুমি কি কচুটা জানো, আলতু ফালতু বই পড়ে পড়েই তো নিজের জীবনের চৌদ্দটা বাজিয়েছো ।অনেকের মুখে শুনেছি, বইপড়া একটা নেশা । মদ হিরোইনের মত নেশা । তুমি বল, তুমি তো অনেক পন্ডিত, নেশা করা কি ভাল জিনিষ । কোন নেশা কি কখনো কারো ভাল করেছে । আর এই যে আমি, দুই দুইবার আই এ পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারলাম না । কেন জানো তুমি । সবুজ জানত না যে, চিত্রা আই এ ফেল । সবুজের খালাত ভাই বলেছিল, চিত্রা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ নেই । আই এ পাশ করে আর কলেজে যায় নি ।চিত্রার মা বলেছিল, মেয়েটাকে এত করে বলছি, বি এ পরীক্ষাটা দিয়ে দাও, কিন্তু মেয়ে আমাদের কারো কোন কথা শুনছে না । সবুজ এসব কথা তার বিয়ের আগে শুনেছে । চিত্রার রুপে সবুজ এতই মুগ্ধ ছিল যে, সবুজের সাথে চিত্রার প্রথম দেখায় এসব কথা জিজ্ঞাসা করার কথা তার মনেই আসে নাই । পরবর্তি সময়ে এইসব জানার মত সাহস সবুজের আর হয় নি । সবুজ বলে, মাথাটা ঠান্ডা করে তুমি লক্ষী হয়ে আমার পাশে বস । সবুজ নিজেই চিত্রাকে টেনে কাছে বসায় । আলতো হাতে চিত্রাকে জড়িয়ে নিয়ে বলে, জানিনা তো, তুমি তো কখনো আমাকে তোমার স্কুল কলেজ জীবনের কোন কথা বলো নি । কি করে বলব, তুমি তো সারাক্ষণ তোমার জ্ঞানবুদ্ধির কচকচানি দিয়ে আমার মেজাজটা গরম করে রাখো ।আমার নিজের কথা কি তুমি কখনো শুনতে চাও, না চেয়েছো । সবুজ তাকে আরো গাঢ়ভাবে চেপে ধরে, চিত্রার মুখের কাছে নিজের মুখ এনে সুরেলা সুরে বলে, লক্ষী সোনা আমার, বলো তো, কেন তুমি আইটা পাশ করতে পারলে না । আমি শুনবো ।  ঐ যে সারক্ষণ বই বই করো, সেই বইতো আমার জীবনের গোড়াতেই গিট্টু লাগিয়ে দিয়েছে । বই, বই তোমার জীবনের চলার পথে গিট্টু মেরে দিল, এরকম আজব কথা তো আমিও আমার জীবনে কখনো শুনি নাই ।খোলসা করে বুঝিয়ে বল ।সবুজ চিত্রার চুলের খোঁপাটা খুলে দেয় ।চিত্রার ঘন কালো চুল চিত্রার বুক পিঠ ছড়িয়ে পড়ে । আচ্ছা, তোমার মাথায় কি দোষ আছে নাকি । চুলটা খুলে দিলে কেন ।কি আছে চুলের ভেতর ।যে, সারাক্ষণ চুল ধরে নাচানাচি করো । খোলা চুলের কন্যা আমার, বলেই সবুজ একটু খানেক থামে । বলে চিত্রা সোনা, তুমি কিন্তু, ট্রেক চেইঞ্জ করার চেষ্টা করছ । কথা হচ্ছিল, পাশ ফেইল নিয়ে ।  চিত্রা নিজেকে কিছুটা শান্ত করে, ধীর স্থির গলায় বলে, আসলে, তুমি আবার আমাকে ভুল বুঝবে নাতো, আগেই আমি বলে রাখছি, আমি কিন্তু, তোমার মত লম্পট নই ।নোংরামি আমার একদম পছন্দ হয় না । আমি তোমকে কখনো বলেছি, তুমি একটা বাজে স্বভাবের মহিলা ।বলি নাই তো, আমার নিজের সোনা মনিকে কি আমি কখনো খারাপ বলতে পারি । চিত্রা বলে যায়, কলেজে যখন ভর্তি হই, তখন কি হইচই না করে সময়গুলো কাটত ।একদিন আমার এক বান্ধবী একটা বই আমাকে হাতে দিয়ে বলে, চিত্রা বইটা পড়ে দেখ, দেখবি, কি সুখ । এত সুখ যে বই পড়ে পাওয়া যায়, এটা আমিও এর আগে বুঝি নাই । বইটা আমি বাসায় নিয়ে আসি ।একটু রাত হলে, যখন দেখি, চয়না ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন নিজ ঘরের দরোজা বন্ধ করে বইটা পড়তে শুরু করি ।পড়তে পড়তে দেখি, আমার সারা শরীর ঘেমে ভিজে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে ।কেমন একটা ভাললাগা উত্তেজনা, আমার সারা শরীরকে উত্তপ্ত করে দিচ্ছে ।সারা রাত জেগে আমি বইটি পড়া শেষ করি । বইটি পরের দিন আমি আমার বান্ধবীকে ফেরত দিয়ে দিই, বলি, সত্যিই ফাটাফাটি বই । রাতে তো ঘুমাতেই পারি নাই । তোর ষ্টকে আরো আছে নাকি । বান্ধবী হেসে বলে, আরো অনেক আছে, কাল পেয়ে যাবি ।এরপর আরো দুইটা বই আমি গিলে গিলে খেয়েছি । একদিন রাতে, ভুলে বোধ হয় দরোজাটা বন্ধ করা হয় নি ।আমরা ঘুমিয়ে পড়লে,বাবা প্রায় রাতেই আমাকে ও আমার বোনকে একবার দেখে যায় । সেই রাতেও বাবা চুপিচুপি আমাদের ঘরে আসে ।দেখে, আমি মোহাচ্ছন্ন্ হয়ে বই পড়ছি । বাবা আমাকে বই পড়তে দেখে খুশি হয়, বলে, বাহ ! আমার চিত্রা মায়ের তো তাহলে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে । বইটা আমি লুকাতে ও পারছি না । বাবা বইটা আমার হাত থেকে তার হাতে তুলে নেয় । বইয়ের দুই একটি পাতা উল্টিয়ে বাবা ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করে ।বলে, আমার পাপের শাস্তি তো আমাকেই ভোগ করতে হবে । বাবা আমাকে কিছু বলে না । বইটা হাতে নিয়ে বাবা ঘর থেকে বের হয়ে যায় । এর পর সপ্তাহের বেশি সময় বাবা আমার দিকে চোখ তুলেও তাকায় নি, আমার সাথে আর একটি কথাও বলে নাই । সেই তো শেষ । আর স্কুলের পড়া পড়তে ইচ্ছে করে না, পড়লেও কিছুই মনে থাকে না । সারাক্ষন বইয়ের কথাগুলো, ঘটনাগুলো মনের ভেতর নড়াচড়া করতে থাকে ।সেইসব অখাদ্য খেয়ে খেয়ে মনের বারোটা বাজিয়ে দিলাম । তাইতো পরীক্ষা পাশটা হলো না । আই এ, বি এ, পাশ করতে পারলে কি আর তোমার মতো একটা গর্দভের সাথে আমার বিয়ে হয় । তোমার সেই বান্ধবীটা এখন কোথায় । আমি কি করে বলব, সে হারামজাদী মরছে না জাহান্নামে গেছে । *******************========বার============== সবুজ বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজের চেহেরাটা দেখে । চিত্রার কথাগুলো তার মনে আসে । কি বলছে চিত্রা ।আই এ পাশ করতে পারে নাই । কিসব নোংরা বিশ্রী বই পড়ে পড়ে, সবুজ কি ভুল করেছে । চিত্রা কি সত্যিই, সবুজ ভাবতে পারে না । তার মনটা কেমন বিষিয়ে ওঠে । সবুজ অনেকক্ষন ধরে তার চোখে মুখে পানি ছিটায় ।চোখ মুখ শীতল হয়ে আসে, কিন্তু, মনটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে।চিত্রাকে নিয়ে সবুজ কোনদিনই সুখী ছিল না, সেটা সত্যি, কিন্তু তাই বলে, চিত্রার নোংরামি, চিত্রার চরিত্র, কি হলো, বাথরুম বসে বসে কিসব ভাবছ । আমার বান্ধবী একটা, ও মরেছে, গলায় ওড়না ঝুলিয়ে ওকে ওর পাপের ফল ভোগ করতে হয়েছে । চিত্রার কথায় সবুজের ধ্যান ভাঙ্গে । সবুজ হাত মুখ মুছে বের হয়ে আসে । সবুজ চিত্রাকে আর জড়িযে ধরে কাছে বসতে চায় না । চিত্রার সাথে কোন কথা বলতেও তার ইচ্ছে করছে না । চিত্রা নিজেই সবুজের গা ঘেষে বসে । বলে, মাগো, কিসব বিশ্রী বিশ্রী নোংরা বই । তুমি কি বই পড়েছো, যাতে শুধু নোংরা নোংরামিতে ভরা, কার লেখা । লেখকের নাম কি আমি তোমার জন্য মুখস্ত করে রেখেছি নাকি, দুই চারটে বইয়ের নাম বলো, শুনি । কেন জিহ্বায় জল ঝরতে শুরু করছে বুঝি । বলবো না, আর আমার মনেও নেই, কিসব নাম টাম ছিল । ঐসব ফালতু বই পড়ে পড়েই তো আমি নষ্ট হয়ে গেলাম । সবুজ আঁতকে ওঠে, নষ্ট হয়ে গেলে, এর মানে কি ।সবুজ অনেকটা আর্তনাদ করে ওঠে, চিত্রা কি বলছ তুমি । তুমি একটা নষ্টা মেয়ে মানুষ । আর দুর, আমি বলেছি, ঐ বইগুলোর কথা । যেগুলো পড়ে পড়ে আমার মনটা নষ্ট হয়ে গেল । আমি আর পরীক্ষায় পাশ করতে পারলাম না । সবুজ স্বস্থির শ্বাস ফেলে । হা হা করে হাসে, সবুজের বুকটা হালকা হয় । হাসি মুখে বলে, তাই বলো, আমি তো মনে করেছিলাম । তুমি তো তাই মনে করবে । পুরুষ জাতের ধর্মই এই, ওদের কাছে পৃথিবীর সব মেয়ে মানুষই নষ্টা, দুশ্চরিত্রা । আর তোমরা পুরুষেরা সবাই সাধু সন্ন্যাসী । সবুজ হাসে, বলে সরি, আমি আসলে একটু মেন্টালি ডিষ্ট্রাব হয়ে পড়েছিলাম ।তাই কি বলতে কি বলে ফেলেছি । সরি, তুমি আমাকে ভুল বুঝ না । আমি এরকম ভাবতে চায় নি, কিন্তু, মানুষের মন তো । তুমি মনে কষ্ট নিও না । মানুষের মন নয়, বল, পুরুষের মন, তাই সারাক্ষন মেয়ে চরিত্রের খুঁত খুজে বেড়াতে সুখ লাগে ।ইতর কতগুলো । সবুজ চিত্রাকে স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করে । চিত্রাকে জড়িয়ে কাছে টেনে নেয় । তার কপালে আলতো করে একটা চুমো খায়, বলে, কান ধরছি, জীবনে আর কখনো এরকম হবে না । চিত্রা বলে, থাক, একটা নষ্টা মেয়েকে নিয়ে আর সোহাগ করতে হবে না । ঘুমিয়ে পড় । সবুজ আমতা আমতা করে বলে, দেখ, ভাল মন্দ দুটোই তো জীবনের অংশ । কেউ জীবনের নগ্ন অংশটুকুতে হালকা চাদর টেনে সেই নগ্নতাকেও সুন্দরে সৌরভে ভাসিয়ে তুলে, আবার কেউ, আদি রসকে আরো উলঙ্গ করে করে আরো বেশি আদিম করে তুলে । আদিমতার রসাজালে টেনে টেনে জীবনের খন্ড এই অংশটাকে আরো বীভৎস করে ছেড়ে দেয় ।ভুললেই চলবে না, এই আদিরস, উলঙ্গতা, নোংরামি নষ্টামিও কিন্তু জীবনের একটা অংশ । তোমার পড়া বইগুলো সেই আদি রসের ভান্ডার । অনেক পাঠকই কিন্তু তা পড়ে, পড়ে পড়ে এক ধরনের সুখানুভবে দিন রাত ভোর হয়ে থাকে,কেউ কেউ আবার সারা জীবন এই মানষিক অসুস্থতায় ভুগে । কেন, বইতে এসব খারাপ কথা লেখা হবে । বইতে লেখা থাকবে, কৌতুক, হাসি, দুঃখের কথা, কখনো কখনো কিছু জ্ঞানের কথা । মেয়েদের রুপ আর শরীর নিয়ে কেন এতো টানা হেঁচড়া । ঐ থেকেই শুধু বইয়ের উপর নয়, গোটা পুরুষজাতের ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে । সবুজ চিত্রার সাথে একটু কৌতুক করে । বলে, এই ঘেন্নার কারণে তোমার মুখটা এখনও তেতো হয়ে আছে । তাই বলছি, তুমি তোমার নিজের হাতে দুইকাপ দুধ চা করে নিয়ে আস, চা খেয়ে মিষ্টি মুখে তুমি আমার সাথে তোমার নষ্ট হয়ে যাবার গল্প করবে । তখন আর আমাদের কারো মুখ তেতো থাকবে না । চিত্রা হাসিমুখে সবুজের দিকে তাকায় । হঠাৎ সবুজের মনের ভেতর খটকরে কিছু শব্দ বেজে ওঠে,বাবা, বিনা দোষে একটা মেয়েকে এভাবে শাস্তি দিস না, মেয়েটার দীর্ঘশ্বাস পড়বে, মেয়েটার মায়ের অভিশাপ লাগবে ।তোর জীবনটা তছনছ হয়ে যাবে । কথাগুলো সবুজের মায়ের । সবুজ কি সত্যি চিত্রার কোন কূল কিনারা খুঁজে পায়, পেয়েছে ।স্ত্রী নং চরিত্রং, না, সবুজ সব মেয়েকে এক পাল্লায় মাপতে পারবে না । চিত্রা শুধু চিত্রাই ।বিয়ের পরদিন থেকে সুখ তো দুরের কথা, সবুজ শান্তি শব্দটার মানেও ভুলে গেছে ।বাসায় যতক্ষন থাকে, ততক্ষন চিত্রার ঝাঁ ঝাঁ, ভাষাজ্ঞান ওর এত বাজে কেন, সবুজ বুঝতে পারে না ।ওর হাত মুখ কিভাবে চব্বিশঘন্টা সমান তালে চলে ।সবুজের কোন কথা চিত্রা বুঝে না, বুঝতেও চায় না । সবুজের ইচ্ছে, আগ্রহ, সখ, কোন কিছুর মূল্য চিত্রার কাছে নেই ।সবুজ জোর খাটাতে গেলে, তখন চিত্রার সারা শরীরে যে রুদ্র মূর্তি ফুটে ওঠে, তা দেখে তো স্বয়ং শিব ঠাকুরও ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে । এ কোন ফাঁসরজ্জু সবুজ গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে ।পান থেকে চুন খসলে, সেই রজ্জুতে টান পড়ে । আর তখনি সবুজের দমটা বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয় ।   ***************************তেরো***************** চিত্রা দুই কাপ চা হাতে, হাসিমুখে ঘরে ঢুকে । বলে, এই যে, লাট সাহেব, আপনার জন্য চা নিয়ে এসেছি । চায়ের সাথে কিছু খাবে, নাকি খালি চায়ে পেঠ ভরবে । সবুজ জোর করে এক চিলতে হাসি তার ঠোঁটে চেপে রাখে । বলে, অন্য কিছু লাগবে না, থালি চা ই ভালো । চিত্রা ও সবুজ গায়ে গায়ে লাগিয়ে বিছানায় বসে । সবুজ চুপ করে আরো কত ভাবনায় ভাবিত হয় । চিত্রা বলে, এই শুন, আমি একটা বই পড়েছি, বইটার নাম মনে পড়েছে, লেখকের নাম মনে নেই । কি বাজে বই, কি বিশ্রী সব কথাবার্তা । এখনো মনে পড়লে আমার গা গুলিয়ে আসে । বইটার নাম কি । চিত্রা কিছুক্ষন চিন্তা করে বলে, এই দেখ, আবারো ভুলে গেছি । কিছুক্ষন আগেই মনে পড়ল, এখন আবার ভুলে গেলাম ।একটা ছেলে, পনের ষোল বছর, আর মেয়েটা তের চৌদ্দ, মেয়েটার মা বাবা মেয়েটাকে একা রেখে বাইরে কোথায় যেন গেছে ।সেই খালি ঘরে, চুপিচুপি ছেলেটা আসে । ছেলেটা নিজ ইচ্ছায় আসে না, মেয়েটা ছেলেটাকে আসতে বলেছে । ছেলেটা ঘরে ঢুকেই মেয়েটাকে প্রথমে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে, তারপর, ছিঃ, আমি ওসব বলতে পারব না । আমার বমি চলে আসবে । পুরুষ মানুষ এত নোংরা কি করে হয়, বুঝতে পারি না ।  নোংরা কে, ছেলে টা, নাকি ঐ মেয়েটা, যে খালি বাসায় তার এক ছেলে বন্ধুকে ডেকে নিয়ে এসেছে । এই, মেয়েদের সম্পর্কে একদম বাজে কথা বলবে না ।বইটা তো লেখেছে, তোমার মত কোন নোংরা স্বভাবের পুরুষ । সে তো মেয়েটাকে খারাপ বলবেই ।  সবুজের কেন যেন মনে হয়, চিত্রার মন মেজাজে এখন একটা ফুরফুরে ভাব এসেছে । বহু বছর পর,এই রাত দুপুরে চিত্রা তার পাশে বিছানায় বসে তার সাথে আগ্রহভরে কথা বলছে । কিছু শোনার জন্য কিছু জানার জন্য চিত্রার ভেতরের মানুষটা উন্মূখ হয়ে ওঠেছে । সবুজ একজন আগ্রহী শ্রোতা পেয়েছে । সবুজও নানা কথায় তার জ্ঞান ভান্ডারের দরোজা একটু একটু করে চিত্রার মনের কাছে খুলে ধরার চেষ্টা করছে ।    দেখ চিত্রা, অনেক লেখকই মেয়েদের শরীরটাকে লেখার প্রধান উপজীব্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আসে । মেয়েদের শরীর, ছেলে মেয়েদের শারীরিক সর্ম্পক, এসব নিয়ে লেখা বইগুলো বাজার দরটাও একটু বেশি পায় । আমরা সবাই জানি, মানব মন বড়ই বিচিত্র, বড়ই গভীর আর রহস্যজনক এর অতল তল । মনের গতিপ্রকৃতি, ভাবনা চিন্তা, ধ্যান ধারণা, বোধ বিশ্বাস এর সঠিক সন্ধান লাভ কোন মানব মনের পক্ষেই সম্ভব নয় । এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষন, যুক্তি সবই ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন আলাদা । কারো বিশ্বাসে আছে, যৌনতাই মানব চরিত্রের সারকথা । তারাই যৌনতাকে সাহিত্যের মূল উপাদান ভাবে । একটা বিশেষ বয়সের ছেলে মেয়েরা এই বইগুলো শুধু পড়ে না, গোগ্রাসে গিলে, কেউ হজম করতে পারে, কেউ পারে না, অনেকে বদহজমে ভুগেভুগে জীবনটা নষ্ট করে । কিন্তু, বই হলো জ্ঞান সমুদ্র, বহু বই আছে, যেগুলো পড়লে মানুষের পুরো জীবনটায় আনন্দ আলোকে ঝলমল করে ওঠবে । রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, চিত্রা সবুজের কথা বুঝে না, সবুজের দীর্ঘ বক্তৃতায় তার ধৈয্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় । বলে, তোমার ঐ রবীন্দ্রনাথের চরিত্র তো আমার জানা আছে । শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, সব বাঘা বাঘা লেখকদের চরিত্র নাকি ফুটো কলসি । মেয়ে দেখলে জিহ্বায় লালা ঝরে । কসম খেয়ে বলছি, আমি যতদিন জীবিত থাকবো, আমার ছেলে মেয়েকে আমি একটা বই ছুঁয়ে দেখতেও দেবো না । এ আবার কি কথা, বই না পড়লে ওরা তো বুদ্ধিবন্দি হয়ে পড়ে থাকবে । সুন্দর এই পৃথিবীর কোন কিছুই ভালো করে উপভোগ করতে পারবে না ।  চিত্রা বেশ মেজাজের সাথে বলে, তুমি তো জীবনে কত কত বই নাকি পড়েছো, মানুষ তো হতে পার নি । হয়েছো তো একটা গেঁয়ো ভুত, তোমার ডাইরি তো আমি দেখলাম । এজন্য তো আজকালকার বিবেকবান বুদ্ধিমান মা বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের কে বাজারের কোন বই পড়তে দেয় না । বই পড়া মানে তো অসুস্থ জীবানুর ভেতর গড়াগড়ি খাওয়া । এই নষ্ট জীবানুর ছোবল খেয়ে খেয়ে অনেক ছেলে মেয়েরা নানা অপকর্মে নিজেদেরকে জড়িয়ে নেয় । পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারে না, পাশ করতে পারে না । পরীক্ষা পাশের সাথে বইয়ের কোন বিরোধ নেই । ভাল লেখকের ভালো ভালো বই পড়লে মনের সব দরোজা জানালা এক সাথে খুলতে থাকে । বাইরের আলো বাতাসে মন হয়ে ওঠে অমৃত সাগর । চিত্রা তার কন্ঠস্বরে মরিচের গুড়া ছড়িয়ে বলে, এ্যাই, আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না । তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি আমার বহুদিন আগেই জানা হয়ে গেছে । ডাইরিতে তো সুন্দর করে লিখেছো, একটা মেয়ে, পুকুর ঘাটে-জলে রাজ হাঁসের মতো ভাসতো, ভেজা শরীর ভেজা চুল, তোমাকে দেখলে খিলখিল করতো, কোলা ব্যাঙের মতো বুক ফুলিয়ে কোঁতকোঁত করে ডাকতো । খোলা চুলের বাতাসে তোমাকে পাগল করে দিত, এইগুলো হলো তোমার জ্ঞানী কথাবার্তা । কথা শেষ না করতেই চিত্রার চোখ পড়ে ডাইরিটার ওপর, আর সাথে সাথে চিত্রার স্বরসুর পরিবর্তিত হয়ে যায় । বলে, ডাইরিটা বিছানার ওপর কি করে এলো, ওটাকে আমি আজই পুড়িয়ে ছাই করব । তোমার এই রকম ডাইরি আর কটা আছে, সব আমাকে বের করে দেবে, সবগুলোর গায়ে আজ আমি আগুন লাগাব । সবুজ চুপ করে বসে থাকে । কি বলবে চিত্রাকে, বুঝে ওঠতে পারে না । চিত্রা, তুমি ভুল বুঝেছ । কচি খুকী তো আমি, তাই তোমার লেখার কথাগুলো বুঝতে পারছি না । বল, কে এই মেয়ে, কি নাম, কোথায় থাকে, কতদিন ধরে চুপে চুপে এসব   নোংরা খেলা খেলে যাচ্ছ । দেখ, আমি লেখক নই, গল্প কবিতা উপন্যাস আমি লিখি নাই, এটা ডাইরি । নিজের দিনলিপি । আমার মুখে মুখে একদম মুখ চালাবে না, চুপ করে থাক, লজ্জা করে না, বেহায়া নির্লজ্জ কোথাকার । সবুজ চুপ করে থাকে না, একটু খানেক হাসে, বলে, দেখ, এগুলো হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার । দেখ, ঐ টা রক্ত মাংসে গড়া কোন মেয়ে নয়, পুরো বিষয়টা হলো গিয়ে একটা গ্রাম, সবুজে শ্যামলে চিত্রিত এক গ্রাম । যাকে আমি কল্পনায় মেয়ে বলে সাজিয়ে রেখেছি । যে হাসি আনন্দে উচ্ছলতায় ভরা গ্রামটি হয়ে যায় কখনো আমার মা, কখনো আমার বোন । এদের স্নেহ মাযায় রুপসুধায় সিক্ত হয়ে থাকি আমি সারক্ষণ । তাই, মা বোনকে নিয়ে কেউ অসভ্যের মতো এসব ভাবে । তুমি মনে করেছো, আমি তোমার ভাবসাব কিছুই বুঝি না । এসব নোংরামি করার জন্য গ্রাম গ্রাম করে সারাক্ষণ আমার কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করো । আমি যদি তোমার মাথা থেকে ঐ ভুত নামাতে না পারি, তাহলে আমি বাপের মেয়েই নয় । চিত্রা অনেক কিছু বুঝে, যা সবুজ বুঝে না । সবুজ যা বুঝে তা চিত্রাকে বুঝাতে পারে না, এই বুঝা না বুঝার সংর্ঘষে সবুজই শুধু ক্ষত বিক্ষত হয় । ++++++++++++++++++++চৌদ্দ++++++++++++++++++   সবুজ চিত্রাকে বুঝে ওঠতে পারে না । চিত্রার ভালবাসা, রাগ, মান অভিমান কোন কিছুই সবুজের কাছে স্বচ্ছ জলধারা হয়ে কখনো ধরা দেয় না । চিত্রার স্বচ্ছ জলস্রোত ভালো লাগে না, নারীও নদীর মতো বহে যায়, এই ধীর শান্ত বহমান ধারা চিত্রার স্বভাবে চরিত্রে নেই বললে চলে । চিত্রা ধীরে বহা নদী নয়, সে সদা খরস্রোতে ধাবমান । চিত্রা স্বচ্ছ জলকেলিতে আগ্রহী নয়, ঘোলা জলে ঘাই তুলে স্বচ্ছ চিন্তাভাবনা গুলোকে ধোঁয়াশা করে দিতে সে বেশি পছন্দ করে । সবুজ এই ঘোলা খরস্রোতে ভামসান প্রিয়তম মানুষটাকে তার মনের মতো করে ধরে আনতে পারে না, ধরে আনলেও বেশিক্ষণ তার সাথে জলকেলিতে মেতে থাকতে পারে না । সবুজ তার জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে, আদর দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে চিত্রাকে বুঝাতে চেয়েছে, সংসার ধর্ম কি, সংসারে স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক, হৃদ্যতা, বিশ্বাস, বুঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তা কি, গুরুত্ব কতটুক । মান অভিমান করে, দুই একদিন চিত্রার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে চিত্রার মনোগতির পরিবর্তন করতে চেয়েছে । পারে নি, ফলাফল হয়েছে আরো অধোগতি । চিত্রার হৃদয় কথা বলে না, শুধু মুখটা খরখর শব্দে বহে যায় । চিত্রা কিছুই বুঝে না, বুঝতেও চায় না ।সবুজ মাঝে মধ্যে এমনও ভেবেছে, চিত্রা কি মানষিক প্রতিবন্ধি । যদি তা না হয়, তাহলে, ও কেন এরকম করে, কেন সে কোন কিছু বুঝতে চায় না, কোন জ্ঞান যুক্তি, উদাহরণ, তাকে তার সিদ্বান্ত থেকে সরিয়ে আনতে পারে না । চিত্রা যা জানে, যা বুঝে, সেটাই একমাত্র সত্যি, তার চেয়ে বেশি কেউ জানে না, বুঝে না, এই সত্যি তার মনে শক্ত পোক্ত হয়ে বাসা বেঁধে থাকে । চিত্রার অন্যসব ভাইবোনেরাও, তাদের চলনে বলনে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে, কিন্তু ঘরের বাইরে ভেতরে চিত্রার মতো সর্বক্ষনিক স্বৈরাচরনে মত্ত থাকে না । তাদের প্রত্যেকের পরিবারে প্রীতি আছে, প্রেম আছে, বিশ্বাস- ভালবাসা আছে । চিত্রার বাবাও রীতিমত একজন ভদ্রলোক । চিত্রার মা, সেও বড়লোক বাবার রুপবতী দুলালি, পড়ালেখা খুব একটা জানে না । সবুজের মনে হয়,  চিত্রার মা কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক, হিংসুটে, এবং স্বার্থপর । তবুও সে তার সন্তানদের স্নেহ ভালবাসায় জড়িযে রাখে, স্বামীকে ভালবাসে, স্বামীকে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা, না সবুজের মনে একটা দ্বিধা জাগে । সবুজ ভাবে, চিত্রার বাবা কি সুখী, নাকি সুখের অভিনয় করতে করতে তিনি ক্লান্ত । ভদ্রলোককে ঠিক বুঝা যায় না । সারাক্ষন হা হা করে হাসে । হাসিটা কি সত্যিকারের হাসি, নাকি নিজের ভেতরের দুৎখ কষ্ট যন্ত্রনাকে গোপন রাখার জন্য কথায় কথায় এই নাটুকে হাসি ।সবুজকে ভদ্রলোক খুবই ভালোবাসে, সবুজের সাথে গল্পও করে । কিন্তু, কখনো তো তার সুখ আনন্দ, বা দুঃখ কষ্টের কথা সে সবুজকে বলে নি । শুধু চিত্রাই জানে না, ভালবাসা জিনিষটা কি, সবুজের প্রতি তার বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাসও নেই । সবুজের তো মাঝে মধ্যে এমনও মনে হয়, চিত্রা তার সন্তানদেরও সত্যিকার অর্থে স্নেহ করতে, ভালবাসতে জানে না । যা করে, তাকে স্নেহ প্রেম বা ভালবাসা বলে না, বলা যায় জোরাজুরি ।  *********************পনের******** সবুজের এক ছেলে এক মেয়ে । ছেলে বড়, নাম লরেন্স, চিত্রার পছন্দের নাম । মেয়ে ছোট, নাম কৃষ্টি, সবুজের ভালবাসার দেয়া নাম ।দু’জনের বয়সের ফারাক সাড়ে চার বছর ।পড়ালেখায় দুইজনেই বেশ মেধাবী ।  ছেলেটা কলেজে পড়ে । মেয়েটা স্কুলে । ওরা দুইজনে অনেকটা গৃহবন্দি । ওদের নিজ্বস্বতা বলতে কিছুই নেই । ঘুম, গোসল, খাওয়া, পড়া লেখা, সবই রুটিনে বাঁধা থাকে, সবই চিত্রার ইচ্ছে-অনিচ্ছায় । চিত্রা ওদের কাউকে, ওদের ইচ্ছে মতো কিছুই করতে দেয় না । কখনও একা ঘর ছাড়া করে না । বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে চিত্রাও ওদের সাথেই থাকে ।  চিত্রার ছেলে মেয়ের বিশেষ কোন বন্ধু বান্ধবও নেই । চিত্রা সারাক্ষণ তাদের পাহারায় রাখে, কারো সাথে ভালো করে মিশতে দেয় না । কলেজে ভর্তি হবার পর ছেলে একটা মোবাইল চেয়েছিল । চিত্রা স্পষ্ট উচ্চারণে জানিয়ে দিয়েছে, ওসব হবে না ।পত্রিকায় দেখি, টি ভি তে শুনি, তোমার অনেক সহপাঠির মায়েদের মুখেও মোবাইলের কেচ্ছাকাহিনী তো শুনি । পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদির মোবাইলে খটরখটর । রাত জেগে জেগে গেমস খেলা, আজেবাজে সিনেমা দেখা, ন্যাংটা ছবি দেখা । ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মুখে কিসব পাকাপাকা কথাবার্তা, শুনে আমার গা জ্বলে যায় । ওসব হবে না । তুমি তো গাড়িতে যাও, গাড়িতে আস । একটা গাড়ি আর একটা ড্রাইভার তো চব্বিশঘন্টা তোমার পাহরায় থাকে, তাহলে কি কারনে তুমি মোবাইল চাচ্ছ । ছেলে তার যুক্তি দেখিয়ে বলে, আম্মু, সব বন্ধুদের কাছে কত সুন্দর সুন্দর মোবাইল আছে, শুধু আমার হাতে নেই, লজ্জায় ওদের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারি না । ওরা আমাকে এসব নিয়ে খুব ইনসাল্ট করে । চুপ করো, তোমার ফ্রেন্ডরা তোমাকে কি বলে, সেই সব শুনতে আমি আগ্রহী নই, আমি যখন না বলেছি, তখন সেটা নাই থাকবে ।  সবুজ চিত্রাকে মিষ্টিস্বরে বলে, দেখ, ছেলে মেয়েদের এভাবে কথায় কথায় হার্ট করো না, এতে ওরা মানষিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে, বিগড়ে যাবে ।ওরা বড় হচ্ছে, এটা তোমাকে মেনে নিতে হবে । যুগটাই হচ্ছে ইলেকট্রনিক্সে মিডিয়ার যুগ ।যুগের গতিধারাকে আমি তুমি কেউ অস্বীকার করতে পারবো না ।লরেন্সের সব বন্ধুদের কাছে হয়তো মোবাইল আছে ।এটা শুধু ফ্যাশন নয়, প্রয়োজনীয়তাটুকুও আমি তুমি কেউ অস্বীকার করতে পারবো না ।  লরেন্স এখন কলেজে পড়ে । ওর একটা আত্মসম্মান বোধ তৈরি হচ্ছে । সবার কাছে সেই আত্মসম্মানটুক ধরে রাখতে চায় । ওর অহংবোধে ঘা লাগলে ও কিন্তু যে কোন সময় রিয়েক্ট করতে পারে, সেটা কিন্তু, আমাদের কারো জন্যই ভালো হবে না । চিত্রা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, যুগের হালহকিকত তুমি কি কচুটা বুঝ, মোবাইল হাতে দেয়া মানে ছেলেকে নিজহাতে নষ্ট করে দেয়া, মা হয়ে ছেলের এতোবড় সর্বনাশ আমি করতে পারবো না । সাবধান করে দিচ্ছি, ওকে কিন্তু তুমি মোবাইল কিনে দেবে না ।যদি আমাকে লুকিয়ে কিছু করো, বলে রাখছি, আমি কিন্তু কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছাড়বো । সবুজ একটু মিষ্টি করে হাসে ।বলে, কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে কার লাভটা হবে । তোমার না আমার, কারো কোন লাভ হবে না । মাঝখানে ছেলেটার হয়তো কোন বড় ক্ষতি হয়ে যাবে ।তাই আমি বলছিলাম, আমরা যদি ওকে একটা অতি সাধারণ ফোনসেট কিনে দিই, যেখানে গেমস থাকবে না, ইন্টারনেট কানেকশন দেযা যাবে না, ফেইসবুক খোলা যাবে না, শুধু প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া আর কোন কিছুই করা যাবে না । সেই রকম একটা ফোনসেট ওকে গিফট করলে, ওর অভাব বোধটা আর থাকবে না । চিত্রার ভাব কিছুটা নমনীয় হয় ।যদিও চিত্রার হাতে বেশ দামী একটা স্মার্টফোন সেট আছে, তার ব্যবহারও চিত্রা ভালো করে জানে না । কাউকে কল করা আর অন্যের কল রিসিভ করা ছাড়া, সবুজ দিয়ে নিজের ফেইসবুক আই ডি খুলে নিয়েছে ।সেটার ব্যবহারও জানে না । হাতে সময় থাকলে, মাঝে মধ্যে অন্যদের ছবিগুলো সে দেখে ।ব্যস অইটুক, ফোনের অন্য কোন ব্যবহার চিত্রার জ্ঞান বুদ্ধির বাইরে । ফোনের বিচিত্র সব কর্মকাজ, আর এর ব্যবহারের লাভক্ষতি, চিত্রা অন্যের মুখে মুখে যা শুনে, তাই নিয়ে সে বকবক করে যায় । চিত্রা সবুজকে বিশ্বাস করতে চায়, বলে, তোমার ছেলে কি ঐ লক্কর ঝক্কর মার্কা ফোনসেট নিতে রাজি হবে । না, ঐসব সেটও কিন্তু দেখতে খারাপ না । আর লরেন্স তো বলে নি, ওকে একটা স্মার্টফোন কিনে দিতে হবে । ও একটা ফোনসেট চেয়েছে, আমরা তার আব্দারটা রেখেছি । আমাদের পছন্দের সেট যদি ওর পছন্দ হয় ভালো, না হলে নেবে না । তুমি চিন্তা করে দেখ, আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করে, শুনি তো নানা রকম কেচ্ছা কাহিনী । চিত্রা তার জীবনে এই প্রথমবার কোন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার, একক ভাবে সবুজের ওপর চাপিয়ে দেয় । সবুজ মনে মনে খুশি হয় ।মাস দুয়েক পরে, সবুজ সুন্দর একটা ফোনসেট লরেন্সের হাতে তুলে দেয় । ছেলেকে বারবার সাবধান করে দেয়, বাবাকে অপমান করো না,ফোনের অপব্যবহার যেন না হয় । ছেলে ফোন হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ভালো করে দেখে, ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলে, রিয়েলি ইউ আর গ্রেট, থ্যানক্স এ লট, মাই সুইট ড্যাড । ওয়েল কাম মাই সন, যাও, তোমার মমকেও একটা গ্রেটফুল স্মাইল দিয়ে খ্যানক্স বলে আসো । তোমার মম রাজি না হলে কি আব্বু এই সাহস দেখাতে পারতাম । সবুজ হা হা করে হাসে সাথে ছেলেও শব্দ করে হেসে ওঠে । ++++++++++++++++ষোল+++++++++++++++++++++++ লরেন্স মা বাবার খুব লক্ষী ছেলে । ধীর স্থির, শান্ত প্রকৃতির ।মোবাইল হতে পেয়ে সে খুবই খুশি ।তার ছোটবোন স্কুলে পড়ে, সে গাল ফুলিয়ে সন্ধ্যা থেকে কারো সাথে কোন কথা বলছে না, বিকেলের নাস্তার টেবিলে বসেও মুখে এক ফোটা পানিও নেয় না । সবুজ খুব আদুরে গলায়, হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করে, আমার কৃষ্টি মা মনির হলোটা কি, মুখে যের শ্রবানের মেঘ জমেছে, বারিধারা নামবে বলে মনে হচ্ছে । সাথে সাথে কৃষ্টির দুচোখ বেয়ে দরদর করে জল গড়াতে শুরু করে । সে বলে, তোমরা কেউ তোমাকে একটুও ভালবাস না ।তোমাদের কাছে ভাইয়া সব, আমি কি বানের জলে ভেসে এসেছি, আমাকে কি তোমরা কুড়িয়ে পেয়েছ । চিত্রা তার স্বাভাবিক স্বরভঙ্গিতে বলে, এই প্যানপ্যান করবি না, কি হয়েছে, সেটা বল । চিত্রাকে ছেলে মেয়ে দুটোই ভীষন ভয় পায় ।কথায় কথায় চিত্রা ছেলে মেয়ে দুটোকে যা তা বলে বসে ।মাঝে মধ্যে চড় থাপ্পড়ও বসিয়ে দেয় । সবুজ বাঁধা দিতে গেলে, নানা কথায় সবুজের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ে।কৃষ্টি পারতপক্ষে চিত্রার কাছে ভীড়তে চায় না । কৃষ্টি মাথা নিচু করে মিনমিন স্বরে বলে, আমার বুঝি ইচ্ছে করে না, মোবাইল হাতে রাখতে । ও, এই হলো কারণ, এই অসময়ের বৃষ্টি পতন । সবুজ হা হা করে হাসে । চিত্রা সবুজের হাসি থামিয়ে দিয়ে বলে, হা হা করছ কেন, এবার বাপ সোহাগী মেয়েটার জন্যও একটা মোবাইল কিনে নিয়ে আস । সবুজ বলে, স্কুল গোয়িং ছেলে মেয়েদের হাতে মোবাইল থাকাটা সুন্দর দেখায় না ।এই বয়সের ছেলে মেয়েদের জন্য একটা বিষ ফোঁড়া । তুমি যখন কলেজে পড়বে, তখন তোমাকে এর চেয়ে দামী ও সুন্দর একটা মোবাইল সেট কিনে দেয়া হবে । কৃষ্টির বিশ্বাস হয় না, কারণ, কথাটা তার ড্যাডের, মমের নয় । দিন পনের চিত্রা ছেলের মোবাইল নিয়ে কোন ঝামেলা করে নাই । সব সময় ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছে, ছেলে মোবাইল হাতে কি করে, চোরা পথে, সাবধানী চোখে ছেলের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে । হঠাৎ এক মধ্যরাতে ছেলের ফোন বেজে ওঠে । লরেন্স তখন গভীর ঘুমে । রিং টোনের আছড়ে পড়া শব্দে চিত্রার ঘুম ভাঙ্গে । চিত্রা চুপিসারে ছেলের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় । কোন সাড়া শব্দ নেই । সেকেন্ড কয়েক পরে, আবারও ফোন বেজে ওঠে । চিত্রা দ্রুত ঘরের ভেতর ঢুকে ফোনটা তার হাতে নিয়ে নেয় । বাটন অন করে, ফোনটা কানে তুলে নেয় । অপর প্রান্ত থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ সহাস্য রিনিঝিনি স্বরে বলে ওঠে, মাই সুইট হার্ট, কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি । তুমি ফোন  তুলছোই না । আমাকে ছাড়া এত ঘুম তোমার কি করে আসে, দেখ তো আমি এখনো তোমার জন্য ভেবে ভেবে জেগে আছি । ও মাই , কথা শেষ হবার আগেই চিত্রা খট করে ফোন সুইচ অফ করে দেয় । তার সারা শরীর রাগে থিরথির করে । চিত্রা মোবাইলটা হাতে নিয়ে নিজের বেডরুমে আসে । লাইট অন করে, ধাক্কা দিয়ে সবুজকে জাগিয়ে দেয় । চিত্রার চোখ মুখ দেখে সবুজ ভয় পেয়ে যায় । ঝট করে বিছানায় ওঠে বসে, বলে, কি হয়েছে, তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন । চিত্রা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে ।বলে, বারবার না করা সত্বেও তুমি আমার ওপর একগাদা জ্ঞান ঝেড়ে, ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দিলে । এখন মজাটা টের পাবে । সবুজ চিত্রাকে কাছে টেনে পাশে বসায় । শান্তস্বরে বলে, শান্ত হয়ে বস, কি হয়েছে, আমাকে বলো ।      চিত্রা সবুজ কে সব খুলে বলে । সবুজ হাসে, বলে, এজন্য এতো মাথা গরম । দেখ, রাত বিরাতে এরকম অনেক কল আসে, কেউ হয়তো দুষ্টুমি করেছে । আর কলটা ভুলেও আসতে পারে । ভুলে আসতে পারে, মানে কি, তোমার ছেলের নাম্বারে একটা মেয়ে এতো রাতে, তুমি আর আমাকে শিখাতে এসো না । দেখ, ছেলেটা তোমার, ও এমন কোন কাজ করবে না, যাতে তোমার সম্মান নষ্ট হয় । আমি নিশ্চিত, ওই কলটা ভুলক্রমে লরেন্সের ফোনে ইন করেছে । কেউ হয়তো নম্বর টিপতে গিয়ে ভুল করেছে । যদি লরেন্সকে চাইতো, তা হলে আরো বার কয়েক সে ফোন করতো । তুমি এতো টেনশন নিয়ো না । সবুজ মোবাইলটা তার হাতে নেয় । সেটিং বক্স খুলে দেখে, সেখানে কার কার নম্বর সেট করা আছে । লরেন্সের গোটা ছয়েক ছেলে বন্ধু, তার নানা নানী, মা বাবা ও খালা এবং মামাদের নম্বর । আন নোন নম্বরটাও সবুজ ভালো করে দেখে । হাসিমুখে চিত্রাকে বলে, দেখ, তোমার ছেলের সুইট হার্ট যদি সত্যিই কেউ থাকত, তাহলে ওর নাম নম্বরটা এখানে সেভ করা থাকত । নেই, তুমি নিশ্চিত থাকতে পার, ঐটা একটা রং নম্বর ছিল । চিত্রা সবুজের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারে না । ।বলে, এখন থেকে এই ফোন আর লরেন্সর কাছে থাকবে না, আমার কাছেই থাকবে । দিন তিনেক ফোন চিত্রার বক্সে বন্দি হয়ে ছিল । মা ছেলে এই নিয়ে অনেক মন খারাপের মান অভিমান চলেছে । পরে ছেলেকে নানা কথায় সর্তক করে, একটা নির্মম শর্ত জুড়ে দিয়ে,সেটটা আবারো ছেলের হাতে তুলে দেয় । সেই থেকে, ছেলে কলেজ থেকে ফিরে আসা মাত্রই ফোন চিত্রার কাছে জমা করে দিতে হয় । চিত্রা রাতের বেলা পরখ করে দেখে, ছেলে কার কার সাথে কথা বলেছে । ফোন বুকে কারকার নাম সেইভ করা আছে । কোন মেয়ের নাম সেইভ করা আছে কিনা, তাও খুঁটিযে খুঁটিয়ে দেখে । মেয়ের ওপর চিত্রার খবরদারিটা সবচেয়ে বেশি ।মেয়েকে ঘর থেকে একা কোথাও বের হতে দেয় না ।একা ছাদে ওঠতে দেয় না, ব্যালকনিতে বেশিক্ষন একাকী থাকাও মেয়ের জন্য দন্ডনীয় অপরাধ । মেয়ের সাথে চিত্রার শাড়ির আঁচল সব সময়ে বাঁধা থাকে, স্কুলে, কোচিংয়ে প্রাইভেটে সর্বত্রই চিত্রা সশরীরে মেয়ের সাথে হাজির থাকে । মেয়ে একটু আপত্তি জানিয়ে ছিল, বলেছে, মা, তোমার এই পাহারাদারী নিয়ে আমার বন্ধুরা হাসাহাসি করে, আমাকে নিয়ে কটাক্ষ করে । আমি তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছি, ক্লাস টেনে পড়ি, আর স্কুলটাও তোমার চোখের সীমানায়, তবু তুমি কেন ওখানে গিয়ে বসে থাকো । এখন আমি একা একা যেতে পারবো, ফিরে আসতেও পারবো । চিত্রা মেয়ের কোন কথায় কানে নেয় না ।বলে, তুমি কি পারবে, আর কি পারবে না, সেটা আমি ভালো করেই জানি, মুখের ওপর ফটফট কথা বলবে না, এসব বেয়াদবী আমার সহ্য হয় না ।  চিত্রার মনে সব সময়, একটা সন্দেহ, একটা ভয় কাজ করে । ছেলে মেয়ে, সবুজ কাউকে সে বিশ্বাস করে না । তার বিশ্বাসে স্থায়ী হয়ে আছে, সবুজ গেঁয়ো, তার স্বভাবে চরিত্রে, কোথাও একটা বুনোভাব আছে, সেই বুনো স্বভাবকে বেশি আশকরা দিলে চিত্রার জীবন শুধু নয়, ছেলে মেয়েদের জীবনটাও তছনছ হয়ে যাবে ।     চিত্রা সারাক্ষন ঝড়োগতিতে চলে । সেই ঝড় জলের ঘোলা নদীতে সবুজ ছোট্ট এক খেয়া নৌকা, দোল খেয়ে খেয়ে, ডুবে ভেসে, সাবধানে পথ চলায় তার কাজ ।   সবুজ তার পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার শেকল ছিন্ন করে চিত্রার সাথে কোন রকম সাংঘর্ষিক ছবি আঁকতে পারে না । ধুপকাঠি হয়ে সারাক্ষণ নিজ পৃথিবীতে নিজে জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয় । সবুজের মা নিস্তেজ শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়েছিল ছয় মাসেরও বেশি সময় । সবুজ বার কয়েক বাড়িতে গিয়ে মাকে দেখে এসেছে । তাও ঘন্টা কয়েকের জন্য ।মা অনুনয় করে বলেছে, বাবা, একটা রাত মায়ের কাছে থাক, মায়ের সাথে গল্প করে রাতটা ভোর করে দে, ভোর সকালে তুই আবার ফিরে যাস । সবুজ মায়ের সেই আর্তি শুনে নি, রক্ষা করতে পারে নি । কাজ আছে, এই সহজ যুক্তি দিয়ে চিত্রার বেঁধে দেয়া সময়ের ভেতরই সবুজ ঢাকা ফিরে গেছে । ++++++++++++++++++++++সতেরো+++++++++++++++++++++++++++   চিত্রার মন ভালো নেই । সে একটা ধাক্কা খেয়েছে, একটা বড় ধরনের আঘাত তার মনকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিয়ে যাচ্ছে । চিত্রার বাবা মারা গেছে । বাবার মৃত্যু, ভূমিকম্প হয়ে, চিত্রার মনোভূবনে বিশাল ক্ষতের গহ্বর তৈরি করে দিয়েছে । চিত্রার ঝড়োগতির জীবনটা হঠাৎ করে যেন, কোন বালি পাথরের শুকনো চরে আটকা পড়ে গেছে । চিত্রা একাকী, অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে সেই মরুচরে রাত দিন হেঁটে বেড়ায় । বছর আগে চিত্রার বাবা শারা যায় । এই ভাবে হুট করে চলে যাবে, তা কেউ ভাবে নাই । শরীর স্বাস্থ্য ভালো ছিল । ব্যবসাও ভাল চলছে । সুখের কমতি ছিল বলে কারো কখনো মনে হয় নি । দুপুরের খাবার শেষ করে, কফি হাতে বসে, চিত্রার মায়ের সাথে গল্প করছিল । নানা কথার ফাঁকে বলে, ভাবছি, আগামী বছর আমি আর তুমি গিয়ে হজটা টা করে আসব । আল্লাহর ঘর, প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জেয়ারত করে এসে, সংসারের দায়িত্ব ছেলেদের হাতে তুলে দেব । আমরা বুড়ো বুড়ি দুইজন নিরিবিলিতে বসে আল্লাহকে ডাকব । কথা বলতে বলতে চিত্রার বাবা, চেয়ারের হাতল ধরে ওঠে দাঁড়ায় । কি হলো, ওঠে পড়লে কেন । শরীরটা কেমন ঘুলিয়ে আসছে, মনে হচ্ছে বমি হবে । কথাটা বলতে না বলতেই এক দলা তেতো পানি চিত্রার বাবার বুকের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে ।বাথরুমে যাবার আগে আরো বার দুয়েক ওয়াক ওয়াক করে শ্বেত পাথরের ফ্লোরটা ভাসিয়ে দেয় । চিত্রা মা ওঠে গিয়ে তাকে ধরে । ধরে রাখতে পারে না । প্রচন্ড একটা মোচড় খেয়ে চিত্রার বাবা ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ে । চিঃকার দিয়ে চিত্রার মা ঘরের লোক জড়ো করে ।কাজের লোক, ছেলের বউয়েরা সবাই ছুটাছুটি করে । এ্যম্বুলেন্স আসে । হাসপাতালে ডাক্তার ছুটে আসে ।নাড়ী দেখে, চোখ উল্পিয়ে দেখে, বুকের ওপর হাতের চাপ দিয়ে দেখে, আরো কিসব পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার বিষন্ন স্বরে বলে, সরি, হি ইজ নো মোর । প্রায় রাতেই চিত্রার ভালো করে ঘুম হয় না । চিত্রার বাবা ছিল মেয়ে অন্তে প্রাণ । সেই বাবাকেও চিত্রা সত্যিকার অর্থে ভালবাসে নি । শ্রদ্ধা করতে পারে নাই । চিত্রার বাবা কখনো সখনো মেয়ের কাছে তার মনোকষ্টের কথা এক আধটু বলতে চেয়েছে । চিত্রা সেইসব কথা তার মায়ের কানে ফিসফিস করে   বলে দেয় । এই কান কথায় চিত্রার মা রেগে আগুন হয় ।দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ভুল বুঝাবুঝি হয়, নানা রকমের সম্যসা সৃষ্টি হয় । পুরানো দিনের সেইসব কথা চিত্রা এখন বসে বসে একাএকা ভাবে, তার মন খারাপ হয় । চোখের জলের বন্যায় সে নিজেকে ভাসায় । বারবার বোবা কান্নায় ছটফট করে । বাবার বিদেহী আত্মার কাছে বারবার ক্ষমা চায় । চিত্রার মনের এই উদাস হাওয়া সবুজের অন্তরকেও বিষাদে ছুঁয়ে যায় ।সবুজ তার ব্যস্ততার ফাঁকটুকু চিত্রার পাশে কাটায়, চিত্রাকে সঙ্গ দেয় । চিরন্তনী সত্য মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নেয়ার জন্য চিত্রাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে । চিত্রাকে ক্ষেপিয়ে দেয়ার জন্য নানা অনিয়ম করে, চিত্রার অপছন্দের কাজ করে, কথা বলে । চিত্রা উদাস চোখ তুলে সব কিছু দেখে, কোন সাড়া শব্দ করে না । রাত গভীর । সবুজ ঘুমিয়ে আছে । চিত্রার চোখে ঘুম নেই । তার মনটা বিধ্বস্ত ও বড় অস্থির হয়ে আছে । একটা অপরাধবোধ দিন কয়েক ধরে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে । কাউকে সে কিছু বলতে পারে না । নিজের মনে নিজে জ্বলে পুড়ে সে মরছে । চিত্রা বিছানায় ওঠে বসে, সবুজের মাথায় একটা হাত রেখে চুপটি করে বসে থাকে । সময় পার হয় । চিত্রা তার বুকের কষ্ট চাপা রাখতে পারে না । বুকের বাঁধ ভেঙ্গে যন্ত্রনার জল ছলছল করে চিত্রার চোখ বেয়ে ওঠে আসে । জলগতির সাথে ঝড়োশব্দ শুরু হয় । চিত্রার শব্দ কান্নায় সবুজের ঘুম ভেঙ্গে যায় । সবুজ সচকিত হয়ে ওঠে বসে । চিত্রাকে বুকে জড়িয়ে রাখে কিছুক্ষণ । কেউ কোন কথা বলে না । দু’জনের বুকের ভেতর যন্ত্রনার নিঃশব্দ ঢেউ আচড়ে আচড়ে পড়ে । সরি, সবুজ, আই এ্যাম ভেরি ভেরি সরি । প্লিজ, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও । চিত্রা শব্দ করে কান্না করে ওঠে । সবুজ অবাক চোখে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে । কোন কথা বলে না । আসলে, সবুজের মুখে কোন কথা আসে না । সবুজ বুঝে ওঠতে পারে না, চিত্রা কি বলছে, কেন বলছে, বা কাকেই বা সরি বলছে, কার কাছে সে ক্ষমা চাচ্ছে । চিত্রার জীবন অভিধানের পাতায় সরি শব্দটা চিত্রা কখনো দেখেছে কিনা, শুনেছে কিনা, তা নিয়ে সবুজকে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে হয় । আস্তে করে বলে, কেন তুমি সরি বলছো, কেনই বা তুমি ক্ষমা চাচ্ছো ।  বাবা, আমার বাবা. চিত্রা আবারো হু হু করে কান্না শুরু করে । বাবা, বাবাকে স্বপ্ন দেখেছো, ভয় পেয়েছো, বলো, আমাকে, বলো,কি হয়েছে । চিত্রা গলানো মোমের মতো সবুজের বুকের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখে । ধীর শান্ত গলায় বলে, বাবার মৃত্যু আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, সন্তানের কাছে বাবা-মা কত বড় সম্পদ । সবুজ, আমার বুকটা কেমন খালি খালি লাগে । বুকের ভেতর একটা কষ্ট, একটা যন্ত্রনা, একটা হাহাকার সারাক্ষণ আমাকে খাবলে খাবলে খায় । কি যেন নাই, কি যেন নাই, আমার বুকের ভেতর আমি পাহাড় ধ্বসের শব্দ শুনি, মাংসল পিন্ডটা বারবার দুমড়ে মুচড়ে আমাকে বিবশ করে তুলে ।  সবুজ চিত্রাকে তার বুক থেকে ছাড়িয়ে নেয় । ডান হাতের তালুতে চিত্রার মুখটা তুলে ধরে । চিত্রার ফর্সামুখে মেঘের কালো আঁধার । চোখে জল । সবুজ বলে, এই ভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে কেন, আল্লাহর এই বিধানকে আমাদের মেনে নিতে হবে । তুমি তো বেশ শক্ত মনের অধিকারী, সাহসী, চিরতœনী সত্যকে তো মেনে নিতেই হবে ।ধৈয্য ধারণ করতে হবে । আমি আসলে বুঝি নি, বুঝতেও চাই নি । আজ আমি বুঝতে পারছি, তুমি কি হারিয়েছ, কত কষ্ট যন্ত্রনার পাহাড় নিয়ে তুমি তোমার দিন রাতগুলো পার করেছো । সবুজ, প্লিজ, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও । সবুজের মা মারা গেছে এক দশকেরও আগে । গভীর রাতে সবুজ মায়ের মৃত্যুর খবরটা পায় । চিত্রাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ দেয় । বলে, আমি এখনি রওয়ানা দেবো । চিত্রা শান্তস্বরে বলে, পাগলামি করো না, এতরাতে যাবে কি করে, ড্রাইভার পাবে কোথায় । আমি নিজেই ড্রাইব করে যাবো । না, এতো রাতে তোমাকে গাড়ি ড্রাইভ করে আমি যেতে দেবো না । সকালেই যাবে তুমি, ড্রাইভারকে সাথে করে, না হয় প্লেনেই চলে যেও । সবুজের কান্নার শব্দ পেয়ে ছেলে মেয়ে দুটোই ঘুম চোখে ওঠে আসে ।চিত্রার মুখে তাদের দাদীর মৃত্যুর খবর শুনে, তারা সবুজকে জড়িয়ে ধরে, শব্দ করে কেঁদে ওঠে । চিত্রা বলে, তোদের আবার কি হলো । তোরা আবার মরাকান্না শুরু করলি কেন, তোদের মাতো মরে নি । তারা সবুজের ছেলেমেয়েরা কেউ কখনো গ্রামের বাড়িতে আসে নি, গ্রামের বাড়ি দেখেনি । মাঝেমধ্যে তারা শুধু সবুজের মুখে গ্রাম, দাদা, দাদী, জেঠা জেটিমা, তাদের ভাইবোন, এসব গল্পকথা শুনেছে । চিত্রার কথা শুনে, ছেলে মেয়ে দুটোই পাথর চোখে চিত্রার দিকে তাকায় । ছেলেটা ইদানিং চিত্রার কথার বাদ প্রতিবাদ করতে শিখে গেছে । ছেলে বলে, আম্মু, তুমি একটা হার্টলেস, বড় ছোট কারো প্রতি তোমার কোন লাভ, রেসপেক্ট কিছুই নেই । যিনি মারা গেছেন, তিনি আমার ফাদার’স মম, আওয়ার গ্র্যান্ড মাদার । মেয়েটা বলে, আম্মি, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করছে, শুধু শুধু কান্না পাচ্ছে । ছেলেটা বলে, আম্মু, আমিও আব্বুর সাথে যাব । মেয়েও বলে ওঠে, আমিও যাবো । চিত্রা দৃঢ়স্বরে তাদের না করে দেয়, বলে, তোমাদের কাউকে যেতে হবে না, আমি আর তোমাদের আব্বু যাব । মেয়ে ভেজা কন্ঠে বলে, আম্মি, প্লিজ প্লিজ, প্লিজ, নো বলো না, আমাদেরকেও তোমার সাথে নিয়ে যাও । কখনো দাদু বাড়ি দেখি নাই, দেখা হবে কিনা কখনো, তাও জানি না । আজ একবার গিয়ে বাবার বাড়িটা দেখে আসি । চিত্রা চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, বলছি, না, তোমাদের কাউকে যেতে হবে না ।  ছেলেটা বেশ দৃঢ়স্বরে বলে ওঠে, আমি তোমাদের সাথে যাব, জীবিত দাদীকে তো কখনো দেখতে তুমি দাও নি, একবার না হয় দাদীর ডেড ফিগারটা দেখে আসি । সবাইকে তো বলতে পারব, আমি আমার লাইভ দাদীকে নয়, ডেড দাদীর মুখটা দেখেছি । ছেলেটা ঝরঝর করে কান্না করে ওঠে । প্লিজ আম্মু, ডোন্ট সে, নো , তুমি না করো না । তোমার কারণে আমরা ভাইবোন কেউ কখনো গ্রামের বাড়িতে যেতে পারি নাই । আব্বুর মুখে জেনেছি, গ্রামে আমাদের গ্র্যান্ড ফা”র বিশাল বাড়ি আছে, সেখানে আমাদের অনেক ব্রাদার সিস্টার আছে, অনেক রিলেটিভ আছে । কিন্তু, কারো সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই, থাকে না । ছেলেটা আরো কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই চিত্রা কোন কিছু না ভেবেই, ছেলের মুখের ওপর একটা চড় বসিয়ে দেয় । দাঁতে দাঁত খিঁচে, লাল চোখে সবুজের দিকে তাকায় । বলে, দেখেছো, ছেলে-মেয়েদেরকে তুমি কোথায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছো । মেয়ে বলে, আম্মি, তোমার এতো ভয় কিসের, তুমি তো আমাদের সাথেই থাকছো । কেউ তো আর, তুমি তো আমাদেরকে পাহারা দিয়ে রাখতেই পারবে । সবুজ বলে, কৃষ্টি, কথা বাড়িও না । আম্মির মুখের ওপর কথা বলতে নেই । তোমার আম্মি যখন না বলেছে, সেটা না থাকবে । তোমরা তোমাদের ঘরে যাও, ঘুমিয়ে পড়ো । করুন মুখে, সজল চোখে ছেলেটা বলে, ড্যাড, লরেন্স, বলছি না, নো টক এ্যানিমোর । যাও, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো । ***************************আঠার************************* সবুজ চিত্রাকে সাথে করে মায়ের শেষ যাত্রায় হাজিরা দিতে এসেছিল । কিন্তু, মায়ের মৃত মুখটাও শেষ বারের মতো তাদের কারো দেখা হয়নি । পথে কি একটা দুর্ঘটনার কারণে সবুজ আসছি আসছি করেও যথাসময়ে বাড়িতে পৌছতে পারে নাই ।লাশও আর রাখা যাচ্ছে না । সবুজের অপেক্ষায় থেকে থেকে বিকেল সাড়ে চারটেয় লাশ দাফন করা হয় । সবুজ যখন বাড়িতে পৌঁছে তখন চারপাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান শুরু হয়ে গেছে । সবুজ বাড়িতে পৌঁছে কোন কান্না করে নি । কারো সাথে কোনরকমের সাড়াশব্দও করে নি । পাথর বুকে ঘরের একপাশে চুপটি করে বসে বসে ভেবেছে ।তার মায়ের কথা, বাবার কথা, নিজের কথা । মায়ের বড় ইচ্ছে ছিল, একটা রাত সবুজকে বুকে জড়িয়ে গল্প করবে ।সবুজের শরীরের গন্ধ মা মন প্রাণ ভরে উপভোগ করবে । সবুজের তো খুব ইচ্ছে করতো, একটা রাত সেই তার মায়ের বুকে ঘুমিয়ে থাকবে।মায়ের শরীরের উম,গন্ধ নিয়ে নিজের জীবনটা ধন্য করবে ।সবুজ মায়ের ইচ্ছেটা পুরণ করতে পারে নাই । চিত্রা তাকে তার মায়ের কাছে রাত কাটাতে দেয় নি । সবুজ কি পারত না, চিত্রার কথাকে উপেক্ষা করে একটা রাত মায়ের কাছে থেকে যেতে । হয়তো পারত । কিন্তু, তারপর, চিত্রা নামক হিংস্র বাঘিনীর থাবা থেকে নিজেকে কি করে রক্ষা করত ।ঘরের শান্তির জন্য সবুজ নিজের সব সুখ আহ্লাদকে তো বহু বছর আগেই কোরবানী দিয়ে বসে আছে । সবুজ একটা কথা বুঝতে পারে না ।চিত্রা তো মা ।মায়ের নাড়ী ছেঁড়া ধন সন্তানের মনোকষ্ট টা সে কেন বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না । ঢাকায় ফিরে এসেও সবুজ কারো সাথে কোন কথা বলে নাই ।খাওয়া গোসল, অফিস সব কিছুই সে করেছে, কিন্তু, বড়বেশি অগোছালো, অনিয়মের মধ্য দিয়ে । চিত্রার সাথে এর পরে আর কখনো মাকে নিয়ে কোন টু শব্দটিও উচ্চারণ করে নাই । এই এক দশক সময়ের মধ্যে একবারই মাত্র সবুজ গ্রামের বাড়িতে এসেছে । দুইরাত ছিল, আর যায় নি । যেতে তার ইচ্ছে করে না । কি যেন নেই, সব কিছু ফাঁকা, চারপাশ কেমন যে শুন্য, খাঁ খাঁ । বাড়ি থেকে ভাই, ভাবীরা মাঝে মধ্যে ফোন করে, তাদের সাথে টুকটাক কথা হয় । বছরে ছয়মাসে এক আধবার চিত্রাও সবুজের বড়ভাই ও বড়ভাবীর সাথে কথা বলে । চিত্রা একাই কথা বলে, অপর প্রান্তের কথা শুনতে সে রাজি নয় । ছেলে মেয়েরাও তাদের এই অদেখা স্বজনদের সাথে একটু কথা বলতে চায়, চিত্রা তাদেরকে ধমক দিয়ে দুরে সরিয়ে দেয় । চিত্রার ভয়, কথা বলতে দিলে ছেলে মেয়েগুলো গ্রাম্য চিন্তা ভাবনায় পোক্ত হয়ে ওঠবে, ভাই বোনেরা তাদেরকে কু কথা বলে বিগড়ে দেবে । বড় ভাবীটাকে চিত্রা ভালো করে চিনে । কথার পন্ডিত, ফেরেশতাদের মত কথা বলে, কখন কি বলে ছেলে মেয়েদের মাথা নষ্ট করে দেবে, তার কি বিশ্বাস আছে । আর মেজ ভাবী, ওটাতো ইবলিশকেও হার মানায় ।ওদের সাথে কথা বলা আর ইবলিশের সাথে সাক্ষাৎকার করা, সমান কথা । একদিন চিত্রা ফোন বেজে চলছিল, চিত্রা বাথরুমে । ছেলেটি ফোন তুলে বাটন অন করে । বলে ওঠে, হ্যালো, কে বলছেন । অপর প্রান্তে মেয়ের কন্ঠ, ভাইয়া আমি তোমার আপু, আমার নাম সোনিয়া, তোমার মেজ জেঠুমনির বড় মেয়ে । অইটুকু, চিত্রা চিলের মতো ছোঁ করে ছেলের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেয় । বলে, কে, সোনিয়া সালাম দিয়ে বলে, চাচী, আমার এইচ এস সি’ র রেজাল্ট দিয়েছে । আমি এ প্লাস পেয়েছি । বেয়াদব মেয়ে কোথাকার । এইটা খবর হলো, এই খবর দেযার জন্য দিন দুপুরে আমার ছেলের মাথায় পোকা ঢুকাচ্ছো ।আর তুমি এ প্লাস পেয়েছো, এটা আর নতুন কি খবর । গ্রামের ছেলে মেয়েরা তো সবাই এ প্লাস পাওয়া উচিত, ওদের জন্য তো সরকার আলাদা কোটা করে দিয়েছে, যাতে সবাই এ প্লাস পেয়ে যায় । তা আমার ছেলের সাথে কি কথা বলেছো । হোক না সে বয়সে তোমার ছোট, সেও তো আগামী বছর এইচ এস সি দেবে, তার সাথে এতো গুজুর গাজুর কেন করছো, বেয়াদব, মা বাবা সামান্যতম ভদ্রতাটুকু তোমাকে শেখায় নি, আমার ছেলে বড় হচ্ছে, তার সাথে তোমার কি কথা, লজ্জা করে না তোমার । সোনিয়া সাড়াশব্দ হীন গাছ পাথর হয়ে ফোনটা কানে ধরে রাখে । চিত্রা সোনিয়াকে যা বলার নয়, তা বলে ভালো করে শাসিয়ে দেয় । তাতেও চিত্রার রাগ কমে না । সোনিয়ার মাকে ফোন করে অনেক কটূকথা শুনিয়ে দেয় । আজ এতো বছর পরে, চিত্রা সবুজকে তার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয় । মায়ের স্নেহ আদর ভালবাসা, কত কত স্মৃতি, যেগুলো সবুজ ইচ্ছে করে ভুলে যাবার অভিনয় করে তার রাত দিনগুলো পার করে দিযেছে । সেইসব কথা, স্মৃতি. সবুজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে । কোন কথা না বলে, চিত্রাকে শক্তহাতে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে । +++++++++++++++++++++++++++++++++++++উনিশ++++++++++++++++++++++++++++  সবুজ স্বপ্ন দেখে, সে মরে গেছে । তার মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়েছে । ওঠানে খাটিয়ার ওপর তার লাশটা পড়ে আছে ।আত্মীয় অনাত্মীয়, বাইরের লোকজন, কেউ নেই । শুধু চিত্রা আর তার ছেলে মেয়ে সজল চোখে, নির্বাক ওঠানে দাঁড়িয়ে আছে । কেউ একজন আসে, সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা, মাথায় সাদা টুপি । চুল দাঁড়িও ধবধবে সাদা । বয়সও বোধ হয় আশির ঘরে, না, সবুজ ঠিক আন্দাজ করে ওঠতে পারে না । লোকটা বাচ্ছাদের মতো হাউমাউ করে কান্না করে ওঠে । বলে, লাশটা বাইরে ফেলে রেখেছো কেন । ওকে ঘরের ভেতর নিয়ে যাও । ঘরের ভেতর থেকে কেই একজন ঝাঁঝালো স্বরে বলে, কোন ঘরে, কার ঘরে ওর লাশটা ওঠাবে ।ওর নিজের ঘর তো নেই । বাপের অংশ যেটা আছে, সেটাতো এখন ইঁদুর বেড়ালের খেলার মাঠ । তেলাপোকা বিচ্ছুর স্বর্গরাজ্য । ঐ ঘরে তুলতে চাইলে তুমি একাকী কষ্টকরে তুলে দাও ।এক মহিলার কন্ঠস্বর সবুজ শুনতে পায়, কিন্তু কে কথাটা বলে, তা বুঝে ওঠতে পারে না । আবারো কেউ একজন বলে ওঠে, আলু ভাই, লাশ নিয়ে এতো দরদ দেখাতে হবে না । আগে দেখ, কবর খোঁড়ার লোকজন পাওয়া যায় কিনা । সবুজ আলু ভাই শব্দটা শুনে । শব্দটা তার ভেতরে বাইরে বার কযেক ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় ।সবুজ এই নামটা এর আগ্রে বহুবার শুনেছে, কিন্তু, কোথায়, কবে, সেগুলো তার স্মরণে আসে না ।আলু নামটা সবুজের মনের ভেতরে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে এদিক ওদিক গড়িয়ে গড়িয়ে যায় ।সবুজ নামটা বারবার উচ্চারণ করতে থাকে । হঠাৎ করে তার মনে পড়ে, আলু, আলু ভাই, পুরো নামটা ছিল ।এবার লোকটাকে সবুজ চিনতে পারে, তার আলু ভাই, পুরো নাম শফিউল আলম । সবাই ডাকতো আলম । কি করে যে, আলম থেকে সে আলু হযে গেল, তা কেউ সঠিক করে বলতে পারবে না । আলু ছিল সবুজের সহপাঠি, বন্ধু, সকল দুস্টুমি বাঁদরামির সঙ্গী সাথী । গ্রাম সর্ম্পকে চাচাত ভাই । দুইজন ছিল হরিহর আত্মা । কলেজ পযর্ন্ত, দুইজন  এক সুতোতে গাঁথা ছিল। তারপর থেকে সুতার গিট ছাড়া । ধুলো ময়লা বালিতে দু’জনের সম্পর্ক ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন । কত বছর, কত য়ুগ হয়ে গেছে । ফোনেও কখনো যোগাযোগ হয় নি । কিন্তু আলু ভাই এত বুড়িয়ে গেছে কেন, কত বা বয়স, আমার চেয়ে মাত্র বছর দেড়েক দুয়েকের বড় । দেখে তো মনে হচ্ছে, শত বছর পার হয়ে গেছে । সে  তার আলু ভাইকে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করে, কোন কথা তার মুখে আসে না । চিত্রা কাকে বলে, এ্যাই, কবর খোঁড়ার লোক পাওয়া যাবে না, মানে কি । টাকা দিলে বাঘের দুধ পাওয়া যায় । চিত্রার ধমকে সবুজের ঘুম ভেঙ্গে যায় । ঘুম জড়ানো চোখে, ঘর্মাক্ত শরীরে সে বিছানায় ওঠে বসে । তার বুক মুখ শুকিয়ে গেছে । ভয়ের একটা শিরশিরানি তখনো তার বুকের ভেতর পিঁপড়ের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে । বিছানার একপাশে চিত্রা ত্রিভুজ ভাঁজে নাক ডেকে ডেকে ঘুমাচ্ছে । ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় চিত্রার বাড়ি । জমিটা তার বাবার দেয়া যেতৈুক । বাড়ি করেছে চিত্রা । গাড়ি বারন্দা ছাড়াই ত্রিতলা বাড়ি, নিচের তলায় ডাইনিং, কিচেন, চোখ ঝলসানো বিশাল ড্রয়িং ।ওপরের তলা গুলোতে শোবার ঘর । দোতলা চারটে, ত্রিতলায় দুইটি । প্রতিটি রুমের সাথে আছে খোলামেলা ব্যালকনি । তিন তলার খোলা জায়গাটা সাদা টাইলসে ঝকমকে । চারপাশ ঘিরে সতেজ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে, টবের বুকে আশ্রিত নানা ফুল আর দেশি বিদেশি বামনাকৃতির গাছ । চিত্রা এই ফ্লাটের গর্বিত মালিক । বিছানায় পড়ে থাকা ত্রিভুজাকৃতির চিত্রাকে সবুজ ঘনচোখে বার কয়েক দেখে । একটু খানেক হাসে, ভাবে, তার সাহস তো কম নয়, চিত্রার রাজপ্রাসাদে শুয়ে এরকম চাল চুলাহীন গাঁ গ্রামের স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে সবুজ । চিত্রা সবুজকে ডাকে না । বিছানা ছেড়ে ওঠে আসে । সাইড টেবিল থেকে পানি ভর্তি গ্লাসটা হতে নেয়, পুরো গ্লাস পানি ঢকঢক করে গিলে ।ঘড়ির দিকে তাকায় । রাত পৌণে তিনটে । সিগারেট প্যকেট হাতে করিডোরে এসে দাঁড়ায় । সাবধানে চেয়ার টেনে নিয়ে চুপটি করে বসে । সিগারেট জ্বালায় । নিঃশব্দ বর্হিঃজগত, কুয়াশার গাঢ় আস্তরণ । বিদ্যুৎ আলোতে ছায়া ছায়া অস্পষ্ট সব রাজ অট্টালিকা । সবুজ ভাবে, এটা কি স্বপ্ন, নাকি দুঃস্বপ্ন । শেষ রাতের স্বপ্ন, লোকে তো বলে, শেষ রাতের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় ।কিন্তু, এই স্বপ্ন দেখার বয়স কি সবুজের হয়েছে ।সবুজ নিজের শরীরের দিকে তাকায় । চোখ ঘুরিয়ে আবছা আলোতে সে নিজেকে ভালো করে দেখে । ভাবে, বয়ষ আমার কত, এইতো গত মার্চে তেপান্নের ঘরে পা রাখলো । এই বয়সে মৃত্যুর স্বপ্ন কেন । চিত্রা তো বলে, দুঃস্বপ্ন দেখে অসুস্থ মানুষ । তাহলে সবুজ কি অসুস্থ, শারীরিক নাকি মানষিক   । সবুজের মনটা নানা ভাবনায় বিষাদে ভরে ওঠে । মৃত মানুষ স্বপ্ন দেখাটা স্বাভাবিক । কিন্তু, নিজের মৃত্যু, গ্রামের বাড়ি, নিজ বাড়ির ওঠান, খাটিয়াতে শুয়ে থাকা, আত্মীয়-স্বজনহীন, নানা প্রশ্নে, উদ্ভুট সব নানা ভাবনায় সবুজ হাবুডুবু খায় । সবুজ মারা গেলে, সবুজের লাশটা গ্রামের বাড়িতে, তাদের পারিবারিক কবরস্থানে কি দাফন পাবে না ।এটা কি কোন সর্তক সংকেত, দৈব ইংগিত । সবুজ আর ভাবতে পারে না, তার শরীরটা শিউরে ওঠে, আবারও একটা নাম না জানা ভয় তাকে ঘিরে ধরে ।সবুজ আরো একটা সিগারেট জ্বালায় । ধোঁয়া ভর্তি মুখে, হঠাৎ সে শব্দ করে বলে ওঠে, হে আল্লাহ, মাফ করে দাও ।   চিত্রার ঘুম ভেঙ্গে যায় । হাতের ছোঁয়ায় সবুজকে সে বিছানায় খুঁজে পায় না ।ভীতস্বরে সবুজের নাম ধরে সে সবুজকে ডাকে । চিত্রার ডাকে সবুজের ভাবনায় ছেদ পড়ে । ধীর পায়ে সবুজ ভেতরে আসে । ঘুমঘুম চোখে চিত্রা বলে, ঠান্ডায় বাইরে বসে বসে কি করছো । নিশ্চয় বসে বসে সিগারেট গিলছো । কতবার বলেছি, ঘুম থেকে ওঠে এভাবে রাত দুপুরে সিগারেট টানবে না । তোমার মুখের গন্ধে আমার ভেতরটাও গুলিয়ে আসছে । ওরে বাবা, কি বিশ্রী গন্ধ । বাইরে তো কুয়াশা আছে, হালকা ঠান্ডাও পড়ছে, শুধু সিগারেট খাওয়ার জন্য তুমি এতোরাতে ঠান্ডার ভেতরে বসে ছিলে, যাও, মুখটা ভালো করে ধুয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়ো । বাবার মৃত্যু, মাকে নিয়ে ভাইদের মধ্যে টানাটানি, মায়ের দুর্দশা  দেখে চিত্রার স্বভাবে ইদানিং অনেক পরিবর্তণ এসেছে । ক্ষণস্থায়ী জীবনের অসারতার কথা ভেবে ভেবে চিত্রার মনও নানাবিধ নব দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয় । চিত্রার বাহ্যিক অঙ্গে একটা পরিবর্তণ দেখা যায় । চিত্রা এখন মাসে একবার পার্লারে যায় । ফেসিয়া করে, আর চুলে রং দিয়ে আাসে । বাইরে গেলে হিজাব পড়ে ।পাঁচবেলা নামাজ পড়ে । যে চিত্রা সবুজের সাথে কথায় কথায় ক্যাটক্যাট করতো, সবুজের ছায়ার ভেতরেও খুঁত খুঁজে বেড়াত, সেই চিত্রা এখন সবুজের অনেক অগোছালো কাজ কথায়ও কোন বাদ প্রতিবাদ করে না । সবুজ বিছানায় এসে বসে । কোন কথা বলে না । চিত্রা বলে, কি হয়েছে, বসে আছ কেন, শুয়ে পড় । ঘুম আসছে না । চিত্রা সবুজের শরীরের সাথে লেপটে গিয়ে শুয়ে থাকে । কারো চোখে ঘুম আসে না । সবুজের বুকের ভেতর জমানো হাজার হাজার কথা সবুজকে অবশ করে রাখে ।সবুজ ভাবে, চিত্রা হয়তো সবুজকে আগেও ভালবাসতো, কিন্তু তাতে ছিল ঝড়ের গতি, তাই সবুজ চিত্রার ভালবাসার ঘরে ঢুকতে পারে নি, দরোজা থেকে বারবার ফিরে এসেছে । এখন চিত্রার ভালবাসার একটা ছন্দ, একটা সুর খুঁজে পাওয়া যায় । তবু চিত্রাকে সবুজ বিশ্বাস করতে পারে না । তার মনের অনেক গোপন কথা সে চিত্রাকে খুলে বলতে পারে না । সবুজের সাহস হয় না, সবুজের ভয় হয়, চিত্রা আবার কখন ফোঁস করে ওঠে । সবুজের সব সত্য সুন্দরের আলাপন চিত্রার কাছে হয়েছিল, নিছক বোকামী, কাপুষের দম্ভোক্তি । মাঝেমধ্যে তার নিজেরও মনে হয়েছে, সত্যিই সে দুর্বল চিত্তের মানুষ । সব কিছুতেই একটা অজানা ভয় তাকে কেন তাড়িয়ে বেড়ায় । সবুজ এখন অনেক ভালো আছে । বলা চলে শান্তিতে আছে । ছেলে মেয়ে, চিত্রাকে নিয়ে সুখ সুখ ভাবনায়, সবুজ বেশ ভালোই আছে । ******************* কুড়ি********************************   সবুজ চিত্রার পাশে গিয়ে বসে । চিত্রা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে । সবুজ নিজের হাতে চিত্রার বাম হাতটা টেনে নেয়, হাতের উল্টো পিঠে আলতো করে একটা চুমো খায় । কি হলো, এতোরাতে হাত ধরে টানাটানি করছো কেন ।উদ্দেশ্যটা কি । শুয়ে পড় । সবুজ কোন কথা না বলে চিত্রার হাতের আঙ্গুলগুলো আলতো চাপে ধরে রাখে ।নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে চিত্রার নরম কোমল আঙ্গুল তুলিতে সুড়সুড়ি জাগায় । বলে, হাতটা আমার বউয়ের । অন্যের বউয়ের হাত ধরে তো টানাটানি করছি না, নিজের বউয়ের হাত ধরে যখন ইচ্ছে তখনি টানাটানি করা যায়, ওতে কোন পাপ নেই, বরং ভালবাসার ঘরে কয়েক ফোটা পূণ্য জমা হয় । চিত্রা একটু খানেক হাসে । বলে, কথার পন্ডিত আমার, হাত টানাটানিতে পাপ পূণ্যের মাপকাঠি নিয়ে এসেছে, এতো কথা কি করে যে, বলো তুমি । জিহ্বার ডগায় যেন সব কথা জমাট বেঁধে থাকে । চিত্রা কাৎ হয়ে সবুজের কাছাকাছি এসে শোয় ।হাত দিয়ে সবুজের কোমর জড়িয়ে রাখে । মিষ্টি করে বলে, তা সজু সোনা আমার,প্রায় রাতে দেখি, আপনি ঐ ব্যালকনিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকেন । উদ্দেশ্যটা কি, শুধু কি সিগারেট খাওযা, নাকি পুরানো কোন প্রেম নতুন বোতলে ঢেলে,নতুন নেশায় মত্ত হয়ে থাকেন । সবুজ তার অন্য হাতটি চিত্রার মুখের ওপর রাখতেই, চিত্রা তার দাঁতের আগা দিয়ে সবুজের একটা আঙ্গুলের ওপর হালকা করে পিঁপড়ে কামড় বসিয়ে দেয় ।  সবুজ কোন সাড়া শব্দ করে না ।চিত্রার এই ছোঁয়াছুয়ি তার ভাল লাগছে । সবুজের ভাবনায়, এই কোন চিত্রা, এরকম সুড়সুড়ে ভালবাসাগুলো চিত্রার একেবারেই পছন্দ নয় । অবসরের সময় টুকুতে, ঘরের ভেতর চলা ফেরার পথে, চিত্রাকে একটু করে পেছন থেকে  জড়িয়ে ধরা, চুলের খোঁপাটা খুলে চুলগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া, হালকা চটুল দুই একটা শব্দ, বাক্যকে চিত্রা কখনো সহজ ভাবে নেয় নি । এরকম রোমান্স চিত্রার ছিল অসহ্য. চিত্রার জ্ঞানে এসব ছিল গেঁয়ো নোংরামি ।সবুজ আরো একটি সন্তান নেয়ার কথা চিত্রাকে বলেছিল ।চিত্রার সেই দিনের আচরণ, চিত্রার রুদ্রমূর্তির কথা মনে পড়লে সবুজ আজোও শিউরে ওঠে । চিত্রা গলা ফাটিয়ে বলেছে, কুকুরের স্বভাব তোমার ।কুকুরের মতো গন্ডা গন্ডা বাচ্ছা পয়দা করার সখ জেগেছে, তাই না । আরো কত অ-কথা কু-কথা যে সবুজকে দিন কতেক শুনতে হয়েছে । ইদানিং চিত্রা এসব নিয়ে মেজাজ দেখায় না, উপভোগ করে । চোখ বন্ধ করে, মিষ্টি হাসিতে সে সবুজকে আরো বেশি বেশি করে কাছে ধরে রাখতে চায় । সবুজ বলে, চিত্রা, তুমি যেন দিন দিন কেমন বদলে যাচ্ছ । চিত্রা হালকা হাসি দিয়ে বলে, না বুঝার কি আছে, সব জায়গায়, সবাই তো বলছে,‘চলো পাল্টায়’ আমিও নিজেকে পাল্টাচ্ছি, । বলছিলাম, তুমি কি এর আগে কখনো এভাবে আদর করে, ভালবেসে আমাকে কামড়ে দিয়েছো । দিই নাই । সোহাগী স্বরে চিত্রা বলে । না । মনে পড়ে না তো । চিত্রা বলে, তুমি যখন বলছো, তখন সেটাই সত্যি । তবু একবার বুকের বাম পাশটায় চোখ ঘুরিয়ে দেখো, আমার ভালবাসার রক্তিম দাগ সেথানে কালচে হয়ে হয়তো এখনো শুয়ে আছে । চিত্রা একটু করে হাসে । সেদিন তো তুমি ক্ষেপে গিয়ে আমার বুকের ওপর কামড়ে দিয়েছিলে, কি ব্যথা যে পেয়েছিলাম, আর রক্ত তো বন্ধই হচ্ছিল না, এখনো ক্ষতটা স্পষ্ট হয়ে আছে । থাকবেই তো, ভালবাসার ক্ষত বলে কথা । আর রক্তধারা, ওটাও তো ভালবাসার স্রোতস্বিনী একবার চলা শুরু করলে, তা কি আর সহজে বন্ধ হতে চায় । সবুজ ভারি গলায় বলে, জানতাম না তো, ভালবাসার মধ্যে পাগলা কুকুরির হিংস্রতা থাকে । সবুজ ইচ্ছে করে খোঁচাটা চিত্রাকে দেয় । এই তো, সামান্য একটু হুলের শব্দে নাক ফুলাতে শুরু করেছো । চিত্রা তার মুখ বন্ধ করে না, সবুজকে একটু খানেক রাগিয়ে দিয়ে, ওর কাছ থেকে আরো বেশি বেশি করে আদর সোহাগ ভালবাসা পাবার জন্য চিত্রার মনটা চটফট করছে । চিত্রা বলে, আসলে সজু, তুমি খুব মিথ্যেবাদি, । নিজেরটা ছাড়া অন্য কিছুই তুমি কখনো বুঝ নাই । সেদিনের কামড়ে তুমি আজো হিংস্রতা খুঁজে বেড়াচ্ছো, আমার ভালবাসা টা দেখো নি, খুঁজেও পাওনি । তুমি শুধু মিথ্যেবাদি নও, ভীষন স্বার্থপরও । এতে আবার স্বার্থপরতার কি দেখলে । স্বার্থপর না হলে কেন তুমি পুরানো কথা তুলে আমাকে কষ্ট দিতে চাও । সেইদিনের সেই ভুলের জন্য আমি তোমাকে সরি বলেছি ।আমার ওপর দোষ চাপিয়ে খুব শান্তি পাও, তাই না । শুধু আজ নয়, সব সময় তুমি তোমার স্বার্থটাই আগে দেখেছো ।চিত্রার কণ্ঠস্বরে ভালবাসার আবেগীয় বৃস্টি ঝরে ।  সবুজ আঁচ করতে পারে, চিত্রার মনে একটা অপরাধবোধ দানা বেঁধে ওঠছে । চিত্রাকে আর রাগিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না । তাই সবুজ হাসিমুখে বলে, ওরে আমার রুপ রানী, ওটাও রাগের লাল রং নয়, ভালবাসার অগ্নি উত্তাপ ।দুইজনে শব্দ করে হেসে ওঠে । আর কোন কথা না,   আমাকে জড়িয়ে চুপটি করে শুয়ে থাক । কোন কথা হবে না, বাড়তি কোন ঝামেলাও করবে না, বলে রাখছি । সবুজ কোন ঝামেলাই করে না । শুধু চিত্রার মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিয়ে চিত্রার মাথার লম্বাচুল চুলগুলো এলোমেলো করে দেয় । দেখ তো, এখন সব চুল গায়ে জড়াবে, টান খেয়ে খেয়ে ছিঁড়বে । খোলা চুলের ভেতর তুমি যে কি সুখ খোঁজে পাও, আমি বুঝি না । মেয়েদের লম্বা খোলাচুল, সেতো ভালবাসার পালহীন নাও, ধীর লয় ছন্দে এদিক ওদিক ওড়ে ওড়ে যে শুধু ভালবাসার কাব্য করে, গান করে ।আর প্রেমিককে বলে যায়, আয় আয়, ছুটে আয়, আরো কাছে আয় । এখানে এই ওড়ন্ত বাগানে, চুলের ঘ্রাণে, উন্মত্ত ভ্রমর হয়ে, আমার বুকে এসে বয় । মেয়েদের খোলাচুল পুরুষ ডাকে, এই আবিস্কার কোন মজনু করেছে শুনি ।ইচ্ছে করছে, এক ঘুষিতে তোমার নাকটা ফাটিয়ে দিই । সবুজ বলে, নাক ফাটানোর যুদ্ধে এখন নেমো না । তুমি চুপটি করে থাকো । আমাকে দেখতে দাও । চিত্রা চুপ করে শুয়ে থাকে । সবুজ চিত্রাকে দেখে না । সে নিজেই চোখ বন্ধ করে রাখে । আবারো তার মনে স্বপ্নটা জেগে ওঠে ।     সবুজ ভাবে, সবুজ যদি সত্যি মরে যায়, তাহলে চিত্রার কি কোন কষ্ট হবে । চিত্রা কি সবুজের জন্য ভালবেসে চোখের জল ফেলবে ।সবুজের অনুপস্থিতিতে চিত্রার বুকটা কি দুমড়ে মুচড়ে, হাহাকারে ভরে ওঠবে ।   এই যে, মাথার চুল ধরে টানছো কেন, কি ভাবছো তুমি । কি হয়েছে তোমার ।বলছি না, ঘুমিয়ে পড়ো ।আমার কিন্তু ঘুম পাচ্ছে । তুমি ঘুম্ওা, আমি তোমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি । বিলি তো কাটছো না, করছো তো চুল ধরে টানাটানি ।এখন এসব টানা হেঁচড়া বন্ধ করে, চোখ দুটো বন্ধ করো ।আমি তোমার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ঘুমাব ।চিত্রা তার মাথাটা সবুজের বুকের ভেতর টেনে নিয়ে যায় ।   ++++++++++++++++++++++একুশ+++++++++++++============ সবুজ চোখ বন্ধ করে ভাবে, চিত্রাকে কি স্বপ্নের কথাটা বলবে, । চিত্রা যদি শুনতে না চায়, যদি চিত্রা ক্ষেপে যায় । তেইশ বছরের সংসার জীবন, তবু সবুজ চিত্রাকে ঠিক বুঝতে পারে না । চিত্রা ইদানিং সবুজের অনেক কিছু সহ্য করে, কিন্তু, তাই বলে, এরকম একটা বাজে স্বপ্ন, সেই স্বপ্নে আবার সবুজের গ্রামে এসে হাজির হয়েছে ।গ্রামের নাম শুনলেই তো চিত্রা দপ করে জ্বলে ওঠবে ।আর তখনি এই মধুময় মধুক্ষন গুলো তেতোরসে ভরে ওঠবে । সবুজের সাহস হয় না । চিত্রা নাক ডাকতে শুরু করে । সবুজ আদুরে হাতে চিত্রাকে তার বুক বিছানা থেকে সরিয়ে এনে চিত্রার বালিশের ওপর শুইয়ে দেয় ।সবুজ নিজে বিছানায় ওঠে বসে ।সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার হাতে নিয়ে বেডরুমের ব্যালকনিতে গিয়ে বসে । চিত্রা নামক চরিত্রটা সবুজ কখনো ভালো করে গুছিয়ে পড়তে পারেনি ।যা পড়েছিল, তা খুব বেশি একটা সুখকর নয় । চিত্রা চরিত্রের অনেক ক্লাইমেক্সও সবুজের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে । তবু সবুজ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে, ডজন খানেক সিগারেট ধ্বংস করে, তার বিবাহিত জীবনে, চিত্রার ভালবাসা, চিত্রার কটাক্ষ, বিদ্রুপ, চিত্রার নানা অবস্থান, অবদান নিয়ে গভীর ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকে । নানা র্পযালোচনায় সবুজের জ্ঞান বুদ্ধিতে আসে, চিত্রা এখন আগের চিত্রা নেই ।চিত্রা অনেক বদলে গেছে । সেই নাটকের সংলাপের মতো ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়’ । চিত্রা এখন বিনে প্রয়োজনে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে না । কথায় কথায় সবুজকে মন্দ শক্ত যা তা বলে অপমান করে না । চিত্রা এখন পাঁচবেলা নামাজ পড়ে, কখনো সখনো কোরান শরীফও পড়ে ।রাতে বিছানায় শুয়ে সবুজের সাথে পরকাল সম্পর্কীয় নানা কথা বলার আগ্রহ  দেখায় । সবুজের মান সম্মান নিয়েও চিত্রা এখন অনেক সময় ভাবে ।এই পরিবর্তনে চিত্রার উপর সবুজের আস্তাটা বাড়ে । কিন্ত, তবু চিত্রার উপর সবুজের বিশ্বাসটা শক্ত হয়ে দানা বাঁধতে পারে না । কি করেই পারবে । মাত্র বছর কয়েক আগেকার কথা, কোন এক মধুর মুহূ্র্েত সবুজ চিত্রাকে তার শৈশব স্বপ্ন স্বাধের কথাটা বলেছিল ।সবুজ বলে, আমার ইচ্ছে ছিল গ্রামের বাড়িতে একটা সুন্দর ঘর করবো । সেই দিন চিত্রা বোম ফাটায় নি, সুঁই খোঁচায় সবুজকে রক্তাক্ত করে দিয়েছে ।চিত্রা বলে, তোমার মাথাটা কি একবারে গেছে, সেই সন্ধ্যে থেকে কিসব আবোল তাবোল বকে যাচ্ছ ।কি আছে তোমার গ্রামের বাড়িতে, এক চিলতে জায়গা,মুরগীর খোপের মতো একটা ভাঙ্গাচুরা ঘর । সেটা ভেঙে দিয়ে সেখানে তুমি তাজমহল বানাবে । না, তাজমহল নয়, মা মহল । যা বানাও না কেন, সেখানে গিয়ে কোন সুস্থ মানুষ থাকতে পারবে না । ওখানে থাকার কথা আমি বলছি না ।মাঝে মধ্যে দুই একদিনর জন্য, জাষ্ট একটু হাওয়া চেঞ্জ । হাওয়া চেঞ্জের জন্য গ্রামের বাড়িতে অট্টালিকা বানাতে হবে । এসব বোধাই মার্কা বুদ্ধি তোমার মাথায় কে ঢুকায়, বলতো ।নিশ্চয় তোমার ভাই ভাবীরা । সবগুলো লোভী, স্বার্থপর । তোমার মাথায় যদি জ্ঞান বুদ্ধি কিছু থাকত, তাহলে ঐ স্বার্থপরদের আসল উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারতে । না, ভাই ভাবীরা কেউ আমাকে এই বিষয়ে কোন কথা বলে নাই । এটা আমার একটা স্বপ্ন, সেই শৈশবকাল থেকে আমি দেখে এসেছি ।আমার গ্রাম, আমার নাড়িপোতা আছে সেখানে, তাই, দেখ, এসব থার্ডক্লাস ইমোশন আমাকে দেখাবে না । আমার নাড়ি পড়ে আছে, চট্টগ্রামের কোন এক ক্লিনিকের ডাষ্টবিনে, তাই বলে আমি, এসব আলত ফালতু কথা বলে আমার মেজাজটা অহেতুক গরম করে দিও না । চিত্রা মেজাজ গরম করে না । চিত্রা হাসিমুখে বলে, দেখ, তুমি বড়বেশি ইমোশনাল । এইজন্য আমি সব সময় তোমাকে বলে আসছি, রাত জেগে জেগে বই ফই পড় না । এসবে মানুষের মনটাকে দুর্বল করে দেয় ।ইমোশন দিয়ে জীবনে বড় কিছু করা যায় না । সবসময় একটা মন খারাপের ধাক্কা নিয়ে চলতে হয় । সবুজ চুপ করে যায় । তার কথা হারিয়ে যায় ।   সবুজ ওঠে আসে । বিছানায় চিত্রাকে দেখে । চিত্রা ঘুমিয়ে আছে ।লাইট অন না করেই সবুজ বাথরুমে যায় ।চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে । বিনে কারনে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে তার নিচে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে ।তার মাথা ভিজে, শরীর ভিজে, সবুজের মনে হয়, তার মনটা ও ভিজতে শুরু করে । সবুজের বিশ্বাস বিশ্বের তাবৎ মানষিক দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র জায়গা এই বাথরুম টয়লেট । টয়লেটে বসলে, শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালে মনের চাকাটা আপনা আপনি ঘুরতে শুরু করে ।আর তখনি মনের দরোজা জানালা সব একসাথে খুলতে শুরু করে । সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়ে এসে মনের ভয়-দ্বিধা সব দুর করে দেয় । মনের ভাবনা চিন্তাগুলোকে করে তোলে গভীর ও প্রশস্থ । সবুজ শাওয়ারের নিচে ভিজে ভিজে নিজের ভেতরের দুর্বল মানুষটাকে হটিয়ে দেয় ।তার মনের সব দ্বিধা দুর করে । মনকে শক্ত করে, দৃঢ় করে ।সবুজ হয়ে যায়, একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এক সাহসী পুরুষ ।  সবুজ বাথরুম থেকে ফিরে আসে, দেখে চিত্রা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে । তার নাক ডাকার সুরে ছন্দে জানালার পর্দাগুলো দুলে দুলে নাচছে ।সবুজের বিশ্বাস, এই বিশ্ব সংসারে চিত্রাই একমাত্র সুখী মানুষ ।ঘুমের প্রকৃতি দেখে সুখী মানুষ চেনা যায় । সবুজ চিত্রার দিকে অপলক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ।চিত্রার নোংরা মনের বৈষয়িক জ্ঞানবুদ্ধির কথা ভেবে ভেবে, সে ভেজা শরীরেও ঘামতে থাকে । মনে মনে সে চিত্রাকে ছোটলোক ইতর নোংরা মহিলা বলে আজে বাজে গালি দেয় ।   +++++++++++++++++++++++++++++বাইশ++++++++++++   চিত্রা বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল । হঠাৎ সবুজের একটা হাহাকার দীর্ঘশ্বাসে তার ঘুমটা ভেঙ্গে যায় । লাফ দিয়ে বিছানায় ওঠে বসে । সবুজের চোখ বন্ধ, কিন্তু সে বিড়বিড় কিসব বলছে । চিত্রা তার মাথার খোলাচুল গুলো ঝুটি করে বেঁধে নেয় । আস্তে করে নিজের একটা কান সবুজের মুখের ওপর রাখে, শুনতে চেষ্টা করে, সবুজ কি নিয়ে বিড়বিড় করছে ।এর আগেও চিত্রা বার কয়েক খেয়াল করেছে, ঘুমের ভেতর সবুজ বিড়বিড় করে । চিত্রা বুঝতে পারেনা, এ আবার কোন ধরনের রোগ, আগে তো কখনো চিত্রার নজরে আসে নাই । বছর কয়েক ধরে, সবুজের এই পাগলামিটা সে লক্ষ্য করছে । শুধু বিড়বিড় করা নয়, ইদানিং চিত্রার সাথে তার আচরণটাও জানি কেমন কেমন, বয়স হয়েছে, তবু বিছানায় শুয়ে চিত্রার সাথে নানা রকম খুনসুটি করবে ।গভীর রাতেও চিত্রাকে জাগিয়ে দিয়ে, কিসব পাগলামি যে সবুজ ইদানিং শুরু করছে । চিত্রা কান পেতে শুনে, আলুভাই, তুমি বেঁচে আছ তো ।সবুজ আরো কিসব বলে, চিত্রা সেইসব ভালো করে শুনতে পায় না ।সে শুধু আলু ভাইটা শুনে । চিত্রা আস্তে করে সবুজের মাথায় হাত রাখে, তার চুলে আঙ্গুল চালায় ।সবুজ চোখ খোলে, দেখে চিত্রা তার পাশে বসে আছে । চিত্রা বলে, কি হয়েছে তোমার, কি বিড়বিড় করছিলে, আলু, আলু ভাই, এসবের মানে কি । স্বপ্নের কথা সবুজ চিত্রাকে বলে না । বলে, আলু ভাইয়ের কথা তোমার মনে আছে । আলু ভাই, এটা আবার কোন ধরনের নাম, সেটা আবার কে । তোমাকে বহুবার বলেছি, আমার স্কুল কলেজ জীবনের সাথী ।সম্পর্কে আমার চাচাত ভাই । বিয়ের সময় দেখেছিলে, তোমার সাথে বসে বসে তো অনেক হাসি মশকরা করলো । মনে নেই তোমার । চিত্রা কিছুক্ষণ ভাবে, বলে, হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে, তোমার বন্ধু, বি এ পাশ করে কোন একটা স্কুলে মাষ্টারি করে । তা এই রাতে তোমার আলু ভাইয়ের কথা মনে পড়লো কেন । কেন জানি না, হঠাৎ করে তার কথাটা মনে পড়লো, সেই সাথে নানা স্মৃতি, নানা কথা । মনটা কেমন জানি করে ওঠলো । কত বছর আলু ভাইকে দেখি না ।সবুজ হঠাৎ করে আবারো চুপ করে যায় । তার মনে খট করে একটা প্রশ্ন বাজে, আলু ভাই বেঁচে আছে তো । স্বপ্নের বিষয়টা উল্টো কোন ইংগিত নয় তো । এত রাতে আলু ফালুর ভাবনা বাদ দিয়ে, একটু ঘুমাতে চেষ্টা করো ।সবুজ একটানে চিত্রাকে তার বুকের ওপর টেনে নেয় । চিত্রাকে বুকে জড়িয়ে, সে একটা দীর্ঘম্বাস ছাড়ে ।বিড়বিড় করে বলে, কেন জানি হঠাৎ করে আলু ভাইয়ের কথা মনে পড়লো, বুঝতে পারছি না । মনটা কেমন অস্থির অস্থির করছে, শরীরটাও বড় ক্লান্ত । চিত্রা দ্রুত সবুজের বুক থেকে সরে আসে।লাফ দিয়ে বিছানায় ওঠে বসে ।বলে, ভালই তো ছিলে এতক্ষন, শরীরে মনে রোমান্স গড়াচ্ছিল, হঠাৎ করে হলো কি ।এসব কি বলছো তুমি । চিত্রা সবুজের কপালে হাত রাখে, বুকে হাত দেয় । বলে, শরীর ঘামাচ্ছে নাতো, বুকে ব্যাথা নেই তো ।সজু, প্লিজ, আমার কাছে মিথ্যা বলো না । মেয়েকে ডাকবো, প্রেসারটা একটু চেক করে দেখুক । চিত্রা অস্থির চিত্তে অনর্গল কথা বলে যায় । কি পাগলামি শুরু করলে, একটু থামো তো, আমার কিছু হয় নি, আমি ভালো আছি । ছেলে মেয়ে কাউকে এখন ডাকতে হবে না । সবুজ চিত্রাকে মৃদু ধমক দেয় । চিত্রা ক্ষনিককাল চুপ করে থেকে আবারো বলে, এ্যাই, বমি বমি ভাব লাগছে না তো ।দেখ, কোন কিছু আমার কাছে লুকিও না । আমাকে বলো, কি সম্যসা হচ্ছে তোমার, আমি তো তোমার বউ, আমাকেই তো সব খুলে বলতে হবে । বললাম তো, আমি ভালো আছি, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে, কোন সমস্যা হচ্ছে আমার । দেখে কিছু বুঝা যায় না ।তুমি বলো, তোমার চেহেরাটা আমার কাছে কেমন যেন লাগছে ।কিসব বলছো তুমি । আর আমাকেও ইদানিং কেন এত বেশি বেশি আদর করছো । সবুজ হাসে, এই কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা । বলছি তো আমি ভাল আছি । আসলে আমার একটু কফি খেতে ইচ্ছে করছে ।যদি পার, একটু কফি বানিয়ে আন । চিত্রা ভেতরে ভেতরে আঁতকে ওঠে ।সবুজকে সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না । সবুজ চা’টা বেশি পছন্দ করে, দিনে সাত আট কাপ চা না হলে তার চলে না ।এতো রাতে চা না চেয়ে কফি খেতে চাচ্ছে কেন । চিত্রা ভীত চোখে সবুজের দিকে তাকিযে থাকে । একটা ভয় শিরশির করে চিত্রার শিরদাঁড়া বেয়ে ওপরের দিকে ওঠে যায় । বাবার কথা মনে পড়ে চিত্রার । তার বাবাও চা’ টা বেশি পছন্দ করতো । কিন্তু সেইদিন, কেন যে বাবা, মাকে বলেছিল, কফি খেতে খুব ইচ্ছে করছে । দুপুর বেলা, খাওয়ার পর, মা নিজ হাতে কফি বানিয়ে বাবার হাতে তুলে দেয় । বাবা সেটা মুখে দিতে না দিতেই, তার কাশি শুরু হয়ে যায়, সাথে বমি, বন্যার স্রোতের মতো, তেতো, বিকট গন্ধে ভরা, বমি করতে করতেই বাবা ফ্লোরে পড়ে যায়, তারপর চোখ ওল্টিয়ে, চিত্রা ঢুঁকরে কেঁদে ওঠে ।এককাপ কফি তার বাবাকে শেষ করে দিল । চিত্রার চোখ দুটো জলে ভরে ওঠে । সবুজ অবাক হয়ে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে । চিত্রা সজল চোখে সবুজকে দেখে, বলে, কফি কেন খাবে, তুমি তো কফি খুব একটা পছন্দ করো না । তাহলে কফি করতে বলছো কেন । চা করে আনি, ঘন লিকারে দুধ চা । সবুজ বলে, তোমার যেটা ভালো লাগে সেটা করে নিযে আস । একটা কিছু হলেই আমার হলো । চিত্রা এবার নিশ্চিত হয়ে যায় । সবুজ ভালো নেই, সবুজ ভালো থাকলে কখনো বলতো না, আমার যা ইচ্ছে তা করে নিয়ে আসি । সবুজ আমাকে সত্যটা বলছে না । সে অসুস্থ, নিশ্চয় ভেতরে ভেতরে কোন সম্যসা হচ্ছে । সবুজ এমনিতে চাপা স্বভাবের, আমার ওপর অভিমান করে কিছু বলতে চাচ্ছে না ।   চিত্রা ওঠে মেয়ের ঘরে যায় । মেয়ে সবেমাত্র মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে । চিত্রা মেয়েকে ডেকে নিয়ে নিজের বেডরুমে আসে । সবুজ তখন বিছানায় শুয়ে নানা ভাবনায় বিভোর হয়ে আছে । মেয়ে বলে, বাপ্পি, আর ইউ ওকে, এ্যনি প্রবরেম । সবুজ মেয়েকে দেখে একটু খানেক মিষ্টি করে হাসে । বলে, আমার তো মনে হয়, আই এ্যাম ফাইন, বাট ইউর মম থিংকস, আমি ঘোরতর ভাবে অসুস্থ । মেয়েও হাসে । মেয়ে সবুজের পাশে বসে, কপালে হাত রাখে । পালস দেখে । প্রেসার দেখে । মেয়ে বলে, মম, ডোন্টওরি, বাবা একদম ঠিক আছে । সবকিছু নরমাল । চিত্রা হাসে । মেয়েও হাসিমুখে তার ঘরে চলে যায় । রাতের ঘড়ি টিকটিক শব্দে সামনের দিকে এগিয়ে যায় । ++++++++++++++++++++++++++++++তেইশ++++++++++++++++++++++ পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যার লালিমা ছড়িয়ে পড়েছে । চিত্রা একাকী ছাদে দাঁড়ি আছে ।বইছে ঝিরঝির হিমেল বাতাস ।বাতাসে চিত্রার খোলা চুল ওড়ছে, শাড়ির আঁচল ঘুরে ঘুরে চিত্রাকে ঘিরে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে । চিত্রা ছাদে খুব একটা আসে না । ছাদ ভ্রমণ চিত্রার খুব একটা পছন্দ নয় । চিত্রার বাসার ছাদের অর্ধেক সাদা টাইলসে আবৃত ।বাকিটা সিমেন্ট ঢালাই । খালি অংশে টব বাগান করার ইচ্ছে জানিয়েছিল ছিল সবুজ । চিত্রা দৃঢ়স্বরে না করে দিয়েছে ।বলেছে, ছাদের ওপর কোন বন জঙ্গল থাকবে না ।ওটা খালি থাকবে । ছেলে মেয়েরা ছুটাছুটি করবে, খেলা করবে, আনন্দ করবে । সবুজ চিত্রার অবাধ্য হয়ে একদিন গোটা কয়েক টবগাছ নিয়ে ছাদের ওপর সাজিয়ে রাখে । চিত্রা দেখে, একটি গোলাপ চারা, একটি চন্দ্রমল্লিকা, একটি হাস্নেহেনা, দুইটি ক্যকটাস, দুইটি পাতাবাহার গাছ । চিত্রা ক্ষেপে গিয়ে সবুজকে বলে, ছাদের ওপর সাপের বাসা বুনছো কেন । সাপের বাসা, মানে কি । নিজেকে এতো পন্ডিত মনে করো, আর এটা জানো না, হাস্নেহেনা ফুলের গন্ধে সাপ আসে । সবুজ হাসে, শুনেছি, তবে বিশ্বাস করি না । তোমার বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে তো আর সাপেরা চলাফেরা করে না । আমি ছাদে কোন গাছপালা রাখতে না করেছিলাম, তবু তুমি ছাদে বন জংগলের আবাদ করছো ।শুন, ছাদের ওপর হাস্নেহেনা থাকবে না । আর নতুন কোন গাছও আসবে না । হাস্নেহেনা টা কি করবো । নিচে, গেইটের বাইরে ফেলে রাখ । ওখানে সাপ আসবে না । না, ওটা চলাচলের পথ, তাছাড়া ওখানে চব্বিশ ঘন্টা দারোয়ান থাকে । আসলেও ধরা পড়ে যাবে । মাস কয়েক আগে চিত্রা নিজেই সেই ছাদকে বাগানে রুপান্তরিত করেছে ।চিত্রা এবং সবুজের পছন্দের নানা জাতের ফুল, ফল, বনসাই, ক্যাকটাস, মিলে গোটা চল্লিশেক গাছ ছাদ বাগানকে সবুজ করে রেখেছে ।  রাত যতোই হোক, সবুজ প্রায় প্রতি রাতেই একবার ছাদে ওঠে ।আকাশ দেখে, তারা গুনে, মেঘদের ওড়াওড়ি দেখে । নিজের বিষাদে আনন্দে নিজে একাকী সময় পার করে ।  চিত্রা বিকেলে ছাদে ওঠে । রাতের বেলা সে ছাদে ওঠতে আগ্রহ দেখায় না । তার কেন জানি ভয় করে । সবাই মিলে ওঠলেও সে বেশিক্ষন ছাদে থাকে না, একা একা ঘরের ভেতরে চলে যায় ।কেন রাতের ছাদকে চিত্রার এত ভয়, তা অবশ্য সে কাউকে বলে না ।সবুজ বার কয়েক চেষ্টা করেও তার কারণ বের করতে পারে নি । চিত্রা ছাদে কখনো একা আসে না । আসে সদল বলে । না হয়, তার বহু বছরের বিশ্বস্ত সেনাপতি, কাজের মহিলা মরিয়মকে সাথে করে নিয়ে আসে ।আজ চিত্রা একা এসেছে । সবুজ কিছুক্ষন আগে বাসায় ফিরেছে । তার চা নাস্তা খাওয়া শেষ হলে, চিত্রা বলে, আমি ছাদে যাচ্ছি, তুমি তাড়াতাড়ি এসো, দেরি হলে কিন্তু, আমি ভেসে ভেসে অন্য দেশে চলে যাব । সবুজ অবাক চোখে চিত্রার দিকে তাকায় । বলে, অন্য দেশে চলে যাবে, মানে কি । ঐসব তুমি বুঝবে না ।পাঁচ মিনিটের মধ্যে কিন্তু আসবে আমি বলে দিচ্ছি । এত যদি ভয়, সাথে কাউকে নিয়ে যাও । কাউকে নিতে হবে না । তুমি তাড়াতাড়ি আস, তাতেই হবে । চিত্রা ছাদের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখে ।ধীরপায়ে টব বাগানের কাছে এসে দাঁড়ায় । চিত্রার পরিবর্তনের এটাও একটা নতুন ধারা ।চিত্রা এসব গাছ গাছালি কখনোই পছন্দ করতো না । চিত্রার পছন্দ ছিল সাজগোছ, হৈই চৈই, আর লোভ ছিল নানা ধরনের মুখরোচক ফাষ্টফুড়। ইদানিং চিত্রা অনেকটা ঘরমুখো হয়েছে, তার ইচ্ছে, পছন্দেরও ধারা বদলে গেছে । রান্নাঘর তদারকি করে, সবুজ এবং ছেলে মেয়েদের পছন্দের রান্না করে ।নিজ হাতে টেবিল সাজায় । সবাই মিলে রাতের খাবার শেষ করে । টেবিলে বসে নানা গল্প, হাসি আনন্দ করে । সবুজকে সময় দেয় ।সবুজের পছন্দের সাথে নিজের পছন্দকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে । চিত্রার বিশ্বস্ত কাজের মহিলা মরিয়ম চিত্রাকে সঙ্গ দেয় । মরিযম টবে পানি দেয়, ময়লা পরিষ্কার করে, ঝরে যাওয়া গাছের হলুদ পাতা তুলে নেয় ।পানি দেয় ।  আজ চিত্রা একা । চিত্রা উপুড় হয়ে একটি টব থেকে জমাট বাঁধা হলুদ পাতা তুলে তার হাতে নেয়, নরম কোমল আঙ্গুলের ছোঁয়া দিয়ে গাছের পাতাগুলোকে নাড়িয়ে দিয়ে গুনগুন করে ।ময়লা পাতাগুলো ডাস্টবিনে রেখে আবারো এসে দাঁড়ায় নাইটকুইন গাছের কাছে ।পাশাপাশি দুটি প্লাস্টিক টবে দুটি গাছ ।একটা গাছের পাতা গাঢ় সবুজ ।অন্য গাছটার পাতাগুলো কিছুটা হলদেটে । চিত্রা ভাবে, মরিয়মের অযতেœর কারণে গাছটা শুকিয়ে আসছে । আলতো হাতে গাছের পাতায় আদর ছড়াতে গিয়ে চিত্রা দেখে, গাছের পাতায় ফুলের কলি, একটি নয়, দুইটি নয়, সাত সাতটি ।কলিগুলো বেশ বড় হয়ে এসেছে, দুই তিনদিনের মধ্যে ফুল হয়ে ফুটবে ।চিত্রার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বুকের ভেতর একটা খুশির ঝলক ঢেউ তুলে । চিত্রা গুনগুনিয়ে ওঠে । পাঁচ মিনিট নয়, দশ বারো মিনিট পরে, সবুজ ধীরপায়ে ছাদে ওঠে আসে, দেখে, চিত্রা টবের সামনে বসে আছে, ভ্রমর গুনগুনে তার সুরেলা স্বর গুঞ্জরিত হচ্ছে।সাড়াশব্দহীন সবুজ চিত্রার পেছনে এসে দাঁড়ায়, মিষ্টিস্বরে বলে, রুপরানী আমার, আপনি কি তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন । চিত্রা মুখ ঘুরিয়ে সবুজকে দেখে, হাসে, উচ্ছ্বাসের স্বরে বলে, দেখ, কতগুলো কলি, আমার নাইটকুইনে কতগুলো ফুলের কলি এসেছে । কাল পরশু ফুটবে । সবুজ দেখে । বলে, সুন্দর, তোমার ভাগ্য পরিবর্তন হতে যাচ্ছে । কি রকম । নাইট কুইন ফোটা মানে গৃহস্ত ঘরের কল্যান ।তা আবার লাকি সেভেন । নিশ্চয়, ভালো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, তোমার কপালে । চিত্রাকে একটু চিন্তিত দেখায়, বলে, ভালো কিছু একটা, কিন্তু, সেটা কি, বলো না, নিশ্চয় তুমি জানো । আরে বাবা, আমি কি করে জানবো, ভবিষ্যত জানা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় । আসল সত্যিটা ওপর ওয়ালা জানেন ।আমি তুমিও জানতে পারব, সময় হলে । এই, তোমার জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বন্ধ করো তো । সময় হলে সবাই জানতে পারবে, তার জন্য নতুন করে জ্ঞান ঝাড়তে হবে না । চিত্রা ওঠে দাঁড়ায় । সবুজ চিত্রা দুইজনে ধীরপায়ে ছাদের এপাশ ওপাশ বার কয়েক হাঁটে । পশ্চিম দিগন্ত লাল আবীরে রাঙা হয়ে ওঠেছে । সবুজ চিত্রাকে বলে, দেখ, আকাশ দেখ, লাল রংয়ের ওপরে সাদা নীল আকাশ ।কি সুন্দর, কি অপুর্ব । ঐ দেখ, ঐ নীল বিল্ডিংটির পেছনে সবুজ গাছের সারি । গাছের গোড়ালি নয়, শুধু সবুজ পাতার অরন্য, বাতাসের দোলায় দুলছে । সোনালি সুরুজের আভায় সেই সবুজ ঝলমল করছে । সজু, ঐ দেখ, একটু দক্ষিন পাশে, গাছের কোন সবুজ পাতা নেই,   সব হলুদ পাতা, সবুজ দেখে, তাইতো, আমার চোখেই পড়েনি ।গাছটা হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে । কি ফুল । নাম জানি না । সোনালি রংয়ের কোন ফুল হবে । আবীর মাখানো আলো, সবুজ পাতা, হলুদ ফুল, তার ওপরে সাদা নীল আকাশ । সত্যিই অপুর্ব, কি অপরুপ রুপ । দেখে, চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা খুশিতে ভরে ওঠে, তাই না । হ্যাঁ, সত্যিই সুন্দর । এই যে চারপাশে অসংখ্য সুউচ্চ বিল্ডিং, নানা রংয়ে রঞ্জিত, সেগুলো ও সুন্দর, তবে কৃত্রিম ।গাছ সবুজ পাতা, ফুল আকাশ মেঘ, এগুলো কিন্তু কৃত্রিম নয়, প্রকৃতিজাত সুন্দর, দোলায়মান, বহমান ।সুন্দরের বৈশিষ্ট্যই হলে চলমান । এই তুমি কথায় কথায় এতো জ্ঞান ঝেড়ো না । আমি একটু ভাল করে দেখি । চোখ জুড়ানো এত সুন্দর আমি এর আগে কখনো চোখ মন খুলে দেখি নাই । সবুজ চিত্রার কথায় অবাক হয় না ।চিত্রার মনের এই পরিবর্তণ দেখে সে ভেতরে ভেতরে খুশি হয় । তার ভালো লাগে, এই সহজ সারল্যে ভরা চিত্রাকে তো সে এত বছর ধরে চেয়েছে । দেরিতে হলেও সবুজ তার কাঙ্খিত চিত্রাকে ধীরে ধীরে তার কাছে পাচ্ছে । চিত্রা আড়চোখে সবুজকে দেখে । কোন কথা সে বলে না । দুরের গাছ দেখে, সবুজ সবুজ পাতা দেখে, লাল লাল ফুল দেখে । চিত্রা গুনগুনিয়্ েওঠে, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভুমি’ । ছেলে মেয়ে দুটি চুপিসারে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় । দেখে, মা গুনগুনিয়ে গান করছে, বাবা ধ্যান মৌন মুখে দুরের আকাশ দেখছে । তারা দুইজনে মুখে হাত চাপা দিয়ে নিঃশব্দে হাসে । সবুজ একটু করে হাসে, বলে বাহ! সত্যিই ধরেছ তুমি, তবে রুপরানী আমার, এই রুপবানী ঢাকা শহরের এই ইট সিমেন্টে বাঁধা স্থবির সৌন্দয্যের জন্য নহে, ঐ হৃদয় সুধা সবুজ-শ্যামলে আচ্ছাদিত, ফুল পাখির নাচনে গাহনে রসাসিক্ত আমার গ্রাম বাংলার জন্য । চিত্রা বাঁধা পেয়ে একটু কৃত্রিম রাগ করে । বলে, তোমার যে কবি এই গানটা লিখেছেন, তিনি কি তোমার কানে কানে বলে গেছেন, যে এই গানটা শুধু গ্রাম সুন্দরের জন্য । তা অবশ্য তিনি আমায় বলেন নি । তাহলে পন্ডিতের মতো এত কথা বলছো কেন । সবুজ জোরে একটা শ্বাস নেয় । বলে, কতদিন গ্রাম দেখা হয় নি, গ্রামে যাওয়া হয় নি । ছেলে বলে ওঠে, আব্বু, তুমি গ্রামের বাড়িতে যাও না কেন । সবুজ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদুস্বরে বলে, গ্রামে যাওয়া তোমার মমের পছন্দ না । চিত্রা সাথে সাথে প্রতিবাদ করে, এই একদম বাজে কথা বলবে না । আমি কখন তোমাকে বাড়িতে যেতে না করেছি । নিজ থেকে যাওয়ার কোন গরজ দেখি না, যেতে চাও না, দোষটা চাপিয়ে দিচ্ছো আমার ওপর । সবুজ বড়বড় চোখ করে চিত্রাকে দেখে । বলে, আমি যেতে চাই না, তাই । হ্যাঁ, তোমাকে বাড়ি যেতেই আমি কখন না করেছি, বলো । তাহলে দিন কয়েকের জন্য আমি গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি । তোমার কোন আপত্তি নেই তো । বলছি তো, না । যাও. আজ রাতের গাড়িতে তুমি চলে যাও । ছেলে বলে, আব্বু, আমিও তোমার সাথে যাব । চিত্রা বড় বড় চোখ করে ছেলের দিকে তাকায় । বলে, তুমি গিয়ে ওখানে কি করবে । আম্মু, প্লিজ, তুমি না করো না । নাটক সিনেমায় ছাড়া বাস্তবে আমি কখনো কোন গ্রাম দেখি নাই । কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা অনেকেই তাদের দাদু বাড়ি নিয়ে কত রোমান্সকর রোমান্সকর গল্প বলে ।প্র্যাকটিকালি আমার তো এই বিষয়ে কোন এক্সপেরিয়ান্স নেই ।জীবনে একটা নতুন এক্সপেরিয়ান্স হোক না । তাছাড়া, গ্রামটা আমার আব্বুর গ্রাম, আমারও, যদিও আমি তা কখনো চোখে দেখি নাই । আমার গ্রান্ড ফা, গ্রান্ড মা সেখানে ছিলেন ।তাছাড়া সবাই তো বলে, আমাদের সবার মূল শেকড় নাকি গ্রামে পোঁতা আছে ।আমার মূল শেকড়টা কোথায়, কোন গ্রামে, একবার দেখে আসি । রিয়েলি, আই এ্যাম সো এক্সসাইটেড, মাই সুইট মম, প্লিজ । +++++++++++++++++++++++++++++++চব্বিশ++++++++++++++++++++++++++।   বাড়িতে এসে নিজের ঘরে শুয়েও সবুজ সারারাত ঘুমাতে পারে না ।বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করে । এই ঘরটাকে সবুজের মা-বাবা থাকতো । ঘরটা এখন খালি পড়ে থাকে । বড় ভাই পাশের জমিতে নতুন ঘর করেছে । মেজ ভাই মূল ঘরের অর্ধেকে নতুন করে ইট সিমেন্টের দেয়াল তুলে রঙ্গিন টিনের ছাউনি দিয়েছে ।বাবা মায়ের স্মৃতি হিসেবে শুন্য ঘরটা জীর্ণ শীর্ণ ভাবে কোন রকমে টিকে আছে।টিনের ফুটো দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যায় । বেড়ার ফাঁকে ধুলো বালি জমাট বেঁধেছে । মা জীবিত থাকা কালেও সবুজ চেয়েছিল, এই ছোট্ট ঘরটাকে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘিরে দিতে । চিত্রা রাজি হয়নি । মেজাজের সাথে বলেছে, টাকা কি তোমাকে কামড়ায় ।বাড়িতে ঘর করার দরকার কি, আমরা তো কেউ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকবো না । সবুজ খুব ভোরে বিছানা ছেড়ে ওঠে আসে ।মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে । সবুজ বাড়ি ফিরে না ।ফিরতে তার মন চায় না।ভোরের প্রকৃতির একটা অস্পষ্ট স্নিগ্ধ সৌর্ন্দয্য গাছের পাতায় ঘাসে নিঃশব্দে শুয়ে আছে । সবুজ তার শিশু শৈশবকালের গ্রামটাকে একবার ঘুরে দেখার ইচ্ছেয় ধীর পায়ে হাঁটতে শূরু করে ।এসে দাঁড়ায় নিজেদের পুকুর পাড়ে ।পুকুরের এই উত্তর পাড়ে এক কোনায় ছিল একটা বাঁশ ঝাড় ।গোটা কয়েক খেজুর গাছ, দুটি মর্দা তাল গাছ ।নিচের খোলা জায়গাটুকু ছিল সবুজ দুব্বাঘামে মোড়ানো ।পড়ন্ত বিকেলের লাল আভায়, সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে, জোছনা ভেজা রাতে, গ্রামের শান্ত অশান্ত ছেলে জোয়ান বুড়োরা এই সবুজ চত্বরে বসে আড্ডা দিত । গানে কথায় গল্পে, হাসি আনন্দের তাদের প্রাণের বন্যা নামিয়ে আনত ।বয়স এবং সম্পর্কের সীমানা ভুলে গিয়ে সবাই নানা হাসি ঠাট্টায় অনেক সময় রাত ভোর করে দিত । শৈশবের স্বর্গোদ্দ্যান সেই পুকুর পাড়টি এখন নেই । দেখা হয়ে যায় সবুজের আলু ভাইয়ের সাথে । সবুজ আলু ভাইকে চিনতে পারে নাই, কিন্তু আলু ভাই সবুজকে চিনতে একটুও ভুল করে নাই । সবুজ ইচ্ছে করে তার বাবা মায়ের ঘরে রাত কাটায় ।একটা চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব মিটমিট করে ঘরের চারপাশে আলো ছড়ায় । চিত্রার বাসায় রাত দিন কত বাল্ব জ্বলে, তার হিসেব সবুজ বা চিত্রা কেউই জানে না ।চারদিকে আলোর বন্যা, আলোর ঝলকানি । সবুজ চিত্রাকে বলেছিল, দিনের বেলায় এতএত লাইট কেন জ্বালিয়ে রাখো, কাব্য করে বলে, ‘ যেই জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি আশুগৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি’ । তোমাদের মত ছোটলোকদের জন্য ঐসব কবিতা লেখা হয়েছে, এই যুগে এইসব নীতিকাব্য অচল । আর এইটা মোমবাতির যুগও নয় ।জন্মদিনের কেককাটার সময় ছাড়া মোমবাতি এখন কেউ জ্বালায় না । চিত্রার উত্তপ্ত কন্ঠস্বর শুনে সবুজ চুপ করে যায় । সবুজ আপন মনে একটু খানেক হেসে নেয় । মনে মনে বলে, চিত্রা, সত্যিই তোমার কোন তুলনা নেই । রাতের খাবারটা সে মেজভাইয়ের ঘরে খায় ।খাওয়া শেষ করে ভাই ও ভাবীদের সাথে অনেক রাত পযর্ন্ত গল্প করে । সকালে ঘুম থেকে ওঠে সবুজ ঘরের চারপাশটা একবার দেখে নেয় । বড় দুইভাইকে ডেকে বলে, আমি এইজায়গায় একটা ঘর করবো ।দোতলা ঘর । বড়ভাই হেসে বলে, শুনে খুব খুশি হলাম । বাড়িতে ঘর একটা থাকলে, তোর সাথে গ্রামের একটা সম্পর্ক থাকবে । ঘরের মায়ায় হলেও মাঝে মধ্যে বাড়ি ঘরে আসবি । মেজভাই একটু মন খারাপ করে । বলে, বাড়িতে ঘর করে তুই কি করবি । তোর ছেলে মেয়ে বউ তো আর ইহজনমে কখনো গ্রামের বাড়িতে আসবে না । মেজদা’ পুরাণো ঘরটা তো নষ্ট হয়ে গেছে, জায়গাটা খালি হয়ে পড়ে আছে, আমি চাচ্ছি না, মা বাবার ঘর ভিটায় ঘুঘু চরুক । মা বাবার জন্য যে তোর দরদ কতটুকু ছিল, সেটাতো আর ঘোষনা দিয়ে তোকে জানান দিতে হবে না ।আসলে শহরে থেকে থেকে তোর চিন্তাভাবনা সব ছোটলোকের মতো হয়ে গেছে । আমার ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে । আমার ঘরটাতো খুব একটা বড় নয় । ঘরটা তো আমি মেরামত করে নিলে, ছেলে মেয়েদের শোয়া থাকার কষ্টটা হয় না । সবুজ জান, ঘরটাতে মেজদার দুইছেলে রাতে ঘুমায় । ঘরের ওপরে নিচে তাকালে বুঝা যায়, ঘরটাতে মানুষের আনাগোনা আছে ।সবুজ মেজদা’র কথার উত্তর না দিয়ে বলে, দোতলা ঘর হবে ।আমার বহু বছরের স্বপ্ন । মাকে কথা দিয়েছিলাম, নাম দেব, “মায়ের নীড়” । মা বাবার জন্য হঠাৎ দরদ উত্থলে উঠেছে, তাই না ।গত দশ বারো বছরে যে একবার বাড়ির ধারে কাছে ভিড়ল না, মা বাবার কবর জেয়ারত করার জন্য যার হাতে কোন সময় থাকে না, সেই ছেলে মায়ের নামে তাজমহল বানাবে । সবুজের মেজভাই বেশ কড়া মেজাজে কথাগুলো বলে । তুই এত কথা বলছিস কেন । সবুজ যদি ঘর তুলতে চায়, সেটাতো ভালো কথা, আমাদের সবার জন্য গর্বের বিষয় । সবুজের বড়ভাই বলে ।গর্বটা থাকবেনা দাদা । বিল্ডিং হলে ঐ ঘরের চাবি তো দুরের কথা, ঘরের ধারে কাছেও ভিড়তে পারবে না ।বছরের পর বছর ঐ ঘর খোলা হবে না ।ঝাড়া মোছা হবে না, মানুষের আনাগোনা থাকবে না । তখন তো আর ঐ স্বর্গপুরি স্বর্গ থাকবে না । হয়ে যাবে গোখরো সাপের গুহা ।ঐ সর্পরাজ্যের সাথে লাগোয়া আমাদের সবার অবস্থাটা তখন কি হবে, একবার তুমি ভেবে দেখেছ । সবুজের বড়ভাই কিছু ভাবে না । সবুজও আর কোন কথা না বলে ওঠে বাইরে চলে যায় ।   ++++++++++++++++++++++++পঁচিশ++++++++++++     চিত্রার দেখা স্বপ্নটা ভীতিকর ছিল । চিত্রা স্বপ্ন দেখে না ।স্বপ্নহীন জীবনেও চিত্রার বাহাদুরির কমতি নেই ।ঘুমের স্বপ্ন নিয়ে তার একটা নিজস্ব দর্শণ আছে । চিত্রা বলে, ঘুম আল্লাহর নেয়ামত, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শরীরের জন্য স্বর্গীয় বিনোদন ।মানষিক ভাবে অসুস্থ মানুষই ঘুমের সারা রাস্তায় নানা রঙ তামাশায়, কষ্ট বেদনায় ভেসে ভেসে ঘুমের আনন্দটাকে নষ্ট করে দেয় । শুধু রাতের ঘুম নয়, স্বপ্নের রেশটুকু ভেবে ভেবে দিনের কাজ কর্মেরও বারোটা বাজিয় ছাড়ে । গত রাতে চিত্রা বিছানায় একাকী ছিল ।সবুজ তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে দিন তিনেক আগে ।গত দুইরাত কৃষ্টি তার মায়ের সাথে ঘুমিয়েছে ।চিত্রাও তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য নিয়ে, হাত পা ছড়িয়ে নাক ডেকে ডেকে ঘুমিয়েছে । কোন রকম ব্যাঘাত ঘটে নাই । কিন্তু, কৃষ্টি সারারাত ভালো করে ঘুমাতে পারে নাই । মায়ের হাত পা ছুড়া, নাক ডাকার কারণে, বারবার কৃষ্টির ঘুমের ব্যঘাত ঘটেছে । সেই কারণে কৃষ্টি মা কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে মাঝ রাতে নিজের বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ।বিছানায় চিত্রাকে একাকী পেয়ে একটা স্বপ্ন তাকে ভয় দেখিয়ে গেছে । সকাল থেকে স্বপ্নটা অস্পষ্ট ছায়া হয়ে   বারবার তার মাথার ভেতর উঁকি মারে, কিন্তু স্পষ্ট হয়ে স্বপ্ন ছায়টা ধরা দেয় না ।স্বপ্নটা খারাপ ভীতিকর স্বপ্ন । কিন্তু স্বপ্নটা কি ছিল, শতবার চেষ্টা করেও চিত্রা সেটা মনে করতে পারছে না ।শুধু এটুকু মনে আছে, কেউ একজন, কিছু একটা তার চোখে মুখে, বুকে নখের আঁচড় বসিয়ে যাচ্ছে ।তার নরম কোমল ফর্সা লাল টুকটুকে মুখটাকে খামচি মেরে মেরে রক্তাক্ত ক্ষতাক্ত করে দিয়েছে । স্বপ্নের ভেতর চিত্রা খুব ভয় পেয়েছিল, সারা রাত বোবা কান্নায় সে ছটফট করেছে । তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল । চিত্রা বুঝে ওঠতে পারে না, এই কি রকমের স্বপ্ন । স্বপ্নের কথাটা কাউকে বলতে পারছে না । বলার মত লোক কেউ বাসায় নেই ।কাজের মেয়েদের সাথে এই সব স্বপ্ন টপ্নের কথা বলা, না বলা দুইয়ে সমান । সবুজটা থাকলে হয়তো বলা যেত । কিন্তু, সবুজও তো একই । শুনতেই চাইবে না হয়তো । শুনলেও চিত্রাকে একগাদা জ্ঞান দিয়ে দেবে । চিত্রা যে এখন কি করবে, বুঝতে পারছে না । চিত্রা স্বপ্নের কথা ভাব না । সে ভাবে সবুজের কথা । ইদানিং সবুজ একটু বেশি কথা বলছে ।কিন্তু কেন ? বাড়িতে ওর কি রাজকাজ পড়লো যে, পুরো একটা সপ্তাহ তাকে বাড়িতে থাকতে হবে । সবুজের ব্যাপার স্যাপার তো কিছু বুঝতে পারছি না । সকালে যখন ফোন করলাম, তখন তো বলছে, ঘুমাচ্ছি ।শুধু মাত্র ঘুমের জন্য কি বাড়ি যাওয়া, নাকি ভেতরে ভেতরে অন্য কোন মতলব আছে । বাড়িতে সবাই তো হা ভাতের দল, লোভী, স্বার্থপর ।সবুজকে ফুসলিয়ে আবার কোন বড় রকমের ফায়দা লুটে নেয় ।কেন যে ওকে একা একা এতদিনের জন্য বাড়িতে যেতে দিলাম । ছেলেটা সাথে গেলেও তো কিছু কথা জানতে পারতাম ।দিন দিন আমার বুদ্ধিসুদ্ধি কেন যে সব লোপ পাচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না । চিত্রা নিজের ওপর নিজে রাগ করে ।   ********************ছাব্বিশ++++++++++++++++++++++     হুইল চেয়ারে বসে চিত্রার মা একটা লেজহীন টিকটিকির দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে ।চিত্রার মা চিত্রার বাসায় থাকে ।চিত্রার বাবার মৃত্যুর মাস কয়েক না যেতেই দুই ভাইয়ের সংসারে সবচেয়ে বড় সম্যসা হয়ে দাঁড়ায়, চিত্রার মা । আপু তুই মাকে তোর কাছে রেখে দে । চিত্রার ছোট ভাই চিত্রাকে বলে ।কেন, তোরা দুইটা ছেলে থাকতে মা মেয়ে জামাইয়ের কাছে থাকবে কেন । আসলে ব্যাপারটা তুই ভালো করে বুঝতে পারবি ।তুই তো একটা মেয়ে, মা তো সারাদিন এটা ওটা নিয়ে ক্যাটক্যাট করে, সংসারে সব কাজের ওপর বউদের ওপর খবরদারী করে, এই যুগে কোন পুত্রবধু তার শ্বাশুড়ির এসব খবরদারী মানবে বল । তাই বলছি, তোর কাছে থাকলে তো আর, এতক্ষনেই পিঁপড়ের পেঠ কামড়ানি বুঝতে পারছি । চিত্রা বলে । সবুজ পরিবারের বড় জামাই হয়ে সম্যসার সমাধান করে দেয় । চিত্রার মাকে চিত্রার বাসায় নিয়ে আসে । এর মাস কয়েক পরে, অসুস্থ হয়ে হুইল চেয়ারের আসনটা পাকাপোক্ত করে নেয় । হাঁটা চলা করতে পারে না । ডান হাত পা’ দুটোই অবশ, তবে, কথা বলতে খুব একটা সম্যসা হয় না ।এখনো সে মেয়ে চিত্রাকে সংসার বিষয়ে নানা জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে । দুপুরে খাবারের পর চিত্রা তার মায়ের কাছে এসে বসে ।মায়ের মাথার চুলগুলো বেনি করে বেঁধে দেয় ।এই কথা সেই কথা বলার পর, চিত্রা বলে, মা, গত রাতে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছি । কি স্বপ্ন দেখেছিস । পুরো স্বপ্নটা ঠিকঠিক মনে করতে পারছি না । তবে, স্বপ্নটা বড় বাজে, স্বপ্ন দেখে আমি ভয়ও পেয়েছি । কি দেখেছিস, সেটা বল । আর কখন দেখেছিস, ভোরের স্বপ্ন না হলে ভয়ের কোন কারণ নেই । মা দেখেছি, কেউ একজন, বা কিছু একটা আমার চোখে মুখে খামচি মেরে মেরে আমাকে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে । কি বলছিস তুই, চিত্রার মা আঁতকে ওঠে । হ্যাঁ মা, আমি তো কখনো স্বপ্ন দেখি না ।যাও একটা দেখলাম, তাও আবার । বুঝতে পারছি, তোর ওপর কোন ধরনের বড় বিপদ ঘনিয়ে আসছে । একটু ছদকা দিয়ে দে, বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চা । আল্লাহ রক্ষা করনে ওয়ালা । চিত্রার মা চোখ বন্ধ করে । বিড়বিড় করে কিসব দোয়া দরুদ পড়ে ।বলে, সবুজ কোথায়, তাকে স্বপ্নের কথা বলিস নি । ও এখানে নেই, ওর গ্রামের বাড়িতে গেছে । কখন গেল, আর আমাকেও তো কিছু বলে যায় নি । বাড়িতে ওর আবার কি দরকার পড়লো । বলছিল, কিসব উল্টাপাল্টা স্বপ্ন নাকি দেখেছে ।মনটা তাই অস্থির অস্থির করছিল । সেজন্য আমিও আর বাঁধ সাধি নাই । ও আবার কি স্বপ্ন দেখল । আমাকে কি স্বপ্নটা দেখেছে, তা বলে নাই । কোন বিপদ যে, আবার আসছে, আল্লাহ জানে ।তোরা দুইজনেই খারাপ স্বপ্ন দেখছিস । আল্লাহ মাফ করে দাও । সকল বালা মুছিবত থেকে রক্ষা করো আমাদের । তখনি চিত্রার মোবাইলটা বেজে ওঠে ।অপরিচিত নাম্বর । চিত্রা ফোন রিসিভ করে না । চিত্রার মা বলে, শুন, সবুজকে তাড়াতাড়ি চলে আসতে বল ।এরকম বিপদের সময় দুইজন দুই জায়গায় থাকা ভাল নয় । বিপদ, কিসের বিপদের কথা বলছ তুমি । চিত্রার মা একটু খানেক হাসে । বলে, বয়স হয়েছে, দুই ছেলে মেয়ের মা হয়েছিষ, এখানো তোর বুদ্ধিসুদ্ধি কিছুই হলো না । আমি বলছি, সবুজকে এভাবে একা ছেড়ে দেওয়া টা তোর ঠিক হয় নি । যা মাথামোটা একটা ছেলে । কি করতে গিয়ে কি করে যে বসে, তার কি ঠিক ঠিকানা আছে ।ওকে চলে আসতে বল । চিত্রা তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । কোন কথা সে বলে না । মোবাইলটা আবারো বেজে ওঠে ।চিত্রা মোবাইল হাতে মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে আসে । ****************************২সাতাশ+++++++++++++++++++++ সকাল বেলা সবুজের আলু ভাই আসে । হাঁকডাক দিয়ে সবুজকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ।সবুজের মেজ ভাবীকে ডেকে বলে,ভাবী চা করেন, সাথে কিন্তু মিষ্টি দিতে হবে ।আমাদের সবুজ বাড়িতে ঘর করবে, এই শুভ উদ্বোধন টা মিষ্টি দিয়ে শুরু না করলে যে, গৃহস্তের মঙ্গল হবে না । মেজ ভাবী কোন সাড়াশব্দ করে না ।সবুজ ঘুম থেকে ওঠে বাইরে বের হয়ে আসে ।আলু ভাইকে দেখে হাসে, বলে তোমার লোকজন কই, তাদের কাউকে তো দেখছি না । আসবে আসবে । আমার কথার বরখেলাপ হয় না । হবেও না কোনদিন । আমি হলাম এই গ্রামের সবার মাষ্টার সাব । আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখে নাই, এমনটি আজ পযর্ন্ত একবারও ঘটে নাই । মিনিট কয়েক পরে দুইজন লোক আসে । তারা এসে মাপ ঝোঁকে লেগে যায় ।বলে, বারো তেরশ স্কয়ার ফিট ঘর হবে । সবুজ ভেবে নেয়, নিজের তলায় একটা মাত্র বেডরুম রেখে বাকি অংশটুকু খোলা থাকবে ।সবুজ মারা গেলে তার লাশটা রাখতে আর কোন সম্যসা হবে না । ওপরের তলায় আরো দুটি বেডরুম করবে । ছাদটাও তার শহরের বাসার মতো করে নেবে ।  সবুজের মেজভাই এসে তাদের পেছনে দাঁড়ায় । তার সাথে বাড়ির আরো জনা কয়েক লোক ।মেজ ভাই ধারালো চোখে সব কিছু দেখে । বলে, সবুজ তুই যে মাপ নিচ্ছিস, তা হিসেবে টিকবে না । কেন মেজ দা, আমি তো পুরাণো সীমানা ধরেই মাপটা নিচ্ছি । পুরানো দিনের হিসেব করে এখন আর লাভ নেই ।উত্তর পাশে বাড়ির মূল রাস্তার জন্য এক ফিট, ও পুর্ব ও পশ্চিশপাশ থেকে আরো দেড়ফিট জায়গা ছেড়ে দিতে হবে । কেন । এটা তোর শহরের বাড়ি নয়, এটা গ্রামের বাড়ি, বাড়ির লোকজনের সুবিধে অসুবিধেটাও তোকে দেখতে হবে । তা না হয় দেখলাম, কিন্তু, পাশের এই ঘরটা তো এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়ে নাই ।আমার যতটুকু মনে পড়ছে, ওর ঘরটা রাস্তার ওপর চলে এসেছে । ও, ছেলে মানুষ, না বুঝে কাজটা করে ফেলেছে, এখন তো ওর ঘরটা আমরা ভেঙ্গে দিতে পারি না । পেছন থেকে সবুজের এক চাচা বলে ওঠে, ভাগ্যিস ছেলে আমাদের বুঝে নাই, বুঝতে পারলে সবুজের খালি জায়গাটা পযর্ন্ত ঘরটা টেনে নিয়ে যেত । এই ছেলে মানুষটা হচ্ছে, সবুজের এক চাচাত ভাইয়ের ছেলে । সবুজদের পরবর্তি প্রজম্মের গুরুজন । সবুজ বলে, রাস্তার জন্য না হয়, আমি এক ফিট জায়গা ছেড়ে দিলাম, কিন্তু, পুর্ব-পশ্চিমে কিসের প্রয়োজনে জায়গাটা ছাড়তে হবে । আপনার ছাদের পানি কোথায় পড়বে । সেটা তো রাস্তায় বা অন্য কারো জায়গায় পড়তে পারে না । মেজ ভাইয়ের বড় ছেলে বেশ দৃঢ়কণ্ঠে কথাটা বলে । এই ছেলে, তুমি কার সাথে কথা বলছ, উনি তোমার চাচা, তোমার বাবার আপন ছোট ভাই । তুমি ছোট মানুষ, তুমি কেন এইসবে মাথা গলাচ্ছ । আলু ভাই মেজ ভাইয়ের ছেলেকে বলে । এই যে, আলু মাষ্টার, এটা তোমার স্কুল নয় । আমাদের পারিবারিক বিষয়ে তোমার নাক গলানো টা ও আমার পছন্দ হচ্ছে না ।মেজ ভাইয়ের তাতানো স্বরটা আলু ভাইকে আহত করে । আলু মাষ্টার কোন কথা না বলে, চুপটি করে, পারিবারিক কোন্দল থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে সবুজদের বাড়ির বাইরে চলে যায় । সবুজ হাসে । কোন কথা বলে না । ভাই ও ভাইপোর কাপ্তানী মেজাজ শুনে বাড়ির অনেক বউ ঝি, ছেলে মেয়েরা সেখানে এসে জঠলা করে । সবুজ তার মেজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে । কোন কথা বলতে পারে না । রণে ভঙ্গ দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায় ।মনে মনে হিসেব করে দেখে, মেজদার হিসেব মত ঘর করতে হলে, ঘরটা আটশ’ স্কয়ার ফিটের বেশি করা যাবে না ।আটশ স্কয়ার ফিটের খুপরি বানিয়ে লাভ টা কি । সবুজের পক্ষে বোধ হয় বাড়িতে ঘরটা করা সম্ভব হবে না ।তার আজম্ম লালিত স্বাধটা আর পূরণ হবে না ।স্বপ্নটা তার কাছে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে ।চিত্রাকে হয়তো রাজি করানো যাবে । কিন্তু মেজ ভাইয়ের বিষ ফলা থেকে তার স্বপ্নকে বাঁচানো যাবে না । সবুজ সারা দুপুর বিকেল ঘর থেকে বের হয় না সবুজ । তার কিছু ভালো লাগে না ।মেজ ভাইয়ের কথাগুলো নিয়ে ভাবে, নিজেকে নিজে ধিক্কার দেয় ।ভাবে, কোন পাপে তার জীবনটা এমন হয়ে গেল ।মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, সুখ নামক সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে কি সবুজ নিজ হাতে খুন করে বসে আছে ।অর্থ বিত্তের অভাব তো তার নেই । কিন্তু, সুখ শান্তি কি কখনো তার জীবনে এসেছে, আসে নি তো ।সুখে আছে, শান্তিতে আছে, এই অভিনয় করতে করতে সবুজ সত্যি আজ বড় ক্লান্ত ।কিন্তু, এই যন্ত্রনা, এই অপমান, লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির বা পথ কি । জীবন মানেই কি যন্ত্রনা ।সবুজের মনের ভেতর একটা চাপা কান্নার বুদবুদ, রক্ত ক্ষরণের একটা অসহ্যকর যন্ত্রনা সবুজকে বিবশ করে তুলে । এত বছর বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল চিত্রা । আর আজ, এখন যদি সবুজ বাড়ির কাজে হাত দেয়, মেজভাই পারলে, পরিবেশ দুষনের মামলা করে বসবে ।  সেই সাথে দেখা যাবে, বাড়ির অনেকেই এই কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে ।গ্রামের ছেলে গ্রামে বাড়ি করতে এসে চাঁদাবাজদের নেক নজরেও পড়ে যেতে পারে ।তখন যদি সবুজ গ্রামের ছেলে বলে গলা খাঁকারী দিতে চায়, তখন হয়তো সবুজের আম ছালা দুই যাবে । সবুজের মেজ ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা খুবই ভালো।ঘরের দেয়ালগুলো ইট সিমেন্টে বাঁধানো, ক্যাটক্যাটে হলুদ রংয়ে রঙিন ।ফ্রিজ টি ভি সহ, আরো অনেক প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় জিনিষে তার ঘর ভর্তি ।অগোছালো জিনিষ প্রত্রের স্তুপের কারণে ঘরটাকে দেখতে ষ্টোর রুম বলে মনে হয় ।তার তিন ছেলে, তারা সবাই অল্পস্বল্প পড়ালেখা জানে । তবে আয় রোজগারটা সবাই ভালোই করে ।মেজ ভাই নিজেও সরকারী দলের লোকজনের সাথে সুসম্পর্ক রাখে, তাদের সাথে এদিক ওদিক চলাফেরা করে । সবুজ মনে মনে বলে, মেজদা, তোমার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড শক্ত হয়েছে সত্যি, কিন্তু, মানবিক মেরুদন্ডে ক্ষয়রোগ ধরেছে ।   +++++++++++++++++++++++আঠাশ++++++++++++ সবুজ আর দোলাচলে দুলে না ।সে দৃঢ়চিত্তে তার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয় । বাড়িতে সে ঘন করবেই । হোক সেটা আট, নয়শ স্কয়ার ফিট । ছোট হোক বড় হোক, তবু তার নিজের বাসা । চড়ুই পাখির বাসায় নয়, সে নিজের গড়া বাবুই পাখির বাসায় দুই এক রাত হলেও রাত কাটাবে । মেজদার কথা মত ঘরটা হবে ।তার চাহিদা মত, তিনদিকের জায়গা সে ছেড়ে দেবে । তার পক্ষে তো বাড়িতে থেকে বাড়ির কাজ শেষ েেকা সম্ভব হবে না । বড় দাদাকে সব দায় দায়িত্ব বুঝে দিয়ে যাব । আলু ভাইটা সাথে থাকলে একটু বেশি ভালো হত । বড়দা বড়বেশি সহজ সরল মানুষ । আর ঘর বানানোর কারিগর গুলো হলো, সেরা বদ ।কথায় কাজে বড়দা’ ওদের সাথে পেরে ওঠবে না । আলু ভাইকেও একটু রিকোয়েষ্ট করে যেতে হবে । সবুজ ঘর থেকে বের হয়ে আসে ।ঘরের চারপাশটা আবারও একটু দেখে নেয় । ঘরে গিয়ে কলম আর ডাইরিটা নিয়ে আসে । ডাইরিতে ঘরের একটা স্কেচ করে নেয় ।আজই ঘরের কাজে হাত দিয়ে দিতে হবে । রাজ মিস্ত্রিকে পুরো নঁকশা টা ভালো করে বুঝে দিতে হবে । তখনি চিত্রা সবুজকে ফোন করে ।, শরীর ভালো আছে তো, বাড়িতে এসে মনটা ফ্রেশ হয়েছে তো, নানা কথা জিজ্ঞাসা করে ।বলে, কি করছো এখন । বাইরে দাঁড়িয়ে আছি । বাইরে, কোথায় । এ্যাই, ঘরের সামনে । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি । ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কি ভাবনা আবার তোমার মনে এলো । ভাবছিলাম, সবুজ একটু দ্বিধায় পড়ে, চিত্রাকে কথাটা এখন বলা ঠিক হবে কিনা । অত বেশি ভাবতে হবে না । তুমি আজ রাতেই ঢাকায় ফিরে আস । এখানে কিছু জরুরী কাজ পড়ে গেছে । জরুরী কাজ, সবাই ভালো আছে তো । মায়ের কোন সম্যসা হয় নি তো । ঐসব কিছু না ।আমরা সবাই ভালো আছি । তুমি আসলে তখন দেখবে জরুরী কাজটা কি । চিত্রা, আমি বলছিলাম, তোমাকে নতুন করে আর কিছু বলতে হবে না । আমি সব শুনেছি । শুনেছ । কি শুনেছ । তুমি ওখানে বসে বসে যা যা করছ, সব আমি ভাল করে শুনেছি । কার কাছে শুনলে । বাহ ! তুমি বাড়িতে গিয়ে, তোমার মায়ের নামে স্মৃতিঘর বানাবে, আর সেই সংবাদ আমি পাব না, এরকম বুদ্ধু তুমি আমাকে কি করে ভাবলে । তাহলে কি আমার স্বপ্ন পূরণ হবে না । স্বপ্ন হলেই তো পূরণ হবে । তোমারটা তো কোন স্বপ্ন না, ওটা একটা দুঃস্বপ্ন । তুমি নিজে বুঝতে পারছ না ।তোমার মেজভাই ও তার ছেলেরা তোমাকে ওখানে ইটের গাঁথুনি গাঁথতে দেবে না । তুমি একা কিছু করতে যেয়ো না । ঝামেলায় পড়ে যাবে । আমি বলছি, বড় দা’কে দায়িত্বটা দিয়ে যাব । তোমার বড় দা’ একটা বোধাই । ওনাকে দিয়ে এসব হবে না ।আর তোমাদের মেঝ ছোটর ঝামেলায় বড় দা’কে জড়াচ্ছ কেন । তাহলে কি আলু ভাইকে দায়িত্বটা দিয়ে যাব । আরে বুদ্ধু, এটা লাখ লাখ টাকার মামলা, এখানে আলু ফালুকে টেনে এনো না । আর তোমার ভাইপোরা যদি জানতে পারে, তাহলে ওরা সবাই মিলে তোমার আলু ভাইকে আলুর ভর্তা বানিয়ে ছেড়ে দেবে ।তোমার মেজ ভাইয়ের গোষ্ঠিকে তো তুমি চেন না, আমি ভালো করে চিনি ।ওরা হচ্ছে এক একটা বাঘা কুকুর, তোমার ঐ নয় ছয় ইঞ্চি মুগর দিয়ে ঠান্ডা করা যাবে না ।কাজেই নেড়ি কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ না করে সোজা বাসায় ফিরে আস । সবুজ কি করবে, বুঝে ওঠতে পারে না ।চিত্রার সাথে আর কথা বলা যাবে না । চিত্রার মুখের লাগাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছে ।এখন বেশি কথা বলতে গেলে, জল আরো বেশি ঘোলাটে ও উতপ্ত হয়ে যাবে । সেই গরম জলে নাকানি চুবানি খেয়ে শেষে আমাকেই মরতে হবে । কিন্তু, কথাটা চিত্রাকে জানালো কে, সবুজের মাথা কাজ করে না । হ্যালো, শুনতে পাচ্ছ । তুমি বিকেলের গাড়িতে রওয়ানা দাও । অঅমি আর কোন কথা শুনতে চাই না । চিত্রা লাইন কেটে দেয় । সবুজ কিছুক্ষন গাছ হয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে । ধীর পায়ে বড় ভাইয়ের ঘরের দিকে হাঁটে । ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে বড় ভাবীকে বলে, ভাবী, এক কাপ চা দাও । আর আমি আজ বিকেলে ঢাকা চলে যাব । দুপুরের খাবারটা তাড়াতাড়ি তৈরি করো । বড়ভাবী কোন কথা বলে না ।সবুজের বড় ভাই বলে, চলে যাবি মানে, তুই তো বললি, সপ্তাহ খানেক থাকবি । এখন আবার, বাসার সবাই ভালো আছে তো,কোন সম্যসা হয় নি তো । না দাদা, কোন সম্যসা হয় নি । সবাই ভালো আছে । চিত্রা চলে যেতে বলেছে । বাড়িতে বোধ হয় ঘর করা হবে না, মা বাবাকে দেয়া কথাটা আমি রাখতে পারলাম না ।আমার আজন্ম লালিত স্বপ্নটাও পূরণ হলো না । চিত্রা জানল কি করে, তুই এখানে এসব করছিস । ওকে কে বলেছে কথাটা ।বড় ভাই সবুজের কাছে জানত চায় । আমি বলেছি । সবুজের বড় ভাবী চা হাতে ঘরে ঢুকে । তুমি বলেছ, কিন্তু কেন । তুমি তো জান, চিত্রার মাথাটা একটু গরম, কেন তুমি তাকে এসব বলতে গেলে । যা করেছি, তোমাদের ভালোর জন্য আমি করেছি ।তোমার মেজভাইকে তুমি চেনো না । সবুজ ভাই যদি এখন, ওই ঘর ভিটায় কোন কোপ বসায়, তাহলে তোমার ছোট ভাইয়ের কি অবস্থাটা কি হবে, একবার ভেবে দেখেছো, আমি সব জানি, সব শুনেছি । তাই বাধ্য হয়ে চিত্রাকে সব জানিয়েছি । ভাবী, কিন্তু, সবুজ কথা বলতে পারে না । তার চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে । সবুজ ভাই, মন খারাপ করো না । চিত্রার সাখে আমার প্রায় ঘন্টা খানেক কথা হয়েছে । চিত্রা আমাকে ওয়াদা দিয়েছে, বাড়িতে সে কিছু একটা করবে ।বছরের শেষে সে নিজেই বাড়িতে আসবে ।নিজে দাঁড়িয়ে সব কিছু শেষ করবে । আমি জানি, চিত্রা পারবে । চিত্রার সাহস আছে ।তুমি ফিরে যাও, বাসায় গিয়ে আবার ভাইদের মহামানব বানাতে চেষ্টা করো না ।যা যা ঘটেছে, সব কিছু খুলে বলবে । চিত্রা এমনিতে আপনাদের কাউকে পছন্দ করে না, তার উপর আমি যদি এসব বলতে যায়, ও আমাদের কাউকে হিংসাও করে না । কেন করবে, চিত্রার সাথে আমাদের কোন স্বার্থের সম্পর্কটা জড়িয়ে আছে । ওর স্বভাবটা এই রকম ।বেশি কথা বলা লোকেরা এমনিতে আজে বাজে বকে বেশি । কখন কাকে কি বলে, তার হিসেব নিকেশ থাকে না । তারপরও, চিত্রা তোমার বউ, তোমার ছেলে মেয়ের মা । এই বয়সে এসে নতুন করে আর ঝামেলা করো না ।চিত্রা তোমাকে বলে কিন্ জানি না, চিত্রার সাথে আমার প্রতি সপ্তাহে একবার করে কথা হয় । ওর কথাতে আমি বুঝতে পারি, চিত্রা অনেক বদলে গেছে । আমার বিশ্বাস তোমার স্বপ্ন পূরণে চিত্রা বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না । এখন আর কাউকে বিশ্বাস হয় না ।সামান্য স্বার্থের জন্য মানুষ কিভাবে অমানুষ হয়ে যায়, সেটা তো সব জায়গায় দেখছি ।সবুজ ভাই, আমিও বলছি, বেলা থাকতে থাকতেই তুমি, আজই ফিরে যাও । সবুজ ভাবে, ফিরে তো আমাকে যেতে হবে । আমার গলার রশিতে যে টান পড়েছে।সেই টান উপেক্ষা করার সাহস তো আমার ইহজনমেও হবে না ।এই ফাঁস তো আমাকে আমৃত্যু বহে বেড়াতে হবে ।সবুজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চায়ের কাপটা হাতে তুলে নেয় ।     ======================সমাপ্ত===================== লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ।
হুমায়ুন আহমেদের কালজয়ী ৪ চরিত্র 

কলম যাদুকর, কথা সাহিত্যিক, দেশ বরেন্য লেখক, চলচ্চিত্র ও বিখ্যাত নাট্য নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ তার লেখায় বিভিন্ন চরিত্রের অবতারণা করেছেন।   বর্তমানে মানুষ হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার লেখায় যে সকল কালজয়ী চরিত্র ফুটিয়ে তোলেছেন তা এখনো আমাদের মাঝে অম্লানভাবে টিকে আছে। তার লেখায় ফুটিয়ে তোলা কয়েকটি চরিত্র আপনাদের সুবিধার্থে উল্লেখ করা হলো-   ১) হিমু  হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা চরিত্রের একটি হচ্ছে হিমু। প্রচন্ড রোদ নিউ মার্কেট এলাকায় দাড়িয়ে আছে যুবক। হাতে একটি সিগারেট। আজ হরতাল। কখন একটি বাস পুড়বে সেই আগুনে সে সিগারেট ধরাবে!’ এই বিস্ময়কর তরুনটিই হলো হিমু্। উদ্ভট সব কাজই তার মূল কর্মকাণ্ড। যুক্তির ধারধারেন না। এমন সব কাণ্ড করেন যে তার আশে পাশের মানুষ বরাবরই অবাক হয়ে যায়। মানুষকে চমকে দেওয়াই তার কাজ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘হিমু’ হতে চেয়ে খালি পায়ে পিচ ঢালা পথে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাটা নিয়েছেন অনেকে। হিমুর প্রথম বইয়ের নাম ‘ময়ূরাক্ষী’।   ২) মিসির আলী যতো রহস্যময় ঘটনাই ঘটুক যুক্তি দিয়ে তার সমাধান খুজে নেন মিসির আলী।  হিমু’র ঠিক বিপরীত। হিমু যেমন যুক্তি মানে না, মিসির আলী আবার যুক্তির বাইরে হাঁটেন না। ফ্রেমের ভারী চশমা পরিহিত মিসির আলী অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা বিশ্বাস করেন না। মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং সংকট যুক্তির আলোকে ব্যাখা করাই হলো মিসির আলীর একমাত্র কাজ। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘মিসির আলী’ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। ৩) শুভ্র হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলোর মধ্যে শুভ্র অন্যতম। নিজেকে পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে ভাবতে চান না শুভ্র। সব সময় মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে তৌকির আহমেদ পরিচালিত ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমায় দেখা যায় এই শুভ্রকে। এ চরিত্রে অভিনয় করেন নায়ক রিয়াজ। ৪) বাকের ভাই: হুমায়ূন আহমেদই সেই বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করেন ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের মাধ্যেমে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ উপন্যাস অবলম্বনে নিমির্ত হয় নাটক। এ নাটকে ‘বাকের ভাই’র চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর। পাড়ার এক মাস্তানকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়। এরই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে শত শত মানুষ! ‘বাকের ভাই’র ফাঁসি বন্ধের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ বিক্ষোভ হয়। নাটকের স্ক্রিপ্ট ঘুরানোর কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফাঁসিই বহাল রেখেছেন নাট্যকার। ‘বাকের ভাই’র ফাঁসি হওয়ার পর কেঁদেছিলেন মানুষ। এমনকি নাট্যকারের উপর তীব্র অভিমান থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।  এমএইচ/এসি       

ফাঁস

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। উপন্যাসটি ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করছে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় পর্ব- সবুজের বাবা ছিল সামান্য একজন সরকারে চাকুরে।উদার প্রকৃতি, নীতিবান আর্দশবাদি, সৎ চরিত্রের মানুষ ।কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা সম্ভব হয় নি । তবু বই পড়ার প্রতি আছে একটা তীব্র নেশা।সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেশি বিদেশী লেখকদের নানা বই ।বেতনের এক চতুর্থাংশ টাকা ব্যয় করেছে এই বই কেনার পেছনে । অর্থ বিত্তের অভাব আছে, কিন্তু মনের দীনতা বলতে কিছু নেই । এখন অবসরে আছে । তবু দীর্ঘবছর ধরে মেনে চলা রুটিনের কোন ব্যতিক্রম করে না ।ভোরের আযান হলে মসজিদে যায় । নামাজ শেষ করে মিনিট বিশেক, এদিক ওদিক ঘুরে, ভোরের আলো বাতাসে নিজেকে সতেজ করে নেয় ।ঘরে ফিরে একমুঠো মুড়ি, কখনো আবার একটুকরো বিস্কিট দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নেয় । আবারো অজু করে কোরান শরীফটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে । ‘ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ । আটটায় তিনটে রুটি, সবজী ও এক কাপ চা খেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের তলায় এসে বসে । হাতে থাকে একটি বই । বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে আসে ।গোসল নামাজ খাওয়া শেষ করে আধঘন্টা সময় বিছানায় গড়াগড়ি । সবুজের মা ঘর সংসারের নানা অভিযোগ নিয়ে কোন কথা বলতে আসলে, মুখ চিবিয়ে হাসে ।বলে, ঘর গৃহস্তালী থাকলে অভাব থাকবে । এজন্য তো এর নাম সংসার ।কখনো আবার অপন মনে বলে ওঠে,হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান । সংসারে তিন ছেলে দুই মেয়ে । বড় ছেলে বিএ পাশ করে, একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে । মেজটা আই এ পাশ । বছর তিনেক একটা পোশাক কোম্পানিতে চাকরি করেছে ।এখন কোন কাজ কর্ম করে না । রাস্তার মোড়ে, দোকানে বসে দেশ উদ্ধারের প্রয়োজনে, দিনরাত রাজা উজির মারে । দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, ভাল পরিবারে ।মেয়ে দুটি সুখে আছে । ছোট ছেলে সবুজ । ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবী ।পরিবারের নানা অভাব অনটন থাকা সত্বেও নিজ সাধনা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটা হাতে নিয়ে এসেছে । সবুজের বাবা তার ছেলে মেয়েদেরকে সব সময় শেখাতে চেষ্টা করেছে জীবনের উদ্দেশ্য কি, সৌর্ন্দয, মাহাত্ম্য কোথায় । স্কুল কলেজ জীবনে সবুজ তার বাবার এই দর্শনকে সম্মানের সাথে সমীহ করে চলেছে ।বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলার সময় বাবার উদাহরণ টেনেছে ।বাবার ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসকে নিয়ে সবুজ সেই সময়ে অহংকারও করেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সবুজকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় । বড়লোক বাবার ছেলে মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে একটা নিরেট সত্যি সবুজের উপলদ্ধিতে এসেছে, জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হলে নীতিবাক্যের ফুলঝুড়ি দিয়ে জীবন সাজানো চলবে না ।জীবন চলে টাকার স্রোতে, টাকায় জীবনে গতি আনে, সুখ আনে, সৌর্ন্দয আনে, জীবনকে করে অর্থবহ, সার্থক । টাকাহীন জীবন বদ্ধ জলাশয়, জঙ্গম স্থবির । সবুজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয় ।তার চোখে স্বপ্ন ভাসে, একদিন সে অনেক অনেক বড়লোক হবে । শহরে বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, সুন্দরী বউ হবে ।তবে তার জীবন চলবে সহজ সরল রেখায় । আধুনিকতার ছল করে কোন অশ্লীল উগ্রতায় জড়িয়ে নিজের অতীতকে বিসর্জন দেবে না ।হাজার বছর ধরে তার রক্তে বহমান পুর্ব পুরুষের ঐতিহ্য-সংস্কার বা বিশ্বাসকে ও সে কখনো অবহেলা অসম্মান করবে না ।  সবুজ গ্রামের ছেলে, জীবন হবে তার সবুজ প্রকৃতির মতো পেলব সুন্দর, মসৃণ । তবে তার বাবার মতো টানটান জীবন নয় । তার অর্থ থাকবে ।দুই হাতে মুঠোভরে সে টাকা খরচ করবে । তার ভবিষ্যত বংশধরদেরকে অভাব শব্দটার সাথে কখনো পরিচয় করিয়ে দেবে না । গ্রামের বাড়িতেও সে একটা সুন্দর ঘর করবে । এই স্বপ্ন তার সেই শিশু-শৈশবকাল থেকে তার মনের ভেতর সুপ্ত হয়ে আছে । গ্রামের বাড়িতে শহরের মতো করে সুন্দর ঘর করবে । মা বাবাও তার সাথে থাকবে । মা বাবার জন্য দক্ষিণ দিকে থাকবে একটি বড়সড় ঘর । দক্ষিনের খোলা হাওয়ায়, সুখে আনন্দে কেটে যাবে, তাদের শেষ দিনগুলো । ইট সিমেন্টের পাকা ঘর হলেও সবুজ গ্রামীন সৌর্ন্দযকে হণন করবে না । সবুজের বাড়ি হবে সবুজে সবুজে সবুজময় । বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকবে সুপারি গাছ । গাছগুলো বড় হয়ে ছাদ পযন্ত ওঠে যাবে ।ছাদের ওপর বসে সবুজ চারপাশের সবুজকে তার বুকের গভীরে টেনে নেবে । আকাশের ভাসমান মেঘমালা দেখবে, দেখবে নীল সামিয়ানায় তলে তারাকা রাজির মিটিমিটি লুকোচুরি খেলা ।জোছনায় নিজেকে ভাসিয়ে নেবে দুর দেশের অজানা সৌন্দযে । রবি ঠাকুরের গান শুনবে । নজরুলের কবিতা পড়বে । “ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না ।” এসব সে জেগে জেগে ভাবে ।রাতের ঘুমেও সেইসব ভাবনা স্বপ্ন হয়ে তার মনে ভাসে । সবুজ তার শিক্ষকদের মুখে শুনেছে, মনীষিদের জীবনীপাঠে জেনেছে, জীবনের সুখস্বপ্ন সত্যি হয়, মেধা শ্রম আর সাধনার বলে । সবুজ মেধাবী, প্রতিটি সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সে তার মেধার যোগ্যতা দিয়েছে ।সবুজ পরিশ্রম আর সাধনা ছিল বলেই তো সে আজ তার চারপাশের লোকজনের কাছে সবুজ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু সবুজ কর্মজীবন, কি করবে, কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবে । ভাবনার শেষ থাকে না, কিন্তু কোন সিদ্বান্তেই সবুজ স্থির হতে পারে না ।সবচেয়ে বড় সম্যসা-সংকট অর্থের । বহু দিন মাস নানা ভাবনায়, হেলাফেলায় সে শেষ করে । তার পর মধ্যবিত্তের শেষ ভরষার স্থল চাকরি বাজারে যাতায়াত শুরু করে । একটা চাকরির জন্য সে নানা জায়গায় তার পরিচয় ও যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা করে । সবুজ চাকরির জন্য এদিক ওদিক হন্য হয়ে চরকী ঘোরা ঘুরে । চাকরি হয় না, কিন্তু, কেন চাকরি হয় না, তার উত্তরও সবুজের জানা হয় না । বছর খানেক পরে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটমাপের একটি চাকরি পাওয়া যায়, তাও নিজের যোগ্যতায় নয়, প্রতিষ্ঠানের বড় সাহেব তার এক নিকটতম বন্ধুর কাকা । বন্ধুর অনুরোধে সবুজকে চাকরিটা পাইয়ে দেয় । সবুজের জীবনের সব সুন্দর ইতিবাচক ভাবনাগুলো নেতিয়ে পড়ে । ভাঁটার স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার জীবনের জোরালো নীতি-আর্দশগুলোতে গুণেপোকা বাসা বাঁধতে শুরু করে । সবুজ নব বিশ্বাসে স্থিত হয়, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে, মেধা শ্রম সাধনা কিছুই নয়, দরকার ক্ষমতাবান আত্মীয়ের । সামনে এবং পেছনে ডাল তলোয়ার হাতে নিয়ে যারা তার জীবন চলার পথকে করে দেবে মসৃণ, ঝেড়ে মুছে লক্ষ্যে পৌঁছার সিঁড়িগুলোকে করে দেবে ঝকঝকে তকতকে । কেউ একজন হাত ধরে সামনে টেনে নিয়ে যাবে, অন্য একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিয়ে যাবে ।সবুজ অস্থির হয়ে ভাবে, কেউ একজন, যে আমার সামনে শক্ত হাতে মই ধরে রাখবে, আমি তার ওপর বিশ্বাস করে, নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সপে দিয়ে তরতর করে ওপরে ওঠে যাব । কিন্তু, কে সেই, কে । অস্থির সব নানা ভাবনায় সবুজ সারাক্ষণ কাটা ঘুড়ির মতো শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকে ।  আলো আঁধারীর ভাবনাকাশে হঠাৎ করে উঁকি দেয়, যদি কোন বড়লোক বাবার অর্থব মেয়ের গলায় ঝুলে যেতে পারা যায়, তাহলে ও হয়তো জীবনের স্বপ্নগুলো সত্যি হয়ে জ্বলে ওঠবে । সবুজ তার বন্ধুসম খালাতো ভাইয়ের্ সহযোগিতায় পেয়ে যায় সেই স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি । চিত্রাই সেই চাবি, যে তাকে পেছন থেকে ঠেলবে, আর তার ব্যবসায়ী শ্বশুর বাবা তাকে সামনে থেকে টেনে নিয়ে যাবে । চিত্রার সাথে সবুজের বিয়ে হয় । বিয়ের অনুষ্ঠানে সবুজ বুঝতে পারে, কত বড় ঘরের মেয়েকে সে তার জীবন সঙ্গীনি করে নিয়েছে ।বিয়েতে আগত অতিথিদের পোশাক, বেশভূষা, পরিচয়, জীবন বৃত্তান্ত শুনে দেখে সবুজ বুঝতে পারে, তার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব ।একই অনুষ্ঠানে দুই দুইটি বিয়ে । চিত্রার আর চিত্রার ছোটবোন চয়নার । চিত্রার মা বাবা পুলিশ জামাইকে স্বীকার করে নিয়ে নব সাজে বরণ করে নিয়েছে । (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ফাঁস পর্ব ১ পর্ব-২ ফাঁস / এআর/

ফাঁস

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। আজ থেকে নিয়মিতভাবে উপন্যাসটি প্রকাশ করবে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এর প্রথম পর্ব।  # এক #   সবুজের চোখে চিত্রা ছিল সুন্দরী, রুপকথার রাজকন্যা, মোনালিসা, ক্লিওপ্রেট্টা। চিত্রা সবুজের একক সিদ্ধান্তের, একক পছন্দের বউ। সবুজের বাবা মা চেয়েছে, মধ্যবিত্ত ঘরের কোন শিক্ষিত সুন্দরির সাথে সবুজের বিয়ে দিতে । পাত্রীও নির্বাচন করা হয়ে গেছে । বিএ পড়ুয়া মেয়ে, গায়ের রং হলুদ বাটা ফর্সা নয়, তবে চোখ নাক ঠোঁট চুল সব মিলিয়ে মেয়েটাকে এক কথায় সুন্দরীই বলা যায় । সবুজ মেয়েটাকে দেখে, মেয়ের বাবা মা সবাই শহরে থাকে । নিজের বাসায় নয়, সরকারী বাসায় ।মেয়ের বাবা একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রধান হিসের রক্ষক হিসেবে কাজ করে । মেয়ের মা পড়ালেখা  জানা শিক্ষিত মহিলা ।মেয়ের ভাইবোনেরা সবাই স্কুল কলেজে পড়ে । সব মিলিয়ে পরিবারটি মার্জিত রুচিশীল মধ্যবিত্ত ঘর ।সবুজ সব শুনে, মেয়েটির একটি ছবিও সে নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখে । ছবির মেয়েটি সবুজের পছন্দ হয় ।  দিন ক্ষন ঠিক করে, বেশ কিছু সময়, সবুজ আলাদা ঘরে মেয়েটার সাখে কথা বলে ।শহরে থাকলেও মেয়েটা একটু ভিন্ন আদলে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে । শিক্ষা সংস্কৃতিতে, সংযত ও শালনিতায় সে বিশ্বাসী । সাধারণ একটা স্যালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় কাপড় টেনে মেয়েটা সবুজের সামনা সামনি চেয়ারে বসে । মুখে ঠোঁটে সামান্য রংয়ের প্রলেপ, চুল গুলো ঝুটিতে বদ্ধ হয়ে ওড়নার চাপে স্থিত ।মেয়েটার চেহেরাটাও কেমন লাজুক লাজুক ।সবুজের সামনে একাএকা বসে থাকতে তার একটু অস্বস্থিই লাগে । তবু মাথাটা হালকা একটু নিচু করে মেয়েটা চুপচাপ বসে থাকে । সবুজ মেয়েটার সাথে কথা বলে । মেয়েটা কথার উত্তর দেয়, মেপে মেপে ধীর শান্ত গলায় ।কথা বলার সময় মেয়েটার ঠোঁটের কোন, চোখের তারায়ও কোন ধরনের ঝিলিক খেলা করে না ।  সবুজ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মেয়ে দেখেছে । বন্ধু হিসেবে, প্রেমিক হিসেবে অনেকের কাছাকাছি ও এসেছে ।গল্প হয়েছে, হাসি তামশা হয়েছে ।বলা যায় প্রতিটি মেয়ে ছিল রুপে রংয়ে নকঁশায় জীবন্ত প্রজাপতি । সারাক্ষণ উড়ুউড়ু মন, দেহ বল্লরীর ভাঁজে পোশাকের বাহারিত্ব, কথার ছলাকলা, চোখের চঞ্চলতা, ঠোঁটের কোনে  বিটকেলে হাসি, ক্ষনে ক্ষনে মুখাবয়বের পরিবর্তন, এই মেঘের ছায়া,এই আবার নবর্সূযের সতেজ রাঙা আলো । মেঘ জড়ানো খোলাচুল, পদ্ম কুসুম খোঁপা, সর্পদোলা লম্বা বেনী । কারো আবার কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে কত রং, বাহাদুরি সব কিসব কাট । সবুজ বইতে পড়ে, নিজ চোখে দেখে, মেয়েরা হচ্ছে বহতা নদী, পাহাড়িয়া ঝর্ণা, ওড়ন্ত প্রজাপতি,  ভোরের আকাশে স্নিগ্ধ বৃষ্টি ফোটা । কিন্তু, সবুজ হিসেবটা মেলাতে পারে না । এই মেয়ে তো ওর মা চাচীদের মতো অনেকটা গেঁয়ো প্রকৃতির, বদ্ধ ডোবা, গতিহীন ঢেউহীন. বড় বেশি ঘোলাটে ।   সবুজের অভিজ্ঞতায় বিবেচিত হয়, মেয়েটা বোকা, ক্ষেতমার্কা ।শিক্ষা থাকলেও আধুনিক স্যের্ন্দযবোধ,উন্মুক্ত সংস্কৃতি এসব বিষয়ে তার ছিটে ফোটা জ্ঞানও নেই ।তার চোখে চাহনিতে নেই একবিংশ শতকের উন্মুক্ত প্রেম, কথার ভেতর আহ্লাদি ঢেউ নেই, স্রোত নেই ।মেয়েটাকে তার খুব একটা পছন্দ হয় না । সবুজের মা গ্রামের মেয়ে ।ভদ্র আচরণ, লাজুক স্বভাব, চলনে বলনে ধীর স্থির স্বভাবের মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলে আনতে তার ইচ্ছেটা বেশি । সবুজ নিজেও বড়বেশি মাতৃভক্ত । মা বাবার সাথে নিজের বিয়ে নিয়ে বেশি কথা বলতে সবুজের একটু আধটু লজ্জা করছে । তার বড় দুইভাই তো চোখ মুখ বন্ধ করে পিতৃআজ্ঞা পালন করে গেছে । মেয়ে নয়, ছবি দেখেই নিজেদের ভবিষ্যত বেছে নিয়েছে, মা বাবার ইচ্ছেয় সম্মতি জানিয়েছে । তবুও তার ভাগ্য হাজার গুণ ভালো । তার সাথে বিয়ের মতো একটা লজ্জাকর বিষয় নিয়ে বাবা মা তার সাথে কথা বলছে ।  তাই মাতৃ- আজ্ঞায় আদিষ্ট হয়ে সবুজ মেয়েটাকে অপছন্দ করতে পারে না । আংটি বদলের মধ্যে দিয়ে সবুজের মা-বাবা বিয়ের সব পাকা কথা বলে আসে ।মাকে হ্যাঁ বলার পরেও সবুজের মনের ভেতর কিছু একটা সুঁইযের মত সারাক্ষন বিঁধতে থাকে। কাছের বন্ধুদের সাথে মেয়েটার রুপ গুন নিয়ে আলোচনা করে । এক বন্ধুর পরামর্শে সবুজ মেয়েটার পেছনের বাড়ির খোঁজ খবরে মেতে ওঠে । খবর যা পাওয়া যায়, তাতে সবুজের মন বিগড়ে যায় । সবুজ তার মাকে বলে, ওই মেয়েকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সবুজের বাবা বলে, কেন, কি অপরাধ মেয়েটার? সবুজ তার বাবাকে কিছু বলে না । সবুজ জানে, বাবা মেয়ের বংশ লতিকার গল্প শুনতে চাইবে না ।শুনলেও তা বিবেচনার গুরুত্বে আনবে না । উল্টো, মানুষের জন্ম, মনুষ্যত্ব, তার শ্রেষ্টত্ব এসব বিষয়ে একগাদা নীতিকথা সবুজকে শুনিয়ে সবুজের মুখ বন্ধ করে দেবে । সবুজ ফিসফিসিয়ে তার মাকে গোয়েন্দা রিপোর্ট শুনায় । মেয়েটার জাত পরিচয় খুব একটা ভাল নয়, যদিও মেয়ের বাবা একটা সরকারী অফিসে ভালো চাকুরি করে ।মেয়ের দুই ভাই আছে, বড়টা ডাক্তারী পড়ে, ছোট টা এখনো স্কুলে পড়ছে । মেয়েটার আরো একটা বোন প্রাইমারিতে পড়ে । এই টুকুতে সবুজের আপত্তি ছিল না । সম্যসাটা হয়, মেয়ের চাচা জেঠাদের নিয়ে । তারা সবাই গ্রামেই থাকে, পড়ালেখাও বিশেস জানে না । জমি চাষ করে, একজন নাকি গ্রামে রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকান চালায় । আড্ডা, গালগল্পে তাদের দিন পার হয় । গর্বকরে বলার মতো কোন বংশ পরিচয়ও তাদের নেই ।গ্রামের বাড়িতে তাদের কোন ভালোমানের একটা ঘরও নেই, এমনকি মেয়ের বাবার একটা ঝুপড়িও নেই ।মেয়েটার বাবাকে গ্রামের লোকেরা কেউ ভালো করে চেনেও না । সবুজ ইচ্ছে করে একটা ভয়ঙ্কর মিথ্যাও তার মাকে বলে ।মা. আমি মেয়েটার এক নিকট আত্মীয়ের কাছে শুনেছি, মেয়েটা শারীরিক ভাবে অসুস্থ । সারা বছর নানা রোগে ভুগে । সবুজের বাবা সবুজকে বলে, মেয়ের পুর্ব পুরুষের এতো ইতিহাস আর মেয়ের বাবার ধন সম্পদ আমাদের জানার দরকার নেই ।আমাদের দরকার একটি সুন্দর মনের মেয়ে, । মেয়েটিকে আমি দেখেছি, কথাও বলেছি, বড়বেশি সহজ সরল । বাবা, কিন্তু, মেয়েটা যে অসুস্থ । একটা অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আমি, মেয়েটা অসুস্থ নয়, যে তোমাকে এই কথা বলেছে, সেই লোকটাই মানষিকভাবে অসুস্থ ।অসুস্থ মানষিকতার লোকদের কথায় কান দিও না, মেয়েটাকে বিয়ে করলে তোমার ভাল হবে, আমি বলছি, জীবনে তুমি সুখি হবে । সবুজের মা গ্রামের সহজ সরল মহিলা । নানা সংস্কার-কুসংস্কারে তার মন নানা সুতোয় শক্ত করে বাঁধা । ছেলের অমঙ্গলের কথা ভেবে সে বলে, বাবা, আমরা ওদেরকে পাকা কথা দিয়ে এসেছি ।বিয়ের একটা তারিখও হয়ে আছে । এই সময়ে যদি, ওরা এই দুঃসংবাদ পায়, তাহলে যে, মেয়েটার অভিশাপ লাগবে, মেয়ের মেয়ের মায়ের বুকফাটা শাপ আর চোখের জলে তোকে সারা জীবন হাবুডুবু খেতে হবে । সবুজ গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে । কোন কথা সে বলে না । সবুজের বড়ভাবী বলে, তুমি তো আমাকে বলেছিলে, কোন একটা মেয়ের সাথে তোমার কি একটা সম্পর্ক আছে, এই মেয়ে যদি তোমার পছন্দ না হয়, তাহলে তোমার সেই পছন্দের মেয়েটাকে বিয়ে করে নাও । সবুজ হঠাৎ থমকে যায় । বাবা মায়ের সামনে এই ধরনের কথা বলতে সবুজ অভ্যস্ত নয় । গম্ভীর স্বরে বলে, ভাবী, তুমি যে কি বলো না ।আমি আবার, সবুজের বাবা নিজ বিবেচনায় স্থান ত্যাগ করে । মা চুপটি করে বসে থাকে । মুখ লুকাতে হবে না । ডুবে ডুবে তো বহু জল খেলে । এবার প্রকাশ করো, তোমার ঐ মুক্তা না ফুক্তা, যাকে তুমি নিজের চেয়ে বেশি ভালবাস বলে আমাকে বার কয়েক বলেছিলে । সবুজ ভাবীকে চোখ ইশারায় কিছু একটা বলতে চায় । ভাবী তার ইশারা বুঝেও বুঝতে চায় না । মুক্তা সবুজের কততম প্রেম, সবুজ নিজেও তা জানে না। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে সে বহু মেয়ের প্রেম নদে একা একা হাবুডুবু খেয়েছে ।কত মেয়েকে প্রেমপত্র দিয়েছে । কিন্তু একটা চিঠির উত্তরও আজ পযর্ন্ত সে পায় নি সবুজ । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হঠাৎ করে মুক্তা আসে। রুপে রংয়ে অতি সাধারণ একটা মেয়ে ।সবুজের সাথে একই বিভাগে পড়ে । সবুজের দুই বছরের জুনিয়র ।পরিচয়, আলাপ, তারপর বোধহয় একটু কাছাকাছি আসা, গল্প আড্ডা, রিক্সায় চড়ে বিকেলের হাওয়া খাওয়া,টং দোকানে দাঁড়িয়ে বসে চটপটি ফুসকা খাওয়া । ভালই চলছিল দিনের সাক্ষাৎ আর রাতের নির্ঘুম স্বপ্ন কল্পনা গুলো ।কিন্তু হঠাৎ করে কি যে হয়, সবুজ তার ভেতরের কষ্টটাকে কোন রকমে চাপা দেয় । সবুজ হাসে, বলে, ভাবী, সম্পর্ক টম্পর্ক আসলে ঐগুলো কিছু না, সময় পার করার জন্য এই বয়সের ছেলে মেয়েরা সবাই কম বেশি এক আধটু এসব করে থাকে । ওখানে প্রেম বা ভালবাসা খুব একটা বেশি থাকে না ।মেয়েটা আমার জুনিয়র । আসলে আমার নোট ফোট নিয়ে একটু আধটু নাড়াচাড়া করতে ভালবাসত, সেই সুবাদে আমরা দুইজন একটু কাছাকাছি ছিলাম ।  বড় ভাবী সবুজের কথায় আহত হয়, বলে, তুমি বড় বেশি দেমাগী, অত দেমাগ কিন্তু ভাল নয়, নিজের দেমাগের আগুনে একদিন নিজেই জ্বলে পুড়ে মরবে, এই আমি বলে রাখলাম ।  সবুজ মায়ের, ভাবীর এইসব কথা মানে না, বিশ্বাস করে না । সবুজ তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, সবুজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক ছেলে । সে ভাল করে জানে, মা বাবার কথা মেনে নিলে তার জীবন গরুর গাড়ির চাকা হয়ে ধূলো কাদায় ঘুরপাক খাবে । জীবনের ভোগ বিলাস, সুখ আহ্লাদ, কিছুই হবে না ।সুখের আশায়, বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্নে বিভোর থেকে, সবুজ তার মা বাবার কোন আদেশ উপদেশ কানে তুলে না । সবুজ এই যুগের ছেলে । আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত,শিক্ষার ধাক্কায়  গ্রাম্য আচারে সংস্কার বিশ্বাসের প্রতিও তার বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অনক কমে গেছে ।মায়ের মুখে অন্যের অভিশাপের কথা শুনে, সে মনে মনে হাসে ।সবুজ ভাল করেই জানে মা বাবার জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে চলতে গেলে, জীবন চাকা সবুজের ইচ্ছেয় চলবে না ।বর্হিবিশ্বের রুপসৌর্ন্দয, জাগতিক জীবনের বিত্ত বৈভব, সুখ আহ্লাদ, কিছুই  আর তার ইহজনমে হয়ে ওঠবে না । আর মনে মনে বলে, দেমাগ, ভাবী, দেমাগ তো থাকতে হবে। দেমাগ দেখানোর জন্য যোগ্যতা থাকতে হয়। সে যোগ্যতা সবুজ অর্জণ করেছে ।তোমাদের মতো গ্রামীন সংস্কার বিশ্বাসকে বেদবাক্য মানলে, জীবন আমার গরুর গাড়ি চাকা হয়ে এই মাটির কাঁদা ধুলায় গড়াগড়ি খাবে । সবুজ গরুর গাড়ির চাকা হয়ে বেঁচে থাকার চন্য এত কষ্টকরে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ করে নাই ।সবুজের জীবন লক্ষ্য, সুখের আশায়, ভোগবাদি জীবনের লালসায় সবুজ মা বাবার পছন্দের মেয়েকে স্পষ্ট ভাষায় না বলে দেয়। সবুজের এই না ধ্বনিতে তার মা বাবা আহত হয় । মেয়ে বাড়ির লোকজন ছুটাছুটি করে। কেন, কি দোষে, কোন অপরাধে, একটা মেয়ের জীবনে এতবড় কলঙ্ককালিমা টিপ সবুজের পরিবার পরিয়ে দেয়। উত্তরহীর মুখে সবুজের পরিবার মাথা নিচু করে, মেয়ে বাড়ির লোকজনদের নানা কূটকাটব্য শুনে যায়।  (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ।

‘পরকীয়ায় ভড়কে যাওয়ার কিছু নেই’

তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক ফারজানা মিতু। সুন্দর গল্প ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা যার উপন্যাসের প্রধান অনুসঙ্গ। লেখার প্রতি রয়েছে তার নিরন্তর ভালোবাসা। গ্রন্থভুক্ত তার পঙক্তির পরতে পরতে পাওয়া যায় ভিন্নমাত্রা। সম্পর্কের বিশ্লেষণ এবং অভিজ্ঞতার বিচিত্র প্রভাব পাওয়া যায় তার লেখায়। বিষয় বৈচিত্র্যেও তা হয়ে উঠে অনন্য। লেখনির মাধ্যমে তার বিস্তার ও দিক অন্বেষণ যথার্থই সাড়া জাগিয়েছে। প্রথম জীবনে ফারজানা মিতু কবিতা দিয়েই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। এরপর গল্প ও উপন্যাস। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮-এ প্রকাশিত হয়েছে তার চারটি বই। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত উপন্যাস ‘পরকীয়া’। এটি পাঠক হৃদয় ছুঁয়েছে। এতে পাওয়া যাবে ভিন্ন জীবনের চিত্র, বৈচিত্রতা। জীবনের নানাচিত্রে নান্দনিক উপন্যাসে রূপান্তর করেছেন ‘পরকীয়া’। সাম্প্রতিক সময়ের সাহিত্য, লেখালেখি, একুশে বইমেলার নানাদিক নিয়ে মিতুর সঙ্গে কথা হয় একুশে টেলিভিশন অনলাইনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ সাহিত্যে কেন এলেন, কিভাবে  এলেন? ফারজানা মিতুঃ সাহিত্যের ধারায় কীভাবে চলে এলাম সেটা নিজেও সেভাবে বলতে পারবো না। নানা সময়ে ছোট করে ২-৩ লাইনের কথা লিখতাম, কখনও বন্ধুদের কার্ডে কিংবা চিঠিতে। আমার আম্মা যেহেতু লেখালেখি করতেন তাই সেগুলো পড়া হতো। আর ওই বয়সেই মনে হতো, এই লাইনটা না হয়ে অন্যটা হলে ভালো হতো। সাহিত্য তখন থেকেই বুঝা শুরু। ক্লাস নাইন টেনে থাকতেই পড়া শুরু হয়েছিলো কঠিন সব বই। সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুনীল সবই একে একে পড়া শুরু। তারপর হুমায়ূন আহমেদ। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ মেলায় এবার আপনার কি বই এসেছে? ফারজানা মিতুঃ মেলায় এবার ৪টি বই এসেছে। দিব্যপ্রকাশ থেকে এসেছে ‘প্রযত্নে সে’ এবং ‘তোমার মুঠোয় বন্দী আমার আকাশ’। দেশ পাবলিকেশন্স থেকে ‘পরকীয়া’ আর অন্বয় প্রকাশ থেকে ‘ফেরা না ফেরার গল্প’। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নতুন বই সম্পর্কে বলুন? ফারজানা মিতুঃ আমি বরাবরই রোমান্টিক ঘরানার কাহিনী লিখি। তাতে কষ্ট, প্রেম, বিরহ আর না পাওয়াগুলোই উঠে আসে। এবারও তাই। তবে কাহিনীর বৈচিত্র্য অবশ্যই আছে। একেকটি বইয়ে একেক রকম স্বাদ দিতে চেয়েছি আর পাঠক সেই স্বাধটুকু পুরোটাই পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ পরকীয়ার পাঠক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? ফারজানা মিতুঃ পরকীয়া বইটি ইতোমধ্যে অনেক পাঠকের হাতে পৌঁছেছে। রিভিউ যা পেয়েছি পাঠকের কাছে সেটা খুবই পজিটিভ। আমি বরাবরই বলেছি বই নিয়ে সমালোচনা করার আগে বইটি পড়ুন। পরকীয়া নাম দেখে ভড়কে যাবার কিছু নেই। বইটি না পড়লে কখনই জানতে পারবে না আমি বইটিতে কী বলতে চেয়েছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন বই প্রকাশ করেন? ফারজানা মিতুঃ আমি ২০১৫-২০১৬ সালে অনেকগুলো বই মেলার বাইরের সময়ে এনেছি; কিন্তু মেলায় যেভাবে পাঠকের আগ্রহ আর উদ্দীপনা দেখতে পাই সেটা অন্য সময়ে দেখা ভার। লেখক হিসেবে আমাদের কাছে পাঠকই প্রধান। তাই এখন চেষ্টা করি মেলাতেই বই নিয়ে আসার। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কীভাবে? ফারজানা মিতুঃ আমি সবসময়ই বলে থাকি কারও প্রেরণা কিংবা প্রভাবে আমি লেখালেখিতে আসিনি। আমাকে সেভাবে প্রেরণা প্রথম অবস্থায় কেউ দেয়নি। এখন অনেকেই দিয়ে থাকে কাছের মানুষেরা ছাড়াও দূরের মানুষেরাও। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ একুশে বইমেলার প্রাপ্তি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন… ফারজানা মিতুঃ একটা জাতি কখনোই শিক্ষা ছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না। আর বই প্রতিটা মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসে মতোই অপরিহার্য। একটা ভালো বই একজন মানুষের জীবনে নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। আর আমাদের দেশে যেহেতু বই কেনার প্রচলনটা বইমেলাতেই বেশি। তাই বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই সময়েই লেখক আর পাঠক এভাবে কাছাকাছি আসতে পারে। লেখক আর পাঠকের এমন সেতুবন্ধন বইমেলা ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? ফারজানা মিতুঃ লেখালেখি আমার সবটুকু জুড়েই, তাই লিখে যাবো যতোদিন পারি। এবার পরকীয়া নিয়ে বড় পরিসরে যেমন লিখেছি তেমনি সামনেও এমনকিছু আরও লেখার আশা রাখছি। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটি লেখায় আমি নিজেকে ভাঙি আর গড়ি। আগামীতেও আরও সমৃদ্ধশালী লেখা দিতে পারবো বলেই আশা করছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনার জন্য শুভ কামনা রইল। ফারজানা মিতু : আপনার জন্যও শুভকামনা। / এআর /

একা এবং অদৃশ্য

থেমসের পাড়ে দাঁড়ানো অট্টালিকাগুলো ভেঙে ভেঙে পরছে। এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ, ক্রেডিট সুইজ সব, সেঁধিয়ে যাচ্ছে থেমসের পেটে। নানান রঙে ভাসছে জল। মৃত এবং আহত মানুষের রক্ত, শ্বাসের নীলাভ অংশ, কারো কারো বুকে জমিয়ে রাখা ক্ষোভ, ঘৃণা ও ভালোবাসা সব, সব ভাসছে। মাছেরা তৃপ্তি পাচ্ছে,  এতো সুগন্ধি রক্ত আর কখনো পাওয়া যায়নি। এতো এলকোহল কোথা থেকে এলো! থেমসের সাথে মিশে সব পানি নেশা নেশা হয়ে ভাসছে। মাছেরা নেশায় বুদ হয়ে যাচ্ছে। রমনীর বুক থেকে শুঁকে নিচ্ছে আফিমের ঘ্রাণ। ছুঁয়ে দিচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে নদীর নাভী বেয়ে তপ্ত উনুন। এভাবে আহত রমনীরা মাছের মা হয়ে উঠছে আর আহত পুরুষেরা নিজেদের জনক ভাবতে শুরু করেছে। মাছেরা ঠোঁট কেলিয়ে হাসে আর ভাবে,’যাক বাবা দূর্নামের হাত থেকে বাঁচা গেলো।’ মৃতদের দেখে আহতরা হাসছে আর বলছে, ’কি বোকা ওরা বাঁচতে পারলো না, মরে গেলো, হাঃ হাঃ হাঃ, আমরা বাঁচলাম কি করে। বাঁচলাম বলেই এতো এতো গিনি সোনা আর এতো রমনের রঙমহলে ভাসছি। রক্ত কোথায়? সব দেখি মৌতাতের নেশাজল। আরে কত কত পাউন্ড ভাসে জলে! প্রতিদিন এক একটি দেশ কিনে নেবো। বসাবো তান্ডব বাজার। হি: হি: হি:। ঘুম ভেঙে গেলো সিহানের। জানালার পাশে বৃক্ষরা পাতাবাহার পাতাবাহার খেলছে। কোথাও মেঘ নেই। ওয়াপিং থেকে দেখা যায় দাঁড়িয়ে আছে এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ, ক্রেডিট সুইজ। তাহলে কি দেখেছে সে! ভাবতেই অবাক লাগে। কি বাজে স্বপ্ন! হায়! হায়! কি অমঙ্গল। গত পাঁচ বছরে একবারও দেখেনি এমন স্বপ্ন। এর মানে কি? আহা! কত কত রমনীরা ভেসে যাচ্ছিলো। এলসেসেসিয়ান কুকুরের মত জিহ্Ÿাও দেখা গেলো ভেসে যাওয়া পুরুষদের। তাদের মধ্যে সিহানও কি ছিলো! ভেবেই জিব কাটে সিহান। থাকলেও মন্দ হতো না! বড়লোকদের সাথে কিছু সময় ভেসে থাকতে পারলে মোটাতাজা হবার কিছু কড়ি জুটেও যেতে পারতো। একটু আফিমের ঘ্রাণ, একেবারে মন্দ হতো না। সিহান আবার ভেবে হতাশ হয়। আহা, সেতো ছিলো স্বপ্ন। কিন্তু ওই যে ভেঙে যাবার দৃশ্য! কোন মতেই ভুলা যাচ্ছে না। সত্যিই যদি ভেঙে যায় কি হবে? ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে ওই এলাকার একটা ছবি আছে। ওই ছবি ১৮০৮ সালে তোলা। কিছুই ছিলো না সেখানে। ছিলো বাঁক নেয়া নদী আর ভাসমান কিছু ইঞ্জিনবোট। স্বপ্নের মত সব ভেঙে গেলে কি দুই’শ বছর পিছনে ফিরে যাবে কেনারি ওয়ার্ফ বা ইস্ট ইন্ডিয়া ডক? তাতে কি ভালো হতো? না । কারণ তখন তো ব্রিটিশরা দস্যুবৃত্তি করে বেড়াতো। ওই ডাকাতরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের দাবি করে। অথচ তাদের ডাকাতির ধরনটা পোশাক বদলেছে মাত্র। আমি যা আয় করি তা যে কিভাবে শালারা আমার পকেট থেকে নিয়ে নেয় টেরই পাই না। আমাদের দেশে পকেট থেকে টাকা নেয়ার সময় ঝগড়া করা যায়। কিন্ত এখানে বুঝা যায় যে পকেট থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছু বলা যায় না। কারণ পদ্ধতি। ইংরেজীতে যাকে বলে ’সিস্টেম’। ইচ্ছে করে পুঁদের ওপর কষে একটা লাথি মারি। আহা! দিয়া’র পাশে বসলেই সব কষ্ট বাতাসের মত ফুৎকারিয়া যায়। বুক পকেটে জমে যায় আধুলি আধুলি সুখ। ওই সিস্টেমের কথা আর মনে পড়ে না। দিয়া বড় পয়োমন্তর। চোখ দিয়ে চেকে নিয়ে যায় সব চিন্তা আর টন টন ব্যাথা। ওই সুখের জন্য একটা রাজ্য দিতেও আমি রাজি। কিন্তু সমস্যাতো অন্য। ধ্যাৎ সমস্যার কথা আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। আজ দিনটাই শুরু হলো এভাবে। বাসা থেকে বেরিয়ে ওয়াপিং ডকের রাস্তা ধরে হাটতে শুরু করেছে সিহান। কাজে যেতে ভালো লাগছে না। প্রায় দুইশ’(১৮০৫) বছরের পুরনো ওয়াপিং ডক এখনো কতো সাজানো গোছানো। এখানে নাকি বাংলাদেশ থেকে একবার একটি শীপ এসেছিলো। যে জলপথে ব্রিটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষে লুটপাটে গিয়েছিলো, ওই পথেই এসেছিলো কি সে জাহাজ! যেভাবেই আসুক, অবাক করা ব্যাপার হলো,এ জলই পুরো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠকে অখন্ড করে রেখেছে। কী দীর্ঘ জলের শরীর! শঙ্খ, কর্ণফুলীর জল কি থেমসে এসে মিশে? সিহান ভাবে, এই ডকের পাশে যদি তার ঘর হতো। তাহলে প্রতিদিন জলের শব্দ শুনতে পেতো। যে জল ভেসে এসেছে তার দেশের প্রিয় নদী কিংবা সমুদ্র থেকে। ঠিক জলের ওপর একটি ঘর। ওখানে দিয়া আর সিহান কান পেতে থাকতো। জলের শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহের মত ইথারে ভেসে আসতো ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী। কিন্তু এ মুহূর্তে ভাবেতও আর ভালো লাগছে না। রাতের স্বপ্ন আর দিয়া, দু`টোই কেমন যেনো ভেজা মেঘের মত ধোঁয়াশা হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন তো স্বপ্নই, কিন্তু দিয়া? তাকে স্বপ্ন ভাববে কেনো! তার ঘ্রানতো সারাক্ষণ লেগে থাকে শরীর আর মনে। আন্ধারমানিক কানিচরার জল যখন সাপের মত ভাটির দিকে যায়, তখন তো ঘুমায় না বইন্যাকোরা কিংবা চালতা আঁটির ঝাড়। থেমসের জল ভাটিতে গেলে কেনো মরে যাবে দিয়া দিয়া সুখ? এ এক অবাক করা ব্যাপার। বিলেতের বাতাসে আফিম কিংবা এলকোহলের ঘ্রাণ থাকতেই পারে। সাদা গোলাপ বাগানে উর্কাবগা সাপ কিছু সময় বিলি কাটলে কি করার থাকে? দিয়া তো আর মেঘ হয়ে যায়নি। বরং আকাশের পশ্চিম রেখা থেমসের নাভিতে ডুব দিলে জেগে ওঠে দিয়ার মোলায়েম ঘ্রাণ। সিহানের মনে পড়ে প্রথম বিলেতে প্রবেশের কথা। সেদিন থার্টিফাস্ট নাইট। ভারী মেটালের সাথে দুলে দুলে উঠছিলো বিলেতি কইন্যারা। কিন্তু শরীর কিংবা মনের কোন অঙ্গে কাঁপন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মনে মনে ওই দিয়ার মত কাউকেই খুঁজেছিলো সিহান। এখনতো সে আছে। আজ গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছে সিহানের। তাদের বাড়ির পুকুর ঘাটে বসলেই সামনে দাঁড়িয়ে যায় কালো পাহাড়। পেছন থেকে ভোরের সূর্য রশ্নি ছড়াতে থাকলে ওই পাহাড়ও হেসে ওঠে। কিন্তু কানিচরা থেকে আন্ধার মানিক-দোচাইল­া-একপাইয়া হয়ে মাটির শরীর বেয়ে বাঁকা পথটি কোথায় চলে গেছে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি কখনো। সেই কৈশোর থেকে ওই পথের শেষ খুঁজছে সে। ওই পথে তো আর সমুদ্র নেই যে পৃথিবীতে ব্যপ্ত হয়ে গেছে। সত্যিই এই রহস্য নারীর মতই! দিয়াকে কত কাছে ধরে রাখে সারাক্ষণ, কিন্তু প্রায়ই তাকে অচেনা মনে হয়। বিলেতের আবহাওয়ার মত মুহুর্তেই সে মেঘ, রোদ কিংবা বৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু কোন রঙেই তাকে দূরের মনে হয় না। তবে থাকে মাঝ সমুদ্রে জেগে ওঠা একটা চর। ওখানে সব প্রশ্ন নির্বাসনে থেকে যায়। কোন প্রশ্নেরই আর উত্তর মেলে না। ও হেনরি’র ’প্রাইজ’ গল্পের প্রধান চরিত্রটির মতই প্রশ্নরা বিনা অপরাধে নির্বাসন প্রাপ্ত হয়। হাটতে হাটতে রাতের স্বপ্নের সাথে দিয়া’র অন্তমিল খোঁজে সিহান। কোথাও একটা সূতো বান্ধা না থাকলে স্বপ্নের সাথে দিয়া কেনো আসবে? কিন্তু পরক্ষনেই এ চিন্তা ঠাঁই পায় না। স্বপ্ন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না সিহানের। তবুও কখনো কখনো কিছু স্বপ্ন নোঙর ফেলে বসে থাকে বুকের মাঝখানে। ভাগ্যিস দিয়াকে মাছের মা হতে দেখেনি সিহান। তাহলে বিলেত যাপন ভারী হয়ে যেতো। অজান্তে বা অদেখায় যা কিছুই হয় তা ’না দেখে বলবো কিভাবে’র মত প্রশ্নই থেকে যায়। চতুর না হলে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না আর। ঠিক ওই ইংরেজী ’সিস্টেম’ এর মত একটা ব্যাপার। সিহান ভাবে, তাহলে কি দিয়া ব্রিটিশ কায়দা রপ্ত করে ফেলেছে? ভারতবর্ষের যে মানুষগুলো উড়ে চলে এসেছে এদেশে, সবাই কি একই কায়দা রপ্ত করছে? তাহলেতো একটা কাজ হবে। ওই যে ভারতবর্ষে বেনিয়াদের শাষন-শোষনের কাল, তার পূণঃ প্রবর্তন হবে ব্রিটেনে। এটাকে প্রাকৃতিক নিয়মও বলা যেতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষগুলো ওই শোষনের জন্য মানষিকভাবে সামর্থবান কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে। ওই এলাকার মানুষেরা কেনো যেনো দুঃখ বিলাসী হয়। দুঃখের গান কিংবা কবিতা তাদের ভালো লাগে। মুখে সহজে হাসি লাগে না। এর প্রধান কারণ কি দারিদ্র? হতেও পারে। দিয়া’র তো অর্থ-কড়ির টান নেই। বাবার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদ। তবুও কখনো কখনো তার মুষড়ে যাওয়া পরিদৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিলেতের নদীগুলো ভাঙ্গে না পদ্মা-মেঘনার মত। নিরন্তর বহমান যৌবন। দিয়ার বাল্য বন্ধু রূপনের কথা মনে হয় সিহানের। যে কিনা ঢাকায় বসে প্রতিনিয়ত মনে করতো  তার গ্রাম সাভারচালায় শীতলক্ষ্যা ভাঙছে আর বুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভুল ভাঙে পাঁচ বছর পর যখন শীতলক্ষ্যার জলে পা রাখে। টের পায় শীতলক্ষ্যা নয়, রূপনই বুড়িয়েছে। ইদানিং এ গল্প বলে দিয়া। কেনো বলে?  আজ আর কাজে যাওয়া হবে না। ওয়াপিং পার্কে ওক গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে সিহান। ওকের চ্যাপ্টা পাতার ফাঁক গলে গড়িয়ে পরছে কখনো রোদ, কখনো মেঘ। এ এক অদ্ভুদ আবহাওয়া। সামার যাই যাই করছে। গাছের পাতারা হলুদ হচ্ছে। তাপমাত্রা এখন চৌদ্দ ডিগ্রী তো কতক্ষণ পর আঠারো ডিগ্রী। তবে বৃষ্টির আশংকা নেই মনে হচ্ছে। অদূরে ম্যাপেল গাছে বসে আছে ব্লু টিট পাখি। বুকের হলুদ রঙ আর নীল পাখনায় এ পাখিটির আঁকার বাংলাদেশের দোয়েলের কথা মনে করিয়ে দেয়। কখনো কখনো দিয়া পাখি হয়ে যায়। উড়তে থাকে লন্ডন শহরের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। পাখি হিসেবে কি নাম দেয়া যায় তার? ব্লু টিট নাকি দোয়েল? ওকে জিজ্ঞেস করলে নির্ঘাত বলবে দোয়েল। বাংলাদেশের অনেক পাখির নাম তার মুখস্ত। দেশের প্রতি তার ভালোবাসা যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। এক সময় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তার দেশ নিয়ে বক্তব্য শুনার জন্য অনেক শিক্ষকও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো কখনো ভাড়াটে বক্তা হিসেবে কাজ করার গল্পও সে করেছে। মুখে বাক্য থাকলে যে কোনো দেশে গিয়ে খাপ খাওয়ানো সহজ। দিয়া কে দেখলে তা বুঝা যায় অনায়াসে। ব্রিটিশদের নানা অকর্ম নিয়ে তার তিরস্কারের সীমা নেই। অথচ সেই পথেই পা রেখে সব ভুলে যায় দিয়া। কাজ করে যায়। হাতের মুঠো পুরে ফিরে আসে। এসে বলে ’বুঝলে এ হলো ক‚টনীতি’। বাংলাদেশের কোনো একটি মিশনে যদি সরকার তাকে নিয়োগ দিতো তাহলে নিশ্চয় একটি ঐতিহাসিক দৃশ্য তৈরী করতে পারতো। আজকাল বাংলাদেশের রাজনীতিক বা ক‚টনীতিক-আমলারা ছিচকে চোর। তাদের দিয়ে আর যাই হোক দিয়া’র মত ক‚টনীতি হবে না। প্রায়ই দেশে ফেরার কথা বলে সে। বেশ কয়েক বছর যাওয়া হয়না। লাল পাসপোর্টটা যতেœ রাখে। যাদের নাই তারা ওটা পর্দাফাই করে দিতে পারে সে ভয় তাকে তটস্থ রাখে। সবুজ পাসপোর্টটিও রিনিউ করে রাখে। তবে ওটার প্রতি তার তেমন মায়া দেখা যায় না। কাছে থাকলে তাকে রাতের স্বপ্নের কথা বলা যেতো। ও আবার এলকোহল খুব পছন্দ করে। নিমিষেই ভোতকা সাফাই করে দেয়। আহা, তখন দিয়ার চোখে ঘোড়া ছুটতে থাকে। লিপিস্টিক ছাড়াই অধর লাল হয়। কাঁপতে থাকে আর টান টান করে কথা বলে। একবার তো এ অবস্থায় পুরো ওয়েস্টমিনিস্টার নিজের দাবি করে বসেছিলো। আর বলেছিলো একবার যদি ছোট প্রিন্সের সাথে দেখা হতো! সিহানের তখন বলতে ইচ্ছে করেছিলো, ইস একবার যদি মিডলটনের সাথে দেখা হতো! এ কথা মনে হবার সাথে সাথে রাতে দেখা স্বপ্নের সাথে দিয়া এবং নিজের কোথায় যেনো একটা মিল পাওয়া যায়। কোথায়? দু’জনের মধ্যেই ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন কাজ করছে। কাজ করছে স্থান দখলের ইচ্ছা। ব্রিটিশ আর মার্কিনীরা তো পুরো বিশ্বে থাবা ফেলে বসে আছে।  আর এলকোহল না হলে দু’জনেরই এখন আর চলে না। পুরো সপ্তাহের অন্তত একদিন দু’জনে বসে পান করতে করতে মাতাল হবে আর ঢলে পরবে এটা তো রুটিন হয়ে গেছে। কি অবলীলায় মৌজ করার দেশ ব্রিটেন। দিয়া অন্য দিনগুলো পাখির মত উড়তে থাকে। সিহানের কাছে এসময়  বিলেতের আকাশকে দিয়াময় মনে হয়। খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোট বেলায় মেঘের ঘোড়া কিংবা হাতি দেখার মত পেয়ে যায় দিয়াকে। কিন্তু কখনো কখনো ওই মেঘের দেশে দিয়ার সাথে অন্য একজনকে দেখা যায়। তখন সিহানের মুখ খিচে খিস্তি আওড়াতে ইচ্ছে করে। আবার দমে যায়। এদেশে এসব নিয়ে কথা বলা যায় না। যার যা ইচ্ছে করবে। বাঁধা দিলে বিপদ। অধিকার খুন্নের অভিযোগে আইনের ফাঁস গলায় বিঁধে যাবে। সিহান ওকের গুঁড়ি থেকে টান টান করে উঠে দাঁড়ায়। থেমসের দিকে হাটে। পাশের অফ লাইসেন্স থেকে একটি স্ট্রংবো’র ক্যান টেনে নেয়। রাতের একটি স্বপ্ন পরো দিনটিকে চমৎকার কিংবা দুরূহ ভাবনার আধার করে দিলো। বিয়ারের ক্যানে কয়েক টান দিয়ে বিরক্তিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মাত্র ৫ ভাগ এলকোহল! শালা এতেতো নেশাই হবে না। মাঝে মাঝে সিহানের এমন নেশা করতে ইচ্ছে করে যে, চোখে যেনো শুধু সবুজ দেখা যায়। ওই বাংলাদেশের মত সবুজ মানচিত্র। ওই মানচিত্রের শিরায় শিরায় মিশে যাবে দিয়া আর তার দেহগত সুখ। এরকম চিন্তা মাথায় কুন্ডুলী পাকাতে থাকলে থেমসের পাড়ে দাঁড়িয়ে একটু স্থির হয় সিহান। পাশের বেঞ্চিতে বসে খালি পা রাখে বেঞ্চের ওপর। মেজাজ আবার সিঁটিয়ে ওঠে। মনে পড়ে বাড়ির পাশে দূর্বাঘাসের ওপর পা রাখলে কেমন শিউরে উঠতো পুরো শরীর। আর এখানে পা রেখে মনে হচ্ছে মরা কার্পেটের ওপর পা রেখেছে। কেনারি ওয়ার্ফের দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করে না। থেমসের বুকে জেগে ওঠা ওই বাণিজ্যিক শহরটি তাবৎ বিশ্বের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এখান থেকে কত অন্নের যোগ-বিয়োগ হয় তা কে জানে। ওখানে নাকি বিশাল বাজেটের ছবিরও শ্যূটিং হয়। একবার নাকি আমাদের নায়িকা ববিতা শ্যূটিং করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একদিনে নব্বই হাজার পাউন্ড দিতে হবে শুনে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও ওই এলাকাটি স্বপ্নের মত ভেঙে যাক তা সিহান চায় না। ধরা যাক ওখানে যা কিছু মঙ্গলের জন্য হয় তা-ই মানুষের জন্য। আর অমঙ্গল তো সব সময়ই অস্পৃশ্য। সিহান তাকায় সম্মুখে। থেমসের বুক দ্বিখন্ডিত করে চলে যাচ্ছে রিভার ক্রুইজ। ওখানে লাফাচ্ছে সাফ কিংবা অক্টোপাস। ওরা ছোবল দেয় ওরা ঘিরে রাখে। ওদের বিষ অনেক সুস্বাদু হবার কথা নয়। মাঝে মাঝে দিয়া’র চোখে মুখে ওই বিষের সন্তরণ দেখা যায়। তবুও যে কেনো দিয়াকে এতো ভালো লাগে! কাছে পেতে ইচ্ছে করে। বুক থেকে এক গুচ্ছ বেলিফুলের ঘ্রান নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইদানিং প্রায়ই ওর ফোন বন্ধ থাকে। বেশ ক’দিন দেখা হয় না। মাঝে মাঝে ও সময় পাল্টাতে চায়। রিফিল করতে চায় নতুন সময়। সিহান ঠিক করে এবার পেলে দিয়াকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। এ অঞ্চল ছেড়ে অন্য অঞ্চলে। সেখানে থেমস নয়, লী’র মত ছোট্ট একটি নদী থাকবে। থাকবে ছোট্ট ডিঙ্গী নৌকো। ওখানেই জলের ওপর হবে বসত। চারদিকে থাকবে জলপদ্মের বজরা। মাঝে মাঝে শাপলা থাকলেও মন্দ নয়। প্রতিদিন দিয়ার পুঁজো দিতে সংগ্রহে থাকবে এক লক্ষ গোলাপ। ভাবতে ভাবতে দিয়ার নাম্বারে ফোন করে সিহান। আগে ভাগেই বলে নেয়া যাক ভাবনার কথা। দিয়া নিশ্চয় এসব শুনার পর মেঘের ঘোড়ায় চাপবে না। কিন্তু মোবাইল যথারীতি বন্ধ। মাথা নীচু করে বসে থাকে সিহান। দেখে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল কামড়ে ধরেছে একটি বিলেতি পোকা। ওটাকে হাতে তুলে ছুঁড়ে দেয় থেমসের স্রোতে। থেমস ভেসে যাচ্ছে। দিয়া ভেসে যাচ্ছে। থেমস বহুগামী হয়ে আছে এ লন্ডন শহরে। অত গমণ পথে দিয়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে, যাত্রা ভঙ্গ এড়াতে কিংবা নিজের ভেঙ্গে যাওয়া গোপনে লালন করতে। সিহান আর দাঁড়ায় না। নিজের ছায়া সাথে করে কর্ণের দুল খোঁজে নদী কর্ণফুলীতে।     / এআর /

মার্কিন লেখক উরসুলা আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সায়েন্স ফিকশান ও ফ্যান্টাসি’ বিষয়ক লেখক উরসুলা কে লি গুয়িন আর নেই। গত সোমবার রাতে পোর্টেল্যান্ডের নিজ বাড়িতে তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।  গত মঙ্গলবার তার টুইটার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তার পরিবারের সদস্যরা জানান, উরসুলাকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। বিশ্বব্যপী লিঙ্গ বিষম্য, শ্রেণী বৈষম্য ও অসম প্রতিযোগিতার সমস্যা মোকাবেলায় তিনি নানান বই লিখেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি ২০টি উপন্যাস ও ১০০টি ছোট গল্প লিখেছেন। এই বইগুলোর বিশ্বব্যপী কয়েক লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে `আর্থসি` সিরিজের জন্য উরসুলা বিখ্যাত হয়ে ওঠেছিলেন। তরুণদের জন্য লেখা বইটি ১ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ১৯৬৯ সালে লেখা সায়েন্স ফিকশান- ‘দ্য লেফট হ্যান্ড অব ডার্কনেস’বিশ্বব্যপী সমাদৃত হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে উরসুলা বলেছিলেন, আমি শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য লিখি না। অর্ধ শতক ধরে সায়েন্স ফিকশান লেখা গুণী এই লেখিকা যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিশুসাহিত্যে সর্বোচ্চ পুরস্কার নেউবেরি মেডেল পদকও তিনি অর্জন করেন। জানা যায়, উরসুলা ১৯২৯ সালের ২১ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া শহরের বার্কেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানের উপর ফেলোশিপ অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে তার প্রথম নোবেল রোকানন’স ওয়ার্ল্ড প্রকাশিত হয়। সুত্র:বিবিসি এমজে/  

ছেলেবেলায় কবিতা লেখা শিখতে চাননি হুমায়ূন আহমেদ!

সাধারণ মানুষের জানার আগ্রহ থাকে তাদের প্রিয় কবি সাহিত্যিকরা ছেলেবেলায় কি হতে চাইতেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা আরও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। তেমনি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ ছেলেবেলায় কি হতে চেয়েছিলেন এ নিয়ে অনেকের আগ্রহের কমতি নেই। ওই সময়ের একজন কবি তাকে কবিতা লিখা শিখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। অর্থাৎ তার কবিতা লিখার ইচ্ছে ছিল না ওই সময়ে এমনটিই জানা যায় তার ‘আমার ছেলেবেলা’ নামক বইয়ের সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে। সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন - বাবার অসংখ্য বাতিকের একটি হল-সাহিত্য-বাতিক। মাসে অন্তত দু’বার বাসায় ‘সাহিত্য বাসর’ নামে কী যেন হত। কী যেন হত বলছি এই কারণে যে, আমরা ছোটরা জানতাম না কী হত। আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সাহিত্য চলাকালীন আমরা হৈ চৈ করতে পারতাম না, উঁচু গলায় কথা বলতে পারতাম না, শব্দ করে হাসতেও পারতাম না। এর থেকে ধারণা হত, বসার ঘরে তাঁরা যা করছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে একদিন খানিকটা শুনলাম। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হল। একজন খুব গম্ভীর মুখে একটা কবিতা পড়ল। অন্যরা তার চেয়েও গম্ভীর মুখে শুনল। তারপর কেউ বলল, ভালো হয়েছে, কেউ বলল মন্দ এই নিয়ে তর্ক বেধে গেল। নিতান্তই ছেলেমানুষী ব্যাপার। একদিন একজনকে দেখলাম রাগ করে তার লেখা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অম্নি দু’জন ছুটে গেল তাকে ধরে আনতে। ধরে আনা হল। বয়স্ক একজন মানুষ অথচ হাউমাউ করে কাঁদছে। কী অদ্ভুদ কাণ্ড! কাণ্ড এখানে শেষ হয় না। ছিঁড়ে কুচিকুচি করা কাগজ এরপর আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হতে লাগল। সেই লেখা পড়া হল, সবাই বলল, অসাধারণ এই হচ্ছে বাবার প্রাণপ্রিয় সাহিত্য বাসর। সারাটা জীবন তিনি সাহিত্য সাহিত্য করে গেলেন। কতবার যে তিনি ঘোষণা করেছেন, এবার চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করবেন! চাকরি এবং সাহিত্য দুটো একসঙ্গে হয় না। ট্রাংকে বোঝাই ছিল তাঁর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গল্প কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ। থরেথরে সাজানো। বাবার সাহিত্যপ্রেমের স্বীকৃতি হিসেবে আমাদের বসার ঘরে বড় একটা বাঁধানো সার্টিফিকেট ঝোলানো, যাতে লেখা- ‘ফয়জুর রহমান আহমেদকে সাহিত্য সুধাকর উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।’ এই উপাধি তাঁকে কারা দিয়েছে, কেন দিয়েছে কিছুই এখন মনে করতে পারছি না। শুধু মনে আছে বাঁধানো সার্টিফিকেটটির প্রতি বাবার মমতার অন্ত ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিফলকে আমি এই উপাধি এবং শোকগাথায় রবীন্দ্রনাথের দু’লাইন কবিতা ব্যবহার করি। দূরদূরান্ত থেকে কবি-সাহিত্যকদের হঠাৎ আমাদের বাসায় উপস্থিত হওয়া ছিল আরেক ধরনের ঘটনা। বাবা এঁদের কাউকে নিমন্ত্রণ করে আনতেন না। তাঁর সামর্থ্য ছিল না, তিনি যা করতেন তা হচ্ছে মনিঅর্ডার করে তাঁদের নামে পাঁচ টাকা বা দশ টাকা পাঠিয়ে কুপনে লিখতেন- জনাব, আপনার…কবিতাটি…পত্রিকার…সংখ্যায় পড়িয়া মনে বড় তৃপ্তি পাইয়াছি। উপহার হিসেবে আপনাকে সামান্য কিছু অর্থ পাঠাইলাম। উক্ত অর্থ গ্রহণ করিলে চির কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকিব। ইতি প্রতিভামুগ্ধ- ফয়জুর রহমান আহমেদ (সাহিত্য সুধাকর) ঐ কবি নিশ্চয়ই তাঁর কাব্যের জন্য নানান প্রশংসাবাক্য শুনেছেন, কিন্তু মনি অর্ডারে টাকা পাওয়ার ব্যাপারটা না ঘটারই কথা। প্রায় সময়ই দেখা যেত, আবেগে অভিভূত হয়ে যশোর বা ফরিদপুরের কোনো কবি বাসায় উপস্থিত হয়েছেন। এমনিভাবে উপস্থিত হলেন কবি রওশন ইজদানী। পরবর্তীকালে তিনি খাতেমুন নবীউন গ্রন্থ লিখে আদমজী পুরস্কার পান। যখনকার কথা বলছি তখন তাঁর কবিখ্যাতি তেমন ছিল না। আমার পরিষ্কার মনে আছে, লুঙ্গি-পরা ছাতা-হাতে এক লোক রিকশা থেকে নেমে ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। জানলাম, ইনি বিখ্যাত কবি রওশন ইজদানী। আমাদের বল দেওয়া হল যেন হৈ চৈ না করি, চিৎকার না করি। ঘরে একজন কবি বাস করছেন। কবিতা লেখার মুডে থাকলে ক্ষতি হবে। দেখা গেল, কবি সারা গায়ে সরিষার তেল মেখে রোদে গা মেলে পড়ে রইলেন। আমাকে ডেকে বললেন- এই মাথা থেকে পাকা চুল তুলে দে। কবি-সাহিত্যিকরা আলাদা জগতে বাস করেন, মানুষ হিসেবে তাঁরা অন্যরকম বলে যে প্রচলিত ধারণা আছে কবি রওশন ইজদানীকে দেখে আমার মনে হল ঐ ধারণা ঠিক না। তাঁরা আর দশটা মানুষের মতোই, আলাদা কিছু না। আমার আদর-যত্নে, খুব সম্ভব পাকা চুল তোলার দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি আমাকে একদিন ডেকে বললেন, খাতা-কলম নিয়ে আয়, তোকে কবিতা লেখা শিখিয়ে দিই। আমি কঠিন গলায় বললাম, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, তাহলে কি শিখতে চাস? কিছুই শিখতে চাই না। আসলেই তা-ই। শৈশবে কারওর কাছ থেকে আমি কিছুই শিখতে চাইনি। এখনও চাই না। অথচ আশ্চর্য, আমার চারপাশে যাঁরা আছেন তাঁরা ক্রমাগত আমাকে শেখাতে চান।‘জানবার কথা’ নামের একটি বই শৈশবেই ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলেছিলাম এই কারণেই। এসএইচ/ডব্লিউএন

যদি মন কাঁদে...

কথার জাদুকর। বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, কিংবদন্তি। যার লেখায় মোহিত হননি এমন বাঙালি পাঠক পাওয়া দুষ্কর। তিনি সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। যিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। আজ পালিত হবে তার ৭০তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা তেমন পছন্দ ছিল না হুমায়ূন আহমেদের। তবুও রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রিয়জনদের নিয়ে কাটতেন জন্মদিনের কেক। সকাল হলে ভক্তরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন প্রিয় লেখককে। এছাড়া দিনব্যাপী নানা আয়োজন তো থাকতই। আর আজ সকালে নুহাশ পল্লীতেও থাকছে বিশেষ অনুষ্ঠান। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে আজ চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে ‘হুমায়ূন মেলা’। বিকাল ৩টা ৫ মিনিটে তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই চত্বরে হুমায়ূন মেলার উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত থাকবেন- নাট্যব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিকসহ দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজন, চ্যানেল আই পরিচালক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও হুমায়ূন আহমেদ পরিবারের সদস্যরা। মেলায় থাকবে হুমায়ূন আহমেদের বই, চলচ্চিত্র, নাটকসহ তার কর্মজীবনের নানা সামগ্রীর স্টল। মেলা চলবে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। মেলা প্রাঙ্গণ মঞ্চে পরিবেশিত হবে হুমায়ূন আহমেদের লেখা গান, নাচ, আবৃত্তি, স্মৃতিচারণ পর্ব ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রকাশকদের আয়োজনে বিকাল সাড়ে ৩টায় পাবলিক লাইব্রেরিতে শুরু হবে হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে সাত দিনব্যাপী একক বইমেলা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও লেখকের অনুজ কার্টুনিস্ট লেখক আহসান হাবীব। এছাড়া বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলেও অনুষ্ঠিত হবে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনের নানা আয়োজন। হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালিতে অবস্থিত স্বপ্নের নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেক কাটা, পুরো নুহাশ পল্লীকে আলোকসজ্জায় সজ্জিতকরণ ও মরহুমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ। নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে নুহাশ পল্লীর পক্ষ থেকে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। আজ সকালে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে নুহাশ পল্লীতে মরহুমের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের সংগঠন হিমু পরিবহনের উদ্যোগে গাজীপুরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে ক্যান্সার সচেতনতামূলক ৩০ জনের একটি সাইকেল শোভাযাত্রা জেলা শহর থেকে নুহাশ পল্লীতে যাবে। পথে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হবে। সংগঠনের ১৫ সদস্যের অপর একটি দল ঢাকা থেকে খালি পায়ে হেঁটে নুহাশ পল্লীতে যাবে। হুমায়ূন আহমেদ এর বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। বাবা লেখালিখি ও পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশ করতেন। বগুড়া থাকাকালীন তিনি একটি গ্রন্হও প্রকাশ করেছিলেন। নাম ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। হুমায়ুন আহমেদের ছোট তিন বোন শিকু, শিফু ও মনি। ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। ডাকনাম কাজল। তার বাবা নিজের নাম ফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন। বাবার চাকরি সূত্রে নেত্রকোনা, দিনাজপুর, বগুড়া, সিলেট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, বরিশালে শৈশব কেটেছে তার। সেই সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। জনপ্রিয় কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তার রুমমেট ছিলেন। এমএসসি শেষে হুমায়ূন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তবে প্রচারবিমুখ এই বিস্ময় পুরুষ সাধারণত নামের শেষে কখনও ‘ড.’ উপাধি ব্যবহার করতেন না। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মে প্রবেশ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ লিখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এক সময় অধ্যাপনা ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৩ সালে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রথমা স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ভালোবেসে তিনি গুলতেকিনকে বিয়ে করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের উত্থান ও তার প্রথম জীবনের সংগ্রামে নেপথ্যের নায়িকা হয়ে ছিলেন তার স্ত্রী। নিজের লেখা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ বইতে সেই সাক্ষ্য নিজেই দিয়ে গেছেন তিনি। হুমায়ূন-গুলতেকিন দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। তারা হলেন- মেয়ে বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলার বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ওই বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যা মারা যায়। সেই কন্যার নাম রেখেছিলেন লীলাবতী। তাকে একটি বইও উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ূন। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র জীবনে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে, ১৯৭২ সালে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার দ্বিতীয় গ্রন্হ। তারপর থেকে যেখানেই হাত দিয়েছেন হুমায়ূন, সেখানেই সোনা ফলেছে। সময়ের অববাহিকায় দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্হ। যা বিশ্ব সাহিত্যে একজন লেখক হিসেবে তাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। তার রচনাসমগ্রের মধ্যে এইসব দিনরাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, নি, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জাংশান, বহুব্রীহি, আশাবরি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, আমার আছে জল, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, বাদশাহ নামদার, এপিটাফ, রূপা, আমরা কেউ বাসায় নেই, মেঘের ওপারে বাড়ি, আজ চিত্রার বিয়ে, এই মেঘ, রৌদ্রছায়া, তিথির নীল তোয়ালে, জলপদ্ম, আয়নাঘর, হুমায়ূন আহমেদের হাতে ৫টি নীলপদ্ম ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়া লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প। তার ছোট গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভৌতিক গল্পেও জুড়ি নেই হুমায়ূনের। এর বাইরে কবিতা ও গান লেখাতেও হাত চালিয়েছেন। বিশেষ করে একজন গীতিকবি হিসেবে হুমায়ূন ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো’, ‘চাঁদনি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে’ ইত্যাদি গানে নিজেকে কালজয়ী করে রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যের নতুন যুগের স্রষ্টা ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যকে সার্বজনীন করে তুলতে এই কিংবদন্তি কথাশিল্পীর অবদান ইতিহাস হয়ে থাকবে। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’ জনপ্রিয়তায় বিশ্ব সাহিত্যেও বিস্ময়। এর বাইরে ‘মিসির আলী’, ‘রুপা’, ‘শুভ্র’, ‘মাজেদা খালা’, ‘বাকের ভাই’, ‘মোনা’, ‘ছোট মামা’ ইত্যাদি চরিত্রগুলোও দারুণ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে। এই চরিত্রগুলো নাটক ও চলচ্চিত্রের হাত ধরে চিরদিনের মতো থেকে গেল আশ্চর্য রকম জীবন্ত। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা বিচিত্র সব চরিত্র মানুষকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, স্বপ্নে ভাসিয়েছে। এক একটি চরিত্র পাঠক-দর্শকদের কাছে একেকটি নতুন আবিষ্কার। সাহিত্যের চরিত্রগুলোই বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে তার নাটক-সিনেমায়। হুমায়ূনের গড়া এসব চরিত্রে কখনও কখনও তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজেরই প্রতিরূপ। হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে আমরা তাই খুঁজে পাই কখনও হিমু, কখনও বা মিসির আলী, আবার কখনও শুভ্রকে। তার তৈরি করা চরিত্রের জনপ্রিয়তা ব্যক্তি হুমায়ূনকেও কখনও কখনও যেন ছাড়িয়ে গেছে। একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। হুমায়ূন আহমেদে মৃত্যতে শোক প্রকাশ করে স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সব গুণী মানুষ একে একে চলে যাচ্ছে। হুমায়ূনকে হারিয়ে অনুভব করছি, আপনজন হারানোর বেদনা। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের জন্য আমরা যারা কাজ করে আসছি, হুমায়ূন আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মানুষকে হলমুখী করেছিলেন।’ মূলত তার চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ তৈরি হয় নব্বই দশকের প্রথম দিকে। এই আগ্রহ আর সীমাহীন স্বপ্ন ছিল জীবনের শেষভাগেও। মোট ৮টি ছবি নির্মাণ করে গেছেন তিনি। ছবিগুলো হলো ‘আগুনের পরশমনি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে একজন লেখক হিসেবে প্রায় সবই তিনি অর্জন কিংবা জয় করে নিয়েছিলেন। পাঠক, ভক্ত, সম্মান, টাকা-সব কিছুই তিনি পেয়েছিলেন দু’হাত ভরে। আর স্বীকৃতিস্বরুপ নানা সময়ে ঘরে উঠেছে নানা পুরস্কার। তার মধ্যে রয়েছে- সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসুদন পদক, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক এবং চলচ্চিত্রে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদ চিরদিন সম্মানিত হয়ে থাকবেন আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, ডলি জহুর, সুবর্ণা মুস্তাফা, আলী জাকের, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, স্বাধীন খসরু, ডা. এজাজ, মাহফুজ আহমেদ, কুদ্দুস বয়াতি, বারী সিদ্দিকী, ফারুক আহমেদ, বিপাশা হায়াত, শমী কায়সার, প্রাণ রায়, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শামীমা নাজনীনের মতো অসংখ্য নন্দিত শিল্পীদের কারও কারও উত্থান ও কারও বা অনিন্দ্য বিকাশের কারিগর হিসেবে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন কোলন ক্যান্সারে ভুগছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আরোগ্যের আশায় দীর্ঘ ৯ মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হসপিটালে স্থানীয় সময় ১১টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ। সাহিত্যের আড়ালে হুমায়ূন আহমেদ খুব হালকা ভাষায় বলে যেতেন মানবজীবনের চরম বাস্তবতার কথা। তেমনি এক লেখায় বলেছিলেন- ‘তুমি হাসলে সবাই তোমার সাথে হাসবে, কিন্তু তুমি কাঁদলে কেউ তোমার সাথে কাঁদবে না। মানুষকে কাঁদতে হয় একা একা।’ খুব জানতে ইচ্ছে করে, কত মানুষ তার বিরহে আজ একা একা কাঁদে সে কথা কি প্রিয় হুমায়ূন জানেন? কিংবা দেখতে পান? আরকে// এআর

বুকার পেলেন মার্কিন লেখক জর্জ স্যান্ডার্স

এ বছর ম্যান অব বুকার পুরস্কার জিতেছেন মার্কিন লেখক ৫৮ বছর বয়সী জর্জ স্যান্ডার্স৷ প্রথম উপন্যাস ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ লিখেই এ পুরস্কার পান তিনি । লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ডাচেস অফ কেমব্রিজ কেট উইলিয়াম ৷ সেইসঙ্গে ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থমূল্য পান তিনি৷ দ্বিতীয় আমেরিকান হিসাবে এই পুরস্কার পেলেন জর্জ স্যান্ডার্স৷ যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ঠিক এক বছর আগের সময়কাল অর্থাৎ ১৮৬২ সালকে জর্জ স্যান্ডার্স তার ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ উপন্যাসের জন্য বেছে নিয়েছেন৷ নাম থেকে স্পষ্ট আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে কেন্দ্র করে সাজিয়েছেন গল্পটি৷ ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলে ধরার পাশাপাশি আশ্রয় দিয়েছেন নিজের কল্পনাকেও৷ উপন্যাসে উঠে এসেছে লিঙ্কনের ছোট ছেলের কথা৷ গতবছর আমেরিকান লেখক পল বেট্টির লেখা ‘দ্য সেলআউট’ উপন্যাসটি বুকার পায়৷ এই বছর ফের মার্কিন ঝুলিতেই গেল সাহিত্যের অন্যতম এ পুরস্কার৷ এর আগে বুকার পুরস্কার ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সাহিত্যিকদের দেওয়া হত৷ ২০১৪ সালের পর সেই প্রথা তুলে দেয় বুকার কমিটি৷ সূত্র:দ্যা গর্ডিয়ান এম     

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি