ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮ ১০:০২:০৪

‘আইনী জটিলতায় নারী উদ্যোক্তারা সুবিধা পাচ্ছে না’

‘আইনী জটিলতায় নারী উদ্যোক্তারা সুবিধা পাচ্ছে না’

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রাষ্ট্র অনেক সুবিধা দেওয়ার পরও আইনের নানা মারপ্যাঁচে এসব সুযোগ কাজে আসছে না। তাছাড়া নারীরা পারিবারিক ও গৃহস্থালি কাজে যে শ্রম ও সময় দেয় এরও কোনো স্বীকৃতি নেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ব্যারিষ্টার মিতি সানজানা। তিনি মূলত একজন কর্পোরেট ল`ইয়ার। আইনপেশার পাশপাশি তিনি শ্রমজীবী নারীদের অধিকার, নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করছেন। এসব বিষয় নিয়েই তার সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনি কর্পোরেট` ল নিয়ে কাজ করছেন। ঐ জায়গা থেকে বলুন আমাদের উদ্যোক্তা নারীদের কী কী সমস্যা রয়েছে? ব্যারিস্টার মিতি সানজানাঃ হ্যাঁ, এজন্য বিভিন্ন স্কীম রয়েছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, একজন নারীকে মাত্র ৯% সুদে লোন দেওয়া যাবে। কিন্তু অন্যদের জন্য সেটা ১৪% বা ১৫%। এটা একটা ইতিবাচক দিক। এর ফলে নারীরা উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ পায়। তবে এর পরও অনেক নারী সাহস করে এগিয়ে আসে না। কেন আসে না? এখানে জামানত বিহীন লোনের কথা বলা হয়েছে। কোন নারী যদি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন চায়, তার কোন জামানত লাগবেনা। কিন্তু তারপরও সেটি সম্ভব হয়না। কারণ, লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি শর্ত দেওয়া আছে। শর্তটি হলো, কোন একজন সরকারী কর্মকর্তা তার গ্যারান্টার হতে হবে। গ্রামের একজন সাধারণ নারীর পক্ষে এটি কঠিন শর্ত। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীকেও গ্যারান্টার হতে বলা হয়। কিন্তু যারা বিধবা নারী বা তালাকপ্রাপ্তা নারী তারা সে সুযোগটি পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এসএমই ক্ষুদ্র লোনের ১০% নারীদের দিতে হবে। কিন্তু এসব জটিলতার কারণে নারীর লোন পাওয়া হয়ে উঠেনা। ২০১৬ সালে মাত্র ৩% নারী এ লোন পেয়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের চাহিদায় ২৫% ঘাটতি রয়ে গেছে। আবার সামাজিক দৃষ্টিভংগিও অনেক সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। যেমন: নারীকে লোন দিলে আদৌ তিনি সেই লোন শোধ করতে পারবেন কীনা? বা ব্যবসা দাঁড় করাতে নারীরা কতটুকু সক্ষম এমন সব প্রশ্ন কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আসছে। অর্থাৎ নারীদের জন্য সরকার ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ব্যাংকের দিক থেকে অসহযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।   একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নারী পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও অনেক শ্রম দেয়। কিন্তু তার কোন স্বীকৃতি পায়না বা পাচ্ছেনা। কেন? ব্যারিস্টার মিতি সানজানাঃ পারিবারিক জীবনে পুরুষের চেয়ে নারীর শ্রমের পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তার কোন মূল্যায়ন কোথাও নেই। সন্তান লালন পালন, গৃহের কাজ কর্ম করা, রান্না বান্নাসহ সব ধরনের কাজেই নারীর ভূমিকা বেশি। এটাকে টাকা পয়সার হিসেবে কনভার্ট করলে কিন্তু অনেক টাকা আসে। কিন্তু আমাদের সমাজে এটাকে নারীর একতরফা দায়িত্ব বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে নারী আয় ও মূল্যায়ন দুটো থেকেই বঞ্চিত হয়। সাংসারিক জীবনে সময় ও শ্রম দিতে গিয়েই নারী অফিসিয়ালি চাকরি করার সুযোগ পাচ্ছেন না অনেক ক্ষেত্রে। সে বিবেচনায় সমাজে তার মূল্যায়ন করা উচিত। কিন্তু সে আয়ের উৎস নয়, বা পরনির্ভরশীল এ বিবেচনায় নারীকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হয়। শ্রম আইনে আট ঘণ্টা সময় চাকরিতে দেওয়ার কথা বলা আছে। ওভার টাইম সহ দশ ঘণ্টা। কিন্তু একজন মা চব্বিশ ঘণ্টাই সময় দেন। যার কোন ধরনের মূল্যায়ন তিনি পারিবারিক বা সামজিক জীবনে পাননা। নারী যদি ঘর সংসারে সময় না দিয়ে দেশের কাজে সময় দেয় তাহলে তার কাজের স্বীকৃতি আসবে। নিজের মেধার স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও কল্যাণ হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের দেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কী কোন আলাদা আইন আছে? ব্যারিস্টার মিতি সানজানাঃ না, আমাদের দেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কোন আইন নেই। যেহেতু আমাদের সমাজে নারী- পুরুষ উভয়কে সমদৃষ্টিতে দেখা হয় সেহেতু এমন আইনের কথা কেউ চিন্তা করেন না। কিন্তু নারী মালিকানা, কোম্পানীতে নারীর অধিকার, নারীর জন্য ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, ট্রেড লাইসেন্স, টিন সার্টিফিকেটসহ নানা বিষয়ে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু আইন হওয়া দরকার। এর ফলে তারা উৎসাহ পাবে। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী। সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমাদের যে যাত্রা তা কিন্তু নারীকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের বিভিন্ন স্কীমে, ব্যাংক লোনের ক্ষেত্রে কিছু সহজ নারী বান্ধব আইন আসা দরকার। খেয়াল করলে দেখবেন, লোন পেতে গিয়ে একজন নারীকে নানা ধরনের ঝক্কি ঝামেলার ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পদক্ষেপ পার হতে হয়। এর ফলে একটা পর্যায়ে সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আবার অনেক সময় দেখা যায় অনেক প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর শেষ মুহুর্তে কোন একটা ছোট অজুহাতে তার লোনটা আটকে যায়। এজন্য নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আইন দরকার।   একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনি একজন লেবার ল`ইয়ার। সেই জায়গা থেকে সাধারণত কোন ধরনের সেবা নারী শ্রমিকদের দিয়ে থাকেন? ব্যারিস্টার মিতি সানজানাঃ আমি সাধারণত নারী শ্রমিকদের সচেতন করে থাকি। প্রচুর নারী শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। শ্রম আইন সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করে থাকি। শ্রম আইনে অনেক ধরণের বিষয় চলে আসে। যেমন: একজন নারীকে নাইট শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা যাবেনা। মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে তাদের সচেতন করি। আমাদের দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার ব্যপারে ও এর নানাদিক নিয়ে অনেকে এখনো সচেতন নয়। একজন নারী গর্ভকালীন সময়ে ( যদি তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে থাকেন) চারমাস ছুটি পান। এর মধ্যে দুই মাস সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে আর দুই মাস সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে। এই চারমাস তিনি পুরোপুরি বেতন পাবেন। উপরন্তু তিনি একটি মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাবেন। আমাদের অনেক মেয়েই এই সুবিধা সম্পর্কে জানেন না। শ্রম আইনে বলা আছে প্রত্যেকটি ফ্যাক্টরী বা প্রতিষ্ঠানে একটা করে শিশু কক্ষ থাকবে। যেখানে কর্মজীবী মা তার শিশুকে স্তন্য পান করাতে পারবেন। এসব বিষয়ে শ্রমিকদের সচেতন করা, তাদের একটা ভয়েস তৈরি করা- এটাই আমি করে থাকি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ব্যারিস্টার মিতি সানজানাঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। আআ/টিকে
উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প উদ্বোধন করলেন চুমকি

আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৮উদযাপন উপলক্ষ্যে ‘উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প ২০১৮’ এর উদ্বোধন করেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম এর আয়োজনে গতকাল বৃহস্পতিবার এর উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি ‘উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প-২০১৭’-এর বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম, এনডিসি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী রওশন আক্তার এবং জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী মেহরীন। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) এবং এটুআই প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক কবির বিন আনোয়ার। নারীদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে উদ্ভাবনী আইডিয়ার মাধ্যমে সেগুলো সমাধানের জন্য এটুআই প্রোগ্রাম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প আয়োজিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নারীর দুর্ভোগ নিরসনে নারীর উদ্ভাবন’- প্রতিপাদ্য বিষয়ে ২০১৭ সালে আয়োজন করা হয়েছিল ‘উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প-২০১৭’।  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা চিহ্নিত করা এবং একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীদের দ্বারা এগুলোর উদ্ভাবনী সমাধানের ব্যবস্থা করা। উক্ত প্রতিযোগিতায় নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ, কর্মজীবী মায়েদের বিড়ম্বনা, নারীর সম্ভাবনাময় দক্ষতার ব্যবহার এবং বৃদ্ধ নারীদের বিবিধ সমস্যা এই ৪ টি ক্ষেত্রের আইডিয়া বিজয়ী হয়েছে। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি। ২০১৬ ও ২০১৭ এর সফলতার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও এটুআই এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে “উইমেন্স ইনোভেশন ক্যাম্প-২০১৮”। চিহ্নিত খাতগুলোর সমস্যা সমাধানে যে কোন বয়সের নারীদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বা দলগতভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনলাইনে চিহ্নিত সমস্যাসমূহের উদ্ভাবনী সমাধান প্রদানের জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আইডিয়া জমা দিতে এবং বিস্তারিত তথ্য জানতে প্রতিযোগিতার ওয়েবসাইট http://challenge.gov.bd/wic এ আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনসমূহ প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবে। এছাড়াও বিজয়ী প্রকল্পসমূহ পাইলট আকারে বাস্তবায়নে এটুআই প্রোগ্রাম থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অনুদান প্রদান করা হবে।   //এস এইচ এস//

কর্মক্ষেত্রে সফল ৬ নারীকে সম্মাননা

কর্মক্ষেত্রে সফল ৬ নারীকে সম্মাননা দিয়েছেন উইমেন এন্ট্রাপ্রিনিওয়ার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন (ওয়েন্ড)। নারীকে আর্থিকভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে সহায়তা ও উৎসাহ প্রদানে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ৬ নারীকে সম্মাননা প্রদান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আইবিএ অ্যালামনাই ক্লাবে আর্ন্তজাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘প্রেস ফর প্রোগ্রেস’ অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সোহেলা আহম্মদ, স্থপতি নুজহাত জেরিন, ‍সাংবাদিক সামিয়া রহমান, ফ্যাশন ডিজাইনার সাবিনা পান্নি, আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, সরকারী কর্মকর্তা নাহিদা সোবহান। আইনজীবী নাহিদ মাহতাব বলেন, আইন পেশাটা মূলত পুরুষতান্ত্রিক। এখানে সারা দিন চেম্বার করার পর রাতের বেলায়ও কাজ করতে হয়। আইন পেশায় নারী আইনজীবীদের গ্রহণযোগ্যতা সেইভাবে নেই। বিচার প্রার্থীরা ভাবে নারী আইনজীবীদের কাছে গেলে তারা বিচার সেইভাবে পাবেন কিনা। সেক্ষেত্রে আমাদের যোগ্যতা, মেধা দিয়ে প্রমাণ করতে হয় আমরাও পারি। এ সফলতার পেছনে আমার পরিবারের ভূমিকা রয়েছে। তবে সফলতার পেছনে সব কিছু সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সাংবাদিক সামিয়া রহমান বলেন, নারী পুরুষ নয় আমি মানবতা বাদে বিশ্বাসী। যে কোন পুরস্কার মানুষের সমতার জন্য মানুষের অধিকারের জন্য। নারীর অধিকার মানে শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি নয় নারীর অধিকার মানে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা। সেটা যখন শুধু এ সমাজ নয় পুরো বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন নারী-পুরুষ বলে কোন ব্যাপার না, সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে। ফ্যাশন ডিজাইনার সাবিনা পান্নি বলেন, কর্মক্ষেত্রে সফল নারীদের সম্মাননা প্রদানের ওয়েন্ড এর উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়। সম্মাননা পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। অনেক নারী উদ্যোক্তা অনেক সমস্যায় রয়েছেন। স্থপতি নুজহাত জেরিন এ সম্মাননা প্রদান করায় ওয়েন্ড কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমার পরিবারের কারণে আজকে আমি সফল। সেজন্য এককভাবে আমি এ সফলতা দাবি করতে পারি না। আজকে নারী দিবসে যদিও আমার কাজ দিয়ে আমাকে সফল হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আমি মনে করি প্রতিটি নারী-মাকে নারী দিবসে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়েই আসবে আমাদের স্বার্থকতা। ডা. সোহেলা আহম্মাদ বলেন, প্রোগ্রেসের ক্ষেত্রে শিক্ষা মুখ্য ভূমিকা রাখে। নারীকে সম্মান দেওয়া পরিবার থেকে শেখাতে হবে। নারীকে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে মাইন্ড সেটের পরিবর্তন ও সেলফ কনফিডেন্ট বাড়াতে হবে। নারীদের মূল ধারায় আনতে হলে মানসিক অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। আমার সফলতার পেছনে আমার বাবা-মা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। ওয়েন্ড এর সম্মাননার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে প্রেরণা যোগাবে। ওয়েন্ড এর প্রেসিডেন্ট ড. নাদিয়া বিনতে আমিন বলেন, সাধারণত দেখা যায় যারা সাফল্যের চূড়ায় তাদের সব সময় সম্মাননা দেওয়া হয়। ওয়েন্ড এর পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সফল নারীদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। সম্মাননা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ একটা বয়সের ক্যাটাগরি বিবেচনা করেছি। যাদের বয়স ৪৫ থেকে ৫৫ বছর। যারা এ বয়সে অনেক ঘাত প্রতিঘাত সহে কর্মক্ষেত্রে আছেন, সফল হয়েছেন এবং চাকরিতে থেকে তাদের অবস্থান তুলে ধরছেন।   এমএইচ/

সামাজিক সংগঠনের ইতিবাচক উদ্যোগেই এগিয়ে যাবে নারী

বর্তমানে নারীরা পরিবার ছাড়াও দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলছেন। তাদের একনিষ্ট প্রচেষ্টায় অর্থনীতির চাকা দিন দিন আরও বেশি সচল হচ্ছে। বিশেষ করে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে প্রশংসিতভাবে। গত কয়েক বছর ধরেই সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অবদান ঊর্ধ্বমুখী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যে কাজগুলো শুধু ছেলেদের দ্বারাই করা সম্ভব বলে মনে করা হতো এমন কাজগুলো আজ নারীরা সফলভাবে করছেন। এছাড়া সামাজিক সংগঠনগুলো যদি ইতিবাচক উদ্যোগ নেয় তবে সমাজ, অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নারীর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে। এমনটিই মনে করেন ইভিন্স রিটেইল লিমিটেডের (নোয়া) ম্যানেজিং ডিরেক্টর শবনম শেহনাজ চৌধুরী। ৮ মার্চ ‘বিশ্ব নারী দিবস’ উপলক্ষ্যে একুশে টিভি অনলাইনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। শবনম শেহনাজ চৌধুরী আরগন ডেনিমস্ এবং ইভিন্স টেক্সটাইল লিমিটেডের যথাক্রমে চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি ইভিন্স গার্মেন্টস, ইভিটেক্স ড্রেস শার্ট, ইবিটেক্স এপারেলস এবং ইবিটেক্স ফ্যাশন এবং ইভিন্স লিমিটেডের ডেপুটি মেনেজিং ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন রিপোর্টার মাহমুদুল হাসান। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কি ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় মূলধন তার নতুন কিছু করতে চাওয়ার ইচ্ছা। কত টাকা পূঁজি আছে বা কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে তা কিন্তু নয়। একজনের অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বচ্ছলতা না থাকতে পারে, কিন্তু  তার যদি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন থাকে তাহলে সে একদিন বড় উদ্যোক্তা হতে পারবে।  একজন উদ্যোক্তা তার রাস্তা নিজে তৈরি করেন। এখানে ঝুঁকির সম্ভাবনা শতভাগ। তাই যারা এপথে আসতে চায় তাদেরকে সবার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দেওয়া উচিৎ। আমি মনে করি গ্রামের যে মা বোন হাস-মুরগী বা গরু-ছাগল লালন পালন করেন তারাও উদ্যোক্তা। তাদের মধ্যে বড় হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে। তাদেরকেও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারী উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে কি কি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: প্রথমেই যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সেটি হলো প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত এবং সঠিক ধারণার অভাব। প্রথমদিকে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি, কর প্রদান, ব্যাংক লোন বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা এমন নানা বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আর এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পাওয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। এছাড়া নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জটিল পদ্ধতিকে অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে আমি মনে করি। স্বাভাবিকভাবেই, শুরুতে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পূঁজি কম থাকে, তাই প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ীর চেয়ে ব্যাংক ঋণ পাওয়া তার পক্ষে অনেক বেশি কঠিন হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বা অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেক সময় উদ্যোক্তার অনুপ্রেরণার পথে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারে। তবে বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি উদ্যোক্তা রয়েছে, যাদের কাছ থেকে নতুনরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহায়তা পেয়ে থাকেন। এছাড়া ইন্টারনেট ও যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের কারণেও অনেক সহজ হয়েছে উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া পেছনে কি কি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: একজন পুরুষের সমান যোগ্যতাসম্পন্ন হয়েও, শুধু নারী হওয়ার কারণে তাকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়। অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি অনেক সময় পরিবারের দিক থেকেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিদেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সহজ পদ্ধতি প্রণয়নের অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ আদান প্রদানের সহজ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এ সকল ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। তবে বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নারীরা আগের মত সমস্যার মুখোমুখি হননা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের অগ্রগতিতে চাই নারী ‍উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় বলে আপনি মনে করেন? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাপক সামাজিক স্বীকৃতি থাকলে নারীরা এ ক্ষেত্রে উৎসাহিত হবে এবং নারীদের কাজে গতি আসবে। উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতাগুলো দূর করার মাধ্যমেও নারীদের সামনে নিয়ে আসা সম্ভব। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা প্রনয়ণ করতে হবে। নারী উদ্যোক্ততাদের বিনিয়োগের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলে তারা নিজেদের ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে একটা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। একুশে টিভি অনলাইন: নারীরা এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, এর কারণ কি? শবনম শেহনাজ চৌধুরী:  অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন নয়। রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের অধিকার এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাদের অধিকার আদায়ে তাদেরকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।  একুশে টিভি অনলাইন: নারীদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে আপনার পরামর্শ কী? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: নারীর প্রতি বৈষম্য, নিষ্ঠুরতা, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নসহ সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ না করলে রাষ্ট্রের অগ্রগতি সম্ভব নয়। কেননা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা এই নারী সমাজকে পিছিয়ে রেখে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষা, চাকরি ও রাজনীতিতে যে সকল নারী নিজ মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নেতিবাচক মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নারীদের যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, আন্তরিকতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: যৌতুকের মতো অভিশাপ প্রথা এখনো সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি? শবনম শেহনাজ চৌধুরী: পারিবারিক সহিংসতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে যৌতুক একটি অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে এটি দরিদ্র পরিবার ছাড়াও স্বচ্ছল ও তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারেও এর প্রভাব দেখা যায়। যৌতুক না পেলে শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন করার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। যৌতুক নেওয়া বা দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও একে পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। তাই আমি বলব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আরও বেশি আন্তরিক হন তাহলে তা বন্ধ করা সম্ভব। এমএইচ//

নারী নির্যাতন বন্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক

দেশব্যাপী নারী নির্যাতন বন্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৪.৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশ ও র‌্যালিতে এ দাবি জানায় তারা। এসময় তারা বলেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নারী নির্যাতন বন্ধে ভূমিকা রাখতে হবে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর কেন্দ্রীয় সভাপতি রওশন আরা রুশো এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু। সভায় বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য সামসুন্নাহার জ্যোৎস্না। সমাবেশে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের চেতনার মূলে ছিল নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার আহ্বান। নারীদিবস ঘোষণার ১০৭ বছর পর এবং মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পরও আমাদের দেশের নারীরা সমাজিক-পারিবারিক জীবনের অনেক ক্ষেত্রে সম-অধিকার থেকে বঞ্চিত। এখনও সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। কোন সরকারই সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে আপত্তি তুলে নেয়নি। ‘সমকাজে সমমজুরি’ আইনে থাকলেও প্রায় সকল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের (নির্মাণ কাজ, চাতাল, ক্ষেতমজুর ইত্যাদি) নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন নেই। অন্যদিকে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতন, নির্যাতনের ধরণ এবং নির্যাতিতের সংখ্যা। বক্তারা আরও বলেন, পোশাকশিল্পে শতকরা ৬০ ভাগই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশ পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ। আর বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৩ সালে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর তাদের ন্যূনতম বেতন বেড়ে হয়েছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা। এই ৪ বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে কিন্তু বেতন বাড়েনি! এই রাষ্ট্র এই সমাজ নারীদের ন্যূনতম যে মানবিক অধিকার তাই দেয় না; সম-অধিকার তো আরও দূরের কথা! তাই পোষাকখাতসহ অন্যান্য খাতে যাতে সমমজুরি নিশ্চিত করা হয় তার জোরালো দাবি জানানো হয়। এমজে/

‘নারীকে এখনও ভোগের উপকরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে’

নারী ভালোবাসা ও সৌন্দর্যবোধের অনুপম প্রতীক। নারী মানেই মা, ভগিনী, জায়া। একজন পুরুষ পরিবেশগতভাবে যে আনুকূল্য পায় সেই তুলনায় একজন নারীর সুযোগ সুবিধা খুবই নগণ্য। সমাজ পরিবার-রাষ্ট্রের মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যে রয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। তবুও দিন শেষে একজন পুরুষকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত নারীর কাছেই ফিরতে হয়। তাঁর কাছেই পুরুষ আশ্রয় নেয়। আর দিন শেষে পুরুষকে ঘরে ফেরাতে নারীর অনন্য অবদান রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একজন নারীই তাঁর মাতৃত্বের জায়গা থেকে ছেলে সন্তানের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। এজন্য যে সব সময় পুরুষ-ই দায়ী তা সত্যি নয়। একজন মায়ের কাছে মেয়ের তুলনায় ছেলেরা বাড়তি অগ্রাধিকার পায়। এরমধ্যেও এক ধরণের ভালোবাসার বৈষম্য সৃষ্টি হয় । বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক হুমায়ূন আজাদ এর লেখায় সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যের চিত্র এভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ছেলেটি তার বিছানা গুছিয়ে না রাখলে মা খুশি হয়, দেখতে পায় একটি পুরুষের জন্ম হচ্ছে; কিন্তু মেয়েটি বিছানা না গোছালে একটি নারীর মৃত্যু দেখে মা আতংকিত হয়ে পড়ে ।’ পুরুষের ক্লান্তি-শ্রম ঘামের যথার্থ মূল্যায়ন কেবল একজন নারীই দিতে পারেন। অথচ পুরুষের স্বার্থপরতার কারণে নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, যেন ভোগের আর ব্যবহারের উপকরণ মনে করা হয় এখনও। নারীকে যদি পুরুষের মত সমান চোখে দেখা হত তবে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার নিয়ে কথা উঠত না।বিশেষ করে নারী দিবসেরও প্রয়োজন হতো না। নারীরা ঘরে বাইরে অবহেলিত বলেই তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ দিবস অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমনটিই মনে করেন ইউওয়াই সিস্টেম কোম্পানি লিমিটেডের কর্ণধার ফারহানা এ রহমান। নারীর প্রতি পুরুষশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাত্যাহিক সমস্যা থেকে নারীর প্রগতি, এবং জাগরণের বিষয় নিয়ে নারীর অধিকার, কর্মপরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী সম্পর্কে পারিপার্শ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। আইটি উদ্যোক্তাদের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বেসিসের এ ভাইস প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নারী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? ফারহানা এ রহমানঃ মূলত নারীকে সামনে নিয়ে আসার জন্য আমরা নারী দিবস উদযাপন করি । এই দিবসের অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করবার জন্য এই রকম একটি দিনের দরকার ছিল। নারী দিবসে নারীকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন নেই। যেহেতু নারীরা সমাজে পুরুষের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে, সেই জন্য নারী দিবসের মাধ্যমে নারীকে বাঁধা জয় করার একটা অনুপ্রেরণা দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সে তাঁর মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে বলে মনে করি। সমাজে সফল নারীর সংখ্যা হাতেগুনা। সুতরাং নারী দিবসে সবার প্রতি একটাই চাওয়া সেটা হল সমাজে নারী পুরুষের মধ্যে যেন বৈষম্য না হয় এই ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে কোন সমস্যাকে দায়ী করছেন ?  ফারহানা এ রহমানঃ  নারীদের  প্রতিষ্ঠিত হওয়া অবশ্যই কঠিন। আমি নিজেকে প্রমাণ করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। কারণ আমি নারী। আর নারী বলেই এই সমস্যাগুলি মেনে নিতে হয়েছে। আমার উঠে আসার গল্পটা ভিন্ন নয়, আমার মতো এই রকম সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশে বহু নারী রয়েছে। তাঁদেরও দু`চোখ ভরা স্বপ্ন আছে, কিন্তু সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ জানা নেই।  আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যেহেতু নারী এদের একটা বড় অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রয়েছে। নারীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র নেই বলেই মূলত নারীরা পুরুষের মতো সমানতালে  উঠে আসতে পারছে না। এই ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশের সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকে প্রধান বাঁধা হিসেবে দেখছি। সাহসিকতার মাধ্যমে নারীরা সফল হতে পারবে আর না হয় এরা বোঝা হয়ে থাকবে।  একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কি করা উচিত? ফারহানা এ রহমানঃ নারী বলেই তো কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না। সব নারীকেই যোগ্যতা অর্জন করেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর যেহেতু নারী তাই এক্ষেত্রে তাঁদের নিষ্ক্রিয় ভুমিকা দেশ ও সমাজকে পিছিয়ে দেয়। যদি তারা অর্থনৈতিক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তবে দেশের উন্নয়ন এবং গ্রগতিতে রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। আমি যে সেক্টরে কাজ করি সেখানে তো নারীর অংশগ্রহণ একেবারেই সীমিত। একসময় আমি বেসিসের যখন ডিরেক্টর ছিলাম তখন যেকোনো ভাতে ঘর ভর্তি পুরুষ দেখতাম, এই জায়গাতে নারীর আরও উঠে আসা দরকার। সর্বক্ষেত্রে নারীর পদচারনা বাড়ানো গেলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হবে। আর এজন্য নারীদের রোল মডেল যারা তাঁদেরকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য আগের চেয়ে  নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। আমার মনে হয় শিক্ষিত নারীরা আইটি খাতে এলে ভালো করবেন। এই খাতে এখন প্রচুর জনবল প্রয়োজন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আইটি খাতে কাজ করতে গিয়ে আপনি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কিনা? ফারহানা এ রহমানঃ দেখুন, একটা মেয়েদের কেউ কাজে নিতে চাইতো না। এই জন্য নারীদেরকে সংগ্রাম করে  আজকের এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। আইটি খাতে কাজ করতে গিয়ে আমি কোনো সহযোগিতা পাইনি।আমি নারী বলে ব্যাংক আমাকে লোন দেয়নি। সবাই বলতো ওনি কয়েকদিন পরে এই কাজে  আর থাকবেন না। মেয়েদের সম্পর্কে পুরুষের ধারণা মেয়েরা কোনো কাজ ভালো মত করতে পারে না। আমার পারিবারিক সাপোর্ট থাকার কারণে আমি এই কাজে সফলতা পেয়েছি। এরপরেও আমি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারিনি। আমার ছেলেটা প্রতিবন্ধি। এই রকম একটি বাচ্চা নিয়ে আমার উঠে আসতে হয়েছে। যেহেতু ওকে সব সময় নজরে রাখতে হয় তাই তাকেও ছোট বেলা থেকে আইটি কাজে পারদর্শি করে তুলেছি। সেও এখন অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখছে। আমাকে সহযোগিতা করছে।  একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আমাদের দেশে আইটি খাতের সুযোগ-সুবিধা কেমন? তরুণরা এ সুযোগটা কেমন কাজে লাগাতে পারছে? ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশে আইটি খাত এখন অনেক দূর এগিয়েছে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও মানুষ জানতো না, প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই উপার্জন করা যায়। দেশে এবং দেশের বাইরে এ সেক্টরে কাজের সুযোগ বেড়েছে। এমনকি কেউ চাকরি করতে না চাইলেও, ইচ্ছে থাকলে উদ্যোক্তা হতে পারেন। আমাদের দেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে এখন অনেকেই বিদেশে বড় বড় ফার্মে কাজ করছে। দেশে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার আইটি ফার্ম রয়েছে, যারা সফটওয়্যার তৈরি, ওয়েব ডিজাইন, ই-কমার্সের কাজ করে বছরে কোটি ডলার আয় করার সামর্থ্য রাখে। এছাড়া সরকারের সব মন্ত্রণালয় এখন অটোমেটেড হচ্ছে। কাগজ-কলম ছেড়ে অটোমেশনের দিকে যাচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আইটি খাতে এত সুযোগ থাকার পরও আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারছি না কেন? ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশে একজন সিইওকেই (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) সব কাজ করতে হয়। ক্রেতা নিয়ে আসা, গুণগত পণ্য নিশ্চিত করা, বিদেশে বাজার তৈরি করা, কর্মী পরিচালনা করা-সবকিছু একজনকেই করতে হয়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন সিইউকে এসব কাজ করতে হয় না। এদের ডিজিটাল মার্কেটিং অনেক শক্তিশালী। যার যার কাজ প্রত্যেকেই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেন তারা। অথচ আমাদের দেশে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। যারা তৈরি হচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ বিদেশে চলে যাচ্ছেন, না হয় উদ্যোক্তা হচ্ছেন। তবে আমি মনে করি এ খাতে আমাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়া। এ খাতে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো আইটি উদ্যোক্তাদের কোনো ধরণের সহযোগিতা করে না। এ বিষয়ে দেশে কোনো নীতিমালা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে না। অথচ গার্মেন্টস, ফার্মিং-এ খাতগুলোতে ব্যাংকগুলো সহজেই বিনিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে হলে অবশ্যই ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আপনাদের মতো আইটি উদ্যোক্তারা তাঁদের যোগ্যতা দেখিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বড় বড় কাজ নিয়ে আসছেন। বিপরীতে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরের ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? ফারহানা এ রহমান : আমাদের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে সফটওয়্যার আমদানি করছে। কখনো কখনো বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে এসে সফটওয়্যার তৈরি করছে। এতে প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক ভোক্তা হয়ে পড়েছি। প্রডিউসার হতে হলে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উপর। দেশের আইটি খাতে দক্ষ জনবল যত বাড়বে, আমাদের উৎপাদন ক্ষমতাও তত বাড়বে। একই সঙ্গে বিশ্ব দরবারে দেশীয় পণ্যের গুণাগুণ তুলে ধরতে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। স্বজাত্যবোধ তৈরি হতে হবে। দেশীয় পণ্যের উপর শতভাগ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। বিদেশি পণ্যই সেরা এই বোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবেই দেশের আইটি খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোর বিদেশমুখী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে সফটওয়্যার তৈরির একটি চুক্তি করলেও সেটি আলোর মুখ দেখছে না। তাই দেশি উদ্যোক্তাদের এ ধরণের সুযোগ দেওয়া হলে, এ খাতে আরো বেশি প্রাণ সঞ্চার হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারের কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? ফারহানা এ রহমান : দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সবাইকে গতানুগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের একটা অংশকে অবশ্যই কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। সরকার সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই জনশক্তি বাড়বে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আইটি খাত সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে সরকারের কাছে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি কি আশা করেন? ফারহানা এ রহমান : দেখুন, এদেশে আইটি খাত যতটুকু বিকাশ ঘটেছে, তার মূলে রয়েছে প্রাইভেট সেক্টর। বাজারে প্রতিনিয়তই আইটি খাতে নতুনত্ব আসছে। তার সঙ্গে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের অভাবে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। তার কারণ আমাদের সেক্টরকে অন্যান্য সেক্টরের মতো ভ্যালুয়েশন করা হচ্ছে না। যার কারণে ব্যাংকগুলো আমাদেরকে লোন দিতে চায় না। আইটি খাতের উন্নয়নে সরকারের প্রথম যে কাজটা করতে হবে, তাহলো কিভাবে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় সে বিষয়গুলো সরকারকে আরো আন্তরিকভাবে ভাবতে হবে। যাতে আমাদের মতো উদ্যোক্তারা যোগ্যতা থাকা সত্বেও শুধু বিনিয়োগের অভাবে হারিয়ে না যায়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনি কতটুকু আশাবাদী? ফারহানা এ রহমান : ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান আসার পর সবাই এখাতে ঝাপিয়ে পড়ছে। শুধু ঝাপিয়ে পড়লেই হবে না, আমাদের ফোকাস থাকতে হবে, গোল থাকতে হবে, টার্গেট থাকতে হবে। সেটা অর্জন করার জন্য যদি কৌশল পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে তাও করতে হবে। কিন্তু টার্গেট পরিবর্তন করা যাবে না। এ লক্ষ্যে আমাদের জনবলকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা পেশাগতভাবে দক্ষ নন। কোনো কাজকেই ছোট করে দেখা যাবে না, তবেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : সম্প্রতি দেখা গেছে, তরুণরা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে? এই ইন্টারনেটকেই কাজে লাগিয়ে কিভাবে আয় করা সম্ভব? ফারহান এ রহমান : ব্রডব্যান্ডের তুলনায় মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বেশি হওয়ায় এ সমস্যাটা হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মোবাইলে ফেসবুকিং, ইউটিউবিং আর গেমস নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। যত দ্রুত ব্রডব্যান্ড প্রসারিত হবে ততদ্রুত ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে ছেলে-মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হবে। তবে আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জে এখনো ইন্টারনেট সেবা পৌঁছোয়নি। এ সেবা পৌঁছালে প্রান্তিক পর্যায়েও শিক্ষার্থীরা আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আইটি খাতে আসতে চায়, এমন শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি? আন্তর্জাতিক মানের কর্মী হয়ে উঠতে হলে তাদের কোন দিকটির প্রতি নজর দিতে হবে? ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখে। কিন্তু ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে আইটি সেক্টরে ভালো করা সম্ভব নয়। তাকে যে কোনো একটি বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে এবং ঐ বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে। যেমন কেউ ওয়েব ডিজাইনিং করলে, তাকে অবশ্যই ওয়েব ডিজাইনিংয়ের খুঁটিনাটি সবই জানতে হবে। কেউ গ্রাফিক্স ডিজাইনিং করলে তাকে অবশ্যই গ্রাফিক্স ডিজাইনের সব বিষয়ে জানতে হবে। আমি সব পারি এই ধারণা থেকে তরুণদের বেরিয়ে আসতে হবে। একটা কাজ আমি ১০০ ভাগ পারি, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আইটি বিষয়ে পড়ালেখা না করেও কি কেউ এখানে কাজের সুযোগ পেতে পারে? ফারহানা এ রহমান : আইটি বিষয়ে পড়ালেখা না করেও নিঃসন্দেহে এখানে ভালো করার সুযোগ আছে, তার উদাহরণ আমি নিজেই। তবে তার আগে তাকে ট্রেনিং নিতে হবে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার অনেকগুলো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা আইটি বিষয়ে ট্রেইনিং দিচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যে কোনো শিক্ষার্থী এখানে কাজের সুযোগ পেতে পারেন। কারা আপনার এখানে কাজ করছে এমন আরেকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিপ্লোমা পাশ কিংবা আইডিবি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ছেলে-মেয়েরা এখানে বেশি আসছে। এছাড়া কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীরাতো আসছেই। এমন অনেক কর্মী আছেন যারা দুই থেকে তিন বছর এখানে চাকরি করে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। তবে তার আগে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ফারহানা এ রহমান : একুশে টেলিভিশন অনলাইন কে ধন্যবাদ। আরকে// এআর

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই নারী অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়

নারী ভালোবাসা ও সৌন্দর্যবোধের অনুপম প্রতীক। নারী মানেই মা, ভগিনী, জায়া। একজন পুরুষ পরিবেশগতভাবে যে আনুকূল্য পায় সেই তুলনায় একজন নারীর সুযোগ সুবিধে খুবই নগণ্য। নারীর প্রতি পুরুষ শাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাত্যহিক সমস্যা থেকে নারীর প্রগতি এবং জাগরণের বিষয় নিয়ে নারীর অধিকার, কর্মপরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী সম্পর্কে পারিপার্শ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের অন্যতম  খ্যাতিমান আইটি উদ্যেক্তা দোহাটেক এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা শামসুদ্দোহা। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী দিবস সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? লুনা শামসুদ্দোহাঃ আমার কাছে মনে হয় এই দিন পুরুষ দিবস। কারণ এই দিনটা পুরুষেরা দেখে যে, আজ নারী দিবস। কিন্তু বছরের বাকি দিন গুলোতে তো আমরা নারী। নারী না থাকলে তো পৃথিবীতে খুব কম জিনিসই থাকতো। মহৎ কিছু সৃষ্টি হত না। নারী অধিকারের প্রতি পুরুষের আন্তরিকতা ও উর্বর মানসিকতা বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে এখনো অনেক দূরে রয়ে গেছে। যদিও একটু একটু করে পরিবেশ তৈরি হয়েছে বটে। নারীদের প্রতি সম্মান ও তাদের অধিকারকে সমন্নুত করতে হলে প্রথমে নারীদের সচেতন হতে হবে। তাঁদের জেগে উঠতে হবে। নারীদের প্রগতির পথে, মুক্তির পথে নেমে পরতে হবে। তারপর সরকারকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রযুক্তির এই বহুল ব্যবহারের যুগেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হতে হয়। এখনো বখাটেদের অত্যাচার-ইভটিজিংয়ে এসিডে মুখ ঝলসে যাচ্ছে আমাদের মা-বোনেরা। এখনো শ্রমজীবী নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে ঘর পর্যন্ত নিরাপদ নয়। নারীর প্রতি সমঅধিকারের এই কথাগুলো বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণ থেকে শুরু করে এখনও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সংগঠন, সংস্থা, সোচ্চার থাকলেও দিবস কেন্দ্রিক এর গুরুত্ব জেগে উঠে কিন্তু আদৌ কি নারীরা সেই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে? এ প্রশ্নের সোজা উত্তর কিছুটা হয়তো পৌঁছাতে পেরেছে কিন্তু সেটা এতটাই অপর্যাপ্ত যে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে এখনো পাড়ি দিতে হবে বিস্তর পথ। প্রান্তিক পর্যায়ে খেয়াল করলেই এর সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়। এই অবস্থাটা না বদলানোর পরিবেশটাকে আমরা কী বলব? দোষের আঙুল কার দিকে নির্দেশ করব? আমি মনে করি নারীরা অনেক ক্ষেত্রে এখনও নিজেদের কারণে পিছিয়ে রয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ অর্থনীতিতে নারীরা প্রতিনিয়তই জোরালো ভূমিকা পালন করছে একজন নারী হিসেবে এই সাফল্যকে আপনি কীভাবে দেখছেন? লুনা শামসুদ্দোহাঃ পোশাক কারখানায় নারী না থাকলে কি হতো ভেবে দেখুন। মাইক্রো ফাইন্যান্স না থাকলে কিছু হত না। নারীদের সক্ষমতা বাড়াতে তাদের লেখাপড়া করতে হবে। শুধু সার্টিফিকেট এর শিক্ষা নয়, প্রতিদিনই কিছু না কিছু তাদের শিখতে হবে। হঠাৎ করে কেউ নারী বলে এই অজুহাতে তো কেউ পার পেয়ে যেতে পারবে না। কারণ সমাজ তাকে সেই সুযোগ কখনো দেয়নি। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হলে প্রথমে নারীরা  নিজেদেরকে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। একটা কথা বলতে চাই শেখার কোন সংক্ষিপ্ত পথ নাই। ডিজিটাল বাংলাদেশ যে প্রধানমন্ত্রীর একটা স্বপ্ন এটা কিন্তু নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে এদেশের অর্থনীতিতে তারা আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। আমাদের বর্তমান প্রবৃদ্ধি হার ৭.২ অর্জন কিন্তু নারীদের জন্যই সম্ভব হয়েছে। নারী বলে তাদের ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। আমি বলব সব নারীরই আয় করার অধিকার রয়েছে। এই ক্ষেত্রে শুধু যে তারা পুরুষের উপর নির্ভর থাকবে সেটা যুক্তিযুক্ত নয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনি দেশের একজন প্রথম সারির নারী উদ্যেক্তা। আপনার উদ্যেক্তা হওয়ার গল্প বলুন? লুনা শামসুদ্দোহাঃ আমার স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো। এই জন্য ভর্তি হলাম বুয়েটে। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার পরিচিত তেমন কেউ নাই। ওখানে গিয়ে আমার তেমন ভাল লাগেনি। যদিও আমার বন্ধুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক ছিলো, তাই আমি অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়ে মজা পাইনি। নিজের ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিয়ে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। বিষয়টি বেশ মজার ছিলো। পড়াশোনা অবস্থায় আমার বিয়ে হয়ে যায়। আসলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তখন সে চাইলে নিজের ইচ্ছাই অনেক কিছু করতে পারে না। এই জন্য বিসিএস দিতে গিয়েও দেওয়া হয়নি। কারণ আমার কাছে চাকুরী করতে কখনো ভালো লাগেনি। তবুও আমি  ভালো লাগা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়িয়েছি, ব্রিটিশ কাউন্সিলে পড়িয়েছি।  দোহাটেক করার মধ্য দিয়ে আমি ১৯৯২ সালে ব্যবসা শুরু করি। তখন দেশে সবে মাত্র কম্পিউটার এসেছে তাও দেখতে অনেক বড় বড়। আইটি খাতে ব্যবসা করতে যেয়ে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকে। এখানে শুধু সফটওয়ার ডেভেলাপিং করলেই হবে না। কারণ আইটিখাতে কাজ করতে গেলে প্রচুর পরিমানে তথ্য জানা লাগে। এই ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ খুবই জরুরি। ওই সময় আমার আমেরিকা যাওয়ার একটা সুযোগ এলো। আমার কিছু নিজস্ব লোকজন বলল কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট এন্ড নজেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করতে। সেই সময় সিডিরম বাজারে এসেছে মাত্র। নজেল ম্যানেজমেন্টের জায়গা তো অনেক বড়। ওই সময় আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থার কাজ পেয়ে যাই। এই যেমন বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউএইচও মত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট এন্ড নজেল ম্যানেজমেন্ট এর তথ্য সাজিয়ে দেওয়ার কাজ করতাম। প্রথমে আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পাইনি। কারণ দেশে তখন কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত ছিল। তাই বাধ্য হয়ে পরিসংখ্যান, পদার্থবিজ্ঞানের লোকজন দিয়ে শুরু করতে হয়েছে। ওই সময় ডাটা ম্যানেজমেন্ট এর কাজও পেলাম। কীভাবে তথ্যগুলি সাজানো যায়। আমেরিকায় কানাডায় কাজ পেয়েছিলাম। আস্তে আস্তে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এরইমধ্যে টেক বেসিসে দশবছর অতিক্রম করার পর ২০০৪ সালে ইজিপি শুরু করলাম। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ নিলাম। ইজিপির কাজ করার কারণে টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়ে গেল। প্রায় দেড় লাখ টেন্ডার অনলাইনে চলে গেছে, এদের মধ্যে ৮০ হাজার টেন্ডার চুক্তি সম্পাদন হয়ে গেছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অফিসের এসএসএফএর একটা কাজ করলাম। দেশে একের পর এক যখন বড় ধরণের কাজ বাড়তে থাকল আমার প্রতিষ্ঠানের লোকবলও বেড়ে গেলো। বর্তমানে ৩০০ জন প্রকৌশলী আমার কোম্পানিতে কাজ করছে। তারই সূত্রধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের সলিউশনের ( সংশোধনী) কাজ করেছি। যদিও সেনাবাহিনীর প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে কাজটা করতে হয়েছে। তবুও জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ করতে এর চেয়ে বড় কাজ আর কি হতে পারে? এই কাজে এদেশের ছেলেমেয়েরা কাজ করেছে এটাই অনেক আনন্দের। আমরা ফেস, ফিঙ্গার ম্যাচিং এর কাজ করেছি। এই কাজের জন্য আমি স্বীকৃতি পেয়েছি মাইক্রোসফট থেকে। দেশে বাংলাদেশ সরকার ছাড়া অন্য কারও কাজ করিনি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনি কর্মক্ষেত্রে কি কি বাঁধার সম্মূখীন হয়েছেন? লুনা শামসুদ্দোহাঃ আমি জীবনে অনেকবার কাজে ফেইল করেছি। বার বার ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে শক্তি পেয়েছি। যদিও আইটির কাজগুলো এত সহজ না। সফটওয়্যার ডেভেলাপিং করে কাজ শেষ নয়, এই জন্য প্রচুর লিখতে হয়। একাধিকবার পাসপোর্ট প্রজেক্ট ফেইল করেছি। ফেইল থেকেই বড় কাজ করার সামর্থ্য বেড়ে গেছে। নারী বলে আমাকে কেউ সুবিধে দেয়নি, আবার নারী বলে কেউ অসুবিধেও করেনি। সমস্যা সব সময় থাকবে আমি নারী বলে ঘরে বসে থাকবো সেটা ঠিক নয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ সমাজের বিদ্যমান সমস্যাগুলি থেকে নারীরা কীভাবে মুক্তি পেতে পারে এই ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি? লুনা শামসুদ্দোহাঃ নারীদের জন্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আইনে কিন্তু কোন বাঁধা নাই যে নারীরা এগিয়ে যেতে পারবে না। আমি বলতে চাই আপনারা আমাদের প্রগতির পথে দেবেন না। আমাদের বিশেষ কোটা দিবেন না, সহযোগিতা করবেন না, তাই বলে আমাদের বাঁধাও দেবেন না। আমাকে আপনি ঠেকাবেন না। আমাকে না ঠেকালে আমি অধিকার চাইব কেন? আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীকে বাদ দিয়ে দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। এখন তো পাঠাও উবারে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়ে গেছে। নারীদের সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রধান মাধ্যম হল তাদের অধিকারের প্রতি মনোযোগী হতে হবে আরও। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে আপনার পরামর্শ কি? আমাদের দেশে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? লুনা শামসুদ্দোহাঃ কর্মক্ষেত্রে নারীরা একসময় আসতে চাইত না। আমি নারী-পুরুষ কোন ভেদাভেদ দেখি না। আমার অফিসে নারীরা কাজ করে। আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে চাকুরি দিয়েছি। কে কোথায় থেকে এসেছে তা নিয়ে আমি কোন ভেদাভেদ করিনা। কর্মক্ষেত্রে নারীদের এখনও পুরোপুরি স্বাধীনতা আসেনি। অনেক সময় দেখা যায় ৫ টায় অফিস শেষ হলেও অনেক অফিসে অযথা ৮টা পর্যন্ত আটকে রাখা হচ্ছে। কাজ থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কাজ না থাকলে আটকে রাখার প্রবণতা হচ্ছে আমাদের মানসিক সমস্যা। নারীর ঘরে ফেরার পথ এখনও নিরাপদ হয়নি। বাহিরের পরিবেশ সম্পর্কে মালিক পক্ষ অবগত থাকলেও নারীদের প্রতি একটু সহমর্মী হতে দোষ কোথায়? এখনও একটা মেয়ে রাত বারোটার পরে বাসায় ফিরলে সমাজের লোক সেটাকে ভাল চোখে দেখে না। আমি যখন ন্যাশনাল আইডির প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতাম তখন আমাকে প্রায় রাতের পর রাত অফিসে থাকতে হয়েছে। আমার সাথে আমার ছেলেরাও কাজ করেছে। আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য মেয়েদেরকে কাজে আনতে পারছি না। এতে করে তাদের হৃদয়ের সুকুমারবৃত্তিগুলো প্রকাশ পাচ্ছে না। এতে করে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সমাজের বেশির ভাগ মানুষের ধারণা হচ্ছে মেয়েদের শুধু রান্না আর বাচ্চা পালন করতে হবে। এর বাহিরে যাওয়া বোধ হয় পাপ। কিন্তু আমি শিক্ষিত নারীদের সমস্যা বেশি দেখতে পাচ্ছি। আর দেশজুড়ে তো প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা আরও বেশি অবহেলিত। এই প্রবণতা থেকে আমাদের সকল কে বেরিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নারীরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ধরণের নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এই ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে পুরুষের কাছে কি আশা করেন? লুনা শামসুদ্দোহাঃ দেখুন নারীরা প্রতিনিয়তই সমস্যার বালুচরে বসবাস করছে। নারী পুরুষের সহযোগী না হয়ে ব্যবহারের বস্তুতে পরিণত হয়ে পরছে। পুরুষ নারীকে শুধু ভোগের সামগ্রী হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে দেখলে সমাজে নারী নির্যাতন কমে যেতো। শহরে কর্মজীবি নারীদের প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে পরিবহন। সাধারণত শহরের গণপরিবহনগুলোতে নারীরা উঠতে যেতে চায় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতে নারী পুরুষরা একই সাথে যাতায়াত করছে অথচ কোন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশে নারীরা বাসে উঠতে গেলে ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে হয়। নারীদের চিমটি কাটা হয়, শরীরে হাত দেয়। ইভটিজিং করে হেরেজমেন্ট করা হয়। অনেক সময় বাসে মেয়েদেরকে উত্যক্ত করা হয়। পুরুষদের উচিত নারীদের উপর সহনশীল আচরণ করা। এর থেকে রক্ষা পেতে নারীদের জন্য কোন আলাদা গাড়ি থাকা দরকার। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ হল হয় ছেলেদেরকে বলতে হবে ঘরে বসে থাকতে, আর না হয় নারীদের বলতে হবে ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠো। আমার সে রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। আমি ছোটবেলায় সাইকেল চালিয়ে স্কুল গেছি। কিন্তু এখন মেয়েরা কি সাইকেল করে স্কুল যেতে পারবে? সে পরিবেশ কিন্তু বর্তমান সমাজে নেই। সমাজ মেয়েদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তির কারণে নারীরা বেশি অনিরাপদ বোধ করছে। সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে নারীরা প্রতিদিন যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। মেয়েদের সরলতার সুযোগে এই কাজগুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহরহ ঘটছে। এই ব্যাপারে আইন থাকলেও প্রয়োগ সীমিত। ফলে অনেকে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রয়ে যাচ্ছে। এই জন্য সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। পরিশেষে একটা কথায় বলব যে যায় বলুক, আর যে যেই পেশায় কাজ করুক আমরা দিন শেষে কিন্তু নারী। নারীও মানুষ এটা সবার আগে পুরুষের উপলব্ধিতে আনতে হবে। তাহলেই আমাদের পারস্পরিক বৈষম্য দূর হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা রইলো । এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। লুনা শামসুদ্দোহাঃ আপনাকে ও একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পাঠকদেরকেও ধন্যবাদ। 

‘সব বাধা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারী’

দেশের সারা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী। শ্রমবাজারে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী কাজ করছে যা কিনা ভারতের চেয়ে অনেক অংশে বেশি। নারীর ক্ষমতায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। নারী মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। কর্মক্ষেত্রে তারা নিজেদের দক্ষতা ও কৃতিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে পর্বত আরোহণ, খেলাধুলা সর্বক্ষেত্রে নারী তার দক্ষতা-যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে যাচ্ছে, কিন্তু দু:খজনক হলেও এটা সত্যি রাজনৈতিক পেশীশক্তি, সম্পদহীনতা, গৃহাস্থলি কাজের বোঝা আর অনৈতিক-সহিংস নির্যাতনের কারণে নারীর ক্ষমতায়নে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান  অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে একুশে টিভি অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ডিন সাদেকা হালিম। সাক্ষাতাকার নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান। তার কথায় উঠে আসে, নারী ক্ষমতায়, নারী শিক্ষা বিকাশ, নারী আগ্রগতি, অর্থনীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে থাকার কারণসহ বিভিন্ন বিষয়। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো একুশে টিভি অনলাইন : নারী ক্ষমতায়নে মূল বাধা কোথায় ? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: বর্তমানে অনেক বড় বড় ক্ষমতায়নের জায়গায় নারী নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পীকার নারী, বুয়েট ভিসি নারী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রো-ভিসি হচ্ছেন নারী। র‌্যাবের বড় পদে নারী। সেনাবাহিনীর বড় পদে নারী স্থান দখল করে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সার্বিক বিষয় বিবেচনা করলে নারী ক্ষমতায়ন পুরুষের তুলনায় অনেক কম। কিছু কারণে নারী ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সারা বছর নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো বিষয়গুলো দেখে পরিবারগুলো শঙ্কিত। এসবের ভয়ে অনেক অভিভাবক তার উচ্চশিক্ষিত মেয়েটিকে কর্মক্ষেত্রে দেওয়ার আগেই বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। এসবই সমাজের অস্থিরতার প্রতিফলন। এদিকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীকে উপাজর্নের জন্যে বাইরে যেতে দিলেও তার উপর ঘরের অমূল্যায়িত কাজ চাপিয়ে রাখছে। ফলে নারী তার সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। আর নারীদের সস্পত্তিতে অধিকার না থাকায় পরিবারে তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হচ্ছে। একুশে টিভি অনলাইন: বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি হলেও মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সমাজ ব্যর্থ। এর মূল কারণ কি ? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সমাজে আমাদের নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। উচ্চমানের কর্মসংস্থানে নারীরা পিছিয়ে আছে। কিন্তু মধ্যম মানের কর্মসংস্থানে নারীর অনেক অগ্রগতি হয়েছে। উচ্চ মানের কর্মসংস্থানে যেতে হলে নারী প্রচেষ্টার পাশাপাশি পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। সমাজের সব পেশায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য প্রযুক্তি, কৃষি শিক্ষকতায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মানুষ মনে করে নারী অনেক পিছিয়ে আছে। ঢালাওভাবে এমন মন্তব্য করা ঠিক না। নারীর মেধা ও কর্ম প্রচেষ্টাকে মূলনায় করে মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একুশে টিভি অনলাইন: আপনি সমাজের বড় একটি অবস্থানে থেকে নারীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এপর্যন্ত আসতে কী ধরনের বাধা ডিঙিয়ে আসতে হয়েছে আপনাকে ? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: আমার বাবা ফজলুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। বাবার স্বপ্ন সত্যি করে পড়াশোনা শেষে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। দেশের প্রথম নারী তথ্য কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি সফলভাবে। ১৯৭০সালে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ প্রতিষ্ঠার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম নারী ডিন হচ্ছে আমি। আমার স্বপ্নগুলো যেন  খুব সহজে পূরণ হয়েছে এমনটি নয়। আমার পেছনে আমার পরিবার ও সঠিক পরিবেশ ছিল বলেই এতটা পথ আসা সম্ভব হয়েছে। সমাজ নারীদের এখনও সেকেন্ড পারসন হিসেবে দেখে। নারীরা যোগ্য হলেও উচ্চতর পদে যেতে তাঁদের পেরোতে হয় পাহাড়সম বাধা। নানা অন্তরায়, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই এ পর্যায়ে এসেছি। আমি আমার অর্জনকে দেখি নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক দিক হিসেবে। একুশে টিভি অনলাইন: নারী শিক্ষায় হার দ্রুত বাড়াতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: নারী শিক্ষা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য আর বাড়তি পদক্ষেপ নিতে হবে বলে আমি মনে করি না। বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনা নারী শিক্ষায় আলোর দিশারী হয়ে কাজ করছেন। শিক্ষাখাতে নারীর অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে অনার্স পযর্ন্ত নারী শিক্ষার হার আশানুরূপ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একুশে টিভি অনলাইন: স্বাধীনতা চার যুগ পরে নারীর অগ্রগতি কতটা হয়েছে বলে মনে করেন? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: সহস্র সহস্র নারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, শিক্ষা,অফিস-আদালত সর্বত্র মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে পেশাজীবী এক নারীগোষ্ঠী তৈরি করেছেন বাংলাদেশে। ব্যাংক, কলকারখানায় আজ ৬২ শতাংশ নারী কাজ করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও বেশি। কূটনৈতিক মিশনে এর মধ্যেই বেশ কয়েকজন নারী নিযুক্ত হয়েছেন। এসব পেশায় আরও নারী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনেও বাংলাদেশের নারীরা কাজ করছেন। আমি মনে করি নারীর অনেকটায় এগিয়েছে। একুশে টিভি অনলাইন: অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা এখনও অনেক পিছিয়ে।  এর কারণ কি? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: অর্থনীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও নারী অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নারীর ক্ষমতায় ও অর্থনীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হলেও এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে সমাজ। এখনও  কোন জমি ক্রয় বিক্রয় থেকে শুরু করে বড় বড় অর্থনীতি সিদ্ধান্ত পুরুষ গ্রহণ করে। কিছু নারীও মনে করছে এ বিষয়গুলো অনেক জটিল বিষয়। এদিনে আমাদের না যাওয়াই ভাল। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। একুশে টিভি অনলাইন : নারীরা এখন মজুরি বৈষমের শিকার এর কারণ কি? অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম: নারীরা নিজেদের প্রচেষ্টায় অনেকটা এগিয়েছে। সরকার নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্য নিরসনে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মাধ্যমে পোষাক শিল্পসহ কিছুটা হলেও মজুরি বৈষম্য নিরসন হয়েছে। তবে গ্রাম এলাকায় এখনও কিছু বৈষম্য রয়েছে। একজন নারী রোজ প্রায় ৮ ঘন্টা গৃহাস্থলির সেবামূলক কাজে ব্যয় করেন। যেখানে পুরুষের ব্যয় হয় মাত্র দেড় ঘন্টা। যার পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নেই। ফলে নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। নারীর ঘরের কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন খুবই দরকার। একুশে টিভি অনলাইন : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম : একুশে পরিবারের প্রতি শুভ কামনা রইল। ‘‘অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী ডিন। বাংলাদেশের প্রথম নারী তথ্য কমিশনার। মা-বাবা দুজনই শিক্ষক। বাবা অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। মা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। সাদেকা হালিমের তিন বোন, সবাই আছেন শিক্ষকতা পেশায়। একমাত্র ছোট ভাই ব্যাংকার হলেও তাঁর স্ত্রী শিক্ষক। তাঁর পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী ইউনিয়নে। সাদেকা হালিম ১৯৭৮ সালে ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন প্রথম বিভাগ পেয়ে। ১৯৮০ সালে হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতেও প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন। ১৯৮৩-৮৪ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। ১৯৮৮ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিজ বিভাগে। পরবর্তী সময় কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিতে। সেখান থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি নেন তিনি। এরপর কমনওয়েলথ স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে পোস্ট-ডক্টরেট করেন যুক্তরাজ্যের বাথ ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য কমিশনে প্রথম নারী তথ্য কমিশনার পদে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম নাজমুল করিম গোল্ড মেডেলিস্ট সাদেকা হালিম ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিন মেয়াদে শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও তিনবার সিনেট সদস্য ছিলেন। এবারও শিক্ষক সমিতির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অধ্যাপক সাদেকা হালিম জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি ২০০৯-এর ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের কমিটিতে অন্যতম সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে সাদেকা হালিম অতিথি অধ্যাপক হিসেবে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার বকু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর লেখা প্রায় ৫০টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।’’ / এআর /                                    

‘কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে দেশের জন্য মঙ্গল’

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হচ্ছে। দিবসটি যখন পালন করা হচ্ছে ঠিক সেই সময় আমাদের সমাজ বা পরিবারে নারীরা এখনও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গণ-পরিবহনসহ চলাফেরার সময় তাদেরকে নানাভাবে হেনস্ত করা হয়। এসব বিষয় নিয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন। স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত রিপন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের সমাজে চলা-ফেরাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের হেনস্তার শিকার হয়ে হয়। পাশাপাশি এখনও নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? ড. মাহবুবা নাসরীন: নারীকে হেনস্তা করার কালচারটা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সমাজে যে নারী পুরুষের ব্যবধান এটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আমি এটা বলব না যে, আমাদের মানষিকতার পরিবর্তন হয়নি, কোথাও হয়েছে আবার কোথাও হয়নি। সেক্ষেত্রে পরিবর্তনটা সমানতালে হওয়া দরকার। সব জায়গায় নারী-পুরুষ সমান এ কথা বলি আমরা, উন্নয়নের কথা বলি কিন্তু সত্যিকার অর্থে যদি আমরা দেখি, অবশ্যই তাদের অবদান আছে বলেই উন্নয়ন হচ্ছে। তবে এই উন্নয়নটাকে একইভাবে সবাই উপভোগ করতে পারছেন না। অথবা একইভাবে বিষয়টাকে মেনে নিতে পারছেন না। সমাজে সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় নারী-পুরুষের ব্যবধানটাকে আমরা আগের মতোই দেখতে থাকি। এজন্যই এই অবস্থার তৈরি হয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য জন্য কী শুধু সমাজ ব্যবস্থাটাই দায়ী? ড. মাহবুবা নাসরীন: আমাদের দেশ শ্রেণীভিত্তিক সমাজ। দেখা যায়, সেখানে ধনীদের মধ্যে সহিংসতাটা আছে কিন্তু এর পরিমাণ খুব বেশি না। তারা ওই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তবে মধ্যবিত্ত সমাজের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, সেখানে এটা খুব বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা সমাজের দিকে তাকিয়ে সেখানে সহিংসতার কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না। আর যদি কোনো নিম্নবিত্ত পরিবার হয়, যাদের খেটে খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, পুরুষের টাকায় সংসার চলে সেখানে তো প্রতিবাদের কোনো ভাষাই থাকে না নারীদের। আবার তারা প্রতিবাদ করলেও সেটা শোনা যায় না। আমাদের দেশে নীতিগতভাবে নীতিমালার পরিবর্তন হয়েছে। আন্তর্জাতিক দলিলগুলোকে আমরা স্বীকৃতি দেই, স্বীকার করি, স্বাক্ষর করে সেগুলো নিজেদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছি। কিন্তু সহিংসতার অবসান ঘটাতে পারিনি। এ জন্য সমাজ দায় এড়াতে পারে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: পুরুষ শাসিত সমাজে নারীকে নিয়ে খুব বেশি ভাবা হয় না, এটা কিভাবে দেখছেন? ড. মাহবুবা নাসরীন: আমরা অর্জনের কথা বলি। শিক্ষাক্ষেত্রে, অর্থনীতিতে, পরিবার গঠনে নারীর যে অবদান রয়েছে সেটা আমাদের দেখতে হবে। একইসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার কথা, সামাজিকিকরণের বিষয়টা সমাজকে দেখতে হবে। যেটা এখনও তৈরি হয়নি। তবে এক্ষেত্রে শুধু পুরুষের দোষ দিলে হবে না। নারীরাও দায় এড়াতে পারে না। তারা কিন্তু অন্য নারীর সাফল্য ভালভাবে দেখতে পারে না। অথবা আমরা যেটা বলি যে, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। সেক্ষেত্রে নারীরা পিতৃতান্ত্রিক মানষিকতা বহন করে অনেক সময়। আমাদের সমাজে যেনো কোথাও একটা বাঁধ দেওয়া আছে। আমরা যখন সমাজে জেন্ডারের কথা, সরকারি-বেসরকারিভাবে তখন সাধারণ সাধারণ উদাহরণ দেওয়া হয়। আমাদের এখানে লিঙ্গবিভাজন আছে। রান্না থেকে শুরু করে সব কাজই নারী-পুরুষ ভাগাভাগ করা যায়। তখন একজন হয়তো বলে উঠবে আপনি চা বানালে যতটা মজা হবে সেটা স্যার বানালে অতটা মজা হবে না। এই যে ছোট ছোট কথা, এর মধ্য দিয়েও কিন্তু অনেক কিছু বোঝাতে চাওয়া হয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারী এখনও গণপরিবহনে নিরাপদ নয়, একটু সুযোগ পেলেই তারা সহিংসতার (ইভটিজিং) পথ বেছে নেয়। এ বিষয়ে আপনার কাছে জানতে চাইব। ড. মাহবুবা নাসরীন: নারীকে যখন রাস্তা-ঘাটে উত্যক্ত বা হয়রানি করা হয় সেটা কিন্তু কোনো নারী করছে না, এটা পুরুষরাই করছে। গায়ে হাত দেওয়া, ধাক্কা দেওয়া, পিছন থেকে জামা কেটে দেওয়া হয় ট্রান্সপোর্টে পিছনের সিট থেকে। মনে রাখতে হবে, নারীরা তাদের প্রয়োজনের তাগিদেই কিন্তু যানবাহনে উঠে। সেখানে উঠেই বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এজন্য আমাদের অনেক বেশি গণপরিবহণ করা দরকার। নারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা না করে আরো বেশি গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হলে এই প্রবণতা কমতে পারে। আবার রিকশাসহ সব জায়গাতেই নারীদের হয়রানি করা হয়। পরিবেশ সচেতন না হওয়ায় নারীরা হেঁটে অফিসে যেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে অনেক বেশি গণপরিবহন দরকার। যেখানে নারী উঠছে না পুরুষ উঠছে সেটা কেউ দেখবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, নারী যত বেশি কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান হবে তত দেশের জন্য, অর্থনীতির জন্য ভালো। তাছাড়া মূল বিষয়টা হলো আমাদের সামাজিক সচেতনতা বেশি জরুরি। সামাজিক সম্পর্ক জালকে আরো শক্ত হতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীর স্বাধীন চলাফেরার স্বাধীনতায় সামাজিক কি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? ড. মাহবুবা নাসরীন: আগে বয়স্করা সমাজ শাসন করতেন। তরুণরা তাদের এলাকার কোনো নারীকে কিছু বলতেন না। এ নিয়ে অনেক গল্প আছে। তারা নিজের এলাকার মেয়েদের উত্যক্ত করত না। এখন নিজের মহল্লার মেয়েদেরও উত্যক্ত করে তরুণরা। তাই দেখতে হবে শহর বা গ্রামে কে কোথা থেকে আসছে এটা বিষয় না, মূল বিষয় একটা বলয় তৈরি করতে হবে আমাদের। যে বলয়ে তরুণরা সমাজকে প্রোটেকশন দিবে। এজন্য তাদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করার কর্মসূচি নিতে হবে। সেটা সমাজে কম আছে। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে এই ভাবে যে, আমরা নারী-পুরুষ সবাই বন্ধু। এটা তরুণদের ভাল করে তাদের বোঝাতে হবে। সহিংসতার মূল কারণ হলো, আমরা সমাজে নারী-পুরুষের ব্যবধানটাকে বোধগম্য করতে পারিনি। নারী যে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, সমাজে অবদান রাখছে সেটা দেখা হচ্ছে না। নারীকে দেখা হচ্ছে নারী হিসেবে। আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীকে অফিসে এখনও সহকর্মীর পরিবর্তে নারী হিসেবে গণ্য করা হয়। কিভাবে দেখছেন বিষয়টিকে? ড. মাহবুবা নাসরীন: নারী-পুরুষকে অফিস-আদালতে আলাদাভাবে দেখা হলে এটা সত্যি দু:খজনক। এটা ভাষাগতভাবে পরিবর্তন করতে হবে। অফিসে আমরা নারীর ক্ষেত্রে যে শব্দ চয়ন করি সেক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়নি। ভাষাগত দিকগুলো আমাদের ভালোভাবে দেখতে হবে। অনেক সময় একজন নারীকে নারী সাংবাদিক বলা হয় এটা প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বলা হয়। তবে অনেক সময় যখন কেউ প্রশ্ন করে আপনাদের অফিসে কতজন স্টাফ আছে, উত্তরে আমরা বলি এখানে তিনজন আছেন। তাদের মধ্যে দুইজন পুরুষ কর্মী ও একজন নারী। এখানে নারী কর্মী বলা হয় না। তাহলে দেখা যায় সেখানে, নারীর ক্ষেত্রে অন্য অর্থ দাঁড়ায়, আমরা এখনও নারীকে সহকর্মী হিসেবে নিতে পারিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, করপোরেট সেক্টরে আমরা সবাই সহকর্মী। আমাদের দেশের মডেল শেখ হাসিনা নারী প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার আছেন নারী। আবার অফিস আদালতে যখন নারীরা প্রধান হয়ে আসবে তখন তাদেরকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এখানে আবার পুরুষকে দূরে ঠেলে দিলে হবে না। এখন আমাদের দেশে একটা সম্বোধন হয়েছে নারীদের স্যার বলা হয়। আমি মনে করিনা ওই সম্বোধনের মধ্যে কোনো কিছু আছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় না। আমরা যদি সম্মানই না করতে পারি তাহলে সম্বোধনের কোনো মানে হয় না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীর ক্ষেত্রে এখনও নেতিবাচক কথা বলা হয়, এটাকে কিভাবে দেখছে? ড. মাহবুবা নাসরীন: হ্যা অনেক সময় অফিসে নারীদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয় যে, নারী দেখে উন্নতি হয়েছে। আমরাতো দেখি নারীরা অনেক পরিশ্রম করে দেখেই তাদের উন্নতি হয়। পরিশ্রম করলে অবশ্যই যে কেউ উন্নতি করতে পারবে। নারীর যে বিপত্তির জায়গা আছে সেগুলো বুঝতে হবে আবার নারী-পুরুষের বন্ধুত্বের জায়গাগুলোও বুঝতে হবে। এভাবেই আসলে সমাজ থেকে বৈষম্য কমতে পারে, নেতিবাচক কথা চলে যাবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারী ইভটিজিংয়ের শিকার হলে, আমরা দর্শক হয়ে দেখি আবার ইভটিজিং-এ শিকার নারী প্রতিবাদ করতে চায় না, এর কারণ কি? ড. মাহবুবা নাসরীন: আগে নারীর প্রতি নেতিবাচক আচরণকে ইভটিজিং বললেও এখন আমরা সহিংসতা বলি। নারীর প্রতি সহিংসতারোধে এখন ম্যাজিস্টেটের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো সহিংসতার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া হয় প্রশাসনিকভাবে। নারীর ক্ষেত্রেও একই কথা, তাদের প্রতিবাদ করতে হবে। রাস্তা-ঘাটে বা দশজনের মধ্যে চলাচল করার সময় কেউ সহিংসতার চেষ্টা করলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। প্রতিবাদ করলে দশজনের মধ্য থেকে চারজন এগিয়ে আসবে। বসে থাকলে আসবে না। তবে এক্ষেত্রে তার নিজেরও আত্নরক্ষামূলক কিছু জানতে হবে, প্রতিবাদের ভাষা জানতে হবে। এটা এখনও ব্যাপকভাবে তৈরি হয়নি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সামজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিনিয়তই ঘটছে। এটাকে কিভাবে দেখছেন আপনি? ড. মাহবুবা নাসরীন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কঠিনভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নাই। সরকারিভাবে আরো কঠোর হতে হবে। সরকারিভাবে ভার্চুয়াল জগতের নিয়ন্ত্রণ রেখে যারা নেতিবাচক পোস্ট দেয় তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের শাস্তি দিয়ে সেটি আবার ভার্চুয়াল জগতেই প্রকাশ করতে হবে।   একজন নারীকে অত্যাচার করে সেটার ভিডিও করে ছেড়ে দিল, আমরা সেটা দেখছি। কিন্তু এটা রক্ষা করার দায়িত্বটা কি আমার ছিল না। যারা এই ধরনের ভিডিও পোস্ট দেয় তাদের ধরা খুব বেশি কঠিন না। তাদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আবার বেশি বেশি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে যে এই ধরনের ছবি পোস্ট দেওয়া যাবে না। এটা সবাইকে মানতে হবে, সবাইকে জানাতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: পরিবারে নারীর অসামান্য অবদান থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর মূল্যায়ন নেই। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। ড. মাহবুবা নাসরীন: আমরা যদি নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি তাহলে তার মধ্যে একটা হলো নারীর সীদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। কিন্তু এটা মানা হয় না। তবে কর্মজীবী নারী যারা আছেন তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা আছে। যারা প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এখনও আসেনি। পরিবারে দুজন মিলে মতামত নিতে হবে, শুধু যে নারীর মতামত বা পুরুষের মতামত নিতে হবে এটা কিন্তু না। মতামতের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে ভাগাভাগি করতে। আপনি যদি চিন্তা করেন বিভিন্ন জায়গাতে নারী প্রধান থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে ধীরে ধীরে এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি, কারণ নারীর ক্ষমতায়নের সূচক নিয়ে এখন দেশে অনেক কাজ হচ্ছে। তবে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন এখনও হয়নি। জমি কেনা বা বিক্রি করা, সন্তানের ভবিষৎ, তার লেখা পড়া ইত্যাদির বিষয়ে আলোচনা করে হয় না। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও বাধা আছে। এটা নিয়ে কাজ হলেও বড় পরিবর্তন আসেনি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: পরিবারে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে আমরা প্রথমে চিন্তা করি তার বিয়ে দিতে হবে। তার জন্য পজেটিভ চিন্তা করা হয় না। এ বিষয়ে আপনার কাছে জানতে চাইব। ড. মাহবুবা নাসরীন: এখন আমাদের মেয়ে জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার থেকে তার জন্য চিন্তা করা হয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা হয়। কারণ তাকে মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে হবে। এখন নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক এবং বাল্য বিয়ে নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয় কাজ করছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন আসছে না। মন্ত্রনালয়েরও প্রশ্ন আছে কেনো কাজ হচ্ছে না। হয়ত যারা কাজ করছে তারা ওইভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। তবে অনেক মনিটরিং হচ্ছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বাল্য বিয়ে হলে প্রশাসন যেয়ে সেই বিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অর্থনীতিতে নারীর অবদান এখনও জিডিপির বাইরে। অফিস শেষে এখনও নারীকে গৃহের কাজ করতে হচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মতামত। ড. মাহবুবা নাসরীন: জিডিপিতে নারীর গৃহভিত্তিক কাজগুলো ধরা হয় না। তবে টেকসই উন্নয়নে এই কাজগুলো ধরা হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নারী যে কাজগুলো গৃহে করে সেই কাজ অন্য কেউ করলে তাকে কত টাকা দিতে হতো। এই কাজগুলো জিডিপিতে অন্তভূক্ত করা দরকার। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: মূল্যবান সময় আমাদের দেওয়ায় আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং নারী দিবসের শুভেচ্ছা। ড. মাহবুবা নাসরীন: একুশে পরিবারকেও অনেক ধন্যবাদ। আর / এআর

কর্মক্ষম নারীর ৬৪ শতাংশ-ই বেকার

নারীর কাজের আর্থিক মূল্য চিহ্নিত হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর যুক্তিসঙ্গত ইচ্ছা, স্বপ্ন ও মত প্রকাশের স্বীকৃতি পদদলিত হয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ নারী পুরুষের গভীর ব্যবধান তৈরি করেছে, তৈরি করেছে বৈষম্য। নারীর প্রতি বৈষম্য বলতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে যে কোনো পার্থক্য, বঞ্চনা অথবা বিধিনিষেধকে বোঝায়। এর ফলে নারীকে  ‍পুরুষের তুলনায় অধ:স্তন বা ছোট করে দেখা হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক, পারিবারিক সবক্ষেত্রে নারীর অধিকার লঙ্ঘন করা হয়। অথচ মানব সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে যুগে যুগে নারী যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছেন, তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতেও নারাজ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এসব বিষয় নিয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পক্ষে স্বাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত রিপন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অর্থনীতিতে নারীর অবদান কতটুকু? নাজনীন আহমেদ: আমরা সবাই জনসংখ্যার দিক দিয়ে জানি, দেশে নারী-পুরুষ সমানে সমান। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে কর্মক্ষম নারী যাদের বয়স ১৫ থেকে বেশি তাদের মধ্য থেকে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী শ্রম বাজারে আছেন। বাকিরা শ্রমবাজারে নাই। তার মানে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ কর্মক্ষম নারীর ৬৪ শতাংশই শ্রমবাজারে নেই। শিশু এবং বৃদ্ধদের বাদ দিয়ে সম্পদের এই বিরাট একটা অংশের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে ৮২ শতাংশ কর্মক্ষম পুরুষ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত আছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীকে গৃহকর্মী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এখনও। এটাকে কিভাবে দেখছেন আপনি? নাজনীন আহমেদ: দেশের বেশিরভাগ নারী-ই গৃহকর্মে নিযুক্ত আছেন। গৃহকর্মে নিযুক্ত থাকা আর অর্থনীতিতে অবদান রাখা এক কথা নয়। তারা পারিবারিক সামাজিকসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। নারীরা শুধু গৃহকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন কেন? এখানে পুরুষদেরও এ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এছাড়া সংসার তো নারী-পুরুষ দুজনের, দুজনকেই কাজ ভাগাভাগি করে নিতে হবে। কারণ গৃহের কাজকে আমরা বলি ‘আনপেইড ওয়ার্ক’। এটার জন্য কেউ কাউকে অর্থ দেয় না। তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই ঘরের এবং বাইরের কাজ করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সমাজে নারীর কর্মকাণ্ড নাই, যেখানে একজন পুরুষের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা শক্তিশালি। এর কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: নারীরা কোনোভাবে অর্থ পায় না, আর অর্থ না পেলে সত্যিকার অর্থে কেউ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে না। এছাড়া নানা কারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। নারীর একদিকে অর্থ নাই, অন্যদিকে তার সম্পদ নাই। এই দুই কারণে নারীর ভিত্তিটাই দুর্বল। আবার ধর্মীয়ভাবেও নারীকে সম্পদের দিক থেকে সমানাধিকার দেওয়া হয়নি। সম্পদে যেহেতু নারীর সমানাধিকার নেই তাই তার ক্ষমতা কোথা থেকে আসবে? হয় তার সম্পদ থাকবে, না হয় তার রেগুলার আয় থাকতে হবে। তার সম্পদও নাই আবার আয়ও নাই। সুতরাং তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নাই। ফলে নারীর ভিত্তিটা হয়েছে অনেক দুর্বল। অপরদিকে কর্মক্ষম পুরুষের ৮২ ভাগই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালি। তারা শ্রম বাজারে আছে। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা মজবুত। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: গৃহের কাজ কি শুধু নারীরা করবে, নাকি দুজনের মতামতের ভিত্তিতে করা উচিত? নাজনীন আহমেদ: সমাজে পুরুষের সঙ্গে নারীর তুলনা করা যাবে না। মূল কথা হলো নারী-পুরুষ যাই হোক তাদের কর্মক্ষমের মধ্যে থাকা উচিত। এছাড়া আনপেইড ফ্যামেলি ওয়ার্কগুলো সমানভাবে করতে হবে। এক্ষেত্রে একজন পুরুষও গৃহের সব কাজ করতে পারেন নারীর মতামতের ভিত্তিতে। আবার পুরুষকে যদি বলি গৃহসহ আপনাকে বাইরের কাজ করতে হবে। তাহলে পুরুষরা ভাববে তাদের একটা বন্ধনের মধ্যে রাখতে চাচ্ছি আমরা। আমরা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলি কিন্তু আমরা এটা ভুলে যায় যে ছেলেদেরকেও একটা বন্ধনের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। আবার পুরুষকে বলছি তোমাকে উপার্জন করতেই হবে। আর মেয়েকে বলছি তোমাকে উপার্জন না করলেও চলবে, বাসায় থাকলেও চলবে। এই দু’টিই ঠিক না। পুরুষেরও স্বাধীনতা থাকতে হবে। সে চাইলে পুরো ঘরের কাজটা নিতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল হলো নারী-পুরুষ আলোচনা, সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহকর্ম আর বাইরের কাজের সিদ্ধান্ত নেবে। নারীদের যারা কর্মক্ষম তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। তারা দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন, যদি তাদের কাজে লাগানো যায়। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শ্রমবাজারে যেসব নারী এসেছেন তাদের কৃষিতে অবদান কেমন? নাজনীন আহমেদ: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে খুব কম সংখ্যেই শ্রমবাজারে এসে যুক্ত হয়েছেন। শ্রমবাজারে যেসব নারী এসেছেন তাদের ৬৫ শতাংশের বেশি কৃষিতে আছেন। কৃষিতে তারা এমনভাবে আছেন, সেখানে যে তারা একটা ডায়নামিক পজিশনে আছেন, তা কিন্তু না। কৃষিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা নিজের জমি বা অন্যের জমিতে কাজ করছে। একটা কৃষি খামার করা বা এ ধরণের কাজ কিন্তু খুবই কম। সব মিলিয়ে আমরা দেখি ম্যানফ্যাচারিং সেক্টর বা ট্রেডিং-এ নারীরা কম আসছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের ফরমাল জবে না আসার কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: এটা সত্য যে, নারীরা ফরমাল জবে খুব কম আসছেন। আবার ফরমাল জব যদি বলি এর মধ্যে বেশির ভাগই আছেন গার্মেন্টস সেক্টরে। সরকারি চাকরি যেমন ডাক্টারসহ অন্যান্য জবে মোট ৫ শতাংশ নারী আছেন। এখানে সচেতনতার অভাব রয়েছে বলি মনে করি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারী কর্মক্ষেত্রে আসতে চায় না। এর কাণটা যদি বলেন? নাজনীন আহমেদ: এখন এটা ঠিক উচ্চ শিক্ষিত না হয়েও কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে। ৮ম বা১০ম শ্রেণী পর্যন্ত যারা পড়েছেন তারা কর্মক্ষেত্রে নাই। এর মধ্যে অনেকে আছেন যারা কর্মক্ষেত্রে আসতে চান। কিন্তু তারপরও তারা আসতে পারছে না। তাদের মধ্যে জেন্ডার রুল এমনভাবে ঢুকে গেছে যে আমি বাইরের কাজ করব না। গৃহাস্থলির কাজেই থাকবে। কেউ যদি সব সুযোগ পেয়েও গৃহে থাকে আমি মনে করি এটা তার চয়েজ। তবে এই চয়েজটা শুধু নারীর না একজন পুরষেরও থাকা উচিত। আমাদের সমাজে কিছু নারী অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হতে চান সেক্ষেত্রে তারা সুযোগ পান না। আরেকটা হলো শিক্ষার সুযোগ পায় কিন্তু শিক্ষার সুযোগ নেওয়ার পর তারা উচ্চ শিক্ষায় যেতে পারেন না। আরেকটি অংশ আছে যারা শিক্ষা যতটুকু করেছে, কিন্তু শিক্ষাটাকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যেতে পারছেন বা চাচ্ছেন না। এ জন্য দরকার সচেতন করে তোলা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী ঝরে পড়ে, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় এখনও নারীরা পিছিয়ে। এ বিষয়ে আপনার মাতমত জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: নারীদের আমরা শিক্ষিত করছি। এন্ট্রি পয়েন্টে আমরা শতভাগ মেয়ে, শতভাগ ছেলে স্কুলে ভর্তি করায়। প্রথম পর্যায়ে আমরা নারী-পুরুষ সমানে সমান স্কুলে ভর্তি হতে দেখি। এরপর যত উপর ক্লাসে উঠতে থাকে তত তারা ঝরে পড়ে। আবার নারীদের জন্য আমরা বৃত্তির ব্যবস্থা করছি। কলেজ লেবেল পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দিচ্ছি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে যেতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে না। এক্ষেত্রে তারা স্থানীয় পর্যায়ে যখন স্কুলে যায় তখন নানা ভাবে ইভজটিজিং-এর শিকার হন। আবার পরিবারকভাবে সমান সুযোগ দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে পরিবারকে সমান সুযোগবান্ধর হতে হবে। ছেলেকে যেমন সাপোর্ট দিবে মেয়েকেও শিক্ষায় সুযোগ দিতে হবে। তবে এখন সচেতনতা এসেছে স্কুল পর্যায়ে তবে কলেজ পর্যায়ে গেলে ইভটিজিং-এর সম্বাবনা থাকে। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার জন্য ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটা হলে নারীদের আমরা উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারব। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: লেখাপড়া জানা মেয়ে কর্মক্ষেত্রে আসতে চায় না। এর কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: শিক্ষা নিয়েছেন এরপরও নারীরা কর্মক্ষেত্রে আসতে চাই না। এ জন্য তাদের সচেতন করতে হবে। এটা হতে হবে বইপত্রের মাধ্যমে, পাড়া ক্লাবের মাধ্যমে, গণমাধ্যমের মাধ্য, সেখানে জেন্ডার বিষয়ে বোঝোতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ ঘরের এবং বাইরের কাজ করবেন। সেইটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আসতে হবে। যারা ডাক্টার বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন, বিশ্বিবিদ্যালয়গুলোতে যারা পড়বেন এখানে বিরাট একটা বিনিয়োগ বাবা-মার এবং সরকারের। এরপরও যদি তারা কর্মক্ষেত্রে না আসে তাহলে তাদের ফিছনে যে টাকা খরচ হয়েছে সেগুলো ফেরত নেওয়া উচিত। কারণ একটা মেয়ে ডাক্টার হওয়ার জন্য সুযোগ-সুবিধা নিল কিন্তু কর্মক্ষেত্রে আসলো না, ওখানে একটা ছেলে হলে সে ভালো সেবা দিতে পারত। আমাদের এখানে অনেককে ডাক্টারি পড়ার সুযোগ দিতে পারছিনা, এরপরও তারা সেই সুযোগ নেওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে আসেনা। দেশে ডাক্টার নাই অনেক অনেক রোগি আছে। আগেই ঘোষণা দেওয়া উচিত যে, যারা ডাক্টারি পড়বে তাদের কমপক্ষে ৫ বছর বা ১০ বছর সামজে সেবা দিতে হবে। এই উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম সিট থাকে, কম্পিটিশন বেশি থাকে। এই ধরণের পড়াশেনার পরও যারা সেবা দেন না তারা সমাজের খারাপ উদাহারণ। কেউ যদি মনে করেন আমি কর্মক্ষেত্রে অতোদুর যাব না, তাহলে তাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। অতো যাওয়ার দরকতার নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সংসারে আসার দরকার নেই। সংসারের জন্য উচ্চ ডিগ্রি লাগে না। আবার মেয়েরা গার্হস্থ কলেজে পড়বে ছেলেরা পড়বে কৃষি শিক্ষা নিয়ে। এই বিভাজন কেন সমাজে? ছেলে গার্হস্থ কলেজে পড়তে পারবে আবার মেয়েও কৃষি নিয়ে পড়তে পারবে। আমাদের বিভাজনের এই মানুষিকতা থেকে বের হতে হবে। আবার ছেলেরা রান্না করতে পারে না, ঘর মোছার কাজ করতে পারেনা, কেনো। এটা হতে পারেনা এটা তাকে জানতে হবে। আবার মেয়েকেও বাজারে যেতে হবে, ব্যাংকে যেতে হবে, রান্না করতে হবে। ছেলেরা ডিম ভাজতে পারেনা এটা বিদেশিরা শুনলে হাসবে। দেশের ছেলেরা গর্ব করে বলে আমি এটা করতে পারিনা। মধ্য আয়ের দেশের ছেলে একটা ডিম ভাজতে পারে না মানা যায় না। আবার মেয়েদের পরিবার সামলিয়ে চাকরি করতে হবে, ছেলেদের ক্ষেত্রে কেন নয়। সে আরামে অফিসে যাবে এটা হতে পারেনা। পরিবার দুজনের। নারীকে বলা হচ্ছে পরিবার সামলায়ে চাকরি করতে পারলে কর, তাকে একটা বোঝা দেওয়া হচ্ছে। এর চেয়ে ঘরে বসে থাকা অনেক ভাল। এক্ষেত্রে অবশ্যই সমঝোতা থাকতে হবে নারী-পুরুষের। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা একেবারেই কম। এর কারণটা যদি বলেন? নাজনীন আহমেদ: ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে মেয়েকে কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। খুব অল্প পরিসরে বাবার ব্যবসার একটা অংশের ডিরেক্টর রাখা হয় মেয়েকে। কিন্তু একটা নতুন একটা ব্যবসায় রিস্ক নিয়ে ছেলেকে দেওয়া হয়, মেয়েকে কিন্তু দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়ের চেয়ে মেয়েটা যোগ্য ছিল কিন্তু তাকে দেওয়া হয়নি। কারণ সে মেয়ে তাকে বিয়ে দেওয়া হবে অন্যের ঘরে। তাই এটা দেওয়া হয় না। এখনও আমাদের সমাজে এই প্রথার প্রচলন আছে যে, বাবা অর্থ উপার্জন করবে আর মা সন্তানের লালন-পালন করবেন। কিন্তু এটা কেনো বাবা-মা দুজনের আদর স্নেহ থাকতে হবে সন্তানের লালন-পালনে। এক্ষেত্রে মাও অর্থ দেবেন, স্নেহ দেবে, ভালবাসা দেবে। এজন্য অবশ্যই ডে-কেয়ার সেন্টার করা দরকার। বেসকারি খাতে আরও বেশি বেশি ডে-কেয়ার সেন্টার হচ্ছে। এটা হলে একজন মা সন্তানের লালন-পালন করতে পারেন এবং অর্থ উপার্জনও করতে পারেন। ডে-কেয়ার সুযোগটা খুব বেশি জরুরি।  এ ব্যাপারে প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের বিভিন্নভাবে সমাজ বা চলার পথে ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: আমাদের অবশ্যই নারীদের সম্মান করতে হবে। এখনও নারীদের ইভটিজিং-এর শিকার হতে হয়। হাটে-ঘাটে যদি নারী নিরাপত্তা না পায় তাহলে কেনো সে যাবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আর সমাজে জেন্ডারের ভিত্তিতে সমতা আনতে হবে। সুযোগের সমতা যদি আসে তাহলে নারী-পুরুষের সমতা আসবে। এখানে সমান মানে নারী-পুরষের সব বিষয়ে সমান সুযোগ থাকতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে নারীর অবদান কতটুকু? নাজনীন আহমেদ: রাষ্ট্রের প্রধান যখন নারী হন, তখন তিনি সেটা দেখেন, এগিয়ে নেন। রাষ্ট্রে নারীর অবদান আরও বেশি হতে পারত যদি আমরা সক্ষম প্রতিভাবান নারীদেরকে কর্মক্ষেত্রে আনতে পারতাম। আজ পোশাক খাতে বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী। সেই নারী শ্রমিকের বানানো পোশাকের ৮০ ভাগ রফতানি আসছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: উদ্যোক্তা তৈরিতে চেম্বারগুলোর অবদান কেমন? নাজনীন আহমেদ: উইমেন চেম্বার এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখছেন। তারা উদ্যোক্তা তৈরি করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। বিভিন্ন ফান্ডের মাধ্যমে ট্রেনিং হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। উইমেন চেম্বার, এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে। আগে অনেক কম হয়েছে এখন অনেকটা ভালো হচ্ছে। আপনি শুধু সেলাই মেশিনে সেলাই শিখিয়ে দিলেই হবে না, ব্যবসার বিষয়েও ট্রেনিং দরকার। সেক্ষেত্রে তারা সেটাই করছে। আবার এসএমই ফাউন্ডেশনও অনেক কাজ করছে। এতো দিনে ট্রেইনাররা বুঝতে পেরেছেন তাই তারা অনেক ভাল কাজ করছেন। নারী উদ্যোক্ত তৈরি এবং উদ্যোক্তা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে করতে উইমেন চেম্বাররের ভালো ভূমিকা আছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: এখনও নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হয়, এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: নারীকে অর্থনীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হয়। আগেই তাকে বলা হয় তুমিতো বোঝই না, এভাবে তাকে থামিয়ে দেয়। কর্মক্ষেত্রে নারীর সংযোগ যদি না ঘটানো হয় তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষমাতায়ন হবে না। আবার এমনও অনেক নারী আছে যে, পত্রিকা পড়তে পারে না, ঘরের বাইরে যেতে পারে না সে কিভাবে সিদ্ধান্ত দেবে? এজন্য তাকে ঘরের বাইরে গিয়ে জ্ঞান নিতে হবে। পড়ালেখা জানতে হবে এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে অবদান রাখতে হবে।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং নারী দিবসের শুভেচ্ছা রইল। নাজনীন আহমেদ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আর / এআর                                                                       নারীর কাজের আর্থিক মূল্য চিহ্নিত হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর যুক্তিসঙ্গত ইচ্ছা, স্বপ্ন ও মত প্রকাশের স্বীকৃতি পদদলিত হয়।সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ নারী পুরুষের গভীর ব্যবধান তৈরি করেছে, তৈরি করেছে বৈষম্য। নারীর প্রতি বৈষম্য বলতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে যে কোনো পার্থক্য, বঞ্চনা অথবা বিধিনিষেধকে বোঝায়। এর ফলে নারীকে পরুষের তুলনায় অধস্তন বা ছোট করে দেখা হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাস্কৃতিক, নাগরিক, পারিবারিক সব ক্ষেত্রে নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। অথচ মানব সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে যুগে যুগে নারী যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে, তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতেও নারাজ আমাদের পরুষতান্ত্রিক সমাজ। এসব বিষয় নিয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পক্ষে স্বাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত রিপন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অর্থনীতিতে নারীর অবদান কতটুকু? নাজনীন আহমেদ: আমরা সবাই জনসংখ্যার দিক দিয়ে জানি, দেশে নারী-পুরুষ সমানে সমান। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে কর্মক্ষম নারী যাদের বয়স ১৫ থেকে বেশি তাদের মধ্যে থেকে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী শ্রম বাজারে আছেন। অর্থাৎ তারা কর্মের সাথে সংযুক্ত আছেন। বাকিরা শ্রমবাজারে নাই। তার মানে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠি অর্থাৎ কর্মক্ষম নারীর ৬৪ শতাংশই শ্রমবাজারে নাই। শিশু এবং বৃদ্ধদের বাদ দিয়ে সম্পদের এই বিরাট একটা অংশের অপচয় হচ্ছে। আবার পুরুষের মধ্য থেকে আমরা যদি দেখি দেখব তাদের ৮২ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে আছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীকে গৃহের কর্মী হিসেবে দেখা হয় এখনও। এটাকে বিভাবে দেখছেন আপনি? নাজনীন আহমেদ: দেশের বেশির ভাগ নারীরাই গৃহকর্মে নিযুক্ত আছেন। কিন্তু গৃহকর্মে নিযুক্ত থাকাটা অর্থনীতির ক্ষেত্রে অবদান রাখে না। তারা পারিবারিক সামাজিকসহ বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন। নারীরা শুধু গৃহ কর্মের সাথে যুক্ত থাকবেন কেন। এখানে পুরুষদেরও এ কাজের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। তাছাড়া সংসারতো নারী পুরুষ দুজনের, তাই দুজনকেই এখানে কাজ ভাগাভাগি করে নিতে হবে। কারণ গৃহের কাজকে আমরা বলি ‘আনপেইড ওয়ার্ক’ এটার জন্য কেউ কাউকে অর্থ দেয় না। তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই ঘরের এবং বাইরের কাজ করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সমাজে নারীর কর্মকান্ড নাই, যেখানে একজন পুরুষের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা শক্তিশালি। এর কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: নারীরা কোনোভাবে অর্থ পায়না, আর অর্থ না পেলে সত্যিকার অর্থে কেউ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে না। তাছাড়া নানা কারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। নারীর একদিকে অর্থ নাই, অন্য দিকে তার সম্পদ নাই। এই দুই কারণে নারীর ভিত্তিটাই দুর্বল। আবার ধর্মীয়ভাবেও নারীকে সম্পদের দিক থেকে সমানিধিকার দেওয়া হয়নি। সম্পদের যেহেতু নারীর সমানাধিকার নেই তাই তার ক্ষমতা কোথা থেকে আসবে। হয় তার সম্পদ থাকবে না হয় তার রেগুলার আয় থাকতে হবে। তার সম্পদও নাই আবার আয়ও নাই সুতরাং তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নাই। ফলে নারীর ভিত্তিটা হয়েছে অনেক দুর্বল। অপর দিকে কর্মক্ষম পুরুষের ৮২ ভাগই অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালি। তারা শ্রম বাজারে আছে। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা মজবুত। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সমাজে গৃহের কাজ কি শুধু নারীরা করবে নাকি দুজনের মতামতের ভিত্তি করা উচিত। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাইব। নাজনীন আহমেদ: সমাজে পুরুষের সাথে নারীদের তুলনা করা যাবে না। মূল কথা হলো নারী-পুরুষ যাই হোক তাদের কর্মক্ষমের মধ্যে থাকা উচিত। তাছাড়া আনপেইড ফ্যামেলী ওয়ার্কগুলো সমানভাবে করতে হবে। এক্ষেত্রে একজন পুরুষও গৃহের সব কাজ করতে পারেন মতামতের ভিত্তিতে। আবার পুরুষকে যদি বলি গৃহসহ আপনাকে বাইরের কাজ করতে হবে। তাহলে বলতে পারি পুরুষকেউ একটা বন্ধনের মধ্যে রাখতে চাচ্ছি আমরা। আমরা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলি কিন্তু আমরা এটা ভুলে যায় যে ছেলেদেরকেও একটা বন্ধনের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। আবার পুরুষকে বলছি তোমাকে উপার্জন করতেই হবে। আর মেয়েকে বলছি তোমাকে উপার্জন না করলেও চলবে, বাসাই থাকলেও চলবে। এই দুইটাই ঠিক না। পুরুষেরও স্বাধীনতা থাকতে হবে। সে চাইলে পুরো ঘরের কাজটা নিতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল হলো নারী-পুরুষ আলোচনা, সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহ কর্ম আর বাইরের কাজের সিদ্ধান্ত নেবে। নারীদের যারা কর্মক্ষম তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। তারা দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন, যদি তাদের কাজে লাগানো যায়। এতে রাষ্ট্রিয় সম্পদের অপচয় হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শ্রমবাজারে যে সব নারী এসেছেন তাদের কৃষিতে অবদান কেমন? নাজনীন আহমেদ: নারীর অর্থনীতিক ক্ষমতায়ণে খুব কম সংখ্যক শ্রমবাজারে এসেছেন। শ্রমবাজারে যে সব নারী এসেছেন তাদের ৬৫ শতাংশের বেশি কৃষিতে আছেন। কৃষিতে তারা এমনভাবে আছেন,, যেখানে যে একটা ডায়নামিক তা কিন্তু না। কৃষিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা নিজের জমি বা অন্যের জমিতে কাজ করছে। একটা কৃষি খামার করা বা এ ধরণের কাজ কিন্তু খুবই কম। সব মিলেয়ে আমরা দেখি ম্যানফ্যাচারিং সেক্টর বা ট্রেডিং-এ নারীরা কম আছেন। যেখানে ম্যানফ্যাচারিং সেক্টর অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের ফরমাল জবে না আসার কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: এটা সত্য যে, নারীরা ফরমাল জবে খুব কম আছেন। আবার ফরমাল জব যদি বলি এর মধ্যে বেশির ভাগই আছেন গার্মেন্টস সেক্টরে। সরকারি চাকরি যেমন ডাক্টারসহ অন্যান্য জবে মোট ৫ শতাংশ নারী আছেন। এখানে সচেতনতার অভাব রয়েছে বলি মনে করি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারী কর্মক্ষেত্রে আসতে চায় না। এর কাণটা যদি বলেন? নাজনীন আহমেদ: এখন এটা ঠিক উচ্চ শিক্ষিত না হয়েও কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে। ৮ম বা১০ম শ্রেণী পর্যন্ত যারা পড়েছেন তারা কর্মক্ষেত্রে নাই। এর মধ্যে অনেকে আছেন যারা কর্মক্ষেত্রে আসতে চান। কিন্তু তারপরও তারা আসতে পারছে না। তাদের মধ্যে জেন্ডার রুল এমন ভাবে ঢুকে গেছে যে আমি বাইরের কাজ করব না। গৃহস্থলির কাজেই থাকবে। কেউ যদি সব সুযোগ পেয়েও গৃহে থাকে আমি মনে করি এটা তার চয়েজ। তবে এই চয়েজটা শুধু নারীর না একজন পুরষেরও থাকা উচিত। আমাদের সমাজে কিছু নারী অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম হতে চান সেক্ষেত্রে তারা সুযোগ পান না। আরেকটা হলো শিক্ষার সুযোগ পায় কিন্তু শিক্ষার সুযোগ নেওয়ার পর তারা উচ্চ শিক্ষায় যেতে পারেন না। আরেকটি অংশ আছে যারা শিক্ষা যতটুকু করেছে, কিন্তু শিক্ষাটাকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যেতে পারছে না। এ জন্য তাদের সচেতন করা দরকার। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী ঝরে পড়ে, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় এখনও নারীরা পিছিয়ে। এ বিষয়ে আপনার মাতমত জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: নারীদের আমরা শিক্ষিত করছি। এন্ট্রি পয়েন্টে আমরা শতভাগ মেয়ে, শতভাগ ছেলে স্কুলে ভর্তি করায়। প্রথম পর্যায়ে আমরা নারী-পুরুষ সমানে সমান স্কুলে ভর্তি হতে দেখি। এরপর যত উপর ক্লাসে উঠতে থাকে তত তারা ঝরে পড়ে। আবার নারীদের জন্য আমরা বৃত্তির ব্যবস্থা করছি। কলেজ লেবেল পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দিচ্ছি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে যেতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে না। এক্ষেত্রে তারা স্থানীয় পর্যায়ে যখন স্কুলে যায় তখন নানা ভাবে ইভজটিজিং-এর শিকার হন। আবার পরিবারকভাবে সমান সুযোগ দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে পরিবারকে সমান সুযোগবান্ধর হতে হবে। ছেলেকে যেমন সাপোর্ট দিবে মেয়েকেও শিক্ষায় সুযোগ দিতে হবে। তবে এখন সচেতনতা এসেছে স্কুল পর্যায়ে তবে কলেজ পর্যায়ে গেলে ইভটিজিং-এর সম্বাবনা থাকে। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার জন্য ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটা হলে নারীদের আমরা উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারব। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: লেখাপড়া জানা মেয়ে কর্মক্ষেত্রে আসতে চায় না। এর কারণ কি? নাজনীন আহমেদ: শিক্ষা নিয়েছেন এরপরও নারীরা কর্মক্ষেত্রে আসতে চাই না। এ জন্য তাদের সচেতন করতে হবে। এটা হতে হবে বইপত্রের মাধ্যমে, পাড়া ক্লাবের মাধ্যমে, গণমাধ্যমের মাধ্য, সেখানে জেন্ডার বিষয়ে বোঝোতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ ঘরের এবং বাইরের কাজ করবেন। সেইটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আসতে হবে। যারা ডাক্টার বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন, বিশ্বিবিদ্যালয়গুলোতে যারা পড়বেন এখানে বিরাট একটা বিনিয়োগ বাবা-মার এবং সরকারের। এরপরও যদি তারা কর্মক্ষেত্রে না আসে তাহলে তাদের ফিছনে যে টাকা খরচ হয়েছে সেগুলো ফেরত নেওয়া উচিত। কারণ একটা মেয়ে ডাক্টার হওয়ার জন্য সুযোগ-সুবিধা নিল কিন্তু কর্মক্ষেত্রে আসলো না, ওখানে একটা ছেলে হলে সে ভালো সেবা দিতে পারত। আমাদের এখানে অনেককে ডাক্টারি পড়ার সুযোগ দিতে পারছিনা, এরপরও তারা সেই সুযোগ নেওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে আসেনা। দেশে ডাক্টার নাই অনেক অনেক রোগি আছে। আগেই ঘোষণা দেওয়া উচিত যে, যারা ডাক্টারি পড়বে তাদের কমপক্ষে ৫ বছর বা ১০ বছর সামজে সেবা দিতে হবে। এই উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম সিট থাকে, কম্পিটিশন বেশি থাকে। এই ধরণের পড়াশেনার পরও যারা সেবা দেন না তারা সমাজের খারাপ উদাহারণ। কেউ যদি মনে করেন আমি কর্মক্ষেত্রে অতোদুর যাব না, তাহলে তাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। অতো যাওয়ার দরকতার নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সংসারে আসার দরকার নেই। সংসারের জন্য উচ্চ ডিগ্রি লাগে না। আবার মেয়েরা গার্হস্থ কলেজে পড়বে ছেলেরা পড়বে কৃষি শিক্ষা নিয়ে। এই বিভাজন কেন সমাজে? ছেলে গার্হস্থ কলেজে পড়তে পারবে আবার মেয়েও কৃষি নিয়ে পড়তে পারবে। আমাদের বিভাজনের এই মানুষিকতা থেকে বের হতে হবে। আবার ছেলেরা রান্না করতে পারে না, ঘর মোছার কাজ করতে পারেনা, কেনো। এটা হতে পারেনা এটা তাকে জানতে হবে। আবার মেয়েকেও বাজারে যেতে হবে, ব্যাংকে যেতে হবে, রান্না করতে হবে। ছেলেরা ডিম ভাজতে পারেনা এটা বিদেশিরা শুনলে হাসবে। দেশের ছেলেরা গর্ব করে বলে আমি এটা করতে পারিনা। মধ্য আয়ের দেশের ছেলে একটা ডিম ভাজতে পারে না মানা যায় না। আবার মেয়েদের পরিবার সামলিয়ে চাকরি করতে হবে, ছেলেদের ক্ষেত্রে কেন নয়। সে আরামে অফিসে যাবে এটা হতে পারেনা। পরিবার দুজনের। নারীকে বলা হচ্ছে পরিবার সামলায়ে চাকরি করতে পারলে কর, তাকে একটা বোঝা দেওয়া হচ্ছে। এর চেয়ে ঘরে বসে থাকা অনেক ভাল। এক্ষেত্রে অবশ্যই সমঝোতা থাকতে হবে নারী-পুরুষের। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ব্যবসার ক্ষেত্রে নারীর অবদান খুব কমই লক্ষ করা যায়। এর কাণটা যদি বলেন। নাজনীন আহমেদ: ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে মেয়েকে কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। খুব অল্প পরিসরে বাবার ব্যবসার এটকা অংশের ডিরেক্টর রাখা হয় মেয়েকে। কিন্তু একটা নতুন একটা ব্যবসায় রিস্ক নিয়ে ছেলে দেওয়া হয়, মেয়েকে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়ের চেয়ে মেয়েটা যোগ্য ছিল কিন্তু তাকে দেওয়া হয়নি। কারণ সে মেয়ে তাকে বিয়ে দেওয়া হবে অন্যের ঘরে। তাই এটা দেওয়া হয় না। এখনও আমাদের সমাজে এই প্রথা প্রচলন আছে যে বাবা অর্থ উপার্জন করবে আর মা সন্তানের লালন-পালন করবেন। কিন্তু এটা কেনো বাবা-মা দুজনের আদর স্নৃহ থাকতে হবে সন্তানের লালন-পালনে। এক্ষেত্রে মাও অর্থ দিবে, স্নৃহ দিবে, ভালবাসা দিবে। এজন্য অবশ্যই ডে-কেয়ার সেন্টার করা দরকার। বেসকারি খাতে আরো বেশি বেশি ডে-কেয়ার সেন্টার হচ্ছে। এটা হলে একজন মা সন্তানের লালন-পালন করতে পারেন এবং অর্থ উপার্জনও করতে পারেন। ডে-কেয়ার সুযোগটা খুব বেশি জরুরী।  এ ব্যাপারে প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নারীদের বিভিন্নভাবে সমাজ বা চলার পথে ইভটিজিং-এর শিকার হতে হয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: আমাদের অবশ্যই নারীদের সম্মান করতে হবে। এখনও নারীদের ইভটিজিং-এর শিকার হতে হয়। হাটে-ঘাটে যদি নারী নিরাপত্তা না পায় তাহলে কেনো সে যাবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আর সমাজে জেন্ডারের ভিত্তিতে সমতা আনতে হবে। সুযোগের সমতা যতি আসে তাহলে নারী-পুরুষের সমতা আসবে। এখানে সমান মানে নারী-পুরষের সব বিষয়ে সমান সুযোগ থাকতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অর্থনৈতিকভাবে নারী এখনও অসচ্ছর। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: নারী কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেনা বলেই সে অসচ্ছল না। এখানে অসচ্ছলতার কারণে এটা নয়, বরং অসচ্ছলতার কারণে নারী উদ্যোক্তা হতে পারছে না। চাকরি করতে সমস্যা না। অর্থনৈতিকভাকবে ক্ষমতায়ন মানে জব করা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে নারীর অবদান কতটুকু: নাজনীন আহমেদ: রাষ্ট্রের প্রধান যখন নারী হন, তখন তিনি সেটা দেখেন, এগিয়ে নেন। রাষ্ট্রে নারীর অবদান আরো হতে পারত যদি আমরা সক্ষম প্রতিভাবান নারীদেরকে কর্মক্ষেত্রে আনতে পারতাম। আজ পোশাক খাতে বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী। সেই নারী শ্রমিকের বানানো পোশাকের ৮০ ভাগ রফতানি আসছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: উদ্যোক্তা তৈরিতে চেম্বারগুলোর অবদান কেমন? নাজনীন আহমেদ: উইমেন চেম্বার এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল ভূমিকা রাখছেন। তার উদ্যোক্তা তৈরি করতে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করছে। বিভিন্ন ফান্ডের মাধ্যমে ট্রেনিং হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। উইমেন চেম্বার, এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে। আগে অনেক কম হয়েছে এখন অনেকটা ভাল হচ্ছে। আপনি শুধু সেলাই মেশিনে সেলাই শিখিয়ে দিলেই হবে না, ব্যবসার বিষয়েও ট্রেনিং দরকার। সেক্ষেত্রে তারা সেটাই করছে। আবার এসএমই ফাউন্ডেশনও অনেক কাজ করছে। এতো দিনে ট্রেইনাররা বুঝতে পেরেছেন তাই তারা অনেক ভাল কাজ করছেন। নারী উদ্যোক্ত তৈরি এবং উদ্যোক্তা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে করতে উইমেন চেম্বাররের ভালো ভূমিকা আছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: এখনও নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হয়, এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। নাজনীন আহমেদ: নারীকে অর্থনীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হয়। আগেই তাকে বলা হয় তুমিতো বোঝই না, এভাবে তাকে থামিয়ে দেয়। কর্মক্ষেত্রে নারীর সংযোগ যদি না ঘটানো হয় তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষমাতায়ণ হবে না। আবার এমনও অনেক নারী আছে যে, পত্রিকা পড়তে পারেনা, ঘরের বাইরে যেতে পারে না সে কিভাবে সিদ্ধান্ত দিবে? এ জন্য তাকে ঘরের বাইরে যেয়ে জ্ঞান নিতে হবে। পড়াশোন জানতে হবে এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে অবদান রাখতে হবে।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনার মূল্যবান সময় দেওয়া জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং নারী দিবসের শুভেচ্ছা রইল। নাজনীন আহমেদ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আর                                                                      

কিশোরী বধূ থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা

পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ নিরিবিলি জীবন যাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সমাজের অধিকাংশ নারী-ই অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতার অজুহাতে আবার কেউ নিরাপত্তার অজুহাতে নিজেকে গুঁটিয়ে রেখেই স্বস্তি পান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে। যারা বাধাকে ডিঙিয়ে আনন্দ পান। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে চান। পাঠক, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই দিনে আমরা এমন একজন নারীর গল্প বলবো যিনি জীবনের পরতে পরতে লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দৃঢ় মনোবল, সাহস, বুদ্ধি ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে নিজেই গড়েছেন নিজের জগত। হ্যাঁ, তিনি হেলেনা জাহাঙ্গীর। হেলেনা জাহাঙ্গীর একজন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা। সমাজসেবী হিসেবে তার স্বীকৃতি দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছেছে অনেক আগেই। পাশাপাশি টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর পরিচালক তিনি। জড়িত রয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমই, এনসিসিআই, এনএএসসিআইবি, গুলশান ক্লাব, গুলসান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলসান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলসান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলসান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলসান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলসান জগার্স সোসাইটি ও গুলসান হেলথ ক্লাবে। নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন নিয়ে দেশের মাঠ ঘাট চষে বেড়ালেও সিআইএস- বিসিসিআই, রোটারী, ইন্টারন্যাশনাল জোন্টা ক্লাব, ইন্টারন্যাশনাল ইনার হুইল ক্লাব, বাংলাদেশ ক্রীড়া সাংবাদিক সমিতি, আমরা সবাই ফাউন্ডেশন- এর মাধ্যমেও সমাজ সেবায় ভূমিকা রাখছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয়েছিল তার। হেলেনা জাহাঙ্গীর শুনিয়েছেন তার জীবনের গল্প। বলেছেন, লড়াই করে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প। এদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কেমন ভূমিকা রাখছে তাও উঠে এসেছে তার আলাপচারিতায়। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে নারীকে নিয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। সাহসী হেলেনা জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, এদেশের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা জাতির জন্য আশীর্বাদ। দেশকে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কাতারে নেওয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। পাশাপাশি এটাও বলেছেন, অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধির মধ্যে সততার অভাব রয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আজকে উদ্যোক্তাদের মাঝে, সমাজসেবীদের কাছে হেলেনা জাহাঙ্গীর একটি অনুপ্রেরণার নাম। কীভাবে এই জায়গায় এলেন। উঠে আসার গল্প বলুন। হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আমি বড় হয়েছি চট্টগ্রামে। পড়তাম কৃষ্ণচূড়া স্কুলে। আমাদের বাসা ছিল হালিশহর, মাদারবাড়ী, সদরঘাট এসব এলাকায়।আমার বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ সাহেব জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। আমি খুব চঞ্চল ও দুরন্ত ছিলাম ছোটবেলা থেকে। একপর্যায়ে বাবা অলিম্পিক কোম্পানী থেকে ভালো একটা প্রস্তাব পেয়ে আফ্রিকায় গেলেন। মা আমাদেরকে নিয়ে গ্রামে ফিরে এলেন। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি। সাধারণত যেটা হয় শহরের কোনো সুন্দর মেয়ে গ্রামে এলে গ্রামের বখাটেরা নানা ধরণের উৎপাত করে। তখনো করত। নানাভাবে প্রেম প্রস্তাব দেওয়া, দেওয়ার চেষ্টা করা ইত্যাদি। সত্যি কথা হচ্ছে, আমাদের পরিবারটা প্রভাবশালী পরিবার ছিল। কেউ তেমন একটা সাহস করতো না। এরপরও মায়ের চোখে ব্যপারটা পড়ে গেল। তখন নানা দিক থেকে ভাল ভাল বিয়ের প্রস্তাবও আসছিল। বিয়ে হয়ে গেল। ১৯৯০ সালের ৫ অক্টোবর আমাদের বিয়ে হয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ এত অল্প বয়সে বিয়ে। সেখান থেকে উঠে এলেন কিভাবে? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আমি ভাগ্যবান। আমার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন। আমাদের তিন সন্তান। আমার স্বামী তার তিন সন্তানকে যেভাবে যত্ন নেন, আমার যত্নটাও ঠিক একইভাবে নেন। আমি আমার অভিজ্ঞতায় শিখেছি, পেশাগত জীবনে তিনিই সফল, যিনি দাম্পত্য জীবনে ও সাংসারিক জীবনে সফল হবেন। স্বামী- স্ত্রীর ভাল বোঝাপড়া খুবই জরুরি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ ব্যবসায়ী হলেন কীভাবে? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আগেই বলেছি, আমি ছোট থেকেই খুব দুরন্ত ছিলাম। সবকিছুর প্রতি আমার তীব্র কৌতুহল ছিল। বড় বড় লেখকের লেখা পড়তাম। বিভিন্ন বিষয় নিজে লেখার চেষ্টা করতাম। তেমনি নিজে কিছু করার তাগিদ থেকে চাকরি খোঁজা শুরু করি। এখানে বলা হয়নি, ক্লাস এইটে পড়া অবস্থায় বিয়ে হলেও বিয়ের পরে নিজের চেষ্টায় পড়ালেখা চালিয়ে যাই। আমাকে আমার স্বামী খুবই সাপোর্ট দিয়েছেন। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় নিজ তাগিদে চাকরি খোঁজা শুরু করি। বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিচ্ছি। এ অবস্থায় একদিন আমার হাজবেন্ডের অফিসে যাই। নারায়ণগঞ্জে। তার অফিসে গিয়ে আমি একটা ধাক্কা খাই। অফিসের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, তার রুম, বসার চেয়ার, প্রভাব- আসলে এতকিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমডির অফিস যেমন হয়, তেমনটাই। আমি তখন ভাবলাম আমি যদি কোথাও চাকরি করি, তাহলে আমি ছোট হয়ে যাবো। তাহলে কী করা যায়? হুঁ, ভাল উপায় হচ্ছে নিজে কিছু করা। নিজের মতো করে নিজের একটা জগৎ তৈরী করা। এরমধ্যে ডিগ্রী পাস করলাম। আমাদের প্রথম সন্তানও এর মধ্যে এসেছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ যাত্রাটা কেমন ছিল? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ ব্যবসায়ের প্রতি তখন আমার আগ্রহটা এত বেশি ছিল, আমি ব্যবসা সম্পর্কে প্রচুর খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করলাম। এই ঢাকা শহরে বিভিন্ন অফিস ভিজিট করা শুরু করলাম। আসলে মানুষের মধ্যে কাজের ক্ষুদা থাকতে হয়। সেই ক্ষুদাটা আমার ছিল। আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করলাম। বললাম, আমি কিছু করতে চাই। তিনি আমাকে যথেষ্ট গাইড করলেন। মিরপুরে তিনি আমার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে একটা ফ্যাক্টরি করেছিলেন।  কিন্তু আমি শেয়ারে ব্যবসা করতে আগ্রহী ছিলাম না। তখন মিরপুর ১১- এ একটা ভবনের কয়েকটা ফ্লোর নিয়ে কাজ শুরু করি। পেইন্টিং বিজনেস। বিদেশ থেকে মেশিন নিয়ে এসেছিলাম। নিয়ম মেনে প্রচুর পরিশ্রম করতাম। সকাল সাতটায় অফিসে আসতাম। এরপর অল্প সময়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে লাগলাম। ঢাকা শহরের অধিকাংশ অফিস ভিজিট করার যে অভিজ্ঞতা তা ব্যবসায় আমাকে খুব কাজে দিয়েছিল। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা কেমন? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ (হেসে) প্রতিবন্ধকতা তো থাকবেই। মিরপুরে যখন ব্যবসা শুরু করলাম তখন দল বেঁধে অনেকে এল। চাঁদা চায়। ব্যবসা চায়। তবে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি। আমি ওদের মোটিভেট করে ফেললাম। পরে অবশ্য ওরা আমার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করত। কিন্তু আমি আর ঝুঁকি নিইনি। এরপর আমি আমার সব ফ্যাক্টরি গুছিয়ে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যাই। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কতোটা উপযোগী? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আমাদের পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ১৩% নারী। বাকি ১৭% পুরুষ। সেই বিবেচনায় সংখ্যাটা সন্তোষজনক না। আমাদের পোষাক শ্রমিকদের মাঝে অর্ধেকেরও বেশি নারী। সাধারণত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে নারীরা বেশী পরিশ্রমী হয়। অর্থনৈতিক সঙ্গতির কথা চিন্তা করে তাদের পরিবার বা স্বামী সেখানে নারীদের কাজ করতে বাধা দেয় না। বরং উৎসাহ যোগায়। পক্ষান্তরে উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজে আভিজাত্যের নামে নারীদের কর্মবিমুখ করে রাখা হয়। যেহেতু পারিবারিকভাবে আর্থিক অস্বচ্ছলতা নেই- সেহেতু সেখানে অনেক নারী নিজে কিছু করার চেষ্টায় উৎসাহী হয় না। এটা ইতিবাচক দিক নয়। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান শ্রদ্ধার দাবি রাখে। নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীরা পুরুষদের তুলনায় সৎ। ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করছে, দুর্নীতি করছে এমন অভিযোগ কোনো নারী ব্যবসায়ীর নামে সচরাচর পাওয়া যায় না। তারা যথেষ্ঠ পরিশ্রমী। সুযোগ পায় না। কিন্তু সুযোগ পেলে সুযোগের সদ্ব্যবহারে তারা সচেষ্ট। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ তৃণমূলে নারী উদ্যোক্তাদের সাধারণত কী কী সমস্যায় পড়তে হয়? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আমাদের দেশে তেলে মাথায় তেল দেওয়া হয়। আমি হেলেনা জাহাঙ্গীর আমার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে যেসব সুবিধা সহজে পাই- একজন তৃণমূল উদ্যোক্তা কিন্তু তা সহজে পায় না। নানা ধরনের জটিলতা তাকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয়। টেবিলে টেবিল তার ফাইল ঘুরে। নানা অজুহাত দেখানো হয়। আমি মূলত এ বিষয়গুলো নিয়ে জনসচেতনতামূলক কাজ করছি। তৃণমূল উদ্যোক্তাদের নানা কথা শুনছি। তাদের কাউন্সিলিং করছি। উৎসাহী করছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ রাজনীতি নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না? হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ আমি যে প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করছি, সেখান থেকে মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেশা যায়। মানুষের সুখ দুঃখে অংশীদার হওয়া যায়। আশপাশে অনেক এমপি মন্ত্রী দেখি যারা সেই সুযোগ পান না। এদেশের এমপিরা ভোগবাদী। অধিকাংশ এমপি শুধু নিতে জানে। দিতে জানে না। খেয়াল করলে দেখবেন, এমপি হওয়ার আগে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা থাকে একরকম। পাঁচ বছর যখন বিদায় নেন, তখন অর্থনৈতিক অবস্থা ফুলে ফেঁপে দেখার মতো। আজকের বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লড়াইয়ে তিনি এক অবিসংবাদিত নেতা। আমি তার স্নেহ পেয়েই খুশি। তিনি আমাকে দেশের প্রয়োজনে যা করার নির্দেশ দিবেন আমি তাই করব। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও নারী দিবসের শুভেচ্ছা। হেলেনা জাহাঙ্গীরঃ পৃথিবীর সব বঞ্চিত নারী পথ খুঁজে পাক, সেটাই প্রত্যাশা। / এআর /

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি